আমার ছেলেবেলা ও দুর্গাপুজো
মহঃ সা নো য়া র
আমি মুসলিম পরিবারের ছেলে। তবু আমার ছোটবেলার স্মৃতিতে দুর্গাপুজোর একটা আলাদা জায়গা আছে। কারণ ছোটবেলায় ধর্মের হিসাব বুঝতাম না, বুঝতাম শুধু আনন্দ, বন্ধুত্ব আর উৎসবের রঙ।
পুজো এলেই আমাদের পাড়াটা যেন বদলে যেত। চারদিকে আলো, ঢাকের শব্দ, নতুন জামাকাপড় আর মণ্ডপ সাজানোর ব্যস্ততা। পাড়ার হিন্দু বন্ধুদের সঙ্গে আমরাও ঘুরে বেড়াতাম। কোন প্যান্ডেল বেশি সুন্দর, কোথায় ফুচকা ভালো, কোথায় মেলা বসেছে—এসব নিয়েই ছিল আমাদের যত আলোচনা।
মহালয়ার ভোরে রেডিও থেকে ভেসে আসা চণ্ডীপাঠ, পুজোর দিনের ঢাকের আওয়াজ কিংবা সন্ধ্যার আলোকসজ্জা—এসব আজও আমার শৈশবের সঙ্গে মিশে আছে। অষ্টমীর দিন বন্ধুরা যখন অঞ্জলি দিতে যেত, আমি বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতাম। এরপর সবাই মিলে ঘুরতে বের হতাম, ফুচকা খেতাম, মেলায় যেতাম। সেই আনন্দে ধর্মের কোনো দেয়াল ছিল না।
সবচেয়ে ভালো লাগত পুজোর সময় পাড়ার মানুষের একসঙ্গে হয়ে যাওয়া। কারও বাড়িতে রান্না হলে অন্য বাড়িতে পাঠানো, সবাই মিলে মণ্ডপ সাজানো, রাত পর্যন্ত আড্ডা—এসব দেখে মনে হতো, উৎসব আসলে শুধু একটি ধর্মের বিষয় নয়; উৎসব মানুষেরও।
আজ বড় হয়ে বুঝি, ছোটবেলার সেই সরল সময়টা কত মূল্যবান ছিল। তখন হিন্দু-মুসলিম আলাদা করে বন্ধুত্ব করতে শিখিনি; মানুষকে মানুষ হিসেবেই চিনেছিলাম। আমার বন্ধুরা ছিল হিন্দু, আমি ছিলাম মুসলিম—কিন্তু আমাদের খেলাধুলা, হাসি, দুষ্টুমি আর বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো ধর্মের পরিচয় ছিল না।
আজও দুর্গাপুজোর ঢাক শুনলে আমার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই পাড়ার গলি, বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, ফুচকার স্বাদ আর সন্ধ্যার ঝলমলে আলো।
দুর্গাপুজো আমার ধর্মীয় উৎসব নয়, কিন্তু আমার শৈশবের একটি সুন্দর অংশ। সেই স্মৃতিগুলো তাই আজও আমার কাছে খুব আপন। কারণ শৈশবের আনন্দের কোনো ধর্ম হয় না—সেখানে শুধু থাকে বন্ধুত্ব, ভালোবাসা আর একসঙ্গে বেড়ে ওঠার গল্প।

No comments:
Post a Comment