Friday, October 9, 2026


 



 


সিঁদুরে লাল দশমী 

দেবযানী চক্রবর্তী 


শ্রুতি আর রাহুল ---  দুই বন্ধু বান্ধবী একসঙ্গে স্কুলে পড়া শুরু সেই নার্সারি থেকে l  তারপর একের পর এক ক্লাস টপকে টপকে  টুয়েলভ পর্যন্ত একসঙ্গে একই স্কুলে পড়াশোনা  l  শ্রুতির ইচ্ছে ডাক্তার হওয়ার আর রাহুল ছোট্টবেলা থেকেই বাবার কম্পিউটার নাড়াচাড়া করতে করতে কবে যে ওই রেক্টাঙ্গুলার স্ক্রিন আর মাউসটাকে ভালোবেসে ফেলেছিল ও নিজেই জানে না l  দুজনে টুয়েলভ এর পরীক্ষা দিয়ে একজন  নিট আর আরেকজন  এআইইই  পরীক্ষায় বসে  l  ছাত্র হিসেবে ওরা দুজনেই খুব ভালো আর কঠোর পরিশ্রম করে  এই দুটি পরীক্ষার জন্য নিজেদের শখ  , আহলাদ ,  আনন্দ ভুলে প্রস্তুত হয় | আর কথায় আছে কঠোর পরিশ্রমের বিকল্প হয় না। ওরা পছন্দের বিষয় নিয়ে নতুন পড়ার যাত্রাপথ শুরু করে l  সুদীর্ঘ বছর একসঙ্গে পড়াশোনা করতে করতে ওরা একে অন্যের ছায়া সঙ্গী হয়ে উঠেছিল যেন  l  কঠিন কঠিন বিষয় নিয়ে আলোচনা , মিলেমিশে বিভিন্ন রেফারেন্স বই কেনা ,  প্রাইভেট টিউশন ,  কোচিং এই সব কিছু নিয়ে এই ছেলে মেয়ে দুটির জীবন একদম রকেট গতিতে এগিয়ে চলছিল l

চোখের সামনে দুজনেই দুটি লক্ষ্য ঝুলিয়ে রেখেছিল একজনের ডাক্তার হওয়া আর একজনের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার  l  মাঝে মাঝে রাহুল   অন্যান্য বন্ধুদের সাথে একটু দিকভ্রষ্ট হয়ে দুষ্টুমিতে মেতে উঠলে  শ্রুতি তখন  ওর কঠিন কঠোর অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতো  l স্কুলের শিক্ষিকার মত প্রায় জোর করে ওকে পাখির চোখের  লক্ষ্যে   স্থির  করবার গুরু দায়িত্ব নিজের কাৃঁধে তুলে নিয়েছিল  l ফলে রাহুলের বাবা মা রাহুলকে নিয়ে খুব নিশ্চিন্তে থাকতেন আর ওদের মধ্যে কার বন্ধুত্বটাকে   প্রশ্রয় দিতেন l  রাহুলের পরিবারের আদি বাড়ি রাজস্থানের  জয়পুর l  এই মারোয়াড়ী পরিবারটি তিন পুরুষ আগে ব্যবসার কারণে জলপাইগুড়ি শহরে এসে   থিতু হয়  l  ওনাদের ডুয়ার্সে  চারটে চা বাগান আছে  l  রাহুলের বাবা কাকারা চা বাগান গুলি দেখাশোনা করেন l   কিন্তু রাহুলকে এই পারিবারিক ব্যবসা কোনদিনই আকর্ষণ করেনি  l তবে স্কুল-কলেজ ছুটি হলেই ওরা সব ভাই-বোনরা মিলে চা বাগানের বাংলোতে চলে যেত। ডুয়ার্সের শান্ত সবুজ চা বাগান ওর ভীষণ প্রিয় l  ঢেউ খেলানো  চা  গাছে ভরা নুড়ি পাথরের রাস্তায় বাবার জিপ গাড়ি নিয়ে ওরা ঘুরে বেড়াতো এ বাগান থেকে সে বাগান l   আর ভুটান থেকে নেমে আসা লিস ,   ঘিস ,  জলঢাকা  , ডায়না নদী গুলি যেন ওর কানে কানে ফিসফিস করে বলতো ---  আয়  , আয় ! দেখে যা আমরা কেমন আছি l

পুজোর ছুটি কিংবা বড়দিনের ছুটিতে বাগানে এসে ও দেখতে পেত নদীগুলি  একেবারে   শীর্ণকায় হয়ে যায়  l   সেই সময় ওরা নদীতে নেমে স্নান করত  l  জলে  পাথর ছোড়াছুড়ি করত l  

ওদিকে শ্রুতির পরিবার একেবারে বিশুদ্ধ মধ্যবিত্ত পরিবার l   বাবা ব্যাংক ম্যানেজার আর মা স্কুল শিক্ষিকা । ফলের শ্রুতি এক মধ্যবিত্ত বাঙালিয়ানার ঘেরাটোপে বড় হয়েছে l   আর এই মূল্যবোধের  জমিতে ওর মননের চাষবাস  l   শ্রুতি হায়দ্রাবাদ এর একটি বিখ্যাত চোখের হাসপাতালে চাকরি করছে l  রাহুল ওই শহরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক  l  দুজনেই পিজিতে থাকে ওদের পিজি দুটি শহরের এক প্রান্তে পাশাপাশি ওদের বন্ধুত্বের মতোই বন্ধু হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে  l  একে অন্যের সুখে দুঃখে শতকরা ১০০ ভাগ আনুগত্য দেখিয়ে সম্পর্ক অটুট রেখে চলেছে  l  মাঝে মাঝেই ছুটির দিনে শ্রুতি  ছোট্ট  স্কাইলার্ক  পাখি হয়ে যায় আর তখন রাহুলকে হতে হয়  ওর ওড়ার  আকাশ  l  দুজনে স্নান সেরে সুন্দর ফিটফাট হয়ে বেরিয়ে পরে  l  কখনো সালার জং মিউজিয়াম  , কখনো চৌমা হাল্লা প্যালেস  আবার কখনো ওরা   হুসেন সাগরের ধারে বসে টিফিন খেয়ে বাড়ি মানে পিজিতে ফেরে l   যতক্ষণ ওরা একসঙ্গে থাকে ওদের বকবকম বকম বিরামহীন ভাবে চলতে থাকে  l  শহরের আলোকস্তম্ভ গুলি  , আকাশের নক্ষত্রপুঞ্জ , ক্যাফেটেরিয়ার ওই কোনের চেয়ার টেবিলটি ও বোধহয় অবাক হয়ে ভাবে এই ছেলে মেয়ে দুটির সম্পর্কের উপচে পড়া  জীবনীশক্তির উৎস কি ?

কিন্তু শ্রুতিরা কি আদৌ এই বিষয়টি নিয়ে একবারও ভেবেছে  ? নাকি ভাবে  -- দেখে তো মনে হয় না ,   দুজনের কেউ কখনো এই দীর্ঘ একুশ বাইশ বছরের সম্পর্কে  রোমান্টিক  মুহূর্ত কাটিয়েছে কিনা  তাতে  যথেষ্ট সন্দেহ আছে  l   ওদের জগত চরাচরে যেন ওড়াতেই আনন্দ  ,  একজন কবিতা পড়ে আর একজন শোনে  l  এই পড়া  আর শোনাতেই সম্পর্কের  অস্তিত্বের   উলুধ্বনি  l   আর তার বিস্তার কত গভীর পর্যন্ত  কোনোটা নিয়েই ওরা সচেতন নয় কিংবা বলা ভালো ভাববার অবকাশ তৈরি হয়নি  l   সত্যি কথা বলতে কি ----  এভাবে দুটিতে আছে বেশ l  

এবারের দুর্গাপূজায় শ্রুতির বাড়ি  যাওয়া হবে না  l  বেচারী  ছুটি পায়নি l  প্রত্যেকবার ওরা দুজনে ছুটি পেয়ে দুর্গাপুজোয় জলপাইগুড়ি চলে যায় কিন্তু এবার শ্রুতি যেতে না পারায় রাহুল ও ঠিক করেছে ও যাবে না বাড়ি  l  শ্রুতি প্রথমে মন খারাপ করে কয়েক দিন রাহুলের কান ঝালাপালা করে কাটালো l  কিন্তু পরে অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে রাহুলের সঙ্গে প্ল্যান করা শুরু করল পুজোর চারটে দিন কিভাবে কাটাবে? মা , পিসি  , মাসিরা সকলে ক্যুরিয়ার করে পুজোর শাড়ি ,  সlলোয়ার কামিজ পাঠিয়ে দিয়েছেন  l ওদিকে রাহুলের ও বাড়ি থেকে কুর্তা পাজামা চলে এসেছে l   রাহুলের সাথে মার্কেটে গিয়ে শ্রুতি শাড়ি আর সালোয়ার কামিজের সঙ্গে রং মিলিয়ে হাতের ,  কানের  , গলার কিছু অ্যান্টিক ফ্যাশন জুয়েলারি কিনে ফেলল  l চারদিন ধরে দুর্গাপূজা  l ফলে চার দিনের সাজগোজ  !  ওদিকে রাহুলের তরফ থেকে কোন উচ্চবাচ্য নেই  , গায়ে জামা গলালেই যেন হল !

 হায়দ্রাবাদের দুর্গাপূজা ওরা কোনদিন দেখেনি , তাই শ্রুতি বেশ উত্তেজিত ভেতরে ভেতরে  l  হসপিটালে ওর সিনিয়রম্যাম সেদিন   গল্প করছিলেন যে হায়দ্রাবাদের যে বাঙালীরা পাকাপাকিভাবে এখানে থেকে যায় তারা কয়েকটি পূজো মন্ডপে সার্বজনীন দুর্গোৎসবে মেতে ওঠেন  l  এ রকমই কয়েকটি পূজোর আয়োজক হল  বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশন  , উৎসব কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন  , হায়দ্রাবাদ কালীবাড়ি ,  হায়দরাবাদ বেঙ্গলী সমিতি  , রামকৃষ্ণ মিশন l  শ্রুতি চার দিন অর্থাৎ সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত ডিউটির টাইম ম্যামের অনুমতি নিয়ে অন্যান্য  কলিগদের সঙ্গে পরিবর্তন করে ফেলেছে  l  যার ফলে  দুর্গাপূজার আনন্দ উৎসবে সামিল হতে ওর  আর কোন বাধা রইল না  l  সপ্তমী অষ্টমী নবমী  --  এই তিন দিন   প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে ও টের পেল যে হায়দ্রাবাদে কত বাঙালি থাকেন   l শুধু বাঙালী কেন অনেক অবাঙালীরা ও এই মহান উৎসবের আনন্দ নিতে বেরিয়ে পড়েছেন ঘর থেকে  l  একটি প্যান্ডেলে  কলকাতা থেকে নামি   শিল্পীরা এসেছেন অনুষ্ঠানে যোগদান করতে   l  বিভিন্ন প্যান্ডেলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে  , স্থানীয় শিল্পীরা নাচ গান নাটকের আয়োজন করেছেন  l  বোঝাই যাচ্ছে যে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি বেশ দীর্ঘ সময়ের l  অষ্টমীর দিন পিজির কিছু বাঙালী মেয়ে আর রাহুলের সঙ্গে শ্রুতি চলে গেল রামকৃষ্ণ মিশন l

সবুজ গাছে ভরা নুড়ি বিছানো রাস্তা চলে গেছে ঠাকুরদালানে  l  ওখানে ওরা মায়ের সামনে অঞ্জলী দিল l  রামকৃষ্ণ মিশনের   আশ্রমিক পরিবেশে  স্বামীজীর উদাত্ত কণ্ঠের মন্ত্র উচ্চারণে সে এক অনন্য অনুভূতি!  শাস্ত্রীয় বিধান ও পবিত্রতা এত সুন্দর ভাবে মেনে চলা হয়েছে যে মনে হচ্ছে এক স্বর্গীয় ঐশ্বরিক পরিবেশে যেন মা দুর্গা স্বয়ং উপস্থিত হয়েছেন  , আর তার আশীর্বাদ ধন্য হয়ে উঠেছে এই ধরাধামে সকল প্রাণীকুল l  দুপুরে অমৃত সমান খিচুড়ি প্রসাদ খেয়ে ওরা ফিরে এলো পিজিতে  l  এভাবে তিন দিন  অনেক সাজুগুজু করে  প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে মা দুর্গার  দর্শন হল l   কয়েকটি বিখ্যাত বাঙালী হোটেলে বেশ পেট পুরে ভোজন ও হল l  শ্রুতির মা দশমীর দিন প্রত্যেকবার মা দুর্গাকে মিষ্টিমুখ  করlতে যান জলপাইগুড়িতে পাড়ার প্যান্ডেলে ,  মা সিঁদুর ছোৃঁয়ান আর ও বই খাতা কলম ঠাকুরদের পায়ে ছোঁয়ায়  l  কিন্তু হায়দ্রাবাদে  তো মা নেই l  অবশেষে   আবারও রাহুলের শরণাপন্ন হল শ্রুতি l  ঠিক হলো সকাল সাড়ে ১১ টায় ওরা দুজনে হায়দ্রাবাদ বেঙ্গলী কালচারাল এসোসিয়েশনের মন্ডপে যাবে মা দুর্গার চরণে  বই  ছোঁয়াতে l

প্ল্যান অনুযায়ী শ্রুতি পেতলের  ট্রেতে বই  , খাতা , কলম আর মিষ্টি নিয়ে তৈরি হলো l  পরনে মায়ের চওড়া লাল পাড় জরির নকশা কাটা তসরের শাড়ি আর লাল টুকটুকে ব্লাউজ l  মানানসই   সেই হালকা গয়না ও পড়েছে l  আর ঢেউ খেলানো কোমর অব্দি চুল খোলা অবস্থায় পিঠে লুটোপুটি খাচ্ছে  l  ওরা দুজনে এবার চলে এলো মন্ডপে  l  বাঙালি মহিলারা মা দুর্গাকে সিঁদুর নিবেদন করছেন একে একে ,  তারপর নিজেরা একে অন্যকে সিঁদুর পরিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়ে মিষ্টিমুখ করছেন l  এভাবেই প্রত্যেকবারের মতো  দুর্গোৎসবের সমাপ্তি ঘটলো এই দশমীর দিন  l  শেষ এই দিনটিতে এক আবেগ ঘন পরিবেশ   ছেয়ে আছে সমস্ত মণ্ডপটিতে l  শ্রুতি মা দুর্গা আর সব ঠাকুরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে বই খাতা কলম তাদের পায়ে ছুঁইয়ে প্রণাম করল  l  রাহুল শ্রুতিকে পুরো ব্যাপারটাতে সঙ্গ দিল  l এবার পিজিতে ফেরার পালা  l মা দুর্গাকে আবার সামনের বছরের নিমন্ত্রণ জানিয়ে ওরা মণ্ডপের বাইরে বেরিয়ে এলো  l  শ্রুতি রাহুলকে ওলা কিংবা উবের এর কথা জিজ্ঞেস করবে বলে ওর দিকে তাকাতেই দেখে রাহুল ওর দিকেই  এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন দেখছে  , আর  একটু অন্যমনস্ক  ও  !  শ্রুতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ---  কি হলো রে? কিছু ভুলে গেলি নাকি  ? রাহুল স্থির দৃষ্টিতে   শ্রুতির দিকে তাকিয়ে থেকেই বলল ---   হ্যাঁ  ,  সিঁদুর ,  চল বিয়ে করি l  তোর কপালটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগছে  !

No comments:

Post a Comment