শুভ বিজয়া
ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য
বহুদিন পর বাড়িটায় এল সেবন্তী। বড় রাস্তা থেকে অনেকটা ঢালু অপরিসর গলিপথে নেমে বাঁয়ে ঘুরে দু’পা হাঁটতেই দোতলা হলুদরঙা বাড়ি। সামনে ছোট লোহার গেট। তারপর জিগজ্যাগ নকশার সাদা গ্রীলঘেরা বারান্দা। এই বারান্দা পেরিয়েই বাড়িতে ঢুকতে হত একসময়।
বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে সেবন্তীর। এত দ্রুত চলে গেল দিনগুলো! চোখ বুজলেই তো পাড়া মাথায় করা চেঁচামেচি, কপট কলহ আর মেজাজি আড্ডার সেই দারুণ উদাত্ত কলরোল এখনও স্পষ্ট শুনতে পায় সে!
“ সুবু, এলি? গেটের আওয়াজ শুনলাম যেন!”
চমকে বাস্তবে ফেরে সেবন্তী। ঘাড় হেলিয়ে তাকায় ওপরে। বড় জেঠিমা। শীর্ণ শিরাজর্জর দু’হাতে জানালার গ্রীল আঁকড়ে প্রবল আগ্রহে তাকিয়ে আছে নীচের দিকে। ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ। তাই কানের ভরসায় মানুষ চেনার আপ্রাণ চেষ্টা।
সেবন্তী হাত নেড়ে বিষন্ন হাসে। পাশের ছোট দরজা ঠেলে সিঁড়িতে পা দেয়। ঘোরানো লাল সিমেন্টের চার থাকের সিঁড়ি। পা ভারী হয়ে আসে উঠতে উঠতে। সারা বাড়িময় রাক্ষুসে শূন্যতা বিশাল হাঁ করে যেন গিলতে আসছে তাকে।
“ আয়, আয়!”
চোখ তুলতেই দোতলার সিঁড়ির মাথায় দেখা যায় জেঠিমাকে। চিরকালের শক্তপোক্ত ছোট্ট চেহারার মিষ্টিমুখী মানুষটা আজ বেঁকেচুরে দাঁড়িয়ে আছে হাতের লাঠিতে ভর করে। ভাঙা শরীর জুড়ে ফেলে আসা অতীতের নির্দয় ছাপ।
“ শুভ বিজয়া মনিমা!”, দ্রুত উঠে এসে রমলাদেবীর পা ছুঁয়ে প্রণাম করে সেবন্তী।
শীর্ণ দু’হাতে সেবন্তীকে বুকের মধ্যে সজোরে আঁকড়ে ধরেন রমলাদেবী। মুহুর্তে বুঝি বদলে যায় গোটা পৃথিবী! জমজমাট বিজয়ার সন্ধের সেইসব উচ্ছ্বল হাসি, হুল্লোর, আনন্দ কোন জাদুবলে নিমেষে যেন ঝলসে ওঠে চোখের সামনে! আঃ! সুখসময়ের গোটাটাই তাহলে ভ্যানিশ হয়ে যায়নি! বাড়ির পড়ে থাকা মানুষদুটোর বুকের গোপনতম কুঠুরিতে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে আজও!
থাক। বাস্তবে নয় নাই হল, বচ্ছরকার দিনের শুভস্মৃতিটুকু এভাবেই নাহয় চিরঅক্ষয় হয়ে থাকুক তাদের তৃষ্ণার্ত বুকদুটোর মধ্যে। আহা, এও যে পরম পাওয়া!

No comments:
Post a Comment