পুজোর ছোটবেলা
বেলা দে
উঠলো বাই তো কটক যাই, ঠিক এমনটাই ছিল ছোটবেলা,ভোর হতে না হতে ব্রাশে টুথপেষ্ট লাগিয়ে কোনমতে ছুটে বোসবাড়ি। যাই দেখে আসি কুমোর কাকুদের কতটা এগোলে প্রতিমা গড়া সেইসাথে হাতের কর গোনা কদিন বাকি পূজোর। উল্টো রথের দিন কাঠামো পূজো হয়ে গেলেই ওদের ঠাকুর দালান থেকে গোটা বাড়ি ঝাড়পোঁছ, রঙ করায় উৎসব লেগে পরেছে। দূরান্তের স্বজনরা এসে পড়েছে একে একে, কুচবিহার থেকে মনি জ্যেঠু সবচেয়ে বড় ভাই স্বপরিবারে, উনি সেখানে ওকালতি করেন, বাড়িও করেছেন, গোপালপুর চা বাগিচা থেকে এসেছে বাসন্তী পিসিমা, সঙ্গে পিসো এবং ছেলেমেয়েরা দোলাদি, লালুদা, কালু,বাবলী, ঝুমরি। ঝুমরি খুব ঝগড়াঝাটি ক্যাপবন্দুক দিয়ে ভয় দেখায় কেবল, ওর সাথে আড়ি করে দিতাম , বাকিরা সবাই ভালো। পিসিমা খুব আদর করতেন। আমার মা'কে ডাকতো সুন্দরী বউদি। মেজ জ্যেঠু মানিক বোস দুর্দান্ত ক্ষ্যাপাটে স্বভাবের। খাজনা যেদিন তুলেছে রেগে আগুন, মারধোর করেছে প্রজাদের, ভয়ে সেদিন ওদের বাড়ি চৌহদ্দি মারাইনি। তার আট ছেলেমেয়ে। দীপ্তি দি, গোবিন্দদা, দুলালদা, নন্দাদি, জহরদা, চুনি, লিপি, বাবলা। ওরা আমার খেলার সাথী শেষের তিনজন।
মানিক জ্যেঠুরা তিন ভাই, সবচেয়ে ছোট ভাই সুধীর বোস, সুধীর কাকুর স্ত্রীর নাম সুধা। নামের খুব মিল।
স্কুলের সময়টুকু ছাড়া সমস্ত দিন কেটেছে ওদের ঘরে। তার ছেলেমেয়ে রত্না, স্বপ্না, বুদ্ধ, কেষ্ট অসমবয়সী হলেও বন্ধুত্ব সবাইকার সাথে। বাড়িতে না খেয়ে গেলে কাকিমা খাইয়ে দিত, কম খেলে মায়ের কাছে নালিশ যেত। ভয় দেখানো ছিল " তুই কোনদিন বড় হবি না, হাড়গিলে থেকে যাবি" পূজোর কটা দিন তো বাড়ি ফেরার নামগন্ধটি নেই।
একবারে রাতে ফিরে মায়ের হাতে তৈরী একমাত্র সম্বল সূতির ফুলছাপা জামাটি পড়ে বোসবাড়ির নায়েবমশাই বসন্তকাকুর হাত ধরে আমি এবং সে বাড়ির সমস্ত কচিকাঁচার দল একসঙ্গে ঘুরে পূজো দেখার কি আনন্দ, কোনদিন হয়তো গিরিজা নিয়োগী অথবা রেবতী কাকুও সঙ্গে করে নিয়ে যেত। সেসময় পল্লী শহর ফালাকাটায় হাতে গোনা কয়েকটি পূজো। মুক্তিপাড়া, গৌরী টকিজের সামনে বারোয়ারী পূজো, দেশবন্ধুপাড়ায়, মশল্লাপট্টি, মিলরোডে এবং বোসবাড়ি। বিশেষত জমিদার বাড়ির চৌহদ্দি পেরিয়ে দুর্গাপূজার রীতি ছিল বারোয়ারী অথবা ধনীগৃহে। এখন বহু পূজো। দু'বছর আগে গিয়ে দেখে অবাক, বিশেষ উল্লেখযোগ্য আমাদের গেটের সামনে আমাদের জমিতেই শারদীয় মায়ের পূজো হচ্ছে সাত বছর যাবৎ। পাড়ায় মেয়েরা মিলে করে। একবার মাত্র গিয়েছি সেখানে। গেলেই ঝাঁপিয়ে নামে ছোটবেলা।
যে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে ছিল বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্য তারা আজ কোথায় গেল, অন্তর্জালেও খুঁজে বেড়াই সময় নিয়ে, হদিস নেই। দল বেঁধে প্রতিদিন পোয়ালের গায়ে মাটি পরা, রং-তুলির আলোর ছোঁয়ায় তিলে তিলে প্রতিমা হয়ে উঠছে মৃন্ময়ী মা, মায়ের গায়ে উঠছে অস্ত্র, আভরণ। আলাদাভাবে তৈরি মূর্তিগুলি বসেছে একচালায়। শেষদর্শন চক্ষুদান। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিল মা এসে গেল। প্রতিরোজ দর্শনধারী আমরা ছানাপোনারা খেয়ালখুশির লাগামছাড়া মত্ততা মূর্তগড়া থেকে বেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় ফের চোখ শারদীয় মায়ের প্রতিক্ষায়।
No comments:
Post a Comment