Monday, January 12, 2026


 

লহো প্রণাম 

মিত্রা রায় চৌধুরী

চারিদিকে অবক্ষয়ের ছবি। ধনী-দরিদ্র শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে মানবিকতা শৌর্য্য, ধৈর্য সহিষ্ণুতা হারিয়ে ফেলেছে। এখনো মানুষ জাত পাতের ঘেরাটোপে বন্দি। আমরা ভুলেই গেছি স্বামীজীর আত্মত্যাগের কথা। ভারতের ঘরে ঘরে আলো জ্বালাতে চেয়েছিলেন স্বামীজি ,। সেই কাজ করতে গিয়ে   পদব্রজে ভারত ভ্রমণ করে তিনি ভারত তথা ভারতবাসীকে জেনেছেন। নিরন্ন মূর্খ দরিদ্র ভারতবাসী র সামগ্রিক উন্নতিকল্পে নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে,   নিজের জীবনই শক্তিকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়ে অসময়ে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছেন।

                                   আমরা তারই উত্তর সুরি রা তাকে নিরাশ করেছি। দিকভ্রষ্ট যুবসমাজ। আমরা তার আদর্শকে সত্যি কি অন্তরের স্থান দিয়েছি? তার জন্মদিন আসলে আমরা তার ছবিকে ফুলমালা দিয়ে সাজাই স্মরণসভা করি এতেই আমাদের দায় শেষ। 

 এই স্মরণ কি সত্যিই স্মরণ।! আত্মতুষ্টির নীরব আয়োজন।নিজেদেরকে বিবেকের সামনে দাঁড় করাই না। বিবেকানন্দ মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখেছিলেন আমরা সেটা দেখতে ভয় পাই তাই নীরব থেকে সব অন্যায়ের সাথে আপোষ করে নেই।

                                  ভারতবর্ষের যথেষ্ট উন্নয়ন হয়েছে কিন্তু সংবেদনশীলতা কমেছে তাই আমরা লজ্জা পাই না। ক্ষুধার্ত অসুস্থ মানুষ দেখলে পাশ কাটিয়ে চলে যাই। তাদের আমরা বোঝা বলে ভাবতে শিখেছি। যেশক্তিকে স্বামীজি ধারণ করতে বলেছিলেন সে শক্তি আমরা আত্মস্থ করেছি ঠিকই কিন্তু তা হয়ে গেছে দুর্বলতার নগ্ন প্রকাশ।   

            স্বামীজি কি তো একবার নয় বারবার বলেছিলেন ভারতবাসীর মঙ্গল সাধনের নিমিত্ত আমি বারংবার মনুষ্য জন্ম লাভ করতে রাজি আছি। স্বামীজি এই সামাজিক চূড়ান্ত অবক্ষয়ের সময়ে তোমাকে আমাদের খুব প্রয়োজন। 

                                   লহ প্রণাম 

           মধ্য গগনে সূর্য সম  দীপ্তমান

           সুঠাম দেহ বলিষ্ঠ গড়ন

           মানবপ্রেমী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক 

            সপ্ত ঋষির এক ঋষি।

           গুরুর একান্ত আহবানে 

          ধরাধামে পদার্পণ।

       তার নির্দেশ মতো চলা শুরু 

          চলতে চলতে সব জঞ্জাল অপসারণ 

        মানব কল্যানে  কৃচ্ছ সাধন।

       নিজেকে নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে

       নিরন্ন মূর্খ দরিদ্র ভাই বোনেদের

        মা নসিক জাগরনের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা।

        গেরুয়া বসনধারী দীপ্ত ভঙ্গিতে প্রকট 

         সকলেরই আদর্শ স্বরপ,

 ক্ষন জন্মা পুরুষ শ্রেষ্ঠ বীর সন্তান 

          তোমাকে জানাই মন

              ভুলুন্ঠিত প্রণাম।

                                          


 

বিবেকানন্দ
 স্ব প ন  গা য়ে ন


সূর্যের আলোয় চড়ে আসছে এক মহাপুরুষ 
হৃদয়ের ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখি সেই ছবি 
আঁধারে পেরিয়ে যায় এক আলোকবর্ষ।

কন্যাকুমারীকার মাটি আজও কথা বলে বিবেকের 
জাতি ধর্মের উর্ধে উঠে বলেছেন জীবনের রূপকথা
কোনো মানুষ ছোটো নয় -
সপ্তর্ষিমন্ডলের মতো উজ্বল মহামানব।

অপমান অসম্মান হেনস্থার জবাব দিতেন অনায়াসে 
অলৌকিক অন্ধকারে তিনি কখনোই ডুবে যাননি 
শরণাগত যুগপুরুষের আর এক নাম বিবেকানন্দ।

Thursday, January 8, 2026


 

পৌষালী

আরাত্রিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আমার উত্তর খোলা জানলা,
পৌষের এই অন্তরঙ্গ দুপুরবেলা—
রোদের পিঠে আলসেমি মেখে
স্মৃতিদের সব লুকোচুরি খেলা।
পৌষের আকাশ বড্ড উদাস,
জানালা জুড়ে রোদের মায়া।
নির্জন এই মনের কোণে 
পড়ছে তোমার চেনা ছায়া।

(ছবি- শৌভিক রায়) 

Tuesday, January 6, 2026


 

তুবড়ি

মনীশ সরকার

প্রথম পর্ব:

সময় টা ২০০৩ সাল। খুব একটা খারাপও যেমন নয়, তেমন খুব যে ভালো কিছু হচ্ছে তাও না। পশ্চিমবঙ্গে এখন উৎসবের মরশুম। আসলে উৎসব তো প্রত্যেক বছরই হয়, কিন্তু এই উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার হলো আতশবাজি। শুধু শ্রাদ্ধ শান্তি ছাড়া বাকি সব কাজে এই আতশবাজি আমাদের বাংলার এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু বাজি বললে তো শুধু শব্দ বা আলোর রোশনাই দেখলে হবে না, তার উৎস কোথায় সেটাও জানতে হয়। আতশবাজি প্রায় পুরো ভারত তথা আমাদের গ্রাম বাংলার অনেক জায়গায় তৈরি হয়, কিন্তু হারাল নামে জায়গা টি বাংলার মানুষ দের জন্য খুবই চেনা একটা স্থান। হারাল হচ্ছে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার চাম্পাহাটি তে অবস্থিত এবং এই জায়গাটি আতশবাজির জন্য সমস্ত বাংলায় পরিচিত। এখানে ছোট বড় মাঝারি সকল প্রকার মানুষ বাজি বানাতে পটু। আর এই বাজির যখন কথা হচ্ছে তার মধ্যে তুবড়ি র কথাও বলতে হয়। তুবড়ি আমি আমার মামা-কে দেখেছি কী ভাবে বানাতে হয়, কিন্তু সেটা যে অতীব নিম্ন মানের হয় সেটা তার অগ্নি সংযোগের পর বোঝা যায়। তবে আমি বলছি তুবড়ি রাজা অলোক স্যামুয়েল মণ্ডলের কথা। তুবড়ি রাজা এই কারণে বলা, যে ওর বানানো তুবড়ি যেমন গুনে ভালো তেমনি তার শক্তি। অর্থাৎ আতশবাজির কম্পিটিশনে এ এস মণ্ডলের বাজির তুলনা হয় না। এই পর্যন্ত কোনোটাতে তে প্রথম কোনোটাতে দ্বিতীয় স্থান নিয়ে তবে ফিরেছে। তবে অলোক যে শুধুই বাজি বানায় তা নয়, বছরের বাকি দিনগুলো ভ্যান রিক্সা চালিয়ে তার পরিবার চালায়। তার পরিবারে আছে একজন স্ত্রী, দু ছেলে আর একটা মেয়ে। প্রথম ছেলের বয়স খুব বেশি হলে সাত হবে, বাকি দুটো যমজ বলে দুজনেরই পাঁচ বছর হয়েছে। পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় না থাকলেও বেশ কাটছে এই পাঁচটা মানুষের জীবন। বড়ো ছেলেকে সবে গ্রামের সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছে। তাই পড়াশোনার সাথে ওর খাওয়ার ব্যাপারটা ওখানেই হয়ে যায়।মানে ইস্কুলে মিড ডে মিল এর ব্যবস্থার জন্য একজনের পেট আপাতত ঠিক ভাবে চলছে, বাকি চারজন তাই বেশ সুখেই কাটাচ্ছে। অলোকের বাড়ি আসলে ঠিক বাড়ি বলা চলে না। কারণ জায়গাটা দখলের, তার ওপর ঝুপড়ি বাড়ির কটা টালি আর বাঁশের বেরা দিয়ে প্লাস্টিকে মোরা একটা ঘর। ঘরে আছে বাচ্চা দের ঘুমনোর জন্য একটা চকি আর চাটাই , মা বাবা দুজনেই নিচে মাটিতে আরেকটা চাটাই পেতে ঘুমোয়। তাও তিন বেলার ভাত ডাল হয়ে যায়। সরকারি সাহায্য বলতে রেশনের ব্যাবস্থা টা এখনও হয়ে ওঠেনি বলে একটু অসুবিধা তো আছেই। তার জন্য অবশ্য অলোক কাছের গির্জার ফাদার কে বলেছে, সেটাও বোধয় হয়ে যাবে। যাই হোক অলকের পরিবার মোটামুটি খেয়ে পরে ঠিকঠাক চলছে।

দ্বিতীয় পর্ব:

পঞ্চায়েত অফিসে এখন খুব তোড়জোড় শুরু হয়েছে, গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধান আজ সকাল বেলা আসবে বলে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছে। সেখানে গ্রামের বাচ্চাদের থেকে সম্বর্ধনা প্রদান, আঁকার প্রতিযোগিতা, আর একটু গ্রাম উন্নয়নের ব্যপারে বক্তৃতা হবে। দিনের যা অনুষ্ঠান হওয়ার তা বেশ ভালো ভাবেই হলো। কিন্তু আসল অনুষ্ঠান তো হবে দুই দিন পরে রাতে। পঞ্চায়েত প্রধানের আগমনের খুশিতে বাজি প্রদর্শনী হবে ওই দিন। সেখানে হারালের তাবর সব বাজির পসরা নিয়ে হাজির হবে এক এক জন মহারতি। সেখানেই ডাক পেল অলোক এস মন্ডল, সেখানে তার তুবড়ি দেখাতে হবে। অলোক শুনে খুব খুশি হলো। যে এতবড় মানুষের সামনে তার পটুতা দেখাতে হবে। তাই সে তার সমস্ত অভিজ্ঞতা দিয়ে বেশ কটা তুবড়ি বানালো এবং ওইদিন তার তুবড়ি র আলো যখন চারিদিকে ছড়ালো গ্রামের সকল মানুষ অলোকের নামে হাত তালি দিল, শুধু তাই নয় পঞ্চায়েত প্রধান নিজে গিয়ে অলোকের হাত ধরে পাঁচটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে বলল, আমার ছেলের বিয়েতে তোমাকেই তুবড়ি বানিয়ে জ্বালাতে হবে। তারপর অলোক স্যামুয়েল মন্ডল কে দেখে কে। বাড়িতে সেদিন রাতের বেলা ডাল ভাতের শেষে একটু মিষ্টি খেলো সকলে। অলোকের বউ অবশ্য আবদার করলো, "এবার কিন্তু কালী পুজোয় ময়দানে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে, আর আমরা ওইদিন মোগলাই পরোটা খাবো, রাতে কিন্তু আর রান্না করবো না আমি।" হঠাৎ চারিদিকে তার নাম হয়ে গেলো। বাড়ির অনুষ্ঠান হোক আর পুজোর আতশবাজি প্রতিযোগিতা হোক এ এস মণ্ডলের তুবড়ি চাই চাই। বেশ ভালই অলোকের দিন কাটছে। অলোক এখন আর লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরে না, ও এখন প্লিট করা প্যান্ট আর পুরো হাতা জামা পরে। এখন আর অলোক ভ্যান রিক্সাও চালায় না। কারণ ও জানে যে ওটা না চালালেও ওর পরিবারের কোন অসুবিধা হবে না। ধীরে ধীরে পুরনো টালির চাল টিনের চাল হলো, বাঁশের বেড়া থেকে মাটির দেওয়াল হলো এবং নিজের জন্য একটা ছোট্ট বাজি তৈরির ঘর ঠিক রান্না ঘরের পিছনে তৈরি করলো। কি নেই সেখানে , ছোট থেকে বড় হাড়ি, বারুদ, কাঠ কয়লা, ফসফরাস, লোহার কুচি, ও আরো কত কিছু।এখন প্রায় দিন ওকে বিভিন্ন লোকের অর্ডার এর তুবড়ি বানাতে হয়। আয় উপার্জন বেশ ভালই হচ্ছে। অলোকের বউ পাড়ায় খুব মেজাজে ঘোরে, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে, " অলোক কে বেশি দেখা যায় না তো আর পাড়ায়, কোথায় থাকে সে এখন, মাথা উচু করে বলে অনেক কাজ পড়েছে ওর , খুব ব্যস্ত ।"এদিকে পরিবারের সুখী দিন যেনো বউ বাচ্চা র চেহারাতে ফুঁটে উঠছে। অলোক এখন হাড়ালের তুবড়ি রাজা।

তৃতীয় পর্ব:

এখন বছরটা ২০০৫ , বড়ো ছেলের বয়স নয়। ইস্কুলে মায়ের সাথে এখনও তাকে যেতে হয়, কারণ মিড ডে মিল টা যে ঠিকভাবে পাচ্ছে সেটা দেখতে হবে । বাড়িতে আরো যে দুটো বাচ্চা রয়েছে তারা যে আজ কি খাবে সেটা অলোকের বউ জানে না। এদিকে অলোকের ছোট ছেলের আবার দিন দিন পেট টা বড় হয়ে গেছে, মনে হয় ওর ক্রীমি ধরা পড়েছে, কিন্তু ডাক্তার দেখানোর পয়সা নেই। গত ছয় মাস যে কিভাবে ওদের কেটেছে সেটা কেবল অলোকের পরিবার জানে। গির্জা থেকে কিছু অর্থ সাহায্য এসেছিল , কিন্তু সেটা বেশি দিন চলেনি। অন্যের বাড়িতে কাজ করে যেটুকু করা যায় সেই টুকু নিয়ে চলছে অলোকের পরিবার। বাড়ির এত চাপ যে বাকি ছেলে মেয়ে দুটো কে ইস্কুলে দিতে হবে সেটা আর অলোকের বউয়ের মাথায় নেই। এইভাবে আর চলতে পারেনা, অলোকের বউ মনে মনে চিন্তা করে আর চোখের জল ফেলে। একদিন তো ঠিক করেই ফেলেছিল পালিয়ে যাই, কিন্তু বাচ্চা গুলোর মুখ দেখে আর কিছু করতে পারেনি। গ্রাম পঞ্চায়েত দপ্তরে গিয়েও কোনো লাভ হয়নি। বাচ্চা গুলোর মুখ দেখলেও যেনো এখন পাগলের মত লাগে অলোকের বউয়ের। কি করবে? একা বউ টা যে নিজের বাপের বাড়িতে কত আদরে বড়ো হয়েছে, সে এখন লোকের বাড়ি কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। রাস্তায় বেরোলে কতরকম লোক, আর কতরকমের চাউনি । দিনের বেলা চলতে ভয় লাগে যেখানে, সেখানে কত রাতে ফিরতে হয় অলোকের বউকে। একবার তো ট্রেন স্টেশন থেকে ফিরতে গিয়ে একদল মাতাল দের সামনে এসে ভেবেই নিয়েছিল যে এটাই বোধয় শেষ রাত। টহলদারি পুলিশ ঠিক সময় চলে এসেছিল বলে প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু মান টা আর থাকলো কোথায়। ওই রাতের পুলিশ এখন অলোকের বউয়ের রোজগারের নতুন পন্থা। সেদিনের পর থেকে প্রায় রোজই অলোকের বউয়ের কাছে আসে সুখেন ঘরোই। সুখেন রেল পুলিশের একজন কনস্টেবল, মাইনে ভালই। তাই জুলিয়েট ব্যাপারটা মেনেই নিয়েছে, নাহলে নিজে খাবে কি আর বাচ্চা দের খাওয়াবে কি আর। কি করবে মেয়ে টা, সবকিছুই তো ছিল হাতের মুঠোয় , হঠাৎ যে কি হয়ে গেলো, সব শেষ। ২০০৪ এর জৈষ্ঠ্য মাসে এক গাদা তুবড়ির অর্ডার নিয়ে অলোক খুব ব্যস্ত ভাবে মশলা তৈরি করেছিল। সকাল তখন এগারোটা হবে, প্রচন্ড জোড়ে একটা আওয়াজ হলো, ভাগ্য খুব ভালো ছিল বাচ্চা বউ তখন মামা বাড়ি বেড়াতে গেছে। বাড়ির যেই অংশটা তে অলোকের তুবড়ি কারখানা করছিল আর তার লাগোয়া ঘরের রান্নার জায়গাটা বারুদের মশলায় জ্বলছে। অলোক কে চেনার উপায় ছিল না। দলা পাকিয়ে একটা মাংসের পুটলির মত হয়ে গেছিলো। বাপের বাড়ি থেকে পরের দিন এসে শুধু অন্তিম যাত্রায় চাদরে মোড়া একটা হারির মত জিনিস দেখেছিল অলোকের বউ। পুলিশ এসেছিল , রিপোর্ট লিখেছিলো, বাজি বানাতে গিয়ে অসাবধানতার জন্য মৃত্যু। মানুষ টা যেনো নিজের সাথে ওর তৈরি করা সংসারটা ও নিয়ে চলে গেলো। জুলিয়েট সারাদিন কেঁদে ছিল, অ্যালেক্স ব্যাপারটা বুঝে কেমন যেনো গুম মেরে গেছিলো, মিসবা আর মেরী কিছু বুঝতে না পেরে মায়ের কোলে বসে এমনি কান্নাকাটি করছিল। পাড়ার লোকজন কটা পাটকাঠির বেরা দিয়ে ঘরের ভেঙে যাওয়া জায়গাটা ঢেকে দিয়েছে, আর পঞ্চায়েত থেকে ত্রাণের তাবু দিয়ে ছাওনি করে দিয়েছে অলোকের পুড়ে যাওয়া ঘর টাকে। অলোক কে কবর দিয়ে এসে আর রাতে জুলিয়েট কিছু খায়নি, শুধু দুই ছেলে আর মেয়ে কে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে ছিল। বাড়ির পুড়ে যাওয়া জায়গাটা দেখে জুলিয়েট কেমন যেনো হয়ে গেলো , আবার সেদিন যেনো ও অলোক কে দেখতে পেলো, ও দেখতে পেলো অলোক গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে বলে উঠলো , " কি গো ওরা ঘুমালো, তাহলে আমায় এবার খেতে দাও, খুব খাটনি গেলো আজ, কাল আবার ত্রিশ টা তুবড়ি তৈরি করতে হবে, সব মিলিয়ে দেড়শো টা তুবড়ি ঘোষ বাবুর বাড়িতে দিতে হবে" , দূরে ট্রেনের সাইরেনের আওয়াজে যেনো ঘোর কাটলো, রান্না ঘরের দিকটা খুব অন্ধকার, ঘন কালো জমাট অন্ধকারটা জুলিয়েট কে যেনো গিলে খেতে আসছে, জুলিয়েট দৌড়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো, মাথায় ঘাম আর চোখের জল একসাথেই গড়িয়ে জুলিয়েটের ঠোঁটে এসে পড়েছে, আজ মনে হয় অমাবস্যা, তাই মনে হয় খুব ঘন অন্ধকার। কে বলবে দেখে কাল পর্যন্ত যে বাড়িতে আনন্দের ফুলঝুরি দেখা যেত, সেখানে কেবল এখন ছাই পড়ে আছে দুঃখের।

চতুর্থ পর্ব:

চায়ের দোকানে বাসন মেজে দিনে পঞ্চাশ টাকা আয় হয়ে যায় মিসবা মন্ডল এর। কচি হাতে বারে বারে জল লেগে ক্ষয়ে যাওয়া আঙ্গুল গুলো এক সময় পেন পেন্সিল যে ধরত টা বোঝা যায়না। মিসবা অনেক কষ্ট করে একটা কাজ জুটিয়েছে, চায়ের দোকানে, রোজ পঞ্চাশ টাকা আয় এখন তার। বাড়ির দুই ভাই বোন আর নিজের পেট চালানোর ভার এখন ওই ছোট্ট কাধে চেপেছে। প্রথম প্রথম কষ্ট হতো ঠিকই, কিন্তু এখন মিসবা নিজেকে নিজেই শিখিয়ে পড়িয়ে গোটা একটা পুরুষ তৈরী করে ফেলেছে। মিসবা নাম টা দিয়েছিল গ্রামের একমাত্র ফাদার জ্যেরোম আলফ্রেড রয়। হারালের গির্জায় হাতে গোনা কয়েকজন খ্রিস্ট ধর্মের লোক থাকে। তারা নিজেদের মধ্যেই থাকতে ভালো বাসে, খুব বেশি সাতে পাঁচে থাকে না। তাই বাইরের থেকে সেরকম ভাবে বিপদে পড়লে সাহায্য খুব একটা আশেও না। একমাত্র যদি গির্জার ট্রাস্ট থেকে কিছু পাওয়া যায়, সেটাই অনেক। এখানে অনেকে খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল শুধু মাত্র একটা আয়ের সুযোগের জন্য। অনেকেই জন্মগত হিন্দু হয়েও খ্রিস্ট ধর্ম নিয়েছিল। অলোক মন্ডল তাদের মধ্যেই একজন। কিন্তু শর্ত একটাই প্রতি রবিবার গির্জায় আসতেই হবে, আর যিশু খ্রিষ্টের নাম ছড়াতে হবে। দুটোর কোনোটাতেই অবশ্য খুব একটা গায়ে লাগায়নি অলোক, তবে যখন বিয়ের সময় হয়েছিল তখন ফাদার নিজে অলোক কে বলেছিলেন , এবার থেকে বউ কে নিয়ে আসতে ভুলনা যেনো। বিয়ের পর ভোলেনি অলোক, কারণ বউ ছিল জন্মগত খ্রিষ্ট ধর্মের। বউয়ের জন্য এই নিয়মের মধ্যে আসতেই হয়। গির্জার ট্রাস্ট থেকে অলোক কে একটা ভ্যান রিক্সা দিয়েছিল, কিন্তু পুরনো হাতের কাজ কোনোদিন বন্ধ করেনি। বিয়ের সুন্দর একবছর কাটার পর প্রথম সন্তান এলো যেনো দেব দূতের মত। অলোক ভালো বেশে নাম দিয়ে ছিল দুলাল, কিন্তু বাধা পড়লো মায়ের কাছে, যাইহোক ছয় মাস বাদে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার জন্য গির্জায় গিয়ে ফাদার মাথায় হাত দিয়ে মিসবা নাম টা দেয়। বড় ছেলের যখন পাঁচ বছর তখন যমজ সন্তান দিয়ে ঘরে এসেছিল অলোকের বউ জুলিয়েট মন্ডল। পরের সন্তানদের নাম অবশ্য অলোক করেছিল, ছেলের নাম দেয় অ্যালেক্স আর মেয়ের নাম দেয় মেরী। খুব ভালো নাম দিয়েছো, ফাদার বলেছিলেন অলোক কে। মিসবা প্রথম প্রথম একটু হিংসা করতো বটে তবে পড়ে খুব ভালোবেসে ফেলেছিল তার দুই ভাই বোন কে। এখন মিসবার এগারো বছর , ইস্কুল কবে যে শেষ করেছে সেটা আর এখন মনে করতে চায়না। ওর ওপর এখন এই দুই ভাইবোন এবং নিজের পেট চালানোর ভার পড়েছে। মা দুই বছর আগে কার সাথে চলে গেছে এক রাতে। পাড়ায় লোকেরা কয়েক দিন খোঁজ করেছিল, কয়েক জন খাবারও দিয়ে গেছিলো, কিন্তু ওই কয়েক দিন , বাকি টা আর ঠিক হয়ে ওঠে নি। গির্জার ফাদার মিসবার পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বুঝিয়ে ছিল যে এখানে থেকে আর কি হবে, চলো আশ্রমে থাকবে তোমরা। দুই একদিনের জন্য থেকেও ছিল, কিন্তু একদিন রাতে ফাদার মিসবাকে নিজের ঘরে ডেকে মিথ্যা ধর্মের অনেক কথা বোঝাতে গিয়ে মিসবাকে নির্যাতন করতে গেছিলো, কিন্তু মিসবা হাতের কাছে একটা কলম পেয়ে ফাদার এর পায়ে গেঁথে ওই রাতেই ভাই আর বোন কে নিয়ে নিজের পুড়ে যাওয়া ঘরে পালিয়ে চলে এসেছিল। মায়ের কথা আর এখন ওর বেশি মনে আসে না, কোথায় গেছে কি করছে কিছুই জানেনা মিসবা। কিছু দিন না খেতে পেয়ে কষ্ট হচ্ছিল তবে এখন ও বাড়ির কর্তা, তাই চোখের জল শুকিয়ে মনকে লোহা করে ফেলেছে। এই এগারো বছর বয়সে ছেলেটা যেনো পৃথিবীর সব জ্বালা সহ্য করে নিয়েছে। খেতে না পেয়ে ভেবে ছিল চুরি করবে, কিন্তু পারেনি, বাবা ওকে বলেছিল, " জীবনে যতই কষ্ট হোক তোমার , হারামের সুখ কখনো নিওনা সোনা।" তাই পাড়ায় চায়ের দোকানে কাজ করে ইনকাম করে। ওর খুব ইচ্ছা যে ভাই বোন কে ইস্কুলে দেওয়ার, নিজের শেষ হয়ে যাওয়া ইচ্ছাটা যেনো মিসবা ওদের মধ্যে থেকে দেখতে চায়। কিন্তু কি করে ইস্কুলে ভর্তি করবে জানেই না এগারো বছরের ছেলেটা। পঞ্চায়েত থেকে একবার কে যেনো একজন এসে বলেছিল যে সরকারি হোম এ যেতে হবে, কিন্তু তার পরে আর কথা এগোয়নি। রাতে যখন ছেড়া তাবুর চাল থেকে হাওয়াই রকেটের আলো দেখতে পায় তখন খুব রাগ হয় মিসবার, ও যেনো ওই আতশবাজি টাকে আর দেখতে পারেনা, কারণ ও মনে করে ওই আতশবাজি টা ওর সব কিছু কেড়ে নিয়েছে। ছোট্ট অ্যালেক্স চোখ কচলাতে কচলাতে দাদা কে জিজ্ঞাসা করে ছিল, " আচ্ছা দাদা আমরা কাল কি খাবো রে, জানিস তো আমার খুব ইচ্ছা করছে এখন গরম ভাত আর ছোট মাছের ঝোল খাবো ঠিক মা করে দিত না সেই রকম"। মিসবা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে ছিল আজ ঘুমিয়ে পর কাল আমি তোদের খাওয়াবো। পরের দিন অনেক সকালে উঠতে হবে ওকে, চায়ের দোকানে সকাল বেলা খুব চাপ থাকে। সকালে উঠে বাড়িতে তিনজন জল মুড়ি বাতাসা খেয়ে, আর আগের দিনের পান্তা ভাত হাড়ি তে রেখে চলে যায় মিসবা। কাজ করতে করতে হঠাৎ কে একজন এসে বললো , তুমি এখানে কাজ করছ কেনো, তোমার মা বাবা নেই, তারা কি তোমায় এই কাজ করতে বলেছে। এত প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে যায় মিসবা, কি বলবে বুঝতে না পেরে চায়ের দোকানের মালিক কে ডেকে নিয়ে আসে ও। অনেক ক্ষন পর মালিক এসে মিসবা কে ডেকে বললো, যা তোর ভালো দিন এসে গেছে। একটা এন জি ও থেকে একজন এসেছে, তোকে আর তোর ভাই বোন কে বলেছে কাল তোর বাড়ি গিয়ে ওদের হোম এ নিয়ে যাবে, ওখানে অনেক বন্ধু পাবি তুই, ভালো খেতে আর পড়তে পারবি, তোর ভাই বোন টাও ভালো ভাবে থাকবে, আজ তোর ছুটি, হাতে একশো টাকা দিয়ে চায়ের দোকানের মালিক বললো ওকে। বিকাল বেলা তিন জনের জন্য রাতের খাবার কিনে মিসবা ঘরে ফিরে দুই ভাইবোন কে বললো সব কথা। মিসবা বললো আজ এই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়, কাল আমরা হোম এ চলে যাবো। ছোট্ট অ্যালেক্স বললো, দাদা, হোম টা কিরে? আমাদের নতুন বাড়ি!




 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া ।।
ছাই ও ছায়ার পরবর্তী: উদয় সাহা
আলোচক: মানিক সাহা
কুচবিহারের একজন গুণী শব্দ শিল্পী। কখনো সে শব্দ ধ্বনী আবার কখনো সেই শব্দ অক্ষরে আবৃত। মুজনাই সাহিত্য সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে কাব্য পুস্তিকা 'ছাই ও ছায়ার পরবর্তী'। সম্ভবতঃ বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ধরনের কবিতা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই কাব্য পুস্তিকা। কবিতা কখনো রাতের আকারে চলমান আর কখনো পাখির মতো পদ্য ছন্দে হাওয়ায় উড্ডীন। আনন্দ হয় যখন দেখি কবিতা কবির আঙ্গুল থেকে বেড়িয়ে আসে - "আলেকজান্ডারের মতন তীব্র গতিতে ছুটে আসছে বাতাস/ কবিদের খাতা ভরে উঠছে মরশুমি কবিতায়" (মরশুমি)।
অসাধারণ সব পংক্তি রচনা করেছে উদয়। একজন কবিই তো বলতে পারেন - "সব মৃত্যুই মেঘের কাছে মিসড কল দিয়ে যায়" (সবাই ঘুমোলে)। কিংবা "পুকুর নদী সাগর যে মুগ্ধরেখায় একসাথে বসবাস করে তার নাম জলপ্রহর। তোমার বুক কিংবা চোখ সেই প্রহর মাখানো শ্রাবণ বেলা। " (ধূলির সরগমে আঁকা/ দুই)
উদয়ের কবিতায় মৃত্যু, বিষন্নতা, ঘুম বারবার ফিরে এসেছে। কবির মধ্যে কাজ করেছে অতীতচারীতা ও মায়াময়কাতরতা। রোমান্টিক পেলবতার খানিক স্পর্শ পাওয়া যায় বৈকী! তবু শেষ পর্যন্ত তিনি আধুনিকতাকেই অবলম্বন করেছেন। তিনি লিখতে পারেন- "নদী তো ঘুমের ভেতরেও চলে, অবিরাম। মৃত্যুর পরোয়ানার উল্টো পিঠে পরপারের আলোর বিজ্ঞাপন। জলের দাগ মনের দেওয়ালে সাবলীল ওয়ালপেপার।" (ছাই ও ছায়ার পরবর্তী / দুই)
একই কবিতার এক নং অংশে তিনি লিখেছেন - "কারা যেন শেষকৃত্য সেরে বাড়ি ফিরে গামছা থেকে ধুয়ে ফেলছে শবগন্ধ সব"। আমরা প্রায় সকলেই বিগতকালের কথা ভুলে গিয়ে নতুন করে চলতে শিখি। যা কিছু বর্জনীয় তাকে ফেলে দিয়ে, গ্রহণযোগ্য যা কিছু, তাকে অবলম্বন করে আমরা সূর্যের দিকে হেঁটে যাই।

Monday, December 22, 2025


 

শীতের সেতার

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

বিরহিনী হেমন্তের লাজুক চোখের তারা অবনত হতে হতে পুরোপুরি সময়ের পাতার আড়ালে অদৃশ্য হয় একসময়।রেখে যায় কিছু অশ্রুবিন্দু,শীতের শিশির হয়ে যারা মুক্তো ছড়ায়।পরিযায়ী ডানায় ভর করে শীত এসে আসন পাতে মিঠে- কড়া হলদে রোদের ওমে ভরা আঙিনায়।ভোরের শীত যেন এক রহস্যময়ী নারী।পরতে পরতে গুপ্ত কথার কুয়াশার মসলিনে নিজেকে আবৃত করে আবছায়া এক গল্পের নায়িকা সে।কখনো কখনো দিনভর খোলা থাকে সেই রহস্য উপন্যাসের ধোঁয়াটে মলাট। খামখেয়ালি কোনো পৃষ্ঠা থেকে কখনো চুঁইয়ে পড়ে রহস্যভেদের হালকা ছবি।ছায়াময় গল্পের বুনোটকে হঠাৎ ছুঁয়ে যায় ঈষৎ উষ্ণ রোদেলা কলমের নরম পালক।ঝাপসা অবগুণ্ঠন খুলে হলুদ রঙা জামদানি জড়িয়ে শীত তখন কোনো গৃহবধূ অথবা মেটে রঙের হলুদ ছোপ তোলা শাড়িতে মাঠের এক কৃষক কন্যা ..গোলার ধানে যত্নের হাত রেখে যে প্রতীক্ষা করে আসন্ন পৌষ পার্বণের।রোদ পিঠে একটু একটু করে কমলালেবুর খোসা ছাড়ানোর দুপুরের উদযাপনে,নকশি কাঁথাটির রোদের সুখস্নানে,হাওয়ায় ভেসে আসা নলেন গুড়ের পায়েসের সুবাসের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া মায়ের সুঘ্রাণে,কোমল রোদের কাছে জমাট নারকেল তেলের প্রতিজ্ঞা ভঙ্গে,পরিচিত স্মৃতির খামে একদা বাড়ির কোনো আত্মীয়সম কাজের মানুষের ফাটা গোড়ালির আত্মকথায় শীতের ছোট্ট বেলায় সাঁঝের ঘন্টা বেজে ওঠে কখন।ডাউন মেমোরি লেন ঘেঁষা ঝরোকার রেলিং- এর ঠান্ডা ছুঁয়ে বরফ হয়ে জমতে থাকে না বলা যত কথারা।অসীম এই শীতলতা থেকে কবোষ্ণ কোনো ঠিকানায় উত্তোরণের ছাড়পত্র অধরা রয়ে যায়।একটু উষ্ণতার আর্তিতে গাল বেয়ে ঝরে পড়া বেয়ারা জলের দাপটে পশমিনার বুকের লতাপাতায়ও শীত জমে। কুয়াশা মাখা ল্যাম্পপোস্টের নীচে শীতজয়ী স্বল্পবাসের রাতের গল্প জারি থাকে নগরে,শহরে, মফস্বল জুড়ে।ফুটপাতের জীর্ণ কম্বলে কাঁপা হাতে শীত লেখে এক দুঃসহ লড়াইয়ের করুণ অমনিবাস।তবুও শীত আসে নিয়ম করে।নিয়ে আসে কিছু রঙিন গল্পের ফুলঝুরি।উত্তরের জানালা ফিসফিস উচ্ছ্বাসে চড়ুইভাতির মৌতাতে মাতোয়ারা হয়।উল ও কাঁটার আত্মীয়তায়, সান্টাক্লজ,কেক,সখের ভ্রমণ কাহিনী সবমিলিয়ে প্রতীক্ষার শীতও অতিথি থেকে মনোরম এক আত্মীয় হয়ে ওঠে কখন..জড়িয়ে থাকে সময়ের আলোয়ান হয়ে।তারপর একসময় হাত বাড়িয়ে মধুমাসের সঙ্গে করমর্দন করে মিলিয়ে যায় আবার বৃত্তের আবর্তে।দাওয়া জুড়ে রেখে যায় কিছু প্রহেলিকা,কিছু বা রৌদ্রজ্জ্বল স্মৃতি মেদুরতাকে।

( ছবি- শৌভিক রায়)

 


 

একটি শীতের বিকেল
রেবা সরকার 

চড়াই উৎরাইয়ের পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সাদা গাড়ি। 
বরফ পথ আটকে আছে
গাড়ি থেকে নেমে এসেছে পর্যটকেরা। 
আমিও নেমে পড়েছি প্রকৃতি রূপের টানে। 
এতো ভয়ংকর রূপের টান কুয়াশা-মুখ। 

        থমকে যাওয়া পথে মনে পড়ে... 
বিকেলের নরম আলো, গ্রামের রাস্তা, 
আল পথে সাইকেলের চাঁকা বসে যাওয়া, 
গদাধর নদী ছুঁয়ে পাকা ধানক্ষেত। 

মাইলের পর মাইল দুচোখ জড়িয়ে থাকা নকশিকাঁথা। 

পরিচিত শীতকাল 
উলের টুপির অন্তস্থলের উষ্ণতা

অথচ, তাকিয়ে থাকলে ভাষাহীন।


(ছবি- শৌভিক রায়)


 

কুয়াশা ঘেরা ভোর 
   রাণা চ্যাটার্জী 

এই ভাই তুই কি আজ বেরুবি! কাজ ও কলেজ কি যেতেই হবে? বাইরে কিন্তু প্রচণ্ড কুয়াশা ,কিছুই দেখা যাচ্ছে না রে ভাই ! শ্রাবন্তী ঘুম ঘুম চোখে ভাই রূপকে তুলতে এসে কথাগুলো বলল।ঘড়িতে চারটে বেজে পঞ্চাশ মিনিট,ঠান্ডাটা হঠাৎ করে জাঁকিয়ে পড়েছে কিন্তু বিছানায় কই ভাই তো নেই! পা বালিশে এমন ভাবে চাদর ঢাকা দিয়ে দিদিকে বোকা বানাতে পারলে ভীষন খুশি হওয়া ভাই ততক্ষণে বাথরুমে গায়ে জল ঢালছে।দিদি আমি স্নান করে ফেলেছি ,কুয়াশা তো কি আছে যেতে আমায় হবেই রে দিদি!বাইরে দু বস্তা সবজি নাহলে পচে যাবে তো দিদি বলে থামলো ভাই রূপ।

শ্রাবন্তী দ্রুত মুখ ধুয়ে রান্না ঘরে গেলো ভাইয়ের জন্য দুধ গরম করতে।সেই কখন ফিরবে কলেজ থেকে,সারাদিন ঘুরে পরিশ্রম করে তাও কিনা সবে উনিশ বছরে পা দিয়েছে রূপ।ভাবলে ভীষন কষ্ট হয় শ্রাবন্তীর তবু কোনো দিশা খুঁজে পায় না।বাবাকে আমৃত্যু খুব ভোরে সবজি নিয়ে স্টেশনে যেতে দেখতো শ্রাবন্তী,রূপ তখন খুবই ছোটো তাই ওর মনে থাকা কথাও নয়। শেষের দিকে বাবার শরীরে যখন আর কুলাতো না এত পরিশ্রম,কিছুদিন ভাই যেতো বাবার সাথে।তারপর একদিন স্টেশন থেকে মুকুল কাকা,সাধু বাবু হন্তদন্ত হয়ে বাবার নিথর দেহটা বাড়ি পৌঁছে দিতে স্তব্ধ হয়ে গেছিল শ্রাবন্তী।কুয়াশা ঘেরা আঁধার ভোরে মানুষটা নাকি মাথা ঘুরে একটা গাছে ধাক্কা মেরে টাল সামলাতে না পেরে উল্টে মারা যায়!মা তো আগেই মারা গেছে,এখন পরিবারটা আরও যেন শূন্যতায় ভরে উঠলো।

প্রথমে ভাই পড়া ছেড়ে দিলেও শ্রাবন্তী অনেক বুঝিয়ে রাজি করিয়েছে কলেজে ভর্তি হতেই হবে তারপর কাজ ,সংসার সামলানো।যদিও রূপ কথা রেখেছে দিদির।প্রতিদিন ভোরবেলায় সবজির বস্তা ভ্যানে টেনে প্রথম লোকাল ধরে রূপ।দমদমে ,শিয়ালদহতে ট্রেন ঢোকা মাত্র সবজির বস্তা নামানোর লোক হাজির থাকে।এই শীত ও বর্ষায় বেশি কষ্ট হলেও রূপের চোখে মুখে সংসার সামলানোর দায়িত্ব ও তারপর পড়াশোনার চাপ দিদি শ্রাবন্তীকে বিহ্বল করে তোলে।গ্রামের জাগ্রত বুড়ো শিবের কাছে শ্রাবন্তীর একটাই প্রার্থনা ভোরের কুয়াশার মতো উদ্ভুত সমস্যা বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে হাজির হলেও সূর্যের কিরণে রূপের জীবন যেন আলোকিত হয়।


(ছবি- শৌভিক রায়)


 

বাঁচতে চাই

রীতা মোদক


আমার নিভন্ত দীপের সলতে টা 
একটু উস্কে দাও
আমার চোখের চারপাশে
সবুজ পাতাগুলো কেমন জানি 
বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে.. 
আমার বিবর্ণ প্রায় গাছে,
আমার শুষ্ক মাটিতে,
একটু জল দাও...
হাড় কাঁপানো শীতের রাতে
আমার ক্ষয়িষ্ণু শরীরটা --
একটু আগুন চায়।
আমার নিভন্ত দীপে একটু তেল দাও
 আমার জীবন দীপের সলতে টা 
একটু উস্কে দাও।
আমি সবুজ হতে চাই
তোমাদের মাঝে আমি
আরো কিছুকাল বাঁচতে চাই....

(ছবি- শৌভিক রায়) 


 

শীতের দিনে 
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

শীত পোশাকে শীতের বুড়ী বেড়গুমেরই গ্রামে
উত্তর মাঠ মাঠান-জুড়ে আলতো পায়ে নামে।
মাফলার আর শাল-চাদরে মানায়  না তো শীত
ময়রা মেশায় ময়দা, ছানায় বদলায় না ঋত।
শ্যামনগরের খুড়ো ব্যাচে, জয়নগরের মোয়া
দুধ-চায়েরই কাপ গুলোতে উঠছে মিঠে ধোঁয়া। 
বড়োলোকের কুকুরগুলো লেপের জামা গায়
লালি কালি কুঁকড়ে মরে, শীত কামড়ে হায়।
চালকুমড়ো কলাই ডালের বাটনা বাটে পিসি
ভাজতে পিঠে পাটিশাপটা উপুড় তেলের শিশি।
করিম মিঁয়া পাগড়ি বেঁধে নামায় রসের হাঁড়ি
পালং শাকে ডালের বড়ি খাচ্ছি কাঁড়ি কাঁড়ি।
নলেন গুড়ের পায়েস সাথে আঁদোশা মালপোয়া 
পাটিশাপটা পেটটি মোটা পেটের ভিতর খোয়া।
কড়কড়া ভাত ট্যাংরা কষা বাপের ভীষণ শীত
সলিল -কিশোর- হেমন্তেরই গাইছি কসে গীত।
ফাটা  ঠোঁটে  বরোলিনের আতর দিয়ে ঘষে
অর্পিতা আজ শেষ বয়সে মুচকি মুচকি হাসে।
প্রেমের গানে মন ভিজে তার হৃদয় জমে ক্ষীর
টুপি পরে টাক ঢেকে নিই,  দেখায় যেন বীর।
মেছো খুড়ো মাছ নিয়ে তার লাল জামাটি গায়
বুল ষাঁড় তার লেজটি তুলে সেই দিকেতেই ধায়।
নখ ভিজেছে রাত কুয়াশায় আলপথ যায় ঘেমে 
শীত পোশাকে শীত- বুড়ি ভাই এসেছে এই গ্রামে।

ছবি- শৌভিক রায় 


 

।। পাঠ প্রতিক্রিয়া।।

বোবা কান্নার বেদনা: প্রাণেশ পাল
প্রকাশক:  দৈনিক বজ্রকন্ঠ 


প্রাণেশ পালের ‘বোবা কান্নার বেদনা’ একটি অন্তর্মুখী ও অনুভূতিনির্ভর কাব্যগ্রন্থ, যেখানে মানুষের দৈনন্দিন সংগ্রাম, স্মৃতি, ব্যথা, প্রকৃতি, এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্ববোধ সুন্দরভাবে মিশে গেছে।

গ্রন্থের কবিতাগুলোতে একদিকে আছে অভ্যন্তরীণ দহন ও ক্লান্তি (যেমন নিঃশব্দের দহন, অসহায় ক্লান্ত), অন্যদিকে আছে আলো খোঁজার চেষ্টা, মুক্তির আকাঙ্ক্ষা (আলোকময়, আত্মসম্মান)। প্রকৃতি এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক—মেঘ, পাতা, বৃষ্টি, আলো—যে সব উপমা মানুষের মনের অবস্থাকে প্রতিফলিত করে।

ভাষা সহজ, অথচ ভাব দার্শনিক; চিত্রকল্প স্পষ্ট এবং আবেগঘন। পুরো বইটি এক ধরনের নিঃশব্দ যন্ত্রণা ও মানবিক সংবেদনশীলতার ক্রমযাত্রা, যেখানে বেদনা কেবল বিষাদ নয়—এটি আত্মজিজ্ঞাসা ও উপলব্ধির পথও।

সার্বিকভাবে, এই কাব্যগ্রন্থটি মানবজীবনের বেদনা ও আশার সূক্ষ্ম বিন্যাস—সরল ভাষায় গভীর অনুভূতির এক নীরব দলিল।

আলোচক- অমিতাভ চক্রবর্তী 

Thursday, December 4, 2025


 

মুনা 

অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


সম্পাদকের কথা 

শীতকাল কবে আসবে বলে আক্ষেপ করি না। বরং চাই শীতকাল না আসুক। আসলে শীত মানেই তো জরা, ব্যাধি, মৃত্যু। তার চাইতে বরং গাই জীবনের গান। আর বারবার ভাবি If winter comes can spring be far behind! অবশ্য আমাদের মতো গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শীতকালের কদর আলাদা। কিন্তু তাতেও আজকাল ভাটা। সৌজন্যে বিশ্ব উষ্ণায়ন। কে কবে ভেবেছিল মুজনাইয়ের বয়ে যাওয়ার এই উত্তর দেশেও এভাবে একটু শীতের জন্য মাথা কুটতে হবে! গত শীতে সেভাবে ঠাণ্ডা পড়েছিল সাকুল্যে এক-দেড় সপ্তাহ। এবারে এই মাঝ-অগ্রহায়ণেও শীতের তেমন দেখা নেই। অথচ একটা সময় হু হু ঠাণ্ডায় জমে যেতে যেতে কুয়াশায় হেঁটে বেড়ানো ছিল আমাদের শীতের সেরা সময়। সবই হারিয়ে গেছে বা যাচ্ছে পরিবর্তনের ঠেলায়। আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক জীবনেও একই দশা। এমন সব বদলে যাওয়া, যা মেনে নিতে কষ্ট হয়। ঠিক যেভাবে মানতে পারি না প্রকৃতির এই ভোলবদল। তবু ভাবি `দুখানি চ সুখানি চ চক্রবৎ পরিবর্তন্তে`-এর সেই ঋষিবাক্য ভুল হওয়ার নয় কখনই.....     


অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা

চিত্রা পাল, গৌতমেন্দু নন্দী, কবিতা বণিক,

শুভেন্দু নন্দী, অনিতা নাগ,  মৌসুমী চৌধুরী, 

রণিতা দত্ত,  দেবযানী ভট্টাচার্য, উদয় সাহা, 

জয়িতা সরকার, মনোমিতা চক্রবর্তী,  বটু কৃষ্ণ হালদার, 

অভিজিৎ সেন, ভাশ্বতী রায়, শাশ্বত বোস

 আকাশলীনা ঢোল, প্রতিভা পাল, মহঃ সানোয়ার 

পার্থ সারথী নন্দী, চিরঞ্জিত মন্ডল 


অনলাইন অগ্রহায়ণ  সংখ্যা ১৪৩২


 

কুয়াশা বনাম ক্রিকেট 
উদয় সাহা 


ভোরের কোমল অনুত্তেজনা। কিন্তু আমরা ছুঁয়েছি উত্তেজনার সিলিং। আলস্য যে নেই, তা নয়। কুয়াশা নামলে পৃথিবীর রঙ যেন অপার্থিব হয়ে যায়। একটা মায়া-ম্যাজিকের আবহ। আকাশ তখনো পুরোপুরি জাগেনি, আলো ঠিক মতো ধরেনি মাঠের ঘাসে, অথচ আমরা জেগে উঠি। ক্রিকেটের প্রতি টান আমাদের ঘুম ভাঙায়, আর সেই টানেই আমরা ছুটে যাই ভেজা পিচের দিকে—যেখানে প্রতিটি সকাল যেন নতুন করে শেখায় অধ্যবসায়ের অর্থ।

মাঠে পা রাখলেই কুয়াশার স্নিগ্ধ কার্পেট। ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরে জুতো ভিজে যায়। মনে হয় প্রকৃতি যেন আমাদের গ্রাউন্ডস্ ম্যান। কখনো পিচ এতটাই ভেজা থাকে যে বল হাতছাড়া হয়ে যায়, আবার কখনো পুরো সবুজে নরম কাদা এঁকে বসে থাকে এক অচেনা পথ। তবু এই ভেজা, ধূসর সকালগুলোই আমাদের সবচেয়ে কঠোর পরীক্ষা নেয়। আমরা তৈরি হই আসন্ন কঠিন লড়াইয়ের জন্য ; রোদেলা বিকেল নয়, অনিশ্চিত ভোরের সঙ্গে সখ্য  গড়ে ওঠে আমাদের। 

প্রিয় ভোর, সকালের পোশাক পরে নিতে নিতে এক নতুন বর্ণমালা তৈরি হয়। কুয়াশার ফাঁকে ফাঁকে সকালের আলো চুঁইয়ে পড়ে ব্যাটের গায়ে, বোলারের দৌড়ে তৈরি হয় হালকা কুয়াশার রেখা, উইকেটের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা শুনি বলের মৃদু থুপথাপ শব্দ—যেন মাঠ প্রতিদিন একই ছন্দে আমাদের ডাক দেয়। মাটির পিচে স্কিড করা বল, দৌড়ানোর শব্দ, মাঝে মাঝে উদ্দীপনার চিৎকার—সব মিলিয়ে ভোরের এই মাঠ হয়ে ওঠে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্লাসরুম।

মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে৷ হারিয়ে গেছে হিম সকালে আমাদের সেইসব অনুশীলনের দিন। কিন্তু মনে পড়ে, ভেজা মাঠে আমাদের রিফ্লেক্স যাচাই হ'ত। কুয়াশার আড়ালে দাঁড়িয়ে আমরা শিখেছি কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নিজের ফোকাস ধরে রাখা কতটা জরুরি। ভেজা পিচে স্লিপ করার ভয় থাকে, তবু প্রতিটি বল ফেস করতে গিয়ে আমরা নিজেদের আরও মজবুত করে তুলি। ভোরের ঠান্ডা আর কুয়াশার আস্তরণেও যে দৃঢ়তা জন্মায়, পরে সেই অনুভূতি আর বোধ আমাদের পরবর্তী প্রতিটি ম্যাচের ভিত গড়ে দেয়। ভালো আর নিখুঁত হবার তফাত শেখায়। 

আমরা যখন অনুশীলনের শেষে, সূর্য তখন ব্রেকফাস্ট করছে আকাশে। কুয়াশা শীর্ণ। মাঠের সবুজ আরও প্রাণবন্ত। আমরা ফিরে যাই ঘামে ভেজা শরীর নিয়ে, কিন্তু মন ভরপুর শক্তিতে। কারণ জানি—পরের ভোরেও একই কুয়াশা, একই ভেজা পিচ, একই মাঠ আমাদের অপেক্ষায় থাকবে। আর আমরা—আমরাও প্রস্তুত থাকব, কারণ এটাই আমাদের প্রতিদিনের সাধনা, আমরা প্রিয় নেশার পথে অবিচল। হায় প্রিয় নেশা ! 




 

অক্ষ্যাংশ যখন ৫১°উঃ
রণিতা দত্ত

শীত! উত্তরবঙ্গ। মাগো কি শীত! কলকাতা থেকে কেউ এলে ট্রেন নেমে ই মাফলার মাংকি টুপি পরে নেন। নিজের শহরের এই শীতকে একসময় থোড়াই পরোয়া করতাম। বয়সের সাথে সাথে কাবু হয়েছি ব্যাথায়।তবু শীতকে মন্দ লাগে না। এবারে তো দেখছি উচ্চ অক্ষাংশে অবস্থান করে দিব্যি আছি। অথচ এই শীতে সুমেরু বৃত্তের কাছাকাছি থাকতে হবে ভেবে নেহাত একান্ত ব্যক্তিগত দায়। ছিটকে এলাম ২৭°উঃ থেকে ৫১°উঃ অক্ষাংশে। ক্রান্তীয় উপমহাদেশের উষ্ণতা ছেড়ে এসে পড়লাম উত্তর পশ্চিম ইউরোপিয় শীত প্রধান জলবায়ুর দেশে! তাও শীত এসে প্রকৃতির দরজায় কড়া নাড়ার ঠিক প্রাগ মুহূর্তে। তখন সেপ্টেম্বরের শেষ হপ্তা। সন্ধ্যেয় ফ্রাঙ্কফ্রুট এয়ার পোর্ট থেকে বেড়িয়েছি জ্যাকেট গায়ে টুপি মাথায়। তাও শিরশিরে বেশ ঠান্ডা হাওয়া লাগছিলো। যাগ্গে গাড়িতে বা বাড়িতে উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করা। তাই বিছানা আর ভাত পেয়ে বেশ ঘুমিয়ে নিলাম। সকলে বলল "জেদল্যাক"। নিশ্চিত ঘুম। বিকালে বেরোলাম। 

"Autumn is a second spring
When every leaf is a flower."
                            Albert Camus





এই হেমন্তে চারদিকে দেখি রঙের বিচিত্র খেলা। গাছগাছালির শাখায় পাতায় কত যে রং! লাল, হলুদ, কমলা, তামাটে, বাদামী রংয়ের গাছেরা উঁকি দিচ্ছে! সে এক অপূর্ব দৃশ্য! এতদিন বিদেশের 'ফল' (Fall) এর ছবি দেখেছি নানা জায়গায়, বর্ণনায় পড়েছি । কিন্তু নিজের চোখে এই সাজে প্রকৃতিকে দেখার অনুভূতিটাই যেন আলাদা।এখানে ঘরবাড়ি, অফিস দোকান পসার আর গাছপালা সমানুপাতিক । এতো গাছ মেইন টাউন শিপে না দেখলে বিশ্বাস হত না। ম্যাপল পপলার, অ্যাশ গাছগুলোর পাতায় পাতায় কত রকম যে রং! চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখি। চোখ ভরে তো মন ভরে না। সময় পেরিয়ে যায়।হিমেল হাওয়াকে একটু যেন তাচ্ছিল্য ই করি এই রূপের কাছে। শীতের দিন গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসছে। ঝরে পড়ার আগে সেজেছে পর্ণমোচির দল। পাতার সবুজ ক্লোরোফিল জায়গা ছেড়ে দিয়েছে ক্যারোটিনয়েডস,জ্যান্থোফিল, পিগমেন্টকে। তাই এত রংয়ের বাহার। এত রঙিন ভাবেও যে বুড়িয়ে যাওয়া যায়, তা কে জানত?




  
সব সৌন্দর্যই তো ক্ষণস্থায়ী। দেখ্ না দেখ্ করে এই রঙিন সাজ খসিয়ে দেবে গাছেরা। মাটিতে,রাস্তায়, ঘাসে কিছুদিন পড়ে থাকবে । হাওয়ার তালে নেচে নেচে ওড়াউড়ি করবে এদিক ওদিক। তারপর। একেবারে শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে থাকবে মাটির বুকে।

অক্টোবর চলছে। শীত এখন বেশ আরামদায়ক। বাইরে দামাল হাওয়া শুকনো ঝরা পাতাগুলো নিয়ে খেলায় মেতে থাকে। ভোরে কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা, তারপর দিব্যি রোদ। কমললেবু পাতা ডাল সহ সুপার মার্কেট ছেয়ে গেছে। এতো ফ্রেস কমলা আমাকে টানছে। 

এখানে দেখলাম কিছু মানুষ বেশ উস্কোখুস্ক, অবিন্যস্ত গোছের। জামাকাপড় ধপদুরস্ত নয়। খাপ ছাড়া আচরণ। ওরা নাকি রিফিউজি। চেনা শব্দ, অচেনা ভূ খন্ড। ভিটে ছাড়া, চলচুলো না থাকায় কিছুটা উৎশৃঙ্খল অপরিনামদর্শী। যত চুরি চামারি ছিনতাই সব নাকি ওদের ই কীর্তি কলাপ। তবু শুধু ওদের জন্য লোকজন তাদের অতিরিক্ত জামাকাপড় শীত আসার আগে ব্যাগে করে রাস্তায় রেখে আসে।একে গিভ অ্যাওয়ে বলে।




 হ্যালোউইনের আগে ই আলো জ্বলা ভূত মুখো কুমড়োই শুধু নয়, কঙ্কাল, ভূত পেত্নী অনেকেই বাড়ির সামনে সাজিয়ে রেখতে শুরু করেছে। কোথাও কঙ্কালরা পার্টি করছে, কোথাও বা ভূতেরা গাছ বসে পা দুলাচ্ছে, আবার কোথাও বা কবরের ভেতর থেকে হাত পা বাড়িয়ে উঠে আসতে চাইছে। ঝিরঝির কুয়াশায় ছায়াছায়া কায়া। বেশ মজাদার ব্যাপার। যেন ভূত তাড়ানোর জন্য ভৌতিক সজ্জা। ধর্মীয় অনুষঙ্গ যাই থেকে থাক না কেন আজকাল এটা বিশুদ্ধ মজার ব্যাপার হয়েই দাঁড়িয়েছে এ' দেশে।

৩১শে অক্টোবর সন্ধের মুখে ছোট বাচ্চারা কিম্ভুত সেজে বেরিয়েছে 'ট্রিক অর ট্রিট' এ। বাড়ি বাড়ি ঘুরে চকলেট সংগ্রহ করতে। বাবা মায়েরাও কম যান না। তারাও ভৌতিক সাজে । ওদের আনন্দ দেখে ভীষণ ভালো লাগছিল। আশেপাশের বাড়ির লোকেরা চকলেট বোল, কুমড়োয় মিষ্টি টর্ট দিয়ে টেবিল সাজিয়ে বসেছিল ছোটদের অপেক্ষায়। চকলেট দিতে পেরে ওরাও শিশুর মত খুশি হয়ে উঠছিল। ছোটরা এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়ি হুটোপুটি করে দৌড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিল।
 
বহুদিন আগে আমাদের ছোটবেলায় বিজয়া বা লক্ষ্মীপুজোর পরে এভাবেই বাড়ি বাড়ি ঘুরে নাড়ু, মোয়া খেতাম। বড়রাও সাগ্রহে অপেক্ষা করে থাকতেন। সেকথা খুব মনে পড়ে যাচ্ছিল।
ভূত চতুর্দশী। চোদ্দপুরুষের উদ্দেশ্যে বাতি।অক্টোবরের শেষে বা নভেম্বরের শুরুতেই। ইসলাম ধর্মে সবেবরাত। হয় ওই একই সময়। সেও নাকি মৃত আত্মাদের শ্রদ্ধা জানাতে । অক্টোবর নভেম্বর মাসটাই যে কেন মৃত আত্মাদের এত পছন্দের মাস জানিনা বাপু! দেশ কাল যতই আলাদা হোক না কেন ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মানুষের রীতি নীতি, আনন্দ উৎসবের একটা কোথাও ভীষণ মিল থেকেই যায় এ বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল। আজকাল যত দেখছি, সেই বিশ্বাসটাই আরও দৃঢ় হচ্ছ।



দেখতে দেখতে নভেম্বর শুরু হয়েছে।ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে। পাঁচ নভেম্বর। আমার জীবনের চতুর্থ পুরুষটি (নাতি) এখন আমাকে জাগিয়ে রাখে। মাঝরাতে কখন যে ঘড়ির কাঁটাটা উল্টোবাগে ঘুরে গেছে টের পাইনি।ভোর চারটেয় মোবাইলে অ্যালার্ম। ওনার ফিডিং টাইম। উঠে দেয়াল ঘড়িতে তিনটে দেখে ভাবলাম নিঘাত ব্যাটারিটা গ্যাছে। বদলাতে হবে। বিড়বিড় করছি নিজের মনে, মেয়ে আধো ঘুমে বলল " আজ থেকে 'ডে লাইট সেভিং' অফ হয়ে গেল মা। এখন চারটে ই বাজে। খাওয়াও। তখন খেয়াল হলো। তাই তো! আজ নভেম্বরের ফার্স্ট রোব্বার ! তাকিয়ে দেখি, আমার ফোনের দেখানো সময় আর দেওয়ালে ঝোলানো ঘড়ির সময়ের ঠিক একঘন্টা ফারাক হয়ে গেছে।

ঠিক রাত দুটোয় প্রায় সব জায়গার ঘড়ি আবার চলে গেছে রাত একটার ঘরে। । প্রায় বললাম এজন্য যে হাওয়াই, অ্যারিজোনার দ্বীপের মত কয়েকটা জায়গা ভৌগলিক অবস্থান কারণে এই সময় আগুপিছুর চক্করে ঢোকে না।

ফোন যেহেতু ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। তাই ওখানে অটোমেটিক ফোনের সময় বদলে গেছে। দেওয়ালের ঘড়িটার কাছে চেয়ার টেনে কাঁটা ঘুরিয়ে ঠিক করতে হলো। এই একটা দিন হয়ে গেছে চব্বিশ ঘন্টার বদলে পঁচিশ ঘন্টার। একঘন্টা কড়ে পাওয়া চোদ্দ আনা!



 এদেশে যাকে বলে প্রকৃত শীত, সে আসছে। দিন একটু একটু করে দ্রুত ছোট হচ্ছে। পাশ্চাত্য দেশ 'ডে লাইট সেভিং' অফ করে দেয়।আবার স্ট্যান্ডার্ড টাইমে ফিরে যায়। এই স্ট্যান্ডার্ড টাইম হলো সারা পৃথিবীর যে কোন স্থানের দ্রাঘিমাংশের হিসেবে গ্রীনিচ মিন টাইমের (GMT) পরিপ্রেক্ষিতে যে সময় নির্ধারণ করে, সেটা। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ইলেকট্রিসিটি আর জৈব জ্বালানী বাঁচানোর জন্য ডে লাইট সেভিং চালু হয়েছিল । এর অর্থ আর কিছুই নয়, গ্রীষ্মকালের ১৪ঘন্টা লম্বা দিনগুলোতে ঘড়ির কাঁটা একঘন্টা এগিয়ে দেওয়া । তার মানে হলো সকাল হবে একঘন্টা আগে। সকাল দশটায় অফিস শুরু হলে আসলে স্ট্যান্ডার্ড টাইম অনুযায়ী পৌঁছাতে হবে সকাল ন'টায়। লোকজন বাড়িও ফিরে আসবে দিনের আলো থাকতে থাকতে। সূর্য তো তাঁর চলাচলের সময় বদলাবেন না। তিনি চলবেন তাঁর নিজের নিয়মে। আর পশু পাখিদের বায়োলজিকাল ক্লকও চলবে সূর্যের নিয়মে।  

এখন প্রতি বছর মার্চের দ্বিতীয় রবিবার 'ডে লাইট সেভিং' শুরু হয়। চলে নভেম্বরের প্রথম রবিবার পর্যন্ত। ২০২৬সালের ১০ই মার্চ, রবিবার রাত দুটের সময় সব ঘড়িতে রাত তিনটে বাজবে। ডে লাইট সেভিং অন হবে। সাথে সাথে মানুষের ঘুমের সময় থেকে একঘন্টা চুপচাপ চুরি হয়ে যাবে। সেদিন দিন হবে তেইশ ঘন্টার।

পরশুদিন সকালবেলা হাঁটতে বেরিয়েছিলাম । তখন সকাল ন'টা। তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড । সাড়ে সাতটায় অন্ধকার দেখাচ্ছিল। বাইরে পারদ ছিল জিরো ডিগ্রি। বেরিয়ে দেখলাম কনকনে ঠান্ডা তো আছেই সঙ্গে উত্তুরে বাতাস বইছে। ভালোর মধ্যে এইটুকুই ঝলমলে রোদ্দুর ।ঝকঝকে নীল আকাশ। নভেম্বরের শেষে এই রোদ,ঝকঝকে আকাশ কদাচিৎ দৃশ্য মান। এখানে এখন দেখছি দু'দিন বাদে বাদেই মেঘলা আকাশ। ঝিরঝির বৃষ্টি। ঠান্ডা আরও জাঁকিয়ে পড়ছে। আলো ফোটে দেরিতে। দিনের শুরু আর শেষে ভিজিবেলিটি কম। সন্ধ্যে সাড়ে চারটায়।
ক'দিন আগের রঙ বাহারি গাছপালা আস্তে আস্তে রঙিন বসন খুলছে। যাও বা সামান্য কিছু রঙিন পাতা এখনও লেগে আছে ডাল পালায়, তারাও বাতাসের আঘাতে কেঁপে কেঁপে খসে পড়ছে। ও হেনরীর "লাস্ট লীফ" গল্পটা মনে পড়ে যচ্ছিল। কিছু কিছু গাছ তো ইতিমধ্যেই সম্পূর্ণ নিষ্পত্র। 




 গুটি গুটি পায়ে এসে পড়েছে শীত। রাতে ২/৩•, সূর্য্যর ডিউটি আওয়ার্স কমছে। তাও তেঁনার লেট্ এটেন্ডেন্স, আবার নতুন বউ রেখে আপিস আসার মত যাওয়ার জলদি। শুনেছিলাম ব্রেসেলসে শীতে কয়েকদিন মাত্র তুষারপাত হয়। আজ সকালে সাড়ে পাঁচটায় মেয়ে ঘুম থেকে গুঁতিয়ে তুলল। কাঁচের দরজার ফাঁক দিয়ে দেখি বাইরে ফিন ফিনে তুলোর মত কিছু ঝিরঝিরিয়ে পড়ছে। গাড়ি গুলোর ওপর, মাঠের ঘাসে সাদা আস্তরণ। নভেম্বরের শেষে স্নো দেখে তো সবাই বলাবলি করছে এবারে শীত জাঁকিয়ে পড়বে। ডিসেম্বর জানুয়ারি তো পড়েই রয়েছে পারদস্তম্ভ শূন্য ছাড়িয়ে মাইনাসে নামবার। সূর্য্য মুখ তবে শীতের প্রকৃতির বর্ণহীনতাকে ঢেকে দিতে মানুষের চেষ্টার কোনো খামতি নেই। 

রাস্তা ঘাট দোকান বাজার, শপিং মল সব ইতিমধ্যেই রেন ডিয়ার, ক্রিসমাস ট্রী, সান্তা ক্লজ, আর নানারকম আলোকসজ্জায় সেজে উঠছে। দোকানে দোকানে সাজানো ক্রিসমাসের হরেক রঙিন পসরা। গাড়িতে যেতে যেতে, মর্নিং ওয়াক করতে করতে চোখে পড়ে হ্যালোইনের সাজসজ্জা খুলে ফেলে লোকজন বাড়ির সামনে সাজাচ্ছে ক্রিস মাস থিমে।ঋতু আসবে যাবে বাঁচতে হবে আনন্দে।


 

যে শীতে বৃষ্টিও ঝরে...

মৌসুমী চৌধুরী 

               মজা করে লিখতে ইচ্ছে করে, শীতের দাঁত নখ আমি দেখিয়াছি। তাই পৃথিবীতে কোথাও শীতের আদর খুঁজিতে যাই নাই আর। 

          ইঁট-কাঠ-পাথরের এই জঙ্গলে আজ হঠাৎই শীত এসে গালে আলতো টোকা মেরে ফিসফিস করে বলে যায়, "আমলকী বনগুলো তো কেটেছ হে, বহুকাল। বলো তো আজ কোথায় দাঁড়াই? দুয়ারে যে দিয়েছ কাঁটা।" আজকাল দুয়ারে সব জিনিস এসে হাজির হলেও, শীত যেন আসতে চেয়েও আসতে পারে না তাই।
        আমার শীত তাই স্মৃতির শীত বা শীতের স্মৃতি। স্মৃতির বালুচরে জেগে ওঠা মান্ধাতার গল্পগাছা। শ্লেটরঙা গাঢ় কুয়াশা, আবছায়া ভোর, লাল সাইকেল, আপাদমস্তক টুপি-মোজা-লাল সোয়েটারে মোড়া কিশোরী এক আর ইংরাজির টিউশন। এছাড়া ডিমা নদীর চরে পাড়াতুতো পিকনিক, কমলালেবু, নুন কম দেওয়া মাংস। তখনও বিপিনবাবুর কারণসুধার রমরমা ততটা ছিল না, কারণ পাড়ার জ্যাঠারা। তাঁদের যে বড্ড ভয় করত পাড়ার বীর-পুঙ্গব দাদারা। আর ছিল ডিমা নদীর পাশের জঙ্গলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হাতির পায়ের ছাপ কিংবা বর্জ্য-পদার্থ আবিষ্কার করে শিহরিত হওয়া ...। সেইসব শীতের দিনে বেলা বাড়লে ছেঁড়া ছেঁড়া কুয়াশার ফাঁক গলে ফিকে হলুদ রোদ উঁকি দিত। অনতিদূরে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠত পাহাড়। পাহাড়কে ছু্ঁয়ে থাকা উদাত্ত আকাশটা বড় বেশি যেন নীল হয়ে উঠত, নীল অপরাজিতা ফুলের মতো! যেন কন্ঠভরা বিষ নিয়ে শুয়ে থাকতেন স্বয়ং নীলকন্ঠ। আর সাদা ফতুয়া পরা গম্ভীর মেঘেদের দল তাঁর মাথায় চূড়ো করে সাদা জটাজাল বাঁধতে ব্যস্ত । নীল সিল্যুয়েটে মেঘসইদের সে কী হা হা হি হি আহ্লাদেপনা! আপনমনে তারা গড়ে তুলত তুলোয় মোড়া মেঘবাড়ি সব। হাঁ করে চেয়ে দেখতে দেখতে, হোঁচট খেতে খেতে নিজেকে সামলে নিত এক অবাক কিশোরী !
        দীর্ঘ শীতের রাতগুলোতে কুয়াশা ঘিরে ফেলত চারপাশের ঘরবাড়িগুলো। পাড়াময় সাদা আঁচল বিছিয়ে নেচে নেচে, উড়ে উড়ে, ঘুরে ঘুরে রীতিমতো যেন উৎসবে মেতে উঠত কুয়াশার দল। আর ঘরের ভিতর লেপ কম্বলের ওমে নিজেদের ঢেকে আমরা তখন দুরুদুরু বুকে বার্ষিক পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করে চলেছি সিপাহি বিদ্রোহের কারণ কিংবা আইন অমান্য আন্দোলনের রূপরেখা। আমাদের টিনের চালে তখন টুপটাপ শিশির ঝরত। তেমনই এক শিশিরঝরা শীতে গোটা রাত জেগে পড়েছিলাম সমরেশ মজুমদারের "কালবেলা"। আর সেই সময়ই দেখতাম পাকরাশি বাড়ির সেই বিশাল আমলকী গাছটাকে। পাতা খসিয়ে কেমন যেন রিক্ত, বিষন্ন দাঁড়িয়ে থাকত ! কেন জানি না ভারী কষ্ট হত দেখে। গাছটাকে দেখলেই আমার মনে পড়ত কালবেলার "মাধবীলতা"কে। আর বড্ড ভারী হয়ে উঠত বুকটা।
            নাগরিক এই জীবনে বাজারের মাঝখান দিয়ে নিত্যকার চলার পথ আমার। সে পথে যেতে যেতে চোখে পড়ে শীতের রকমারি সবজির পসরা । নাক ছু্ঁয়ে যায় নানা সবজির একটা ককটেল সুবাস। টাটকা বুনো একটা গন্ধ মনটাকে বড়ই দ্রব করে তোলে। স্মৃতির সরণি বেয়ে তক্ষুনি ছবি হয়ে ফুটে উঠতে থাকে ছোটবেলায় হাট থেকে নিয়ে আসা রঙবেরঙের তাজা সবজিগুলো। হাট থেকে এনে বাবা মেঝেতে ঢালতেন সাদা ফুলকপি, লাল টমাটো, গোলাপি রঙের মূলো, ফিকে সবুজ বাঁধাকপি, গাঢ় সবুজ সিম, কালচে বেগুনি রঙের বেগুন...মেঝের বুকে ধীরে ধীরে যেন ফুটে উঠত বিচিত্র রঙ বাহারি জগত এক। বাবা বলেছিলেন, "দেখ প্রকৃতির বৈচিত্র্য। কত বিচিত্র রঙের সমাহার। এরা কিন্তু আবার একই সূত্রে বাঁধা, এরা একই প্রকৃতিজাত যে।" কথাটা শুনে কেমন চমকে উঠেছিলাম। তখন আমার কলেজবেলা, মনে যখন তখন নানা প্রশ্ন এসে হানা দিত। সেইদিন মনে প্রশ্ন জেগেছিল, এটাই কি তবে বিবিধের মাঝে মহান মিলন?
    আজকাল নাগরিক শীত এসে দুয়ারে দাঁড়ায় ম্লান মুখে, আঁচলে বেঁধে আনে জয়নগরের মোয়া কিংবা বহড়ুর নলেন গুড়। হালকা উত্তুরে বাতাস ছুটে আসে, আর মনের মেঝেটাও হঠাৎই আর্দ্র হয়ে ওঠে। মাঘের সেই কোন এক হাড়-হিম-
করা শীত রাতে আমার বাবার উষ্ণ হাতখানি তীব্র শীতল হয়ে চিরতরে চলে গেছে আমার হাতখানি ছেড়ে। শীত এলে তাই বৃষ্টিও ঝরে ভিতরে আমার। আদ্যন্ত ভিজে উঠি। প্রতিটি শীত স্পর্শেরই নিজস্ব কিছু কথা থাকে, যা এক মাঘে যায় না, বার বার ফিরে ফিরে আসে।


 

শীত স্মৃতির আয়না

জয়িতা সরকার

টুনিলাইট চলেছে শীতঘুমে, আগামী বছর সবগুলো জ্বলবে কি না তা নিয়ে ফি বছরের অহেতুক আলোচনা। এক্সটেনশন বক্সগুলো টুনির সঙ্গে এক জায়গায় গুটিসুটি মেরে পড়ে থাকবে এই একবছর। শীতঘুম শেষে গ্রীষ্ম, বর্ষা কাটিয়ে শরতের কোন এক শিশির ভেজা সন্ধ্যেতে তোরজোড় করে বেরিয়ে দিন কয়েকের জন্য সকলকে মুখ দেখাবে ওরা। শহর জুড়েও একটা শীত নামবে কালীপুজোর ক'দিন পরেই। কয়েকটি পুজো মন্ডপে চন্দননগরের লাইটিং-এ বিষন্ন হেমন্তের ঝলমলে এক সন্ধ্যেতে প্রথম শীতের নাচন লাগল মফস্বল শহরে, হঠাৎই কেমন এক হিমশীতল অন্ধকার উৎসবকে ছুটি দিয়ে রিক্ততার বাহক হয়ে কড়া নাড়ছে দোরে দোরে।

জড়োসড়ো অবস্থায় শীতের আগমনের প্রথম অনুভূতি স্বরভঙ্গ যাকে বলে, গলা দিয়ে সপ্তসুর একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইছে,প্রাণপণ চেষ্টায় বোঝাতে চাইছি, কিন্তু আমার কন্ঠস্বর তখন জবাব দিল গোটা কালীপুজোয় ইস্টাইল খানা ভুলে গেলি? সামনে ক্লাস পরীক্ষা, এদিকে সেই প্রাচীন যুগের ছাত্রছাত্রী আমরা, গলা চড়িয়ে না পড়লে মগজে ঠিক ঢোকে না, গলা তখন শীত ঘুমের প্রস্তুতি নিতে ব্যতিব্যস্ত, এদিকে অক্ষরগুলো চোখের সামনে নেচে বেড়াচ্ছে, দিশেহারা হয়ে সদ্য আলমারি থেকে বেরিয়ে আসা লেপমুড়ি দিয়ে আমি উষ্ণতার আদর নিয়ে শীতকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। শীত নিয়ে আদিখ্যেতা করার মত মানুষ যদিও আমি না। আসবি আয়, কিন্তু সঙ্গে ওই রুক্ষ্ম ত্বক, শুষ্ক চুল এসবকে সঙ্গী না করলেই হতো। স্কুল যাওয়ার সময় ঝক্কি কম, একদিকে কাঁপতে কাঁপতে স্নান সারো, তারপর ত্বকের যত্ন, সবশেষে শরীর গরম করতে ঠান্ডা সোয়েটার গায়ে চাপাও। এতকিছুর পর ঘড়ির কাঁটায় সাড়ে দশটা, কিন্তু বাইরের দিকে তাকাতেই মনে হল ভোর হয়নি, কুয়াশা ঘেরা চারিদিক, একহাত দূরের কিছুও দৃশ্যমান নয়। এমন দিনে কাঁধে বইয়ের বোঝা নিয়ে স্কুল যাওয়ার কষ্ট যদি কর্তাব্যক্তিরা বুঝত, তবে হয়ত বাড়তি গরম- বর্ষা- শীত সবেতেই ছুটির পরব উপভোগ করত আমাদের ছোটবেলা।

শীত মানেই যত কান্ড পাড়া জুড়ে, সেসব ঘটনার ঘনঘটায় একটি শীত উপাখ্যান রচনা করা খুব কঠিন হবে না। মহাজাগতিক নিয়মের তোয়াক্কা না করেই প্রথম বকাঝকা খেত সূর্যদেব। শীতকাল এলেই তার কদর বৃদ্ধির নামে প্রত্যাশার পারদ এমন চড়ত যে এক টুকরো রোদের জন্য এদিক ওদিক সকলের ছোটাছুটি। আহা এমন শীতের মিঠে রোদে কোথায় দু'দন্ড শান্তিতে দাঁড়িয়ে উষ্ণ চায়ে চুমুক দেব, তা নয় সকাল থেকে লেপ- কাঁথা- কম্বল কাঁধে নিয়ে সকলে ছুটে বেড়াচ্ছেন, একটু রোদ্দুর কোথায় পাবো? জানালা দিয়ে সে সব হাস্যকর দৃশ্য দেখতে দেখতে বীজগণিতের এ প্লাস বি হোল স্কোয়ার কখন যে উত্তরায়ণ দক্ষিণায়নের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, তা ধরা পড়ল মায়ের চিৎকার করা লিটমাস টেস্টে। পাড়া জুড়ে শীতের মরসুম, হাঁকডাক চলছে, তোমাদের মাঠে খুঁটি পুঁতে দু'টো বাঁশ লাগালে এই শীত বাহারিরা একটু রোদ পোহাতে পারত, আহা! তখন আমার ছোট মনে বিরাট অহংকার, সবাই কত খাতির করছে, মাঠখানা ভাগ্যিস ছিল। না হলে রোদের হাহাকারে আমরা দানশীল হতাম কেমন করে? যদিও অনুমতি দাতা মানুষটি এসবের ধারে পাশেও আসে না, এসব আমরা মাথার দুষ্টু বুদ্ধি, সবার জন্য টাইম ঠিক করে টিকিট সিস্টেম করে লেপ- কম্বলদের এন্ট্রি করানো হবে মাঠে। মা-বাবা আমার এমন শীতল প্রস্তাব শুনে আরও শীতল হয়ে বলত, মাঠ যখন তোমার হবে, তখন এসব করো। আর আমার মন ভাবত, মাঝের উঁচু ঢিবির দু'পাশে দু'খানা মাঠের মালকিন হয়ে আমি রোদ বিক্রি করছি, আর তা দিয়ে স্কুল ছুটির পর বনকুল কিনে খাচ্ছি, আহা এমন ব্যবসায়িক বুদ্ধি আর কতজনেরই বা আছে, এসব ভাবতে ভাবতে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিলাম।

শীতের শব্দ শুনলেই নস্টালজিক হতেই হবে, কয়েকটি চেনা শব্দ,  পরিচিত ছবি আর কিছু গন্ধ, আমার শীতকাল জুড়ে এখনও উত্তাপ ছড়ায় ওই লেপ জড়িয়ে হাত দু'টোকে বের করে কমলালেবুর খোসা ছাড়াতে গিয়ে রস ছিটে চোখ জ্বলা অনুভূতিকে ঘিরে। মায়ের সে এককথা ওই রস চোখে গেলে নাকি চোখ ভালো থাকে, অলীক নাকি বাস্তব সে তর্কে জড়ায়নি কোনদিনই, কারণ মায়ের সঙ্গে তর্কবিদ্যায় আমি তখন শিক্ষানবিশ। কমলালেবুর গন্ধ মাখা দুপুরে হিমেল বাতাসে মিশে যেত সন্ধ্যের নলেনগুড়ের সুবাস। বাড়ি থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে আছে বাতাসা ফ্যাক্টরি। সারাবছর সাদা বাতাসা, লাল বাতাসা তৈরি হলেও শীতকাল মানেই গুড়ের তিলা, খাঁজারা কাঁচের বয়ামে জায়গা পেত বিশেষ আথিতেয়তায়। শৈশব- কৈশোরকে ইতি জানিয়ে মাঝজীবনেও শীত সন্ধ্যের সে গন্ধ দূরত্ব মানে না, মনে হয় সেই চেনা গন্ধ পাড়াময় ভেসে বেড়াচ্ছে। গন্ধের সঙ্গে মিশে থাকা শব্দগুলোও শীত স্মৃতির উষ্ণতার পরিপূরক। শীত এলেই ওরা আসে, এখন অবশ্য আসে কি না সে খবর জানা হয় না। লুপ্তপ্রায় তালিকায় অন্তর্ভুক্তি হয়েছে বলেই মনে হয়। প্রতি শীতেই পাড়ার কোন এক বাড়িতে নতুন লেপের প্রয়োজন পড়বেই, আর সকাল হতেই টুংটাং শব্দ করে ধোনকারের সঙ্গে দর কষাকষির শব্দগুচ্ছ কানে বাজবে, শীতের সকালে অত্যাবশক এক চেনা ছবি। আমার কথায় ওনারা একতারা বাজান। আবার সেই আমাদের মাঠ, ত্রিপল পেতে প্রায়,দু'ঘন্টা তারের সঙ্গে তুলোর সঙ্গতে তৈরি হয়ে গেল নতুন লেপ, উফফ যার জন্য তৈরি হচ্ছে সে যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মত খুশি, শীতে নতুন লেপ মানে তো অমূল্য রতন পাওয়া।

হঠাৎই কোন এক শীতে আবিষ্কার হল উষ্ণতার নতুন এক উপকরণ। চেনা হাঁকডাকের শব্দ তো নয়, কানখাড়া করে শুনছি ঠিকই, কিন্তু ঠাহর করতে পারছি না। উৎসুক মনের ডাকে সাড়া দিয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি এক ভদ্রলোক সাইকেলের পেছনে বাহারি রঙের কাঁথা বিক্রি করতে এসেছেন। তবে সেগুলো কাঁথা নয়, পোষাকি নাম বালাপোশ, পুরনো সিনথেটিক দু- তিনটে শাড়ি দিলেই বানিয়ে দেবেন শীতের উষ্ণতার নতুন বাজারি উপাদান। শহরের অলিগলি গুলোতে নতুন শব্দের অনুরণন। পুরনোকে নতুন করে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে অধীর অপেক্ষা মা- কাকিমাদের। শীত জুড়ে নলেনগুড় - ভাগ করে নেওয়া কমলালেবু- নানা রঙের ফুল- হঠাৎ কোন এক দুপুরের শেষ রোদে একবাটি কুলমাখা, এমন চেনাছবিগুলো ভিড় করে আসে আজকের একলা ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা আমিটাকে। উত্তাপহীন নরম রোদে উষ্ণতা খুঁজি মায়ের হাতে সোজা কাঁটা- উল্টো কাঁটা,ঘর তোলা-ঘর গোনার জটিল হিসেবে। কী নিপুণ দক্ষতায় মা বুনে চলেছে লাল-হলুদ উলের সোয়েটার, মায়ের যত্নে বোনা সোয়েটারে লেগে থাকা ওম যেন শীতের পরম প্রাপ্তি। শীত জুড়ে স্মৃতির ভিড়, রাতদুপুরে শীত যখন শান্ত- নীরব, আমি কান পেতে থাকি বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের রেলস্টেশনের কোন এক দূরপাল্লার ট্রেনের হুইসিলের জন্য। শীতের সঙ্গে এই হুইসিলের গভীরতার রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। শীত এলে জলশহরের চেহারা বদলায়, কুয়াশা ঘিরে ধরে আনাচে-কানাচে, সন্ধ্যে হলেই কেমন এক রহস্যে মোড়া মায়াবী আবহ জড়িয়ে ধরে শহরটাকে।

শীত এলে মনের কোলাহল বাড়ে, স্মৃতিদের আনাগোনায় উত্তাপ বাড়ে শরীর জুড়ে, ফেলে আসা মাঠের যে কোণটা ছিল ভীষণ প্রিয়, পড়ন্ত রোদে দিনের শেষ উষ্ণতারা ছুঁয়ে যেত মায়ের একগোছা খোলা চুল, কিংবা আদর করত বেবি ক্রিম মাখা আমারছোট্ট গোলাগাল মুখটাকে, সেখানে আর রোদ-বিকেল নামে কারোর যাতায়াত নেই। অট্টালিকায় হারিয়েছে শীত দুপুরের চেনা ওম। স্মৃতিরা কুঁকড়ে যাচ্ছে ক্রমশ। হয়ত ঝরে যাবে শীতের পাতার মত, ধূসর হবে শীতের বাহারি ফুলেরা, মাঠের কোণটা খুঁজতে হলে অপেক্ষা করব কোন এক বসন্তের, নতুন পাতারা জায়গা পেলে জমাট বাঁধবে শীতের শিশির বিন্দুরা।