Friday, October 9, 2026


 

ঘুম : একটি নীল ভূগোল
ফটিক চৌধুরী

ঘুম প্রতিরাতে মানুষের ভিতরে একটি অদৃশ্য ভূগোল খুলে দেয়। সারাদিনের শব্দ, মুখ, অপমান, ব্যর্থতা ও না-বলা কথাগুলো সেখানে এসে তাদের শেষ আশ্রয় খোঁজে। চোখ বন্ধ হলেই দিনের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে মুছে যায়; পরিচিত পৃথিবী তার সীমারেখা হারায়, মানুষও নিজের নাম থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়।
ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্তে পরিচয়গুলো আলগা হয়ে আসে। বাবা, সন্তান, বন্ধু, শত্রু—এই সমস্ত নাম যেন দরজার বাইরে থেকে যায়। বিছানায় শুধু শরীরটি পড়ে থাকে; তার ভিতরের অদৃশ্য মানুষটি প্রবেশ করে অন্য এক সময়ে। সেখানে অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি বসে থাকে। বহু বছরের পুরোনো একটি দুপুর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দেয়, আর মানুষ অজান্তেই তার দিকে ফিরে যায়।
স্বপ্ন সেই অদৃশ্য ভূগোলের গোপন শহর।
সেখানে হারানো বাড়িগুলোর জানালায় আবার আলো জ্বলে। বিস্মৃত মুখেরা কুয়াশা সরিয়ে সামনে আসে। মৃত সময়ের ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে মানুষ নেমে যায় নিজেরই ফেলে আসা জীবনে। তখন বোঝা যায়, স্মৃতি কেবল অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়; সে আমাদের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা এক সমান্তরাল শহর, যার দরজা সবসময় খোলা থাকে না।
অনিদ্রা সেই দরজার সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা। বিছানা তখন বিশ্রামের স্থান নয়, এক নিঃশব্দ প্রহর। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু রাত যেন একই জায়গায় জমাট বেঁধে থাকে। চিন্তাগুলো একে একে ফিরে আসে এবং মানুষকে নিজেরই ভিতরে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তবু ঘুমের কাছে সবাই সমান। সম্পদ, পদমর্যাদা, পরিচয়—সবকিছুই চোখের পাতার বাইরে রেখে যেতে হয়। ঘুমের ভিতরে মানুষের কোনো বাহ্যিক পরিচয় থাকে না; থাকে শুধু তার ক্লান্ত শরীর এবং নিজের অজানা গভীরে পৌঁছানোর এক নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষা।
ভোর হলে সেই অদৃশ্য ভূগোল গুটিয়ে যায়।
জানালায় আলো পড়ে। ঘরের জিনিসপত্র আবার তাদের পরিচিত অর্থ ফিরে পায়। পৃথিবী আবার আমাদের নাম ধরে ডাকে। আমরা ফিরে আসি কাজের কাছে, মানুষের কাছে, অসমাপ্ত জীবনের কাছে।
তবু ভিতরে কিছু থেকে যায়।
হয়তো একটি অস্পষ্ট আলো।
হয়তো কোনো পুরোনো মুখের ছায়া।
হয়তো এমন একটি দরজা,
যার ওপারে আমরা রাতের জন্য
নিজেদের নাম ভুলে রেখেছিলাম।
ঘুম তাই শুধু বিশ্রাম নয়।
সে মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা আর-এক পৃথিবী—যেখানে প্রতিরাতে আমরা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাই, আর ভোর হলে ফিরে এসে ভাবি, আমরা সত্যিই কোথায় ছিলাম?

No comments:

Post a Comment