আলোর দিশারী
মধুমিতা দে রায়
স্টেশন চত্বরটা পেরিয়ে, বড় রাস্তা, তারপর ট্রাফিকটা বাঁদিকে রেখে ডানদিকে পোস্ট অফিসের সামনে ছেলেদের জটলাটা চোখে পড়ে তনিমার। অন্ধকারে জ্বলছে সিগারেটের বিন্দু বিন্দু ফুলকি, ধোঁয়ায় ভরে আছে জায়গাটা। অজানা এক আশঙ্কায় নিজের মধ্যে গুটিয়ে যায় তনিমা, যেমন শামুক নিজেকে গুটিয়ে নেয় বিপদ বোধ হলে।
আসলে ট্রেনটা আজ বড্ড লেট করে দিলো, অন্যদিন আটটার মধ্যে নৈহাটী পৌঁছে যায়। কিন্তু আজ ব্যারাকপুরে রেলট্রাকে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে তাই দুঘন্টা লেট। এই শীতের রাতে দশটা মানে বেশ রাত। এমন রাতগুলোতেই মুশকিল হয়ে যায় একা বাড়ি ফেরা। মা চেয়েছিল তনিমা মায়ের মতো স্কুলের একটা সরকারি চাকরি করুক। কিন্তু পছন্দের এই ব্যাংকের চাকরিতে জয়েন করা ইস্তক গত দু বছর রোজ শিয়ালদা থেকে নৈহাটীর এই যাতায়াত। বাড়িতে মা ছাড়া আছেনই বা কে, যে পথে একটু এগিয়ে নিয়ে যেতে আসবে। বাড়ির দূরত্ব হাঁটা পথে স্টেশন থেকে মিনিট পনেরো, তাই এই রাস্তাটুকু বরাবর হেঁটেই যাতায়াত করে তনিমা।
রাস্তায় এখন গুটিকয় লোকজন। কাঁধের ব্যাগটাকে শক্ত করে বুকের কাছে মুঠোতে চেপে ধরে এগিয়ে যেতে থাকে তনিমা। ছেলেগুলোর ওঁর দিকে চোখে পড়তেই ওদের হাসি মস্করার মাঝে কিছু তীর্যক কথাও যেন কানে ভেসে আসে -- "এতো রাতে একা একা চললে কোথায়, আমাদেরও একটু সাথে নাও"-- তারপর চাপা হাসির গুঞ্জন। অপ্রস্তুত বোধ করে তনিমা, একদল হায়নার সামনে এক অসহায় হরিণী যেন। নিজের বুকের ধুকপুক শব্দটা নিজের কানেই বাজছে। হঠাৎ পেছনে একটা ছায়া ছোট থেকে বড় হতে হতে ওর পাশে চলে এল। একজন বছর পঁচিশ তিরিশের পুরুষ! ওঁর দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তনিমা। জিন্স টিশার্টে, লম্বা-চওড়া ছেলেটির এক মুখ দাঁড়ি, হাতে গলায় মোটা রুপোর চেন। ছেলেটি বলল,"ভয়ের কিছু নেই। তুমি প্রভা ম্যামের মেয়ে তো? আমি ম্যামের ছাত্র ছিলাম। চলো বাড়ি পর্যন্ত আমি সাথে আছি।"
`সাথে আছি` কথাটায় যেন এক নিজস্বতা খুঁজে পেল তনিমা, ভরসা করতে ইচ্ছে হলো। বাধ্য মেয়ের মতো নিরুপায় তনিমা হাঁটতে লাগলো ওঁর পাশে পাশে। ওঁদের একসাথে দেখে মুহূর্তে ছেলেরদলও একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলো। জায়গাটা পেরিয়ে গেলে ছেলেটা তনিমাকে বলল, "জানো একবার ক্লাস সেভেনে ক্লাসের এক বন্ধুর পয়সা চুরি করেছিলাম ভালো টিফিন কিনবো বলে। ম্যাম জানতে পেরে সকলের সামনে আমাকে কিচ্ছু বলেননি, কিন্তু তারপর আমাকে আলাদা করে ডেকে ভালো করে বুঝিয়েছিলেন।"
বাড়ির দরজায় এসে তনিমা অনুরোধ করে "ভেতরে আসুননা মা খুশি হবেন আপনাকে দেখলে".. এমন সময় প্রভাদেবী দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
"আমাকে চিনতে পারলেন ম্যাম? আমি বিপ্লব।" প্রভাদেবী ভালো করে ওঁর মুখটা দেখে বলেন, "চিনব কি করে কতদিন দেখিনা বলতো। উচ্চ মাধ্যমিকের পর তো আর দেখাই হয়নি। কি করছিস রে এখন?"
"তারপর আর পড়িনি ম্যাম, বাবার গ্যারেজ সামলাচ্ছি।" একটু থেমে, ইতস্তত করে বিপ্লব বলে, "পড়াশোনাটা হয়তো আর করতে পারিনি ম্যাম, কিন্তু আপনি বলেছিলেন পড়াশোনাই সব নয়, ভালো মানুষ হওয়াটাই বড় কথা, সে চেষ্টা এখনো করি"...."আসছি ম্যাম", বলে প্রভাদেবীকে প্রণাম করে রাস্তার অন্ধকারে আস্তে আস্তে মিলিয়ে যায়।
বিপ্লবের যাবার পথের দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্তে তনিমার মনে হয় "মায়ের মতো স্কুলের শিক্ষিকা হলে হয়তো ভালোই হতো, জীবনে এমন আরও অনেক সুন্দর মুহূর্তের সাক্ষী হওয়া যেতো।"

No comments:
Post a Comment