Sunday, October 11, 2026


 

(লেখকের পিতৃভিটা। বর্তমানে অন্য পরিবারের হাতে। 

সাবেক ভিটের মাটির একটি দেওয়াল এখনও রয়েছে।) 


ফিরে দেখা

বাণী প্রসাদ নাগ


জীবনের গোধূলি বেলায় মনের আয়নায় ভেসে ওঠে ছোটবেলার দুর্গাপুজোর ছবি। থাকতাম বীরভূমের ছোট্ট গ্রাম বড় তুড়িগ্রামে । গ্রামবাসীর সংখ্যা ছিল কম। কৃষি ও দিন মজুরী ছিল জীবিকা। শহরের ছোঁয়া তখনও তেমন লাগেনি।

বর্ষা শেষে শরতের আকাশে পুজো পুজো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। মাঠে, মাঠে কাশফুল, দীঘিতে পদ্ম পুজো আসছে বলে আগাম খবরের ঢাক বাজাত। শিউলির গন্ধে চারিদিক ম ম করত। গাছে গাছে স্থল পদ্ম ছেয়ে যেত। প্রতিমায় দু’ মাটি দেওয়ার কাজ চলত। মন্ডপে কচিকাঁচাদের ভিড় লেগেই থাকত। 



(গ্রামের দুর্গা মণ্ডপ) 

পুজো আরও কাছাকাছি এলে ছেলেমেয়েরা বাবা মাকে জামা,জামা করে ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। সকল পরিবারের পক্ষে সন্তানদের আবদার মেটানো সম্ভব হত না। কান্নাকাটিও বাদ যেত না। ছেলে মেয়ে সকলেই দড়ি ভরা প্যান্ট পড়ত। ইংলিশ কাট প্যান্ট তখন চালু ছিল না। মেয়েরা ঘটি হাতা ফ্রক পড়ত। জুতো বা চটি সকলের ভাগ্যে জুটত না। মেয়ে ও বৌদের সাধারণ দামের শাড়িতেই সন্তুষ্ট থাকা ছাড়া অন্য পথ ছিল না।


(গ্রামের সাবেক মন্দির) 

গ্রামে দুটি পুজো হত। একটি ঘোষাল বংশের অন্যটি ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণদের। প্রতিমার সাজসজ্জার বাড়াবাড়ি ছিল না। দৃষ্টিনন্দন একচালা প্রতিমার চল ছিল। শুদ্ররা মন্ডপের ভিতরে প্রবেশ করতে পারত না। অঞ্জলি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা ছিল। কাটা ফলের বদলে গোটা ফল দিতে হত। মন্দির চত্বরে মিষ্টি, তেলে ভাজার দোকান বসত। বিদ্যুতের আলো ছিল না। হ্যাজাক, ডে-লাইটের (ঝোলানো হ্যাজাক) আলো জ্বলত । মন্ডপের সামনে সামিয়ানা টাঙানো হত। ডেকরেশনে মুখ্য ছিল কলাগাছ। তবে লম্বা পাটের দড়িতে লাল নীল কাগজের পতাকা আঠা দিয়ে আটকে ঝোলানো হত। সেগুলি হাওয়ায় দুলত। নিম্ন সম্প্রদায়ের পুরুষ ও মহিলার মনে ক্ষোভ থাকলেও মন্ডপ বিমুখ হতে দেখা যেত না। ঢাক, সাথে কাসর ছিল পুজোর অঙ্গ। মাইকের চল ছিল না। বলি প্রথা ছিল। তবে আখ ও চালকুমড়ো ধুমধামে বলি হত। উচ্চ ও নিম্নবর্ণের পার্থক্য থাকলেও খুব নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর আরাধনা চলত। 


(বর্তমান লেখকের তৈরি করা মণ্ডপ ) 

পঞ্চাশের দশকে গ্রামে একজনেরই রেডিও ছিল। দুটি উঁচু বাঁশে এরিয়াল লাগানো থাকত। সেখান থেকে অন্য একটি তার রেডিওর সাথে যুক্ত হত। মহালয়ার গান শোনার চিন্তায় ঘুম আসত না। রাত থাকতেই মাইল খানেক পথ ছুটে যেতাম বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের ভরাট গলায় গান শুনতে। উঠানে বসার জায়গা হত না। তবু দাঁড়িয়ে শুনতে ক্লান্তি আসত না। 

পুজোর অনেক আগে থেকেই মাটির দেওয়াল খড়ি মাটি দিয়ে রঙ করা হত। পুজো আরও এগিয়ে এলে সব বাড়িতেই দশমীর তোড়জোড় দেখা যেত। গজা,গুড়ের পাটালি, নিমকি,নারকেলের নাড়ু, এসব ছিল দশমীর উপকরণ। 

সপ্তমীর সাতসকালে ঢাক বাজিয়ে দোলা নিয়ে মাঠের পুকুর থেকে ঘট ভরে নিয়ে এসে পুজার সূচনা হত। ঘট ভরা অনুষ্ঠানে মহিলা পুরুষ, কচিকাঁচা নেহাত কম জুটত না। 


(গ্রামের পোস্ট-অফিস)

উৎসব মুখর দিনগুলিতে কবিগানের আসর হতে দেখা যেত। সব সম্প্রদায়ের মানুষ তাতে অংশ নিত। তালপাতার ভেঁপু ছোটদের মুখে মুখে বাজত। খেলনা বন্দুকে বারুদের গন্ধ ভেসে আসত। কেউ কেউ ফোলানো বেলুন নিয়ে ছুটাছুটি করত। কেউ বা জলে সাবান গুলে সরু পেপের নল দিয়ে বুদ্বুদ তৈরি করে ওড়াতে থাকত। 

অষ্টমীর দিন খিঁচুড়ি ভোগ বিলি হত। নবমীর দিন অল্পবয়স্ক ছেলেরা নারকেল কাড়াকাড়িতে অংশ নিত। উপস্থিতির সংখ্যা থাকত নজর কাড়ার মত। 


(শীতকালের গ্রাম) 

দশমীতে গ্রাম জুড়ে গরু দৌড় শুরু হত। আট থেকে আশি এই আনন্দে সামিল হতে বাদ পড়ত না। হিন্দু-মুসলিম সকলকেই গরুর দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দেখা যেত। গরুর স্বাস্থ্য সাথে দৌড়ের গতি বিচার করে বিজয়ী ঘোষণা করে প্রাইজ দেওয়া হত । গরু দৌড় উৎসব ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। উৎসব শেষে বিসর্জনে সকলেই অংশ নিতেন। 


(বড় রাস্তা থেকে গ্রামে প্রবেশের পথ) 

সন্ধ্যায় কোলাকুলি ও প্রণাম সারার পালা। মিষ্টিমুখ চলত ঘরে ঘরে। বাংলার এই উৎসব যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে পরিবর্তনশীল সমাজে এর রূপ বদলেছে বা আগামীতে আরও বদলাবে।

ছবি- শৌভিক রায় 

লেখক পরিচিতি- শ্রী বাণী প্রসাদ নাগ ইসলামপুরের বাসিন্দা। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। বীরভূমের ছোট্ট `বড় তুড়িগ্রাম`-এ জন্ম হলেও পিতার কর্ম সূত্রে বড় হয়েছেন বিহারের কাটিহারে। তাঁর পিতা মৃত্যুঞ্জয় নাগ ছিলেন কাটিহারের সুপরিচিত শিক্ষক। উত্তরাধিকার সূত্রেই পিতার কাছ থেকে লেখার নেশা পেয়েছেন বাণী প্রসাদ। নিজের কোর্মা সূত্রে দীর্ঘদিন থেকে সপরিবারে ইসলামপুরে রয়েছেন। শহরের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে তিনি পরিচিত মুখ। বয়সজনিত কারণে আজকাল অধিকাংশ সময় ঘরে থাকলেও, লেখা ও পড়ার ক্ষেত্রে একইরকম সচল রয়েছেন তিনি।   

No comments:

Post a Comment