আবাহন
মনোমিতা চক্রবর্তী
শরতের মেঘমুক্ত নীল আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়াচ্ছে। দিগন্ত জোড়া কাশফুলের দোলায় যেন উৎসবের আগমনী বার্তা। শিউলির গন্ধে ভরা বাতাস আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের আওয়াজ সব মিলিয়ে শহরটা যেন কয়েক দিনের জন্য তার চেনা রূপটা বদলে ফেলেছে।
পুজো এসে গেছে। শহরের বনেদি রায়বাড়িটিও সেজে উঠেছে আপন সাজে। এককালে এই বাড়িটি জমিদার বাড়ি ছিল। মহাসমারোহে দুর্গাপূজা হতো। সময়ের সঙ্গে অনেক জৌলুস ম্লান হয়ে গেলেও এই চারটি দিন বাড়ির কর্তা-গিন্নি সাধ্যমতো আয়োজন করেন। বিশাল ঠাকুরদালান, লাল মেঝে, উঁচু ছাদ, পুরোনো কাঠের দরজা আর দেয়ালে ঝোলানো পূর্বপুরুষদের ছবি, সবকিছুতেই যেন ইতিহাসের গন্ধ। এই বাড়িতে বহু বছর ধরে ঢাক বাজায় বাবলু ঢাকির পরিবার। কিন্তু এবছর বাবলু অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার পক্ষে ঢাক বাজানো সম্ভব নয়।
মাস তিনেক ধরে শয্যাশায়ী বাবার পাশে বসে জয়ী বলল-- বাবা তুমি তো এবার রায়বাড়িতে ঢাক বাজাতে যেতে পারবে না। এটাই তো আমাদের রুটি-রুজি। তুমি অনুমতি দিলে আমি আর ভাই রায়বাড়িতে যাই?
বাবলু অবাক হয়ে বলল-- জয়ন্ত তো ছোট। সবে বারো বছরে পড়ল। ও কি পারবে ঢাক বাজাতে?
জয়ী মৃদু হেসে বলল-- ভাই মোটামুটি পারে। তবে ঢাকটা তো আমি বাজাব।
-- কী তুই? তুই ঢাক বাজাবি?
-- আমি তোমার মেয়ে বাবা! আমি ঢাক বাজাতে পারব না, এটা কখনও হয়?
জয়ী ঢাকটা নিয়ে বাজাতে শুরু করল। মেয়ের ঢাক বাজানো দেখে খুশিতে বাবলুর চোখ ভিজে গেল।
জয়ী ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে পুজোর মণ্ডপে ঘুরেছে। ঢাক ওর কাছে শুধু একটা বাদ্যযন্ত্র নয়। এটা ওদের রুটি রুজির মাধ্যম , ওর শৈশব, ওর নিজের পরিচয়।
অবশেষে জয়ী ছোট ভাই জয়ন্তকে নিয়ে রায়বাড়িতে ঢাক বাজাতে এলো। বাড়ির কর্তা-গিন্নি তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। বহু বছর পর বাবলুর পরিবর্তে তার মেয়েকে ঢাক হাতে দেখে গিন্নির চোখে বিস্ময় আর স্নেহ ফুটে উঠল।
বাড়ির পুরোনো কাজের লোক শেফালিও সকাল থেকে ব্যস্ত। তার সঙ্গে এসেছিল তার ষোলো বছরের মেয়ে পরী। এ বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে সে। শান্ত, মিষ্টি, পড়াশোনায় মনোযোগী মেয়ে। ছোটবেলাতেই তার বাবা অন্য এক মহিলার হাত ধরে নতুন সংসারে চলে গিয়েছিল। শেফালি তাকে বুকে করে বড় করেছে। এতো দিন শেফালিকে সঙ্গ দিয়েছিল ওর মা।কিন্তু সাত মাস আগে শেফালির মা মারা যাওয়ায় পুজোর দিনগুলোতে পরীকে একা বস্তির ঘরে রেখে আসতে পারেনি সে। তাই গিন্নির অনুমতি নিয়ে মেয়েকে সঙ্গে এনেছে।
জয়ী পরীর দিকে তাকিয়ে বলল-- ভালোই করেছিস পরী। আমরা সকলে মিলে পুজোও দেখব, আনন্দও করব। তবে পড়াশোনাটা যেন ভুলে যাস না বোন।ওটাই আমাদের বাঁচার একমাত্র পথ।
প্রথম দু-একটা দিন আনন্দেই কাটল। বাড়ির উঠোনে অতিথিদের আনাগোনা বাড়ল। ষষ্ঠী পেরিয়ে সপ্তমী এল। ধূপ, ফুল, ভোগের গন্ধ আর জয়ীর ঢাকের তালে বাড়িটা যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেল। এর মধ্যেই রায়বাড়ির বড় ছেলে অর্ণব বিদেশ থেকে স্ত্রী তনয়া ও তিন বছরের ছেলে মেঘকে নিয়ে ফিরল। অর্ণব শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত।বাড়ির গর্ব। এখানে অর্ণবকে সকলে শ্রদ্ধা করে ।তনয়া শান্ত স্বভাবের মেয়ে,তার পৃথিবী যেন ছোট্ট ছেলে মেঘকে ঘিরেই। কিন্তু জয়ীর চোখে ধীরে ধীরে কিছু বিষয় ধরা পড়ল। অর্ণবের চোখের চাহনি একদম ভালো না।মেয়েদের দিকে কেমন একটা অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে থাকে।জয়ী অর্ণবের এইভাবে তাকানোর মানে বোঝে।কারণ এইসব ব্যাপারে মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কাজ করে।মেয়েরা ঠিক বুঝে যায় কার চাহনিতে কী রয়েছে। জয়ী এমন কটমট করে অর্ণবের দিকে তাকায় যে সে বুঝে যায় জয়ীর সঙ্গে সে কিছুই করতে পারবে না।
এরপর জয়ী খেয়াল করে অর্ণব সেই একই রকম চাহনি নিয়ে পরীকে দেখছে। আর পরী অর্ণবকে দেখলেই অস্বস্তিতে সরে যাচ্ছে।
জয়ী পরীকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলল -- দিদি, ওনাকে দেখলে আমার ভয় করে।
জয়ীর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। সে বলল --
শোন পরী তুই একা কোথাও যাবি না। প্রয়োজনে আমাকে ডাকবি। বুঝলি?
নবমীর সন্ধ্যায় ঠাকুরদালান আলোয় ভরে গেল। শঙ্খ, ঘণ্টা আর ঢাকের তালে চারদিক মুখরিত। জয়ী ঢাক বাজাচ্ছিল। হঠাৎ তেষ্টা পাওয়াতে সে জয়ন্তকে বলল-- ভাই, তুই একটু বাজা। আমি জল নিয়ে আসছি।
জল আনতে যাওয়ার পথে হঠাৎ সে একটি ঘর থেকে চাপা কান্নার শব্দ শুনল।
-- আমাকে যেতে দিন।
চমকে উঠে জয়ী বলল -- পরীর কণ্ঠ না !
জয়ী ছুটে গিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। --
পরী! ভয় পাবি না। আমি চলে এসেছি!
বাড়ির লোকজনকে ডাকতে ডাকতে দরজা খুলে গেল। ভেতরে অর্ণব পরীকে জোর করে আটকে রেখেছিল। জয়ী সঙ্গে সঙ্গে পরীকে নিজের আড়ালে নিয়ে দাঁড়াল।
চিৎকার শুনে সবাই ছুটে এল।
তনয়া সবকিছু বুঝে গেল। তার মনে পড়ল, বছর দুয়েক আগেও অর্ণবের এমন আচরণের জন্য সে তাকে একবার ক্ষমা করেছিল। অর্ণব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এমন ভুল আর হবে না। কিন্তু সেই ক্ষমাকে সে দুর্বলতা ভেবেছিল।
অর্ণব বলল-- তনয়া শোন, তুমি ভুল বুঝছ। এটা একটা সামান্য ভুল বোঝাবুঝি।
তনয়া শান্ত অথচ দৃঢ় গলায় বলল-- একবার তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম অর্ণব ! তোমাকে ক্ষমাও করেছিলাম। কিন্তু একই অন্যায়ের জন্য আর তোমাকে ক্ষমা করব না।
তনয়া পুলিশকে ফোন করে সব জানাল। তারপর ছেলেকে কোলে নিয়ে বলল-- আমি আমার ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। ও যেন কখনও না ভাবে, ক্ষমতা বা পরিচয় থাকলে অন্যের সম্মানকে অবহেলা করা যায়। তাই আজ আমি চুপ থাকব না।
রায়বাড়ির কর্তা বললেন-- আমরা একটা অমানুষ তৈরী করেছি। মা তনয়া, তুমি ঠিক কাজই করেছ। আমরা তোমার পাশে আছি।
পুলিশ এসে অর্ণবকে নিয়ে গেল। উঠোনে নেমে এল অদ্ভুত এক নীরবতা। এতক্ষণ যে বাড়ি ঢাক, শঙ্খ আর মানুষের কোলাহলে মুখর ছিল, সেখানে যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল।
বাড়ির কর্তা-গিন্নি ঠাকুরদালানের দিকে এগিয়ে গেলেন। কর্তা বললেন-- পুজো কেন বন্ধ করে রেখেছেন ঠাকুরমশাই ? অন্যায় হয়েছে, তার বিচার হবে। কিন্তু মায়ের পুজো থেমে থাকবে কেন? পুজো শুরু করুন।
কিছুক্ষণ পর ঠাকুরদালান থেকে আবার ঢাকের শব্দ ভেসে এল। জয়ী ঢাকের সামনে দাঁড়িয়ে দেবীর মুখের দিকে তাকাল। তার চোখে জল, কিন্তু মুখে দৃঢ়তা। সে ঢাক বাজাতে শুরু করল।
হঠাৎ দুহাত তুলে সে বলে উঠল-- মা, তোমার আশীর্বাদেই আজ অসুর নিধন হলো!
তনয়া ছেলেকে বুকে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শেফালিও তার মেয়েকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
পুরোহিতের কণ্ঠে ভেসে এল-- যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেণ সংস্থিতা…
জয়ীর মনে হল, আজ সে এই মন্ত্রের সত্যিকারের অর্থ বুঝতে পেরেছে। অসুর সবসময় দশমাথা নিয়ে আসে না। কখনও সে মানুষের রূপ নিয়েও আসে। আর দেবীও সবসময় শুধু প্রতিমার মধ্যেই থাকেন না। কখনও তিনি জয়ীর সাহসে, কখনও তনয়ার প্রতিবাদে, কখনও শেফালির মায়ের হৃদয়ে প্রকাশ পান।
বাইরে শরতের আকাশে চাঁদের আলো। কাশফুলগুলো মৃদু বাতাসে দুলছে। রায়বাড়ির ঠাকুরদালানে ঢাকের তালে ধ্বনি উঠল—জয় মা দুর্গার জয়।
জয়ী আবার ঢাক বাজাতে শুরু করল। তার মনে হল, দেবীর হাতে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়নি আজ। মানুষের মধ্যেই জেগে উঠেছে সেই শক্তি।

No comments:
Post a Comment