Saturday, April 4, 2026


 

ফ্রড

অভিজিৎ সেন 

মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে ঘিরে থাকে অজস্র স্বপ্ন । এমনকি অলীক কল্পনাকেও সত্য বলে নিত্যদিনের পোশাকের মতো মনের শরীরে পরিধান করে থাকে যেন অদৃশ্য কোন বস্তু । সে সময় যুক্তি বুদ্ধিকে রেখে দেওয়া হয় নিষ্ক্রিয় করে। মিথ্যা স্বপ্ন বারে বারে মস্তিষ্ককে আঘাত করতে থাকে,একসময় মিথ্যা বিষয়কেও সত্য ভেবে নেয় চিন্তাস্রোত। অবাস্তবকেই মন বাস্তব বলে প্রতিষ্ঠা করতে উঠে পড়ে লেগে যায়। প্রতীক চৌধুরী বয়স পঞ্চাশ, পেশায় শিক্ষক। একটি ছেলে। নবম শ্রেণির ছাত্র। মোটা অঙ্কের টাকা ব্যাঙ্ক থেকে লোন নিয়ে দুকাঠা জমি কিনে একতলার ছাদ দিয়ে নব নির্মিত বাড়িতে উঠে আসে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে দিয়ে। প্রতি মাসে মাইনার সিংহভাগ অংশই ঋণ পরিশোধে চলে যায়। স্কুল থেকে ফিরে এসে রাতে সপ্তাহে একদিন কয়েকটি ছাত্র পড়িয়ে নিত্যদিনের যাতায়াতের গাড়ির ভাড়া ও হাত খরচের টাকাটা তুলে নেয়। 
                   
ছেলেটি লেখাপড়ায় ভালো। ছেলেটির ভবিষ্যতে যাতে লেখাপড়ার পথে আর্থিক সমস্যা বাধা হয়ে 
না দাঁড়ায় সেই বিষয়ে প্রতীক দিনরাত ভাবে। রাতে নিরিবিলিতে স্ত্রী মেঘার সঙ্গে বলে,' প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকাও খুব বেশি জমেনি, আর অবসরের পর পেনসন যা পাওয়া যাবে তাতে আমাদের কোন ভাবে চলে যাবে। সম্পত্তি বলতে এ বাড়িটি। ছেলেটির লেখাপড়ার খরচ কীকরে যে চালাবো ? আরতো মাত্র দুবছর চাকরি আছে । ভাবছি কিছু টাকা শেয়ার বাজারে খাটাবো। তুমি কি বলো ?' 'আমি আর কী বলবো, আমি কী এসব বুঝি,যা করবে ভেবে চিন্তে করো। ঠগ লোকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। বুঝেশুনে করো ।' 
                  স্কুল থেকে ফিরে বিকেলের দিকে হাঁটতে বেড়ায় নিয়মিত। ঘন্টা খানেক হেঁটে এসে চা পান পর্বের পর ছেলেকে নিয়ে বসে। ঘন্টা দুই পড়ানোর পরে সে ফ্রি। রবিবার কয়েকটি ছাত্র পড়াতে বাইরে যায় । সেদিন বাড়ি ফিরে আসে রাত দশটায়। এই তার নিত্যদিনের ছকবদ্ধ কাজের খতিয়ান। বাড়ির সিংহভাগ কাজের দায়িত্ব স্ত্রী মেঘাই পালন করে থাকে। 
        
কতো স্বপ্ন ছেলেকে ঘিরে। লেখাপড়ার জন্য চাই মেধা, শিক্ষার্থীর শিক্ষাগ্ৰহণের চাহিদা,চাই প্রচুর অর্থও। ছেলেটির মধ্যে সেসবই আছে। কিন্তু প্রতীকের জমানো অর্থের পরিমাণ কম। ছেলে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়েই লেখাপড়া করবে। জয়েন্ট পরীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডাক্টার হতে চায়। এখন থেকেই সে মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করে। সময়ের অপচয় করে না। ছেলের প্রবল আগ্রহের কারণে প্রতীক দিনরাত চিন্তা করে কীভাবে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে লক্ষাধিকের বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারে সৎভাবে পরিশ্রম করে? কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার কারণে সে কখনোই কঠোর শ্রম করতে পারেনি। যা মাইনা পায় তাতে সংসার চলে যায়।সামাজিকতা,ঔষধের খরচ,উৎসবের বাজার, দেশের দর্শনীয় স্থানে বছরে একবার ভ্রমণ সবমিলিয়ে খুব হিসেব করেই চলে প্রতীক ও মেঘা । ইভিনিং ওয়াকের সময় বন্ধুরা বলেছিল 'কিছু টাকা শেয়ারে, কমকরে পাঁচ বছরের জন্য লগ্নি করে রাখলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যায় অন্ত্যত ফিক্সড ডিপোজিটের তুলনায়। তবে এটাতেও ঝুঁকি আছে, পরিবেশ পরিস্থিতি অর্থাত্ মার্কেটের ওঠা নামার উপর নির্ভর করে। তবে দেখা গেছে দীর্ঘ সময় ধরে লগ্নি করে রাখলে লাভই হয়। তবে ভালো করে স্টাডি করে টাকা রাখা উচিৎ । অথবা পরিচিত এজেন্ট এর মাধ্যমে করা উচিৎ।' প্রতীক কয়দিন ধরেই ভাবছে সে বিষয়ে । সে সরকারি সংস্থা ছাড়া কোন বেসরকারি সংস্থায় টাকা রাখেনি আজও। পি.এফ,পি.পি.এফ ছাড়া কোথাও টাকা জমা রাখেনা । এখানেই যা আছে । আর কিছু নেই । শেয়ার মার্কেট বিষয়ে বিশেষ ধারণাও নেই। সে কয়দিন ধরে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই হেঁটে এসেই মোবাইল নিয়ে বসে যায়। সংসার ও ছেলের দিকে নজর যেটুকু দিতেন তাও আজকাল বন্ধ হয়ে গেছে। মোবাইলের স্ক্রিন শুধু উপরে নীচে স্ক্রল করে চলে। সেদিন একটি বিশেষ বিজ্ঞাপন দেখে চোখ থেমে যায় তার উপরে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি স্কিম। বিজ্ঞাপন দিয়ে চলেছে দেশের কেন্দ্রীয় স্তরের নেতা,কখনো দেশের স্বনামধন্য শিল্পপতি। এটা দেখে প্রতীকের এই স্কিমের সত্যতা বিষয়ে কোনই সন্দেহ থাকে না। প্রযুক্তি ব্যবহার করেও দেখলো ঠিক আছে। লেখা আছে লিঙ্কে ক্লিক করে মোবাইল নাম্বার এবং Gmail দিলেই মিনিট দশেক পরে একজন কথা বলবে। এককালীন বাইস হাজার টাকা লগ্নি করলে প্রতিদিন ষাট, মাসে দুই লক্ষের বেশি মাসিক আয় সম্ভ ! বিজ্ঞাপনের নীচে অনেকেই মন্তব্য করেছেন তারা কেউ কেউ মাসে চার লক্ষের অধিকও আয় করেছেন। দুই একজন এটাকে 'ফ্রড'ও বলেছেন। সত্য আর মিথ্যার মধ্যে দোদুল্যমান প্রতীকের মন মিথ্যার মায়াজালে শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়লো। এবার সে দিনরাত ভবিষ্যৎ ধনী জীবনের স্বপ্নের স্বকল্পিত আবেশের ঘোরে ঘুরে চললো। এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারো সাথেই আলোচনা করলোনা । এটা কী জাদু ? অল্প সময়ে অধিক টাকা কী ভাবে অর্জন সম্ভব? বিজ্ঞাপন দাতাগণ বলছেন আধুনিক এ.আই প্রযুক্তির সাহায্যে স্বয়ং এ.আই বিদেশে ট্রেডিং করে নিশ্চিত আয় করে দেবে লগ্নিকারির হয়ে। এ.আই বর্তমান প্রযুক্তির একটি অপরিহার্য অংশ। দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসায় চিকিৎসা বিজ্ঞান একে ব্যবহার করছে। এমন বহু যুক্তি প্রতীকের মনকে বিশ্বাসের কষ্টিপাথরে ঘষে উত্তীর্ণ হলো । প্রতীকের বিশ্বাস দৃঢ় হলো সে টাকা লগ্নি করলো। সে বুঝলো সে কোন ভুল করেনি। কিন্তু তার মনে এই ভাবনা এলোনা এই এ.আইকে ব্যবহার করে শঠ ও ঠগেরদল অসৎ উদ্দেশ্য সাধন করতে পারে। এ.আই এর মাধ্যমে স্বনামধন্য নেতা শিল্পপতিদের ইলিউশন প্রতিকৃতিকে উপস্থাপনের মুন্সীয়ানায় সত্য বলে প্রচার মাধ্যমে চালিয়ে জালিয়াতের সূক্ষ্মছকের পরিকল্পিত ফাঁদ পাততে পারে। যারা বুঝতে পারে তারা সাবধান থাকে আর যারা এই রহস্যময় কুহেলিকা ভেদ করতে পারে না তারা সর্বসান্ত হয়। প্রতীকের বিশ্বাস ছিল এটা তেমন নয়। তাই আয়ের এমন সহজ ও সৎ পথ পেয়ে মনের যাবতীয় ভাবনা সব দূর হয়ে‌ যায়। ছেলের লেখাপড়া অর্থ আর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবেনা । এটাই তার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ছিলো। দুর্গাপূজাটা এবার তার ভালোভাবেই পার হলো । আগামী নববর্ষের সময় তার আর্থিক অবস্থা উন্নতির চরম শিখরকে স্পর্শ করবে সেকথা যতোবার ভেবেছে ততবারই তেনজিং নোরগে ও এডমন্ড হিলারির হিমালয়ের প্রথম শীর্ষদেশ ছোঁয়ার শিহরণ সমস্ত শরীর দিয়ে বয়ে যেতে লাগলো।
           
মনে মনে কতো টাকা সে আগামী পাঁচ বছরে আয় করবে তার একটি ধারণা করে নিলো। সে মনে মনে ভেবেছে, 'টাকা বেশি হলো জমি কিনে রাখবে। বই পড়তে ভালোবাসে প্রচুর টাকার বই কিনবে। যতো ঋণ আছে পরিশোধ করে দেবে। মেধাবী কিন্তু অভাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করবে। এমন কতো কী ভাবনা তার মনের মধ্যে খড়কুটোর মতো জমতে জমতে এক অলীক অট্টালিকা গড়ে চললো প্রতিদিন! অন্যদিকে সেই ফ্রডেরা তার সঙ্গে আলাপের আড়ালে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের গোপন তথ্য প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই জালিয়াতি করে জেনে নিলো, কিন্তু প্রতীক ঘূণাক্ষরেও সেটা টের পেলো না। 
                  
সন্ধ্যায় চা পান করতে করতে প্রথমে বাংলা খবর পরে হিন্দি খবর নিয়মিত শোনে। প্রতিদিন একটি ইংরেজি খবরের কাগজ রাখে, নিজেও পড়ে ছেলেকেও পড়তে হয়। পৃথিবীতে চলেছে ভয়ানক যুদ্ধ। চলছে রাশিয়া ইউক্রেনের কয়েক বছর ধরে যুদ্ধ । কোন পক্ষকেই থামানো যাচ্ছে না। বারে বারে শান্তি বার্তা ব্যর্থ হচ্ছে। হামাসদের নারকীয় হত্যাকাণ্ড এবং অপহরণের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ইজরায়েল গাজায় ভয়ানক ভাবে মিশাইয়া বর্ষণ করে চলেছে দিনে রাতে । ভারতের কাশ্মীরের পেহেলগামে নৃশংস নারকীয় হত্যা করলো পাকিস্তান প্রেরিত আতঙ্কবাদী। ভারত গুঁড়িয়ে দিলো পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অবস্থিত আতঙ্কবাদীদের ক্যাম্পগুলো। দুই দিন দুদেশের মধ্যে যুদ্ধের পর পাকিস্তানের যুদ্ধ বন্ধের আবেদন পর শান্তিপ্রিয় ভারত যুদ্ধ থামালো । পৃথিবীর ধনী দেশ সমূহ নানা অছিলায় ছোট ছোট দেশের মধ্যে যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে রাখে, যুদ্ধাস্ত্র বিক্রির জন্য। খনিজ তেল, ইউরেনিয়াম মতো মূল্যবান খনিজের জন্য। কেউ চায় নিজের ভূভাগের বিস্তারের জন্য। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলেও খন্ড খন্ড যুদ্ধ হয়েই চলছে। প্রতীক মনে করে মানুষের লোভ, অহংকার ও আগ্ৰাসী মনোভাব পারমাণবিক যুদ্ধ না বাঁধিয়ে দেয় । টি.ভি তে কোথাও ভালো খবর সে খুঁজে পায়না! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, 'আমাদের তো জীবন একরকম কেটে গেলো, আমাদের ছেলেমেয়েদের কী যে হবে ? যুদ্ধের প্রভাব সারা পৃথিবীর অর্থনীতির উপর গভীর ভাবে পড়ে চলেছে। নিত্যদিনের জিনিস পত্রের দাম আকাশছোঁয়া হয়ে গেছে। চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজে অসামাজিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়। কর্মক্ষম বলিষ্ঠ যুবসমাজ কাজের অভাবে আশ্রয় নেয় মাদকের মাঝে, আবার অর্থের চাহিদা মেটাতে যুক্ত হয়ে যায় বেআইনি কাজে । এমন সময় তার ছেলেটা ঘরে ঢুকে বললো 'বাবা আজ পড়াবে না ' ? 
 
                  ছেলেকে পড়ানোর পরে ফেসবুকে পরিচিত অপরিচিতের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। বিশেষ ঘটনার আপডেট দিচ্ছেন ও নিচ্ছেন। বিষয়টি মনমতো হলে লাইক দিচ্ছেন, বিতর্কিত বিষয় এড়িয়ে যান,অরাজনৈতিক বিষয়ে কমেন্ট করেন আর শিক্ষামূলক বিষয় হলে তাকে শেয়ার করেন। বিশেষ কিছু ছবিও সেভ করে রাখছেন। এমন করতে করতে হঠাৎ একটি ফোন এলো, অজানা নম্বর‌ থেকে । কলটি রিসিভ করতেই ফোনের ওপার থেকে ভেসে এলো অবাংলাভাষী একটি লোকের গলা । তিনি পরিচয় দিয়ে বললেন তিনি সেই অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার যার দায়িত্বে প্রতীকের লগ্নি করা টাকা আছে। যে তার টাকাকে বিদেশি কোম্পানিতে বিনিয়োগের দায়িত্ব পালন করবেন, প্রতীকের লাভ হলে তিনি কমিশন পাবেন, কোন ছল চাতুরী এখানে নেই । It is fully Transparent and Reliable Trading । সেই লোকটি বলেছে,' আপ প্রতীক বাবু বিলকুল চিন্তা মত কিজিয়ে আপকে পয়সেকো ইতনা রিটার্ন দেঙ্গে আপকা হর তকলিপ আগে চলকে বিলকুল সমাপ্ত হো যায়েগা ।' এই কথায় পরে অবিশ্বাস করার মতো কিছু সে পেলোনা । এরপর তাকে প্রাইম ট্রেডের নামে গুগলে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে দিলো । একটি পাসওয়ার্ড দিলো । তারপরে তাকে নতুন পাসওয়ার্ড তৈরি করতে বললো । এটাও বললো এটা যেন প্রতীক কারো সাথে সেয়ার না করে এমনকি তার (অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার) সাথেও না । একটি কোড নম্বর দিয়ে বললো কেউ ফোন করলে কোড নম্বর টি ঠিক করে বলার পরই তবে কথা বলতে। এভাবেই তার সাথে প্রতীকের কথা চলতে থাকে মাঝে মাঝে। প্রতীক লোকটির কথায় বিশ্বাস করে নিজের সম্পর্কে সব কথা বলে, নিজের স্বপ্নের কথা বলে। নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে কথা হয়। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও হয়। একমাস কেটে যায় । কিন্তু প্রতীক দেখে তার টাকা কখনো পঁচিশ কখনো ত্রিরিশ হাজার হয়‌, তার বেশি না। প্রতীকের মনে খটকা লাগতে শুরু করে । লোকটি প্রতীকের কাছে আরও টাকা চায় ট্রেডের জন্য। প্রতীক বলেন, আর টাকা দেবো না, যা হওয়ার এই টাকাতেই হবে।' লোকটি তাকে নানা ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। প্রতীক রাজি হয়না। প্রতীক বুঝেছে তার টাকা বহুগুণে বৃদ্ধি তো হবেই না বরং টাকাটি তুলে নিতে হবে।
    
২০২৫ সাল । এর মধ্যে দুর্গাপূজা চলে এসেছে। লোকটি বারেবারে ফোন করে, প্রতীক কখনো ফোন ধরে বেশিরভাগ সময় এড়িয়ে যায়। লোকটি একই কথা বলে। এভাবেই পুরাতন বছর চলে যায়। নতুন বছরের সূচনা হয় ২০২৬ এর হাত ধরে। বছরটি পৃথিবীর পুরানো বছরের যুদ্ধ সঙ্গে করেই যেন এসেছে। নতুন বছরে অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার আর ফোন করে না প্রতীককে। সে ভাবে এবার টাকাটা তুলে নেবো । কিন্তু স্কুলের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ব্যস্ততায় সব ভুলে যায়। 
         
মাঝে প্রতীকই লোকটি যে নাম্বারগুলোতে ফোন করতো সে গুলোতে ফোন করে, যে হোয়াটসঅ্যাপ দিয়েছিল সেখানে ম্যাসেজ করে কোন উত্তর পায়না । ঠিক করে লগ্নি করা পুরো টাকাটি সে তুলে নেবে।
কয়দিন ধরেই তার বাম চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সে ডাক্তার দেখায় । চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করতে হয়, চোখের পরীক্ষা করতে হবে ডাক্তার বলেন । তিনি তার জন্য  নির্দিষ্ট তারিখ নেন । সাত দিন পরে পরীক্ষাটি করবেন। তিনি একটি অ্যাকাউন্ট থেকেই সবকিছু করতেন। তার স্যালারি একাউন্টও এটাই । ফ্রড কী করতে পারে শুনেছেন কিন্তু কখনো এর করুন অভিজ্ঞতা হয়নি ! প্রতীক তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে চলেছে আমার টাকা না বৃদ্ধি পেলেও এরা ফ্রড নয় । 
                 
স্কুল থেকে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে ইভিনিং ওয়াকে নিত্যদিনের মতো বেড়িয়েছে। পথে যেতে যেতে অবিনাশ বললো শোন শোন আমার অফিসের একজন সহকর্মী প্রিয়তোষ মোদক মোবাইলে একটা বিজ্ঞাপন দেখে। সেখানে বলা হয় আপনি ৫০০ টাকা আমাদের নীচে দেওয়া নম্বরে মাধ্যমে ডিপোজিট করলে এক ঘন্টার মধ্যে এ.আই তাকে দ্বিগুণ করবে। সত্যিই তাই হলো। সেই লোভে সে পঞ্চাশ হাজার টাকা একেবারে লগ্নি করলো । এক ঘণ্টা করে করে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলো, দুদিন পরে তার অ্যাকাউন্ট থেকে দশ লক্ষ টাকা ফ্রড হয়ে গেছে। তারপরে সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করা, ব্যাঙ্ক ম্যানেজারকে আবেদন পত্র দিয়ে অ্যাকাউন্টকে হোল্ড করে রাখা এবং তিনি তিন দিন ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য ব্যাঙ্ক থেকে এ.নো.সি নেওয়া, শেষে উকিলের দ্বারস্থ হতে হওয়া । এসব কথা শুনে প্রতীক বললো,' আমার পুলিশ আদালতে ভীষণ ভয় । একবার এদের পাল্লায় পড়লে আর রক্ষে নেই। এদের থেকে শতসহস্র হস্ত আমি দূরে থাকতে ভালোবাসি। ইদানিং ব্যাঙ্কে কোন কাজ নিয়ে গেলে সেদিনটি সেখানেই কেটে যায়। মেলার মতো ভীড় সেখানে প্রতিদিন। ওদের কাজের চাপ বেড়েছে। ইদানিং এস.আই.আর এর কাজে বহু কর্মী নিযুক্ত থাকায় কাজ খুব ধীর গতিতে চলছে ।' বাড়ির কাছে এসে বন্ধুদের বললো,'আগামীকাল বিকালে চোখের ডাক্তার দেখাতে যাবো হাঁটতে যাবো না।' 'ঠিক আছে' বলে সবাই চলে গেলো।

                     প্রতীক বাড়িতে ঢুকবে এমন সময় তার পাশের বাড়ির ছেলে চিত্রাঙ্কন চক্রবর্তী সামনে এসে দাঁড়ালো,পরনে  উকিলের পোশাক । প্রতীক দেখে বললো কবে ওকালতি পাশ করলি । খুব ভালো হয়েছে। তোর বাবা আর তুই দুজনেই উকিল । ভালোই হলো ।' প্রতীক মনে মনে ভাবছে 'ভগবান না
করুক তাকে যেন কখনো আইন আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়'।
            
বাড়িতে ঢুকে হাত পা ধুয়ে চা পানের পরে ডাক্তারকে দেখানো আগের প্রেসক্রিপশন ওষুধ একটি জায়গায় জড়ো করলো। মাসের শেষের দিক। অ্যাকাউন্টে দশ-বারো হাজার টাকা ছিল। সেদিন কিছু বাজার করেছিল।একবার ভাবলো দেখি কতো টাকা আছে ?' yono অ্যাপটি ওপেন করেই চক্ষু চড়কগাছ। তার অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা উধাও। তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্ট যুক্ত থাকায় সেখানে থেকেও অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার নামক ফ্রড ব্যক্তিটি এবং তার দল তার মোবাইল হ্যাক করে টাকা চুরি করে নেয়। প্রায় এক লাখের মতো টাকা চুরি হয়ে যায়।তার স্বপ্ন মুহূর্তে কাঁচের মতো চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে রঙ্গিন ভবিষ্যৎ জীবনের পথ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। শুরু হয়ে যায় তার জীবনে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার সময়। মাথাটা বনবন করে ঘুরতে থাকে। জীবনে সে এতোটা অসহায় বোধ করেনি। প্রথমে এ.টি.ম লেনদেনকে ব্যাঙ্কের টোলফ্রি নম্বরে ফোন করে বন্ধ করেন । সকাল হতেই সাইবার ক্রাইমে রিপোর্ট করেন । ব্যাংকে যোগাযোগ করেন। নতুন অ্যাকাউন্ট চালু করে, পুরনো অ্যাকাউন্টটি হোল্ড করে রাখেন। কারণ এটাতেই তার স্যালারি ক্রডিট হয়ে থাকে। কয়দিন পরে সাইবার ক্রাইমের অফিস থেকে তাকে ফোন 
করা হয় বলা হয় তার টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তবে আদালতে তাকে অভিযোগের প্রমাণ পত্রটি সহ উকিল সহ নিজেকে হাজির হতে হবে। হারানো টাকার কথা চিন্তা করে সন্ধ্যার সময় ছিন্নমূল,সর্বহারা মৃতপ্রায় মানুষের মতো পাশের বাড়ির চিত্রাঙ্কন উকিলের বাবা উকিল চিন্ময় চক্রবর্তী মহাশয়ের চেম্বারের বন্ধ দরজায় এসে টোকা দিয়ে বললো, 'কাকু আমি প্রতীক দরজাটা খোলো তোমার সঙ্গে কিছু কথা আছে।' আর অবিনাশের সেই সহকর্মীর কথাই তার মনের মধ্যে ফুটন্ত জলের মতো ওঠানামা করতে লাগলো ।


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

কবিতা (প্রথম পর্যায়)

   


অভ্যাস 
নির্মাল্য ঘোষ 

তবুও কোথাও একটা
পুরোনো ঢাকের শব্দ বাজে,
মনের ভেতর লাল-সাদা একটা সকাল
নীরবে জেগে ওঠে।
শহরের ভিড়ে,
ক্যাফের কোণে,
অথবা ব্যস্ত অফিসের ডেস্কে—
খুঁজি একটুখানি পয়লা বৈশাখ,
এক চিলতে শিউলি গন্ধ,
এক কাপ মিষ্টি চা আর নতুন শুরুর সাহস।
তারপর, সব কিছু অভ্যাস হয়ে যায়।


 

প্রহসন

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

অমিমাংসিত যত, রইল আবার তোলা
তোলার গায়ে জমবে আবারও ধুলো, 
ধুলো ধুলো সব প্রতিশ্রুতির দায়
দায়সারা হালে সংকটে চালচুলো.. 

চালচুলোহীন উলঙ্গ কিছু রব
সরব কেবল চোরা সময়ের খাতে, 
ক্ষতবিক্ষত পুরোনো বছর জানে
জানে,নতুন কিছুই নেই নতুনের হাতে.. 

হাতে নেই হাত,আত্মমগ্ন কাল
কালবেলা ঘিরে গহীন মেঘের ভার, 
ভারে ভারে বেলা ন্যুব্জ, দুচোখ ম্লান
ম্লান অভীপ্সা, স্বপ্নেরা ছারখার.. 

ছারখার এই সময়ের শিলালিপি
লিপিকর ছুঁয়ে আগামীর রূপরেখা.. 
রেখায় রেখায় দোলাচল, ঠোকাঠুকি
শেষ কী এবার? পাবে নতুনের দেখা? 


 

সূচিপত্রের সূচনা 

কেতকী বসু 

তোমার আসার দিন সংখ্যা গুনে রাখা হয়নি
ভোরের আলোর সাথে ভাব করে বলা হয়নি ভালোবাসার কথা
একটা দুটো বকুল ফুল তুলে মালা গাঁথার সময়
মনে পড়েনি তোমাকে
অযাচিত ভোরে দরজায় আবির ছড়িয়ে
বলা হয়নি ভালোবাসার কথা
এতদিন পরে
ভিজে চোখে কুয়াশা মেখে জড়িয়ে নিয়েছি যে ঠান্ডা বাতাস
সেখানে চাদরের সুখ পেতে গায়ে নিয়েছি
ওম সুখ 


ভোরের আলোর ছায়া দেখে পার করেছি অনেক আলপথ
রোদ বাড়ার সাথে সাথে খুঁজে নিয়েছি বিশ্রামের আশ্রয়
তবু মনে হয়নি শান্ত হাত, শান্ত শরীরের স্পর্শ

সাথে একটু গলা ভেজানো জলের অপকারিতা

আর কিছু পাওয়ার জন্য হতাশ হয়ে চরণ ভিক্ষা করিনি
ভেঙেছি গড়েছি আবার নিজের মত করে
চলতে শুরু করেছি।


 

গোবি সাহারা 
তন্ময় কবিরাজ

ফাটলে জমছে জল,
শোষনের ভাঁজে জোনাকি উঁকি দেয় সুখে
আরও ভাঙা হাত, নুড়ি ঘষা ক্ষত পা
প্রতিবাদে মিছিল করে ঘুনপোকা ডেকে আনে ।

বিষাক্ত সিরাপে শৈশব নিস্তেজ,
হলুদ পাতা থেকে বিদায়ী মৌমাছি 
আজ পরিযায়ী বা,ভিন্ন দেশের হাতিয়ার।

জমা জলে সংসার
নর্দমার পোকাতে বিশ্বাসী দল
আবার ভোটে সবুজ হবেই গোবি সাহারার বন।


 

বিশ্বাসে বলি তাই

অলকানন্দা দে


বৈশাখ এক তীর্থের শুভ নাম

সঞ্জীবনী সুধার মতো বেলা

মনের স্বাস্থ্য মনোরমে চলো যাই

প্রিয় মাটিতে বসেছে রবীন্দ্র মেলা।


রাজকীয় সুর বাতাস পাগল করে

অভিমানী ফুল বৈশাখে ফুটে ধন্য 

অবলম্বন তোলপাড়ে শুধু বলে

সব অনুভূতি বৈশাখটার জন‍্য!


দাবদাহের মাঝেই বিরাজ করে

শিশির-সিক্ত মনের উঠোনখানি

কবিকে বলে তোমার মতো সত‍্য

বসুন্ধরায় নেই আর কেউ জানি!


অমোচনীয় কালিতে লেখা নাম

মরমী সাধক শোনান অভয়কথা

বুকের মধ্যে ফুটে ওঠে সাত তারা

শোভা পায় চাঁদ, জ‍্যোৎস্না খরস্রোতা।


ধন্য হতে আর কি লাগে বলো!

পাতায় পাতায় সেই কথা কানাকানি

শালবন তাই গৌরবী হতে মরিয়া

সোনাঝুরি বন শোনায় নিজ কাহিনি।


নিরবধি এত আবেগের স্রোতধারা

আর কারো তরে বয় না তো কলরবে

রবীন্দ্রনাথ! কি যেন জপের নাম 

জপে যেতে হয় সম্ভব অসম্ভবে।


 

বৃত্ত
প্রতিভা পাল 

তারপর হঠাৎ একদিন 
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ায় সময়। 
পিছনে পড়ে থাকে জীবনের বিস্তৃতি, 
মুহূর্তগড়া পান্ডুলিপি আর যাপনের ইতিবৃত্ত। 
শূন্যর উত্তরণে বদলে যায় দৃশ্য সহসা,
যেন দৃষ্টির পরিধি দিগন্ত পর্যন্ত শুধু।

মাটিতে পা রেখে যেসব ইচ্ছেগুলো
আকাশ ছুঁতে চেয়েছিল,
পাতাঝরা হাওয়ায় হাওয়ায় 
নিদারুণ দুঃখ এঁকে নিঃস্ব তারা।

মানুষ হারিয়ে গেলে স্তব্ধ হয় জীবনের যাবতীয়।
জল জমা পলির মতো 
সাময়িক অবাধ্য হয় যাপন। 
নদী তবু চলমান আবহমান।
ঋতুর উপসংহারে যেমন নতুনের আবাহন।
বৃত্তের শুরু অথবা শেষ নেই যেমন....


 

অকথিত 

শ্রীতমা ত্রিপাঠি 


আমি তোমার ছায়া আঁকতে গিয়ে
আশ্রয় নিই তুলির প্রতিটি টানে
রঙ ফুরিয়ে এলে দেখি আঙুলে লেগে থাকে অন্ধকার

আলো মেশাই, তবু তুমি সম্পূর্ণ হও না ক্যানভাসে
যেন ইচ্ছে করেই অর্ধেক লুকিয়ে রাখো নিজেকে

ছায়ার ভাঁজে ভাঁজে জমে ওঠে অকথিত উচ্চারণ
আমি শুধু রেখা টানি, তুমি হয়ে ওঠো নিঃশব্দ আশ্রয়

শেষে বুঝি,
তোমার ছায়া আঁকা মানে শুধু তোমাকেই নয়
আঁকতে হবে নিজের নিঃসঙ্গতাকেই...


 

নব সূর্যোদয় 

   রীনা মজুমদার 


প্রকৃতির ললাটে প্রভাতী রাঙা রশ্মি 
সবুজ আঁচলে শোভিত রডোডেনড্রন গুচ্ছ 
ঘাসে জ্বলে বিন্দু বিন্দু রত্ন জ্যোতি 
হাতে বকুলের কনকন, মাথায় রৌপ্যশৃঙ্গ
    আহা! মুগ্ধ বিস্ময়
পুরাতন ছেড়ে হয় নবাগত কিশলয় 
উৎস হতে নদী হাঁটে মাটির বুক চিরে
নিবিড় সৌন্দর্যে গড়া পৃথিবীর নীড়ে 

এ পৃথিবী আমার তোমার সবার স্বপ্ন। 
অজ্ঞ, ভেদাভেদ, মনুষ্যত্বহীন মূল্যায়নে  
করতে পারিনি বর্ণের সাথে বর্ণপরিচয়, 
মানবের বিবেকহীন দম্ভ ও আস্ফালনে
স্বাধীনতা ধংসের ঘন্টাধ্বনি, অশনিসংকেত
নেই সুস্থ প্রাণের স্পন্দন, অশান্ত পৃথিবী 

  কবে হবে নব সূর্যোদয়?
দীপ্ত তেজের দাবানলে পুড়ে যাবে 
  ঘন অন্ধকারের প্রহর 
আশার আলোয় জেগে উঠবে বয়স আঠারো 

   কাঁদে অন্তরের প্রেমময় আহ্বান..
      নব বর্ষে নব সূর্যোদয়ের।


 

সভ্যতার মূল্যবোধ

প্রাণেশ পাল 


চৈত্র শেষের তৃষ্ণার্ত দুপুর 
অভুক্ত শিশুর ম্লান হাসিমুখ
অনন্ত পিপাসা মিটে যায়....

বিষন্ন চৈত্রের শুষ্ক ভালবাসা
রমণে উন্মুখ কৃষক গৃহবধূ
কালবোশেখীর চিরন্তন অপেক্ষা....

বসন্তের রঙিন বাতাস,পর্ণমোচীর পত্রমোচন 
ঝরে পড়ে স্মৃতিদের জীবাশ্ম 
বারুদের বিষাক্ত নিঃশ্বাস, মুছে যায়
পৃথিবীর অনন্ত শব্দের আয়ুরেখা....

চৈত্র শেষের উড়ন্ত দহন 
নক্ষত্রশোকে অবিরাম উল্কাপাত 
ঢেকে যায় শত সহস্র শিশু প্রাণ 
বাতাসে বিদ্যালয় পোড়া গন্ধ 
আমাদের চেতনা, বিবেক, মনুষ্যত্ব 
মধ্য প্রাচ্যের ট্রপোস্ফিয়ার ভারী হয়ে আসছে....

বর্ষশেষের বিদগ্ধ যন্ত্রণা, পৌঁছে যাই 
বৈশাখী দিনের নতুন ভোরে
অপেক্ষা,সভ্যতার মূল্যবোধের সুচেতনা
আসুক শান্তির নতুন সকাল, নতুন পৃথিবী !


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

অণু গল্প 




কোকোনদ
মধুমিতা দে রায় 

আজ নির্মলা মেয়ের সাথে তাঁর নতুন বাড়িতে এল। তাঁর নিজের বাড়ি। মেয়ে আত্মজার দৌলতে অবশেষে নিজের একটা ঘর পেলো জীবনের এই গোধূলি বেলায়। এই আনন্দ সে রাখবে কোথায় বুঝে পায় না। একটা ঘরের জন্য একসময় কম আকুল তো হয়নি সে। ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরে সেই কবে তাঁর পুরুলিয়ার ঘর ছেড়েছিল, সেও নিজের একটা ঘর বাঁধবার আশায়। তখন কি ভেবেছিল সেই ভালোবাসার মানুষটিই শুধুমাত্র কিছু অর্থের লোভে তাঁকে এই পাঁকে ঠেলে দেবে .....কেনো যে মানুষ চিনতে ভুল করেছিল, আজও আত্মদগ্ধ হয় সে। বিগত পঁচিশ বছরের দমবন্ধ করা প্রতিটা রাত আর হতাশায় ভরা প্রতিটা  দিন তাঁর কেটেছে লখনৌ-এর এই পতিতাপল্লীতে। গুমোট দরজার অন্দরে একটু ঠান্ডা বাতাস বয়ে আসতো আত্মজার 'মা' ডাকে। চারদেওয়ালের জমাট অন্ধকারে আশার আলোর রেখা উদ্ভাসিত হতো যখন দুদিকে বিনুনি দুলিয়ে আত্মজা স্কুল থেকে ফিরে এসে সারাদিনের গল্প শোনাতো। সেই ভালোবাসার মানুষটি জানেনি সে স্ত্রীর সাথে সন্তানকেও বিক্রি করেছিল। এই পতিতাপল্লীতে আসবার দিন কয়েক পরেই নির্মলা বুঝতে পেরেছিল সে সন্তানসম্ভবা। সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে গিয়েও নির্মলা তাঁর আত্মজাকে রক্ষা করেছে। আত্মজা ছোটবেলা থেকেই খুব সংবেদনশীল। মাকে কোনোদিন এমন কোনো প্রশ্ন করেনি যাতে মা কষ্ট পায়। মায়ের একটা নিজের বাড়ির ইচ্ছে, সেই ইচ্ছেকেই নিজের লক্ষ্য তৈরী করে এগিয়ে গেছে আত্মজা। এখন সে একজন রেভেনিউ অফিসার। চাকরি পেয়ে প্রথমেই লোন নিয়ে বাড়ি তৈরী করেছে আত্মজা, তাঁর নতুন বাড়ির আজ গৃহপ্রবেশ, বাড়ির নাম 'নির্মলা ভবন'।


 

ডায়েরীর পুরাতন পাতা থেকে সামান্য মোকাবিলা
সোমনাথ মুখার্জী 


আজ আবার নিজস্ব গল্প বলার লোভ হয়েছে। যে ছাদে ঘুড়ি ওড়াই তোমার আঁচল ভেবে সেই সেই ছাদ কেড়ে নিয়েছে কেউ। নাম বলতে অপারগ আমি। ওর‌ও আমার প্রতি ঝক্কাস্ টান আছে,মাইরি। আমার বাড়ীর পাশে নদী নেই। স্নান করে পবিত্রতম হব। দুটো ভালবাসা দুরকম যেন হয়। ভাবি। একটায় থেকে যাক বাণী। অন্যটায় থেকে যাক্ মর্মবাণী।


 

গোপন কথা

মনোরঞ্জন ঘোষাল


সন্ধ্যার পর পুবের বাগানে যাওয়া বারণ। সেদিন রাতে শুনি জটলার শব্দ। টর্চটা নিয়ে যেতেই দেখি কিচ্ছু নেই। নিভিয়ে দিতেই সবাই হাজির। কানে এলো তাদের জটলার কারণ।

ওদের গোসা হয়েছে, আগেই তো পুড়িয়ে, গোরে দিয়ে দেহটা বাতিল করেছে, এবার যা-ও এক-দু’জনের নাম কাগজে লেখা ছিল তাও বাদ দিচ্ছে! ভারী অন্যায়। 

শুনলাম ওরা বড় আন্দোলনে নামবে। 


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

বেড়ানো  


বসন্ত দুপুরে বড়দীঘি টি এসেস্টে

জয়িতা সরকার




সবুজ গালিচা, পাখিদের কলতান, বৃষ্টিভেজা সকাল কিংবা বসন্তের বিকেলে একটু উষ্ণতার চুমুক, এমন অনুভূতির স্পর্শগুলোই রোজনামচায় ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে তরাই - ডুয়ার্সের কোন চা বাগানের পুরাতনী গন্ধে। চা বাগিচা ঘিরে পর্যটন নর্থ বেঙ্গল ট্যুরিজমে নতুন সংযোজন, যা টি- ট্যুরিজম হিসেবে ইতিমধ্যেই খানিকটা পরিচিতি পেয়েছে ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের কাছে। চা বাগানের মাঝে বিরাট বাংলো, যার প্রতিটি কোণে আজও ঔপনিবেশিকতার ছোঁয়া। ব্রিটিশ শাসনে দার্জিলিং থেকে ডুয়ার্সের বিস্তর জমিতে তৈরি হওয়া বাগানগুলি চা-শিল্পের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে সেই উনিশ শতক থেকে। বর্তমানে নতুন রূপে,ভিন্ন আঙ্গিকে পর্যটন মানচিত্রে নিজেকে বেশ আকর্ষণীয় করে তুলেছে ব্রিটিশদের তৈরি চা বাগান আর পুরাতন আভিজাত্যে মোড়া বাংলোগুলি।


সাজসজ্জার প্রতিটি কোণে ঔপনিবেশিকতার পাশাপাশি দেশীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন চোখে পড়বে, এমনই একটি বাংলোর উদ্দেশ্যে আমাদের ঝটিকা সফর। গরুমারার জঙ্গলের ফাগুন হাওয়া গায়ে মাখিয়ে বেশ বেলার দিকে পৌঁছলাম বড়দীঘি চা বাগানের টি বাংলোতে। চা বাগানের মাঝবরাবর মাটির রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা পথ যেতেই সাদা বাংলোটি প্রাচীণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। ১৮৯১ সালে তৈরি হওয়া বড়দীঘি এসেস্ট এবং পরবর্তীতে তৈরি টি-বাংলো বর্তমানে টি-ট্যুরিজমের অন্যতম। প্রবেশপথের দু'পাশে গাছের সারি, আর বাহারি বোগেনভিলিয়ারা আপনাকে সযত্নে আপন করে নেবে। বসন্তবেলায় পুরো বাংলো জুড়ে ফুলেদের আনাগোনা। মরসুমি ফুল - পাতাবাহার - বড় গাছেদের সহাবস্থানে বাংলোর সৌন্দর্যে অনুঘটকের কাজ করেছে তা বলাই বাহুল্য। বাংলো জুড়ে অ্যান্টিকের সম্ভার, গাড়ি থেকে টেলিফোন, ক্যামেরা থেকে শো-পিজ, সবকিছুতেই যেন একটা আভিজাত্যের ছোঁয়া। দ্বিতল বাংলোর ওপরের অংশে রয়েছে রাত্রিবাসের সুবিধে। নির্জনতা ঘিরে থাকা এই চা- বাংলো অবশ্যই একরাতের সেরা ঠিকানা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলোতে প্রবেশ করতেই নীচতলায় থাকা বিরাট বারান্দা মন কাড়বে সহজেই, প্রতিটি কোণার সাজসজ্জায় যে আলাদা করে নজরদারি আছে তা সুস্পষ্ট। আধুনিকতার মিশেল রয়েছে তা বোঝা যায় সুইমিংপুলের দিকে তাকালেই। আমরা খানিকটা সময় সেখানে কাটিয়ে ফিরে এলাম বারান্দায়, আড্ডা গল্পে জমজমাট দুপুর। দায়িত্বে থাকা কর্মীরা আগেই খাবারের অর্ডার নিয়ে গিয়েছিল, লাঞ্চ এলো বেশ অনেকটা সময় পর। নিজেদের পছন্দ মত খাবার খেয়ে আমরা আবার আড্ডা জমালাম সামনের ফুলঘেরা বাগানে। বিকেল হতেই বাড়ি ফেরার তাড়া, বড়দীঘি টি-বাংলোর পেছনে সবুজ চা গালিচায় পড়ন্ত বিকেলের সূর্য, পাখিদের ঘরে ফেরার গান, আমরা বাংলোকে পেছনে ফেলে গেটের দিকে এগোতেই পথ আটকালো ময়ূর, রাস্তা পারাপার করছে সে, আবার খানিকটা এগিয়ে আসতেই আরও একটি, এভাবে পনের মিনিটে সাতখানা ময়ূর দর্শন। চা বাগানের মাটির রাস্তা ছেড়ে আমরা পাকা রাস্তায় উঠলাম।


বড়দীঘি টি- বাংলোকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া টি-ট্যুরিজমের তালিকায় রয়েছে টি-ফ্যাক্টরি পরিদর্শন থেকে নদীর ধারে সান্ধ্য ভ্রমণ। গরুমারা চাপরামারি সাফারি থেকে বার্ড ওয়াচিং, সবটা মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের পরিচিত পাহাড় নদী ভ্রমণের মাঝে নতুনের ছোঁয়া এই টি- ট্যুরিজম। চা বাগানের নৈঃশব্দের মাঝে নিজেকে হারিয়ে ফেলা কিংবা খুঁজে পাওয়ার ঠিকানা এমন সব সবুজেরা ছড়িয়ে আছে তরাই থেকে ডুয়ার্সের আনাচে-কানাচে। নিরালা- নিস্তব্ধতা প্রিয় মানুষেরা অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারেন দু-একদিন,মালবাজার কিংবা জলপাইগুড়ি থেকে অনায়াসেই পৌঁছে যাওয়া যায় বড়দীঘি টি- বাংলোতে। রাত্রি যাপন করতে না চাইলে আমাদের মত একটা দুপুর কাটিয়ে গরুমারায় বিকেলের সাফারি শেষে ফিরে যেতে পারেন সহজেই। জঙ্গল আর সবুজঘেরা চা বাগানের মাঝে একটা দুপুর কিংবা সারাদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়ার সেরা ঠিকানা হতে পারে বড়দীঘির টি-বাংলো।




 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

কবিতা (দ্বিতীয় পর্যায়)


হাওয়া চলাচল 

বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী 


সময়ের সারণী বেয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ে যায় ;
আর ঘন্টা ধ্বনি ক্রমাগত বাজে ঘড়ির পেন্ডুলামে।
ঘর থেকে ঘরে এঘর - ওঘর করি , দরজায় কড়া নাড়ি
বেসিনে হাত- মুখ ধুয়ে মুছে ফেলি ঝোলানো গামছায় 
তারপর নিয়ে বসি টেলিফোন ডিরেক্টরি , এর পাতায় খুঁজি 
কাকে যেন ফোন করে জানাব হর্ষ- বিষাদ - শুভেচ্ছা।
আরও কাজ আছে, তুলসী তলায় প্রণাম , ছাড়া চটিতে পা গলাই
স্নান সেরে যে উদিত সূর্যকে নমষ্কার করি, দিন শেষে আবার 
কেন পুরোনো যা ছুঁড়ে ফেলে দেব আবর্জনার স্তূপে ;
কেন নতুন নতুন করে বাঁচার অভ্যাস বদলাব বল ।


 

বাতাসের শরীর

শিশির আজম



১|
কোথায় ডানাবিহীন শক্ত সেতুগুলি? মেয়েটি বাতাসে
ঝুলিয়ে দেয় তার চুল, আর অতিথি চাঁদের দিকে
উড়তে শুরু করে।


২|
বাতাসের শরীর তাদের। তারা রাস্তায়,
আমাদেরই মতো, অধঃপতনের ব্রহ্মজাগতিক চিৎকার...


৩|
বিশ্বাস-অবিশ্বাস-ইতিহাসবিবর্ণতা -- কী এসে যায়?
বস্তুর প্রকৃতি
বাতাসের প্রকৃতি।


৪|
এই বাতাসের ডানায় জড়িয়ে রয়েছে
নেপালের জঙ্গলের কোলাহল।


৫|
সুন্দরবনের আয়তন নেহাত কম না। আমরা দেখি
রয়েল বেঙ্গল টাইগার
অন্যান্য প্রাণিদের ভিতর কিছুটা আলাদা।
মনে রাখতে হবে
মানবজাতি ভেসে রয়েছে বাতাসের ভিতর।


৬|
এতকাল তিনি নিজেকে নিয়ে ছিলেন, দ্বীপপুঞ্জের ম্যনগ্রোভ মৃত্তিকায়,
নিজের ভিতরে ছিলেন।
পাতায় পাতায় বাতাস কত কি লিখে দিয়ে গেছে!


৭|
বাতাসের সুতোয় জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ উপকূলের অসম্পূর্ণ ক্রিয়াপদগুলি।
তোমার দরকার শাই শাই বুনো রাজহাঁসের নিষ্পলক কম্পাস
আর দরকার কুয়াশা।


৮|
আমাকে বলা হয়েছে ভেতরে থাকো, জানালা না খুলে।
কেউ কি জানে, দূরের বাতাস, কত দূরের এ-বাতাস
কী চোখে দেখবে আমাদের? কুকুর ডাকছে
মাটির নিচ থেকে, ডেকে চলেছে,
আর রাষ্ট্রপতির টেবিলের পুষ্পস্তবক হোলি খেলছে বাগানে
আপন রক্তের সঙ্গে।


৯|
শীতের পা, বাতাস, কীর্তিনাশা -- সবুজ বাতাসে মলিন যত মুখ।
জোসনায় মলিন সেইসব মুখে নারকেলনাড়ু, হিজলের নরম ঢেউ --
স্মৃতি আর বিশ্বস্ততায় দেখা দেয় উষ্ণতা।


১০|
মহাশূন্যের ভিতর এই পৃথিবী তোমার এক শ্বাসের মতো।
এক ফুট উঁচু ঘাসের বাতাস
প্রতিধ্বনি করে আমার নতুন শৈশবের;
শালিখের ঠোঁটে ঐতিহ্যবাহী শস্যসমাজ উন্মুখ,
উদ্বেগ ও প্রত্যাশায়, কুয়াশার সূর্য।


১১|
ভুলে যাও

ওপরের দাঁত
তোমার নিচের দাঁতকে কীভাবে চেপে ধরেছিল
টের পাওনি

সবুজ শীতের বাতাস
ঘুমিয়ে পড়বে
তোমার সাদা খাতায়


১২|
কোথাও গুম হয়ে ছিল
এখন বাতাস বয়ে চলেছে সন্ধ্যার কানায় কানায়
শেখ মুজিবকে মেরে ফেলা হয়েছে
মেরে ফেরা হোক তাকে শত বার হাজার বার কোটি কোটি বার


১৩|
স্বচ্ছলতার কথা বলে ওরা তোমাকে ফেলে দিয়েছে পাঁচিলের এপাশে
ওরা কেড়ে নিয়েছে তোমার শৈশব
ওরা তোমার ভালবাসাকে কলুষিত করেছে
তাহলে এই রাস্তা বুঝি কোথাও যাবে না
ভাগ্যিস আমাদেরও রয়েছে এক চাঁদ
আর বাতাসের কানে কানে ফিসফিসানি


১৪|
ধবধবে চাঁদের নিচে এই কোমল রাস্তায়
বায়ু আর আমি


১৫|
মহান দেবদূতেরা, প্রিয় পুতুলেরা, শোন,
আমি এক টুকরো শ্বাস, দক্ষিণ বায়ুপর্বতের।


১৬|
বড় হয়ে আমি শহরে এলাম
আমার সঙ্গে গ্রাম
গ্রামের সঙ্গে বাতাস
যা শহরটাকে গ্রামের মতো সহজ করে তোলে


১৭|
তাদের অসুখ আছে। স্মৃতি আর মৃত পাথরগুলোর সঙ্গে মিশে
এমন কি ঘুমের ভিতর
তারা আঁচড়ায় ম্লান গ্রহটিকে।


১৮|
ঘরে চলো।
বুনো হাওয়া
মুকুল।


১৯|
প্রকৃতির নিজস্ব যে প্রকৃতি, অন্বেষার স্ফূর্তি,
আমরা বিপ্লব বলি তাকে।
কবুতর আর ঘাস আর স্মৃতির আকাশ
সবার একই ভাষা।


 

শেষের মাঝে শুরু

 মহঃ সা নো য়া র 


বর্ষশেষের সন্ধ্যা নেমে আসে নীরবতার গান,
পুরোনো দিনের স্মৃতি ভাসে মনের অজানায়।
হাসি-কান্নার কত গল্প জমে থাকে মনে,
সময়ের স্রোতে সবই ধরা পড়ে জীবনের ক্ষণে।

ক্যালেন্ডারের পাতা শুধু বদলে যায় চুপে,
তবু জীবনের গল্প থামে না কোনো রূপে।
শেষের মাঝেই লুকিয়ে থাকে শুরুর আলো,
অন্ধকার পেরিয়ে আসে নতুন ভোরের ভালো।

তাই বর্ষশেষ মানে নয় থেমে যাওয়া পথ,
এটাই নতুন দিনের স্বপ্ন দেখার রথ।
হৃদয়ে আশা রেখে এগিয়ে চলি আমরা—
শেষের মাঝেই শুরু, জীবন সেই ধারা। 


 

আবদার 
পলাশ পাল 


কঠিন পথ আর অচেনা 
পথের সাথে 
হাসতে হাসতে পৌঁছে গেছি
মায়ার কাছে 
ছোট্ট ছোট্ট আবদার 
পথভোলা জোনাকির মতো 
এগিয়ে আসে
বুকের পাথর ভেঙে যেতেই দেখি
আলোময় ছেঁড়া ফাটা 
উপলব্ধিকথা... 


 

বর্ষশেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?
চিরঞ্জিত মন্ডল


শেষ বিকেলের আলোটা আজ
কেমন যেন অন্যরকম লাগে—
পুরোনো দিনের ক্লান্তি মেখে
নরম হাওয়ায় ভেসে আসে স্মৃতির ফাঁকে।

ক্যালেন্ডারের পাতাটা শুধু উল্টে যায়,
তবু মনে হয় কত কিছু বদলে গেল—
হাসি, কান্না, হারানো স্বপ্ন,
সবই যেন এই বছরে মিশে রইল।

বর্ষশেষ কি সত্যিই শেষ?
নাকি নতুন দিনের প্রথম দরজা?
পুরোনো ব্যথা গুছিয়ে রেখে
মনের কোণে জ্বলে ওঠে আশার প্রদীপটা।

যা ছিল না বলা,
যা ছিল না পাওয়া,
সব কিছুর মাঝেও
একটা নীরব প্রতিজ্ঞা রয়ে যায়।

শেষ রাতের আকাশে চাঁদ উঠে বলে—
“শেষ মানেই শেষ নয়,
প্রতিটি বিদায়ের ভেতরেই
লুকিয়ে থাকে নতুন দিনের সূচনা।”

তাই আজ বর্ষশেষ নয় শুধু,
এ এক নতুন পথের আহ্বান—
গতকালের চোখের জল মুছে
আগামীকালের দিকে বাড়িয়ে দিই প্রাণ।



 শেষের শুরু

অবুঝ বালক


চৈত্রের শেষে ঝরা পাতার বিষণ্নতা,

ধুলোমাখা পথে নামে বিদায়ের নীরবতা।

রোদে পোড়া বিকেলে ক্লান্ত দিনের শেষ,

অস্তরাগে নিভে আসে স্মৃতির আবেশ।

নীরব হাওয়ায় ভাসে অতীতের মৃদু গান,

দূরের মেঘে জাগে ওঠে আগামীর আহ্বান।

হঠাৎ ঝড়ে কেঁপে ওঠে স্তব্ধ সময়ের গতি,

বৈশাখ আসে—নতুন প্রাণ, নতুন পথের জ্যোতি।

কৃষ্ণচূড়ার অগ্নিরঙে জ্বলে ওঠে প্রাণ,

পলাশ ডাকে—“ভেঙে দাও সব, শুরু হোক নতুন গান!”

শেষ আর শুরুর মাঝে সময় দাঁড়ায় নীরব সেতু,

প্রতি বৈশাখে জীবন জাগে—নতুন স্বপ্নের রূপে রূপান্তরিত।

                       


 

বর্ষবদল স্রোতে 
জীবন সরখেল

বাতাসের কানে আকাশ মাটির গানে
আরও দৃঢ় হয় পৌনঃপুনিকতার ঢেউ..
সরীসৃপেরাও স্বপ্নের বুকে তা দিতে জানে!
তপ্ত পৃথিবীও বর্ষার চিঠিতেই বাঁধে প্রাণ 
সৃষ্টি সুখের সৃজন উল্লাসে পূর্ণতা পায় 
বৈচিত্র্যের মাঝে ক্রম উত্তরণের ঢেউ...
শরৎ হেমন্তও নিঃশব্দে শিশিরের মতোই 
ঝরাপাতার বিষন্নতা এড়িয়ে দানা বাঁধে তাই
বাঁধভাঙা রঙের পুনর্মিলন উৎসার... 
শেষের পরিণত বীজে নতুনের সম্ভাবনায়
ভরা নির্মেদ চিরসত্যের মতোই পবিত্র 
এই সংজ্ঞাতীত অনিবার্য প্রবহমানতা...


 

কালবৈশাখী 

মিত্রা রায় চৌধুরী


 চৈত্রের শেষে দিক চক্রবালে আচম্বীতে 

 তোমার আগমন ধ্বনি ঘোষিত হয় 
 আকাশের বুকে কালো যবনিকা 
 ধরণীকে পাণ্ডুর  করে তোলে।


 মেঘের বজ্রনিনাদে শঙ্কিত 
 বনস্পতি মনুষ্যকূল, পক্ষী কুল 
 রুদ্ধ নিশ্বাসে তোমার তান্ডব নীলা প্রত্যক্ষ করে 
 আলো ঝলমলে প্রকৃতিকে দুচোখ ভরে 
 দেখবে বলে প্রহর গোনে।

 পৃথিবীর বুকে মধু ভরে, রস সঞ্চার করে 
 নববর্ষ কে আমন্ত্রণ জানিয়ে 
পুরাতন জঞ্জালসমুহ সরিয়ে 
 সদর্পে  বিদায় নাও তুমি।
                                        


 

দৃষ্টিপাত  
আশীষ  কুমার  বিশ্বাস

মরছে মানুষ , মারছে  মানুষ
উড়ছে ফানুস  আকাশ পথে
দুর্নীতি  আর   হিংস্রোক্ষয়ি
চলছে মনের সাথে সাথে ।

পোশাক  আশাক  ধুপধুরস্ত
মুখের ও মুখোস আছে
সমাজসেবি মুখোস সমাজ
ঘুরছে  তোমার পাশে পাশে ।

পিছন ফিরে দেখছি যখন
যুদ্ধ  যুদ্ধ  নতুন  খেলা
শিশু  মৃত্যু  যুদ্ধবাজদের
মানবতাও   অবহেলা !

ঘটনা  আর দুর্ঘটনায়
সন্ত্রাসবাদ  বিশ্বজুড়ে
হাজার শিশুর জন্ম এখনো
ফুটপাতের   আস্তাকুঁড়ে !

ইতিহাস  গড়ছে  যারা
অক্লান্ত  তার  পরিশ্রম
আমরা একটু চেষ্টা করি
স্বার্থপরতা  অতিক্রম ।

কৃত্রিম  বুদ্ধিমত্তার  ও
অভাবনীয়  বুদ্ধিজয়
সে-ই  লিখবে নতুন ইতিহাস
কার  জয় , কার পরাজয় ?

উগ্রধর্ম,  মৌলবাদ 
মানব ধর্মে জীবন পাত
মুক্ত চিন্তার আশা নিয়ে
ভুলে যাবো জাত পাত ।

    


 

কালবোশেখি 
মজনু মিয়া 

ঈশান কোণে কালো মেঘ
করছে ভীষণ সাজ, 
গুড়ুম গুড়ুম দেয়া ডাকে 
ফেলছে বিজলি বাজ। 

শুরু হলো দমকা হাওয়া 
ভাঙছে বাড়ি ঘর, 
গাছপালা সব দুমড়ে মুচড়ে 
ফেলছে প্রবল ঝড়।

এমন দৃশ্য দেখছি যখন 
'কালবোশেখি ' নামে,
খোকা-খুকুর আনন্দ খুব 
কুড়িয়ে পাওয়া আমে।


 

নববর্ষের আনন্দ 

প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী 


 শান্ত সমাহিত বাতাবরণে, 
         সকলি কলুষ পরিমার্জনে; 
 নব নব চিন্তা নিয়ে- 
        আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে, 
  সুস্থিত সুন্দর রূপচরিত মহিমা,
       নবারুণের আলোর আভাসে;
  মনের দ্বিধাহীন অভিলাষে, 
            এসো হে নববর্ষ, এসো হে ।। 


 

বর্ষ শেষ? নাকি শুরু নতুন দিন?

ছবি   



শিল্পী- হৃদান সরকার