Friday, September 4, 2026


মুনা 

অনলাইন ভাদ্র  সংখ্যা ১৪৩৩

 

সম্পাদকের কথা 

পূর্বাভাস ফলে গেলে খুশি হওয়ার কথা। স্বাভাবিক সেটা। কিন্তু এমন অনেক বিষয় আছে, যা মিলে গেলে স্তম্ভিত হতে হয়। এই রকমভাবে আশঙ্কা মিলে যাক, সেটা চায় না কেউই।   

বহুদিন থেকেই মুজনাই প্রকৃতির প্রতিশোধের কথা বলে আসছে। মুজনাইয়ের আশঙ্কাকে সত্য প্রমাণিত করে সম্প্রতি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নেপালে হড়পা বানে যা ঘটল, তা ভাবতেই শিউড়ে উঠতে হচ্ছে। এভাবে মুহূর্তের মধ্যে ছবির মতো সাজানো জনপদ সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্রাকৃতিক তাণ্ডবে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, সে কথা আর কে ভেবেছিল! কিন্তু তেমনটিই ঘটেছে। চোখে দেখা যায় না এমন বিপর্যয়ে আমরা সত্যিই দিশেহারা। অতি দ্রুত যদি প্রকৃতির রোষ প্রশমণে আমরা সচেষ্ট না হই, তবে আগামী দিনগুলি কিন্তু আরও মারাত্মক হতে চলেছে। আমাদের রাজ্যের উত্তর অংশ সহ সিকিম, উত্তরাখন্ড, হিমাচল, কাশ্মীর ইত্যাদি সব জায়গাই কিন্তু আক্ষরিক অর্থে বারুদের স্তুপের ওপর বসে আছে। 

প্রকৃতির এই ধ্বংসলীলার পাশাপাশি আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখতে পাচ্ছি যে, এই রাজ্যে আবার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক তলানিতে ঠেকছে। একদল অতি উৎসাহীর প্ররোচনায় নষ্ট হচ্ছে পারস্পরিক সম্পর্ক ও সম্প্রীতি। এটি কাম্য নয় কখনই। 

প্রকৃতির রোষ কমানোর পাশাপাশি যদি আমরা নিজেদের সম্পর্ক সুষ্ঠ রাখার প্রচেষ্টা না করি, তবে আগামী দিনগুলি আবার অস্থির হয়ে উঠবে। সেটি নিশ্চয়ই কেউই চাই না।  


অনলাইন ভাদ্র সংখ্যা ১৪৩৩ 

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

 

 প্রচ্ছদ ছবি 

বাবুল মল্লিক 

সম্পাদক 

শৌভিক রায় 

প্রকাশক 

রীনা সাহা 

 মুজনাই ভাদ্র  সংখ্যা ১৪৩৩



    




 





শতবর্ষে ভূপেন হাজারিকা : এক ‘সুধা কণ্ঠে’র অনুধ্যান

আকাশলীনা ঢোল

ভারতীয় সঙ্গীত ঘরানার স্বর্ণ যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন একের পর এক সঙ্গীতশিল্পী। গানের জগতে তাঁরা রেখে গিয়েছেন তাঁদের পদচিহ্ন, উপহার দিয়ে গিয়েছেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ শ্রোতাদের একের পর এক সৃষ্টি। সেই স্বর্ণযুগেরই একজন যুগাবতার হিসেবে ভারতবর্ষ পেয়েছিল এক ‘সুধা কণ্ঠ’কে। অবশ্য, শিল্পীকে বোধহয় দেশ, কালের সীমাবদ্ধতার মাপকাঠিতে কখনওই মেলানো যায় না। তাঁরা, সর্বদেশে, সর্বকালে, সর্বভূতে বিরাজমান। সেই যুগ থেকে যুগান্তরের আলোর পথ যাত্রী হিসেবেই সঙ্গীত জগতে আবির্ভূত হয়েছিলেন ড. ভূপেন হাজারিকা। ৮ সেপ্টেম্বর ১৯২৬, আসাম রাজ্যে এই মহামানবের জন্ম হয়। এবছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে তিনি শতবর্ষে পদার্পণ করেছেন। নশ্বর দেহ বিনষ্ট হলেও, শিল্পীর পরিচয় তো শিল্পেই। তাই, গান যতদিন বেঁচে থাকবে, শিল্পীও বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টি নিয়ে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিন, তাই তাঁকে নিয়ে দু-চার কথা লিখব বলেই আজ কলম ধরেছি। নাহ্, এমন এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বেশি কথা বলার কিংবা আলোচনা করার ধৃষ্টতা আমার মতো সামান্য মানুষের নেই। আমি শুধু নিজের অনুভূতি দিয়ে স্মৃতিচারণ করতে পারি, তাঁর গান কবে, কীভাবে নিজের অনুভূতিতে মিশে গিয়েছে তার অনুসন্ধান করতে পারি।

    ভূপেন হাজারিকা, নামটার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল খুব ছোটবেলাতেই মায়ের মুখে শুনে শুনে। দুয়েকটি গানও তখন শুনেছিলাম রেডিও কিংবা টিভিতে। ছোটবেলায় শোনা একটা গানের কথা আজও খুব মনে পড়ে- ‘ডুগডুগ ডুগডুগ ডম্বরু/ মেঘে বাজায় ডম্বরু’। সুরের মধ্যে মজা থাকায় ছোটবেলায় গানটা আনন্দ দিত, বড় হয়ে গানটা যখন শুনলাম তখন গানের ভাষার সারমর্ম বুঝতে শিখেছি। গানটির মধ্যে ঘুণ ধরা সমাজের যে অব্যক্ত যন্ত্রণার দিকটি ব্যক্ত হয়েছে তা কেবল শ্রোতাদের নয়, গোটা সমাজকেই ধাক্কা দিয়ে যায়। লীলা ও যোগেনের জাতপাত না মেলায় ঘুণ ধরা সমাজ বিবাহে অনুমতি না দেওয়ার পরেও তাদের মিলন আসলে সমকালীন সমাজব্যবস্থা ও তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিকটিকেই ইঙ্গিত করে। দাবানলের হোম দেওয়া, বিজুলীর আলো দেওয়া, ঝিঁঝিঁপোকার উলুধ্বনি এবং বাতাসের সানাই বাজানোর ঘটনার মধ্যে দিয়ে রচয়িতা আসলে প্রান্তিক মানুষের জীবন সংগ্রামের কথাই তুলে ধরতে চেয়েছেন। 


    এরপর, সময় যত এগিয়েছে তত বেশি করে জেনেছি ভূপেনবাবুর সম্পর্কে। যত বেশি জেনেছি, তত ভাল করে বুঝতে পেরেছি শুধুমাত্র সঙ্গীতস্রষ্টা, সুরকার প্রভৃতি পরিচয়ের মধ্যে তাঁকে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। তিনি একাধারে কবি, সঙ্গীত রচয়িতা, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা। যা কিছুই বলি না কেন, কোনও পরিচয়ই বোধহয় তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতি ছিল তাঁর গভীর দৃষ্টি। শুধুমাত্র একটি গানেই নয়, তাঁর প্রায় সব গানেই রয়েছে মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণার কথা, সমকালীন সমাজের কথা, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার, শাসক শ্রেণির নির্মম শোষণ, দুর্নীতি ও সততার প্রসঙ্গ। তথাকথিত রোম্যান্টিক ভাবধারার বদলে জীবনমুখী গানই বেশি শোনা গিয়েছে ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর যখন কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে যান, তখনই আমেরিকান সঙ্গীতশিল্পী পল রবসনের সান্নিধ্যে আসেন। বর্ণের ভিত্তিতে মানুষের সঙ্গে মানুষের ভেদাভেদ আরও স্পষ্ট হয় তাঁর কাছে। পল রবসনের প্রভাব তাঁর ওপর দীর্ঘস্থায়ী হয়, একে একে সৃষ্টি হয় ‘বিস্তীর্ণ দুপারে’, ‘মোরা যাত্রী একই তরণীর’, ‘আমায় একজন সাদা মানুষ দাও যার রক্ত সাদা’, ‘আমরা করব জয়’- এর মতো কালজয়ী গান। গানের বিষয়বস্তুর জন্যই হোক কিংবা জীবনের প্রতি গভীর অন্তর্দৃষ্টি, বারংবার তাঁকে শ্রোতাদের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে, আবার শ্রোতাদের ভালবাসাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের দরবারে। সেই অনুভূতিই যেন প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘আমার গানের হাজার শ্রোতা’ গানে যেখানে শিল্পী বলছেন- ‘আমার গানের হাজার শ্রোতা, তোমায় নমস্কার/ গানের সভায় তুমিই তো প্রধান অলঙ্কার’। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে ভূপেন হাজারিকার অধিকাংশ গানই তাঁর নিজের লেখা, তবে তা সম্ভবত অসমীয়া ভাষায়। বাংলায় সেই গানগুলি অনুবাদ করতেন শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। 


    ভূপেন হাজারিকার গানের সঙ্গে আমার খুব বেশি করে পরিচয় হয় ২০১১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর। সেইসময় শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন আমায় গৃহবন্দী থাকতে হয়েছিল, তখন ভূপেনবাবুর গানগুলি ছিল আমার অবসরযাপনের একমাত্র সম্বল। আজ থেকে অনেক বছর আগের কথা, হাতে হাতে স্মার্টফোনের এত চল ছিল না, দুনিয়া হয়তো এত স্মার্টও ছিল না, তাই আমাদের হাতে সময় ছিল গান শোনার, বই পড়ার, মানুষকে নিয়ে চিন্তা করার। রিলস দেখে ঝড়ের বেগে সময় কাটিয়ে দেওয়ার যুগ ছিল না সেটা। তাই গান শুনতাম, পরিচয় হল অনেক নতুন গানের সঙ্গে, গানের কথার সঙ্গে, নতুনভাবে চিনলাম ড. ভূপেন হাজারিকাকে। তখন থেকেই জানলাম আমাদের চোখের তারায় হাজার সূর্য আছে বলেই, আমাদের চলার পথ সুগম হয়। সেই পথে চলতে চলতেই রতনপুর বাগিচার জগ্নু আর লছমির সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়, নতুন জীবনের সন্ধান পাওয়ার জন্যে আমরা মিলেমিশে যাই জনতার মহারণ্যে। তাঁর নতুন করে লেখা ‘মেঘদূতে’র পাতায় পাতায় মেঘ হতে চাওয়ার ব্যাকুল আর্তিই যেন অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ে শরৎবাবুকে লেখা চিঠির গফুর-আমিনা-মহেশের চোখ দিয়ে। এ প্রসঙ্গে, একটা গানের কথা বিশেষভাবে বলতে ইচ্ছে করছে। ‘কেঁদো না কেঁদো না তুমি আমার নতুন কন্যা’ গানটি যখন প্রথমবার শুনি, তখন তা বাবা ও মেয়ের স্বাভাবিক কথোপকথন বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু, সময় যত এগিয়েছে খুঁজে পেয়েছি নতুন নতুন ব্যাখ্যা। গানের প্রথম লাইনে বলা হয়েছে ‘কেঁদো না কেঁদো না তুমি, আমার নতুন কন্যা/ পাহাড় খুঁজে এনে দেবো কথা কওয়া ময়না’ যা শুনলে ছোট মেয়েকে বাবার সান্ত্বনা দেওয়ার দৃশ্যই চোখের সামনে ফুটে ওঠে। কিন্তু, যখন লেখক বলেন- ‘ধানচালের কালোবাজার শিক্ষা গুরু দেয়নি/সর্ষের তেলে ভেজাল দিতে আমায় কেউ শেখায়নি’ তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে সমকালীন সমাজের দুর্নীতির দিকগুলি এবং সেই দুর্নীতির সঙ্গে হাত না মেলানোর কারণেই মানুষকে চিরকাল দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে যেতে হয়। আবার অন্য এক ধারণাও শ্রোতাদের নাড়া দিয়ে যায় যখন শোনা যায়- ‘বড়লোকের ঘরে তোমার বিয়ে হলে কন্যা/বাক্সভরা নকশাকাটা পেতে অনেক গয়না/শুধু ভুলতে যদি চাও গো মেয়ে, পেটে ক্ষুধার যাতনা/ শুনিয়ে আমি দিতে পারি কংস বধের গাওনা’ কিংবা ‘শুনতে যদি চাও গো মেয়ে, শোনো গো ও ললনা/ আগাল বাঁশের বাঁশির সুর, এই তো তোমার পাওনা’ প্রভৃতি লাইনগুলো। একদিক থেকে ব্যাখ্যা হতে পারে দরিদ্র পিতার কন্যার মুখে অন্ন তুলে না দিতে পারার ব্যর্থতার কারণেই তিনি কখনও কংস বধের গাওনা শোনাতে চেয়েছেন, কখনও আগাল বাঁশের বাঁশি বাজিয়ে শোনাতে চেয়েছেন। এ যেন সমাজের দরিদ্র মানুষদের চিরকালের কথকতা, যারা সংসারে কেবল দিয়েই যায়, বদলে পায় না কিছুই, যাদের চোখের জলের দাম কেউ কোনওদিন দেয়নি, যাদের মুখ বন্ধ করা হয় সামান্য কিছু ভিক্ষার বদলে, তাদের কথা। কংস বধের গাওনা কিংবা বাঁশের বাঁশির সুর সেই ভিক্ষা বা ভাতারই প্রতীক। অথবা এমনটাও হতে পারে, সমাজ থেকে নারীর প্রাপ্য কেবল সামান্য। তাই, ক্ষুধার যাতনাই হোক বা জীবনের যাতনা, কিংবা তার যতই কামনা-বাসনা থাকুক না কেন জীবন থেকে তার প্রাপ্য কেবল আগাল বাঁশের বাঁশির সুর, এর বেশি কিছু চাওয়ার বা পাওয়ার অধিকার তার নেই। মানুষের জীবনের নিদারুণ কষ্ট অনুভব করেই গায়ক বলেন- ‘মানুষ মানুষের জন্যে/জীবন জীবনের জন্যে/ একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?’ মানুষকে কষ্ট থেকে মুক্তি দিতেই আহ্বান জানিয়েছেন সজাগ জনতাকে, অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন ‘রক্তিমে এক উত্তাপ’ হওয়ার, ‘প্রচণ্ড এক প্রতাপ’ হওয়ার, ‘এক নিরাপত্তা’ হওয়ার, ‘এক সুধাকণ্ঠ’ হওয়ার। রাজা-মহারাজার দোলা সযত্নে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে বয়ে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়েও যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলার যন্ত্রণা। ‘ভাঙ ভাঙ ভাঙ ভাঙরে পাথর ভাঙ’ গানেও রয়েছে শ্রমিক শ্রেণির ওপর শোষকের শোষণের দৃশ্য।  

   শুধুমাত্র জীবনসংগ্রাম কিংবা শোষণের দিকটিই নয়, তাঁর গানে রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর সুরও। ইতিবাচকতার বার্তা শোনা যায় ‘আজ জীবন খুঁজে পাবি’, ‘জীবনডিঙা বেয়ে চলো’, ‘আমি এক যাযাবর’, ‘এই গান হোক বহু আস্থাহীনতার বিপরীতে এক গভীর আস্থার গান’, ‘এ শহর প্রান্ত’, ‘মোর গাঁয়ের সীমানা’, ‘সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ’, ‘সাগরসংগমে সাঁতার কেটেছি কত’ প্রভৃতি গানে। ‘এ শহর প্রান্ত’ গানে মৃতনগরী কলকাতাকে নতুন উজ্জীবনী মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন তিনি ‘তুমি ইতিহাস সৃষ্টির ইতিকথা’ বলে। কিংবা, ‘এই গান হোক’ গানে যখন বলেন-‘সমসাময়িক সংঘাত/জীবনের জ্যোতিঃপ্রপাত/তার ছোঁয়া পেয়ে হোক ধন্য/ হোক সমবেত কণ্ঠ অগণ্য/ ধ্বংসমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, কিংবা মনোমালিন্য/ সে নয় আমার গানের লক্ষ্য/ লক্ষ্য শান্তি অনন্য’, তখন ইতিবাচকতার বাণীই স্পষ্ট হয়। ‘সময়ের অগ্রগতি’ গানের এক লাইনে গায়ক স্পষ্টই বলেছেন- ‘নাই আক্ষেপ কোনও পাওয়া না পাওয়ার/সামনে রয়েছে পথ এগিয়ে যাওয়ার’। এই ইতিবাচকতাই বোধহয় আমার মতো তাঁর অগণিত ভক্তের জীবনের পথে চলার অন্যতম পাথেয়।


    কেবল জীবনমুখী গানই নয়, তাঁর গানে চিরকালীন প্রেমানুভূতি, রোমান্টিকতার ছাপও স্পষ্ট। ‘প্রেম আমার শত শ্রাবণের’, ‘তোমার ছোঁয়ার কোমল কেয়া’, ‘এ কেমন রঙ্গ জাদু’, ‘গঙ্গা আমার মা’, ‘সজনি সজনি’, ‘সহস্র জনে মোরে প্রশ্ন করে’, ‘গোপনে গোপনে কত যে খেলি’, ‘ও পাহাড়ি বন্ধু’, ‘সুউচ্চ পাহাড়ে শৃঙ্গে উঠি আমি’, ‘সাজিয়ে দোপাটি মাথার খোপাটি’, ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’, ‘বিমূর্ত এই রাত্রি আমার’ প্রভৃতি গানগুলির মধ্যে কখনও প্রকৃতির প্রতি প্রেম, কখনও নরনারীর প্রেমের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। আবার, এর মধ্যেও কোনও কোনও গানে মানুষের জীবনের দুঃখ ধরা দিয়ে গিয়েছে। ‘সজনি সজনি’ গানে যখন বক্তার মুখে শোনা যায়- ‘সজনি সজনি কলকাতা ঘুরিলাম/সজনি সজনি গৌহাটি ঘুরিলাম/ সজনি গো সজনি কোথাও চাকুরি জুটিল নাই’ কিংবা ‘সজনি সজনি রেল গ্যাস কোম্পানি/ সজনি সজনি রেলগাড়ির কোম্পানি/ সজনি গো সজনি কোথাও দেখি মিঠে বাতাস নাই’ তখনই সমাজের চিরকালীন বেকারত্বের সমস্যা স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ‘একখানা মেঘ ভেসে এলো আকাশে’ গানে নির্বাসিত যক্ষের অলকানিবাসী প্রিয়ার প্রতি প্রেম নিবেদন করতে না পারার ব্যাকুল বেদনার মধ্যে দিয়ে মানুষে-মানুষে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ব্যক্ত হয়েছে।

     স্মৃতিচারণ এবং শোকের অনুভূতিও স্পষ্ট কোনও কোনও গানে। ‘ঐ কাজল কাজল দীঘি’ গানে মা হারা মানুষের বেদনা বর্ণিত হয়েছে- ‘ঐ বেণু বনের আড়ে, ঐ কাপাস ক্ষেতের ধারে/ যার রাঙা পাড়ে আঁচল দোলায় হিমেল হিমেল বা/ সেই তো আমার মা, আমার জুঁইয়ের ডালি মা’ কিংবা ‘আজ পৌষ পাবনের রাতে, ঐ মাটির আঙিনাতে/ আজ মনে পড়ে সোনার হাতে রাঙা সোনার শাখা/ সেই তো আমার মা, আমার শ্যাম দুলালী মা’ প্রভৃতি শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে। ‘বেহুলা বাংলা দুঃখিনী বাংলা’ গানে বেহুলাকে উদ্দেশ্য করে শিল্পী যেন আসলে বাংলার ভগ্ন, নগ্ন রূপকেই সকলের সামনে তুলে ধরে সচেতন করতে চেয়েছেন- ‘লক্ষ্মী পেঁচা, চড়ুই পাখি বসে না আর ঘরে/চণ্ডীতলার আটচালা তোর ভেঙে গেছে ঝড়ে/চূর্ণী নদীর ঘূর্ণি জলে ভাসছে তেপান্তর’ বলার মধ্যে দিয়ে বিধ্বস্ত বাংলার, বাংলা মায়ের করুণ রূপের প্রতি সহানুভূতিই প্রকাশ পেয়েছে যেন। 

    কয়েকবছর আগে সৌভাগ্য হয়েছিল আসামের জালুকবাড়িতে ভূপেন হাজারিকার সমাধিক্ষেত্র দেখতে যাওয়ার। সেখানকার চিত্রশালায় দেখেছিলাম তাঁর অসংখ্য ছবি, তাঁর অসংখ্য সৃষ্টির সাক্ষ্য। ভূপেন হাজারিকা শুধু অসম রাজ্যের নন, শুধু বাংলা গানের নন, শুধু ভারতীয় সঙ্গীত ঘরানার নন, তিনি সমগ্র বিশ্বের, তিনি বিশ্বশিল্পী। তাঁর সৃষ্টিই তাঁকে নিয়ে চলেছে যুগ থেকে যুগান্তরে। তাঁর সুরে গান গেয়ছেন লতা মঙ্গেশকর, শ্যামল মিত্র, নির্মলা মিশ্র-এঁর মতো শিল্পীরা। তাঁর সুধাকণ্ঠ কখনও মানুষকে প্রেমের সাগরে জাহাজ ভাসাতে উদ্বেলিত করেছে, কখনও সমাজের বৈরির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে, কখনও শোকসাগরে নিমজ্জিত করে কাঁদিয়েছে। কখনও তিনি শুনিয়েছেন দূরের আর্তনাদের নদীর ক্রন্দন, কখনও বা মানব সাগরের কোলাহল, কখনও বা নতুন দিনের পদধ্বনি। মানুষের জীবনের স্রোত তাঁর গানে ফল্গু নদীর ন্যায় বহমান। তাঁর সম্পর্কে যা কিছুই বলি না কেন, তা-ই অতি অল্প হয়ে দাঁড়াবে। তিনি আমাদের চিন্তায়, আমাদের চেতনায়, আমাদের মননে। সবশেষে তাঁর কথাতেই তাঁকে বলতে হয়- ‘সুরবিন্যাসে মূর্ত হোক অতীত বর্তমান/চির উজ্জ্বল ভবিষ্যতেও যেন সেই সুর করে স্নান/ এই গান হোক বহু বাঁধার প্রাচীরকে ভেঙে ফেলা এক তীব্র গতির গান’, যে গান আমাদের পৌঁছে দেয় সেই সুধাকণ্ঠের কাছে, তাঁর সুর ও সুধা মূর্ত করে আমাদের যুগ যুগ ধরে। শতবর্ষে সেই সুধাকণ্ঠের প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও প্রণাম।






 শিক্ষক দিবস

মহঃ সানোয়ার 

মানুষের জীবনে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের অবদান কোনোদিনই পরিমাপ করা যায় না। তাঁরা আমাদের জীবনের পথ দেখান, ভুল থেকে শিক্ষা নিতে শেখান, অন্ধকারের মধ্যে আলোর সন্ধান দেন। বাবা-মায়ের পরে যদি এমন কোনো মানুষ থাকেন, যিনি একটি শিশুর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তিনি হলেন শিক্ষক। তাই শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; শিক্ষক হলেন একজন পথপ্রদর্শক, একজন অভিভাবক, একজন নির্মাতা।

প্রতি বছর ৫ সেপ্টেম্বর ভারতবর্ষে শিক্ষক দিবস পালিত হয়। এই দিনটি ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি, বিশিষ্ট দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের প্রকৃত উন্নতি নির্ভর করে সেই দেশের শিক্ষা ও শিক্ষকদের মর্যাদার ওপর। তাঁর জন্মদিনকে শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করার মধ্য দিয়ে আমরা দেশের সমস্ত শিক্ষককে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রের সম্পর্ক অত্যন্ত সুন্দর ও গভীর। একজন ছাত্র যখন প্রথম বিদ্যালয়ে আসে, তখন তার হাতে থাকে কেবল একটি বই-খাতা, আর মনে থাকে অসংখ্য প্রশ্ন। শিক্ষক ধীরে ধীরে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করেন। শুধু বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের পাঠ নয়—শিক্ষক শেখান কীভাবে সত্য কথা বলতে হয়, কীভাবে অন্যকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়াতে হয়। একটি ভালো শিক্ষক ছাত্রের মনের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেন।

শিক্ষক আমাদের শুধু পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য প্রস্তুত করেন না। জীবনের পরীক্ষার জন্যও প্রস্তুত করেন। বইয়ের পাতায় লেখা জ্ঞান একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু একজন শিক্ষকের দেওয়া মূল্যবোধ ও শিক্ষা সারাজীবন আমাদের সঙ্গে থাকে। একজন ছাত্র হয়তো বহু বছর পর বিদ্যালয় ছেড়ে চলে যায়, কিন্তু কোনো এক সময় শিক্ষকের বলা একটি ছোট্ট কথা তার জীবনের বড় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

শিক্ষক দিবস তাই শুধু আনন্দের দিন নয়, এটি আত্মসমীক্ষারও দিন। এই দিনে আমাদের ভাবতে হয়—আমরা আমাদের শিক্ষকদের কতটা সম্মান করি? তাঁদের পরিশ্রমের মূল্য কতটা বুঝি? একজন শিক্ষক প্রতিদিন অসংখ্য ছাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে পাঠদান করেন। প্রত্যেক ছাত্রের স্বভাব আলাদা, বোঝার ক্ষমতা আলাদা, স্বপ্ন আলাদা। তবু শিক্ষক প্রত্যেককে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কখনও কঠোর হন, কখনও বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ান, আবার কখনও অভিভাবকের মতো ভুল ধরিয়ে দেন।

বিদ্যালয়ে শিক্ষক দিবসের দিনটি সাধারণত অন্য দিনের তুলনায় একটু আলাদা হয়। ছাত্রছাত্রীরা এই দিনে শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানায়, ফুল দেয়, কার্ড তৈরি করে এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেক বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীরা একদিনের জন্য শিক্ষকের ভূমিকা পালন করে। শ্রেণিকক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে অন্যদের পড়ানোর অভিজ্ঞতা তখন তাদের বুঝিয়ে দেয় যে একজন শিক্ষকের কাজ কতটা কঠিন এবং দায়িত্বপূর্ণ। কয়েক মিনিটের শিক্ষকতা করেই যখন তারা ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তারা উপলব্ধি করে—প্রতিদিন একই কাজ ধৈর্য ও নিষ্ঠার সঙ্গে করে যাওয়া কত বড় ব্যাপার।

আমার কাছে শিক্ষক দিবসের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ। আমরা জীবনে অনেক মানুষের কাছ থেকে সাহায্য পাই, কিন্তু শিক্ষকের অবদান অনেক সময় বুঝতে পারি অনেক পরে। ছোটবেলায় শিক্ষকের বকুনি আমাদের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু বড় হয়ে বুঝতে পারি, সেই বকুনির মধ্যেও ছিল আমাদের ভালো করার ইচ্ছা। শিক্ষক যখন বলেন, “আরও ভালো করতে পারো”, তখন সেটি কেবল একটি বাক্য নয়; সেটি ছাত্রের প্রতি তাঁর বিশ্বাসের প্রকাশ।

একজন আদর্শ শিক্ষক কখনও শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর জোর দেন না। তিনি ছাত্রকে প্রশ্ন করতে শেখান। তিনি বলেন, “কেন?”—এই প্রশ্নটি করতে ভয় পেও না। কারণ প্রশ্ন থেকেই জ্ঞানের জন্ম হয়। একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রের চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করেন এবং তাকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখান। সেই কারণে একজন শিক্ষক জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান কারিগর।

আজকের পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আমরা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অসংখ্য তথ্য পেয়ে যেতে পারি। কিন্তু তথ্য আর জ্ঞান এক জিনিস নয়। কোন তথ্য সত্য, কোনটি মিথ্যা, কোন জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হবে—এই বোধ তৈরি করার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা এখনও অপরিহার্য। প্রযুক্তি হয়তো শিক্ষার পদ্ধতি বদলাতে পারে, কিন্তু একজন মানবিক শিক্ষকের প্রয়োজন কখনও শেষ হবে না।

শিক্ষক দিবস আমাদের আরও একটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষকদেরও সম্মানজনক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ প্রয়োজন। তাঁদের ওপর যেমন ছাত্রদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব রয়েছে, তেমনই সমাজ ও রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে তাঁদের যথাযথ সম্মান, সুযোগ ও মর্যাদা দেওয়া। একজন শিক্ষককে সম্মান করা মানে আসলে শিক্ষাকে সম্মান করা; আর শিক্ষাকে সম্মান করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সম্মান করা।

একজন ছাত্রের জীবনে অনেক শিক্ষক আসেন। কেউ হয়তো একটি বিষয় পড়ান, কেউ পরীক্ষায় ভালো ফল করার কৌশল শেখান, কেউ আত্মবিশ্বাস বাড়ান, আবার কেউ জীবনের কঠিন সময়ে সাহস দেন। তাঁদের প্রত্যেকের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিত্বের একটি অংশ হয়ে থাকে। আমরা যখন জীবনে সফল হই, তখন সেই সাফল্যের পেছনে আমাদের শিক্ষকদের অবদানও থাকে।

তাই শিক্ষক দিবসে শুধু ফুল বা শুভেচ্ছা জানালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ হয় না। শিক্ষকের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হলো তাঁর শেখানো ভালো কথাগুলো জীবনে পালন করা। সততা, শৃঙ্খলা, পরিশ্রম, মানবিকতা ও অন্যের প্রতি সম্মান—এসব মূল্যবোধকে নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করাই শিক্ষকের প্রতি সবচেয়ে বড় সম্মান।

শিক্ষক হলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিজে সামনে না থেকেও ছাত্রকে সামনে এগিয়ে দেন। তিনি নিজের জ্ঞানের আলো অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেন। একটি প্রদীপ যেমন অন্য প্রদীপকে জ্বালিয়ে নিজের আলো কমায় না, তেমনি একজন শিক্ষক যত বেশি জ্ঞান বিতরণ করেন, তাঁর জ্ঞানের মর্যাদা ততই বৃদ্ধি পায়।

শিক্ষক দিবসের দিনে তাই আমাদের প্রত্যেকের মনে একটি কৃতজ্ঞতার অনুভূতি থাকা উচিত। যাঁরা আমাদের হাত ধরে অক্ষর চিনিয়েছেন, ভুল করলে সংশোধন করেছেন, পড়াশোনায় উৎসাহ দিয়েছেন এবং স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন—তাঁদের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।

শিক্ষক শুধু শ্রেণিকক্ষের মানুষ নন; তিনি আমাদের জীবনের পথের একজন নীরব সহযাত্রী। তাঁর শিক্ষা আমাদের সঙ্গে থাকে বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের প্রতিটি ধাপে। আমরা হয়তো একদিন বিদ্যালয় ছেড়ে দূরে চলে যাব, শিক্ষকও হয়তো আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ থাকবেন না। কিন্তু তাঁর বলা কথা, তাঁর শেখানো মূল্যবোধ এবং তাঁর দেওয়া সাহস আমাদের মনে থেকে যাবে।

তাই শিক্ষক দিবস কেবল একটি বিশেষ দিন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন শিক্ষকের হাতে শুধু একটি বই থাকে না, তাঁর হাতে থাকে একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে গড়ে তোলার জন্য যাঁরা নিরলসভাবে কাজ করেন, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব।

শ্রদ্ধা সেই সকল শিক্ষকের প্রতি, যাঁরা জ্ঞানের আলোয় আমাদের জীবনকে আলোকিত করেন।

শুভ শিক্ষক দিবস।


 

অনেক কিছু দিয়েছে কিন্তু কি পেলেন নজরুল ইসলাম?
বটু কৃষ্ণ হালদার

খুব ছোট থেকে অর্থাৎ অক্ষর জ্ঞান হওয়ার মুহুর্ত থেকে আপামর বাঙালির  ধমনীতে মিশে গিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজীনজরুলইসলাম।গ্রামে কোন সংস্কৃতি অনুষ্ঠান হলে বর্তমান সময়ের মত ধুম ধারাক্কা গান চালানোর রেওয়াজ ছিল না। আমাদের প্রাণের রবি ঠাকুরের গানের সঙ্গে সঙ্গে বাজানো হতো নজরুল ইসলামের গান কবিতা। এসব শুনতে শুনতে কখন শৈশব পেরিয়ে নব যৌবনে পা দিয়ে সময় গুলো  ক্লান্ত হয়ে যায় নি। বিরক্তিভাব আসেনি। তখন থেকে উপলব্ধিগুলো হৃদয়ের কোণে জমা হতে শুরু করলো যে রবীন্দ্রনাথকে আমার যেমন চাই, নজরুলকে আরও তীব্রভাবে চাই। যে কবি নিজের সীমাহীন দারিদ্রতাকে কুর্নিশ জানিয়ে লিখে ফেলেন -  "হে দারিদ্র্য, তুমি মোরে করেছ মহান/তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীস্টের সম্মান  /   কন্টক মুকুট শোভা - "

বিশ্বযুদ্ধোত্তর প্রেক্ষাপটে ঝঞ্ঝায় দিগভ্রান্ত না হয়েও অতি অনায়াসে তিনি লিখতে পারেন:_ ‘মহা বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত/আমি সেই দিন হব শান্ত/ যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল/আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না/অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ/ভীম রণ-ভূমে রণিবে না"

'আমার কৈফিয়ৎ’ কবিতায় নজরুলের শেষ দুটি ছত্র— ‘প্রার্থনা করো, 

  যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত তাদের সর্বনাশ’—

আমাকে ভাবতে বাধ্য করে প্রকৃত কমিউনিজম এছাড়া আর কি? নজরুল যেন ঠিক সেই মুহূর্তে এই ভারতভূখন্ডের সীমান্ত পেরিয়ে তিনি পীড়িত লাঞ্চিত বিশ্ববাসীর কবি হয়ে ওঠেমানুষের মনুষত্বকে জয় জয়াকার করে নজরুল সাম্যবাদী কবিতায় লিখলেন -

  শোন রে মানুষ ভাই/এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোন মন্দির কাবা নাই।

ব্যাস সেই সময় থেকে কবি নজরুল নিজের স্থান করে নিলেন মানবতার পূজারী রবীন্দ্রনাথের ঠিক পাশের আসনে।

১৯ শতকের কলকাতা। শীতের আমেজে মাখোমাখো এক সকাল ।জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারের বাস ভবনের ঠিক সামনেটায় অন্যদিন শান্ত সমাহিত একটা পরিবেশ থাকে। সেদিন সেখানে বড্ডো শোরগল।হুলুস্থূল কাণ্ড বাঁধিয়েছে এক তরুণ। শূন্যে হাতপা ছুঁড়ে কাঁধ পর্যন্ত বাবড়ি বাবড়ি চুল ঝাঁকিয়ে বলছে,"গুরুজি বাইরে আসুন, আপনাকে হত্যা করব।" একে দ্রোহকাল, ১৯২২, যদিও বন্দুক ফন্দুক নেই এই যুবকের হাতে । আছে মুঠো করে ধরা ক'খান পত্রিকার মত কিছু ।কাগজের তর্জন গর্জন ।জোড়াসাঁকোয় ঠাকুরদের বাড়ি। শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরাও সংযত থাকেন কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েন হিমালয় পর্বতের মত সমাহিত ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের সামনে এসে দাঁড়িয়ে দুটো কথা কইতে । এই যুবকটি কিনা তাঁকেই প্রকাশ্যে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।ততক্ষনে রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণের বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছেন। এই যুবকটিকে তিনি ভালোকরেই চেনেন। এহেন ব্যবহার যুবকটির কাছ থেকে যেন প্রত্যাশিত ছিল। তিনি একটুও বিচলিত হলেন না। একটু অবাকও হলেন না ।শান্ত স্বরে বললেন, ‘কী হয়েছে?সক্কাল সক্কাল ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন? এসো, উপরে এসে বসো? আমি যে তোমার হাতে মরতেই চাই ।’ উচ্ছাসে লাফাতে লাফাতে তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে এল যুবকটি । রবীন্দ্রনাথকে সামনে বসিয়ে দৃপ্ত কণ্ঠে 'বিদ্রোহী' কবিতাটি আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিল- যা আগের দিন ছাপা হয়েছে বিজলী পত্রিকায়।

হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন, যুবকটি আর কেউ নন, তিনি আমাদের ঝড়ের কবি কাজী নজরুল। রবীন্দ্রনাথ এতক্ষন অবাক বিষ্ময়ে অভিভূত হয়ে শুনছিলেন। মুগ্ধতায় স্তব্ধ তখন তিনি। নজরুলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন । কবিতা শেষ হল। রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। দু’হাত বাড়িয়ে তরুণ কবিকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, "--সাবাস কবি। সাবাস। হ্যাঁ কাজী, তুমি আমাকে সত্যিই হত্যা করবে। আমি অভিভূত । নিঃসন্দেহে তুমি বিখ্যাত কবি হবে। এ জগৎ তোমাকে এই কবিতার নামে 'বিদ্রোহী কবি' বলে মনে রাখবে।’সেদিনের রবীন্দ্র নজরুলের মিলনের নাটকীয় মুহূর্তটির আগেও ওঁরা দুজনে বার-দুয়েক মুখোমুখি হয়েছেন। ঘুর্ণাবর্তের মত জীবন ছিল কাজী নজরুলের। লেটোর দল থেকে শুরু করে বিশ্বযুদ্ধের সৈনিক । বিচিত্র অভিজ্ঞতা বোচকায় বেঁধে নজরুল ফিরলেন ১৯২০ সালে কলকাতায়। নবজাগরণের উদ্বেল ঢেউ তখন বঙ্গসাহিত্যতটে আঁচড়ে পড়ছে । ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’, ‘মোসলেম ভারত’, ‘ ‘নবযুগ’ পত্র-পত্রিকা তখন নিয়মিত লিখছেন নজরুল। সাহিত্য আড্ডায় নজরুলের উজ্জ্বল উপস্থিতি । রবন্দ্রীনাথের হাতে এসে পৌঁছয় সেসব পত্রিকা। নজরুলের লেখা পড়েন রবীন্দ্রনাথ । তৎকালীন কবিদের সাথে কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ নজরুল সম্পর্কে বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে ফেললেন । সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের মত স্বনামধন্য কবিরা সেই সুসংবাদ নজরুলের কাছে পৌঁছে দিলেন উপযাচক হয়ে । "অধমের" প্রতি বিশ্ববরেন্য কবির আগ্রহের কথা শোনামাত্র ক্ষ্যাপা নজরুল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে অস্থির হয়ে ওঠলেন । পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে সোজা চললেন জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করতে। দিনটি সম্ভবত ১৯২১ সালের ২০ জুলাই। রবীন্দ্রনাথের শান্তসৌম্য জ্যোতির্ময় মূর্তি দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন নজরুল। বাকরুদ্ধ হয়ে শুধু দেখেই গেলেন নজরুল একরাশ মুগ্ধতায় ।

১৯২৩ সালের ১৭ মে শরৎচন্দ্র বাজে-শিবপুর হাওড়া থেকে লীলারাণী গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে লিখেছেন:“হুগলী জেলে আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম উপুষ করিয়া মরমর হইয়াছে।বেলা ১টার গাড়ীতে যাইতেছি, দেখি যদি দেখা করিতে দেয় ও দিলে আমার আনুরোধে যদি সে আবার খাইতে রাজি হয়। না হইলে তার কোন আশা দেখি না।একজন সত্যিকার কবি। রবী বাবু ছাড়া আর বোধ হয় এমন কেহ আর এত বড় কবি নাই”। কিন্ত শরৎচন্দ্র দেখা করেত পারেন নি।

জেলের ভিতরে অনশনরত নজরুলের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়। ডান্ডাবেড়ী, হ্যান্ডকাপ, সেল কয়েদ, ফোর্সড ফিডিং-এর চেষ্টা চলে, ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়েন নজরুল। মুমূর্ষ কবিকে বাঁচানোর জন্য শিলিং-এ চিঠি লেখা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে, তিনি যেন নজরুলকে অনশন ভঙ্গ করতে অনুরোধ জানিয়ে পত্র লিখেন।

রবীন্দ্রনাথ পএের উত্তরে বিদ্রোহী-বিপ্লবী সৈনিক নজরুলের দৃঢ়তাকে সমর্থন জানিয়ে লিখেন: “আদর্শবাদীকে আদর্শ ত্যাগ করতে বলা তাকে হত্যা করারই সামিল। অনশনে যদি কাজীর মূত্যুঘটে তা হলেও তার অন্তরে সত্য আদর্শ চিরদিন মহিমাময় হয়ে থাকবে।”শেষ পর্যন্ত, স্নেহভাজন নজরুলের অনশনে বিচলিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে টেলিগ্রাম করেন: “Give up hunger strike, our literature claims you”.অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয়, জেল কর্তৃপক্ষ রবীন্দ্রনাথের টেলিগ্রাম নজরুলকে না দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে লিখে পাঠালেন- “Addressee not found.” রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম ফেরত পেয়েই বুঝলেন এটি সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত ও হীনম্মন্যতা। অনশনের চল্লিশ দিনে বিরজাসুন্দরী দেবীর হাতের লেবুর রস পান করে নজরুল অনশন ভঙ্গ করেন।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নজরুল ইসলাম কে প্রায়ই বলতেন,দেখ উন্মাদ তোর জীবন শেলীর মত, জন কিটসের মত খুব বড় একটা ট্রাজেডি আছে।তুই প্রস্তুত হ।গুরুদেবের বাণী এতটুকু মিথ্যা হওয়ার নয়।কারণ তিনি অন্তর থেকে অনুধাবন করে কথা বলতেন।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম তখন  "নবযুগ' পত্রিকার সম্পাদক। ঠিক সে সময়ে চলছিল ভারত বিভাজনের প্রক্রিয়া। তৎকালীন সময়ে সমস্ত ক্ষমতা কলকাতার শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে।তরুণ মুসলিম লীগ নেতা বদরুদ্দোজা,আলম হোসেন, জুলফিকার হায়দাররা তখন ভারত বিভাজনের জন্য আন্দোলন করছেন। কিন্তু বিদ্রোহী কবি নজরুল বিভাজন আন্দোলনে বাধার সৃষ্টি করলেন। তিনি কখনোই চাইতেন না ভারত বর্ষ দ্বিখণ্ডিত হোক। তিনি বললেন এ টি মেকি,ভুয়া আন্দোলন।পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ নিরক্ষর মুসলমানদের মুখের গ্রাস করে এরা নেতা হতে চান।তাদের পুরো চক্রান্ত তিনি পরিষ্কারভাবে বুঝতে পেরেছিলেন।তার সমকালীন বহু বিশিষ্ট সাহিত্যিক রা বুঝেও মুখ খোলেননি।সেটাই কবির জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ালো। নবযুগ' পত্রিকায় কবি তখন স্বাক্ষরযুক্ত সম্পাদকীয়  সংখ্যায় তিনি সম্পাদকীয় কলমে লিখলেন_"পাকিস্তান না ফাঁকিস্থান"। ব্যাস এটুকুতেই যেন দাবানল সৃষ্টি হয়ে গেল। ভারত বিভাজনের যে সমস্ত আন্দোলনকারীরা সমর্থন করতেন তারা নজরুলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন। একদিন কবি পত্রিকা অফিসের কাজ ছেড়ে অনেক রাতে ফিরছিলেন।কবিকে সামনাসামনি ধরাশায়ী করা যাবে না, তাই আন্দোলনকারীরা কাপুরুষের মত পেছন থেকে আক্রমণ করলেন। এক সময়  যাঁরা  কবি নজরুল ইসলাম কে নিয়ে কলকাতার বুকে দাপটের সাথে চলতেন তারাই তাঁর জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালেন।আক্রমণের পর ১৯৪২ সালের মাঝামাঝি কবি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।তার পিঠে সেই আঘাতের চিহ্ন মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত কবি বহন করেছিলেন। বাংলাদেশে কবির ব্যক্তিগত সহকারি শফি চাকলাদার সে কথা অকপটে স্বীকার করেছেন।তিনি ছবি তুলে রেখেছিলেন কিন্তু প্রকাশ্যে আনেননি।তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা করার জন্য তৈরি হল "নজরুল রোগ নিরাময় সমিতি"। কিন্তু সেখানেও ঢুকে গেল দু-একজন পাকিস্তানপন্থী। তারাই কবির চিকিৎসা, দেখাশোনা, অর্থ সংরক্ষন সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলেন।তাঁরা ইচ্ছা করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিলম্ব করতে আরম্ভ করলেন। ধীরে ধীরে সেই রোগ নিরাময়ের অযোগ্য হয়ে উঠলো।জুলফিকার লুম্বিনী হাসপাতালে শেকল দিয়ে বেঁধে লোক আড়ালে কবিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হল। পঞ্চাশের প্রথমদিকে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় নজরুল ইসলামের চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। রবিউদ্দিনকে সাথে নিয়ে কবিকে ভিয়েনায় পাঠানো হলো। কিন্তু ততদিনে নিভেছে দেউটি। কবি আর ভালো হলেন না,মস্তিষ্কের পিছনের বেশ কিছু শিরা উপশিরা শুকিয়ে মরে গেছে। এভাবে শিক্ষিত সুশীল সমাজ ব্যবস্থার সামনে একজন নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমী জীবনকে শেষ করে দেওয়ার পরিকল্পনা সফল হয়ে গেল। না এর প্রতিবাদ কিন্তু হয়নি। এমন এক প্রতিভা দিনে দিনে চোখের সামনে প্রদীপের সলতের মত নিভে যেতে দেখেও তেমনভাবে সাহায্য করতে কেউ এগিয়ে আসেনি।এটাই হল বিশ্বের বিখ্যাত ট্রাজেডি।

 অথচ কাজী নজরুল ইসলামের বয়স তখন ৩০।১৯২৯ সালের কলকাতার অ্যালবার্ট হলে আয়োজন করা হয় কবি-সংবর্ধনা সভা। কলকাতা এ্যালবার্ট হলে ওই অনুষ্ঠানে ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ যখন বজ্রকন্ঠে  বিখ্যাত কবিতা দুর্গম গিরি কান্তার মরু  আবৃতি করে শোনাচ্ছিলেন, সেসময় মঞ্চে উপস্থিতি ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু’ নজরুলের কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন –ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্যে আমি সারা ভারতবর্ষ ঘুরেছি কিন্তু ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরুর’ মত কোন গান আর একটা আমি খুঁজে পাইনি। এই গানের উপরে ভর করেই আমি ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে আসবো। নজরুলের গান ও কবিতা আমাদের বিপ্লবী চেতনাকে আরো শক্তিশালী করেছে।নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন,যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন বাঙালীর  জাতীয়-কবি হবেন কাজী নজরুল ইসলাম।

দ্বিধাহীনভাবে নেতাজির জবাবে কবি বলেন, ‘এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলে, আমি শুধু এই দেশেরই এই সমাজেরই নই। আমি সকল দেশের, সকল মানুষের। যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই আমি জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব।তাঁকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই আমি কবি।’আফসোস।কবিকে আমরা বাঙালীরা তখনও চিনতে পারিনি।এখনো না।এই দেশের জন্যে অনেক কিছু দিয়ে গেছেন।কিন্তু পেলো না কিছুই।এই বিশ্বের সব থেকে মানবতার  বড় অভাগা হলেন "

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

"কবির চার বছরের শিশু "বুলবুল"যেই রাতে মা/রা গিয়েছিল সেই রাতে কবির পকেটে একটা কানাকড়িও ছিল না। 

"অথচ কাফন,দাফন,

গাড়িতে করে দেহ নেওয়া ও গোরস্থানে জমি কেনার জন্য দরকার ১৫০ টাকা, সেই সময়ের ১৫০ টাকা মানে অনেক টাকা। 

এত টাকা কোথায় পাবে। বিভিন্ন লাইব্রেরীতে লোক পাঠানো হল। 

" না " টাকার তেমন ব্যবস্থা হয়নি। শুধুমাত্র ডি.এম লাইব্রেরি দিয়েছিল ৩৫ টাকা। আরো অনেক টাকা বাকি। টাকা আবশ্যক।

" ঘরে দেহ রেখে কবি গেলেন এক প্রকাশকের কাছে। প্রকাশক শর্ত দিল- এই মুহূর্তে কবিতা লিখে দিতে হবে। তারপর টাকা

" কবির মনের নীরব কান্না,যাতনা লিখে দিলেন এই কবিতা়র মাধ্যমে 

ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে

আমার গানের বুলবুলি।

করুণ চোখে চেয়ে আছে

সাঝের ঝরা ফুলগুলি।

"ফুল ফুটিয়ে ভোর বেলা কে গান গেয়ে

নীরব হ’ল কোন নিষাদের বান খেয়ে,

বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যারাণী চুল খুলি।।

"কাল হতে আর ফুটবে না হায়, 

লতার বুকে মঞ্জরী,

উঠছে পাতায় পাতায় কাহার করুণ নিশাস মর্মরী।

" গানের পাখি গেছে উড়ে শূণ্য নীড়,

কন্ঠে আমার,

নেই যে আগের কথার ভিড়,

আলেয়ার এই আলোতে

 আর, আসবে না কেউ কুল ভুলি।।

" একজন সন্তানহারা পিতার কি নিদারুণ কষ্ট। যদিও এই মানুষটাই বাংলা সাহিত্যকে অনেক কিছু দিয়েছেন....।

" দেশের জন্য অনেক কিছু করেছেন, জেল খেটেছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়ে...। 

কিন্তু হঠাৎ করে সেই মানুষটার পিছন থেকে সবাই সরে যায়..., 

একেবারে ভুলে যায়....., 

যাদের জন্য তিনি সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে  গেছেন।

কাজী নজরুলদের মতো কবিরা প্রতি শতাব্দীতে আসেনা।বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি বিশ্বের সকল শোষিত মানু‌ষের প্রতিবাদের অন্যতম কন্ঠস্বর আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে কয়েক শতাব্দী  ধরে শুয়ে থাকবেন।


 

টাকা -কড়ি-মুদ্রা

কবিতা বণিক  

                                                                                                                                
         টাকা মাটি, মাটি টাকা
         লাখপতি রামলাল শুয়ে শুয়ে খাটিয়ায়-
           বলে, মাটি মানে টাকা, টাকা মানে মাটি হ‍্যায়।
টাকার সাথে মাটির সম্পর্ক আছে বৈকি! প্রথম দিকে মাটির ট‍্যবলেটে লেখা হত হিসেব- নিকেশ। লেন-দেনের অঙ্ক ।

টাকার প্রচলন হওয়ার অনেক আগে সমাজে বিনিময় প্রথার চল ছিল। যেমন কৃষক ধানের বদলে কুমোড়ের থেকে হাঁড়ি, কলসী, কলুর থেকে তেল, তাঁতীর থেকে কাপড় ইত্যাদি কিনত। যার যা প্রয়োজন সে নিজের জিনিসের বদলে তার প্রয়োজনীয় জিনিস কিনত। এই ভাবেই সমাজ জীবন চলত। সমস‍্যা হল যিনি তার সামগ্রী দেবেন, গ্রহীতার কাছে সে জিনিসের প্রয়োজন না থাকলে দাতার পক্ষে সে জিনিস কেনা সম্ভব হত না। দুজনের পারস্পরিক চাহিদা মিটলে তবে বিনিময় সম্ভব । এর ফলে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসের বিনিময় শুরু করল। যেমন শষ‍্য, গরু, লবণ, ঝিনুক বা কড়ি , ধাতুর টুকরো ইত্যাদি । তবে দশহাজার বছর আগে অনুসন্ধান ও খননকার্যের মাধ্যমে পাওয়া এক ধরনের মাটির ট‍্যাবলেট আকৃতির জিনিস পাওয়া যায়, যাতে লেখা থাকত নিজেদের ফসল জমা দেওয়ার পরিমাণ এবং তার বিনিময়ে কি কি কিনতে পারেন। সম্ভবত এই ট‍্যাবলেটকেই মনে করা হয় বিশ্বের প্রথম মুদ্রা। কড়ির বিনিময় প্রথা ভারত, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকায় অনেক শতাব্দী আগে থেকেই ছিল। ছোট ছোট কেনাবেচায় কড়ির প্রয়োজন ছিল । 

                     এরপর ধাতব মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয় । মুদ্রা হল সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বীকৃত বিনিময়ের একটি সার্বজনীন মাধ্যম । যে কোন জিনিসের দাম মুদ্রার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় । প্রাচীন মুদ্রা শুধু লেনদেনের মাধ্যম ছিল না। প্রাচীন বাংলা ও ভারতের সমৃদ্ধ ইতিহাস,সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক উত্থান পতনের এক জীবন্ত দলিল। এর মধ‍্যে ইতিহাস তার কথা বলে । সে সময়ের রাজার পরিচয়, রাজ‍্যের সীমা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রযুক্তি গত উন্নতি , সামাজিক ব‍্যবস্হা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় । মুদ্রা আবিষ্কারের জায়গা থেকে সাম্রাজ‍্যের ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ করা যায়। কোন স্হানের মুদ্রা দূরবর্তী স্হানে পাওয় গেলে সেটা আন্তঃরাজ‍্য বাণিজ‍্য বা সামরিক বিজয়ের কথা বলে। 
                   ২৩০০ বছর আগে মৌর্য্য সাম্রাজ্য ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী রাস্ট্র। এই সময় পাঞ্চমার্ক রৌপ‍্যমুদ্রার প্রচলন হয়। চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য‍্য, বিন্দুসার ও সম্রাট অশোকের সময় সবচেয়ে বেশি রৌপ্য‍মুদ্রার ব্যবহার হয়। এই সময় রৌপ‍্য মুদ্রাই বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম ছিল। প্রতিটি মুদ্রায় হাত দিয়ে পাঁচ বা তার বেশি প্রতীক পাঞ্চ করা হত। মুদ্রা গুলো তৈরি হত খাঁটি রূপা দিয়ে । প্রতীক গুলোতে থাকত রাজার ছবি, সেই রাজ‍্যের প্রতীক , দেবদেবী , সূর্য, গাছ, ষাঁড়,ধনুক,হাতি, জ‍্যামিতিক প্রতীক ইত্যাদি । 

             সোনা, রূপা, তামার তৈরি মুদ্রা, সেই সময়কার অর্থনৈতিক অবস্থা ও সমৃদ্ধির কথা বলে। শিল্পকলা ও প্রযুক্তির কথাও বলে , সেই মুদ্রার নক্সা, লিপি, ধাতুর বিশুদ্ধতা দেখে। ধাতুর উপর কাজ ও শিল্পকলায় তাদের দক্ষতার পরিচয় দেয়।  

              প্রাচীন মুদ্রায় দুই ধরণের ভাষার লিপি ও পাওয়া গেছে। দুইধরণের লিপির ব‍্যবহার করা হত কারণ দুই দেশের ভাষা লিখলে সেই মুদ্রা দ্বিভাষিকের কাজ করত। যেমন ইন্দো-গ্রীক মুদ্রায় গ্রীক ও খরোষ্ঠী লিপি ছিল। খরোষ্ঠী লিপি প্রাচীন লিপি। এই লিপি ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম অঞ্চল এবং মধ‍্য এশিয়ায় ব‍্যবহৃত হত। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল ছিল গান্ধার অঞ্চল। এখনকার পাকিস্তান ও আফগান। এই মুদ্রা সেই সময়কার ভাষা ও যোগাযোগের মাধ‍্যম বোঝায়। প্রাচীন ভারতের গুপ্ত বা মৌর্য যুগ, বাংলার সেন যুগ, পাল যুগ। মুদ্রায় থাকত রাজার পরিচিতি, সেই সময়কাল, শাসকের নাম, উপাধি থাকত। একই জায়গায় বিভিন্ন দেশের মুদ্রা পাওয় গেলে বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার সম্বন্ধে জানা যায়।                                                                             





যেমন হাম্পির মিউজিয়ামে আমার দেখা হাম্পির বিজয়নগর সাম্রাজ্যের দুটি মুদ্রার একটি স্বর্ণমুদ্রা ও অন‍্যটি তামার মুদ্রার ছবি দেওয়া হল। হাম্পিতে পাওয়া, স্বর্ণ মুদ্রায় একপিঠে শিবপার্বতীর র্মূর্তি, হামাগুড়ি দেওয়া বালকৃষ্ণের মূর্তি, হাতে মাখনের বল। শঙ্খ, চক্রের প্রতিকৃতি। উল্টোদিকে দেবনাগরী লিপিতে রাজার নাম ও উপাধি লেখা- শ্রী প্রতাপ কৃষ্ণ রায়। এটি ওড়িশার উদয়গিরি বিজয়ের স্মারক হয়েছিল। আরও স্বর্ন মুদ্রা যাকে বরাহ বা প‍্যগোড়া বলা হত। কারণ বিজয়নগর সাম্রাজ্যের রাজকীয় প্রতীক ছিল ভগবান বিষ্ণুর বরাহ অবতার।
   বিশুদ্ধ সোনা দিয়ে তৈরি হত। মুদ্রার আকার প্রায় পাঁচ মিলিমিটারের মতো হত। শুধু ব‍্যবসা বাণিজ্যের জন্যই নয়, ধর্মীয় উৎসবেও দান করত। আরও মুদ্রা পাওয় যায় গজানন গণেশ, লক্ষী-নারায়ণ , দুই মাথা ওয়ালা ঈগল।  
         গুপ্ত যুগে স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন বেশি ছিল। এগুলোকে দিনার বলা হত। রূপার মুদ্রা কে বলা হত রূপক, তামার মুদ্রাকে বলা হত কার্ষাপণ। সাহিত্যে স্বর্ণ মুদ্রাকে সুবর্ণ বা নিস্ক বলা হত। রূপার মুদ্রাকে ‘পুরাণ’ বা ‘ধরণ’ বলা হত। রূপার ছোট মুদ্রা কে শতরান বলা হত। তামার ছোট মুদ্রা কে বলা হত কাকিণী । ১টি সোনার মুদ্রা সমান ১৬টি রূপার মুদ্রা । 

        খ্রিষ্টপূর্ব ৩ শতকের মৌর্য যুগের রূপার মুদ্রায় চাকা এবং হাতির প্রতীক চিহ্ন আঁকা পাওয়াযায়। 
তামার মুদ্রা গুলোকে জিতাল, দুগগানি বা কাসু বলা হত। এগুলোতেও রাজকীয় চিহ্ন হিসেবে বরাহ, সূর্য,চাঁদ, খঞ্জর, গণ্ডবেরুণ্ড - ‘পৌরাণিক দ্বিমুখী পাখি’ যা চরম শক্তির প্রতীক, তার নখ দিয়ে হাতি ধরে আছে এমনও খোদাই থাকত। আর থাকত- শিব-পার্বতী, লক্ষী-নারায়ণ, হনুমান, গরুড়, হাতি, ষাঁড় সিংহ ইত্যাদি । 
           পালযুগের বালমৃগাঙ্ক মুদ্রা শিশু চন্দ্র কে বোঝায়। পাল সম্রাট গোপাল চন্দ্রাদেবীর পূজা করতেন। চণ্ডীর মতোই চন্দ্রাদেবী। এই দেবী অষ্টভূজা। এই বাল মৃগাঙ্ক মুদ্রায় ‘গো’ ‘দে’ এবং ‘ জয়’ লেখা মুদ্রা পাওয়া যায়। ‘গো’ লেখা মুদ্রা টি প্রাচীন। তাই পাল সম্রাট গোপালের মুদ্রার কথা বলে। সেই মতো দে’ ও ‘জয় ‘লেখা মুদ্রা গুলো দেবপাল ও জয় পালের মুদ্রা বলা হয়। প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল মহাস্থান গড় বা বগুড়া। খ্রীষ্ট পূর্ব ৩য় শতকে উয়ারী , বটেশ্বর, নরসিংদী। ১ম শতকে তাম্রলিপ্ত বা তমলুক মেদিনীপুর, চন্দ্রকেতুগড় বেড়াচাঁপা ২৪ পরগণা।

                     প্রাচীন ভারতে সামুদ্রিক যে কড়ি পাওয়া যায় সেই কড়ি ছিল মুদ্রার প্রথম রূপ। বাংলা- ভারত সহ আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন উপকূলীয় দেশে কড়ির ব‍্যবহার হত। কড়ির গুণাগুণ দেখা হত। আবার ছোট , বড় কড়ি, ফুটো কড়ি ও বেচা কেনার জন‍্য ব‍্যবহৃত হত। কড়ি ছোট খাটো কেনাবেচায় ব‍্যবহার হত। ফুটো কড়ি যৎ সামান্য বেচা কেনায় ব‍্যবহৃত হত। এছাডা ছিল দামড়ি, আনা, পাই, পয়সা, টাকা । দামড়ি ছিল তামার তৈরি মুদ্রা । শের শাহ সুরি এই দামড়ি মুদ্রার প্রচলন করেন। দামড়ি ভগ্নাংশ হিসেবে ব‍্যবহৃত হত। যেমন ১ টাকায় ৪০ টি ‘ দাম ‘ হত। ১টি দাম মুদ্রার ১/৮ অংশকে বলা হত দামড়ি। সেই হিসেবে ১ টাকায় ৩২০টি দামড়ি পাওয়া যেত। ১টি দামড়ি ৪০ টি কড়ির সমান ছিল। 
                  ভারী ধাতব মুদ্রার ঝামেলা এড়াতে রসিদ ব্যবহার শুরু হয়েছিল। এর থেকেই চীনের সং সরকার প্রথম কাগজি মুদ্রা ‘ জিয়াওজি’ চালু করেন।  
                  আধুনিক টাকার লেনদেন বা কেনাবেচা মূলত ডিজিটাল মাধ্যমে হয়। মানুষ এখন কাগজ বা মুদ্রার বদলে মোবাইল আ‍্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং,ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির সাহায্যে খুব তাড়াতাড়ি ও সহজে এক জায়গা থেকে অন‍্য জায়গায় টাকা পাঠানো বা কেনাবেচা করতে পারে।  
              অনলাইন ব‍্যাঙ্কিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি— 
ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং — ঘরে বসে ল‍্যাপটপ বা ফোনের মাধ্যমে এক ব‍্যঙ্কের হিসাব থেকে অন‍্য ব‍্যাঙ্কে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা।
 ক্রিপ্টোকারেন্সি— বিট কয়েনের মত ভার্চুয়াল মুদ্রা দিয়েও আজকাল আন্তর্জাতিক স্তরে লেনদেন হয়ে থাকে ।




 

মনসা মঙ্গলকাব্য

বেলা দে


মধ্যযুগে লৌকিক ও পৌরাণিক দেবদেবীর মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য যে কাব্য রচিত হয়েছে তাকে বলা হয় মঙ্গলকাব্য। যেমন -- মনসামঙ্গল, চণ্ডীমঙ্গল, ধর্মমঙ্গল, অন্নদামঙ্গল। মনসামঙ্গল তার মধ্যে অন্যতম। মনসামঙ্গল কাব্যে সর্পদেবী মনসার পূজা প্রচারের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এইএই কাব্যের মূল উপজীব্য হল বণিক চাঁদ সওদাগরের অহংকার  ভঙ্গ। মনসা দেবীর দ্বারা তার সর্বনাশ, এটি একটি জনপ্রিয় লোকসাহিত্য। মনসামঙ্গল কাব্যের রচয়িতা বিজয় গুপ্ত। সর্পদেবীকে কল্পনা করে লেখা। দেবাদিদেব মহাদেবের মানস কন্যা সে, তাই নাম মনসা। তিনি পার্বতীর কন্যা নন, মোটেই পছন্দ করে না পার্বতী তাকে। পার্বতী একদিন রাগবশত অস্ত্র ছুঁড়ে মারায় তাঁর এক চোখ কানা হয়ে যায়। চাঁদ সদাগর ধনী বনিক, সমাজে তার অশেষ প্রতিপত্তি।সে যদি তাঁর পূজা করেব জনসমাজ তাকে মর্যাদা দেবে। তাই সে উঠেপড়ে লেগেছে তার হাতে পূজা নেবার চাঁদের প্রচন্ড ঘৃণা তার উপর, ব্যঙ্গ করে বলে--"
 যেই হস্তে পূজি আমি শঙ্কর- ভবানী "
    সেই হস্তে নাহি দিব ব্যাঙ খেকো কানি।"

কঠোর তপস্বী ব্রহ্মচারী জরৎকারু মুনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন তিনি কোনদিন বিয়ে করবেন না, কিন্তু পূর্ব পুরুষের জেদ এবং বংশরক্ষার অভাবে নরকে ঝুলে থাকায়, শেষে রাজি হন বিবাহে তবে একটা শর্তে 
যদি মনসা কোনদিন  এতটুকুও অমর্যাদা করে তাকে তাহলে সে ছেড়ে চলে যাবে সে মুহূর্তে। অবশেষে সেটাই ঘটে, তাকে ছেড়ে চলে গেল মুনি।

মনসার গর্ভে জন্ম নেয় আস্তিক। এদিকে মনসা কিছুতেই কৌলিন্য অর্জন করতে পারছেন না। চাঁদের জেদ তিনি চ্যাং মুড়ি কানিকে পূজা দেবেন না। সে একবার পূজা দিলেই মর্ত্যলোকে প্রচার হবে, মনসার ভ্রাতা নাগরাজ বাসুকিও দেবাদিদেব মহাদেবকে অনুরোধ করে, কথিত আছে এই জন্মের বেহুলা ও লক্ষ্মীন্দর, পূর্বজন্মের ঊষা ও অনিরুদ্ধ স্বর্গের নর্তক নর্তকী  মনসার চক্রান্তে তাদের নাচের তালভঙ্গ হলে শাপ দেন দেবরাজ ইন্দ্র " তোমরা মর্তলোকে মনুষ্য জন্ম পাবে। মর্তে চাঁদ সদাগরের সপ্তম সন্তান হয়ে জন্ম নেয় লক্ষ্মীন্দর তার স্ত্রীই হলেন বেহুলা। এদিকে মনসার আক্রোশে চাঁদের   ছয় পুত্রের মৃত্যু হয়েছে সর্পদংশনে, ধনসম্পদ  সপ্তডিঙা সহ সমুদ্রে ডুবে যায় বানিজ্যে যাবার সময়। সব হারিয়েও সে প্রতিজ্ঞায় অটল। জন্ম নেয় তার কনিষ্ঠ পুত্র লক্ষিন্দর।  জ্যোতিষী গণনা করে বলেন বিবাহ রাত্রে তাকে সর্প দংশন করবে এবং মৃত্যু ঘটবে বিবাহবাসরে। এই বিপদ থেকে বাঁচতে তার নিশ্চিদ্র অভেদ্য খোদাই "লৌহগড়" নির্মাণ। যেখানে কোনো ছিদ্র রাখেন না। করেন বিশ্বকর্মা।

উজানি নগরের সাহা কন্যা বেহুলার সাথে তার বিয়ে দেন কড়া প্রহরায়। সমস্ত প্রহরীর দৃষ্টি এড়িয়ে মনসার নির্দেশে কালনাগিনী তাকে দংশন করে। গ্রামীণ প্রথা অনুযায়ী সর্পদংশনে মৃতের দেহ কলার মান্দাসে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, পতিব্রতা বেহুলা কঠোর সামাজিক অনুশাসন ভেঙে স্বামীর মৃতদেহ কলার মান্দাসে ভাসিয়ে রওনা হলেন স্বর্গের উদ্দেশ্যে  যেমন করেই হোক তাঁর মৃত স্বামীকে ফিরিয়ে আনবেই। সে দেহ মাসের পর মাস ভেসে পঁচাগলা হয়ে ক্রমে ক্রমে হাড়গোড় বেরিয়ে গেল। অবশেষে মনসাকে করজোড়ে প্রার্থনা করে বেহুলা।  মনসা তার পালক মাতা নেতা ধোপানীর সাহায্যে তাকে  স্বর্গে পৌঁছায়, সেখানে নৃত্য গীতে দেবতাদের সন্তুষ্ট করে লক্ষীন্দর সহ চাঁদের ছয়পুত্রর প্রাণ এবং চাঁদ সদাগরের হারানো সম্পদ, সমুদ্রে ডুবে যাওয়া সপ্তডিঙা সব ফিরিয়ে আনেন। শেষ পর্যন্ত নাছোড়বান্দা চাঁদ বেহুলার ইচ্ছেনুযায়ী বাম হস্তে মনসার উদ্দেশ্যে ফুল ছুঁড়ে পূজা দেয়। মর্তলোকে মনসার পূজা প্রচার হল। ধর্মীয় পরিমন্ডলে তিনি শুধুই ভয়ের প্রতীক নন মনুষ্য জীবন সুরক্ষাও মঙ্গলকাব্যের উপস্থাপনা। মধ্যযুগে দেবী মনসার উদ্ভব কাল্পনিক চরিত্র হিসেবে। বর্ষাকালে জলা জঞ্জাল অধ্যুষিত অঞ্চলের সাপের উপদ্রব মাথায় রেখে মঙ্গলকাব্য রচিত। এই মঙ্গলকাব্য রচয়িতাদের সৃষ্টিকর্মে অনেক মতভেদ রয়েছে কেউবা বলেন বিপ্রদাস পিপিলাই, আবার কারও মতে নারায়ণ দেব, তবে বিজয় গুপ্ত রূপ পরিবর্তন করে এক বিশেষ মর্যাদায় আনেন সেটাই জানা যায়। কেউবা নিশ্চিত বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কবি তাদের মতন করে রচনা করে গেছেন। 



 স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়ে  

                       অভিজিৎ সেন 

স্বাধীনতা কোন 'সোনার পাথর বাটি নয়' স্বাধীনতা মানবচৈতন্যের গভীর অনুভূতির অন্য নাম। 'স্বাধীন' শব্দের অর্থ 'অন্যের নিয়ন্ত্রণে না থাকা' এবং 'তা' প্রত্যয়টি যুক্ত হয়ে স্বাধীনতার ভাবার্থ দাঁড়ায় নিজের অধীনে থাকার ভাব বা অধিকার । লাতিন শব্দ 'Liber' থেকে ইংরেজি 'Liberty'
এসেছে এর অর্থ 'সম্পূর্ণ মুক্তি' । স্বাধীনতা মানুষের মর্যাদা, অস্তিত্ব ও আত্ম বিকাশের সর্বোৎকৃষ্ট চালিকাশক্তি। পরাধীনতার আঁধার চিরে আলোর বুকে সন্তরণের অন্যনাম ।
মুক্ত পাখির মতো অসীম আকাশে উড়ে যাওয়ার অন্য নাম।
নিজস্ব চিন্তা,মেধা ও চেতনার পূর্ণবিকাশের পটভূমির অন্য নাম । তবে অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা কখনোই কাম্য নয়। যা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অন্যের প্রাপ্য অধিকার কেড়ে নেয়। 

               স্বাধীনতা বিষয়ে বিভিন্ন মনীষী নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি রেখে গেছেন। প্লেটো তাঁর 'The Republic' গ্রন্থে বলেন নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতা মানুষকে নিজস্ব বাসনার দাসে পরিণত করে। অ্যারিস্টোটল মনে করেন 'man is by nature a political animal' আবার স্টোইক দর্শন অনুযায়ী 
এপিকটেটাস,মার্কাস অরেলিয়াসের মতো দার্শনিকগণ মনে করেন মানুষের মন ও চিন্তার স্বাধীনতাকে কেউ বন্দী করতে পারে না । রুশো বলেন, 'man is born free but everywhere he is in chains' তিনিও মনে করেন স্বাধীনতা
মানে, যা খুশি তাই করা নয়, বরং যুক্তিসঙ্গত ও নৈতিক আইনের অধীনে থেকে নিজের ও সমষ্টির কল্যাণ সাধন করা। (The social contract) । Thomas Hobbes 'Leviathan' গ্রন্থে বলেন বাহ্যিক বাধার অনুপস্থিতি হলো স্বাধীনতা । উদারনীতিবাদের জনক জন লক বলেন মানুষ কিছু মৌলিক উপাদান নিয়ে জন্মগ্রহণ করে সেগুলি হলো--জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির অধিকার । ইমানুয়েল কান্টের মতে যা ইচ্ছা তা করার নাম স্বাধীনতা নয়। লালসা বা অন্ধ অনুভূতির দ্বারা চালিত হলে তা স্বাধীনতা নয়। জন স্টুয়ার্ট মিল 'On Liberty' গ্রন্থে ব্যক্তির স্বাতন্ত্রকে ও বাক্ স্বাধীনতা সমর্থন করেন। কালমার্কস বলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে আক্রান্ত শ্রমিকের ভোট দেওয়ার স্বাধীনতা অর্থহীন। উৎপাদনে শ্রমিকের অধিকার ও শোষণহীন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠাই হলো মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা। অস্তিত্ববাদী দার্শনিক জঁ পল সার্ত্র বলেন মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য। মানুষের কোন পূর্বনির্ধারিত লক্ষ্য থাকে না। মানুষ তার নিজের কাজের মধ্য দিয়ে নিজের পরিচয় তৈরি করে। তাই মানুষের প্রতিটি পছন্দের পেছনে তার দায়িত্ব কাজ করে। দায়িত্ব থেকে পালানোর অর্থ স্বাধীনতার সাথে প্রতারণা করা। ভারতীয় দর্শনে স্বাধীনতা বাহ্যিক পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়, মনের কাম,ক্রোধ, মায়া ও অহংকারের শেকল থেকে আত্মার মুক্তি। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন, 'freedom is the watchword of the soul' অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ মানুষের আত্মিক উন্মেষ ও সর্বজনীন মানবতা বোধকে 
স্বাধীনতা মনে করতেন। গান্ধীজীর 'স্বরাজ' শুধু ইংরেজদের হাত থেকে ভারতীয়দের মুক্তি নয় স্বরাজ হল 'আত্ম-শাসন' ।

                ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট মধ্যরাতে ব্রিটিশ উপনিবেশের শৃংখল ভেঙে স্বাধীন ভারতের জন্ম হলো। নিজস্ব সংবিধান চালু হলো। নিজস্ব পতাকা উত্তোলিত হলো।
আজ ৮০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মনে প্রশ্ন জাগে ভারতীয়রা কতটা স্বাধীন হয়েছে ? যেখানে স্বাধীনতার প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত থাকে সাধারণ মানুষের অধিকারে,সুরক্ষায়,সমতায়।
সর্বস্তরে কি সত্যি সেটা লক্ষণীয় ? অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা থেকে দেশের কোটি কোটি মানুষ কি মুক্তি পেয়েছে ? শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা,বেকারত্ব দূরীকরণ,যুবক-যুবতীর ভবিষ্যৎ কতটা আশার আলো পেয়েছে ? এ কথা ঠিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার দ্বারা দেশ পরিচালিত হচ্ছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় এশিয়ার বহু দেশ, স্বাধীনতার পরেও সামরিক শাসন বা স্বৈরাচারীর কবলে পড়েছে কিন্তু ভারতবর্ষ আন্তর্জাতিক 'কোল্ড ওয়ারের' মতো সমস্যাকে জোট নিরপেক্ষ নীতির মধ্যদিয়ে দূরে রেখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে এবং শক্তিশালী করেছে । 'সবুজ বিপ্লবে'র মধ্য দিয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও আজও পরিচালক বর্গের একশ্রেণির লোভের কারণে সকল সাধারণ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য পায় না। প্রযুক্তিতে ভারত বিশ্বজুড়ে বিশেষ স্থান দখল করলেও পাল্লা দিয়ে বেকারত্ব বেড়েই চলেছে। তাহলে স্বাধীনতা, পূর্ণতা পেল কী করে ? দেশের বিপুল সম্পদ পুঞ্জিভূত হয়ে আছে মুষ্টিমেয় ধনকুবেরদের হাতে । এদের মর্জির উপরেই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সংস্কৃতিক জগতও পরিচালিত হয়। তাহলে প্রকৃত স্বাধীনতা এলো কোথা থেকে ? 

                ভারতবর্ষে আজও কোটি কোটি মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার উপর বা দানের উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতে হয়। অন্নদাতা কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। খেটে খাওয়া মানুষের জীবন বঞ্চিত হতে হতে বুদবুদের মতো মিশে যায়। অথচ ভারতের সংবিধান তো প্রতিটি মানুষকে সসম্মানে বাঁচার অধিকার দিয়েছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য যারা লড়াই করেছিল তাঁরা তো এই আশা নিয়েই দেশ স্বাধীন করেছিল। জাতি ধর্ম-বর্ণ লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলেই কি সমান অধিকার লাভ করে থাকে ? যদি না ! তবে প্রকৃত স্বাধীনতা এলো কী করে ?

                 শিক্ষার ব্যাপকতার অভাবে আজও সমাজ থেকে অস্পৃশ্যতা, জাতিভেদ প্রথা বিলুপ্ত হয়নি । আদিবাসী ও দলিতদের উপর অত্যাচার, হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ অব্যাহত । স্বাধীন ভারতের সর্ব বিভাগে নারীরা দায়িত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে তবুও এই সমাজ থেকে আজও কন্যাভ্রুণ হত্যা, কন্যা সন্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, বিবাহে পণ গ্রহণ, ডাইনি অপবাদে হত্যা করা, নারী পাচার, যৌন উৎপীড়ন,ধর্ষণ,বাল্যবিবাহ প্রভৃতি চোখের সামনে ঘটে চলেছে । একজন নারীর পোশাক-পরিচ্ছদে, খাদ্যাভাসে, কর্মনির্বাচনে, চলাফেরায় আজও তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে নেই পূর্ণভাবে, নিয়ন্ত্রণ করে সমাজব্যবস্থা। তাহলে নারী স্বাধীন হলো কীভাবে ?

         বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ভারতের স্বাধীনতার মূল মন্ত্র। 
সংবিধান সংশোধনের দ্বারা পরবর্তীকালে ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটি যুক্ত করা হয়, যাতে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় 
নিজের ধর্মাচরণ স্বাধীনভাবে করতে পারে। তাহলে সাম্প্রদায়িক সমস্যা ও দাঙ্গা কেন ? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে যে নিরাপত্তাহীনতা বোধের জন্ম হয়ে চলেছে তাতে ভারতের স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি কি গভীর প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড়িয়ে নেই ?

                    বাক্ স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন মজবুত হলে দেশের মঙ্গল। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদ মাধ্যম। তারা যদি বাণিজ্যিক স্বার্থে, কর্পোরেটের চাপে, রাজনৈতিক প্রভাবে নিরপেক্ষতাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভুল তথ্য প্রচার করে যায় তবে সুস্থ জনমত কি করে গড়ে উঠবে ? সংবিধানের 19 নং ধারায় বাক্ স্বাধীনতার কথা বলা আছে তবে তা হতে হবে গঠনমূলক এবং জন হিতকর। তখন সেই প্রতিবাদ কখনোই সংবিধানিক হবে না। কিন্তু সরকার যদি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গঠনমূলক সমালোচনাকেও রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে বাধা দান করে তাহলে বাক্ স্বাধীনতা অর্থহীন নয় কি ?

        আধুনিক ভারতে তথা বিশ্বে ২১ শতকে নতুন সমস্যা হলো ডিজিটাল ও পরিবেশগত পরাধীনতা। রাষ্ট্র ও বৃহৎ তথ্য প্রযুক্তির সংস্থাগুলো নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের উপর নজরদারি করছে নানাভাবে, ফলে ব্যক্তিগত তথ্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে। স্বাধীনতা অন্যের হাতে আছে গচ্ছিত !

                 এক ভারতবর্ষে দুটি ভারতবর্ষ আছে। একদিকে যারা অর্থ, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থান করছে এবং আধুনিক বিশ্বের সুযোগ সুবিধা উপভোগ করছে। অন্যদিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী,ভূমিহীন কৃষক,নিরাপত্তাহীন নারী,মত প্রকাশের অপরাধের নিপীড়িত জনগণ যাঁরা থেকে গেল হতাশার আর নিঃস্ফলের দলে । তবে স্বাধীনতার বৃত্ত পূর্ণ হবে কী করে ? 

          ভারতের বাইরে বিশ্বের কয়েকটি দেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাস আমাদের বিস্মিত করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৭৭৬ সালে তাদের 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে' স্পষ্ট করে বলে সকল মানুষ সমান এবং তাদের জীবন,স্বাধীনতা ও সুখ অনুসন্ধানের অধিকার অলংঘনীয় (all men are created equal) তাহলে সেখানকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের কেন সমস্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হলো ? ১৭৮৭ সালে সংবিধানে কর ও প্রতিনিধি সংখ্যা গণনার সুবিধার্থে বলা হলো কৃষ্ণাঙ্গ দাসেরা তিন পঞ্চমাংশ মানুষ। ১৮৩০ সালে
'Indian removal act' করে কৃষ্ণাঙ্গদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে উগ্র জাতিগত ও ধর্মীয় বিশ্বাসে শ্বেতাঙ্গরা গণহত্যাও চালালো । ১৮৫৭ সালের 'ড্রেড স্কট মামলা' অনুযায়ী কৃষ্ণাঙ্গরা মার্কিন নাগরিক নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ অংশে প্রচুর তুলা ও তামাক চাষ হয় যা কৃষ্ণাঙ্গ দাসদের উপর নির্ভর করে চলতো। চাবুক মেরে, শেকলে বেঁধে অমানবিকভাবে তাদের খাটানো হতো ।১৮৬১ থেকে ৬৫ 'দাস প্রথা' বন্ধ করতে কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ হয়। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়ারের মতো নেতাদের হাত ধরে দীর্ঘ সংগ্রামের পথে ১৮৬৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে। তাহলে প্রশ্ন হল 'স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র'টি শুধুমাত্র কি শ্বেতাঙ্গদের জন্য ছিল, কৃষ্ণাঙ্গদের জন্য নয় ?

              ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্রই ছিল সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা। সাধারণ মানুষ রাজতন্ত্র ও সামন্তবাদের বিরুদ্ধে আত্মত্যাগ করেছিল। সেখানকার মনীষীগণ মুক্তির কথা প্রচার করেছিলেন। গোটা ইউরোপ, পরাধীন এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশেও এই বাণীই বিস্তার লাভ করে। কিন্তু মজার বিষয় হলো ফ্রান্সে বিপ্লব উত্তরকালে রোবসপিয়ারের সময় "reign of terror," নেপোলিয়নের 'একনায়কত্বে'র মনোভাব সেখানকার সাধারণ মানুষকে এক পরাধীনতার জাল থেকে মুক্ত করে অপর একটি স্বর্ণখচিত পরাধীনতার জালে বন্দী করেছিল, ফলে স্বাধীনতার বাণী নীরবে গেছে কেঁদে ।

              ১৯৫০-৬০ এর দশকে আফ্রিকার বহু দেশ যেমন কঙ্গো,নাইজেরিয়া ও ঘানা প্রভৃতি উপনিবেশিক শাসনের হাত থেকে মুক্ত হলেও দুর্বল অর্থনীতি, স্বৈরাচারী শাসন, গৃহযুদ্ধের ফলে পুনরায় ক্ষমতা পরোক্ষভাবে বিদেশিদের হাতে ও প্রত্যক্ষভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ চক্রান্তকারীদের হাতে চলে যায়। আফ্রিকার ১৪ টি দেশকে স্বাধীনতার পরেও 'CFA france' ব্যবহার করতে বাধ্য করা হতো। IMF থেকে বিপুল ঋণ পরিশোধের কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার রাষ্ট্রীয় অনুদান বন্ধ করতে হয়। দুর্বিষহ হয় সাধারণ মানুষের জীবন। আমেরিকা ও রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধের ময়দান হয়ে ওঠে দেশসমূহ। উপনিবেশিক শাসকগণ আফ্রিকার শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কখনো নজর দেয়নি। ফলে স্বাধীনতা লাভের পর শাসকগণ উপনিবেশিক নীতিকে অনুসরণ করে চলে। দুর্নীতি, স্বজনপোষণ, সেনা অভ্যুত্থানের ঘটনা নিত্যনৈমিতিক কাণ্ডে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা' কবিতাটি স্মরণীয়। ঘানার প্রেসিডেন্ট কোয়ামে
এনক্রুমা এই অবস্থাকে ''Neo-Colonialism'' আখ্যা দিয়েছিলেন ।

        এশিয়া মহাদেশের অন্তর্গত ভারত ভেঙে তৈরি হয় পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তান। ১৯৪৭ সালে দুটি দেশের জন্ম হলেও দাঙ্গা ও দেশভাগ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং বাস্তুহারা করেছে। সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপকে যেভাবে পাকিস্তান আড়াল করে রাখে, তা সমগ্র মানবতার পক্ষে ভয়ানক। সূচনা লগ্ন থেকেই ভারতবর্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শকে ভিত্তি করে এগিয়ে চলেছে। তবুও জাতি, বর্ণ, ধর্ম ও
অর্থনৈতিক বৈষম্য এখনো পূর্ণভাবে দূর হয়নি। যেদিন দূর হবে সেদিন প্রকৃত অর্থে ভারত 'বিশ্বগুরু' হতে পারবে ।

             চীন ও উত্তর কোরিয়ায় মানুষের বাক্ স্বাধীনতা নেই । চীন সরকার তিব্বত, উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম অধ্যুষিত শিনজিয়াং বা পূর্ব তুর্কিস্তান,দক্ষিণ মঙ্গোলিয়াকে তাদের স্বায়ত্তশাসন অঞ্চল হিসেবে দেখে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তাইওয়ানকে দখল করতে চায়। সেই উদ্দেশ্যে ক্রমাগত সামরিক হুমকি, সীমানায় অবৈধভাবে প্রবেশ চালিয়ে যাচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ার সুবাদে 'ভেটো' ক্ষমতার প্রয়োগের দ্বারা বিশ্বের জন্য অহিতকর বিষয়কেও মান্যতা দিতেও পিছপা হয় না । এ কেমন স্বাধীনতা ?

                 রাশিয়ার দ্বারা সার্বভৌম দেশ ইউক্রেন আক্রান্ত হয়ে চলেছে। তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশ রাশিয়ার দখলে চলে গেছে। রাশিয়ার সংবিধানে মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই অধিকার সংকুচিত ও নিয়ন্ত্রিত। 
রাজনৈতিক স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নেই বললেই চলে। অর্থনৈতিক সাম্যবাদ সেখানে নেই, আছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত চরম পুঁজিবাদ । দেশের সম্পদ (যেমন খনি,তেল,গ্যাস,শিল্প কারখানা) পুঞ্জিভূত হয়ে আছে 'ওলিগার্ক' বা ধনকুবেরদের হাতে । রাশিয়ার সংসদে 'কমিউনিস্ট পার্টি অফ দি রাশিয়ান ফেডারেশন' সামাজিক বিপ্লব বা সাম্যবাদের পরিবর্তে ক্রেমলিং ও বর্তমান প্রেসিডেন্টের (পুতিন) নীতিকে সমর্থন করে চলেছে । তাহলে সাম্যবাদী-রাশিয়া একদা সমগ্র বিশ্বের খেটে খাওয়া মানুষদের যে স্বাধীনতা স্বপ্ন দেখিয়েছিল সেই স্বাধীনতা কোথায় ? 

                'সনাতন মার্কসবাদ' যেখানে অর্থনীতি, উৎপাদন ব্যবস্থা ও শ্রেণি সংগ্রামকে কেন্দ্রবিন্দু বিবেচনা করে। অন্যদিকে 'নব্য মার্কসবাদ' সংস্কৃতি,মনস্তত্ত্ব,গণমাধ্যম,শিক্ষা, রাজনীতি,বহুমাত্রিকতা,নমনীয়তা ও আন্তঃবিষয়কে যুক্ত করেছে তাত্ত্বিকভাবে । আন্তোনিও গ্ৰামসি, থিওডোর অ্যাভোরনো,ম্যাক্স হরকহাইমার,মারকিউস আলথুসার প্রভৃতি নব্য মার্কবাদী। উত্তর কোরিয়া সাম্যবাদ থেকে সরে এসেছি । এখানে জনগণের সর্ববিষয়ে স্বাধীনতা নেই। চীনের জনগণ অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন যাপনে কিছু স্বাধীনতা পেলেও সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা 'চীনা কমিউনিস্ট পার্টি'র হাতে। কিউবাতে কমিউনিস্ট পার্টির বাইরে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব নেই। ফলে সরকারি নীতির গঠনমূলক আলোচনার জায়গাও নেই। ভেনেজুয়েলা প্রাতিষ্ঠানিক কমিউনিস্ট রাষ্ট্র না হলেও সমাজতন্ত্র চালুর চেষ্টা হয়। কিন্তু ভুল অর্থনীতি ও দুর্নীতি দেশটিকে চরম সংকটে ফেলেছে । নাগরিকদের স্বাধীনতা,বাক্ স্বাধীনতা এখানে অনুপস্থিত। ভিয়েতনাম ও লাওস একদলীয় কমিউনিস্ট রাষ্ট্র
। পুঁজিবাদী ও মুক্ত বাজার ব্যবস্থা তারাও গ্রহণ করেছে। রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও বিরোধীদের মত প্রকাশে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কমিউনিস্ট শাসনতান্ত্রিক আদর্শে পরিচালিত দেশ গুলির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় সাম্যবাদের ব্যর্থতা ও স্বাধীনতার সংকোচন সাম্যবাদের মৌল নীতিকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। তাহলে স্বাধীনতা কোথায় ?

             ১৭৫৭ সালে পলাশীতে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যাস্ত হয় ভাগীরথীর জলে। তিতুমীরের বিদ্রোহ, সিপাহীদের বিদ্রোহ,ক্ষুদিরাম,সূর্যসেন,সুভাষচন্দ্র বসু,গান্ধীজী প্রমুখের আন্দোলনে শেষ পর্যন্ত ১৯৪৭ সালে ইংরেজ মুক্ত হয় দেশ ।
পার্শ্ববর্তী পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে ১৯৬৯ সালে জাতি,ধর্ম নির্বিশেষে এখানকার মানুষেরা গণঅভ্যুত্থান করে পাকিস্তানি শাসকদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। ১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধ হয় শেষ ।ভারতের সাহায্যে নতুন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু লক্ষ লক্ষ অমুসলমান সম্প্রদায়কে দেশ ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে আসতে হলো কেন ? তাদেরও স্বপ্ন ছিল সেই দেশে থাকার। তাদের সেই স্বাধীনতা টুকু কেড়ে নেওয়া হলো কেন ?

                   স্বাধীনতা নামক অনুভূতিটির বহুমাত্রিক রূপ আছে। পোশাকে,খাদ্যাভাসে,ধর্মচর্চায়,ব্যক্তিগত জীবন পরিচালনায়,নিরাপদে বসবাসে, চলাফেরায়, সমান আইনি সুবিধায়,ভোটদানে,মতামত প্রকাশে, গঠনমূলক আলোচনায়, দারিদ্র্য-বেকারত্ব দূরীকরণে,সামাজিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক অধিকারে,জীবিকা অর্জনের সমান সুযোগে । এছাড়া রাষ্ট্র যখন বিদেশের সম্পূর্ণ প্রভাব মুক্ত হয়ে নিজস্ব নীতি নির্ধারণে,শাসন শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় তখন অর্জিত স্বাধীনতা সার্থক হয় । তবে স্বাধীনতা কখনো উশৃঙ্খলতা নয়। স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে তাকে রক্ষা করা কঠিনতর কাজ। স্বাধীনতা দীর্ঘস্থায়ী হবে আইনের শাসন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের দ্বারা, সচেতন ও জাগ্রত নাগরিক সমাজের দ্বারা, সত্য তথ্য প্রকাশে সক্ষম সংবাদ মাধ্যমের দ্বারা এবং গঠনমূলক সমালোচনার দ্বারা। স্বাধীনতা একটি সাময়িক বিষয় নয় এটা ধারাবাহিক চর্চার বিষয় । জর্জ বার্নার শ বলেছিলে, 'Freedom means responsibility' খেয়াল রাখতে হবে নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করতে এসে যেন আমরা অন্যের স্বাধীনতাকে সংকুচিত না করি এটাই সু-নাগরিকের পালনীয় কর্তব্য।
 
             একটি রাষ্ট্রের সমস্ত নাগরিকগণ তখনই প্রকৃত অর্থে স্বাধীন হবে যখন ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলে ভয় শূণ্য হয়ে নিজের মত প্রকাশ করতে পারবে, সম্মানের সাথে নিরাপদে বাঁচতে পারবে। সর্বক্ষেত্রে যোগ্যতার ভিত্তিতে সুযোগ লাভ করবে । তাই বলা হয় স্বাধীনতা একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া, প্রতিদিনের চর্চার মাধ্যমে একে রক্ষা করতে হয় নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে এবং প্রেক্ষিতে। কুসংস্কার,দারিদ্র্য,বৈষম্য,সহিংসতা,অন্যায় ও নিপীড়নের মতো অদৃশ্য বাঁধাগুলি জীবন থেকে মুক্ত হলেই আসবে প্রকৃত স্বাধীনতা । স্বাধীনতা পরবর্তী অধ্যায়টি তখন হয়ে উঠবে অনুকরণীয়,অনুসরণীয় পাথেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লাস্কি বলেছেন,'স্বাধীনতা হলো সেই সামাজিক পরিবেশের সযত্ন সংরক্ষণ, যেখানে মানুষ তার ব্যক্তিত্বকে পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত করার সুযোগ পায় ।'


 

নায়ক ও দেবতা
মৌসুমী চৌধুরী


        গতকাল রাতে ঘরে ফিরেছে বিনোদ। 
দু'দিন, অর্থাৎ টানা আটচল্লিশ ঘন্টা ডিউটি করে ফিরেছে সে। এখন সকাল সাড়ে এগারোটা বাজে। নীল আকাশ জুড়ে সোনা রোদের ঝলকানি। তবু তার চোখ জুড়ে নেমে আসছে ঘুম। ক্লান্ত চোখে জানালার বাইরে তাকিয়ে সে দেখল পিল পিল করে কালো কালো মাথাগুলো সব সমানের দিকে এগিয়ে চলেছে...হাবলুর মা ছুটছেন,  পিছনে রফিকের আব্বু, সঞ্জিতের পিসি, বিলুর দিদি, চিন্টুর বাবার সঙ্গে হন্তদন্ত করে হেঁটে যাচ্ছেন আফজলের আম্মা...সব্বাই যেন প্রাণপণে ছুটছেন! কে কার আগে যাবেন, কে সব থেকে আগে তাঁকে দেখে চক্ষু সার্থক করবেন তার প্রতিযোগিতা চলছে যেন! একটা তীব্র টান তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে... 

- 'কি রে বিনু সবাই যাচ্ছে, তুই যাবি না একবার তাঁকে দেখতে'?
জানালায় সামনের আবাসনের বোসবাবুর প্রশ্ন। 
উদাস চোখে তাকিয়ে বিনোদ বলল,
-'নাহ্, কাকা'!

   বিনোদ যে বড় ব্যবসায়ীর খাদ্য ও শস্য পণ্যবাহী ভারী ট্রাকগুলো চালায় তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু এই বোসবাবু। একটা রাজনৈতিক দলের সংগঠক তিনি। বাবা চলে যাবার পর বোসবাবুই তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মানুষটা খাঁটি। তাঁর সাথে বিনোদের প্রায়ই রাজনীতি ও রাষ্ট্রের নীতি নিয়ে বেশ বিতর্ক জমে ওঠে। বিনোদকে স্নেহ করেন। তার গাড়ি চালানোর বিশেষ আগ্রহ ও দক্ষতা দেখে তাকে এই কাজটা ঠিক করে দিয়েছিলেন তিনি। সারা ভারতবর্ষ ঘুরতে হয় বিনোদকে। বছর ভর সে মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, কেরালা, উত্তরপ্রদেশ করে বেড়ায়। সেসব জানেন বোসবাবু। 
-'কালকেই ফিরলি বুঝি? খুব ক্লান্ত, না? তবুও একবার অতবড় একজন নায়ককে দেখতে যাবি না? সব্বাই যাচ্ছে'।

-'নায়ক? বলছ কি কাকা? তাহলে আমিও তো নায়ক'। 
ভিতরের বিরক্তি চেপে রাখতে পারে না বিনোদ। 

- 'তুই'?
একটা যেন ক্ষীণ তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে বোসবাবুর ঠোঁটে। 

 বিনোদও নাছোড়বান্দা। একজন সৎ মানুষের ব্যক্তিগত সততাকে কেন কৌশলে রাজনৈতিক ফোকাসে আনা হবে? বিনোদ তাই স্পষ্ট বলে,
--'আমিও কি আমার নিজের কাজটুকু সৎভাবে ও সঠিকভাবে করে যাচ্ছি না ? কত দূরে দূরে দিন রাত ধরে টানা গাড়ি চালিয়ে খাদ্যশস্য পৌঁছে দিয়ে আসছি না'?

-'কিন্তু আমাদের এই কমিশনার সাহেব কতটা মহৎপ্রাণ মানুষ, বল! নিজের কাজটি সুচারুভাবে করার জন্য আজ গোটা দেশে তিনি এবং তাঁর কাজ ভাইরাল...। তাঁর জীবনী নিয়ে সিনেমা করার কথাও ভাবা হচ্ছে'!
বোসবাবু বলে চলেন।

ভিতরের রাগ গলিত লাভার মতো বেরিয়ে আসতে থাকে বিনোদের,
-' তাঁর কথা আমিও খানিক জানি, কাকা। আমি তো খাদ্যপণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে মুম্বাই, পুণে করে বেড়াই। তিনি সত্যিই প্রণম্য মানুষ। কিন্তু খামোখা তাঁকে নায়ক বা দেবতা বানান কেন'?

- 'কেন নয় বলত, বিনু? অমিত কেলকর স্যার
একজন আই.এ.এস। মহারাষ্ট্রের 'ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন'-এর কমিশনার। তাঁর নেতৃত্বে খাদ্যে ভেজাল, অস্বাস্থ্যকর রান্নাঘর, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। যতবড় কেউকেটাই হন না কেন অসৎ খাদ্যপণ্য সরবরাহক ব্যবসায়ীকে রেয়াত করেন না তিনি। স্বয়ং কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রীও তাঁকে সমঝে চলেন। তিনি গোটা দেশ সফরে বেরিয়েছেন। দেশের জনতা একটি বার তাঁকে দেখবার জন্য আজ পাগল'।
এক নাগাড়ে কথাগুলো বলে একটু থামলেন বোসবাবু। তারপর এগিয়ে যেতে লাগলেন ভিড়ের দিকে।

   আর শুনতে পেলেন পিছন থেকে বিনোদ বলছে,
-' কিন্তু কেলকর স্যার এবং তাঁর দপ্তর তো ঠিক সেই কাজটিই করছেন যা তাঁদের করবার কথা এবং করা উচিত। তাই না? আর আপনারা কিনা তাঁকে নায়ক, দেবতা ইত্যাদি বানিয়ে দিচ্ছেন'!

-' কতকিছুই তো আমাাদের করা উচিত রে। কিন্তু করেন ক'জন বলতো'?
 
-'তাহলে কি বলতে চান ঘুষ নিয়ে ফাইল চাপা দেওয়া, প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠানের নাম দেখেও নজর ঘুরিয়ে নেওয়া-ই স্বাভাবিক আচরণ? আর নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করাটা একটা অলৌকিক কাজ'?
 বিনোদের অকাট্য যুক্তি ধারাল ছুরির মতো ছুটে যায়।

     আর কোন কথা সরে না বোসবাবুর মুখে। তিনি হনহন করে হেঁটে ভিড়ে মিশে যেতে থাকেন। 



 

গুণীজন

অমিতাভ চক্রবর্ত্তী


রাজধানীর বিশাল সভামণ্ডপ আজ আলোয় ঝলমল করছে। প্রবেশপথ থেকে মঞ্চ পর্যন্ত লাল গালিচা পাতা। ঝাড়বাতির আলোয় ঝিকমিক করছে দেয়াল, ছাদের কারুকার্য যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আজ দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান অনুষ্ঠান। দেশের রাষ্ট্রপতি নিজে এই সম্মান তুলে দেবেন নির্বাচিত গুণীজনদের হাতে। মঞ্চে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্যরা, উচ্চপদস্থ আমলারা, সেনাবাহিনীর প্রধান থেকে শুরু করে বিচারপতিরাও।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, যাঁরা সম্মান পেতে এসেছেন, তাঁদের কাউকেই খুব একটা চেনা যায় না। তাঁরা কেউ সংবাদপত্রের শিরোনাম হননি, টেলিভিশনের টক শো-তে যাননি, বিদেশ সফরের গল্প শোনাননি। তাঁদের নাম উচ্চারণ করলেই কেউ মাথা নেড়ে বলবে না—“ওহ, উনিই তো!” বরং দর্শকাসনে ফিসফাস,

“এরা কারা?”

“কোন ক্ষেত্রের মানুষ?”

“এরাই কি দেশের সেরা?”

এই গুণীজনেরা এসেছেন প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, পাহাড়ের কোলে, নদীর চর থেকে, অজ পাড়াগাঁ থেকে। কারও পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, কারও মলিন শাড়ি, কারও মুখে গ্রাম্য টান। কেউ জীবনে কখনও মাইক্রোফোনে কথা বলেননি, কেউ কখনও মঞ্চে ওঠেননি।

ঘোষক একে একে নাম ডাকতে শুরু করলেন।

“গ্রামবাংলায় গত চল্লিশ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষা বিস্তারে অবদানের জন্য—”

তালি পড়ল। একজন বয়স্ক মানুষ উঠে এলেন। মাথার চুল সাদা, হাঁটতে একটু কষ্ট হয়। তিনি কেবল মাথা নুইয়ে পুরস্কার নিলেন।

“নদীভাঙন প্রতিরোধে নিজস্ব পদ্ধতিতে কাজ করে শত শত পরিবারকে রক্ষা করার জন্য—”

আরও একজন এগিয়ে এলেন। তাঁর মুখে কোনো গর্ব নেই, যেন কাজটা করাই স্বাভাবিক ছিল।

এভাবে একে একে সবাই পুরস্কার নিলেন। কেউ চিকিৎসক, কেউ কৃষক, কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী। ঘোষক তাঁদের কাজের বিবরণ দিচ্ছেন, আর দর্শকরা বিস্ময়ে শুনছেন—এতদিন এঁরা কোথায় ছিলেন?

এরপর প্রধানমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিলেন। বললেন, “এই মানুষগুলিই আমাদের দেশের প্রকৃত শক্তি। আলোচনার বাইরে থেকেও যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে গেছেন।”

সবশেষে ঘোষণা এল—এবার গুণীজনদের পক্ষ থেকে দু-একজন কিছু বলবেন।

মুহূর্তে নেমে এল নিস্তব্ধতা। মঞ্চের সামনে বসে থাকা মানুষগুলো অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেন। তাঁরা কেউ বক্তা নন, কেউ মঞ্চসুলভ ভাষায় কথা বলতে জানেন না। কার কী বলা উচিত, বুঝে উঠতে পারছেন না।

ঘোষক নাম ডাকলেন প্রথম জনের।

একজন মাঝবয়সি মানুষ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। পরনে সাদামাটা ধুতি-পাঞ্জাবি, পায়ে সাধারণ চটি। হাঁটার ভঙ্গিতে একধরনের সংকোচ। তিনি মাইকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখে জমে উঠল জল। কিছুক্ষণ কথা বেরোল না। পুরো সভাঘর নিস্তব্ধ।

তিনি গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—

“আমি… আমি কথা বলতে পারি না ভালো করে…”

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর হাত কাঁপছে। মঞ্চের আলো যেন তাঁকে আরও অসহায় করে তুলেছে।

“আমি কোনো বড় মানুষ নই,” তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “আমি শুধু কাজ করেছি… যেমনটা মনে হয়েছে করা দরকার।”

কিছুক্ষণ থামলেন। চোখ মুছলেন।

“আমাদের গ্রামে স্কুল ছিল না। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা ছেড়ে মাঠে কাজ করত। আমি নিজের টাকায় একটা চালাঘর বানিয়েছিলাম। তারপর ধীরে ধীরে… সবাই আসতে লাগল। আমি জানি না এটাকে বড় কাজ বলে কিনা…”

কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।

“আজ এখানে এসে ভয় লাগছে। এত বড় মানুষ, এত আলো… আমার মনে হচ্ছে আমি ভুল জায়গায় এসে পড়েছি।”

তিনি একটু থেমে চারপাশে তাকালেন—রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, হাজার মানুষের ভিড়।

তারপর হঠাৎ কাঁপা গলায় বললেন—

“তবু একটা কথা বলতে চাই… বিশ্বাস করুন… বিশ্বাস করুন আমি যোগ্য।”

এই কথাটুকু বলেই তিনি চুপ করে গেলেন।

মুহূর্তের মধ্যে পুরো হল নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যেন সবাই নিঃশ্বাস নেওয়াও ভুলে গেছে। তারপর ধীরে ধীরে হাততালি শুরু হলো। সেই তালি ধীরে ধীরে গর্জনে রূপ নিল। অনেকের চোখে জল।

রাষ্ট্রপতি উঠে দাঁড়ালেন। এগিয়ে এসে সেই মানুষটির কাঁধে হাত রাখলেন। প্রধানমন্ত্রী নত হয়ে তাঁকে প্রণাম করলেন।

সেদিন মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেউ ভাষণের জোরে জয়ী হননি। জয়ী হয়েছিল নীরব পরিশ্রম, বিনয় আর বিশ্বাস।

আর সেই দিন দেশের মানুষ বুঝেছিল—গুণ আসলে প্রচারের মুখাপেক্ষী নয়।

নীরব সাধনাই একদিন সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ হয়ে ওঠে।