প্রবন্ধ/ নিবন্ধ
এক মুকুটহীন রাজকুমারের অজানা কথা
অরুণ কুমার
বৈকুণ্ঠপুর রাজবংশের উত্তরাধিকার থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাহসী কর্মী—গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনকথা
ইতিহাস বড় নির্মম। তার নির্মমতা কখনও যুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে, কখনও রাজপ্রাসাদের অন্তরালে, আবার কখনও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অলিগলিতে ধরা পড়ে। ইতিহাসের পাতায় রাজা, মহারাজা, মন্ত্রী কিংবা সেনানায়কদের নাম সহজেই জায়গা করে নেয়; কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরি হয়েও যে মানুষটি নীরবে জীবনযুদ্ধ লড়ে যান, তাঁর কথা অনেক সময় থেকে যায় অন্ধকারে।
উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে বৈকুণ্ঠপুর রাজ স্টেট এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রায়কত বংশের দীর্ঘ ঐতিহ্য জলপাইগুড়ি ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রসন্ননগর থেকে জলপাইগুড়ির প্রসন্নদেব মহাবিদ্যালয়—বিভিন্ন স্থানে সেই ঐতিহ্যের ছাপ আজও দৃশ্যমান।
এই ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচিত নাম রাজা প্রসন্নদেব রায়কত। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের জনজীবনে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। কিন্তু তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি অধ্যায় অনেকটাই অনুলিখিত—তাঁর পুত্র গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনকাহিনি।
সামাজিক ও ঐতিহাসিক অর্থে তিনি যেন এক ‘মুকুটহীন রাজকুমার’—রাজপরিবারে জন্ম, কিন্তু রাজকীয় আরাম-আয়েশ নয়; উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নিরাপত্তার বদলে অনিশ্চয়তা, প্রাসাদের ছায়ার বদলে সংগ্রাম, আর শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিজের শ্রম ও সাহস দিয়ে নিজস্ব পরিচয় নির্মাণ।
রাজপ্রাসাদ থেকে জীবনের কঠিন বাস্তবতায়
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জন্ম ১৯৪৪ সালে দার্জিলিঙে। তাঁর মা ডিলা দেবী, যিনি ডাংকো দেবী নামেও পরিচিত ছিলেন, ছিলেন রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের অন্যতম সহধর্মিণী। গৌরীশঙ্করের সঙ্গে তাঁর দুই বোন—জ্যোৎস্না দেবী ও লীলা দেবী।
দার্জিলিংয়ের বাতাসিয়া অঞ্চলের কাছে প্রায় সাড়ে ২২ একর জমির উপর অবস্থিত ‘জলপাইগুড়ি হাউস’-এর পরিবেশেই তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে। বর্তমানে সেই সম্পত্তি সরকারি ব্যবস্থার অধীনে; কিন্তু একসময় সেটিই ছিল তাঁর শৈশবের পৃথিবী।
বাবা প্রসন্নদেব রায়কত জীবিত থাকাকালীন গৌরীশঙ্কর তাঁর স্নেহ পেয়েছেন। ছোটবেলার স্মৃতিতে বাবার সঙ্গে বাতাসিয়া, দার্জিলিংয়ের রেলস্টেশন, টয় ট্রেনের ধোঁয়া, দার্জিলিং ম্যাল, ঘোড়ায় চড়া—সবকিছু আজও যেন জীবন্ত।
একবার বাবা তাঁকে একটি দামি ‘Raleigh’ কোম্পানির চেইন-কভার লাগানো সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সেই সাইকেল নিয়ে কিশোর গৌরীশঙ্কর দার্জিলিং থেকে সালুগাড়া, বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল, বেলাকোবা ও রংধাবালি হয়ে জলপাইগুড়ির রাজবাড়িতে পৌঁছেছিলেন। রাজবাড়িতে সাইকেল নিয়ে তাঁর আগমন ছিল যেন এক রাজকুমারের নিজের রাজ্যে ফিরে আসা। অথচ সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
প্রাসাদের সম্পর্ক, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তিকে ঘিরে পারিবারিক টানাপোড়েন ক্রমশ তাঁর জীবনে ছায়া ফেলতে শুরু করে।
পিতার মৃত্যুর পর বদলে গেল সব
প্রসন্নদেব রায়কতের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। শরিকি মামলা-মোকদ্দমা ও পারিবারিক জটিলতার কারণে ডিলা দেবী ও তাঁর সন্তানদের জলপাইগুড়ি হাউস ছেড়ে চলে যেতে হয়।
একসময়ের রাজপরিবারের সন্তানদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয়, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের সহযোগিতা এবং সীমিত সুযোগের মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় গৌরীশঙ্করকে।
দার্জিলিংয়ের রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁর জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে তিনি স্নেহ, শৃঙ্খলা এবং মানসিক শক্তির পরিবেশ পান। পরে দার্জিলিং সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। কিন্তু নবম শ্রেণির পর আবার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
এবার তাঁকে পড়াশোনার পরিচিত পথ ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়।
এক অচেনা লাইনে দাঁড়িয়ে বদলে গেল জীবন
কলকাতায় এসে একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখতে পেলেন একদল যুবক একটি নিয়োগের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে, কোথায় চাকরি—সেটা তাঁর কাছে স্পষ্ট ছিল না। কৌতূহল থেকেই তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন।
সেটিই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’।
বলিষ্ঠ শরীর, খেলাধুলায় অভ্যস্ততা এবং শারীরিক সক্ষমতার কারণে নিয়োগকর্তাদের নজরে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীতে এয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।
জীবনের যে ছেলেটি রাজপরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মেছিল, সে এবার নিজের পরিচয় তৈরি করতে চলেছে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একজন কর্মী হিসেবে।
প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে যেতে হয় আম্বালা, পরে দেশের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে তাঁর কর্মজীবনের বিস্তার ঘটে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দিয়ে তিনি এমন এক সময়ে কর্মজীবন শুরু করেন, যখন দেশের সামনে একের পর এক যুদ্ধ ও নিরাপত্তা-সংকট এসে দাঁড়াচ্ছে।
যুদ্ধের সময় বিমানবাহিনীর নেপথ্য সৈনিক
১৯৬২ সালের চীন-ভারত সংঘাত, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ—এই উত্তাল সময়ের মধ্যেই গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের কর্মজীবন এগিয়ে চলে।
তিনি ছিলেন বিমানবাহিনীর গ্রাউন্ড স্টাফের সঙ্গে যুক্ত একজন দক্ষ কর্মী। বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত অস্ত্রব্যবস্থা, মিসাইল ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
সামরিক জীবনের এই কাজ ছিল নিছক চাকরি নয়। যেকোনো সময় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে; যেকোনো মুহূর্তে নির্দেশ আসতে পারে নতুন ঘাঁটিতে যাওয়ার। তাই প্রস্তুত থাকতে হতো শারীরিক ও মানসিক—দুইভাবেই।
রুশ প্রযুক্তির মিসাইল ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তিগত কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে অস্ত্রব্যবস্থাকে কার্যক্ষম অবস্থায় রাখার দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল।
১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধের সময় তাঁর দায়িত্বের মধ্যে তাজমহল অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত থাকার স্মৃতি তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন। আকাশপথে সম্ভাব্য শত্রু হামলার আশঙ্কায় রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হতো।
এ ছিল যুদ্ধের সেই অন্য মুখ—যেখানে সম্মুখসারিতে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো সৈনিকের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ নেপথ্যে থেকে যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখেন।
গৌরীশঙ্কর তাঁদেরই একজন।
মিসাইলের পাশাপাশি বক্সিং রিং
তাঁর জীবনকে শুধু সামরিক দায়িত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সেই আগ্রহ নতুন মাত্রা পায়।
বক্সিংয়ে তাঁর অসাধারণ সাফল্য তাঁকে বিমানবাহিনীর ক্রীড়া জগতে পরিচিত করে তোলে।
প্রশিক্ষক রঙ্গন দত্ত তাঁকে বক্সিংয়ের প্রতি আরও উৎসাহিত করেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে কঠোর অনুশীলন, শারীরিক প্রস্তুতি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকেন।
লাইট-মিডলওয়েট বিভাগে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলীয় বিমান কমান্ডের বক্সিং প্রতিযোগিতায় তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের কথা তিনি স্মরণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ইন্টার-কমান্ড পর্যায়েও নির্বাচিত হন।
একটি ম্যাচের স্মৃতিও তাঁর মনে গেঁথে আছে—সেমিফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী জেমস বডলেরিকে নকআউট করে ফাইনালে ওঠা এবং সেখানে ল্যারি ফার্নান্ডেজকে পরাজিত করা।
তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথম রাউন্ডে প্রচণ্ড চাপ সামলাতে হতো, কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাউন্ডে নকআউট করে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই ছিল তাঁর বিশেষ শক্তি।
যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে কিছু প্রতিযোগিতা বন্ধও হয়ে যায়। তবু বক্সিংয়ের সেই মেডেলগুলো আজও তাঁর সংগ্রহে—একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে।
গান, গিটার ও এক বহুমুখী মানুষ
গৌরীশঙ্করের জীবনের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক তাঁর সংগীতপ্রেম।
বাংলা, হিন্দি, নেপালি ও ইংরেজি গান—চার ভাষাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল। বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গিটার বাজানোয় দক্ষতা অর্জন করেন। পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর গিটারের সুরে বাংলা, হিন্দি ও নেপালি গানের পরিবেশনা শোনা গেছে।
তাঁর প্রিয় গানের মধ্যে ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের বিখ্যাত গান—‘আপনা দিল তো আওয়ারা’। বাগানে ফুল-সবজির পরিচর্যা করতে করতে আজও কখনও কখনও তিনি আপনমনে গান গেয়ে ওঠেন।
সংগীতপ্রেমের উত্তরাধিকারও যেন বাবার কাছ থেকেই পাওয়া। প্রসন্নদেব রায়কত নিজেও গান-বাজনার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত প্রায় একশো বছরের পুরনো জার্মান হারমোনিয়াম এবং বার্মা টিকের পালঙ্ক গৌরীশঙ্কর যত্ন করে রেখে দিয়েছেন বলে জানা যায়।
অর্থাৎ রাজবংশের স্মৃতি তাঁর কাছে শুধু জমিজমা বা প্রাসাদ নয়—কিছু বস্তু, কিছু সুর, কিছু স্মৃতি এবং কিছু সম্পর্কের মধ্যেও বেঁচে আছে।
রাজকুমারের আরেক পরিচয়—পর্যটনের সঙ্গী
১৯৭৫ সালে বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর গৌরীশঙ্কর ফিরে আসেন দার্জিলিংয়ে।
কিন্তু অবসর মানেই থেমে যাওয়া নয়।
জীবিকার নতুন পথ হিসেবে তিনি গাড়ি চালানোর কাজ শুরু করেন। রায়গড় থেকে একটি উইলিস জিপ নিয়ে দার্জিলিংয়ে আসেন। পরে সেই জিপ বিক্রি করে একটি পুরনো ল্যান্ড রোভার কেনেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৫৫ সালের মডেলের সেই ল্যান্ড রোভার তিনি মধ্যপ্রদেশের রায়গড় থেকে নিয়ে এসেছিলেন।
দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি রাস্তায় সেই গাড়ি নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন অধ্যায়।
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে তিনি দার্জিলিং, কালিম্পং, সান্দাকফু এবং পাহাড়ের নানা দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পাহাড়ের বিপজ্জনক রাস্তা, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং দুর্গম পথ তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা যেন এই নতুন পেশাতেও কাজে লাগত।
রাজেন্দ্র কুমারের অভিনীত ‘ঝুক গয়া আসমান’ সিনেমায় দেখা একটি জিপও তাঁর মনে গাড়ির প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল বলে তিনি স্মরণ করেছেন।
পর্যটকদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কখনও গিটার, কখনও গান—এইভাবেই তাঁর জীবন আবার এক নতুন ছন্দ পায়।
প্রাসাদের উত্তরাধিকার নয়, জীবনের উত্তরাধিকার
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।
তিনি রাজপরিবারে জন্মেছিলেন, কিন্তু রাজকীয় উত্তরাধিকার তাঁর জীবনকে নির্ধারণ করেনি। বরং তাঁর জীবনকে নির্মাণ করেছে সংগ্রাম, কর্মনিষ্ঠা, আত্মসম্মান এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ।
যে সম্পত্তি তাঁর শৈশবের আশ্রয় ছিল, তা একসময় তাঁর নাগালের বাইরে চলে যায়। পারিবারিক জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা, আর্থিক অনিশ্চয়তা—সবকিছু পেরিয়ে তিনি নিজের জীবিকা নিজেই তৈরি করেছেন।
আজ তাঁর নিজের পরিবার রয়েছে। দুই কন্যার বিয়ে হয়েছে; একজন শিক্ষিকা, অন্যজন নার্সিং পেশায় যুক্ত। পুত্রও বিবাহিত এবং বিদেশে কর্মরত। নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর জীবন এখন অনেক শান্ত।
অতীতের ক্ষত থাকলেও তিনি অভিযোগকে জীবনের কেন্দ্র করেননি।
বরং তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম—“আমার কিছু চাই না। ঈশ্বর আমায় সব দিয়েছেন।”
এই কথাটিই হয়তো তাঁর জীবনদর্শনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ইতিহাসের কাছে তাঁর দাবি কী?
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনের গল্পে রাজকীয়তার চেয়ে মানুষের গল্প বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাজবংশের সন্তান কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে নিতে পারেন—এটি তার গল্প।
একজন কিশোর কীভাবে রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তা হারিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রয়ে বড় হয়, কীভাবে কৌতূহলবশত একটি চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে, কীভাবে যুদ্ধের উত্তাল সময়ে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করে, কীভাবে বক্সিং রিংয়ে বারবার জয়ী হয়, কীভাবে গান ও গিটারকে জীবনের আনন্দ করে তোলে এবং অবসরের পর পাহাড়ি পর্যটনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে—এই সমগ্র যাত্রা নিছক একজন মানুষের জীবনী নয়; এটি এক সময়ের সামাজিক ও সামরিক ইতিহাসেরও অংশ।
তাঁর কাছে রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের স্মৃতি এখনও অমূল্য। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ক্ষমতা ফিরে পাওয়া নয়; বরং বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের ইতিহাস, রাজা প্রসন্নদেবের কাজ এবং ঐতিহ্য যেন নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।
সময়ের বিচারে এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
মুকুটের চেয়ে বড় যে পরিচয়
রাজপুত্রের পরিচয় জন্মসূত্রে আসে। কিন্তু মানুষের পরিচয় তৈরি হয় কর্মে। গৌরীশঙ্কর দেব রায়কত জন্মসূত্রে রাজপরিবারের সন্তান—এই পরিচয় তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়েছে জীবনের প্রতিটি কঠিন বাঁকে। রাজপ্রাসাদ তাঁকে স্থায়ী আশ্রয় দিতে পারেনি। উত্তরাধিকার তাঁকে নিরাপত্তা দেয়নি। পারিবারিক পরিস্থিতি তাঁকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই বঞ্চনাই হয়তো তাঁকে অন্য এক শক্তি দিয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি।
বিমানবাহিনীর পোশাক, যুদ্ধকালীন দায়িত্ব, মিসাইল রক্ষণাবেক্ষণ, বক্সিংয়ের মেডেল, গিটারের সুর, পুরনো ল্যান্ড রোভার, পাহাড়ি রাস্তা আর অসংখ্য স্মৃতি—এসব মিলিয়েই তাঁর আসল মুকুট।
সেই মুকুট চোখে দেখা যায় না।
তাই তিনি মুকুটহীন রাজকুমার।
তবে ইতিহাসের বিচারে মুকুটের মূল্য যতই থাকুক, মানুষের কর্মের মূল্য তার চেয়ে কম নয়। বরং অনেক সময় মুকুট হারিয়ে যাওয়ার পরই মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবন সেই কথাই বলে।
বৈকুণ্ঠপুর রাজবংশের ইতিহাস হয়তো প্রাসাদ, সম্পত্তি, রাজনীতি ও ঐতিহ্যের নানা অধ্যায়ে লেখা থাকবে। কিন্তু সেই ইতিহাসের এক মানবিক অধ্যায় রয়ে যাবে এমন একজন মানুষের জীবনে, যিনি রাজপুত্র হয়েও রাজকীয় সুবিধার উপর নির্ভর করেননি; বরং দেশসেবার কঠিন পথে হেঁটে নিজের ভাগ্য নিজেই লিখেছেন।
আজ বয়সের ভারে অতীতের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর চোখে হয়তো ভেসে ওঠে বাতাসিয়ার সেই বাড়ি, বাবার হাত ধরে টয় ট্রেন দেখতে যাওয়া, নতুন সাইকেলের আনন্দ, রামকৃষ্ণ মিশনের দিনগুলি, বিমানবাহিনীর ভোরবেলার অনুশীলন, বক্সিং রিংয়ের উত্তেজনা, যুদ্ধের সতর্কতা, গিটারের সুর, ল্যান্ড রোভারের পাহাড়ি পথ আর একসময়ের রাজপ্রাসাদ।
কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটাই—
উত্তরাধিকার মানুষকে পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু সংগ্রামই মানুষকে মর্যাদা দেয়।
ইতিহাস কখনও কখনও নির্মম হয়। কিন্তু ইতিহাসের কাজ শুধু বঞ্চনার হিসাব রাখা নয়; বিস্মৃত মানুষের কর্ম ও সাহসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবন তাই শুধু এক রাজপরিবারের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়। এটি এক মানুষের আত্মনির্মাণের গল্প—এক মুকুটহীন রাজকুমারের অজানা, অথচ অসাধারণ জীবনকথা।
** তথ্য সংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
উমেশ শর্মা, লেখক ও গবেষক ,জলপাইগুড়ি
পৃথ্বীশ দেব , রায়কত পাড়া,জলপাইগুড়ি
গৌরী শংকর দেব রায়কত, শিলিগুড়ি
প্রদীপ গোলে, বাতাসিয়া, দার্জিলিং

No comments:
Post a Comment