সিঁদুরে লাল দশমী
দেবযানী চক্রবর্তী
শ্রুতি আর রাহুল --- দুই বন্ধু বান্ধবী একসঙ্গে স্কুলে পড়া শুরু সেই নার্সারি থেকে l তারপর একের পর এক ক্লাস টপকে টপকে টুয়েলভ পর্যন্ত একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা l শ্রুতির ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার আর রাহুল ছোট্টবেলা থেকেই বাবার কম্পিউটার নাড়াচাড়া করতে করতে কবে যে ওই রেক্টাঙ্গুলার স্ক্রিন আর মাউসটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও নিজেই জানে না l দুজনে টুয়েলভ এর পরীক্ষা দিয়ে একজন নিট আর আরেকজন এআইইই পরীক্ষায় বসে l ছাত্র হিসেবে ওরা দুজনেই খুব ভালো আর কঠোর পরিশ্রম করে এই দুটি পরীক্ষার জন্য নিজেদের শখ , আহলাদ , আনন্দ ভুলে প্রস্তুত হয় | আর কথায় আছে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প হয় না। ওরা পছন্দের বিষয় নিয়ে নতুন পড়ার যাত্রাপথ শুরু করে l সুদীর্ঘ বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করতে করতে ওরা একে অন্যের ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠেছিল যেন l কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা , মিলেমিশে বিভিন্ন রেফারেন্স বই কেনা , প্রাইভেট টিউশন , কোচিং এই সব কিছু নিয়ে এই ছেলে মেয়ে দুটির জীবন একদম রকেট গতিতে এগিয়ে চলছিল l
চোখের সামনে দুজনেই দুটি লক্ষ্য ঝুলিয়ে রেখেছিল একজনের ডাক্তার হওয়া আর একজনের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার l মাঝে মাঝে রাহুল অন্যান্য বন্ধুদের সাথে একটু দিকভ্রষ্ট হয়ে দুষ্টুমিতে মেতে উঠলে শ্রুতি তখন ওর কঠিন কঠোর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতো l স্কুলের শিক্ষিকার মত প্রায় জোর করে ওকে পাখির চোখের লক্ষ্যে স্থির করবার গুরু দায়িত্ব নিজের কাৃঁধে তুলে নিয়েছিল l ফলে রাহুলের বাবা মা রাহুলকে নিয়ে খুব নিশ্চিন্তে থাকতেন আর ওদের মধ্যে কার বন্ধুত্বটাকে প্রশ্রয় দিতেন l রাহুলের পরিবারের আদি বাড়ি রাজস্থানের জয়পুর l এই মারোয়াড়ী পরিবারটি তিন পুরুষ আগে ব্যবসার কারণে জলপাইগুড়ি শহরে এসে থিতু হয় l ওনাদের ডুয়ার্সে চারটে চা বাগান আছে l রাহুলের বাবা কাকারা চা বাগান গুলি দেখাশোনা করেন l কিন্তু রাহুলকে এই পারিবারিক ব্যবসা কোনদিনই আকর্ষণ করেনি l তবে স্কুল-কলেজ ছুটি হলেই ওরা সব ভাই-বোনরা মিলে চা বাগানের বাংলোতে চলে যেত। ডুয়ার্সের শান্ত সবুজ চা বাগান ওর ভীষণ প্রিয় l ঢেউ খেলানো চা গাছে ভরা নুড়ি পাথরের রাস্তায় বাবার জিপ গাড়ি নিয়ে ওরা ঘুরে বেড়াতো এ বাগান থেকে সে বাগান l আর ভুটান থেকে নেমে আসা লিস , ঘিস , জলঢাকা , ডায়না নদী গুলি যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলতো --- আয় , আয় ! দেখে যা আমরা কেমন আছি l
পুজোর ছুটি কিংবা বড়দিনের ছুটিতে বাগানে এসে ও দেখতে পেত নদীগুলি একেবারে শীর্ণকায় হয়ে যায় l সেই সময় ওরা নদীতে নেমে স্নান করত l জলে পাথর ছোড়াছুড়ি করত l
ওদিকে শ্রুতির পরিবার একেবারে বিশুদ্ধ মধ্যবিত্ত পরিবার l বাবা ব্যাংক ম্যানেজার আর মা স্কুল শিক্ষিকা । ফলের শ্রুতি এক মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানার ঘেরাটোপে বড় হয়েছে l আর এই মূল্যবোধের জমিতে ওর মননের চাষবাস l শ্রুতি হায়দ্রাবাদ এর একটি বিখ্যাত চোখের হাসপাতালে চাকরি করছে l রাহুল ওই শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক l দুজনেই পিজিতে থাকে ওদের পিজি দুটি শহরের এক প্রান্তে পাশাপাশি ওদের বন্ধুত্বের মতোই বন্ধু হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে l একে অন্যের সুখে দুঃখে শতকরা ১০০ ভাগ আনুগত্য দেখিয়ে সম্পর্ক অটুট রেখে চলেছে l মাঝে মাঝেই ছুটির দিনে শ্রুতি ছোট্ট স্কাইলার্ক পাখি হয়ে যায় আর তখন রাহুলকে হতে হয় ওর ওড়ার আকাশ l দুজনে স্নান সেরে সুন্দর ফিটফাট হয়ে বেরিয়ে পরে l কখনো সালার জং মিউজিয়াম , কখনো চৌমা হাল্লা প্যালেস আবার কখনো ওরা হুসেন সাগরের ধারে বসে টিফিন খেয়ে বাড়ি মানে পিজিতে ফেরে l যতক্ষণ ওরা একসঙ্গে থাকে ওদের বকবকম বকম বিরামহীন ভাবে চলতে থাকে l শহরের আলোকস্তম্ভ গুলি , আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ , ক্যাফেটেরিয়ার ওই কোনের চেয়ার টেবিলটি ও বোধহয় অবাক হয়ে ভাবে এই ছেলে মেয়ে দুটির সম্পর্কের উপচে পড়া জীবনীশক্তির উৎস কি ?
কিন্তু শ্রুতিরা কি আদৌ এই বিষয়টি নিয়ে একবারও ভেবেছে ? নাকি ভাবে -- দেখে তো মনে হয় না , দুজনের কেউ কখনো এই দীর্ঘ একুশ বাইশ বছরের সম্পর্কে রোমান্টিক মুহূর্ত কাটিয়েছে কিনা তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে l ওদের জগত চরাচরে যেন ওড়াতেই আনন্দ , একজন কবিতা পড়ে আর একজন শোনে l এই পড়া আর শোনাতেই সম্পর্কের অস্তিত্বের উলুধ্বনি l আর তার বিস্তার কত গভীর পর্যন্ত কোনোটা নিয়েই ওরা সচেতন নয় কিংবা বলা ভালো ভাববার অবকাশ তৈরি হয়নি l সত্যি কথা বলতে কি ---- এভাবে দুটিতে আছে বেশ l
এবারের দুর্গাপূজায় শ্রুতির বাড়ি যাওয়া হবে না l বেচারী ছুটি পায়নি l প্রত্যেকবার ওরা দুজনে ছুটি পেয়ে দুর্গাপুজোয় জলপাইগুড়ি চলে যায় কিন্তু এবার শ্রুতি যেতে না পারায় রাহুল ও ঠিক করেছে ও যাবে না বাড়ি l শ্রুতি প্রথমে মন খারাপ করে কয়েক দিন রাহুলের কান ঝালাপালা করে কাটালো l কিন্তু পরে অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রাহুলের সঙ্গে প্ল্যান করা শুরু করল পুজোর চারটে দিন কিভাবে কাটাবে? মা , পিসি , মাসিরা সকলে ক্যুরিয়ার করে পুজোর শাড়ি , সlলোয়ার কামিজ পাঠিয়ে দিয়েছেন l ওদিকে রাহুলের ও বাড়ি থেকে কুর্তা পাজামা চলে এসেছে l রাহুলের সাথে মার্কেটে গিয়ে শ্রুতি শাড়ি আর সালোয়ার কামিজের সঙ্গে রং মিলিয়ে হাতের , কানের , গলার কিছু অ্যান্টিক ফ্যাশন জুয়েলারি কিনে ফেলল l চারদিন ধরে দুর্গাপূজা l ফলে চার দিনের সাজগোজ ! ওদিকে রাহুলের তরফ থেকে কোন উচ্চবাচ্য নেই , গায়ে জামা গলালেই যেন হল !
হায়দ্রাবাদের দুর্গাপূজা ওরা কোনদিন দেখেনি , তাই শ্রুতি বেশ উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে l হসপিটালে ওর সিনিয়রম্যাম সেদিন গল্প করছিলেন যে হায়দ্রাবাদের যে বাঙালীরা পাকাপাকিভাবে এখানে থেকে যায় তারা কয়েকটি পূজো মন্ডপে সার্বজনীন দুর্গোৎসবে মেতে ওঠেন l এ রকমই কয়েকটি পূজোর আয়োজক হল বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশন , উৎসব কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন , হায়দ্রাবাদ কালীবাড়ি , হায়দরাবাদ বেঙ্গলী সমিতি , রামকৃষ্ণ মিশন l শ্রুতি চার দিন অর্থাৎ সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত ডিউটির টাইম ম্যামের অনুমতি নিয়ে অন্যান্য কলিগদের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেছে l যার ফলে দুর্গাপূজার আনন্দ উৎসবে সামিল হতে ওর আর কোন বাধা রইল না l সপ্তমী অষ্টমী নবমী -- এই তিন দিন প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ও টের পেল যে হায়দ্রাবাদে কত বাঙালি থাকেন l শুধু বাঙালী কেন অনেক অবাঙালীরা ও এই মহান উৎসবের আনন্দ নিতে বেরিয়ে পড়েছেন ঘর থেকে l একটি প্যান্ডেলে কলকাতা থেকে নামি শিল্পীরা এসেছেন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে l বিভিন্ন প্যান্ডেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে , স্থানীয় শিল্পীরা নাচ গান নাটকের আয়োজন করেছেন l বোঝাই যাচ্ছে যে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বেশ দীর্ঘ সময়ের l অষ্টমীর দিন পিজির কিছু বাঙালী মেয়ে আর রাহুলের সঙ্গে শ্রুতি চলে গেল রামকৃষ্ণ মিশন l
সবুজ গাছে ভরা নুড়ি বিছানো রাস্তা চলে গেছে ঠাকুরদালানে l ওখানে ওরা মায়ের সামনে অঞ্জলী দিল l রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমিক পরিবেশে স্বামীজীর উদাত্ত কণ্ঠের মন্ত্র উচ্চারণে সে এক অনন্য অনুভূতি! শাস্ত্রীয় বিধান ও পবিত্রতা এত সুন্দর ভাবে মেনে চলা হয়েছে যে মনে হচ্ছে এক স্বর্গীয় ঐশ্বরিক পরিবেশে যেন মা দুর্গা স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন , আর তার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে উঠেছে এই ধরাধামে সকল প্রাণীকুল l দুপুরে অমৃত সমান খিচুড়ি প্রসাদ খেয়ে ওরা ফিরে এলো পিজিতে l এভাবে তিন দিন অনেক সাজুগুজু করে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে মা দুর্গার দর্শন হল l কয়েকটি বিখ্যাত বাঙালী হোটেলে বেশ পেট পুরে ভোজন ও হল l শ্রুতির মা দশমীর দিন প্রত্যেকবার মা দুর্গাকে মিষ্টিমুখ করlতে যান জলপাইগুড়িতে পাড়ার প্যান্ডেলে , মা সিঁদুর ছোৃঁয়ান আর ও বই খাতা কলম ঠাকুরদের পায়ে ছোঁয়ায় l কিন্তু হায়দ্রাবাদে তো মা নেই l অবশেষে আবারও রাহুলের শরণাপন্ন হল শ্রুতি l ঠিক হলো সকাল সাড়ে ১১ টায় ওরা দুজনে হায়দ্রাবাদ বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশনের মন্ডপে যাবে মা দুর্গার চরণে বই ছোঁয়াতে l

No comments:
Post a Comment