উপস্থিত বুদ্ধি!
চিত্রা পাল
আজকাল কেউ গল্প শোনে না, কারণ তেমন করে গল্প বলার মানুষেরই অভাব। কিন্তু গোপালের ছোটমামা এলেই গোপালের বন্ধুরা সবাই চলে আসে ওদের বাড়িতে,কেননা উনি ভাল গল্প বলেন, তাই যেই পিন্টু শুনেছে যে ছোটমামা এসেছে আর দ্বিরুক্তি না করে মাকে বলেই পিন্টু সোজা গোপালদের বাড়িতে।ওখানে গিয়ে দেখে গোপালের বাবা ওর মামার সঙ্গে বাঘের গল্প করছে। শুনতে পেল,আজ নাকি একটা খবর বেরিয়েছে, মহারাষ্ট্রর কোনও এক গ্রামের এক আদিবাসী মেয়ে সামান্য লাঠি নিয়ে বাঘের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে ভয় ডর তুচ্ছ করে, যখন সেই বাঘটা তার পোষা ছাগলছানাকে মুখে করে নিয়ে যাচ্ছিলো।শুনে পিন্টু বললো, ‘বাব্বা, কি সাহস’।এমন সময় বাচ্চু আর রাজা এসে উপস্থিত। ওরাও গল্পের গন্ধেই এসেছে। এসেই মামাকে ধরে পড়লো, মামা একটা গল্প বলো।আজ কিন্তু বাঘেরই গল্প বলতে হবে। মামা বললো, তোরা একটু বস্,আমি আসছি’। মামা এসে বসতেই এদিকে লোডশেডিং হয়ে গেল। ঘরে শুধু একটা ছোট আলো জ্বলছে,আর বাইরেটা নিকষ কালো অন্ধকার।মামা বলতে শুরু করলেন।
বছর কয়েক আগের কথা। আমার তখন কোলকাতায় পোষ্টিং।ওখানে আমার এক বন্ধু হয়ে গেল রতন,যার বাড়ি দক্ষিন চব্বিশ পরগনার ক্যানিং এর দিকে।ওর মুখে ওদের ওখানকার একজনের বাঘের মুখে পড়া ও তার থেকে উদ্ধার পাওয়ার যা গল্প শুনেছিলুম,তা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।ওদের গ্রামের একজন গোসাবার চারজনকে নিয়ে দক্ষিণ সুন্দরবনের খোলাখালির জঙ্গলের নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়েছিল নৌকো নিয়ে।তাদের মধ্যে ও নিজেও একজন ছিলো। কাঁকড়া ধরার জন্য আগে মাছ ধরার মতো চার ছড়াতে হয়। নৌকোয় ওদের গ্রামের লোক বসে ছিলো লগি নিয়ে। আর দুজন চার ছড়াতে নেমেছে জলে। দুজনেরই পরনে ইলাস্টিক দেওয়া প্যান্ট আর শার্ট। চার ছড়িয়ে উঠতে যাবে,জঙ্গলে ছিল বাঘ ঘাপটি মেরে,একেবারে পেছন থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে একজনের ওপরে।ধরার সময় বাঘের হিসেবে একটু গরমিল হয়ে ছিল।ও ছেলেটার ঘাড় না ধরে জামাটা কামড়ে ধরে। হঠাৎ বাঘ ওকে ওইরকম করে আক্রমণ করলে ও নিজেও বাঘটাকে জাপটে ধরে একেবারে জলে উলটে পড়ে। ওরা জলে জঙ্গলে বড় হওয়া, জীবন ধারণ করা মানুষ। বন্য জন্তুর সঙ্গে কিভাবে মোকাবিলা করতে হয়, সেটা খুব ভালভাবেই ছোট থেকে বুঝে যায়। বাঘ জামাটা কামড়ে ধরতেই ওই ছেলেটি কোনওরকমে টেনে হিঁচড়ে জামাখানা খুলে ফেলে। এদিকে নৌকোয় যারা আছে, তারা ছইএর ওপরে দমাদ্ধম লাঠির বাড়ি মেরে মুখে নানারকম বিকট শব্দ করে বাঘটাকে তাড়াবার চেষ্টা করে। এই সব শব্দে বাঘ একটু ঐ দিকে তাকালে, ছেলেটি মুহূর্তে তার পরণের প্যান্ট খুলে জলে ভাসিয়ে ডুব সাঁতার দিয়ে দূরে চলে যায়।নৌকো তখন মাঝ নদীতে। ছেলেটা ডুব সাঁতার দিয়ে নৌকোর কাছাকাছি এসে গেলে ওর সঙ্গীরা ওকে তাড়াতাড়ি নৌকোয় তুলে ফেলে’। যারা শুনছিলো তারা সবাই জিঞ্জেস করে ‘তারপর’? রাজা জিজ্ঞেস্ করে, ‘আর বাঘটা?’মামা বলে, বাঘটা? ভেসে যাওয়া প্যান্টটাকে মানুষ ভেবে তড়িৎ গতিতে এক লাফ’।পিন্টু জিজ্ঞেস্ করে ‘এবার’?এবারে প্যান্টটাকেই মুখে করে ডাঙায় উঠেই একেবারে দে দৌড়।বাচ্চু বলে,’ ওই ছেলেটার কি হলো’? মামা বলে ছেলেটাকে কোনো রকমে ডাঙায় নিয়ে এসে সোজা গোসাবার হাসপাতালে’।জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখে লোডশেডিং চলছে। এর জন্য ঘরের বাইরে তখনও অন্ধকার।জোনাক জ্বলছে সারেসারে। পিন্টু দেখছে যেন বাঘের চোখ জ্বলজ্বল করছে। বাড়িতে ফিরতে হবে যে!

No comments:
Post a Comment