স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়!
অনিতা নাগ
সে'সব যখন বোঝার বয়স হয় নি, তখন থেকেই এই দিনটা বড় গর্বের, বড় আনন্দের, আর মাথা উঁচু করে বাঁচার ছাড়পত্র। সে আমার দেশের স্বাধীন হবার দিন। ১৫ ই অগাস্ট।
স্কুলে জুলাই মাস থেকেই পিটি স্যার আর দিদি খুব সিরিয়াসলি ক্লাস করাতেন। শেষের দিকে অনেক একস্ট্রা ক্লাস হতো। কতো রকমের ড্রিল। মার্চ ফার্ষ্ট। লেফ্ট, রাইট, লেফ্ট। তালে তালে পা মিলিয়ে চলা। সামনে পতাকা হাতে বড় দিদিরা। সে’ এক অন্য আনন্দ।, এক আলাদা অনুভব। একস্ট্রা ক্লাস মানেই ক্লাসের পড়া থেকে মুক্তি আর সব ক্লাসের মেয়েদের সাথে, বড় দিদিদের সাথে একসাথে প্র্যাকটিস করা, হৈহৈ করা। সে' বড় আনন্দের দিন ছিলো। বাড়ীতে রঙীন কাগজ কেটে তিরঙ্গা বানানো, কাগজের শিকলি বানানো। মা আটা দিয়ে আঠা বানিয়ে দিতেন। সেই শিকলি আর পতাকা দিয়ে পাড়ায়, স্কুলে সাজানো হতো। পাড়াতে ইঁট দিয়ে পতাকা উত্তোলনের বেদী তৈরী হতো। জিলিপি, লজেন্স, বিস্কুট। রেডিওতে দিল্লীতে পতাকা উত্তোলনের ধারাভাষ্য। সারাদিন এক উৎসবের আমেজ। হই হই, আনন্দ, খাওয়া-দাওয়া, চারদিকে মাইকে দেশাত্মবোধক গানের সুর। পড়ার ছুটি। খুব আনন্দে কাটতো ছোটবেলায় এই দিনটা।
একটু বড় হয়ে অন্যরকম স্বাধীনতা। এই দিনটি উদযাপনের সাথে লুকিয়ে প্রেমিকের সাথে দেখা করা! সেই দিন ঘরে ফিরতে একটু দেরী হলেও ম্যানেজ করা যেতো অনায়াসে। স্বাধীনতা দিবসের এই উদযাপনের দিনেও মা একই নিয়মে উনুনের সামনে বসে রান্না করতেন। ছুটির দিন মানেই নিয়মের বাইরে আবদারের রান্না। মা'র সে'দিন স্নান খাওয়া সারতে অনেকটা দেরী হতো। সবাই যখন স্বাধীণতা দিবসের আনন্দ উদযাপনে মশগুল, তখন এক গৃহবধূ নীরবে তার কাজ করে যেতেন। শুধু তো আমার মা নয়। ভারতবর্ষের আগুন্তি গৃহবধূর একই গল্প। তাদের স্বাধীনতার কথা তো আমরা কখনো ভাবি নি। আজও কি ভাবি! আমাদের পরিবারে আমার মা সম্মানীয় ছিলেন। কিন্তু সংসারের স্বার্থেই বোধহয় তাদের একদিন ছুটি দেওয়ার কথা, তাদের মতো করে আনন্দ করতে দেওয়ার কথা কখনো কারুর মনে হয়নি। আমি তার নিজের মেয়ে, আমারও কখনো মনে হয়নি। মনে হয়েছে এটাই আমাদের প্রাপ্য, মা এভাবেই করবেন।
আজ সমাজের ছবি গেছে বদলে। জীবনের সুযোগ-সুবিধাও গেছে অনেক বেড়ে। এখন সোশ্যাল মিডিয়া, মুঠোফোন,আমাদের জীবনকে অন্য এক সুরে বেধেছে। আজ ব্যক্তি- স্বাধীনতা যত বেড়েছে মানুষে মানুষে দূরত্ব ততটাই বেড়েছে। আজ স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অনেকটাই যেনো দেখনদারি। কে কাকে কতটা বেশি পাল্লা দিতে পারলো সেই দৌড়। সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাচ এর ভিডিও আর রিলস বানিয়ে নিজেকে অনেক বেশি দেশপ্রেমিক প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা চলে। থিমের যুগ। তিরঙ্গা থিমে সেজে উঠে সবকিছু।
কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম আলিপুর জেল মিউজিয়ামে। যে গল্প, যে কাহিনী ইতিহাসে পড়েছি, তার সামনে দাঁড়িয়ে দু’চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। মনে হয়েছিল এই পুণ্যভূমিতে না এলে বীর শহীদদের বলিদান ইতিহাসের পাতাতেই থেকে যেতো। এমন করে দেশের জন্য তাঁদের আত্মত্যাগের যন্ত্রণা, তাদের কষ্ট, অনুভব করতে পারতাম না। আঠারো বছরের ক্ষুদিরাম যখন হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেছেন, চারপাশের কারাগার থেকে তখন বন্দে মাতরম, জয়হিন্দ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিলো আকাশ বাতাস। আলিপুর জেলের ইঁট পাথরের কোনে কোনে আজও সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়।
আমাদের স্বাধীনতা বড্ড ভালোবাসার, বড্ড দামি। আর ক’দিন পরেই আমাদের আশিতম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবো। কতো আনন্দ, কতো অঙ্গীকার, কতো প্রতিশ্রুতি। একটা নির্ভেজাল ছুটির দিন দেশপ্রেমের সুরে গাঁথা। এত আনন্দের মাঝেও ভুলতে পারবো আশি তম স্বাধীনতা অভয়াকে বিচার দিতে পারেনা, বিচার পায় না আরো অনেকে! বিচারের বাণী আজও নিভৃতে কেঁদে মরে। সরকার বদলায়। গল্পের কাঠামো বদলায়। সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখে। অপেক্ষায় থাকে কবে সত্যি হবে ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম। মাইকে গান ভেসে আসে পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান। সুরে ছন্দে তালে প্রভাত ফেরি এগিয়ে চলে,
চল্ চল্ চল্,
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল রে, চল রে চল’ লেফ্ট রাইট, লেফ্ট….
ক্রমশ পদধ্বনি মিলিয়ে যায়, সুরের রেশ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। বুড়ো চোখ ঝাপসা হয়ে উঠে। প্রণতি রাখি আমার দেশমাতৃকার চরণে ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’।।

No comments:
Post a Comment