Friday, October 9, 2026


 

মুক্তগদ্য 

পুজোর গন্ধ

অনিতা নাগ  


‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক-মঞ্জীর; ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা; প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা’ 

বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গমগমে গলার এই স্তোত্রের মধ্যেই লুকিয়ে ছিলো পূজোর সুবাস। সে সুবাস আজো তেমন করেই আগলে নিয়ে চলে অনু। রেডিওতে মহিষাসুরমর্দিনী লাইভ না শুনলে পূজো এসেছে মনেই হয় না। মহালয়ার অনেক আগে থেকেই আকাশ কেমন একটা অদ্ভুত নীল রঙে সেজে উঠতো, আর তাতে ভেসে বেড়াতো সাদা মেঘের ভেলা। সকালের শিউলি ফুল মনে করিয়ে দিত শরৎ এসেছে। পাড়ার রক্ষিত মাসিমার বাগানে গিয়ে রোজ শিউলি ফুল কুড়োতো অনু। ফুলের ঝাঁপি ভরে উঠতো শিউলির সুবাসে। রক্ষিত ঠাকুরমা বলতেন আমাকে একটু দিয়ে যাস। রক্ষিত ঠাকুমাকে ফুল দিয়ে, বাকী ফুল নিয়ে আসতো নিজেদের বাড়িতে। ঝুড়ি ভর্তি শিউলি ফুল দেখে অনুর ঠাকুরমা কি যে খুশি হতেন! শ্যামলা মুখে অপূর্ব আলো খেলা করতো। সেদিন কিন্তু সেই আলো দেখতে পাইনি অনু। আজ দেখতে পায়। ছবির মতো সব ভেসে ওঠে সামনে। এখন তো সবই অন্যরকম। প্রকৃতি ও কেমন এক খামখেয়ালি খেলায় মেতেছে। আশ্বিনের বেশ অনেকদিন পার হয়ে গেলেও সাদা মেঘের ভেলা উড়ানো নীল আকাশ এখনো চোখে পড়েনি। শরতে হিমের পরশ যেনো গল্প কথা। দিন বদলের গল্প কথায় প্রকৃতিও সামিল হয়ে গেছে। তবে আশ্চর্য ভাবে শিউলি আজও ফোটে একই নিয়মে, আর রাত পেরোলেই ঝরে পড়ে টুপটাপ। রোজ সকালে হাঁটতে বেড়িয়ে আবাসনের সব শিউলি তলায় দাঁড়িয়ে নিজের ছেলেবেলাটাকে দেখতে পায় অনু। আজও শিউলি তলা ঝরা ফুলের সুবাস মেখে হেসে খলখল, গেয়ে কলকল। সকালের প্রাতঃভ্রমণে এই এক বড্ড ভালোলাগা। এই ভালোলাগাটুকু অনুর একান্ত নিজের। শরতের আকাশের প্রায়ই মুখভার। প্যাচপ্যাচে গরম আর নিম্নচাপের ভ্রুকুটি। সকালেও হিমের পরশ উধাও। তবু শরৎ এসেছে তার নিয়ম মেনেই। 

 সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অনেকদিন পর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো অনু। আবাসনের এক প্রান্তে বিরাট এক শপিং মল তৈরি হচ্ছে। বারান্দা দিয়ে দেখতে পাওয়া এক টুকরো আকাশের পরিধি কমেছে। ইঁট কাঠের গগনচুম্বী অট্টালিকার আড়ালে হারিয়ে গেছে অনুর টুকরো আকাশ। তবে আজও মনের আকাশে পাখা মেলে দিব্যি ঘুরে বেড়ায় অনু। হঠাৎ এক ঝড়ো হওয়ার মতো ছোটবেলার স্মৃতি এসে আঁকড়ে ধরল অনুকে। চুপি চুপি বলে, এই মেয়ে যাবি তোর ছোটবেলায়! মনের আগোল খুলে অনু বেড়িয়ে পড়ে। সেই টুকরো আকাশে মন ভাসিয়ে অনু পাড়ি দেয় ছোটবেলার দিনগুলোয়। তাদের বাস ছিলো উত্তর কলকাতায়। তিনতলা বাড়ী। উপরে থাকতেন দাদু, ঠাকুমা আর দুই দাদা। দোতলার ঘরে মা, বাবার সাথে সে থাকতো। রান্না, ভাঁড়ার সব নীচে। আর সিঁড়ি দিয়ে খানিকটা উঠে ছিলো ঠাকুর ঘর। পূজোর আগে থেকে বাড়ীতে সাজো, সাজো রব। কাচা কুচি, ঝুল ঝাড়া, পাখা পরিস্কার! কতো রকমের কাজ। মা আসছেন যে! তাই সব পরিস্কার, পরিচ্ছন্ন করা। রান্নার পরে উনুনে গুঁড়ো কয়লা দিয়ে, মরা আঁচে সাবান কাচার জল গরম হতো। কখনো বড় হাঁড়িতে জলে সোডার সাথে সাবান কুচি দিয়ে বেশী অপরিস্কার জিনিষ ফোটাতে দিতেন মা। তখন তো এতো রকমের কাপড় কাচার সাবান পাওয়া যেতো না! সোডা সাবান ফুটতো যখন কেমন একটা অন্যরকম গন্ধ বেরেতো! আজও অনু সেই গন্ধটা পায়! মা'কে দেখতে পায়। ফর্সা মুখ আগুনের তাতে লাল হয়ে আছে। এক মাথা খোলা চুল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। বিরামহীন কাজ করে চলেছেন। মহালয়ার আগে সব কাজ সারতে হবে। দেবীপক্ষে ঘর ঝাড়া ঝুরি, সাবান কাচা, এ'সব করা বারণ । জোরে জোরে কথা বলা বারণ, সিঁড়িতে উঠানামা ধীর পায়ে করতে হতো। মা আসবেন যে! তাই রাজ্যের কাজ সারার ব্যস্ততা। বাবা ও অনেক কাজ করতেন। অনামিকা ভাবে কখন এতো কাজ করতো তার মা! বাড়ীতে ছোট থেকে বড়, সকলের সব আব্দার তো এই মানুষটাই সামলাতো। ম্যাজিক জানতো নাকি! রাজ্যের কাজ সেরে কোনো একদিন সময় করে বাবা মা পূজোর বাজার করতে যেতেন হাতিবাগান বাজারে। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতো অনু। ফিরে এসে এক এক করে সব বার করতেন মা। বাড়ীর সকলের সাথে আত্নীয় স্বজন, গৃহ সহায়িকা সকলের জন্য জামা কাপড় থাকতো। কেউ বাদ পড়তো না। খুব যে আহামরী দামী জিনিষ তা নয়। তবে প্রতিটা জিনিষের সাথে মিশে থাকতো ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ।

বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে, খেয়ে নিয়েই তো প্যান্ডেলে দৌড়। রোজ তো একটাই কাজ। প্যান্ডেল কতটা হলো সেটার সমীক্ষা করা! তারপর প্যান্ডেলের বাঁশ ধরে দোল খাওয়া, প্যান্ডেলেই লুকোচুরি খেলা! কি মজা, কি মজা! বাড়ী ফিরে একবার করে নতুন জামা কাপড় গুলো দ্যাখা। নতুন জুতোর গন্ধ সোঁকা। খুব সাধারণ জামাকাপড় হতো। মামার বাড়ী, কাকা, পিসি, সব মিলিয়ে পাঁচটা জামা অবশ্য হতো। সে জামা হাঁটু ছাড়িয়ে যেতো। একবছর চালাতে হবে তো। আর অফিস থেকে আনা জুট দিয়ে নতুন বড়ো মাপের জুতো টাইট করে দিতেন বাবা। এ' গুলোই স্বাভাবিক ছিলো। কই, আনন্দে তো ভাঁটা পড়েনি। আজ তো মুঠোফোনে বোতাম টিপে সব জিনিস অর্ডার করা। বাড়ীতে সে জিনিষ এলে পছন্দ হলে রাখো, নাহলে ফেরাও। তাতে সেই নতুন নতুন পূজোর গন্ধটা পায় না অনু। কতো খোঁজে সেই গন্ধটাকে!

বৌমা! এ'তো দাদুর গলা। কান পাতে অনামিকা। আমার জন্য একটা চব্যনপ্রাশ এনো। শীতে বড় কাজ দেয়। খোকাকে বোলো তামাকের টিকে ফুরিয়েছে। অ বৌমা! আবার কি। কান পাতে অনু। বাড়ী শুদ্ধু সকলের তো জামাকাপড় এলো। তোমার আর খোকার তো কিছু দেখলাম না। মা চুপ করে থাকতেন খানিক। তারপর বলতেন আপনার ছেলে আগে এ'দিকটা সামলাক বাবা। কথাগুলো হুবহু মনে আছে। শুধু মনে নেই সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে তাদের অঙ্গে নতুন কাপড় উঠতো কিনা! সে’দিন জানা হয় নি। অনু ভাবে একটি বার যদি সুযোগ পেতো, সব সাধ পুরণ করতো। আবাসনের মন্ডপের কাজ এগিয়ে চলছে জোর কদমে। আজ আর প্যান্ডেলের কাছে দাঁড়িয়ে দেখা হয় না, সে ইচ্ছে টাও আর নেই। ঠিক সময়ে, তিথি নির্ঘন্ট মেনে মা আসেন। বছরের এই ক'টা দিন সব ভুলে তাঁর আরাধণা। জীবনের দিন কমছে। চারদিকের এই রূপ, রস,গন্ধ আগলে রাখে অনু।  

দীর্ঘ প্রবাস জীবন কাটিয়ে যখন কলকাতা ফিরলো , তখন প্রিয়জনরা অনেকেই সুদূরে পাড়ি দিয়েছেন। চেনা জায়গাটা সবই কেমন বদলে গেছে, বদলে গেছে অনেক কিছুই। সেই বদলে যাওয়া সবকিছুর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। বদলে গেছে শারদোৎসব। আজকাল থিমের পূজো। আড়ম্বরের আড়াল থেকে সাবেক পূজোর গন্ধ, আর সেই উপচে পড়া আনন্দ খুঁজে বেড়ায় অনামিকা। পূজোর গন্ধটা কেমন বদলে গেছে। রান্না সেরে দুপুরে মা, ঠাকুমা নাড়ু, নিমকি, জিভেগজা, কতো কিছু বানাতেন। ডালডার গন্ধে ম ম করতো চারিদিক। কড়ায় ডালডা বেঁচে গেলে তাদের আব্দারে হতো ফুলকো লুচি আর বেগুন ভাজা। অমৃত যেনো! কই কিছু তো হতো না। দিব্য ভালো ছিলো। ডালডার সুবাসের সাথে নারকোল নাড়ু, তক্তির গন্ধটা খোঁজে অনু, চুরি করে খাওয়া প্যারাকীর হিসেব আর কেউ রাখে না। শরীর নামক যন্ত্রের নানান খামখেয়ালীপনায় হাতের সামনে মিষ্টি পড়ে থাকলেও খাওয়া হয় না। এখন নানান বিধিনিষেধ মেনে নিকেকে সাবাধানে রাখা। আসলে মনটাই তো আনন্দে থাকে না। ছেলে মেয়ে জামাই, নাতি, সকলে দূরে। ভিডিও কলে দেখা সাক্ষাৎ। আত্মীয় স্বজনের বাড়ী যাওয়া আসা উঠেই গেছে। শুধু নিজের টুকু নিয়ে থাকলে কি মন ভরে! 

ডিউটি শেষে বাবা ফিরতেন রাত করে। অনু অপেক্ষায় থাকতো। বাবা ব্যাগটা এগিয়ে দিতেন তার হাতে। ব্যাগ তো নয়, যেনো আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপ। জয় সাবান, রেণুকা পাউডার, আফগান স্নো, টিপ পেন্সিল! জয় সাবানের মোড়কটা যে কি সুন্দর ছিলো। গোলাপী চকচকে কাগজে জুঁই ফুলের ছবি। আফগান স্নো আর টিপ পেন্সিল মা'র জন্য। মা'র মুখটাও তো দেখতে পাচ্ছে অনামিকা। আলোকোজ্জ্বল সে মুখ! চাহিদা কম ছিলো, আনন্দ ছিলো অঢেল। 

এখন সবকিছু এতো সহজলভ্য বলেই তার কদর গেছে কমে। দুপুর জেগে শাড়ীতে ফলস বসানোর পাঠ গেছে উঠে। পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সব হয়ে যায়। তবু অনুর কাজের শেষ নেই। মা আসবেন। তার প্রস্তুতি নেই! শুধু কি বাইরের সাজ! অন্তরটাকেও যে সাজাতে হবে। অন্তর শুদ্ধ না হলে তাঁকে আবাহন করবে কেমন করে! আজকাল এই এক রোগ হয়েছে অনুর। সারাদিন মনের অলি-গলি পরিস্কার করে। কোথাও কোনো গিঁট না থাকে। সব গিঁট খুলে সহজ করে দাও, বাঁধণ যতো ছিন্ন করো আনন্দে। বড্ড কঠিন কাজ। তবু চেষ্টা করে। বছরে এই একবার মা আসেন। তাঁর জন্য আসন সাজিয়ে অপেক্ষা করে। সেই অপেক্ষায় মিশে যায় ঢাকের বোল, চন্ডী পাঠের সুর, অঞ্জলীর মন্ত্র। দূরের ওই আকাশ তলে বাবার সাইকেলের আওয়াজ মিলিয়ে যায়। ক্রিং ক্রিং, ক্রিং ক্রিং। মনে মনে অনু বলে দুগ্গা দুগ্গা। ঐ যে তার মা। একটা পাট-ভাঙা শাড়ী আর বড় লাল টিপ পরে হাতের কাজ সারছেন। ঐ যে ঠাকুমা! পূজের প্রসাদ নিয়ে অপেক্ষা করছেন। অনুর দু' চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। বিড়বিড় করে বলে তোমরা আমাকে এমন করেই আগলে রেখো। কোনোদিন যেন এই অনু নিজেকে হারিয়ে না ফেলে ভীড়ের মধ্যে। অনু অপেক্ষা করে। মা ‘এর আগমনে চারদিকের অন্ধকার মুছে যাক। দশপ্রহরণধারিনীর আশীষধারায় ধৌত হোক, আলোকিত হোক সকলের জীবন। একটা সুর বাজে মনের মাঝে ‘আজ বাজে মন মাঝে ওই আগমনীর গান, জগৎ ও জননী মাকে করে আহ্বান’। তুমি এসো মা। তোমার পদস্পর্শে সকলের মঙ্গল হোক, চেতনা হোক। ভোরের সূর্যোদয়, শিশির আর শিউলির পরশ দিয়ে সকলের অন্তরকে তুমি আলোকিত কর।

No comments:

Post a Comment