শিল্পী
অভিজিৎ সেন
পৈত্রিক সম্পত্তির মধ্যে পেয়েছে এক বিঘা চাষযোগ্য জমি, মাথা গোঁজার মতো ছোট্ট দুটি ঘর, এক ফালি উঠোন এবং তার প্রিয় একতারা। কৃষি কাজে মন নেই জগাই বাউরির। জমি আধি দিয়ে দিয়েছে। আধিয়ার যতটুকু দেয় তাতেই সে সন্তুষ্ট। একা মানুষের চলে যায়। করনায় মা বাবা দুজনেই চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছেন জীবন থেকে। জগাই নিজে গান লেখে, সুর দিয়ে একতারা বাজিয়ে মনের আনন্দে গেয়ে ওঠে। কী অসামান্য কন্ঠ তার,সকলের মন কেড়ে নেয় ! আত্মভোলা মানুষটি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় নদীর ধারে, ধানক্ষেতে। প্রকৃতিকে সে যে কী ভালোবাসে সে নিজেও জানে না ! তার গ্ৰামের মেঠো পথে কখনো কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, দেবদারু,নিম,আমলকি,কদম গাছের চাড়া এনে পুঁতে দেয়, শিশুর মতো যত্ন করে । এদিকে নিজের প্রতি থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। 'বিশ্ব পরিবেশ দিবসে'র দিন গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করে । পরিবেশ বিষয়ক গান বেঁধে গ্ৰামের ক্ষুদেদের নিয়ে গোটা গ্ৰামে প্রভাতফেরী করে । তার সহজ সরল শিশুর মতো আচরণে শিশুরা যেমন তাকে ভালবাসে, প্রকৃতিও যেন ! গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো তাদেরই একজন ভেবে নামধরে তাকে ডাকে,বলে,'জগাই চল্,খেলবি না,তুই শীতলা মন্দিরের ভেতরে চাঁপা গাছটি লাগিয়েছিলি। গাছটা বড়ো হয়েছ, কতো ফুল ফুটেছে । চল্ না আজ সেখানে যাই । ' জগাই ও সে কথা শুনে হাতে একতারা নিয়ে চললো সেখানে। রান্না করার কথা,ঘরের দরজায় তালা দেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো ।
ছবির মতো সুন্দর, দর্শনীয় তাদের গ্রামটি। এই গ্রামের বুকচিরে মুজনাই নদী বয়ে চলেছে । এই নদী শুধু এ গ্ৰামের একটি নদী মাত্র নয়,নদীটি গ্ৰামের মা । নদীর বুকে আবর্জনা ভরে গেলে,গ্ৰামের সকলে মিলে পরিস্কার করে। নদীর তীরেই হয় শ্যামা পূজা । গানের আসর বসে,বৈঁচি প্রতিযোগিতা হয় । নদী তীরবর্তী জমিগুলি পলি পড়ে পড়ে হয়েছে উর্বরা । শরৎকালের শান্ত নদী, বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। পাড় ভাঙ্গে। ঘর ভাঙ্গে। চাষের জমি নদীর বুকে মিশে যায়।এ নদীই গ্রামের মানুষদের মাছের যোগান দেয়, হয় জল সেচও । এখানকার মানুষের জীবন,জীবিকা ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়ে চলেছে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই মুজনাই নদীকে কেন্দ্র করে । এই নদীর তীরেই জীবনের নানা পর্যায় পার করে অন্তিমে এই নদীর জলেই মিশে যায় মৃতদেহ ছাই আকারে । নদীর পাড়ের এই শ্মশান-কালীমায়ের পূজাটি হয় ঘটাকরে । মুজনাই নদী এ গ্রামের মা। মায়ের মতন স্নেহের ছায়ায় গ্রামটিকে আগলে রেখেছে। নদীপাড়ে ও গ্রামে আছে অজস্র সবুজ গাছপালা,লতা-গুল্ম । জগাই বাউরির বাড়ি মুজনাই নদীর তীরে এই গ্রামে। গ্রামের নাম চাঁপাডাঙ্গা । গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষক। খুব কম সংখ্যক মানুষই চাকুরীজীবী । নদীর এপার ওপারে দুটি গ্রাম। জগাই এর বাড়িটি নদীর তীর সংলগ্ন। নদীর জলের অজস্র তরঙ্গ ভঙ্গ সে প্রত্যক্ষ করে আর মাছরাঙ্গার মতো এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে চেয়ে থাকে। আপন মনে হাসে। হাসতে হাসতে নিজের মধ্যে ডুবে যায়। ভেতরের ভাবনাগুলো কন্ঠ ঠেলে ঠোঁটের পাশে চলে এলে অপূর্ব মধুর গান বেরিয়ে আসে, মন হালকা হয়। প্রাণ খুলে সে গান ধরে। তার গান শুনে পথচারীরা মুহূর্তের জন্য হলেও দাঁড়িয়ে যায়, কেউ কেউ গুনগুন করে তার সঙ্গে গান করে। কী গভীর দরদ দিয়ে সে গানগুলো লিখে আবার দরদ ভরা কন্ঠে গানগুলো গায় ! মুঝনাই নদীর শীতল বাতাস, পাখিদের কলকাকলি এবং জগাই বাউরীর গান এই গ্রামের মানুষের কাছে সমার্থক বোধক । আবার কেজো লোকের কাছে সে একটা অকর্মণ, অপদার্থ। কেউ তাকে ডাকে 'পাগল 'বলে। কেউ বলে 'খ্যাপা'। যে যাই বলুক গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ তাকে ভালবাসে, স্নেহ করে তার শিশুসুলভ সারল্যের জন্য।
সূর্যোদয়ের আগেই সে উঠে পড়ে। তারপর একতারাটা সঙ্গে নিয়ে সবুজ মখমলে নরম শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে আপন মনে হেঁটে চলে যায়। আঁধার কেটে ভোর হওয়ার অলৌকিক দৃশ্যের আবেশে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ! কুসুমের মতো লাল সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে পূবের আকাশে আলো ছাড়াতে থাকে, তখন তাঁর একতারাটা বেজে ওঠে। ভোরের নির্মল আকাশে দূর মেঘের বুকে এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেলে তার একতারা বেজে ওঠে। উষা কালের সূর্যের আলো যখন মুজনাই নদীর প্রবাহে ঢেলে দেয় গলিত সোনা, নদীর বুকে ভেসে আসা শাপলা ফুল, সারারাত মাছ ধরে ক্লান্ত ডিঙ্গি-নৌকা এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন মাঝি আর মুজনাই-এর স্বচ্ছ টলটলে জলপ্রবাহের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ-- তার মনে কথা ও সুরের সঞ্চার করে, তখন একতারা বেজে ওঠে। প্রাতঃভ্রমণ করে সে নদীর পাড়ের সেই চাঁপা গাছটির নীচে বসে । ডুবে যায় গানে। এই গাছ যেন তার দোসর। এখানে না এলে তার ভালো লাগেনা। গ্রামের সবাই জানে সে এখানেই বসে থাকতে ভালবাসে। কেউ তার খোঁজ নিলে সবাই জানে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। রান্না করতে তার কোন অসুবিধা হয় না। গ্রামের লোকেরা তাকে কষ্ট করে রান্না করতে বারণ করে। তারা বলে সে যেন যেকোন বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নেয়। এ গ্রামের সবাই তাকে নিজের ছেলের মতোই ভাবে। কেউ তাকে বিয়ে করে সংসারী হতে বললে,সে কোন উত্তর দেয়না । আপন মনে থাকে। গ্রামের সবাই বুঝে গেছে বিয়েতে তার মন নেই। প্রকৃতি ,নদী,গাছপালা,পাখি গ্রাম,গান এবং তার একতারার সঙ্গেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে সে শিশুর মতো খেলা করে। আত্মভোলা হলেও আত্মসম্মানটি তার প্রবল। সে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে চায় না। নিজের কাজ নিজেই করে। রান্নাটাও সে নিজেই করে। যদিও এক বেলাই রাঁধে। সেটাই রাতে গরম করে খেয়ে নেয়। আর যেদিন গ্রামে কোন বড় পূজো অনুষ্ঠান থাকে, বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা গানের আসর,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে তার উপস্থিতি দেখার মতো। সে শুধু গান করেই চলে আসে না। সেই অনুষ্ঠানকে নিজের অনুষ্ঠান ভেবে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে । আর সে যেখানে থাকে গ্রামের লোক জানে সে কাজটি কতোটা নিপুণভাব করে । তার নাম ডাক আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে,সুকণ্ঠের জন্য । ভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠান করতে যায়। তারা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে যতটুক মূল্য দেয় তাতেই সে খুশি। তার এই স্বভাবের জন্য,সরলতার জন্য নির্লোভ-স্বভাবের জন্য তাকে ভিন্ন গ্রামের মানুষও ভালোবাসে ।
নিত্যদিনের মতই প্রাতঃভ্রমণ করেই সে বাড়ির উঠোনে নদীর দিকে মুখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর মনে মনে কিছু ভাবছে । ঠিক এই সময় তার বাবার খুব ভালো বন্ধু এ গ্রামের বাসিন্দা হরিহর বাউরি এসে তাকে ডাকছে, 'জগাই ও জাগাই অতো কি ভাবছিস ?'। আত্মমগ্ন জগাই হরিহর কাকুর ডাক প্রথমে শুনতেই পাইনি । এতটাই আত্মমগ্ন ছিল। আবার যখন হরিহর কাকু তার কাছে এসে জোরে জোরে ডাকলো তখন সে চমকে উঠলো এবং তাকিয়ে দেখে হরিহর কাকু । সে বলল, 'কাকু কখন এসেছো । আমি তোমার ডাক শুনতে পাইনি প্রথমে । কিছু মনে করোনা । একটা গান নিয়ে ভাবছিলাম'। হরিহর কাকু বললো, 'নারে না কিছু ভাবি নি আমি কি তোকে জানি না ? তোর জন্ম থেকে তোকে দেখছি। তুই হলি জাত শিল্পী । তুই ভাবের ঘোরে থাকবি না তো আমি থাকবো, আমি চাষ করি রস কষ বলে কিছু নেই আমার। তুই যে কত সুন্দর সুন্দর গান বাঁধিস, গান করিস তাতেই আমার মনটা ভরে যায়। তোর বাবা মা নেই, তাই বলে কি তোকে দেখার লোক নেই? তোর ভালো-মন্দ আমার থেকে কে বেশি দেখবে? তোর বাবা আমার পরম বন্ধু ছিল। তোর বাবা-মা থাকতে এই বাড়িতে কত সময় কাটিয়েছি। তারাও আমাকে কত আদর যত্ন স্নেহ করতো। আজ তারা নেই আমি তো আছি। শোন তোর এভাবে জীবন কাটানো চলবে না। এবার তোকে সংসারী হতেই হবে। আমারও বয়স হচ্ছে আমার ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তোরা তো প্রায় একই বয়সের । জানি তোর সংসারে মন নেই। জমির দায়িত্ব ভাগচাষীদের উপর ছেড়ে দিয়েছিস । এভাবে হাত পুড়িয়ে কতদিন চলবে। আর শোন বয়স বাড়বে মনে রাখিস জীবনে একজন সাথীর দরকার। কে বলেছে বিয়ে করলে সংসারী হলে তোর গান তোর জীবন থেকে চলে যাবে ? আমি তোর জন্য এমনই একটি মেয়ের সন্ধান করেছি যে তোকে ভালো রাখবে। তোকে বুঝবে। তোর গান করাও পছন্দ করবে । আমি যা করছি তোর বাবা-মা থাকলে সেটাই করতো '। গ্রামের কাকিমা জেঠিমা এবং বন্ধুরা তাকে কতবার বিয়ের কথা বলেছে। সে কখনো রাজি হয়নি। সে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। শুনে হেসে বেরিয়ে গেছে সেখান থেকে। কিন্তু হরিহর কাকুর বিষয়টা আলাদা। বাবার পরে তাকেই সে পিতৃস্থানীয় মনে করে। শ্রদ্ধা করে। তাঁর কথা অমান্য সে করার কথা মনেও ভাবে না। এবং নিজের অসুবিধার কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত কাকুর কথাতেই রাজি হয়ে গেলো।
সে বিয়েতে রাজি হয়েছে এই কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের লোকেদের আনন্দের সীমা নেই। গ্রামে যেন উৎসব লেগে গেলো। কিছু নিন্দুকেরা সবখানেই থাকে তারা আবার বলছে, হরিহর কাজটা ঠিক করলো না। জগাই 'ভবঘুরে' ছেলে । গান,নদী যার জীবন,প্রকৃতিতে পাখির মতন মুক্ত জীবন যাপন করতে যে পছন্দ করে সে আবার সংসারী হবে ? এ সংসার কদিন টেকে দেখো ! হরিহর কাকুর অভিভাবকত্বে পাশের একটি গ্ৰামে বিয়ে ঠিক হলো। এটা কার্তিক মাস, বিয়ে আশ্বিন মাসে। কাকু তার সম্পর্কে সব কথাই বলেছে । গোপন করেনি । জগাই সেই গ্ৰামে বেশ কয়েক বার গানের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছে । তার মধুর ব্যবহার তাদের মনকে ছুঁয়ে গেছে। আজ সে সেই গ্ৰামের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধতে চলেছে। ঐ গ্ৰামের মানুষেরা ভালো ভাবেই নিচ্ছে। আনন্দের কারণ একজন ভালো শিল্পীকে পাচ্ছে। মুজনাই তীরের এই মহেশডাঙ্গা গ্ৰামটির শিল্প-সাংস্কৃতি চর্চার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে।
তিন বোন। মা ও বাবা । বাবা ধনেশ্বর বাউরী কৃষিজীবী। বিঘা দশেক জমি, একটি বড়ো পুকুর আছে। সারাবছর মাছ সেখান থেকে পেয়ে যায়। কিছু বিক্রি করে। জমির ফসলেই বছর চলে যায়। মুজনাই নদীর পলি সমৃদ্ধ মাটি প্রচুর পরিমাণে ফসলের যোগান দেয়। মুজনাই নদীকে ধনেশ্বর 'মা' বলেই ডাকে । জগাইকে তার শ্বশুর পণ হিসেবে এক লাখ টাকা এবং মূল্যবান সামগ্রী দিতে চেয়েছে । জগাই পরিষ্কার বলেছে,'জগাই দরিদ্র্য তাই বলে সম্পর্কের মূল্য সে বৈষয়িক মূল্যের দাঁড়িপাল্লায় চড়াতে পারবেনা। মনের দাম অনেক বেশি আমার কাছে। আমি বাণিজ্য করতে আসিনি । মনের দাবি শুধুমাত্র মনের মানুষের কাছেই হতে পারে অন্য কোথাও নয় । দেনা-পাওনার কথা এলে আমি বিয়েতে মত
দিতে পারবো না। ' এরপর আর কোন কথা নেই। জগাই যে কতোটা ভালো মনের মানুষ এবং তার আত্মসম্মান কতোটা প্রবল বুঝতে তাদের অসুবিধা হলো না। যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার নাম তরী। তরী এর আগে জগাইকে গানের আসর দেখেছিল, তার গান শুনেছিল। জগায়ের গান তার ভালো লাগতো, আজ তার কথা,আত্মসম্মান বোধ দেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো । এমন মানুষকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে কোনো দ্বিধা থাকলোনা তার । ওদের বিয়ে হয়ে গেলো। শুরু হলো জগাই আর তরীর সংসার জীবন। মুজনায়ের শান্ত প্রাণবন্ত উচ্ছল তরঙ্গের মতো আন্দোলিত হতে হতে ওদের জীবন বয়ে চললো । পূর্ণিমার রাতের স্নিগ্ধ মাদকতার আবেশে মিশে অনুরাগ,গানের সুরে- স্বরে মুজনাই তীরও উঠলো ময়ূর-ময়ূরীর মতো নেচে। বসন্ত ওদের জীবনে এখন বারোমাস । ফুল্লোরার বারোমাস্যা ছুঁতে পারেনা তাদের মধুর মুহূর্তগুলো। তরী,জগায়ের এতদিনের জীবন যাপনের কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসে রাশ টানলেও, শিল্পী রং স্বাধীনতায় নয়। বরং তাকে মুক্ত করে দিয়েছে সংসারের দায়িত্ব থেকে। তরী হাসিমুখে কাজ করে। জগাই এখন আরও বেশি করে গান বাঁধে,তরী অবসর সময়ে গান শোনে, সঙ্গে সঙ্গে গুণগুণীয় ওঠে । তরী উচ্চমাধ্যমিক পাশ। সংসারের হাল ধরবার জন্য গ্ৰামের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের বাড়িতে টিউশন দিয়ে থাকে । সেলাই মেশিন আছে। মহিলাদের এবং বাচ্চাদের জামাকাপড় শেলাই করে। আর জমি থেকে যা ফসল উঠে আসে তাতে তাদের এখন ভালোই চলে যায়। জগাই,তরীর মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে।আবার বাবাকেও। জগাই উদাসীন,আত্মভোলা। তরীকে তার একতারা আর গানের মতই ভালোবাসে । ওর সব কথা শোনে। তরীও জগায়ের হৃদয়ের সকাল অলিগলির স্পন্দন বুঝতে পারে । ওরা দুজনে দুজনের ভালো মন্দ সব বোঝে । দুজন দুজনের চোখের ভাষা পড়তে পারে। একে অপরের জন্যেই যেন এরা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ঠিকই বলেছিলেন--'খুঁজিয়া পাইলো যেন হাঁড়ির মতো সড়া' ।
জীবন গড়িয়ে গেলো । কেটে গেছে দুবছর। গ্ৰামের একমাত্র মেঠো পথটি পাকা হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর এঁকে বেঁকে মিশে গেছে জাতীয় সরকের সঙ্গে । গ্ৰামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। বাঁকুড়া ও বীরভূমের দুজন শিক্ষক এস.এস.সি পরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। দুজনেই কম বয়েসের । অবিবাহিত। জগাই এর কণ্ঠে বাউল গান শুনে দুই শিক্ষকই বিস্মিত। ওনারাও গ্ৰামেরই ছেলে। এ গ্ৰামেই ভাড়া থাকে । জগাই এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। জগাই কে তাদের প্রকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যের কথা,মানুষের জীবন জীবিকার কথা,লাল মাটির কথা, বাউল সম্প্রদায়ের কথা, তাদের বিশেষ জীবনাচরণের কথা, জয়দেবের মেলার কথা, বাঁকুড়া, বীরভূমের প্রাচীন ইতিহাসের গল্প, লোকগাথার কথা বলে-- সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে আর তার থেকে গানের প্রাণের রসদ সংগ্রহ করে। সে নতুন নতুন গান বাঁধে। তরীর প্রেম,বাউল দর্শনের গভীর উপলব্ধি তার গানকে আরও প্রাণবন্ত করে এবং যুক্ত করে সর্বজনীন মাত্রা।
মুজনাই এর তরঙ্গে মিশে বয়ে চলেছে সময়। জগাই আর তরী আর একা নেই । ওদের যমজ সন্তান হয়েছে। একটি ছেলে অন্যটি মেয়ে। বিহান ও বেলা । আত্মভোলা জগাই আজকাল মুজনাই এর সেই বকুল গাছের নীচেই বেশিরভাগ সময় কাটায় । সুন্দর করে বাঁশের মাচা বানিয়ে তার উপরে বাঁশের ছাদ দিয়ে নিয়েছে। মুজনাই এর সবুজ ঘাসের মখমলি পাড়, জলের তরঙ্গ,দুই তীরের জনজীবন, নৌকা,মাঝি,আবাদি জমি, নানান শ্রেণীর বৃক্ষ, পাখির কলকাকলি, শ্মশানের নিস্তব্ধতায় এমনভাবে ডুবে থাকে বাড়ি ফেরার কথা বেমালুম ভুলে যায়। সে আজকাল কী এক গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে দূরে অনেক দূরে।
প্রকৃতি অপূর্ব সৌন্দর্য্যের পশরা সাজিয়ে মুজনাই নদীর তীরে অবস্থিত গ্ৰামগুলোকে ভরিয়ে তুললেও
বর্ষাকালে কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, গ্ৰামবাসীরা জানেন। এবার বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে অসহনীয় গরম আর কালবৈশাখীর রুদ্র নৃত্য জীবনকে তছনছ করে রেখেছে। গরমের পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে । অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন প্রকৃতির অভিশাপ হিসেবে নেমে আসছে মানুষের জীবনে । তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয় কেউই। জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরম পার করে এলো আষাঢ় মাস। মাসের শুরু থেকেই প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে চলেছে। গ্রামের মাঠ পথ সবই জলে একাকার। ঘন কালো মেঘে সারাদিন আকাশ থাকছে ঢাকা। বাইরে বেরোনোর কোন উপায় নেই। বাড়ির মধ্যেই বন্দী হয়ে আছে সবাই। বৃষ্টির সাথে সাথে নেমে আসে বিকট আওয়াজের বজ্রপাত। এ ধরনের বজ্রপাত এর আগে মানুষ শোনেনি। পাহাড়ের জল এই মুজনাই নদীর প্রবাহ ধরে বয়ে যায়, জলের পরিমাণ যায় বেড়ে । গত তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি চলছে। নদীর জল বিপদসীমাকে ছুঁয়ে গেছে নদী বাঁধের একটি দুর্বল অংশ ভেঙে গেছে। সেই দুর্বল ফাটল দিয়েই জল ঢুকে গেছে গ্রামের ভেতর। এমন প্লাবন গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে উঠে আসছে। বাড়িঘর, গৃহপালিত পশু বন্যার রুদ্র আঘাতে ভেসে চলে যাচ্ছে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছি একটি নিকটবর্তী বিদ্যালয়। একদিকে বাস করতে হচ্ছে মানুষকে এবং গৃহপালিত পশুদের । জগাই এর গ্রামের সবাই সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। দুই শিশু সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে তরী তাদের নিয়ে গ্রামের অন্যান্যদের সঙ্গে ছুটে চলেছে । এখানে পৌঁছে একটি নিরাপদ স্থানে কিছুক্ষণ স্থির হওয়ার পর, তার মনে পড়ল তার স্বামী জগাই আসেনি।
গ্রামের লোকেদের কাছে জানতে চাইলো জগাই কোথায় আছে ? তাকে কেউ দেখেছে কি না ? তারাও সে কথা বলতে পারল না। প্রাণ বাঁচানোই যেখানে বড় বিষয়, সেখানে কে কার খোঁজ রাখে ? যে যেমন পেরেছে পরিবার নিয়ে ছুটে এসেছে এখানে । জগাই যেহেতু বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে ঘুরে বেড়ায় অথবা নদীর ধারে বকুল গাছটার নীচে বসে থাকে তাই তার কথা এমন তান্ডবের সময় কারোই মনে ছিল না। তরী এবার ব্যস্ত হয়ে উঠলো জবাইয়ের জন্য। শিশু দুটোকে রেখে সে আবার গ্রামের উদ্দেশ্যে যাওয়ার উদ্যোগ করলে গ্ৰামের বয়স্ক লোকেরা তাকে বাধা দিল। তাকে যেতে বারণ করলো। শেষে গ্রামের কয়েকটি যুবক ছেলে চলল জগাইকে খুঁজতে। তরীর মনের অবস্থা বুঝে গ্রামের মহিলারা তার বাচ্চা দুটোকে তাদের কাছে রেখে দিল এবং তরীকে স্বামীর খোঁজে যেতে দিল। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরে চলেছে।
ঘন কালো মেঘ আজ যেন রাক্ষুসে হা করে তাদের গোটা গ্রামকটিকে গিলে ফেলবে। পথ কোথায় ? চতুর্দিকে শুধু জল আর জল। এত জল তরী জীবনে প্রথম দেখছে। বন্যা হয়েছে এর আগে কিন্তু এ যে মহাপ্লাবন। গ্রামের যুবক ছেলেদের দলটি একদিকে খোঁজার চেষ্টা করছে জগাই কে । গ্রামের কাছাকাছি আসতেই তারা দেখতে পেলো বাঁধে যে ফাটলটি তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে গেছে এবং গ্রামের একটি অংশ নদীর বুকে তলিয়ে গেছে । তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না, তরীও পারেনি ফিরে এসেছে নিরাপদ আশ্রয়ে।
প্রবল উৎকণ্ঠ নিয়ে তরীর সময় কেটে চলেছে। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করল। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। প্রায় অলৌকিকভাবে সে রাতে আর বৃষ্টি হলো না। নদীর জল কমতে শুরু করল। সকাল হতে না হতেই গ্রামের জল নেমে গেল। নদীর জল বিপদসীমা থেকে নীচে নেমে এসেছে । সুন্দর সাজানো গ্রামটি বিভৎস আকার ধারণ করেছে । এবার জগাইকে খুঁজতে তরী সম্ভাব্য সকল স্থানে প্রথম খুঁজে দেখে কিন্তু পায়না। নদীর গ্রাসে গ্রামের যে অংশটি অক্ষত থেকে যায় তার মধ্যে জগাই এর বাড়িটিও পড়ে । তরী বাড়ি ফিরে এলো। ঘরের অবস্থা শোচনীয় । বন্যার জলে সব জিনিস ওলট-পালট হয়ে গেছে। জগাই এর গানের খাতাটি সম্পূর্ণ ভিজে গেছে এবং ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। স্বামীর সব জিনিসের দিকে নজর যাচ্ছে এবং কান্নায় তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখন তার নজর পড়লো ঘরে একতারাটা নেই । তরীর মনে পড়ল সেদিন যখন আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে, নদীর তীরে এক নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই দৃশ্য দেখে জগাই আনন্দে একতারাটি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার মা অর্থাৎ মূজনাই নদীর তীরে সেই বকুল গাছটির কাছে । তার মনে এই কালো মেঘ গভীর ভাবের জন্ম দিয়েছে। এবার তার একতারা উঠবে গেয়ে। তরী তাকে বারণ করল, বাইরে যেতে। অন্য সময় কখনোই সে তাকে বারণ করে না, আকাশের ঘন মেঘর ভয়ংকর রূপ তরীকে ভীত করে তুলছিল । যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। কিন্তু সে তরীকে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে। এই তাদের শেষ দেখা । তরীর মনে সেখানেই বারে বারে টেনে চলেছে । সূর্য ডুববে ডুববে। তাই শেষ পর্যন্ত সে এবং গ্রামের দু একজন পরিচিত লোককে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এল সেই বকুল গাছটির কাছে । প্রবল বন্যায় বকুল গাছের কাছে ফাটল দেখা দিয়েছিল। গাছটি মাটি সহ উপরে পড়ে আছে মুজনাই নদীর স্রোতের ধারায় । নদীর পাড় থেকে গাছটা যেখানে পড়ে আছে তার গভীরতা প্রায় তেরো-চোদ্দ ফুট হবে। এখানে যে বাঁশের মাচাটি ছিল সেটা জলে ভেসে চলে গেছে। আলো আঁধারের ফলে সবই অস্পষ্ট দেখাচ্ছে । তরী এবং বাকিরা জগাই জগাই বলে চিৎকার করছে কিন্তু কারো কোন সাড়া নেই। নদীর তীরে বিষন্ন হয়ে সবাই বসে আছে। মুজনাই প্রবল গতিতে বয়ে চলেছে। পাহাড় ধৌত গৈরিক জল, বড় বড় গাছ, মৃত পশু ভেসে চলেছে নদীর বুকে । কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে বড় বড় পাক । সেই পাকে মৃত পশু গাছপালা তলিয়ে যাচ্ছে। ওরা বুঝলেও জগাই হয়তো নদীর জলেই তলিয়ে গেছে ।
ওরা ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে । ঠিক এমন সময় ওই বকুল গাছের শেষ মাথায় যা নদীর সঙ্গে মিশে আছে একটি মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে। আর সেই হাতে ধরা আছে একটি বাদ্যযন্ত্র। এটা প্রথমে তরীর নজরে পড়ে । সে চিৎকার করে ওঠে। জগাই জগাই বলে। জগাই তরীর ডাক শুনতে পায়। শরীরের শেষ শক্তি জড়ো করে একতারাটার তারে একটা টান দেয়, তার অস্তিত্বত্বের ইঙ্গিত দেয় । সবাই চিৎকার করে ওঠে, 'জগাই বেঁচে আছে জগাই বেঁচে আছে'। জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছে তার মা মুজনাই জগাইকে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার প্রিয় বকুল গাছটি জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার গ্রামের মানুষের ভালোবাসা। জাগায় কে বাঁচিয়ে রেখেছিল একতারার সুর, তরীর প্রেম । জগাই ফিরে এলো । জগায়ের একতারা আবার বেজে উঠলো, তার কন্ডোম উঠলো গেয়ে । মুজনাই নদী ও প্রকৃতি তার স্নেহের আঁচলে বেঁধে রেখেছিল তাকে । প্রকৃতি শাশ্বত শিল্পী তাই আরেক শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখলো শিল্পের খাতিরে।