Friday, October 9, 2026


 

শরৎশশীরা
মৌসুমী চৌধুরী 

            তারপর... জন্মের সার্ধশতবর্ষ পরে একদিন খানিকটা কৌতুহল বশেই তিনি এসে দাঁড়ালেন রূপনারায়ণের তীরে। শরতের গলা সোনা রোদ্দুর তখন নদীর ওপর চকচক করছে। মাথার ওপর যেন কেচে ধুয়ে নীল দিয়ে মেলে দেওয়া আকাশটার উদাত্ত বিস্তার। তাতে গা ছেড়ে দিয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে পেঁজাতুলোর মতো অলস মেঘেরা। নদীর দু'ধারে মাথা নেড়ে শরৎ বন্দনা গাইছে সাদা কাশফুলের ঝাড়। বহুদিন পর দেউলটি গ্রামে তাঁর প্রিয় নদীটির পাড়ে এসে দাঁড়িয়ে লেখক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনুভব করলেন মা আসছেন। আকাশে বাতাসে তাঁরই পদধ্বনি। 
      আমাাদের প্রিয় সেই লেখক আজ বৃদ্ধ থেকে বৃদ্ধতর হয়েছেন বটে তবে একেবারে নুয়ে পড়েননি। পরনে থান ধুতি, চোখে মোটা কাঁচের চশমা। হাতে বাঁশের একটি লাঠিতে ভর দিয়ে ঠুক ঠুক করে তিনি এসে বসলেন তাঁর গাঁয়ের সেই অশ্বত্থ গাছটির তলায়, যা এক সময় ছিল তাঁর বহু সুখ-দুঃখের সঙ্গী। সামনে রূপনারায়ণ বয়ে চলেছে শান্ত লয়ে। অশ্বত্থ তলার পাশ দিয়ে গাঁয়ের ভোলাদার সেই চায়ের দোকানটাকে বাঁ হাতে ফেলে দূর শহরের দিকে চলে গেছে কালো কুচকুচে নতুন পিচ রাস্তাটা। একটা সবুজ রঙের ই-রিকশা চালিয়ে একটি মেয়ে পিক পিক হর্ন বাজাতে বাজাতে পার হয়ে গেল লেখকের সামনে দিয়ে। রিকশার পিছনের সিটে বসে উচ্চস্বরে হাসছে আর কলকল করে কথা বলছে জনা চার একুশ-বাইশের কিশোরী। শরৎচন্দ্র চশমাটা একটু নাকের ডগায় নামিয়ে নিয়ে হাঁ করে চেয়ে রইলেন তাদের দিকে।
     রূপনারায়ণের কূলে কাশফুল আর বাতাসের কানাকানি চলছে। হঠাৎ সেই কাশফুলের আড়াল থেকে উঁকি দিল একটি উনিশ-কুড়ির কিশোরী মুখ। মেয়েটি শাড়ি পরেছে তবে ব্লাউজখানা বেশ কায়দা করে বানান, অনেকটা হাফহাতা জওহর কোটের মতো। কোথায় গেল অচলা, বিজয়া,  রাজলক্ষ্মীদের সেই লেস লাগানো ঘটিহাতা ব্লাউজ? অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন লেখক শরৎচন্দ্র। 
     মেয়েটির কাঁধ থেকে ঝুলছে লম্বা ফিতের একটা জিন্সের ব্যাগ আর হাতে ধরা চকচকে স্মার্টফোন! ​শরৎবাবু একটু গলা খাঁকারি দিয়ে ডাকলেন,
_ 'ওখানে কে ও? সাবিত্রী নাকি হে? নাকি আমাদের সেই অভয়া'?
       ​মেয়েটি খিলখিলয়ে হেসে একেবারে যেন গড়িয়ে পড়ল। কাশঝাড় সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল লেখকের ঠিক মুখোমুখি। যেন এক কাশজাত কন্যা__মেয়েটির পরনের দুধ সাদা খোলের শাড়িতে উড়ে যাচ্ছে এক ঝাঁক নীল পাখি ___ "তন্বী শ্যামা শিখরিবদনা"...  ঢোঁক গিললেন শরৎবাবু।
__'ধুর দাদু! তুমিও না, কি যে বলো! আমি কেন সাবিত্রী-অভয়া ইত্যাদি হতে যাব? আমি তো সানভি। আর ওই যে ই-রিকশা চালিয়ে তোমার সামনে দিয়ে চলে গেল, ওটা অভয়াদি।"
কলকল করে বলে চলে সানভি মেয়েটি,
__'মিতুল, পলি, পাপিয়া, রুকসানারা তো অভয়াদির ই-রিক্সায় চড়েই অফিসে গেল। দেখলে না? ওরা এবার বি.এ. পাস করে পঞ্চায়েত অফিসে ডেটা এন্ট্রির কাজ পেয়েছে। রোজ অভয়াদিই রিক্সা চালিয়ে ওদের দিয়ে আসে অফিসে। ...'
     ​শরৎচন্দ্র বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। জিজ্ঞেস করলেন,
__'বলছ  কী গো!  ... মানে এ আমার সেই অভয়া'?
__'ও দাদু, তোমার মনে নেই? তোমার কলমই  তো অভয়াদিকে সাহস যুগিয়েছিল। অত্যাচারী স্বামীকে ত্যাগ করে সমাজের সংকীর্ণ আচার ও সংস্কারের গন্ডি ভেঙে অভয়াদি আজ নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে'।
সানভির কথাগুলো বড় আনন্দ দিল শরৎবাবুকে।
 __'আচ্ছা সাবিত্রী...মানে সে কি আজও সেই মেসেই রাঁধুনির কাজ করে? তার সতীশেরই বা খবর কি'?
​_'ওসব তোমার আমলের কথা, দাদু'! 
সানভি তার ফোনের স্ক্রিনে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল,
__'এখন আর কেউ অত ভালো রান্নার হাত নিয়ে ঘরে বসে থাকে না। সাবিত্রীদি তো হোম ডেলিভারি খুলেছে। বেশ নাম ছড়িয়ে পড়েছে তার ক্লাউড কিচেন "রসেবশে"-র। আর সতীশদা? তাঁর সঙ্গে তো সাবিত্রীদির কবেই বিয়ে হয়ে গেছে'।
খল খল করে হেসে উঠল মেয়েটি,
_' তুমি তো সাবিত্রীদিকে খুব কষ্ট দিয়েছিলে, দাদু। তরুণী বিধবা সাবিত্রীর দুঃখে তোমার প্রাণ একটুও কাঁদেনি তখন! সতীশদার সঙ্গে তার বিয়েটা দিয়ে দিলে কি ক্ষতি হত বল তো? তোমার হাতেই তো কলম ছিল। ছু্ঁড়ে মারতে তো পারতে সমাজের মুখে'।

অর্বাচীন মেয়েটির ওপর বড়ই বিরক্ত হলেন শরৎচন্দ্র,
__' এই মেয়ে, তুমি তো বেশ বাচাল হে! বিধবা সাবিত্রী আর সতীশের বিয়ে দিয়ে আমি কি ওদের হোটেলে তুলতুম? তখনকার সমাজের মুরুব্বীরা ওদের সমাজে ঠাঁই দিত? যত্তসব'!

__ 'আহা আহা রাগ কর কেন, দাদু? জানি গো জানি, মা তো সবসময় বলেন তুমি কত্ত আধুনিক মনস্ক ছিলে! "শেষ প্রশ্ন"  উপন্যাসে তুমি বিয়ে, প্রেম ও সামাজিক নীতিবোধের প্রথাগত ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলে। তুমিই নাকি "শেষপ্রশ্ন" উপন্যাসে আজকের দিনের 'লিভিং টুগেটার' রিলেশানের আভাস দিয়েছিলে সেই কত বছর আগে'!
   একটু মুচকি হাসলেন শরৎবাবু। তাঁর মনেপড়ে গেল কমলের কথা। প্রচলিত সমাজ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান সেই স্বাধীনচেতা বিদ্রোহিনীর কথা। বিড়বিড় করে বললেন,
_ 'কে জানে কেমন আছে কমলটা'!
__'তোমার কমলের নাম তো এখন কমলিনী গো, দাদু। শুনেছি, তিনি নাকি মুম্বাইতে এক পাঁচতারা হোটেলের ম্যানেজার। আর কোন এক বিখ্যাত জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পীর সঙ্গে লিভিং রিলেশানে আছেন। তাঁর এখন খুব হাই-ফাই ব্যাপার'!

__'ও তাই নাকি? তাই নাকি? ও মেয়ে চিরকালই অমন ছিল...সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখত। হাঃ হাঃ...'!

সানভিও হাসতে হাসতে এক নাগাড়ে আরও বলে চলল, 
__'তুমি যাদের পল্লীবালা বলে বইয়ের পাতায় বন্দি করে রেখে গিয়েছিলে, তারা এখন বেশির ভাগই স্বনির্ভর। আজ তারা প্রগতিশীল ও বৈপ্লবিক চেতনার আলোকে আলোকিত। তাদের কেউ ওই মোড়ের মাথায় বিউটি পার্লার খুলেছে, কেউ গাঁয়ের স্কুলে পড়ায়, কেউ রিক্সা চলায়, কেউবা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর লোন নিয়ে মুরগি-ছাগলের খামার, অনলাইনে শাড়ির ব্যবসা আর আর রকমারি হস্তশিল্পের ব্যবসা করছে। কেউ কেউ কলকাতার শপিং মলে সেলস গার্লের কাজও নিয়েছে। অনেকেই নার্সিং ট্রেনিং শেষ করে বিভিন্ন নার্সিংহোমে চাকরি করছে। কেউবা কলকাতায় লেখাপড়া শেষ করে আই.টি কোম্পানিতে কাজ করছে। ওদের আবার "ওয়ার্ক ফ্রম হোম", অর্থাৎ ওরা ল্যাপটপের মাধ্যমে ঘরে বসেই অফিস করছে'।
  ​        শরৎচন্দ্র আস্তে আস্তে অশ্বত্থ গাছের গুঁড়িতে গিয়ে বসলেন। তাঁর একে একে মনে পড়ে যাচ্ছে বিন্দু, অনুরাধা, অচলা, ভারতী, কমললতা, রাজলক্ষ্মী, পার্বতীদের কথা। সমাজ যাদের চোখের জল আর ত্যাগের মহিমায় মুড়ে বঞ্চনার হার-ই কেবল পরিয়ে গিয়েছিল সেই সময়।
​__'তা ওদের ঘরে কি আর কোন দুঃখ নেই, সানভি? সমাজের চোখরাঙানি, জাতপাতের বিচার, বাল্যবিবাহের অভিশাপ ... এসব কি একেবারে ধুয়েমুছে গেছে'?
বৃদ্ধের গলায় এক অদ্ভুত আকুলতা।
​   সানভি এবার একটু গম্ভীর হল। শাড়ির আঁচল দিয়ে ফোনের স্ক্রিনটা মুছতে মুছতে বলল, 
  'দুঃখ কি আর একেবারে নেই, দাদু? লড়াইয়ের চেহারাটা শুধু বদলেছে। লড়াই অনেক চ্যালেঞ্জিং হয়ে গেছে গো। এখন আর সমাজ কোন মেয়েকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না ঠিকই, কিন্তু ইন্টারনেটের দুনিয়ায় প্রতিদিন নতুন নতুন ট্র্যাপে পড়ছে মেয়েরা। কাজের জায়গায় যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে, তাদের প্রেমিকেরা কখনও কখনও তাদের মিথ্যে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে পাচার করে দিচ্ছে মিডলইস্টে। আবার এমনও হয়েছে মেয়েদের খুন করে তাদের টুকরো টুকরো দেহ ফ্রিজে রেখে দেয় প্রেমিকেরা! প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হলে কোন কোন ছেলে মেয়েদের মুখে অ্যাসিড ছু্ঁড়ে মারছে। এমন কি জানো, এখন পাঁচ বছরের বালিকাও গণধর্ষণের শিকার হয়? কত যে বীভৎস ঘটনার ঘনঘটা, কী আর বলি দাদু'!
    সূর্যদেব ততক্ষণে মাঝ আকাশে। নীল আকাশ থেকে যেন একেবারে ফেটে পড়ছে উজ্জ্বল রোদ্দুর। দূরে গাঁয়ের গাজনতলার মাঠে দুর্গাপূজোর প্যান্ডেল বাঁধার ঠুকঠাক শব্দ ভেসে আসছে। 
   ​শরৎচন্দ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। একটু ম্লান হাসলেন, তারপর বললেন,
__​'হু্মম... সমস্যা তো আছেই, সানভি। তবে কিছুটা স্বস্তির যে আমার পল্লীবালারা আর অবলা নেই। তারা আর্থিকভাবে খানিকটা স্বনির্ভর হয়েছে। অবশেষে তারা কিছুটা হলেও নিজেদেরকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে পেরেছে। এতেই আমার অনেক আনন্দ'।

    ​সানভি মুচকি হেসে বলল,
 'দাদু, একটা সেলফি নেবে আমার সঙ্গে? ফেসবুকে দেব। ক্যাপশনে লিখব—আমার মায়ের প্রিয় গল্পকারের সাথে হঠাৎ দেখা এক শরত-দুপুরে'!
     হো হো করে হাসতে হাসতে চশমাটা নাকের ওপর ভালোভাবে এঁটে শরৎচন্দ্র মোবাইল ক্যামেরার দিকে তাকালেন। শরত রোদ্দুরের সোনালি আভায় তাঁর মুখখানা চকচক করে উঠল।

No comments:

Post a Comment