হরিহরের মাঠ
সূর্যের উদয়-অস্ত দুটোই যখন অফিসে যাওয়া-আসার সময় দেখতে হয়, তখন বাড়ি এসে ঘুম ছাড়া আর খোশগল্প করার মন-মেজাজই থাকে না। আর তার ওপর যদি দায়িত্ব দেওয়া হয় রাতে বাচ্চাকে এই গণিত বা ইংলিশ বুঝাও, তাহলে কী অবস্থা হতে পারে তা বোঝা অতি সহজ। আমার ভাগ্যেও তাই জুটেছে। অতএব, ক্লান্তি আর ঘুমে ঝিমাতে ঝিমাতে আমি সমাস কত প্রকার কী কী পড়াচ্ছি। হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার শৈশবের ব্যাকরণ চর্চা। স্মৃতির অ্যালবামে হাতড়াতে হাতড়াতে একটা কথা মনে পড়ে বেশ হাসি পেল। সেদিন কতগুলো মার খেয়েছি তা মনে নেই, তবে মনের গভীরে সুপ্ত সেই দিনের মারের ব্যথা বেশ টের পাচ্ছি।
মাত্র প্রাথমিক পার করে আমাদের জেলার সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। আমরা গ্রাম থেকে শহরে এলাম আমার পড়াশোনার জন্য। বাবা-মা দুজনই চাকরি করতো বিধায় আমার জন্য প্রাইভেট খোঁজা হতে লাগলো। অবশেষে বাবা তার এক বন্ধুর ছেলে যেখানে কোচিং করে সেখানে আমায় ভর্তি করালেন। গ্রামের এ মাথা থেকে ও মাথা ঘুরে বেড়ানো ছেলেকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার নিবিড় চেষ্টা। সকালে উঠে, খাওয়া-দাওয়া করে, ব্যাগ কাঁধে নিয়ে সারাদিন স্কুল, তারপর বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে কোনোমতে একমুঠো খেয়েই আবার ব্যাগ নিয়ে কোচিং।
এরপরও যদি শান্তি মিলতো। না, আমাকে বাসায় এসে সকল পড়া তৈরি করে পরদিন আবার স্কুল। কখনো কখনো এত পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে খুব মন খারাপ হতো। তারপরও আমি কোচিং যেতাম শুধু একটা কারণেই। কোচিংয়ে আমার সাথে আরও শিক্ষার্থী ছিল এগারো জন। আমি সহ চারজন ছেলে, বাকি মেয়ে। চঞ্চল হওয়ায় সবাই বেশ তাড়াতাড়িই আমার বন্ধু হয়ে ওঠে। একটু দেরি হয়েছিল শুধু মেঘার সাথে বন্ধু হতে। এর কারণও ছিল বেশ।
এভাবেই চলছিল আমার নতুন জীবন।
আজ আকাশে বৈশাখ মাসের ঘনকালো মেঘ জমেছে, তারপরও যথারীতি আমি কোচিংয়ে হাজির। আমাদের ছোট একটা রুমে ক্লাস করানো হতো, তাই বেঞ্চ ছিল ডান পাশে ছেলেদের চারটি, বাম পাশে মেয়েদের চারটি। আমি সবসময় সেকেন্ড বেঞ্চের বাম পাশে বসতাম আর মেঘা বসতো মেয়েদের সেকেন্ড বেঞ্চের ডানে। আর কে কই বসতো তা ঠিক খেয়াল নেই। সারাদিন স্কুল করে ক্লান্ত থাকলেও কোচিংয়ে এসে আমরা সবাই যে যার মতো লাফালাফি, কামড়াকামড়ি, গল্প, তামাশা সবই করতাম। গণিত আর ইংলিশ ক্লাসের পর এখন শেষ বাংলা ক্লাস নেবেন লুৎফর স্যার। স্যার আসতেই আমরা চুপ। পদ পড়িয়ে বচনে যাবেন, এমন সময় কারেন্ট চলে গেলো। বাইরে বিদ্যুৎ চমকানোর আওয়াজ আগে আসলেও এখন তা কালবৈশাখীতে পরিণত হয়েছে।
স্যার বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ পর হাতে একটা মোমবাতি সঙ্গে ভিতরে এসে জানালেন, বাড়ি যাওয়ার মতো উপায় নেই, ঝড় না থামা অব্দি এখানেই থাকতে হবে। আমাদের আতঙ্কিত হওয়া থেকে বাঁচাতে তিনি গল্পের আসর খুলতে বললেন। তিনিই শুরু করলেন গল্প। চোখ বন্ধ করে আমরা সবাই তার গল্প শুনতে লাগলাম। এভাবে স্যারের পর ইভান, সতী, তারপর আমার ঘাড়ে গল্প বলার ভার এলো। ওরা দুজনই বেশ গল্প বলেছে। আমি গাঁয়ের ছেলে, এর মুখ থেকে ওর মুখ থেকে কত গল্পই না শুনেছি। হুট করে আমার মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে গেল। ঠিক করলাম ওদের সবার সাথে মজা নেব। তাই আমি জানালাম, আমি সবার শেষে গল্প বলবো।
কালবৈশাখী তীব্র রূপ ধারণ করেছে। সো-সো বাতাস চারপাশ তছনছ করছে। এরই মাঝে ওদের জানা সবচেয়ে ভয়ের গল্পটাই বলছে সবাই। একেকটা গল্প শুনে আমাদের দাঁতে দাঁত লাগার জোগাড়। প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের রাতে একটা নিভু-নিভু মোমবাতি যেন বর্তমানকেই ভৌতিক করে তুলেছে। থমথমে অবস্থায় এবার আমার গল্প বলার পালা। সকলের চোখ আমার দিকে। মোমবাতিটা আমার সামনে রেখে গলা পরিষ্কার করে গল্প বলতে আরম্ভ করলাম।
“গল্পটা আমার দাদা আমাকে বলেছেন। তিনি তখন হাইস্কুল পাশ করে কলেজে উঠেছেন। দাদার বাবা মারা যাওয়ায় তখন সে বাড়ির একমাত্র পুরুষ। মাকে নিয়ে সে তাদের পৈতৃক গ্রাম ছেড়ে তার নানিবাড়ির গ্রামে এসে উঠেছেন কিছুদিন হলো। খবর এলো তার পৈতৃক গ্রামের বাড়ির ঝড়ে বেহাল দশা। দাদা একা সেখানে সকালে গিয়ে এটা-ওটা ঠিক করতে করতে সন্ধ্যা প্রায় শেষের দিকে। মা বাড়িতে একা বিধায় আজই বাড়ি ফিরতে হবে। পুটলি আর টর্চ হাতে তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
ঝড়ের রাত, তার ওপর অমাবস্যা, টর্চের আলোতেও কিছু হচ্ছে না। দাদা গান গাইতে গাইতে গ্রাম পার করলেন, আরও চার ক্রোশ রাস্তা পাড়ি দিতে হবে হেঁটে। কারণ গরুর গাড়ি এদিকে চলে ঠিকই, তবে আকাশের অবস্থা ভালো না হওয়ায় কোনো গাড়ি নেই। গ্রাম থেকে বেরিয়ে সামনেই পাঁচগায়ের যৌথ কবরস্থান। এখানেই তার বাবাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মা আসার আগে বারবার বলে দিয়েছেন বাবার কবরটা দেখে আসতে। আপন গ্রাম ছেড়ে, বাবার কবর ছেড়ে সেই কোন দূর গ্রামে থাকেন ভেবে দাদা ঠিক করলেন যত রাতই হোক বাবার কবরটা জিয়ারত করে তারপর বাড়ি যাবেন। যুবক পুরুষ, গায়ে রক্ত টগবগ করছে, তাই ভয়-টয় দাদা গ্রাহ্য করলেন না।
কাঁচা রাস্তা ঝড়ের জলে কাদাকাদা হয়ে গিয়েছে। অতি কষ্টে জুতো হাতে নিয়ে দাদা কবরস্থানের সামনে আসতেই গা শিউরে উঠলো তার। ভিতরে ঢুকে তার বাবার কবর খুঁজে নিতে লাগলো ছয় মিনিট। এরই মাঝে বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলো। হঠাৎ হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলকানিতে প্রতিটা কবর যেন জীবন্ত হয়ে উঠতে লাগলো। দাদা কবর জিয়ারত শেষে বের হবেন, এমন সময় তার মনে হলো কে যেন তাকে দেখছে।”
বলে আমি থামলাম। ওরা সবাই হাত শক্ত করে ধরে চুপ করে চোখ বন্ধ করে আমার গল্পে নিজেদের সেই কবরস্থানে উপস্থাপন করে ভাবছে। ঝড়ের বেগ বেড়েই চলেছে, মোমবাতিরও অর্ধেক শেষ। পানি খেয়ে নিয়ে আমি আবার শুরু করলাম।
“দাদার মনে হলো কে যেন তাকে দেখছে। টর্চ দিয়ে চারিদিক ভালো করে দেখলেন। না, কেউ কোথাও নেই। তিনি কবরস্থান থেকে বের হয়ে আবার কাদাময় রাস্তা দিয়ে হাঁটা ধরলেন। একটু যেতেই দাদা অনুভব করলেন কে যেন তার পিছু নিয়েছে। ঝড়ের পূর্বের তীব্র ঠান্ডা বাতাসে দাদার হাত-পা কাঁপতে লাগলো।
তবে তিনি যদি জানতেন কী হতে চলেছে, তাহলে বোধ হয় কাছের কোনো গৃহস্থের বাড়িতে আশ্রয় নিতেন। কারণ সামনেই হরিহরের মাঠ। দু ক্রোশ বিস্তৃত মাঠ, কোনো জনমানব নেই। মাঠ পেরুলেই বাড়ি, তবে মানুষের মুখে অনেক বাজে কথা শুনেছে সে এ মাঠের সম্পর্কে। কোনো জমিদার হোক বা ডাকাত হোক, মানুষ মেরে সবাই এই মাঠেই পুঁতে রাখে। এ থেকেই মানুষের মুখে মুখে সত্যি বা মিথ্যা ভয়ের গল্প।
খোলা মাঠের মধ্যে দিয়ে সরু সে রাস্তা যতদূর চোখ যায় কোনো বাড়ি নেই। বাড়ি থাকলেই বা কী, গাঁয়ের চাষাভুষো লোক সন্ধ্যা হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। যদিওবা কেউ নেশা বা তাসে আসক্ত থাকে, আজ সেও এই ঝড়ের রাতে নাকে তেল দিয়ে ঘুমচ্ছে। গায়ে চাদর জড়িয়ে তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে হাঁটতে লাগলেন।
না, দাদা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছেন তার পেছনে কার যেন পায়ের শব্দ আসছে। তিনি পিছনে আলো দিয়ে দেখলেন। কোথাও কিচ্ছু নেই। দাদা ভাবলেন মনের ভুল।
দাদা এর আগেও রাতে এপথ পার করেছেন, তবে আজ যেন সব কিছু কেমন স্তব্ধ হয়ে আছে। তিনি আবার হাঁটা দিলেন। বিদ্যুৎ চমকানিতে সারা মাঠ মুহূর্তের ভিতর সাদা হয়ে যাচ্ছে। আবার সেই অন্ধকার, স্তব্ধতা হঠাৎ ফরসাকে ভয়ংকর করে তুলছে। তিনি কোনোদিকে না তাকিয়ে হাঁটছেন আর হাঁটছেন। আর বুঝি এক ক্রোশ, আর বুঝি আধ ক্রোশ, এমন সময় তিনি অনুভব করলেন তার ঘাড়ে কে যেন নিশ্বাস ফেলছে।
তিনি এবার রাগ করে বললেন, ‘কে আপনি? আমায় বিরক্ত করছেন কেন? সামনে আসেন।’
কোনো উত্তর নেই। তিনি আবার বললেন, ‘কী হলো, সাড়া দিচ্ছেন না কেন? সামনে আসেন।’
এবারও কোনো উত্তর নেই। দাদা ডানে-বায়ে তাকাতে তাকাতে খুব সতর্কতার সাথে যাত্রা শুরু করলেন। এরপরই হলো আসল ঘটনা।”
আমি থেমে গেলাম। সবাই অধীর আগ্রহে আমার গল্প শুনছে, মোমবাতি প্রায় শেষ। সবাই ক্লাইম্যাক্সে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে। জিজ্ঞেস করতে লাগলো, “বল, বল। বল না কী হলো।”
আমি হো হো করে হেসে বললাম, “কী আবার হবে গাধার দল। দাদা বাসায় চলে এসেছে। তারপর মায়ের হাতের খাবার খেয়ে মনের সুখে...”
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই আমার ঘাড়ে, পিঠে যে যার মতো পারে ততগুলো চর-থাপ্পড় মারতে লাগলো। আমার হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলো। শেষে মেঘাও আমায় প্রথমবারের মতো খুব করে একটা মাথায় গাট্টা মেরেছিল। এখনো প্রায়ই আমায় ওর গাট্টা খেতে হয়।

No comments:
Post a Comment