Friday, October 9, 2026


 

পাখি

অনিন্দ্য পাল 

বিকেলের আলোটা এবার ম্লান হয়ে এল। ঢাকের কাঠি আর ডুগডুগির আওয়াজটা বস্তির এক কোণে আছাড় খেয়ে পড়ছে, বারো বছর বয়সী মিলির বুকটা কেমন যেন গুড়গুড় করে উঠছে। একটু পরেই তার ঠাকুর্দা বালি দাশ তাঁর ছেঁড়া কোটটা গায়ে চাপিয়ে, মাথায় একটা জাদুকরের মতো টুপি পরে উঠোনে নামবেন। আর তাঁর পিছু পিছু বের হবে রিনি আর জিনিয়া।

মিলি তার ঠাকুর্দা আর ঠাকুমাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। কিন্তু সে তীব্র ঘৃণা করে এই মাদারির খেলাটাকে। যখন ঠাকুর্দা ডুগডুগি বাজিয়ে রিনিকে হুকুম করেন, “দেখা তো বেটি, শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় নতুন বউ কেমন করে কাঁদে?” আর রিনি তার ছোট্ট নোংরা হাত দুটো মুখে চাপা দিয়ে ডুকরে ওঠার ভঙ্গি করে—তখন চারপাশের গোল হয়ে দাঁড়ানো মানুষগুলো হাততালি দিয়ে হেসে ওঠে। মিলির তখন মনে হয়, ওই হাসির প্রতিটি শব্দ রিনির গায়ে চাবুকের মতো গিয়ে পড়ছে। এটা তো খেলা নয়, এটা একটা বন্দিশালা। অথচ, এটাই তাদের রুটি-রুজি। এই ডুগডুগির আওয়াজ না থামলে রাতে তাদের হাঁড়ি চড়ে না।

রিনি অবশ্য মিলির কাছে কোনো খেলায় অংশ নেওয়া সাধারণ বাঁদর ছিল না। মিলি তাকে নিজের ছোট বোনের মতোই ভাবত। দুপুরবেলা যখন ঠাকুর্দা ভাত খেয়ে নাক ডেকে ঘুমোতেন, তখন রিনির কোমরের শিকলটা আলগা করে দিত মিলি। রিনি তখন এক লাফে চলে যেত উঠোনের পেয়ারা গাছটায়। লেজটা উঁচিয়ে এক ডাল থেকে অন্য ডালে তার অবাধ যাতায়াত মিলি জানালার গ্রিল ধরে অবাক হয়ে দেখত। রিনির ওই ছুটে বেড়ানোর মধ্যে মিলি নিজের মুক্তি খুঁজত।
রাতে যখন চারদিক নিঝুম হয়ে যেত, বস্তির লম্ফগুলো একে একে নিভে আসত, তখন মিলি ঠাকুমার বুকের ওমে নিজেকে গুটিয়ে নিত। একদম এইটুকু হয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে সে চোখ বুজত। আর তখনই তার বন্ধ চোখের পাতায় স্বপ্নরা ডানা মেলত। মিলি দেখত, সে আর রিনি দুজনেই পাখি হয়ে গেছে। তাদের কোনো শিকল নেই, কোনো ডুগডুগির তাড়া নেই। তারা ডানায় ভর দিয়ে বস্তির চাল, পেয়ারা গাছের মাথা, এমনকি এই শহরের সীমানা ছাড়িয়ে উড়ে যাচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে—যেখানে মানুষজন এখনো খাঁচা বানাতে শেখেনি।
তবে মিলির পরিবারে সবাই একরকম ছিল না। তার মা ছিল ভীষণ উদাসীন। সংসারের কোনো কিছুতেই যেন তাঁর মন লাগত না। দিনভর জানালার বাইরে তাকিয়ে কী যেন ভাবতেন। আর ছিল জিনিয়া—ঠাকুর্দার প্রিয় মাদী ভালুক। জিনিয়ার শরীরটা ছিল ভারী, লোমশ আর কুচকুচে কালো। জিনিয়া কিন্তু রিনির মতো চঞ্চল ছিল না, সে কেমন যেন গম্ভীর আর দূরত্ব বজায় রেখে চলত। মিলি লক্ষ্য করেছিল, জিনিয়া মিলির চেয়ে তার বাবার সাথেই থাকতে বেশি ভালোবাসত। বাবা যখন জিনিয়ার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতেন, জিনিয়া শান্ত হয়ে চোখ বুজে বসে থাকত। বাবার সাথে দূরে কোনো মেলায় বা হাটে খেলা দেখাতে যেতেই জিনিয়া সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। মিলি চাইলেও জিনিয়ার মনের নাগাল পেত না। জিনিয়া যেন এক রহস্যের চাদরে নিজেকে ঢেকে রাখত।

তারপর হঠাৎ করেই একদিন তাদের এই চেনা জগৎটা ওলটপালট হয়ে গেল।

সেদিন সকাল থেকেই ঠাকুর্দা বালি দাশের শরীরটা ভালো ছিল না। বিকেলের দিকে ডুগডুগিটা হাতে নিতে গিয়েও হাত থেকে মাটিতে পড়ে গেল। রিনি পাশে বসে অবাক হয়ে দেখছিল। ঠাকুর্দা আর উঠোনে নামতে পারলেন না। মাঝরাতেই ঠাকুমার বুকফাটা চিৎকারে মিলির ঘুম ভেঙে গেল। ঠাকুর্দা বালি আর নেই। চিরদিনের জন্য শান্ত হয়ে গেছেন তিনি। 

ঠাকুর্দার মৃত্যুতে পুরো বস্তিটা যেন এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেল। মিলি তো কান্নায় ভেঙে পড়লই, কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা গেল রিনির মধ্যে। সে তার ঘরের কোণায় চুপচাপ বসে রইল। ঠাকুর্দার প্রিয় ডুগডুগিটা মেঝেতে পড়ে ছিল, রিনি সেটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দেখল, কিন্তু একবারও শব্দ করল না। তার গোল গোল চোখ দুটো দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগল। মিলি আর রিনি—দুজনেই যেন এক গভীর শোকের সাগরে ডুবে গেল। অবলা প্রাণী হলেও রিনি যেন বুঝতে পেরেছিল, যে মানুষটা তাকে রোজ বন্দি করত, সেই মানুষটাই তাকে ভালোবেসে আগলেও রাখত।

ঠাকুর্দার শেষ ইচ্ছে ছিল, তাঁর মৃত্যুর পর যেন তাঁর দেহটা সুন্দরবনের আদি ভিটেতে নিয়ে গিয়ে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করা হয়। সেই মতো ঠাকুর্দার শবদেহ নিয়ে মিলি, তার বাবা-মা এবং পুরো দল রওনা হলো সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে। যেহেতু তাঁরা যাযাবরের মতো, তাই রিনি আর জিনিয়াকেও সাথে নিতে হয়েছিল।
সুন্দরবনের সেই জল-জঙ্গলের ছমছমে পরিবেশে এসে রিনি কেমন যেন আরও গুটিয়ে গেল। জিনিয়াও চুপচাপ এককোণে বসে থাকত। রিনি সবসময় জিনিয়ার থেকে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখত। ভালুককে সে সহজাতভাবেই ভয় পেত, আর জিনিয়ার ওই উদাসীন গম্ভীর ভাবটা রিনি একদম পছন্দ করত না।
কিন্তু মৃত্যুর এই আবহ যেন প্রকৃতির সব নিয়ম বদলে দিল। নদীর পাড়ে যখন ঠাকুর্দার চিতায় আগুন জ্বলে উঠল, তখন সেই আগুনের আলো গিয়ে পড়ল জিনিয়া আর রিনির চোখে। মিলি দেখল, জিনিয়া তার বিশাল শরীরটা নিয়ে চিতার আগুনের দিকে তাকিয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছে, আর রিনি গাছের ডাল থেকে নেমে এসে জিনিয়ার থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে মাটিতে বসে মাথা নিচু করে আছে।

দুজনে সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির প্রাণী, একজন চঞ্চল তো অন্যজন গম্ভীর। কিন্তু এই মুহূর্তে তারা এক বিন্দুতে এসে মিলে গেছে। দুজনেই একই মানুষের জন্য শোক করছে। হারানোর এই তীব্র বেদনা তাদের ভেতরের সব দূরত্ব, সব ভয় মুছে দিল। চিতার আগুন যখন নিভে এল, মিলি দেখল, রিনি আস্তে আস্তে হেঁটে গিয়ে জিনিয়ার বিশাল থাবার পাশে বসল। জিনিয়াও তার বড় হাতটা দিয়ে রিনিকে আঘাত করল না, বরং এক অদ্ভুত আশ্রয়ের ভঙ্গিতে রিনির দিকে চেয়ে রইল। শোকের আগুন থেকে জন্ম নিল এক নতুন, অবলা অথচ গভীর বন্ধন।

কিন্তু অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সেই রাতেই ঘটল ভয়ানক ঘটনা। সুন্দরবনের এই অঞ্চলের চোরা শিকারি আর বন্যপ্রাণী পাচারকারীদের উপদ্রব খুব বেশি। তারা খবর পেয়েছিল যে এই যাযাবর দলটার কাছে একটা মূল্যবান ভালুক রয়েছে। রাতের অন্ধকারে, যখন সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, তখন কয়েকজন অস্ত্রধারী লোক তাঁবুর পেছনে এসে জড়ো হলো। তাদের লক্ষ্য ছিল জিনিয়াকে অজ্ঞান করে খাঁচায় পুরে পাচার করে দেওয়া।

জিনিয়াকে যখন তারা দড়ি দিয়ে বাঁধতে গেল, জিনিয়া গর্জন করে ওঠার চেষ্টা করল, কিন্তু ততক্ষণে শিকারিরা তার মুখে বিষাক্ত চেতনানাশক স্প্রে করে দিয়েছে। জিনিয়ার শরীরটা অবশ হয়ে আসতে লাগল। সে এক চরম বিপদের সম্মুখীন। ঠিক সেই মুহূর্তে, গাছের ওপর থেকে পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করছিল রিনি।

নতুন তৈরি হওয়া বন্ধুত্বের টান আর জিনিয়াকে বাঁচানোর তাগিদ রিনির ভেতরের সব ভয়কে দূর করে দিল। রিনি এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চিৎকার করে উঠল—এমন এক তীক্ষ্ণ, অস্বাভাবিক চিৎকার, যা বনের শান্ত পরিবেশকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল। শুধু চিৎকার করেই সে ক্ষান্ত হলো না, সে গাছ থেকে সোজা ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধান শিকারিটার মুখের ওপর। নিজের ধারালো নখ দিয়ে সে লোকটার মুখ আঁচড়ে দিতে লাগল।

হঠাৎ এই আক্রমণে শিকারি দলটি ভড়কে গেল। রিনির এই প্রচণ্ড চিৎকারে মিলির বাবা এবং বাকি লোকজনের ঘুম ভেঙে গেল। তারা লাঠিসোঁটা আর মশাল নিয়ে চিৎকার করতে করতে ছুটে এল। বেগতিক দেখে শিকারিরা জিনিয়াকে ছেড়ে বনের অন্ধকারের দিকে পালিয়ে গেল।

জিনিয়া বেঁচে গেল। কিন্তু রিনি?
চোরা শিকারিদের মধ্যে প্রধান শিকারিটা পালানোর সময় রাগের মাথায় তার হাতের ভারী লোহার রডটা দিয়ে রিনির পিঠে এক সজোরে আঘাত করেছিল। রিনি ছিটকে গিয়ে পড়েছিল বনের ভেতরের এক ঝোপের মধ্যে।
পরদিন সকালে মিলির যখন ঘুম ভাঙল, তখন চারপাশটা বড্ড ফাঁকা হয়ে গেছে। ঘুম থেকে উঠে সে সোজা দৌড়ে গেল পেয়ারা গাছটার নিচে।
"রিনি! রিনি!" বলে সে চিৎকার করতে লাগল। কিন্তু কোনো সাড়া নেই।
মিলি ঘরের ভেতর গিয়ে দেখল, জিনিয়া এককোণে বসে আছে, তার চোখে জল। কিন্তু রিনি সেখানে নেই। মিলির বাবা মাথা নিচু করে বারান্দায় বসে ছিলেন। মিলি বাবার কাছে গিয়ে তাঁর জামা টেনে ধরল, "বাবা, রিনি কোথায়? ও আসছে না কেন?"
বাবা কোনো কথা বলতে পারলেন না, শুধু চোখটা মুছে বাইরের আকাশের দিকে আঙুল তুললেন।  তারপর রাতের ঘটনা তাকে খুলে বললেন। 

মিলি বুঝতে পারল। জিনিয়াকে ওই ভয়ঙ্কর চোরা শিকারিদের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে রিনি নিজের জীবনের বাজি রেখেছিল। সে তার নতুন বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু মিলির মন এই রূঢ় সত্যটাকে এভাবে মানতে চাইল না।

মিলি উঠোনে এসে আকাশের দিকে তাকাল। একঝাঁক পাখি তখন ডানায় দুপুরের রোদ মেখে নীল আকাশ চিরে উড়ে যাচ্ছিল কোনো এক অজানা দেশের উদ্দেশ্যে। মিলির মনে হলো, রিনি মরেনি। ওই মাদারির খেলার জং ধরা শিকল, ডুগডুগির নির্মম তাড়া আর এই পৃথিবীর বন্দিত্ব—সবকিছু থেকে সে আজ মুক্ত।

জিনিয়াকে বাঁচাতে গিয়ে রিনি সত্যিই পাখি হয়ে উড়ে গেল। যে উড়াল দেওয়ার স্বপ্ন মিলি প্রতি রাতে ঠাকুমার বুকে শুয়ে দেখত, রিনি আজ সেই স্বপ্নটাকে সত্যি করে দিয়ে মহাশূন্যের ডানায় ভর দিয়ে স্বাধীন, মুক্ত এক পাখি হয়ে গেছে। মিলি চোখের জল মুছে হাসল, কারণ সে জানে, রিনি এখন যেখানেই আছে, খুব শান্তিতে আছে, ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে এক দেশ থেকে অন্য দেশে।


No comments:

Post a Comment