Tuesday, January 6, 2026


 

তুবড়ি

মনীশ সরকার

প্রথম পর্ব:

সময় টা ২০০৩ সাল। খুব একটা খারাপও যেমন নয়, তেমন খুব যে ভালো কিছু হচ্ছে তাও না। পশ্চিমবঙ্গে এখন উৎসবের মরশুম। আসলে উৎসব তো প্রত্যেক বছরই হয়, কিন্তু এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো আতশবাজি। শুধু শ্রাদ্ধ শান্তি ছাড়া বাকি সব কাজে এই আতশবাজি আমাদের বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু বাজি বললে তো শুধু শব্দ বা আলোর রোশনাই দেখলে হবে না, তার উৎস কোথায় সেটাও জানতে হয়। আতশবাজি প্রায় পুরো ভারত তথা আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক জায়গায় তৈরি হয়, কিন্তু হারাল নামে জায়গা টি বাংলার মানুষ দের জন্য খুবই চেনা একটা স্থান। হারাল হচ্ছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চাম্পাহাটি তে অবস্থিত এবং এই জায়গাটি আতশবাজির জন্য সমস্ত বাংলায় পরিচিত। এখানে ছোট বড় মাঝারি সকল প্রকার মানুষ বাজি বানাতে পটু। আর এই বাজির যখন কথা হচ্ছে তার মধ্যে তুবড়ি র কথাও বলতে হয়। তুবড়ি আমি আমার মামা-কে দেখেছি কী ভাবে বানাতে হয়, কিন্তু সেটা যে অতীব নিম্ন মানের হয় সেটা তার অগ্নি সংযোগের পর বোঝা যায়। তবে আমি বলছি তুবড়ি রাজা অলোক স্যামুয়েল মণ্ডলের কথা। তুবড়ি রাজা এই কারণে বলা, যে ওর বানানো তুবড়ি যেমন গুনে ভালো তেমনি তার শক্তি। অর্থাৎ আতশবাজির কম্পিটিশনে এ এস মণ্ডলের বাজির তুলনা হয় না। এই পর্যন্ত কোনোটাতে তে প্রথম কোনোটাতে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে তবে ফিরেছে। তবে অলোক যে শুধুই বাজি বানায় তা নয়, বছরের বাকি দিনগুলো ভ্যান রিক্সা চালিয়ে তার পরিবার চালায়। তার পরিবারে আছে একজন স্ত্রী, দু ছেলে আর একটা মেয়ে। প্রথম ছেলের বয়স খুব বেশি হলে সাত হবে, বাকি দুটো যমজ বলে দুজনেরই পাঁচ বছর হয়েছে। পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় না থাকলেও বেশ কাটছে এই পাঁচটা মানুষের জীবন। বড়ো ছেলেকে সবে গ্রামের সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে। তাই পড়াশোনার সাথে ওর খাওয়ার ব্যাপারটা ওখানেই হয়ে যায়।মানে ইস্কুলে মিড ডে মিল এর ব্যবস্থার জন্য একজনের পেট আপাতত ঠিক ভাবে চলছে, বাকি চারজন তাই বেশ সুখেই কাটাচ্ছে। অলোকের বাড়ি আসলে ঠিক বাড়ি বলা চলে না। কারণ জায়গাটা দখলের, তার ওপর ঝুপড়ি বাড়ির কটা টালি আর বাঁশের বেরা দিয়ে প্লাস্টিকে মোরা একটা ঘর। ঘরে আছে বাচ্চা দের ঘুমনোর জন্য একটা চকি আর চাটাই , মা বাবা দুজনেই নিচে মাটিতে আরেকটা চাটাই পেতে ঘুমোয়। তাও তিন বেলার ভাত ডাল হয়ে যায়। সরকারি সাহায্য বলতে রেশনের ব্যাবস্থা টা এখনও হয়ে ওঠেনি বলে একটু অসুবিধা তো আছেই। তার জন্য অবশ্য অলোক কাছের গির্জার ফাদার কে বলেছে, সেটাও বোধয় হয়ে যাবে। যাই হোক অলকের পরিবার মোটামুটি খেয়ে পরে ঠিকঠাক চলছে।

দ্বিতীয় পর্ব:

পঞ্চায়েত অফিসে এখন খুব তোড়জোড় শুরু হয়েছে, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান আজ সকাল বেলা আসবে বলে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। সেখানে গ্রামের বাচ্চাদের থেকে সম্বর্ধনা প্রদান, আঁকার প্রতিযোগিতা, আর একটু গ্রাম উন্নয়নের ব্যপারে বক্তৃতা হবে। দিনের যা অনুষ্ঠান হওয়ার তা বেশ ভালো ভাবেই হলো। কিন্তু আসল অনুষ্ঠান তো হবে দুই দিন পরে রাতে। পঞ্চায়েত প্রধানের আগমনের খুশিতে বাজি প্রদর্শনী হবে ওই দিন। সেখানে হারালের তাবর সব বাজির পসরা নিয়ে হাজির হবে এক এক জন মহারতি। সেখানেই ডাক পেল অলোক এস মন্ডল, সেখানে তার তুবড়ি দেখাতে হবে। অলোক শুনে খুব খুশি হলো। যে এতবড় মানুষের সামনে তার পটুতা দেখাতে হবে। তাই সে তার সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে বেশ কটা তুবড়ি বানালো এবং ওইদিন তার তুবড়ি র আলো যখন চারিদিকে ছড়ালো গ্রামের সকল মানুষ অলোকের নামে হাত তালি দিল, শুধু তাই নয় পঞ্চায়েত প্রধান নিজে গিয়ে অলোকের হাত ধরে পাঁচটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে বলল, আমার ছেলের বিয়েতে তোমাকেই তুবড়ি বানিয়ে জ্বালাতে হবে। তারপর অলোক স্যামুয়েল মন্ডল কে দেখে কে। বাড়িতে সেদিন রাতের বেলা ডাল ভাতের শেষে একটু মিষ্টি খেলো সকলে। অলোকের বউ অবশ্য আবদার করলো, "এবার কিন্তু কালী পুজোয় ময়দানে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, আর আমরা ওইদিন মোগলাই পরোটা খাবো, রাতে কিন্তু আর রান্না করবো না আমি।" হঠাৎ চারিদিকে তার নাম হয়ে গেলো। বাড়ির অনুষ্ঠান হোক আর পুজোর আতশবাজি প্রতিযোগিতা হোক এ এস মণ্ডলের তুবড়ি চাই চাই। বেশ ভালই অলোকের দিন কাটছে। অলোক এখন আর লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে না, ও এখন প্লিট করা প্যান্ট আর পুরো হাতা জামা পরে। এখন আর অলোক ভ্যান রিক্সাও চালায় না। কারণ ও জানে যে ওটা না চালালেও ওর পরিবারের কোন অসুবিধা হবে না। ধীরে ধীরে পুরনো টালির চাল টিনের চাল হলো, বাঁশের বেড়া থেকে মাটির দেওয়াল হলো এবং নিজের জন্য একটা ছোট্ট বাজি তৈরির ঘর ঠিক রান্না ঘরের পিছনে তৈরি করলো। কি নেই সেখানে , ছোট থেকে বড় হাড়ি, বারুদ, কাঠ কয়লা, ফসফরাস, লোহার কুচি, ও আরো কত কিছু।এখন প্রায় দিন ওকে বিভিন্ন লোকের অর্ডার এর তুবড়ি বানাতে হয়। আয় উপার্জন বেশ ভালই হচ্ছে। অলোকের বউ পাড়ায় খুব মেজাজে ঘোরে, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, " অলোক কে বেশি দেখা যায় না তো আর পাড়ায়, কোথায় থাকে সে এখন, মাথা উচু করে বলে অনেক কাজ পড়েছে ওর , খুব ব্যস্ত ।"এদিকে পরিবারের সুখী দিন যেনো বউ বাচ্চা র চেহারাতে ফুঁটে উঠছে। অলোক এখন হাড়ালের তুবড়ি রাজা।

তৃতীয় পর্ব:

এখন বছরটা ২০০৫ , বড়ো ছেলের বয়স নয়। ইস্কুলে মায়ের সাথে এখনও তাকে যেতে হয়, কারণ মিড ডে মিল টা যে ঠিকভাবে পাচ্ছে সেটা দেখতে হবে । বাড়িতে আরো যে দুটো বাচ্চা রয়েছে তারা যে আজ কি খাবে সেটা অলোকের বউ জানে না। এদিকে অলোকের ছোট ছেলের আবার দিন দিন পেট টা বড় হয়ে গেছে, মনে হয় ওর ক্রীমি ধরা পড়েছে, কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। গত ছয় মাস যে কিভাবে ওদের কেটেছে সেটা কেবল অলোকের পরিবার জানে। গির্জা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য এসেছিল , কিন্তু সেটা বেশি দিন চলেনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যেটুকু করা যায় সেই টুকু নিয়ে চলছে অলোকের পরিবার। বাড়ির এত চাপ যে বাকি ছেলে মেয়ে দুটো কে ইস্কুলে দিতে হবে সেটা আর অলোকের বউয়ের মাথায় নেই। এইভাবে আর চলতে পারেনা, অলোকের বউ মনে মনে চিন্তা করে আর চোখের জল ফেলে। একদিন তো ঠিক করেই ফেলেছিল পালিয়ে যাই, কিন্তু বাচ্চা গুলোর মুখ দেখে আর কিছু করতে পারেনি। গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বাচ্চা গুলোর মুখ দেখলেও যেনো এখন পাগলের মত লাগে অলোকের বউয়ের। কি করবে? একা বউ টা যে নিজের বাপের বাড়িতে কত আদরে বড়ো হয়েছে, সে এখন লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। রাস্তায় বেরোলে কতরকম লোক, আর কতরকমের চাউনি । দিনের বেলা চলতে ভয় লাগে যেখানে, সেখানে কত রাতে ফিরতে হয় অলোকের বউকে। একবার তো ট্রেন স্টেশন থেকে ফিরতে গিয়ে একদল মাতাল দের সামনে এসে ভেবেই নিয়েছিল যে এটাই বোধয় শেষ রাত। টহলদারি পুলিশ ঠিক সময় চলে এসেছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু মান টা আর থাকলো কোথায়। ওই রাতের পুলিশ এখন অলোকের বউয়ের রোজগারের নতুন পন্থা। সেদিনের পর থেকে প্রায় রোজই অলোকের বউয়ের কাছে আসে সুখেন ঘরোই। সুখেন রেল পুলিশের একজন কনস্টেবল, মাইনে ভালই। তাই জুলিয়েট ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছে, নাহলে নিজে খাবে কি আর বাচ্চা দের খাওয়াবে কি আর। কি করবে মেয়ে টা, সবকিছুই তো ছিল হাতের মুঠোয় , হঠাৎ যে কি হয়ে গেলো, সব শেষ। ২০০৪ এর জৈষ্ঠ্য মাসে এক গাদা তুবড়ির অর্ডার নিয়ে অলোক খুব ব্যস্ত ভাবে মশলা তৈরি করেছিল। সকাল তখন এগারোটা হবে, প্রচন্ড জোড়ে একটা আওয়াজ হলো, ভাগ্য খুব ভালো ছিল বাচ্চা বউ তখন মামা বাড়ি বেড়াতে গেছে। বাড়ির যেই অংশটা তে অলোকের তুবড়ি কারখানা করছিল আর তার লাগোয়া ঘরের রান্নার জায়গাটা বারুদের মশলায় জ্বলছে। অলোক কে চেনার উপায় ছিল না। দলা পাকিয়ে একটা মাংসের পুটলির মত হয়ে গেছিলো। বাপের বাড়ি থেকে পরের দিন এসে শুধু অন্তিম যাত্রায় চাদরে মোড়া একটা হারির মত জিনিস দেখেছিল অলোকের বউ। পুলিশ এসেছিল , রিপোর্ট লিখেছিলো, বাজি বানাতে গিয়ে অসাবধানতার জন্য মৃত্যু। মানুষ টা যেনো নিজের সাথে ওর তৈরি করা সংসারটা ও নিয়ে চলে গেলো। জুলিয়েট সারাদিন কেঁদে ছিল, অ্যালেক্স ব্যাপারটা বুঝে কেমন যেনো গুম মেরে গেছিলো, মিসবা আর মেরী কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের কোলে বসে এমনি কান্নাকাটি করছিল। পাড়ার লোকজন কটা পাটকাঠির বেরা দিয়ে ঘরের ভেঙে যাওয়া জায়গাটা ঢেকে দিয়েছে, আর পঞ্চায়েত থেকে ত্রাণের তাবু দিয়ে ছাওনি করে দিয়েছে অলোকের পুড়ে যাওয়া ঘর টাকে। অলোক কে কবর দিয়ে এসে আর রাতে জুলিয়েট কিছু খায়নি, শুধু দুই ছেলে আর মেয়ে কে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ছিল। বাড়ির পুড়ে যাওয়া জায়গাটা দেখে জুলিয়েট কেমন যেনো হয়ে গেলো , আবার সেদিন যেনো ও অলোক কে দেখতে পেলো, ও দেখতে পেলো অলোক গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে বলে উঠলো , " কি গো ওরা ঘুমালো, তাহলে আমায় এবার খেতে দাও, খুব খাটনি গেলো আজ, কাল আবার ত্রিশ টা তুবড়ি তৈরি করতে হবে, সব মিলিয়ে দেড়শো টা তুবড়ি ঘোষ বাবুর বাড়িতে দিতে হবে" , দূরে ট্রেনের সাইরেনের আওয়াজে যেনো ঘোর কাটলো, রান্না ঘরের দিকটা খুব অন্ধকার, ঘন কালো জমাট অন্ধকারটা জুলিয়েট কে যেনো গিলে খেতে আসছে, জুলিয়েট দৌড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো, মাথায় ঘাম আর চোখের জল একসাথেই গড়িয়ে জুলিয়েটের ঠোঁটে এসে পড়েছে, আজ মনে হয় অমাবস্যা, তাই মনে হয় খুব ঘন অন্ধকার। কে বলবে দেখে কাল পর্যন্ত যে বাড়িতে আনন্দের ফুলঝুরি দেখা যেত, সেখানে কেবল এখন ছাই পড়ে আছে দুঃখের।

চতুর্থ পর্ব:

চায়ের দোকানে বাসন মেজে দিনে পঞ্চাশ টাকা আয় হয়ে যায় মিসবা মন্ডল এর। কচি হাতে বারে বারে জল লেগে ক্ষয়ে যাওয়া আঙ্গুল গুলো এক সময় পেন পেন্সিল যে ধরত টা বোঝা যায়না। মিসবা অনেক কষ্ট করে একটা কাজ জুটিয়েছে, চায়ের দোকানে, রোজ পঞ্চাশ টাকা আয় এখন তার। বাড়ির দুই ভাই বোন আর নিজের পেট চালানোর ভার এখন ওই ছোট্ট কাধে চেপেছে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো ঠিকই, কিন্তু এখন মিসবা নিজেকে নিজেই শিখিয়ে পড়িয়ে গোটা একটা পুরুষ তৈরী করে ফেলেছে। মিসবা নাম টা দিয়েছিল গ্রামের একমাত্র ফাদার জ্যেরোম আলফ্রেড রয়। হারালের গির্জায় হাতে গোনা কয়েকজন খ্রিস্ট ধর্মের লোক থাকে। তারা নিজেদের মধ্যেই থাকতে ভালো বাসে, খুব বেশি সাতে পাঁচে থাকে না। তাই বাইরের থেকে সেরকম ভাবে বিপদে পড়লে সাহায্য খুব একটা আশেও না। একমাত্র যদি গির্জার ট্রাস্ট থেকে কিছু পাওয়া যায়, সেটাই অনেক। এখানে অনেকে খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল শুধু মাত্র একটা আয়ের সুযোগের জন্য। অনেকেই জন্মগত হিন্দু হয়েও খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল। অলোক মন্ডল তাদের মধ্যেই একজন। কিন্তু শর্ত একটাই প্রতি রবিবার গির্জায় আসতেই হবে, আর যিশু খ্রিষ্টের নাম ছড়াতে হবে। দুটোর কোনোটাতেই অবশ্য খুব একটা গায়ে লাগায়নি অলোক, তবে যখন বিয়ের সময় হয়েছিল তখন ফাদার নিজে অলোক কে বলেছিলেন , এবার থেকে বউ কে নিয়ে আসতে ভুলনা যেনো। বিয়ের পর ভোলেনি অলোক, কারণ বউ ছিল জন্মগত খ্রিষ্ট ধর্মের। বউয়ের জন্য এই নিয়মের মধ্যে আসতেই হয়। গির্জার ট্রাস্ট থেকে অলোক কে একটা ভ্যান রিক্সা দিয়েছিল, কিন্তু পুরনো হাতের কাজ কোনোদিন বন্ধ করেনি। বিয়ের সুন্দর একবছর কাটার পর প্রথম সন্তান এলো যেনো দেব দূতের মত। অলোক ভালো বেশে নাম দিয়ে ছিল দুলাল, কিন্তু বাধা পড়লো মায়ের কাছে, যাইহোক ছয় মাস বাদে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য গির্জায় গিয়ে ফাদার মাথায় হাত দিয়ে মিসবা নাম টা দেয়। বড় ছেলের যখন পাঁচ বছর তখন যমজ সন্তান দিয়ে ঘরে এসেছিল অলোকের বউ জুলিয়েট মন্ডল। পরের সন্তানদের নাম অবশ্য অলোক করেছিল, ছেলের নাম দেয় অ্যালেক্স আর মেয়ের নাম দেয় মেরী। খুব ভালো নাম দিয়েছো, ফাদার বলেছিলেন অলোক কে। মিসবা প্রথম প্রথম একটু হিংসা করতো বটে তবে পড়ে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল তার দুই ভাই বোন কে। এখন মিসবার এগারো বছর , ইস্কুল কবে যে শেষ করেছে সেটা আর এখন মনে করতে চায়না। ওর ওপর এখন এই দুই ভাইবোন এবং নিজের পেট চালানোর ভার পড়েছে। মা দুই বছর আগে কার সাথে চলে গেছে এক রাতে। পাড়ায় লোকেরা কয়েক দিন খোঁজ করেছিল, কয়েক জন খাবারও দিয়ে গেছিলো, কিন্তু ওই কয়েক দিন , বাকি টা আর ঠিক হয়ে ওঠে নি। গির্জার ফাদার মিসবার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বুঝিয়ে ছিল যে এখানে থেকে আর কি হবে, চলো আশ্রমে থাকবে তোমরা। দুই একদিনের জন্য থেকেও ছিল, কিন্তু একদিন রাতে ফাদার মিসবাকে নিজের ঘরে ডেকে মিথ্যা ধর্মের অনেক কথা বোঝাতে গিয়ে মিসবাকে নির্যাতন করতে গেছিলো, কিন্তু মিসবা হাতের কাছে একটা কলম পেয়ে ফাদার এর পায়ে গেঁথে ওই রাতেই ভাই আর বোন কে নিয়ে নিজের পুড়ে যাওয়া ঘরে পালিয়ে চলে এসেছিল। মায়ের কথা আর এখন ওর বেশি মনে আসে না, কোথায় গেছে কি করছে কিছুই জানেনা মিসবা। কিছু দিন না খেতে পেয়ে কষ্ট হচ্ছিল তবে এখন ও বাড়ির কর্তা, তাই চোখের জল শুকিয়ে মনকে লোহা করে ফেলেছে। এই এগারো বছর বয়সে ছেলেটা যেনো পৃথিবীর সব জ্বালা সহ্য করে নিয়েছে। খেতে না পেয়ে ভেবে ছিল চুরি করবে, কিন্তু পারেনি, বাবা ওকে বলেছিল, " জীবনে যতই কষ্ট হোক তোমার , হারামের সুখ কখনো নিওনা সোনা।" তাই পাড়ায় চায়ের দোকানে কাজ করে ইনকাম করে। ওর খুব ইচ্ছা যে ভাই বোন কে ইস্কুলে দেওয়ার, নিজের শেষ হয়ে যাওয়া ইচ্ছাটা যেনো মিসবা ওদের মধ্যে থেকে দেখতে চায়। কিন্তু কি করে ইস্কুলে ভর্তি করবে জানেই না এগারো বছরের ছেলেটা। পঞ্চায়েত থেকে একবার কে যেনো একজন এসে বলেছিল যে সরকারি হোম এ যেতে হবে, কিন্তু তার পরে আর কথা এগোয়নি। রাতে যখন ছেড়া তাবুর চাল থেকে হাওয়াই রকেটের আলো দেখতে পায় তখন খুব রাগ হয় মিসবার, ও যেনো ওই আতশবাজি টাকে আর দেখতে পারেনা, কারণ ও মনে করে ওই আতশবাজি টা ওর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ছোট্ট অ্যালেক্স চোখ কচলাতে কচলাতে দাদা কে জিজ্ঞাসা করে ছিল, " আচ্ছা দাদা আমরা কাল কি খাবো রে, জানিস তো আমার খুব ইচ্ছা করছে এখন গরম ভাত আর ছোট মাছের ঝোল খাবো ঠিক মা করে দিত না সেই রকম"। মিসবা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ছিল আজ ঘুমিয়ে পর কাল আমি তোদের খাওয়াবো। পরের দিন অনেক সকালে উঠতে হবে ওকে, চায়ের দোকানে সকাল বেলা খুব চাপ থাকে। সকালে উঠে বাড়িতে তিনজন জল মুড়ি বাতাসা খেয়ে, আর আগের দিনের পান্তা ভাত হাড়ি তে রেখে চলে যায় মিসবা। কাজ করতে করতে হঠাৎ কে একজন এসে বললো , তুমি এখানে কাজ করছ কেনো, তোমার মা বাবা নেই, তারা কি তোমায় এই কাজ করতে বলেছে। এত প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে যায় মিসবা, কি বলবে বুঝতে না পেরে চায়ের দোকানের মালিক কে ডেকে নিয়ে আসে ও। অনেক ক্ষন পর মালিক এসে মিসবা কে ডেকে বললো, যা তোর ভালো দিন এসে গেছে। একটা এন জি ও থেকে একজন এসেছে, তোকে আর তোর ভাই বোন কে বলেছে কাল তোর বাড়ি গিয়ে ওদের হোম এ নিয়ে যাবে, ওখানে অনেক বন্ধু পাবি তুই, ভালো খেতে আর পড়তে পারবি, তোর ভাই বোন টাও ভালো ভাবে থাকবে, আজ তোর ছুটি, হাতে একশো টাকা দিয়ে চায়ের দোকানের মালিক বললো ওকে। বিকাল বেলা তিন জনের জন্য রাতের খাবার কিনে মিসবা ঘরে ফিরে দুই ভাইবোন কে বললো সব কথা। মিসবা বললো আজ এই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়, কাল আমরা হোম এ চলে যাবো। ছোট্ট অ্যালেক্স বললো, দাদা, হোম টা কিরে? আমাদের নতুন বাড়ি!




 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ।।
ছাই ও ছায়ার পরবর্তী: উদয় সাহা
আলোচক: মানিক সাহা
কুচবিহারের একজন গুণী শব্দ শিল্পী। কখনো সে শব্দ ধ্বনী আবার কখনো সেই শব্দ অক্ষরে আবৃত। মুজনাই সাহিত্য সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে কাব্য পুস্তিকা 'ছাই ও ছায়ার পরবর্তী'। সম্ভবতঃ বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ধরনের কবিতা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই কাব্য পুস্তিকা। কবিতা কখনো রাতের আকারে চলমান আর কখনো পাখির মতো পদ্য ছন্দে হাওয়ায় উড্ডীন। আনন্দ হয় যখন দেখি কবিতা কবির আঙ্গুল থেকে বেড়িয়ে আসে - "আলেকজান্ডারের মতন তীব্র গতিতে ছুটে আসছে বাতাস/ কবিদের খাতা ভরে উঠছে মরশুমি কবিতায়" (মরশুমি)।
অসাধারণ সব পংক্তি রচনা করেছে উদয়। একজন কবিই তো বলতে পারেন - "সব মৃত্যুই মেঘের কাছে মিসড কল দিয়ে যায়" (সবাই ঘুমোলে)। কিংবা "পুকুর নদী সাগর যে মুগ্ধরেখায় একসাথে বসবাস করে তার নাম জলপ্রহর। তোমার বুক কিংবা চোখ সেই প্রহর মাখানো শ্রাবণ বেলা। " (ধূলির সরগমে আঁকা/ দুই)
উদয়ের কবিতায় মৃত্যু, বিষন্নতা, ঘুম বারবার ফিরে এসেছে। কবির মধ্যে কাজ করেছে অতীতচারীতা ও মায়াময়কাতরতা। রোমান্টিক পেলবতার খানিক স্পর্শ পাওয়া যায় বৈকী! তবু শেষ পর্যন্ত তিনি আধুনিকতাকেই অবলম্বন করেছেন। তিনি লিখতে পারেন- "নদী তো ঘুমের ভেতরেও চলে, অবিরাম। মৃত্যুর পরোয়ানার উল্টো পিঠে পরপারের আলোর বিজ্ঞাপন। জলের দাগ মনের দেওয়ালে সাবলীল ওয়ালপেপার।" (ছাই ও ছায়ার পরবর্তী / দুই)
একই কবিতার এক নং অংশে তিনি লিখেছেন - "কারা যেন শেষকৃত্য সেরে বাড়ি ফিরে গামছা থেকে ধুয়ে ফেলছে শবগন্ধ সব"। আমরা প্রায় সকলেই বিগতকালের কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে চলতে শিখি। যা কিছু বর্জনীয় তাকে ফেলে দিয়ে, গ্রহণযোগ্য যা কিছু, তাকে অবলম্বন করে আমরা সূর্যের দিকে হেঁটে যাই।