Friday, October 9, 2026


 

ঘুম : একটি নীল ভূগোল
ফটিক চৌধুরী

ঘুম প্রতিরাতে মানুষের ভিতরে একটি অদৃশ্য ভূগোল খুলে দেয়। সারাদিনের শব্দ, মুখ, অপমান, ব্যর্থতা ও না-বলা কথাগুলো সেখানে এসে তাদের শেষ আশ্রয় খোঁজে। চোখ বন্ধ হলেই দিনের দৃশ্যপট ধীরে ধীরে মুছে যায়; পরিচিত পৃথিবী তার সীমারেখা হারায়, মানুষও নিজের নাম থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়।
ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্তে পরিচয়গুলো আলগা হয়ে আসে। বাবা, সন্তান, বন্ধু, শত্রু—এই সমস্ত নাম যেন দরজার বাইরে থেকে যায়। বিছানায় শুধু শরীরটি পড়ে থাকে; তার ভিতরের অদৃশ্য মানুষটি প্রবেশ করে অন্য এক সময়ে। সেখানে অতীত ও বর্তমান পাশাপাশি বসে থাকে। বহু বছরের পুরোনো একটি দুপুর হঠাৎ হাত বাড়িয়ে দেয়, আর মানুষ অজান্তেই তার দিকে ফিরে যায়।
স্বপ্ন সেই অদৃশ্য ভূগোলের গোপন শহর।
সেখানে হারানো বাড়িগুলোর জানালায় আবার আলো জ্বলে। বিস্মৃত মুখেরা কুয়াশা সরিয়ে সামনে আসে। মৃত সময়ের ভাঙা সিঁড়ি বেয়ে মানুষ নেমে যায় নিজেরই ফেলে আসা জীবনে। তখন বোঝা যায়, স্মৃতি কেবল অতীতের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়; সে আমাদের ভিতরে চাপা পড়ে থাকা এক সমান্তরাল শহর, যার দরজা সবসময় খোলা থাকে না।
অনিদ্রা সেই দরজার সামনে দীর্ঘ অপেক্ষা। বিছানা তখন বিশ্রামের স্থান নয়, এক নিঃশব্দ প্রহর। ঘড়ির কাঁটা এগোয়, কিন্তু রাত যেন একই জায়গায় জমাট বেঁধে থাকে। চিন্তাগুলো একে একে ফিরে আসে এবং মানুষকে নিজেরই ভিতরে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
তবু ঘুমের কাছে সবাই সমান। সম্পদ, পদমর্যাদা, পরিচয়—সবকিছুই চোখের পাতার বাইরে রেখে যেতে হয়। ঘুমের ভিতরে মানুষের কোনো বাহ্যিক পরিচয় থাকে না; থাকে শুধু তার ক্লান্ত শরীর এবং নিজের অজানা গভীরে পৌঁছানোর এক নিঃশব্দ আকাঙ্ক্ষা।
ভোর হলে সেই অদৃশ্য ভূগোল গুটিয়ে যায়।
জানালায় আলো পড়ে। ঘরের জিনিসপত্র আবার তাদের পরিচিত অর্থ ফিরে পায়। পৃথিবী আবার আমাদের নাম ধরে ডাকে। আমরা ফিরে আসি কাজের কাছে, মানুষের কাছে, অসমাপ্ত জীবনের কাছে।
তবু ভিতরে কিছু থেকে যায়।
হয়তো একটি অস্পষ্ট আলো।
হয়তো কোনো পুরোনো মুখের ছায়া।
হয়তো এমন একটি দরজা,
যার ওপারে আমরা রাতের জন্য
নিজেদের নাম ভুলে রেখেছিলাম।
ঘুম তাই শুধু বিশ্রাম নয়।
সে মানুষের ভিতরে লুকিয়ে থাকা আর-এক পৃথিবী—যেখানে প্রতিরাতে আমরা কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাই, আর ভোর হলে ফিরে এসে ভাবি, আমরা সত্যিই কোথায় ছিলাম?


 

রম্য রচনা

দশপ্রহরণ ধারিনী 

গৌতমেন্দু নন্দী


কৈলাস থেকে দেবী দুর্গার এই মর্ত্যে আগমন নিয়মিত বাৎসরিক ব্যাপার। চারদিনের জন্য পতি দেবতার সঙ্গ ছেড়ে স পুত্র কন্যা সহ মর্ত্যে পিতৃগৃহে যাত্রা করার সময় মহাদেব "বেস্ট অফ লাক" উচ্চারণ করেন কিনা জানা না থাকলেও স্ত্রী পুত্র কন্যা বিনে চ্যালা চামুন্ডাদের নিয়ে চারটা দিন যে সুখনিদ্রা দেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

কিন্তু এবার বেঁকে বসলেন মহাদেব ----
       " এবার মর্ত্যে যাওয়া বাদ দাও, কী হবে গিয়ে? তোমার ঐ দশপ্রহরণের এখন আর ধার নেই।  দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। নিজে নারী হয়ে নারীদের নিরাপত্তা কি রক্ষা করতে পারছ? খুন, হিংসা,ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। "অভয়া"র ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় গোটা মর্ত্যবাসী কতো বিক্ষোভ, প্রতিবাদ আন্দোলন করল সারা বছর জুড়ে। দোষীদের তো কোন শাস্তি হলোনা! পারলে ধর্ষক, হত্যাকারীদের  বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে? অথচ তুমি নাকি নারী শক্তির প্রতীক! 
      
তাছাড়া প্রতিবছর তোমার মর্ত্যে যাওয়ার প্রাক্কালে বন্যা,ভাঙ্গন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্যার্তদের  দুর্দশা যেন নিয়মিত বাৎসরিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের দুঃখ, যন্ত্রণা প্রশমনে এখন তুমি ফেইলইওর। অসময়ে নিম্নচাপ,ভারী বর্ষণ, বন্যা,ভাঙ্গন -----এর কী জবাব দেবে তুমি?

      তোমার মর্ত্যে আগমনের আগমনী বার্তা মহালয়ার পূণ্য প্রভাতে মন্দ্রিত হয় দেবী বন্দনার প্রথম মন্ত্রে যে মর্ত্যালোকে, সেই মর্ত্যবাসী দরিদ্র, নিরন্ন, অসহায় মানুষগুলোর সামনে দাঁড়াবে কীভাবে? মর্ত্যবাসী প্রদত্ত বিশেষণ "দশপ্রহরণ ধারিনী"র মিথ্যে বোঝা আর কতদিন বহন করবে? সেই কবে অসুর দলন করেছিলে দশপ্রহরণে!

 বর্তমানে  দুষ্কৃতী, খুনী, ধর্ষক ---অসুরদের দমনে সেই প্রহরণ কি কোন কাজে লাগছে? এখন ঐসব "অবসোলেট"। দেখছনা মর্ত্যবাসী এখন  স্মার্টফোনে "নেট" এর মাধ্যমে ডিজিটাল অ্যাকসেসে কেমন আপডেট হয়ে উঠেছে। "কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা" প্রয়োগে অসাধ্য সাধন করে চলেছে!  আর তুমি! সেই মান্ধাতার আমলের অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে এ সময়ের অসুরদের বধ করতে মর্ত্যে যাচ্ছ?  
  
তোমার আগমনের বার্তায় মর্ত্যবাসী যখন আনন্দে উদ্বেলিত ঠিক তখনই বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে তারা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। এতো ব্যর্থতা নিয়েও মনুষ্য-- কুলের ভক্তি পূজা গ্রহণ করতে তোমার বিবেকে  বাধেনা? তাই বলছি, এবার নো মুভমেন্ট টুওয়ার্ডস....."
      
এবার পার্বতী বলে ওঠেন --" কিন্তু প্রভু, এই কটা দিনের জন্য ওরা যে প্রতীক্ষা করে থাকে। ব্যবসায়ীরা
পুজোর বাজারে দুটো পয়সার মুখ দেখে। লেখক-সাহিত্যিকরা দু-কলম লিখে অর্থ, খ্যাতি দুটোই অর্জন করে। ট্র্যাভেলার এজেন্সিগুলোও হোটেল,হোমস্টের ব্যবসায় লাভের মুখ দেখে এই পুজোর সময়েই। এগুলোওতো পজিটিভ সাইড নিঃসন্দেহে। আর বন্যা,ভাঙ্গন আছে বলেইতো টিকে আছে মর্ত্যের কিছু রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিশ্রুতিগুলো।যতো সমস্যা তত প্রতিশ্রুতি, তত রাজনৈতিক প্রচার।
যা রাজনৈতিক নেতাদের নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সাহায্য করে বৈকি !"

        পাল্টা যুক্তি দেন মহাদেব " কেন বুঝতে পারছনা তোমার পুজো ব্যাপারটা এখন "সেকেন্ডারী"।পুরোহিতরা পুজোয় পুরো মন দিতে পারছে কি?  তাদের সঙ্গেও এখন স্মার্টফোন। মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেই  মোবাইলের রিং টোন বেজে যায়। মনঃসংযোগে ব্যাঘাত ঘটে। তোমার সাবেকি চিন্ময়ী রূপটিও  আজ মর্ত্যে উপেক্ষিত। "থিম" এর নামে  তোমার মূর্তি তৈরি হচ্ছে শিশি,বোতল, কাগজ,দড়ি আরও কত কিছু দিয়ে। শিল্পকর্মের আড়ালে ভক্তি শ্রদ্ধা সব গায়েব। নিয়ম রক্ষায় বিশাল মন্ডপের এক কোনায় ছোট্ট মৃন্ময়ীর চিন্ময়ী রূপটি পূজিত হচ্ছে।

          যেখানে মর্ত্যেও এখন ঘন্টায় একশ,দুশো কিলোমিটার গতিতে যানবাহন ছুটছে সেখানে এখনও পড়ে আছে ঐ নৌকা বা ঘোড়াতেই।  আর নামেই "দশপ্রহরণ ধারিনী "!  ঐ দশ অস্ত্রের সম্মিলিত শক্তির চেয়ে এখন অনেক বেশি শক্তিশালী  এ কে ফর্টি ফাইভ, এ-কে ফর্টি সেভেন সহ আরও সব উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র, যেগুলো মর্ত্যের অসুরদের হাতে  এখন অ্যাভেইলেবল। তাদের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে চাইছে ত্রিশূল, রামদা, কুড়াল, তলোয়ার --এইসব অস্ত্র শস্ত্র নিয়ে!  এই সময়ের সন্ত্রাস দমনে  এগুলো এখন " অবসোলেটেড প্রহরণ....!! 

            শিব দুর্গা র এই সংলাপ শেষ হতে না হতেই  স্বপ্নভঙ্গ হয়ে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল মহালয়ার পূণ্য প্রভাতে  আর  কানে ভেসে আসতে লাগল  -- ---

      " জাগো তুমি জাগো, জাগো দুর্গা,জাগো দশপ্রহরণধারিনী ,অভয়া শক্তি বলপ্রদায়িনী তুমি জাগো......."

        


 


কবিতা 

শুভ বিজয়া

অপর্ণা সাহা


অচিনপুর থেকে উড়ে এলো একটি ম্যাসেজ;
দুর্গার ছবির সাথে ---
'শুভ বিজয়া'।

ছোট্ট শুভেচ্ছা। 

দুটি শব্দে প্রবল বিস্ফোরণ! 
যেন ইন্দোনেশিয়ার আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত! 
বুকের ভিতর লাভার উদগীরণ। 

মুঠোফোনে ঝুঁকে পড়ে মাথা। 

হাতের আঙুল 
যেন স্থবির পাথর 
নিথর নয়ন। 

স্তব্ধ চারিদিক,বধির পৃথিবী। 

সম্বিত ফিরে আসে 
ঢাকের আওয়াজে। 
বিষাদের সাথে ধ্বনিত---
আসছে বছর আবার হবে। 

লবনাক্ত চোখ ;
কম্পিত ঠোঁট আস্বাদ গ্রহণ করে 
ছোট্ট শুভেচ্ছা ---
শুভ বিজয়ার।


 

যে সমস্ত পথ নিঝুম

অজিত দেবনাথ 


যে-সমস্ত পথ নিঝুম, প্রতিক্ষণ অন্ধকারে ডুবে থাকে-
জ্যোৎস্না ভাসে অনন্তকাল।
যেখানে বিষণ্ণতা প্রবীণ, ব্যক্তিগত অসুখে নিশ্চুপ, নিস্পৃহ 
জন্মান্তর জলরঙে আঁকে অমল স্মৃতিপথ।
একলা পথের উদ্বৃত্ত ধুলোটুকু সরে গেলে 
চিরায়ত শস্যবীজের জন্ম হয়।
আলপথে পড়ে থাকা দীঘল রাত মুছে দেয় ঘুমন্ত পাখির পালক ঘাম।


 

আদিবাসী পিতা
শিশির আজম

কাঁটা আমাদের রক্ষা করেছিল। ছোট ছোট আলো, হাঙরের চোখ --
কীভাবে অসভ্য মেয়ে বড় হয় গাছের বাকলে,
জানতেন আদিবাসী পিতা। তরুলতা, চাঁদ, পাথরের স্তূপ
জড়ানো রাস্তার মতো মিলেমিশে -- বিষ ও অসুখে
নিশীথরাত্রির সিঁড়ি জ্বলে ওঠে।
শিখতে হয় না কিছু, মানতে হয় না।
নক্ষত্রের অন্ধকারে গ্রহ আবিষ্কার -- দূরত্ব চিহ্নিত করা
সাধারণ কাজ নয়।
তোমার হাতের ছাঁপ দেয়ালের গায়ে
সারি সারি। জগৎ ও শিল্পকলা, দুই সৃষ্টি -- কচুর পাতায়
নিরাশ্রয় রিপুকর্ম।


 

শম্বুক যাপন 

উৎপলেন্দু পাল 


ক্রমশঃ গুটিয়ে নিয়েছি নিজেকে খোলসের ভেতর 
এক সুদীর্ঘ শম্বুক যাপনে 

মিঠে জল একসময় বড়ো প্রিয় ছিলো আমার 
তবুও বাধ‍্যতায় সমুদ্র যাপন 

এখন রোজ লবনের পাহাড় গড়ি জীবনের বারান্দায় 
মৃত‍্যুবাণ খুঁজে পাবার প্রচেষ্টায় 

তারপর গড়িয়ে পড়ি তার শীর্ষ থেকে পাদে 
খোলস সমেত একান্ত গোপনে। 



 

ঘর

অমিত আভা


 এখনও আছে, জং ধরা চাবিটা।
শুধু ঘরটা আর খুঁজে পাই না।

তুমি চলে যাওয়ার পর দেয়ালগুলো একে একে কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেছে।

উঠোনে বিকেলের রোদ নামে, জানালায় বাতাস এসে দাঁড়ায়, কেউ আর ডাকে না।

মানচিত্রে ঠিকানাটা রয়ে গেছে, পথও ভুল হয়নি কোনোদিন— শুধু স্মৃতির ভেতর সেই বাড়িটা আর নেই।

একটা চৌকাঠ এখনও দাঁড়িয়ে আছে, শুকনো গাছের মতো।

ওপারে যাওয়ার কেউ নেই, এপারে ফেরারও না।


 

আরাম

মৃড়নাথ চক্রবর্তী 


একটা ব্যাং হাত-পা ছড়িয়ে 
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে 
সাপে গিলে ধরে রাখতে পারেনি 
উগরে দিয়েছে বহুক্ষণ আগে 
কচ্ছপ হেঁটে গেছে 
পৃথিবীর এ পিঠ থেকে ও পিঠ 
ব্যাঙাচিরা পিতা-মাতা হয়েছে 
পেঁচারা কোটরে বৃদ্ধ 

তবু একটা ব্যাং হাত-পা ছড়িয়ে 
চিৎ হয়ে শুয়ে আছে 

একটা মৃত ব্যাং


 

এবং খিদে

প্রাণেশ পাল 


এবং খিদে….

তথাগত, অনিশ্চয়তা ফুটপাথে, গণিকালয়ে

বৈধতা, অবৈধতা বড়ই প্রশ্নাতীত বিষয়

বরং উদযাপন করি জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী !


এবং খিদে….

তথাগত, জঠরের পলল স্তরে জীবন্ত জীবাশ্ম 

সোমালিয়া, সুদান, মরুভূমির তপ্ত দীর্ঘশ্বাস 

অভুক্ত কান্নায় নীরব শিশু মৃত্যু !


এবং খিদে….

তথাগত, শরনার্থী শিবিরে প্রিয়জনের রক্ত 

রঙিন সূর্যোদয়, শাশ্বত ভাতের লড়াই

শরনার্থী নৌকোয় খিদে, নিক্ষিপ্ত মানুষ অতলান্ত সাগরে !


এবং খিদে….

তথাগত, সুজাতার পরমান্ন ভক্ষণে

শুধুই বিত্তবান মহাপুরুষের উপাসনা প্রহর !


এবং খিদে....

তথাগত, মহাষ্টমীর মহাপ্রসাদ ভোগের লাইনে

আমাদের ছেলেবেলা ফিরে আসে !


 

ক্ষয়

প্রতিভা পাল 


জঙধরা ধাতুর মতো 

জীবনও পরিবর্তিত হয় তারপর, সম্পূর্ণ। 


প্রবর্তিত নিয়মের সমীক্ষায় দেখা যায়

আগের মতো নেই আর কিছু। 

তবে যা আছে 

আগের চেয়ে তা অনেক বেশি বিস্তৃত, 

পরিব্যাপ্ত। 


ক্ষয়ে ক্ষয়ে তৈরি হওয়া 

প্রশস্ত নদীখাত যেমন একসময় 

ক্ষয় লেখে না আর।


বয়ে চলা দেখে শুধু স্থির বিস্ময়ে....।


 

বালিশ  বিসর্গ হলে 
বিকাশ  দাশ  

এপারে আমি আর ওপারে তুমি  
আমাদের মাঝখানে একটা বালিশ  
কেমন বিসর্গ হয়ে আছে।  
দন্ত্য বর্ণের তৃতীয় আর কণ্ঠ্য বর্ণের দ্বিতীয়  
আমি আর তুমি এবং আমাদের দাম্পত্য।  

আমরা চুপ শুয়ে আছি  
কিছু সন্তাপের উপর তা দিয়ে  
বাশিশের কোনো তাপ নেই, যতটা অসূয়া  
ঠিক ততটাই ক্যামোফ্লাজ অসুখ  
ঠিক যতটা অন্তর্ভেদী।  

এপাশে আমি আর ওপাশে তুমি  
মাঝখানে বালিশ কেমন 
অযোগবাহ হয়ে খেলছে কৃপণ।  
"দুঃখ ' বললে ততটা দুর্বোধ্য লাগে না  
বালিশ কেবল বিসর্গ হয়ে দুঃখ বোনে 
আমাদের রাত কাঁথায় । 


 

পুজো
কৌস্তুভ গুপ্ত

পুজোর আড্ডাগুলো হারিয়ে যায় আস্তে আস্তে;

বিচ্ছিন্ন হতে হতে মনে হয় এবারে হয়তো বড় হয়ে গেছি।
ওভারটাইম, বোনাসের অপেক্ষায়, অপেক্ষা করে বাড়ির সবাই।
পঞ্চমীর সন্ধ্যায় ঘামে ভেজা শার্ট, পিঠের ব্যাগ ও একরাশ ক্লান্তি নিয়ে দেখি—
আমার চলে যাওয়া সময়ের টুকরো টুকরো ছবি।
আলো ঝলমলে রাস্তায়, বন্ধুরা মিলে ঠাকুর দেখার সে কী মজা!
সামনে বাস এসে দাঁড়ায়; 
ভিড় বাসের মাঝেও ওদের হাসির রব ক্লান্তি উড়িয়ে দেয় ফুৎকারে।
বাড়ির ইএমআই, বাবার ঔষধ, রান্নার তেল হলুদে জর্জরিত মনে
হঠাৎ যেন কাশফুলের দোলায় লেগে যায় আগমনী বাতাস।
ঘামে ভেজা কলারের গন্ধ ছাপিয়ে যায় শিউলির সুবাসে,
স্মৃতি কেটে যায়, আবার নতুন মুহূর্ত সৃষ্টির অভিযানে।
মনের অপ্রাপ্তিগুলো পিছনের সিটে জায়গা করে নেয়,
আচমকা বাস কন্ডাক্টর জানিয়ে দেয়— পুজো এসে গেছে। এবার নামতে হবে।


 

স্ক্রিন ও শারদপ্রেম
তপন মাইতি

শরতের আকাশ আজ নীল,
আর সাদা মেঘ ভেসে যায় ধীরে,
কাশফুলের ভিতর দিয়ে
তোমার অনলাইন আসার অপেক্ষা করি।
পুজো আসছে,
ঢাকের শব্দ এখনও দূরে,
তবু আমার ফোনের নীরব আলোয়
তোমার নামটি যেন আগমনী হয়ে ওঠে।
তুমি লিখো— “আসছ তো?”
আমি লিখি— “হয়তো…”
এই একটি শব্দের ভিতরেই
কত না বলা দেখা জমে থাকে।
শিউলির গন্ধ জানালায়,
শরৎ নেমে আসে নিঃশব্দে,
আর স্ক্রিনের ওপারে তুমি—
যেন কাছে থেকেও অনেক দূরের মানুষ।
মা আসবেন,
আলোয় ভরে উঠবে শহর,
তবু আমার সবচেয়ে বড় উৎসব
তোমার সঙ্গে একবার সত্যি দেখা হওয়া।


 

বিস্মৃতির নীলে

অনুপম বিশ্বাস 


চারিদিকে স্মৃতি জমতে জমতে
হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়া বিস্মৃতি
ভিজিয়ে দিল পুরোনো চিঠির অক্ষর।

দুই মানুষ—
একজন বুকের ভিতর আগলে রেখেছে অতীত,
আর একজন, পুড়িয়ে খেয়েছে স্মৃতির শেষ অন্ন।

দৃষ্টি গিয়ে পড়ে ধূসর জানালার দিকে;
কুয়াশা ঘিরে নিঃসঙ্গ গন্ধের আবরণ।
শুভ্র পাখা মেলে উড়ে যায় হারানো বিকেল।
তার জন্যই কি স্মৃতিকে ছুঁয়েছি আজ?
নাহলে অগোচরে ছায়া হয়ে রয়ে যেত
নব-অঙ্কুরিত একাকিত্ব।


 

কালিদাসকে খোলা চিঠি... 
আকাশলীনা ঢোল 

আমি এখন একুশ শতকে দাঁড়িয়ে 
আছি মহাকবি,
'মেঘদূত' লেখার বাসনা আমার নেই।
তবু আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে 
না জানি কেন তোমার কথাই মনে পড়ে -
আষাঢ় যায়, শ্রাবণ আসে, ভাদ্র মাসে 
প্লাবনে ভাসে চরাচর -
দুর্যোগের দিনেও মনে পড়ে, 'পততি পতত্রে 
বিচলিত পত্রে....'
ফিরে ফিরে যাই তোমার নির্বাসিত 
যক্ষের কাছে, যে তার প্রিয়াকে পাঠায় 
প্রেমের বার্তা, বিরহের বার্তা -
দেখতে দেখতে আশ্বিন এসে যায়,
মনে পড়ে 'ঋতুসংহার'।
কাব্যের আদিরস আজও ছুঁয়ে যায় 
প্রেম, মিলন, অনুরাগের মুহূর্তগুলোকে -
ব্যথিত হৃদয়ে পাই অস্থির শকুন্তলার স্পর্শ।
সেই কবে তুমি লিখেছিলে তার 
অভিজ্ঞান হারানোর কথা, আজ শৈশব-কৈশোর 
হারিয়ে, আজ তোমাকেই মনে পড়ে, হে মহাকবি।


 

ছবি 


শিল্পী- তিথি পাল সরকার 





শিল্পী- হৃদান সরকার, দ্বিতীয় শ্রেণি 





 


 

কবিতা/ ছড়া 


দুগ্গা এবার আসুক

সোমা দাশ

 

বিষাদমুঠি খোল

মুক্তোদানা ঝরুক,

লজ্জামুঠি খোল

কথারা সব ফুটুক,

মনের আগল খোল

মুক্ত বাতাস ঢুকুক,

ভয় গুলো সব মোছ

আঁধার যত কাটুক,

মেঘের চাদর সরাও

শিউলিরা খুব হাসুক,

টলমলে সরোবরে

দেখ পদ্মে ভ্রমর ঘোরে,

মাঠ ভরা কাশবনে

দুগ্গা এবার আসুক।


 

পূজা এলো

বি এম মিজানুর রহমান 

পূজা এলো শারদীয় 
সবাই খুশি আজ,
মন্ডব জুড়ে বেড়ে গেছে
নানান রকম কাজ।

দেবী এলো দারুণ সাজে
মিষ্টি ভীষণ মুখ,
যতো দেখি ততো তারে
লাগে মনে সুখ।

ঠাকুর মশাই ব্যস্ত ভারি
মন্ত্র জুড়ে সুর,
পূজা এলো দূর হয়ে যাক
অশান্তি যে দূর।

সমাজ থেকে উঠে যাক সব
অনাচার আর ভয়,
জয় মা দুর্গা দেবী মাতা
হোক তোমারি জয়


 

রোদন ভরা আগমনীর সুর

       কবিতা বণিক


শরতের সোনালি রোদ হৃদয় রাঙায়।
মেঘেরা নিয়েছে ছুটি শরৎ বেলায়।
কত শত কাশফুল হাসে দুলে দুলে।
শিউলিরা আগমনীর ঘোষণায় আলপনা আঁকে।

হঠাৎই সহস্রফণা জালে ধেয়ে আসে গর্জন তুলে
মুহূর্তে তাথৈ তাথৈ রবে লণ্ডভণ্ড করে ধরা তলে।
কত মানুষ, পশু, বাড়িঘরের হল ধ্বংস স্তুপ
মৃত্যু আর ধ্বংসের লীলায় দেখি কালভৈরবের রূপ।
বিষাদ-বেদনা ভরা কত না ব‍্যথাতুর হৃদয়
ইচ্ছেগুলো ডানা মেলে নীলকণ্ঠ পাখির পাখায়। 

মাতা পার্বতী ! দয়া করো তোমার সন্তানদেরে
শরত আলোর কমল ফোটাও দিশেহারা আঁধারে।
শারদ আকাশে মাগো ভাসাও তোমার আঁচলখানি,
শিশির সিক্ত শিউলি গন্ধে মুছে যাক যত গ্লানি।।

হিমালয়ের উপর যুগে যুগে তপস‍্যারত হাজারো মুনিঋষি।
জানার নেশায়, মানুষের লোভে আজ ক্ষত বিক্ষত দেবভূমি।
 ক্ষুধিত, তাপিত,লোভাতুর সব হৃদয়ের হয়ে ক্ষমা চাই, মাগো! 
প্রকৃতিরূপিণী হে গিরিজা! তোমার চরণ চুমি।।

 




রাম বাবু

সুশান্ত সেন 

                 
রাম বাবু ঘুরছেন এ ঘর ও ঘর 
ঘুরে ঘুরে তার বুক করে ধর ফর ।
ডান বুকে চিন চিন কি যেন কি ডাকে
শোনা যায় না কিছু পড়েন বিপাকে,
বঙ্কা কে ডেকে বলে 'ওরে শোন শোন 
বুকে কান দিয়ে ভাই শব্দটা গোন।'
একটা মিনিটে বুক কতবার বাজে
গুণে বল শিগগির' -বেহাল মেজাজে।
বঙ্কা ত ঘুম ভেঙে চোখ কচলিয়ে
শব্দ শুনতে বসে বুকে কান দিয়ে,
লোমে ভরা বুকে তার লাগে শুড়শুড়ি
হৃদয়ের শব্দের নেই কোনো জুড়ি ।



 

পরীর ছুটি

মি ষ্টু স র কা র


সূর্যটা চড়া হলো মেলে তার পাখা
সিলেবাসে ছুটিছুটি কতোরঙে আঁকা।

হাঁপছেড়ে বাঁচে ব্যাগ হাঁপছাড়ে পরী 
মনেভাবে গেমটাকে মোবাইলে ভরি।

একগাদা হোমটাস্ক গোটা মাস জুড়ে 
করতেই হবে শেষ সব-খাতা ভরে।

ইংরেজি অঙ্ক’টা প্র্যাকটিস করে 
মা’বলে এইবেলা রেখো শেষ করে।

নয়টায় আবৃত্তি, দুপুরেতে আঁকা 
বিকেলে নাচের ক্লাস নেই কোনো ফাঁকা।

অ্যাবাকাস, সাঁতার তো রোজকার রুল
ক্লান্তিতে ঘুম এসে চোখ ঢুলঢুল।

মোবাইলে প্রোজেক্টটা কমপ্লিট করে 
মনে ভাবে অ্যাপটাকে দেবেই উড়িয়ে।

একদিনও পার্কঘোরা হলোনা এবার 
মামারবাড়ি ! সেতো এক্সামের পর !

রেগে বলে ওমা আমি খেলবো কখন?
রুটিন মাফিক চলে ছুটি যে খতম ।


 

আগমনী সুরে শারদোৎসব

নবনীতা রক্ষিত


শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা,

মর্ত্যে আজ শুরু হলো আনন্দের খেলা।

কাশফুলের দোলাতে ভেসে আসে সুর,

মা দুর্গা আসছেন কত দূর-দূর।

 

ঢাকের কাঠিতে আজ বাজে আগমনী,

জাগে রে বাঙালির হৃদয়ের মণি।

আশ্বিনের দিনগুলোতে মাতোয়ারা মন,

পূজোর সুবাসে ভরা সারাটি ভুবন।

 

ষষ্ঠীতে বোধন আর সপ্তমীর আলো,

অষ্টমীর অঞ্জলি মনে লাগে ভালো।

সন্ধিপূজোর প্রদীপেতে ভক্তির ছোঁয়া,

নবমীর সাঁঝবেলা যেন স্বপ্নে ছাওয়া।

 

নতুন জামা পরে সব শিশুর হাসি,

পূজোর এই চারটে দিন বড্ড ভালোবাসি।

প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে কত রঙের বাহার,

উৎসবে মুছে যায় ভেদাভেদ আর।

 

দশমীতে বিজয়ার বিষাদের সুর,

মা যে ফিরে চললেন কৈলাসে দূর।

চোখের জলে বিদায় জানিয়ে বলি আবার—

"আসছে বছর আবার হবে," শুভ কামনার পার।