Friday, May 1, 2026


 

মুনা 

অনলাইন বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩


সম্পাদকের কথা 

বাংলা নববর্ষের শুরুতেই একটা বিরাট চ্যালেঞ্জকে আমরা জয় করতে পেরেছি। বিগত কয়েক দশকের মধ্যে এই একটি রক্তপাতহীন নির্বাচন দিন পার করা গেল। ফলপ্রকাশের পর অবশ্য অবস্থা কী হবে, সেটা অজানা। কিন্তু আপাতত এটাও অনেক। আশা করছি, যে সংযম আমরা দেখাতে পেরেছি, সেটি বজায় থাকবে এবং এমন কোনও ঘটনা ঘটবে না, যাতে রাজ্যবাসীর মুখ পুড়বে। মনে রাখতে হবে, হানাহানি বা খুন-জখম না হলেও, বিক্ষিপ্তভাবে ঘটা সংঘর্ষকে কিন্তু আমরা এড়াতে পারিনি। তাই দায় সবার। সুস্থিতি বজায় থাকুক। সরকারে যাঁরাই আসুন না কেন, রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রগতির পথে। 

মুজনাইয়ের অনলাইন বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩ নিয়ে কিছু কথা বলার আছে। ছোট্ট মুজনাই যে এত জনপ্রিয় সেটা আমাদেরও জানা ছিল না। পরীক্ষামূলকভাবে আমরা চেয়েছিলাম অন্তত এই সংখ্যায় নির্দিষ্ট সংখ্যক লেখা প্রকাশ করতে। কিন্তু পত্রিকার বিচারে এত গুণমানসম্পন্ন লেখা এসেছে যে, প্রায়  প্রতিটি বিভাগেই আমরা ঘোষিত সংখ্যার চাইতে বেশি সংখ্যক লেখা প্রকাশ করতে বাধ্য হলাম। যাঁদের লেখা এই সংখ্যায় বাদ গেল, তাঁরাও যথেষ্ট বলিষ্ঠ লিখেছেন। আগামীতে অবশ্যই তাঁদের লেখা প্রকাশের সুযোগ রইল। এই সংখ্যায় তাঁদের রাখতে না পারার খেদ রইল আমাদের।  


মুজনাই  

অনলাইন বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


মুজনাই অনলাইন বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩


এই সংখ্যায় 

প্রবন্ধ- 

কবিতা বণিক, অভিজিৎ সেন, রুমা দেব মজুমদার, বটু কৃষ্ণ হালদার

গল্প- 

শৌনক দত্ত, মৌসুমী চৌধুরী, অমলকৃষ্ণ রায়, পর্ণা চক্রবর্তী, লীনা রায়, 

অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী, তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য


অণুগল্প- 

সুমনা ঘোষ দস্তিদার, বেলা দে, মধুমিতা দে রায়, তন্ময় কবিরাজ, সোমা দাশ,

নির্মাল্য ঘোষ, শ্রাবনী সেনগুপ্ত, অনিন্দ্য সান্যাল


মুক্তগদ্য- 

জয়িতা সরকার, অনিতা নাগ, প্রতিভা পাল  


রম্যরচনা-

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়


ভ্রমণ- 

চিত্রা পাল, মিত্রা রায়চৌধুরী, চন্দ্রানী চৌধুরী 


কবিতা- 

শ্যামলী সেনগুপ্ত, গৌতমেন্দু নন্দী, দীপায়ন ভট্টাচার্য, সন্তোষ ভট্টাচার্য, অর্পিতা গুহ মজুমদার,

সুপম রায়, অশোক কুমার ঠাকুর, উৎপলেন্দু পাল, প্রাণেশ পাল, আকাশলীনা ঢোল, 

সজল কুমার বসু, তীর্থঙ্কর সুমিত, অর্পিতা পাল সাহা, রীনা মজুমদার, মনোজ ঘোষ


ছবি- 

 তৃষিতা রায়, বাবুল মল্লিক, তিথি পাল  


মুজনাই  

অনলাইন বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩





বিশেষ বাছাই প্রবন্ধ 


বাংলার ক্লান্তিহরা শীতল পাটির কথা

কবিতা বণিক 

                                                                                                                                        
 
            চন্দনেরই গন্ধ ভরা/ শীতল পারা ক্লান্তি হরা।
            যেখানে তার অঙ্গ রাখি/ সেইখানেতে শীতল পাটি।।

 ছন্দের যাদুকর কবি সত‍্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা এই কবিতা বাংলার মাটিকে নিপুণ কারুকাজের  শীতল পাটির সাথে তুলনা করেছেন। শীতল পাটির বৈশিষ্ট্য, বাঙালিয়ানাকে যেমন বোঝায় তেমনি বাঙালির শিল্প ও পরিচয় বহন করে। ঘরে শীতল পাটি থাকা অর্থ বাঙালিয়ানার প্রতীক।

শীতল পাটির নামের সাথে জুড়ে আছে শীতলতা। শ্রী চৈতন্য দেবও শীতল পাটি ব‍্যবহার করেছেন। সহজ, গুণমানে সমৃদ্ধ, প্রাকৃতিক এই শীতল পাটি অতি সাধারণ থেকে রাজা মহারাজারাও ব‍্যবহার করতেন। এ থেকে বোঝা যায় হাজার  বছরের সনাতনী ইতিহাসের ওপর এই শিল্পের ভিত্তি ও পুরোন হস্তশিল্প সমৃদ্ধ বাংলার শীতল পাটি। এটি বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ও জীবন যাপনেরও জীবন্ত প্রতীক। হস্ত শিল্পের ঐতিহ্য হিসেবেও সংরক্ষণ করা হয়। আমাদের ঘর সাজানোর শৌখিন সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার হয়। অতিথি আপ‍্যায়নে, শোয়ার জন‍্যে, বসার জন‍্যে ব‍্যবহার হয় শীতল পাটি। আজকাল  আরও বিভিন্ন ভাবে শৌখিনতায়, ঘর ঠান্ডা রাখতে সিলিংএ , দেওয়ালে, মেঝেতে, বিছানায় পাতা হয়। এখন নানা রকম উপহার সামগ্রী,  শৌখিন ব‍্যাগ ইত্যাদি তৈরি হয় শীতল পাটির সাথে  জুট সেলাই করে।  খুব গরমে ঘর ঠান্ডা হয়। আমাদের  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মুগ্ধ হয়েছিলেন  শীতল পাটির সৌন্দর্যে ও গুণ মানে। রবীন্দ্র নাথের গাড়িকে ঠান্ডা  রাখতে এক জাপানি শিল্পী শীতল পাটি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন।  শান্তিনিকেতনের উদয়ন বাডিটিকেও  শীতল পাটি দিয়ে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলার ঘরে অতিথিকে  কি কি সেরা জিনিস দিয়ে আপ‍্যায়ণ করবে তা ছড়া কেটে বাংলার মেয়েরা বলতেন।  ঘুমপাড়ানি গানের সাথেও ঘুমের মাসি, ঘুমের পিসিকে সেরা সেরা জিনিস দেওয়ার কথা বলা হয়। এখানেও অবশ্যই আরামদায়ক ঘুমের জন্য শীতল পাটির কথা বলা হয়- 
      ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি, ঘুমের বাড়ি যেও।
       বাটা ভরে পান দেব,  গাল ভরে খেও।
       শান বাঁধানো ঘাট দেব, বেসন মেখে নেয়ো।
        শীতল পাটি পেড়ে দেব, পড়ে ঘুম যেয়ো।।
আগেকার দিনে মায়েরা বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্যে  বাচ্চাদের শীতল পাটিতে শোয়াতেন। শীতল পাটিতে  সাপ ওঠে না। খুব মসৃন ও চকচকে  হওয়ার কারণে।


তিন রকম বুনোটের শীতল পাটি পাই। খুব মিহি নরম ও হাল্কা ঠান্ডা  স্পর্শের শীতল পাটির দামও বেশি। কারণ চাদরের মতো নরম ও নানা ডিজাইনের বোনা এই পাটির দেশ বিদেশে খুব চাহিদা। সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে মুর্শিদকুলি খাঁ শীতল পাটি উপহার দিয়েছিলেন।  রাণী ভিক্টোরিয়ারও খুব পছন্দের ছিল শীতল পাটি।  রাণীর কাছেও এই উচ্চ  গুণমানের শীতল  পাটি পৌঁছেছিল। এ থেকে বোঝা যায় এই শীতল পাটি  মাটির বাড়িতেও এনে দিত রাজকীয় স্বস্তি।  বাংলার গরমে  স্নিগ্ধতা এনে দিত  শীতল পাটি। এটি বাংলার লোক সংস্কৃতির একটা অংশ। শুধু ব‍্যবহারেই নয়, অতিথি আপ‍্যায়নে,  উপহারে, বিয়ের তত্বে যে কোন শুভ কাজে  বাঙালির  শীতল  পাটি চাই।  গরমে এই পাটির বিশেষ ভাবে ব্যবহার হয়। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই পাটি যেমন পরিবেশ  বান্ধব, হালকা, বহন যোগ‍্য, মসৃণ, ঠাণ্ডা। এই পাটিতে বসলে বা শুলে ঠাণ্ডা অনুভব হয়।  ঠাণ্ডা আমেজ আনে বলেই এর নাম শীতল পাটি।  নান্দনিক এই কারুশিল্প সারা ভারতে ও বিদেশে এত সম্মান অর্জন করেছে ও পরিবেশ বান্ধব বলেই ২০১৭ সালে  ইউনেস্কো বাংলাদেশের  সিলেটের শীতল পার্টিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।

     বৃটিশ  আমলে  সিলেটের বালাগঞ্জে শীতল পাটির খুব বড় বাজার ছিল।  এখানে রাজনগরে হাজার হাজার কারিগর ছিল।  বালাগঞ্জ কে আজও শীতল পাটির গ্রাম বলা হয়। বাংলাদেশের  গ্রামাঞ্চলে নদীর ধারে বা স‍্যাতস‍্যাতে জায়গায়  প্রাকৃতিক ভাবেই মুরতা চাষ হত।  বালাগঞ্জের – কাশীপুর, পৈলমপুর, সিঙরা কোনা, হামচাপুর, বাঁধাপুর, রূপাপুর, মাকরামি, তেঘড়ি, জামপুর প্রভৃতি গ্রামে মুরতা চাষ হতো। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মণ্ডিত তুলাপুর গ্রামের একদিকে কুশিয়ারা নদী অন‍্যদিকে সবুজের ফসলি প্রান্তর।  বালাগঞ্জ উপজেলার তুলাপুর গ্রাম শীতল পাটি বুননের আদি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। মুরতা গাছ থেকেই এখানকার কারিগররা  খুব ভালো মানের শীতল পাটি তৈরী করেন। বিছানার চাদরের মতো যেমন ডিজাইন  তেমনি ভাজ করে রাখা যায়। পাটির যে সুতা বা বেতা বলে  তা কিছু কিছু রঙ করা হয়। ডিজাইন  তৈরির জন‍্য। কারিগররা যে সব পাটি বোনেন সবচেয়ে ভালো পাটি তৈরি করতে  কখনও ৬ মাস, ৩/৪ মাস, ১ মাস, ১৫ দিন  লাগে।  রঙ করা বেতা দিয়ে পাটিতে খুব সুন্দর  ভাবে বোনা হয়  গাছের সারি, অনেক পদ্ম ফুল,  কোনটাতে তাজমহল, কোনটাতে পাশা খেলার ছক তৈরি করা। যাতে পাটিতে বসেই গুটি দিয়ে পাশা খেলতে পারবেন। এই পাটি গুলোকে মাঝে মাঝে হালকা জলে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছলে  রঙে চমক আসে। ১ লক্ষ টাকার  পার্টিও আছে। যা বিদেশে  পুরস্কৃত হয়েছে। সিলেটের মৌলভী  বাজারের শীতল পাটি শিল্পী হরেন্দ্র কুমার দাস জানালেন তাদের বংশপরম্পরায় শীতল পাটি শিল্পের কাজ তারা করে আসছেন।  বাংলাদেশের সরকারি উদ্যোগে সারা দেশে প্রচুর মেলা করেছেন। বিদেশেও সরকারি উদ্যোগে গিয়েছেন জাপানে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। শীতল পাটির চাহিদাও আছে। কিন্তু এখন  সেভাবে কারিগর নেই। কারণ ছেলেমেয়েরা অন‍্য কাজ করেই আনন্দ পায়।

      
টাঙ্গাইলের শীতল পাটিও খুব ভালো মানের।কালিঘাটি, ঘাটাল, দোলদোয়া ইত‍্যাদির পঞ্চাশটির মতো গ্রামে এখনও শীতল পাটির প্রচুর কারিগর রয়েছেন। তারা পটিয়াল নামে পরিচিত। রংপুর, বগুড়া, বড়িশাল, কুমিল্লা, লক্ষীপুর এমনই অনেক জায়গায় এই পাটি শিল্পের কাজ হয়।

 বড়িশালের  ঝালকাঠির ব্রান্ড পণ‍্য হচ্ছে পেয়ারা ও শীতল পাটি। ঝালকাঠির- রাজাপুর, নলসিটি, সদর উপজেলা এমন কয়েকটি গ্রাম নিয়ে ঝালকাঠি। এই গ্রামগুলোকে বলা হয় কাঠি গ্রাম। সেখানে এই ব্রান্ড নিয়ে একটা ছড়া বলে।  পেয়ারা আর শীতলপাটি / এই নিয়ে ঝালকাঠি। এই গ্রামের অধিবাসী বলাই চন্দ্র পাটিকর বললেন- আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত এই শিল্পটি বাংলার অহংকার। আমরা চাই এই শিল্পটি তার অস্তিত্ব নিয়ে দেশের ঐতিহ্য রক্ষা করবে। সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ এগিয়ে আসবে। কারন আক্ষেপের সুরে দূষণ যুক্ত প্লাস্টিক পাটিতেই বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। আর আমরা পরিবেশ বান্ধব ভালো শিল্পটাই হারিয়ে ফেলছি। এখানে আশিটা পরিবারের প্রত‍্যেকেই শৈশব থেকেই পাটি শিল্পের সাথে যুক্ত। পাটিতেই রুজি রোজগার।  তাই বিয়েও হয় কারিগর পরিবার দেখে।  অভিনব ব‍্যাপার হল এই কয়েকটা পরিবারের মধ‍্যই এদের বিবাহ হয়। যাতে শিল্পটা নষ্ট না হয়ে যায়।



(এই পাটি যিনি বুনেছেন তার অক্ষর পরিচিতি নেই। 
অথচ এমন নিপুণ হাতে বুনেছেন এ যেন সোনার কাঠি দিয়ে রূপকথার গল্প লেখা)



১৯৫৬ সালে  ব্রজবাসী ধর নামে এক শীতল পাটি শিল্পী  বাংলাদেশের টাঙ্গাইল  থেকে  কোচবিহার আসেন।  তখনই কোচবিহারে শীতলপাটি শিল্পের শুভ সূচনা হয়। ১৯৭০ সালের পর থেকে শীতলপাটি শিল্পীরা আসতে শুরু করেন। শীতল পাটি শিল্পকে উচ্চ মাত্রায়  নিয়ে গিয়েছেন  সুকুমার দাস, গৌরাঙ্গ দাস এমনই কিছু মানুষ।
     
১৯৮০-৮২ সালে বেত কাটা আন্দোলন শুরু হয়। অর্থাৎ বেত বনে বাবুই পাখি  আসে।  আর বাবুই পাখি  বেত বনের পাশে  ধানের জমির ধান খায়। ফলে জমির মালিকেরা  বেত কেটে ফেলতে চায়। অথচ বেত বনের ওপর নির্ভর করে প্রচুর বেত শিল্পী বাঁচে। শেষে এসডিও, বিডিও বসে পিস কমিটি গঠন করে শিল্পীদের হয়ে প্রটেকশন দেন। তাতে শিল্পীরা বাঁচে। ফলস্বরূপ এপার বাংলায় কোচবিহারের শীতল পাটি  আজ সারা ভারতে বিখ‍্যাত।

এ ছাড়া  দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, বর্ধমান, উত্তর চব্বিশ পরগণার এই শীতল পাটির চাষ ও পাটিশিল্পী পাটিয়াল বা পাটিকরেরা  শীতল পাটি বোনেন।  কোচবিহার  জেলায় ৩০ হাজারের ও বেশি শিল্পীর বাস। কোচবিহারের ঢোলুয়া বাড়িকে শীতল পাটির পীঠস্থান বলা হয়। এছাড়াও বাইশ ভোগী, ডায়ালের কোঠি, পুষাণ ডাঙা, নবাবগঞ্জ, ঘেঘরি ঘাট, বালাশি, ঘুঘুমারি, তুফানগঞ্জ প্রভৃতি জায়গায় প্রচুর শিল্পকর্ম হয়। কোচবিহারের ঘুঘুমারি, পাণিগ্রামের বাসিন্দা শীতল পাটি শিল্পী মাধাই লাল দত্ত জানালেন, ঘুঘুমারিতেই আজকাল সবচেয়ে বেশি শীতল পাটি তৈরি হয়। এখন পৃথিবী বিখ‍্যাত এখানকার শীতল পাটি। কোমল কোশ নামে খুব সুন্দর পাটি তৈরি  হয়।



   (রাষ্ট্রপতি পুরস্কার প্রাপ্ত কমোল কোশ পাটি)          



এতে খুব সুন্দর ময়ূর, প্রজাপতি বোনা হয়।  এখানে ১৯৯০ সালে মাত্র   তিরিশ বছর বয়সে রাস্ট্রপতি পুরস্কার পান শ্রী মতি টগর রানী দেবী। তাঁর নানান শিল্পের মধ‍্যে অপূর্ব  চিত্র বোনা কমোল কোশ  পাটির জন‍্য।  হাতে না নিয়ে দেখলে মনে হবে কাপড়। শিল্পের সাথে ভালোবাসা সাধনার মতো জড়িয়ে থাকে বলেই এমন মিহি সুন্দর  কাজ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বছর দশেক বয়স থেকেই এই শিল্পের সাথে যুক্ত। কিন্তু তার মনে সাধারণ পাটি ছাড়াও আরও  কিছু করার ইচ্ছে জাগে। তিনি গরমে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হ‍্যাট তৈরী করেন, নানান ধরনের ঢাকনা দেওয়া ঝুড়ি বাক্স ইত্যাদি।  এইটা টগরদেবীর  হাতে বোনা  নিপুণ কারুকাজের কমোল কোশ পাটি। যা তাকে রাস্ট্রপতি পুরস্কার এনে দিয়েছে।  তাঁর কাছে অনেক ছাত্র ছাত্রীরা শেখেন পাটি তৈরি ও বুননের কাজ।

ঘুঘুমারির হরিণচড়া গ্রামের জয়শ্রী চন্দ ডিস্ট্রিক্ট ও স্টেট লেভেলে পুরস্কার অর্জন করেছেন। সরকারি ভাবে তিনি মাস্টার ট্রেনার হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেন। সরকারি ভাবে সারা ভারত জুড়ে সরকারি খরচে মেলায় তাঁর পাটি শিল্পের নানান সম্ভার নিয়ে যান। তার সম্ভারে সুন্দর  শীতল পাটি ছাড়াও  নানান ধরনের ও সাইজের ব‍্যাগ পাওয়া যায়, সপিং ব‍্যাগ, লাঞ্চ ব‍্যাগ, ট‍্যুর ব‍্যাগ ইত্যাদি । তাঁর তৈরি এক অভিনব শিল্প হল পাটি দিয়ে তৈরী মোদি জ‍্যাকেট। তিনি জানালেন তাঁর মা ১৯৯৪ এ শীতল পাটির সাথে জুট সেলাই করে প্রথম ব‍্যাগ তৈরি করে পুরস্কৃত হন। জয়শ্রী চন্দ সরকারি উদ্যোগে চীন, ইতালি, ইওরোপের কয়েক জায়গায়, ঢাকার মেলায়  শীতল পাটির নানান সম্ভার নিয়ে ভারতের হস্তশিল্পের প্রদর্শনী করেছেন।

এখানের কারিগর পূর্ণবাবু পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে দুইবার পুরস্কার পেয়েছেন। কোচবিহারের বিরু দে ২০১৪-২০১৫ তে প্রথম পুরস্কার পান। ২০১৭-২০১৮ সালে কমলা সুন্দরী ধর প্রথম পুরস্কার পান। কোচবিহার জেলা ভিত্তিক  কারু শিল্প প্রতিযোগিতায় বিশেষ পুরস্কার পান  ধৌলাবাড়ি, ঘুঘুমারি কোচবিহার থেকে প্রদীপ ধর। ভারত বর্ষের সর্বত্র শীতলপাটির নানান সম্ভার পৌঁছয়।  জাপানেও খুব সমাদৃত কোচবিহারের শীতল পাটি। বিছানার যেমন আকার সেইমত পাটি বোনা হয়। ডাবল বেড, সিঙ্গেল বেড ইত্যাদি। খুব সুন্দর ডিজাইনের চাদরের মতো শীতলপাটি যেমন আরামদায়ক, পরিবেশবান্ধব তেমনি সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আজকাল পাটির সাথে জুট সেলাই করে  নানান প্রয়োজনীয় ব‍্যাগ,অফিসব‍্যাগ, ল‍্যপাটপ ব‍্যগ, টিফিন ব‍্যাগ, জলের বোতল রাখার ব‍্যাগ, ফাইল, চটি, মোবাইল  কভার, ইত‍্যদি তৈরি হয়। চটি জলে ভিজলেও খারাপ হবে না। বরং নরম ও চকচকে হবে।

শীতল পাটির জন‍্য মুরতা বেত চাষ একবার হলে বংশ পরম্পরায় চলে আসে। এই গাছ কে মুরতা বেতগাছ বলে। দেখতে অনেকটা সরু বাঁশের মতো। জলাশয় বা স‍্যাতস‍্যাতে  এলাকা জুড়ে  প্রাকৃতিক ভাবেই মুরতা চাষ হোত।  মুরতা গাছের বনকে পাটি বন  ও বলা হয়। পাটি গাছের মরণ নেই। যুগ যুগ বেঁচে থাকে। তবে সোজা রাখার জন‍্য যত্ন করতে হয়। আগা কাটতে হয় যাতে ছড়িয়ে না পড়ে।   মাটি টা পরিষ্কার রাখতে হয়।  প্রয়োজনে গোবর সার দেওয় যেতে পারে। এছাড়া  অন‍্য কোন যত্নের প্রয়োজন হয় না। কাঁচামাল হিসেবে লম্বা সোজা মুরতা বেত কেটে নিতে হয়।  তিন চার মাস পর পর বেত কাটা হয়। অগ্রহায়ণ থেকে ফাল্গুন পর্যন্ত বেত কাটা হয়।  ছয় থেকে সাড়ে ছয় হাত লম্বা হলে বেত কেটে নেওয়া হয়। এই বেত থেকেই সারা বছর পাটি বোনা হয়।  এক বিঘে জমিতে সঠিক ভাবে চাষ করলে পাঁচশো পিস শীতল পাটি তৈরি হতে পারে। আশিটা বেত দিয়ে একটা পাটি তৈরি হয়। কিন্তু ঢোলুয়া বাড়ি গ্রামের গোঁসাই দে জানালেন— তার এক বিঘে জমি থেকে প্রতি বছর দেড়শো পাটির বেত কাটতে পারেন। গাঙালের গুটি গ্রামের চন্দন কুমার দে  জানান বংশ পরম্পরায় তাঁরা সবাই এই শিল্পের সাথে যুক্ত। অর্ডারের ওপর পাটি বোনেন।  ভুশনাই, কমোল কোশ ,উন্নতমানের শীতল পাটি ইত্যাদি।

জমি থেকে তুলে প্রত‍্যেকটা বেতের ডালকে জলে ধুয়ে  ভিজে কাপড় দিয়ে মুছে নিতে হয়। নোংরা যাতে না থাকে।  একটু শুকিয়ে নিতে হয়।  এরপর খুব ধারালো বটির মতো দা দিয়ে চিরে চারদিকের ছাল বের করা হয়। আবারো এই ছালগুলো চেরা হয়। এবার ছালের হালকা সবুজ অংশ চেঁছে ভিতরের সাদা অংশ ফেলে দেওয়া হয়। এই সাদা অংশগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এগুলোকে বুকা বলে।  খুব পাতলা ও সরু করে যখন কাটা হয় তাকে বেতি বলে। একটা বেতের দন্ড থেকে ছয় থেকে আঠার টা বেতি পাওয়া যায়।  পাতলা সবুজ বেতিগুলো একটু শুকিয়ে আঁটি বেঁধে  সাত আট দিন  ভাতের মাড়ে ভিজিয়ে রাখা হয়। তারপর ভাতের মাড়ের মধ‍্যে আমড়া গাছের পাতা, জারুল পাতা  দিয়ে সেদ্ধ করা হয়। এবার  ধুয়ে শুকিয়ে নিলে বেতিগুলোতে সাদা চমক আসে। কুয়াশার  মধ‍্যেও রাখতে হয় বেতি গুলোকে।  এরপর আবার কিছু কিছু বেতি লাল, নীল, সবুজ ইত্যাদি রঙে রাঙানো হয়, ডিজাইন তৈরির জন্য। আট দশদিন লাগে বেতি তৈরি করতে। এই বেতি নানান রঙ দিয়ে দক্ষ কারিগরেরা নিপুণ হাতে শীতল পাটি বোনেন। দুই হাত দ্রুতগতিতে  সমান ভাবে অপূর্ব  ভঙ্গিমায় চালনা করেন পাটি বোনার জন‍্য।  প্রত‍্যেক বাড়িতে সবাই এই শিল্পে যুক্ত হলেও বাড়ির মেয়েরাই পাটি বোনার কাজ বেশি করেন। ঘরের কাজ সামলেও এই কাজ  করেন। পাটিকর মাটিতে বসে কাপড় বোনার মতো করে দৈর্ঘ্য প্রস্থ বরাবর বেতি স্হাপন করে পাটি বোনা হয়।  বোনার সময় বেতিগুলোকে ঘন আঁটসাঁট করে বোনা হয় যাতে ফাঁক ফোকর না থাকে। বোনার সময় জল হাতে নিয়ে বুনতে হয়। পাটি বোনা শেষ হলে মুড়ি টেনে কেটে দেওয়ার কাজ হয়। অর্থাৎ ফিনিশিং।  রোদে শুকিয়ে নিতে হয়। খুব মিহি বেতি হওয়ার কারণে শীতল পাটি বুনতে  সময় লাগে ১৫ দিন থেকে ৩ মাস, ৬ মাস ও লাগে।  মোটা পাটি ৬ ঘন্টা করে বুনলে ৩দিন লাগে। কারিগরেরা পাঁচ থেকে ছয় রকমের পাটি তৈরি করেন।  যেমন টাঙ্গাইল অঞ্চলে শীতল পাটি, বুয়া পাটি , ডালার পাটি, লাল পাটি এই কয় প্রকারের পাটি বোনা হয়। কোচবিহার অঞ্চলে শীতল পাটি, মোটা পাটি, ডালার পাটি, কমল কোশ এই প্রকার পাটি বোনেন।

ডালার পাটি দিয়ে মূলত জুতো, ব‍্যাগ, মোবাইল কভার, নমাজ পড়ার জন‍্য পাটি বোনা হয়। উচ্চ গুণমান সম্পন্ন শীতল পাটি  খুব নরম, টেকসই, সাদা(রঙীন কাজ করাও হয়) চমৎকার ফিনিশিংএর হয়। এর শৌখিনতা বা মূল‍্য দেখেই বোঝা যায়।  এই পাটির সামনে পিছনে কোথাও জোড়া পাওয়া যাবে না। এক একটা গোটা বেতি দিয়ে সম্পূর্ণ পাটি বোনা হয়। চারিদিকে লাল কাপড়ে সরু করে মোড়া হয়। বিছানার মাপ অনুযায়ী  পাঁচ বাই সাত ফিটের  এই আভিজাত্য পূর্ণ  আকর্ষণীয় শীতল পাটি বাংলাদেশের এক নাগরিক ইউ, এস সেনেটর কে  উপহার দিলে তিনি হস্তশিল্পের এমন সুন্দর উপহার পেয়ে খুব সুন্দর ভাবে তার অনুভূতির প্রতিক্রিয়া ব‍্যক্ত করেছেন। এই প্রতিক্রিয়া হস্তশিল্পের দুর্লভ রাজকীয় সম্মান যা বাংলার শীতল পাটি অর্জন করেছে, এইটি আমাদের গর্বের বিষয়। যুগে যুগে শীতল পাটি এমন রাজকীয় সম্মান পেয়ে এসেছে। শীতল পাটির ঐতিহ্য কে ধরে রাখা আমাদের হস্তশিল্পের এমন দুর্লভ রাজকীয় সম্মান, বাংলার শীতল পাটি অর্জন করেছে এইটি আমাদের গর্বের বিষয়। যুগে যুগে শীতল পাটি এমন রাজকীয় সম্মান পেয়ে এসেছে। শীতল পাটির ঐতিহ্য কে ধরে রাখা আমাদের কর্তব্য।

      কোচবিহারের পানিশালা গ্রামে  শীতল পাটির খুব বড় হাট বসে। ১০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয় এখানে। কলকাতার ঢাকুরিয়া ও চাঁদনিচক অঞ্চলে  শীতল পাটির নানান সম্ভার পাওয়া যায়। ঘুঘুমারি অঞ্চলে এত শিল্পীদের বাস, তাদের কাজকর্ম অত‍্য ভালো। কিন্তু সবাই জানেনা বাইরের বাজারের চাহিদা কিরকম তাই বাঙলা নাটক সংস্হা থেকে ২০১৭ তে জানুয়ারি মাসে এক  শীতললপাটি মেলার আয়োজন করে। সেখানে শীতল পাটির নানান সম্ভারের সাথে পুতুল নাচ, বাউল গান, ভাওয়াইয়া গান, রণপা এর খেলা,  ছৌ নাচ, আরও নানান জিমনাস্টিক খেলা প্রদর্শিত হয়।  পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উত্তর বঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের ভার প্রাপ্ত মন্ত্রী প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে এই অনুষ্ঠানের সূচনা করেন।  এর পর থেকে মেলার আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

      উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলাতেও শীতল পাটি চাষ হয়। এখানে হাটথোবা গ্রামের বাবলু মণ্ডল জানালেন তাদের  নিজেদের জমিতে  পাটি বন আছে। পূর্বপুরুষরাও  এই শিল্পের সাথে যুক্ত ছিলেন।  বাবলু বাবু তাঁর বয়স সাতষট্টি। তিনি  বাবার কাছ থেকে এই শিল্পের কাজ শিখেছেন। এই জেলায় অনেকেই অন‍্যের কাছ থেকে বেত কিনে নিয়ে শীতল পাটি বোনেন। এখানকার বাসিন্দা শিখা সমাদ্দার জানালেন ক্ষেতের মালিকের কাছ থেকে বেত কিনে শীতল পাটি বোনার কাজ করেন।

করোনা কালীন পরিস্থিতিতে সব জায়গার শীতল পাটি শিল্পীরা  আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। তাদের  তৈরি জিনিস বাজারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে না। রোজগার  বন্ধ। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার  কৌশিক দত্ত রায় সাহায‍্যরে হাত বাড়িয়ে দিলেন। কোচবিহার ১নং ব্লকের কয়েক হাজার শীতলপাটি শিল্পীদের এই সংকটকালে দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কোচবিহার প্রগ্রেসিভ শীতলপাটি প্রডিউসার অর্গানাইজেশন ও জেড একাডেমী সোসাইটির পক্ষ থেকে ১০০টি পরিবারের হাতে নিত‍্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী  যেমন ঘি, লবণ, মেরি বিস্কুট, রান্নার তেল, চিনি, মুসুরডাল, পাঁপড়, সয়াবিন, চা, টুথপেস্ট এবং সাবান ও মাস্ক তুলে দেওয়া হয়।
         
       
আজকাল  প্লাস্টিক সুতার পাটিতে বাজার  ছেয়ে গেছে। আসল যারা পাটি শিল্পী  তাদের বাজার নষ্ট হচ্ছে, অথচ কম দাম হলেও প্লাস্টিক  শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই প্রতিটি মানুষকে সচেতন হতে হবে  পরিবেশ দূষণ ও শারিরীক ক্ষতির কথা চিন্তা করেই, প্লাস্টিক পাটি একেবারেই বর্জন করা উচিত। রোগ যাতে না ছড়ায়। নাগরিক দের শরীর স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে সরকারের ও এগিয়ে আসা উচিত।
                                                 
       


 

প্রবন্ধ 

বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও আমাদের দেশ

                         অভিজিৎ সেন 
                 

সুপ্রাচীন সভ্যতার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বহনকারী বহুত্ববাদের এক ও অদ্বিতীয় পরাকাষ্ঠা আমাদের দেশ ভারতবর্ষ। মানবিক সম্পদ ও প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যের অপূর্ব সমন্বয়ে  সমৃদ্ধ ভারতবর্ষ। পৃথিবী গ্রহে এমন দেশ বিরল। দেশ শুধু মাত্র একখণ্ড মাটি হয় না। ভারতবর্ষ নির্দিষ্ট ধর্মের নয়, বর্ণের নয়, জাতির নয়। এ দেশে সকলকে ধর্ম, ভাষা, পেশা, শিক্ষা ও আইনী অধিকার সমান প্রদান করা হয়েছে।
 
           একদা ইংরেজ শক্তির হাত থেকে যেদিন জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি ভারতবাসী কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে পুনরায় স্বাধীনতা অর্জন কর, সংবিধান গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা হল এদেশে গণতন্ত্র। সংবিধানের পাতায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলো প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের কথা। অর্থাৎ ভারতীয় সংবিধানের প্রভৃতি ধারায় এদেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত এলো। এখানে দেখা গেল সংবিধান গুরুত্ব দিলো এদেশের বৈচিত্র্যময় সমাজ ব্যবস্থার আদিরূপকে। অর্থাৎ বহুত্ববাদী দর্শনকে। ভারতবর্ষ বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখেছে এভাবে। কোন নির্দিষ্ট জাতির,কোন নির্দিষ্ট ধর্মের,কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মৌরসীপাট্টা নয় আমাদের সুপ্রাচীন দেশ ভারতবর্ষ। বিবিধের মিলন বা  বহুত্ববাদী দর্শন এদেশে মানুষে মানুষে মহামিলনের পটভূমি তৈরি করে এসেছে ঐতিহাসিক কাল পর্ব থেকে ধারাবাহিকভাবে। এবং সেই ধারা আজও বহমান। ভারতের  সাংস্কৃতিক মৌল গুণকে কোন বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি, কোন সংকীর্ণ গন্ডিবদ্ধ রুগ্ন চিন্তার ঘন কালো কূটিল মেঘপুঞ্জ গ্রাস করতে পারবে না আমাদের এতোদিনের সৌভ্রাতৃত্বের দৃঢ় বন্ধনকে। ভারতবাসী যুগ যুগ ধরে একটি মন্ত্র তাদের হৃদয়ে,মননে গেঁথে রেখেছে সেই মন্ত্র হলোসহিষ্ণুতা, সেই মন্ত্র হলো সহযোগিতা, সেই মন্ত্র হলো অহিংসা।  
     
ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা বিশ্লেষণ করলে যে চিত্রটি আমাদের সামনে দিনের আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিশ্ববাসীকে যা বিস্মৃত করে তাহলো এত ভাষা, এত আচার-আচরণ, এত ধর্মীয় বৈচিত্র্য, বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস এবং প্রাকৃতিক ভূ-বৈচিত্র্যের এক অপূর্ব সমন্বয় । এত যে বৈচিত্র্য তবু কোথাও সমন্বয়ের অভাব নেই। ভারতবাসী খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ভিন্ন সংস্কৃতির জগতের মানুষকে আপন করে নিতে পারে। অপরদিকে ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষও সহজেই ভারতবর্ষের সমন্বয়ের মন্ত্রকে,সহিষ্ণুতার মন্ত্রকে,অখণ্ডতার মন্ত্রকে আত্মীকরণ করতে কোন অসুবিধা বোধ করেনা। এখানেই ভারতবাসীর জয়। এখানেই বহুত্ববাদী দর্শনের জয়। এদেশ বরাবর সমন্বয় ও সহিষ্ণুতায় বিশ্বাসী । খন্ডে নয় অখন্ডে বিশ্বাসী। হিংসায় নয় অহিংসায় বিশ্বাসী। যুদ্ধে নয় বুদ্ধে বিশ্বাসী । যুগ যুগ ধরে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সকলের সংস্কৃতিকে, ভাষাকে, ধর্মকে, আচার-আচরণকে, খাদ্যাভ্যাসকে, পোশাক পরিচ্ছদকে অন্তর থেকে গ্রহণ করেছে। ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে ভাষা, সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, শিল্প। প্রসারিত হয়েছে এ দেশের মানুষের মন ও মনন । 
         
          সীমিত ভৌগোলিক গণ্ডি বা আঞ্চলিকতার বৃত্ত ভেঙে বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে ভারতের দর্শন,মনন এবং বহুত্ববাদ । এই পথে হেঁটেই সুপ্রাচীন ভারতবর্ষের সভ্যতা হয়েছে সমৃদ্ধ।। তাই পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর মধ্যে বর্তমানে অস্তিত্ব ধরে রেখেছে ভারতীয় সভ্যতা অপরটি চৈনিক সভ্যতা। 
ভারতীয় সভ্যতা প্রবল ধারায় সমৃদ্ধ হয়ে আজও বহমান হয়ে চলেছে, বহুত্ববাদী দর্শনের ঐতিহ্যকে বহন করে। তুচ্ছতা, সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি পরিবারের মত নানা জাতির, নানা ভাষার, নানা ধর্মের মানুষ পাশাপাশি একসঙ্গে  বসবাস করে চলেছি কারণ ভারতবাসী জন্মগতভাবেই এই বহুত্ববাদকেই মনে প্রাণে গ্রহণ করে এসেছে । ভারতবাসী কখনোই মনে করেনা এটা বিশেষের দেশ বরং  মনে করে এটা নির্বিশেষের দেশ । তাই দেখা যায় যুগ যুগ ধরে অনার্য, আর্য,শক,হূণ,পাঠান,মোগল প্রভৃতি জাতি 
লুট,হত্যা এবং শাসনের উদ্দেশ্যে এদেশে এলেও শেষ পর্যন্ত এই বৈচিত্র্যময় দেশ, এদেশের মানুষের সহিষ্ণুতাগুণ,সহাবস্থানের হৃদ্যতা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈচিত্র্যের অফুরন্ত ভান্ডার বিদেশি জাতিদের মনের হিংসা, বিদ্বেষও দূর করে দিয়েছে। তারাও ধীরে ধীরে এদেশের অগণিত জনসমুদ্রে মিশে গেছে। এবং একমাত্র পরিচয় বহন করে চলেছে ভারতবাসী হিসেবে । এই মহান দেশ প্রতিটি মানুষকে দিয়েছে স্বাধীনতা সর্বক্ষেত্রে । ভারতের সংবিধানে সেই অধিকারকেই করা হয়েছে বিধিবদ্ধ 
এদেশে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের জন্য।

               প্রাচীন,মধ্য এবং আধুনিক যুগে ভারতের মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন এমন কিছু উচ্চ গুণ সম্পন্ন, মানব-প্রেমিক, যাঁরা যুগে যুগে সমাজের কুপ্রথাকে, কুসংস্কারকে, অশিক্ষাকে, সংকীর্ণতাকে, বিদ্বেষকে, জাতিভেদকে দূর করবার জন্য ধারাবাহিক ভাবে আজীবন সেবাধর্ম পালন করে গেছেন। এই মানবতাবাদীগণ প্রচার করে গেছেন অহিংসার মন্ত্র, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে দেখিয়ে গেছেন সত্যের পথ। এঁরা ভারতীয় বহুত্ববাদী দর্শনকে অত্যন্ত সহজভাবে সাধারণের মাঝে তুলে ধরেছেন তাঁদের উপদেশে, কবিতায়, গানে, দোঁহায় এবং বাণীতে। ভারতে ভক্তিবাদী আন্দোলনের সময় এমন কিছু সাধক ও কবিগনের আবির্ভাব হয়েছিল যেমন কবীর,নানক, চৈতন্যদেব, শংকরাচার্য, রহিম, তুলসীদাস, মীরাবাঈ ইত্যাদি। পরবর্তীকালে আমরা পেয়েছি আমির খসরু, মির্জা গালিব, স্বাধীনতা উত্তর পেয়েছি বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, চারণ কবি মুকুন্দ দাস, উর্দু কবি ইকবাল ইত্যাদি কবি, লেখক,যাঁরা তাঁদের কবিতায়, গানে, নাটকে,প্রবন্ধে, ছড়ায়, চিত্রে, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক কর্মকান্ডে ঐক্যবদ্ধভাবে একে অপরের সঙ্গে বেঁধে রেঁধে থেকে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি রক্ষার কথাই বলেছেন। সংকীর্ণ গন্ডির বাইরে এসে মানবতার,সহিষ্ণুতার,অহিংসার পথই নির্দেশ করেছেন। কবীর তাঁর দোঁহায় বলেছেন,"জব তু আয়া জগৎ মে, লোগ হাঁসে তু রোয়/করনী না করী পাছে হাঁসে সব কোয় ।"অর্থাৎ যখন আমরা জন্মগ্রহণ করি সবাই হাসে আমরা কাঁদি। তোমার জীবদ্দশায় ভাল কাজ কর। এমন কাজ করো না যে তুমি চলে গেলে তারা  তোমার পিছনে হাসবে । ভারতবাসীও যেন ঐতিহাসিক কাল পর্ব ধরে এমন কোন কর্ম করেনি যার জন্য ভারতের ইতিহাস কলঙ্কিত হয়ে আছে। এ কথা ঠিক যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন জাতির মানুষ ভারতবাসীকে শোষণ করেছে,অত্যাচার করেছে ভারত ভূখণ্ডকে দখল করেছে। কিন্তু ভারতবাসী কখনোই সহিষ্ণুতাকে,অহিংসাকে ত্যাগ করেনি। ভারতবাসী 
কখনোই কারো ভূখণ্ড দখল করেনি। ভারতবাসী সারা বিশ্বে অহিংসার বাণী ও প্রেমধর্ম প্রচার করেছে। আমরা সম্রাট অশোককে এই কাজ প্রথম করতে দেখি খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে। এ এক অপূর্ব বিস্ময়, কোন রাজা অহিংসার পথ গ্রহণ করে হিংসাকে সম্পূর্ণ বর্জন করেছেন, বিশ্ব-ইতিহাসে‌ বিরল ঘটনা । দেশে দেশে প্রচার করছেন বৌদ্ধ - দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অহিংসার ধর্মকে। বিশ্ববাসীর কাছে তাই ভারতের সভ্যতা চিরকাল আদর্শ ও অনুসরণীয় হয়ে এসছে। আমরা ভারতবাসী এই অহিংসার নীতিকেই দৈনন্দিন জীবনের পাথেয় করে নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন তাঁর ''ভারততীর্থ" কবিতায় "দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে"--এই পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান ভারত ভূমিকে বৈচিত্র্যের মধ্যে অখন্ডতার স্বাদ এনে দিয়েছে ।

ভারতবর্ষে যখনই যখনই বিদেশী জাতি আক্রমণ করতে এসেছে তাদের সঙ্গে কোনো না কোনো পন্ডিত ব্যক্তি ও এসেছেন। তাঁরা সেসময়ের ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁদের বিবরণীতে । সেই বিবরণী-ইতিহাস গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তাঁরাও সেখানে ভারতবর্ষের সর্ব ধর্মের সহাবস্থানের কথাই উল্লেখ করেছেন ,প্রশংসার করেছেন। যেমন মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা', আল বিরুনী তাঁর ভারত বিবরণীতে,ফাহিয়েন,হিউয়েন সাং -এর ভ্রমণ বিবরণী সাক্ষ্য দিচ্ছে যে সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবাসী 
অহিংস-নীতি এবং বহুত্ববাদী দর্শনেই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী। আর্য পূর্ববর্তী সিন্ধু সভ্যতার তথা অনার্য সভ্যতার যতখানি তথ্য আমাদের সামনে এখনো পর্যন্ত উঠে এসেছে সেখানেও দেখা যায় সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের বিষয়টিকে। পরবর্তী আর্য যুগে  রচিত বেদের আদি-ঋক বৈদিক পর্বে আমাদের সমাজে নারী পুরুষের সমান অধিকার লক্ষ্যনীয় । বিদুষী মহিলা হিসেবে গার্গী,মৈত্রী,অপালা,লোপামুদ্রা ইত্যাদির নাম উঠে আসছে। আর্য পরবর্তী প্রতিবাদী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা বৌদ্ধ,জৈন,আজীবিক,চার্বাক প্রভৃতি দর্শন ভারতের বিভিন্ন দর্শনের সমন্বয়কেই ইঙ্গিত করে। ভারতীয় ভাববাদী দর্শন,প্রকৃতীবাদী দর্শন,ষড়দর্শন, বৈদান্তিক দর্শন সমন্বয়কেই সমর্থন করে ।পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে এসেছে ইসলাম ধর্ম। তাদের প্রভাব ভারতীয় জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত হয়ে আছে কি ভাষা,কি পোশাক-পরিচ্ছদ,কি ধর্মীয় বিবর্তন,কি শাসন ব্যবস্থা,কি শিক্ষা কি আচার-আচরণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে । আমাদের বাংলা ভাষায় মধ্যে বহুল পরিমাণে আরবি,ফার্সি শব্দ ব্যবহার করে চলেছি। এগুলোকে কোনভাবেই জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারণ এগুলো আমাদের মনের ভাবকে সহজভাবে, প্রাণবন্ত ভাবে প্রকাশ করে থাকে । আমাদের বহু খাদ্যাভ্যাস ইসলামীয় ও অন্য জাতির দ্বারা প্রভাবিত। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে নব নব রূপ ধারণ করেছে। ভারতবাসী এভাবেই মিশ্র  সংস্কৃতিকে মনে প্রাণে যুগে যুগে গ্রহণ করে সমৃদ্ধ হয়েছে এবং ভারত ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে তার উত্তরপুরুষগণ ।
               
               স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সমগ্র ভারতবর্ষ যে সংবিধানকে গ্ৰহণ করেছে সেও ইংলন্ড ,আমেরিকা, আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশের থেকে প্রয়োজনীয় অংশ নেওয়া হয়েছে। ভারতের সংবিধানে ভারতীয় সকল জনগণের অধিকার প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানের ৩য় খন্ডে ১২ নং থেকে ৩৫ নং ধারায় জনগণের মৌলিক অধিকার বর্ণিত হয়েছে।১৪ থেকে ১৮ নং ধারায় সমতার অধিকার আছে। এখানে বলা হয়েছে ধর্ম,বর্ণ,লিঙ্গ,জন্মস্থান অনুযায়ী সমানঅধিকারের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা যাবে না। ১৯ থেকে ২২ নং ধারায়প্রদান করা হয়েছে স্বাধীনতার অধিকার। শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, সমিতি ও সংঘ গঠনের অধিকার,অবাধে চলাফেরা ও বসবাসের অধিকার এবং যে কোন পেশা নির্বাচনের অধিকার। ২৩ ও ২৪ নং ধারা শোষণের বিরোধিতা করে রচিত। মানব পাচার, জোরপূর্বক শ্রম, ১৪ বছরের কম বয়সীদের কারখানায় ও বিপজ্জনক কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ।২৫ ও ২৮ নং ধারায় দেওয়া আছে সকলকেই নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার। দেওয়া আছে বিবেকের স্বাধীনতা,প্রচারের ও প্রসারের স্বাধীনতা।২৯ ও ৩০ নং ধারায় দেওয়া আছে সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার। সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ভাষা, লিপি ও সংস্কৃতি সুরক্ষার অধিকার।৩২ ও ৩৫ নং ধারায় আছে সাংবিধানিক প্রতিকারের অধিকার। কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান যদিকারো মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করে  তখন আদালতের আশ্রয় নিতে পারে। সুপ্রিম  কোর্ট রিট জারি 
করতে পারে। অর্থাৎ বহুত্ববাদী দর্শনের অনুসারী ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি আধুনিক যুগে জাতি,ধর্ম,বর্ণে,জন্মস্থান নির্বিশেষে সকলকে সমান অধিকারের মধ্যদিয়ে গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসাবে বিশ্বের দরবারে হাজির করেছে নিজেকে। সঙ্গে রেখেছে অহিংসা,অখন্ডতা, সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের ঐক্যতানকে । এ শতক যুদ্ধের নয়, পারস্পরিক সহযোগিতার ও‌ সমন্বয়ের। গ্লোবালাইজেসন প্রকৃত অর্থে তখনই সম্ভব। বিশ্ব দু-দুটো বিধ্বংসী বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান আগুনে পুড়েছে, মানবতাকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখেছে । ভারতীয় সভ্যতা কখনই যুদ্ধের পক্ষে নিজের অভিমত ব্যক্ত করেনি বরং বারে বারে অহিংসা ও  আলোচনার মধ্যদিয়ে বিভেদকে, বিদ্বেষকে দূর করা সম্ভব বলে বিশ্বাস করেছে।যে কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব গঠনমূলক শান্তিপূর্ণ আলোচনার মধ্যদিয়ে। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক মহলে ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষা করতে গঠিত জাতিসংঘেও সেই কথাই বলে চলেছে ভারত বারে বারে।There is not a single problem in our world that will not be solved by peaceful discussion. ভারত সে পথের পথিক। আমাদের আদর্শ তাই বুদ্ধ, অশোক, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ । আমরা মনে করি সর্বধর্মসমন্বয়ের মধ্য দিয়েই সহজে প্রকৃত সত্যে পৌঁছানো সম্ভব। বেদান্ত দর্শন সকল মানুষের মধ্যে অভেদ সম্পর্ক খোঁজে । বাউল জাত ধর্মের সংকীর্ণ গন্ডি অতিক্রম করে তার মনের মানুষকে খুঁজে বেড়ায়। স্বামী বিবেকানন্দ  আমেরিকার শিকাগোতে ধর্মীয় মহাসম্মেলনে যোগদান করেন এবং ভারতবর্ষ যে বহুত্ববাদী দর্শনের আকরঘর বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমন্বয় ও সহাবস্থানের মিলনক্ষেত্র, বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন সহজ সরল সাবলীল ভাষায়। রামকৃষ্ণ তাই অনায়াসেই বলেন "যতো মত ততো পথ" । বুদ্ধের "অষ্টাঙ্গিক মার্গ" মানুষকে সত্যের পথেই চালিত করে । সে পথে চালিত হয়েছেন সম্রাট অশোক । আমাদের অশোকস্তম্ভ এই সত্যের প্রতীক। উপনিষদ বলে, "সত্যমেব জয়তে" এই নীতির কারণেই আমরা ভারতবাসী সমস্ত পৃথিবীর মানুষকে নিজেদের আত্মীয় ভেবে আপন করে নিতে পারি‌,"বসুন্ধরম্কু টুম্বকম" ।
                 
       পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়েছে আফ্রিকা মহাদেশ। তারপর বহু পথ পরিক্রমা করে মানুষ এসেছে ভারতবর্ষে। নিগ্রোটো, প্রোটো অষ্টোলয়েড, অস্ট্রিক [কোল, ভিল , সাঁওতাল, মুন্ডা,ওরাও প্রভৃতি আদিবাসী] মঙ্গলয়েড, দ্রাবিড়, আর্য, শক হূণ, মোগল,পাঠান আরো কত বিদেশি জাতি সব মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে ভারতের অগণিত জনস্রোতে, এদের উৎসের সন্ধান করা সম্ভব নয়। একে অপরের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে আছে সকলে। ফলে বৈচিত্র্য, বহুমাত্রিকতা ভারতের জনবিন্যাসে স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যায়। নানা কারণে অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে কত জাতি হারিয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের ভাষা। হারিয়ে যাচ্ছে তাদের বহুদিনের সাংস্কৃতি। তবুও বিবর্তনের পথ ধরে অজস্র শ্রেণীভুক্ত সমাজে বহু ভাষা ও সংস্কৃতি কোন না কোনভাবে টিকে আছে। এই বৈচিত্র্যেই ভারতের শক্তি,ভারতের সৌন্দর্য, ভারতের নিজস্ব পরিচয় । বহুত্ববাদী দর্শন শুধুমাত্র ভারতের একতাকে, অখণ্ড- তাকে, রক্ষা করে চলেছে তাই নয় এই দর্শনের আলো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর অন্যান্য ভূখণ্ডেও। এখানেই ভারতের সার্থকতা ।

           ভারতের সংবিধানে ২২টি ভাষাকে প্রধান ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে । ভারতে ৪00র বেশি ভাষা ও উপভাষা আছে । ভারতে হাজার হাজার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিদ্যমান ।ভারতীয় সমাজ ও সংস্কৃতির মূল কথা হলো--ভালো আচরণ ভদ্রতা, অন্যদের সম্মান ও একসাথে অগ্রগতি । এটাই আমাদের বহুত্ববাদী দর্শন । ভারতীয় খাবার, রন্ধন পদ্ধতি, বিভিন্ন নৃত্যশৈলী যেমন কথাকলি, কত্থক, মোহিনীঅট্টম, কুচিপুড়ি, ওডিসি, মণিপুরী ও সতত্রিয়া । বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান যেমন ঈদ, বড়দিন, বৈশাখী, দীপাবলি, হোলি,  মকর সংক্রান্তি, মহাবীর জয়ন্তী, বুদ্ধ পূর্ণিমা । হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, জৈন ধর্ম, শিখ ধর্মের পাশাপাশি ভারতে আছে ইহুদি ধর্ম, জরাষ্ট্রবাদ, বাহাই ধর্ম, ইয়েজিদি বাদ, খ্রিস্টান ধর্ম । এছাড়াও আছে নাস্তিকবাদ, সংশয়বাদ, ধর্মনিরপেক্ষ, আহমদীয়া মুসলিম জামাত প্রকৃতির সহাবস্থান, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকেই সগৌরবে তুলে ধরে ।যা ভারতের বহুত্ববাদী দর্শন ও দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষী বহন করে চলেছে ভারত ভূখণ্ডের অস্তিত্বের সূচনা থেকে ।


 

প্রবন্ধ 

নারী জীবনের সেকাল, একাল
রুমা দেব মজুমদার

 

"বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণ কর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।"
বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই লেখনীতে নারীজাতির অবদানকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যুগে যুগে সমাজে, সংসারে নারী জাতি যেভাবে গৃহীত ও পরিচালিত হয়েছে, তার করুণ চিত্র আমরা ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই দেখতে পাই।

শতাব্দির পর শতাব্দি কেটে গেছে নারী জাতির অবদানের স্বীকৃতি বা অস্তিত্বের মূল্য পেতে। পাথর চাপা ঘাসের মতো মেয়েদের জীবন ছিল বিবর্ণ, মলিন। তার অস্তিত্ব, ইচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, বুদ্ধি, বিবেচনা কোন কিছুর গুরুত্ব এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দেয়নি। কিন্তু এই অর্ধেক আকাশ অন্ধকার তো চিরদিন চলতে পারে না—এ কথা রাজা রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের মতো মহান ব্যক্তিত্বরা উপলব্ধি করেছিলেন। নির্যাতন, নিষ্পেষণ, অবদমন কোন ক্ষেত্রেই কোন দিন চিরস্থায়িত্ব পায়নি সমাজের বুকে। ঠিক সেভাবেই ঈশ্বর প্রদত্ত যাবতীয় ধী-শক্তি সম্পন্ন এই নারী সমাজও আস্তে আস্তে নিজেদের জায়গা আপন প্রভাবে কেড়ে নিতে শিখেছে। আজ যেন এক মুক্ত আকাশের খোঁজ পেয়েছে নারী সমাজ। পদে পদে বন্ধনের বেড়াজালে আটকে রাখতে চেয়েছিল যে সমাজ, ধীরে ধীরে সেসব বন্ধন ছিন্ন করে মেয়েরা আত্মপ্রকাশে মগ্ন হতে পেরেছে। সাথে অভিভাবকদের ভূমিকাও আজ বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। আজকের অভিভাবকরা কন্যা সন্তানকে শুধুমাত্র পাত্রস্থ করে দায়িত্ব এড়াতে চান না। তারা মেয়েদের জীবন, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তিত এবং সময় ব্যয়ে আগ্রহীও। এভাবেই হয়তো নারীর জীবনের অন্ধকার দূর হয়ে অনেকাংশে আলোর ঠিকানা মিলছে।

কিন্তু ভাবতে অবাক লাগে কন্যা সন্তানকে অধিকাংশ বাড়িতে আজও কাঙ্ক্ষিত পাওয়া হিসেবে নিতে পারে না। উন্নত চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৌলতে জন্মের সূচনায় লিঙ্গ নির্ধারণ করে কন্যাভ্রূণ হত্যা করা হয়। সমাজে প্রচলিত কিছু কিছু আচার অনুষ্ঠানে ছেলের মায়ের অগ্রাধিকার—এসব প্রমাণ করে এখনও আমরা সমাজের ঘুণধরা মূল শিকড়কে উপড়ে ফেলতে পারিনি। আরও পথ চলতে হবে এই লড়াই নিয়ে।

আজ থেকে একশ বছর আগে যদি ফিরে যাই, আমাদের দিদিমা, ঠাকুমা বা তাদের মায়েদের জীবন যদি ঘুরে দেখি, শুধুমাত্র প্রাকশৈশব অতিক্রম করা পাঁচ-সাত কি নয়, দশ বছর বয়সের একটি মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দশের আগেই সে তার জন্মবৃত্তান্ত, পিতৃকূলের রক্তের সম্পর্কিত আপনজনদের জেনে বুঝে উঠতে পারেনি। এমতাবস্থায় তার গোত্রান্তর, বংশান্তর হয়ে গেল। আর শ্বশুরকুল তো বসেই আছে এক ঘোষিত 'দাসী' পাবার আশায়। কারণ আমাদের বৈবাহিক আচারে আছে ছেলে বিয়ে করতে রওনা হবার সময় মা'কে বলে আসবে— 'মা, তোমার জন্য দাসী আনতে যাচ্ছি।' সমাজ কেমন বেঁধে বেঁধে নিয়ম বিধি তৈরী করেছে মেয়েদের পায়ে শিকল পরাতে। আর মেয়েরা সেই যাঁতাকলে চলতে চলতে নিজেদের ইচ্ছা, আকাঙ্খা বা অস্তিত্বের মূল্য দেওয়ার কথা আলাদা করে ভাবতেই পারতো না। সমাজের সেই নিষ্ঠুর চিত্রগুলি আমরা আরও পরিষ্কারভাবে জানতে ও বুঝতে পেরেছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ মহান লেখকদের লেখনীর ভিতর দিয়ে।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পে তৎকালীন মেয়েদের যে জীবনলিপি বর্ণিত আছে তার করুণ চিত্র আমাদের শুধু মর্মাহত নয়, অবাকও করে। সেই সময়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতে হতো বিস্তর ফারাকের এক অসম বয়সী পুরুষের জীবন সঙ্গী। অবধারিত সত্য হিসেবে অল্প দিনেই সিঁথির সিঁদুর মুছে, পূর্ণ যৌবনে এক বিবর্ণ বৈধব্য জীবন কাটাতে হতো মেয়েদের। 'অভাগীর স্বর্গ' গল্পের নায়িকাকে মাথার চুল ছেঁটে, সাদা থান পরে, শাক পাতা চিবিয়ে জীবনধারণ করতে হয়েছিল পূর্ণ যৌবনে। চোখের সামনে বাবাকে মাছের মাথা চিবিয়ে খেতে দেখে নিজের সমস্ত লোভ লালসাকে সংবরণ করে থাকতে হয়েছে। আর সমাজ চেটেপুটে পুরুষের সেই ভোগ আর নারীর ওই ত্যাগকে প্রবল প্রশ্রয়ে উপভোগ করতে ব্যস্ত থাকতো। তবুও মন্দের ভালো 'অভাগীর স্বর্গ' যখন লেখা হয়েছে তার অনেক আগেই সতীদাহ প্রথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, রাজা রামমোহন রায়ের মতো ঈশ্বরের দূতসম ব্যক্তিত্বের উদয় হয়েছিল বলে। পরবর্তী কালে মেয়েরা আর সতী সাধ্বী হতে পারেনি। তা না হলে কী পরম উৎসাহে ঢাক ঢোল বাজিয়ে একজন বৃদ্ধাবস্থায় মৃত ব্যক্তির চিতায় সদ্য যৌবন প্রাপ্ত বৃদ্ধের স্ত্রীকে জ্যান্ত পুড়িয়ে সতী বানানো হতো! ভাবতে গা শিউরে ওঠে যে সতী হবার এই বিধান তো এই সমাজেরই মস্তিষ্ক প্রসূত। কত হীন, বাসনাপূর্ণ রক্তে মাংসের গড়া নারী শরীরটির স্থায়িত্বকাল সেইসব বিধানদাতাদের হাতের মুঠোয় ন্যস্ত ছিল। যা হোক নারী জীবনের সেই অন্ধকারময় অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন ১৮২৯ সালে লর্ড বেন্টিং-এর সহায়তায় রাজা রামমোহন রায়। সে কথা আমরা ইতিহাসের পাতা থেকেই জানি।

এর পরবর্তী সময়ে মেয়েরা হলো পণ প্রথার বলী। তার প্রমাণ পাই আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'দেনা-পাওনা' গল্পে। যেখানে গল্পের নায়িকা নিরুপমা পণের জন্য কী অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছিল দিনের পর দিন। একমাত্র মেয়ে নিরুকে উচ্চ বংশে বিয়ে দেওয়ার বাসনায় বাবা রামসুন্দর বাবুকে ভিটে মাটিটুকু বিক্রি করে পরিবারের সকলকে পথে বসাতে হয়েছিল। কিন্তু শ্বশুরকুলের ওই পৈশাচিক পণতৃষ্ণা মেয়েটির বাবার স্বপ্নের বাসনাকে বাস্তবায়িত হতে দেয়নি। ভিটে মাটি বিক্রি করে পণের টাকা যোগাড় করে যেদিন রামসুন্দর বাবু জামাই বাড়ি এলেন ততক্ষণে মেয়ে অত্যাচারের বলী হয়ে পরলোকগতা হয়েছে। গল্পের শেষের লাইনটি আরও ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছে। বৌমার দাহকাজ শেষ করে, বাইরে কর্মরত ছেলেকে মা চিঠি লিখছেন— 'এবারের সম্বন্ধটিতে নগদ বিশ হাজার টাকা আর হাতে হাতে আদায়।'

সমাজ, সংসার কতখানি তাচ্ছিল্যের চোখে নারী জীবনের মূল্যায়ন করেছে তাঁর চালচিত্র আমরা এই সমস্ত গল্পের বর্ণনাতেই পেয়ে যাই। আমরা জানি এই মহান লেখকদের প্রত্যেকটি গল্পই প্রকৃতপক্ষে সমাজের দর্পণ। এ হেন সমাজে মেয়েদের মেধা, বুদ্ধি, সক্ষমতা, পরাঙ্গমতা নিয়ে ভেবে জায়গা ছেড়ে দিতে দশকের পর দশক লেগে গেছে। লাটাইয়ের সুতো একটু ছেড়ে দু-প্যাঁচ গুটিয়ে নেয় পাছে সমাজে, সংসারে পুরুষ প্রাধান্য লঙ্ঘিত হয়। সিংহ রূপী হুকুমজারী করা পুরুষকে যদি জানা বোঝা নারীর কাছে হার মানতে হয় । যা হোক ঘরমুখো, সংসারী মেয়েরা এক সময়ে বিদ্যাশিক্ষার অঙ্গনে আসলেও তাদের শিক্ষার দৌড় ওই অক্ষরজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হতো। বলা হতো মেয়েদের 'কিঞ্চিৎ পঠন বিবাহে কারণ', শুধু লক্ষ্মীর পাঁচালী টুকু যেন তারা পড়তে পারে। এই প্রসঙ্গে 'হীরক রাজার দেশে' সিনেমার সেই সংলাপটি মনে আসছে— 'ওরা যত বেশি জানে তত কম মানে।'

তবুও তা সর্ব সাধারণের মধ্যে ছড়ায়নি, শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তী কালে উনবিংশ শতাব্দিতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও রাজা রামমোহন রায় নারী শিক্ষার প্রচার এবং প্রসারে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন। গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন জায়গায় মেয়েদের জন্য বিদ্যালয়। সমাজ অনুভব করেছিল স্ত্রী জাতি শিক্ষিত না হলে দেশের উন্নতি, অগ্রগতি সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলার মূল কাণ্ডারী একজন মা। তাই জাতির উন্নতিকল্পে দরকার নারী শিক্ষা। আমরা তো জানি শিক্ষা আনে চেতনা আর চেতনা আনে বিপ্লব। তাই শিক্ষার আলোয় আলোকিত নারী নিজের জায়গা চিনে নেবেই। সমাজে আজকের নারীর অবস্থান সেই আত্মচেতনার প্রকাশ, যদিও সেই পথ একটুও মসৃণ ছিল না, ছিল যথেষ্ট কণ্টকময়।

আমরা দেখেছি সেই সময় উনবিংশ শতাব্দির শেষের দিকে কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ছিলেন একজন বিলেত ফেরত ডাক্তার। তবে তিনি বিলেত থেকে ফিরে আসবার পর ভারতীয় সমাজে অনেক কটু উক্তি, অনেক অবজ্ঞা এমন কি এক ঘরে করে রাখবার বিধান শুনতে হয়েছিল। কিন্তু সে সময়ে দাঁড়িয়ে তাঁর স্বামী ছিলেন অনেক মুক্তমনা ও উন্নত মনস্ক। তাই ধীরে ধীরে সব প্রতিকূলতা এড়িয়ে তিনি আপন কাজে অর্থাৎ চিকিৎসা কার্যে মনোনিবেশ করে সমাজের সহায় হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। কিন্তু সংস্কারগ্রস্থ তখনের সমাজ সমুদ্র পার করে সাহেবদের দেশ থেকে ফিরে এসেছে বলে তাকে অচ্ছুৎ করে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু শিক্ষার ধার সংস্কারের চাইতে অনেক শানদার। তিনি তাঁর আচরণেই প্রমাণ করতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা চিকিৎসক। উনবিংশ শতক থেকে নারী জীবন যে নতুন খাতে বইতে শুরু করেছিল, বিংশ শতকে তা পত্রে পল্লবিত হয় বলা যায়। এই সময়ে নারী সমাজের অনেকে সরাসরি শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, সাহিত্য, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন ধারায় নিজেদের মুক্ত করে সমাজের বুকে প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে। দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলিত, অবদমিত নারী সমাজ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং সমাজ পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হয়। বিংশ শতকে নারী দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল মোচনের তাগিদে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পড়ে। আমরা পাই সরোজিনী নাইডু, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, মাতঙ্গিনী হাজরা এবং আরও অনেক মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীকে। পরবর্তী কালে পাই ইন্দিরা গান্ধীর মতো রাজনীতিবিদ, যিনি ছিলেন স্বাধীন ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। এবং সরোজিনী নাইডুকে পেয়েছিলাম প্রথম মহিলা রাজ্যপাল হিসেবে।

প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দু-দফায় প্রায় পনের বছরের রাজত্বকালে ইন্দিরা গান্ধী যে দক্ষতা ও যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন তা ভারতের মতো এতো বড় দেশের প্রত্যেকটি নাগরিকের মনে আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। দেশবাসী এমন যোগ্য মহিলা প্রধানমন্ত্রী পেয়ে মহিলাদের সম্পর্কে এক ভরসার জায়গা পায় বলা যায়। এছাড়া তৎকালীন সময়ে দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ, শিক্ষার বিস্তার, মেয়েদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলা ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনার মতো কিছু সুচিন্তিত নীতি নির্ধারণ মেয়েদের জীবনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সমাজ অনুভব করতে শিখেছিল যে নারী শরীর শুধু একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার কারখানা নয়।

শিক্ষার সাথে সাথে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। এই স্বনির্ভরতার স্বাদ তাদের আরও শিক্ষার প্রতি আগ্রহী করে তোলে।তবে আমাদের দেশের মতো জনবহুল দেশে সবার জন্য কাজের সুযোগ না আসলেও, সমাজ অন্তত নারী শিক্ষার সুফল টুকু অনুভব করতে শিখেছে। একজন শিক্ষিত মা যে সঠিক তত্ত্বাবধানে তাঁর সন্তান প্রতিপালন করতে পারবে এবং ফলশ্রুতিতে দেশ ও সমাজ সু-নাগরিক পাবে—এই বোধ টুকু প্রত্যেক পরিবারের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। স্ত্রী-শিক্ষা বিস্তারের শুরুতে শুধুমাত্র প্রাথমিক স্তর পর্যন্তই অধিকাংশ নারীর শিক্ষার দৌড় ছিল। তাতেও সে সময়ে রামায়ণ, মহাভারতের মতো মহাকাব্য গুলো পড়ে, ছেলেমেয়েদের মধ্যে সেই সমস্ত মহাকাব্যের বিষয় গল্প করে তাদেরকে পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে বেশ সমৃদ্ধ করে তুলতে পেরেছিল। সাথে নিজেদের অবসর সময় টুকু সুন্দর ভাবে কাটত। বাস্তব জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে একটা মূল্যবোধ গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী প্রজন্মে দেখা যায় সেই শিক্ষার গ্রাফ বেশ ঊর্ধ্বমুখী। ধীরে ধীরে মেয়েরা পুরুষের পায়ে পা মিলিয়ে প্রতিযোগিতার নিরিখে নিজেদের প্রমাণ করে অনেক উঁচু পদে আসীন হয়েছে।

 আমরা দেখতে পাই কিরণ বেদীকে—ভারতের প্রথম মহিলা আইপিএস (IPS) হিসেবে ইতিহাস গড়তে। প্রশাসন, সমাজসেবা, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। শুধু মেধার বিচারে নারীর ভূমিকা যে বিশেষ উল্লেখ্য তা নয়, সাহসিকতার ক্ষেত্রেও যে মহিলারা কোন অংশে কম নয় তার জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে দুর্বা ব্যানার্জির নাম উল্লেখ করা যায়। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা বাণিজ্যিক পাইলট। যে সময়ে একজন মহিলা পাইলট যাত্রী বোঝাই বিমান নিয়ে আকাশ পথে পাড়ি দেবে ভাবতে শেখেনি দেশ, সে সময়ে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সে বসে প্রথম মহিলা পাইলট হিসেবে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি।

পরবর্তী কালে আমরা পেয়েছি কল্পনা চাওলার মতো মহাকাশচারী। অদম্য সাহস আর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে তিনি মহাকাশে দু-দফায় এক মাস সময় কাটিয়ে ছিলেন।কিন্তু দেশ ও জাতির দুর্ভাগ্য যে দ্বিতীয় দফায় স্পেস শাটল কলাম্বিয়ার সফল অবতরণ সম্ভব হলো না। আমরা হারালাম অনেক সম্ভাবনাময়, মেধাবী ও সাহসী এক মহীয়সীকে বহিরদেশের দিকে তাকালে আমরা সুনীতা উইলিয়ামসের মতো সাহসী নারীকে দেখতে পাই, যিনি প্রায় দশ মাস মহাকাশে কাটিয়ে ছিলেন দু দফায়, এবং অভাবনীয় সাহসিকতার নজির স্থাপন করেছেন। শুধু তাই নয়, খেলাধুলার জগতেও নারীর অবদান বিশেষ উল্লেখ্য।

 বিশ্বের বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযানের অন্যতম দুই অভিযাত্রী হলেন আরতি সাহা ও বুলা চৌধুরী। আরতি সাহা প্রথম ভারতীয় মহিলা যিনি ইংলিশ চ্যানেল সাঁতরে পার হন। কী প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে তিনি এই দুঃসাধ্য অভিযানটি সফল করতে পেরেছিলেন! যেখানে জলের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রির অনেক নিচে, যে জলে দীর্ঘ সময় কাটালে শরীর অবশ হয়ে যায়, তেমন পরিস্থিতিতে সাঁতরে পার হওয়ার সাথে সামুদ্রিক ঝড়, বিভিন্ন ভয়ংকর সব সামুদ্রিক প্রাণীর আক্রমণ—সব বাধা টপকে তিনি এই সাফল্যে নজির তৈরি করে 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বুলা চৌধুরী একইভাবে বিশ্বের সাতটি সামুদ্রিক চ্যানেল পার হয়ে ইতিহাস গড়েছেন এবং 'পদ্মশ্রী' উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।

এই সমস্ত উচ্চ পর্যায়ের সাফল্য মেয়েদের সক্ষমতার দলিল হিসেবে দিনে দিনে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে আজ তাদের বাধার গন্ডি প্রায় সরে গিয়েছে । একবিংশ শতাব্দীতে এসে প্রত্যেক পরিবারের মেয়েরা শিক্ষা গ্রহণের অবাধ সুযোগ পাচ্ছে । ক্ষেত্র বিশেষে দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে মেয়েরা নির্দিধায়। অধিকাংশ মেয়েরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, ফলে অর্ধেক অন্ধকার আকাশে যে আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে পড়ছে, তার সুফলটুকু আমরা প্রত্যেকেই ভোগ করতে পারছি।

কিছু দিন আগে লাদাখ থেকে কাশ্মীর পর্যন্ত যে বিখ্যাত চেনার রেল সেতু তৈরী হয় তার মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন মহিলা ইঞ্জিনিয়ার। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা, চেনার নদীর স্রোত, গভীর খাদ, প্রতিকূল আবহাওয়া ইত্যাদি বহু প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও বিশ্বের সর্বোচ্চ এই রেল সেতুটি এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তৈরী হয়েছে। এই ব্রিজের উচ্চতা, ইস্পাত দিয়ে তৈরী আর্চ, ভূমিকম্প ও বিস্ফোরণ পতিরোধ কারী গঠন এক বিস্ময়কারী সৃষ্টির নজির যা দেশের ও দশের গর্ব।

সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই মেয়েদের সাফল্য আজ বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে আমাদের। যেমন আমরা বলতে পারি অরুন্ধতী ভট্টাচার্যের কথা ভারতীয় স্টেট ব্যাংকের প্রথম মহিলা চেয়ার পারসন ছিলেন। তার নেতৃত্বে অনেক ডিজিটাল ও আর্থিক পরিবর্তন আসে ব্যাংকে। এছাড়া ভারতী স্টেট ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে পেয়েছি সংঘমিত্রা ব্যানার্জীকে। ব্যাংকিং ও ফিনান্স ক্ষেত্রে তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা উল্লেখ করার মতো। এই একই নামে অর্থাৎ সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় নামে আমরা পাই একজন প্রখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানীকেও, যিনি ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট (ISI) এর ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি অনেক আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্র প্রকাশ করেছেন, যা আগামী দিনের গবেষকদের উদ্বুদ্ধ করবে। তবে গুটি কতক নাম উল্লেখ করে মেয়েদের সাফল্যের পরিসংখ্যান দেওয়া সম্ভব নয়। প্রতি ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার সাক্ষী সমাজ। নিত্য নতুন নিয়মের শৃঙ্খলে বেঁধে যাদের একদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল, আজ তারা বিধানদাতাদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের ডানা ভর করে উড়তে শিখেছে।

 তবে প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো এখনও মেয়েদের জীবনে কিছু অন্ধকার অধ্যায় রয়েই গেছে। আজও প্রতিদিনের সংবাদপত্রের পাতায় নারী নিগ্রহের বিভিন্ন রূপ দেখে শিউরে উঠতে হয়। গত ৮ই এপ্রিল ২০২৬ আনন্দবাজারের পাতায় উত্তর প্রদেশের কানপুরের এক ঘটনার কথাই বলছি— দুটো কিডনি ড্যামেজ হওয়া এক অসুস্থ ছেলেকে মেয়ের বাড়িতে না জানিয়ে বিয়ে দিয়েছে পাত্রপক্ষ ।, এরপর নববধূকে বলা হচ্ছে— "তুমি একটি কিডনি দাও অথবা বাড়ি থেকে ৩০ লক্ষ টাকা চেয়ে আনো।" ছেলের পরিবারের প্রত্যেক সদস্য সুস্থ স্বাভাবিক হলেও নববধূকে অনিবার্য দাতা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

 সমাজের গোড়ায় যে বিষ প্রোথিত আছে তার প্রভাব থেকে এখনও পরিপূর্ণ মুক্ত আমরা বলা যায় না। এখন ও বিবাহ যোগ্যতা মেয়েদের পাত্রপক্ষের কাছে পণ্য কেনা-বেচার মতো করে সাজিয়ে, গুছিয়ে প্রদর্শন করাতে হয়। তারপর তাদের চুলচেরা বিশ্লেষণে যোগ্য হলে তবেই বিয়ের সানাই বেজে ওঠে।

 এখনও খবরের কাগজ খুললেই নারী ধর্ষণ, নারী নির্যাতন নিয়ে খবর প্রতিদিন চোখে পড়ে। পুরুষের সেই কামুক দৃষ্টির শিকার শিশু থেকে বৃদ্ধা সকলেই কতক্ষেত্রে পুরুষের সাময়িক লালসার বলী হয়ে অবাঞ্ছিত, অকাল মাতৃত্বকে বরণ করে নিতে হচ্ছে কিশোরী মেয়েকে । আর সমাজের চোখে অপাঙতেয় সেই মেয়ে চরম অনিশ্চয়তা আর অবজ্ঞায় এক অন্ধকারময় জীবনে ডুব দেয় । তখন নারী জাতির উন্নতির সমস্ত নজির এক লহমায় মুছে গিয়ে মনে হয় দেহ সর্বস্ব নারী ছাড়া সমাজের বুকে আর কোন পরিচয় নেই তার।

সরকার ঘোষিত 'বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও' স্লোগান যেমন মেয়েদের এক উন্নত জীবনের পথ দেখায় তেমন বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা কন্যা সন্তানকে নিয়ে চলার পথে এক চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জানি না এর সুরাহা কোন পথে মিলবে। তবে প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েই নারী জীবনের ইতিহাস বহমান ।
বাইরের কর্মজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও সংসার, ধর্ম পালনে নারীর ভূমিকা কোন অংশে খাটো হয়নি আজও । সমাজের বিভিন্ন স্তরের মহিলারা ঘরের পরিচারিকা থেকে অফিসের পরিচালিকা, প্রত্যেকেই দিন শুরু করেন সংসার গুটিয়ে গুছিয়ে নিয়ে। আবার দিন শেষেও সংসারের ডাকই তার কাছে বড় ডাক হয়ে দাঁড়ায় । সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সংসার আবর্তিত হয় একজন নারীকে ঘিরেই । সকলের পরিচর্যার শেষে নিজের ব্যক্তিগত চাওয়া আজও তুচ্ছ হয়ে ওঠে একজন স্ত্রী বা মায়ের কাছে । মেয়েদের এই দশডূজা রূপ নিয়ে কবিদের কলমে উঠে এসেছে কত কবিতা ৷

 কিন্ত এই সাংসারিক দায়বদ্ধতার তার মধ্যে থেকেও একজন নারী যে কিভাবে আপনার সত্তার বিকাশ ও প্রকাশ ঘটাতে পারেন তার এক জ্বাজল্যমান উদাহরণ হিসেবে আমরা বলতে পারি আশাপূর্ণা দেবীর কথা, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে যখন মেয়েদের শিক্ষা নিয়ে সচেতনতা তেমন ভাবে তৈরী হয়নি । সেই সময়ে দাঁড়িয়ে প্রথাগত স্কুল শিক্ষা ছাড়া বাড়িতে পড়াশোনা করে নিজেকে তৈরী করেছিলেন । পরবর্তীকালে সংসার সামলে রাত জেগে নিজের লেখালিখি চালিয়েছিলেন। আমরা পেয়েছিলাম ' জ্ঞানপীঠ' পুরস্কার প্রাপ্ত স্বনামধন্যা এক সাহিত্যিককে। নিজের জীবনের উপলব্ধি থেকেই তিনি তাঁর লেখনীর মধ্যে স্থান দিয়েছিলেন নারী জীবনের বিভিন্ন দিক ও এদের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের কথা।

 
প্রত্যেক প্রজন্মের ব্যবধানে মেয়েদের চলার পথের আলাদা ধরন আমরা দেখে এসেছি। সমাজে চর্চিত অনেক তুচ্ছ বিশয়কে নিজের গায়ে নিয়ে নিজেদের চলার পথকে রুদ্ধ করতে চায়না আজকের মেয়েরা। শিক্ষার আলো তাদের যুক্তির পথ খুঁজে নিতে শিখিয়েছে। অন্ধ বিশ্বাস আর নিয়মের বেড়াজালে ঈশ্বর প্রদত্ত এই সুন্দর জীবনকে মেয়েরা আটকে রাখতে চায়না । তবে তাদের এই চাওয়া এবং পাওয়া অবশ্যই যেন এক সুন্দর সভ্যতা গড়ার সহায়ক হয় । আর আমরা ভাবতেই পারি কন্যা হবে যে রত্ন, রেখে বিশ্বাস, দিয়ে আশ্বাস, করে সঠিক যত্ন। এই প্রসঙ্গে শ্যামা সংগীতের সেই লাইনগুলি বলা যায় - "মন রে কৃষি কাজ জান না, এমন মানব জমিন রইল পতিত আবাদ করলে ফলত সোনা।" - সঠিক আবাদের অভাবে অনেক জমি নষ্ট হয়েছে, আজও হচ্ছে, তাই আমরা চাইব যে পার্থিব সমগ্র মানব জমিন বা মানব সম্পদ ব্যবহৃত হোক মানব সভ্যতার উন্নতি কল্পে। সেখানে সকলের একটাই পরিচয় হোক।


 

প্রবন্ধ 

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য  চেতনায় শ্রী রামচন্দ্র 

বটু কৃষ্ণ হালদার 

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুশাসনের দৃষ্টান্ত হল রাম-রাজত্ব। তাই আজও পৃথিবী জুড়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুশাসনের প্রসঙ্গ উঠলেই রামরাজ্য শব্দটি ব্যবহার করে। ভগবান শ্রীরাম এবং তাঁর রাজ্যশাসনের কথা শুধু মহর্ষি বাল্মিকী রচিত রামায়ণেই নয়; মহাভারত সহ বিবিধ পুরাণে উক্ত হয়েছে। শ্রীরামচন্দ্রের রাজ্যশাসনে ঋষি, দেবতা, মানুষ, পশুপাখি সহ জগতের প্রাণী মিলিত হয়ে একত্রে অত্যন্ত সম্প্রীতির সাথে বসবাস করেছিল। এ কারণেই যুগযুগ ধরে আজও মানুষ শ্রীরামচন্দ্রের জয়গাথা গেয়ে চলছে ।
ঋষীণাং দেবতানাঞ্চ মনুষ্যাণাঞ্চ সর্বশঃ।
পৃথিব্যাং সহবাসােঽভূদ্রামে রাজ্যং প্রশাসতি।।(মহাভারত:দ্রোণ পর্ব,৫১.১২)
"শ্রীরাম রাজ্যশাসন করতে থাকলে, সমস্ত ঋষি, দেবতা ও মানুষেরা পৃথিবীতে একত্রে মিলিত হয়ে বাস করছিল।"
রবীন্দ্র সাহিত্যে রামায়ণের দেশে পাড়ি দিয়েছে শিশু -- "মা গো, আমায় দে না কেন/ একটি ছোটো ভাই-/ দুইজনেতে মিলে আমরা/ বনে চলে যাই।" নাম না করেও শিশু নিজের সঙ্গে শ্রীরামকে অভেদ কল্পনা করেছে। ছোটো ভাইটি যে সহোদর লক্ষ্মণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রকৃতি চিত্রণে রামের বনবাস-জীবন শিশুর কল্পনায় মুহূর্তেই চলে আসে -- "চিত্রকূটের পাহাড়ে যাই/এমনি বরষাতে..."।
চেনা 'রাজপুত্র'-র অনার্জিত ধনসম্পদে, বিলাস ব্যাসনে মত্ত হবার দৃষ্টান্তের বাইরেও, রাজপুত্রের বনবাসী হয়ে যাওয়া, বাঙ্গালি তথা ভারতীয় শিশুর মানস-কল্পনায় কতটা প্রভাব এনেছিল, 'সহজপাঠ'-এর একটি কবিতায় তা এক লহমায় ধরে দেয় -- "ঐখানে মা পুকুরপাড়ে / জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে/ হোথায় হব বনবাসী --/ কেউ কোত্থাও নেই।/ ঐখানে ঝাউতলা জুড়ে/ বাঁধবো তোমার ছোট্ট কুঁড়ে,/ শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে/থাকব দুজনেই।" কি বলবেন একে, রামায়ণ-সম্পৃক্ততা নয়? রামায়ণ-ম্যানিয়া নয়! পারবেন তো এই শিকড়কে কেটে দিতে।
একজন মর্যাদা পুরুষোত্তম, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ  মানব, বাল্মীকি তাঁকে আখ্যা দিয়েছেন নরোত্তম বলে।আরেকজন আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শব্দের জাদুকর,ঋষিকবি।তাই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ যখন শ্রী রামের মহিমা বর্ণনা করেন তখন এরচেয়ে উত্তম রসায়ন আর কিছু হতে পারেনা। কি বলেছিলেন তিনি শ্রী রাম সম্বন্ধে? 
“বৃহৎ ভাবের নিকটে আত্মবিসর্জন করাকে যদি পাগলামি বলে, তবে সেই পাগলামি এক কালে প্রচুর পরিমাণে ছিল। ইহাই প্ৰকৃত বীরত্ব।
কর্তব্যের অনুরোধে রাম যে রাজ্য ছাড়িয়া বনে গেলেন, তাহাই বীরত্ব, এবং সীতা ও লক্ষ্মণ যে তাঁহাকে অনুসরণ করিলেন তাহাও বীরত্ব। ভরত যে রামকে ফিরাইয়া আনিতে গেলেন তাহা বীরত্ব, এবং হনুমান যে প্রাণপণে রামের সেবা করিয়াছিলেন , তাহাও বীরত্ব। হিংসা অপেক্ষা ক্ষমায় যে অধিক বীরত্ব, গ্রহণের অপেক্ষা ত্যাগে অধিক বীরত্ব, এই কথাই আমাদের কাব্যে ও শাস্ত্রে বলিতেছে।
পালোয়ানিকে আমাদের দেশে সর্বাপেক্ষা বড় জ্ঞান করিত না, এইজন্য বাল্মীকির রাম রাবণকে পরাজিত করিয়াই ক্ষান্ত হোন নাই, রাবণকে ক্ষমা করিয়াছেন। রাম রাবণকে দুইবার জয় করিয়াছেন। একবার বাণ মারিয়া, একবার ক্ষমা করিয়া। কবি বলেন, তন্মধ্যে শেষের জয়ই শ্রেষ্ঠ। হোমারের একিলিস, পরাভূত হেক্টরের মৃতদেহ ঘোড়ার লেজে বাঁধিয়া শহর প্রদক্ষিণ করিয়াছিলেন- রাম একিলিসে তুলনা করো। ইউরোপীয় মহাকবি হইলে পাণ্ডবদের যুদ্ধজয়েই মহাভারত শেষ করিতেন কিন্তু আমাদের ব্যাস বলেন, রাজ্য গ্রহণ করায় শেষ নহে, রাজ্য ত্যাগ করায় শেষ। 
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , ১২৯২ বঙ্গাব্দে "বালক" পত্রিকায় প্রকাশিত পঞ্চম পত্রে
“ রামায়ণের কবি রামচন্দ্রের পিতৃভক্তি,সত্যপালন, সৌভ্রাত্র, দাম্পত্যপ্রেম, ভক্তবাৎসল্য প্রভৃতি অনেক গুণগান করিয়া যুদ্ধকাণ্ড পর্যন্ত ছয়কান্ড মহাকাব্য শেষ করিলেন, কিন্তু তবু নূতন করিয়া উত্তরকাণ্ড রচনা করিতে হইল।তাঁহার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গুণই যথেষ্ট হইল না, সর্বসাধারণের প্রতি তাঁহার কর্তব্যনিষ্ঠা অত্যন্ত কঠিনভাবে তাঁহার পূর্ববর্তী সমস্ত গুণের উপরে প্রতিষ্ঠিত হইয়া তাঁহার চরিতগুণকে মুকুটিত করিয়া তুলিল।”
“স্বদেশি সমাজ” প্রবন্ধের পরিশিষ্ট আলোচনায় 
“একথা ভারতবর্ষ ভুলিতে পারে নাই যে তিনি চণ্ডালের মিতা , বানরের দেবতা, বিভীষণের বন্ধু ছিলেন। তিনি শত্রুকে ক্ষয় করিয়াছিলেন, এ তাঁহার গৌরব নহে। তিনি শত্রুকে আপন করিয়াছিলেন।তিনি আচারের নিষেধকে , সামাজিক বিদ্বেষের বাধাকে অতিক্রম করিয়াছিলেন ” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, “ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা”
“ শূদ্র তপস্বীকে তিনি বধদণ্ড দিয়াছিলেন এই অপরাধ রামচন্দ্রের উপরে আরোপ করিয়া পরবর্তী সমাজরক্ষকের দল রামচরিতের দৃষ্টান্তকে সপক্ষে আনিবার চেষ্টা করিয়াছে। যে সীতাকে রামচন্দ্র সুখে দুঃখে রক্ষা করিয়াছেন ও প্রাণপণে শত্রুহস্ত হইতে উদ্ধার করিয়াছেন, সমাজের প্রতি কর্তব্যের অনুরোধে তাহাকেও তিনি বিনা অপরাধে পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন। উত্তরকাণ্ডের এই কাহিনীসৃষ্টির দ্বারা স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায় আর্যজাতির বীরশ্রেষ্ঠ আদর্শ চরিত্ররূপে পূজ্য রামচন্দ্রের জীবনীকে একদা সামাজিক আচার রক্ষার অনুকূল করিয়া বর্ণনা করিবার বিশেষ চেষ্টা জন্মিয়াছিল।(এখানে কবিগুরু বর্ণনা করছেন কিভাবে পরবর্তীকালের কবিরা শ্রী রামের নামে মিথ্যা কাহিনী লিখেছিলেন তৎকালীন সমাজের কুপ্রথাকে বৈধ করতে)
কিন্তু অনেক সময় সমাজ রক্ষার জন্যও ত আচার রক্ষা করতে হয়। সমাজের জন্যই ব্যক্তিগত প্রেম ভালোবাসা প্রভৃতি সাধারণ মনুষ্যত্ব সুলভ দুর্বলতা বিসর্জন দিয়েছিলেন রাম। তিনি যে সাধারণ মানব নন, মহামানব। রামায়ণের কবি রামচন্দ্রের পিতৃভক্তি, সত্যপালন, সৌভ্রাত্র, দাম্পত্যপ্রেম, ভক্তবাৎসল্য প্রভৃতি অনেক গুণগান করিয়া যুদ্ধকাণ্ড পর্যন্ত ছয়কান্ড মহাকাব্য শেষ করিলেন; কিন্তু তবু নূতন করিয়া উত্তরকান্ড রচনা করিতে হইল। তাঁহার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক গুণই যথেষ্ট হইল না, সর্বসাধারণের প্রতি তাঁহার কর্তব্যনিষ্ঠা তাঁহার চরিতগুণকে মুকুটিত করিয়া তুলিল।”
  - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বদেশি সমাজ প্রবন্ধের পরিশিষ্ট তে লিখেছেন:_
“ রামচন্দ্র যে বানরদিগকে বশ করিয়াছিলেন তাহা রাজনীতির দ্বারা নহে, ভক্তিধর্মের দ্বারা। এইরূপে তিনি হনুমানের ভক্তি পাইয়া দেবতা হইয়া উঠিয়াছিলেন। পৃথিবীর সর্বত্রই দেখা যায়, যে কোনো মাহাত্ম্যই বাহ্যধর্মের স্থলে ভক্তিধর্মকে জাগাইয়াছেন, তিনি স্বয়ং পূজা লাভ করিয়াছেন।
রামচন্দ্র ধর্মের দ্বারাই অনার্যদিগকে জয় করিয়া তাহাদের ভক্তি অধিকার করিয়াছিলেন। তিনি বাহুবলে তাহাদিগকে পরাস্ত করিয়া রাজ্য বিস্তার করেন নাই। দক্ষিণে তিনি কৃষিভক্তিমূলক সভ্যতাও ভক্তিমূলক একেশ্বরবাদ প্রচার করিয়াছিলেন। তিনি সেই যে বীজ রোপণ করিয়া আসিয়াছিলেন বহু শতাব্দী পরেও ভারতবর্ষ তাহার ফল লাভ করিয়াছিল। এই দাক্ষিণাত‍্য ক্রমে শৈবধর্ম ও ভক্তিধর্মের রূপ গ্রহণ করিল এবং একদা এই দাক্ষিণাত‍্য হইতেই ব্রহ্মবিদ্যার এক ধারায় ভক্তিস্রোত ও আর এক ধারায় অদ্বৈতজ্ঞান উচ্ছ্বসিত হইয়া সমস্ত ভারতবর্ষকে প্লাবিত করিয়া দিল। ”
“মেঘনাদবধ” কাব্যে রামকে ছোট করে দেখানো হয়েছে- এতে আঘাতই পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, প্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর নিখাদ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল বলেই ।কাব্যের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, “একটা বক্তব্য আছে - মহৎ চরিত্র যদি বা নূতন সৃষ্টি করিতে না পারিলেন, তবে কবি কোন মহৎ কল্পনার বশবর্তী হইয়া অন্যের সৃষ্ট মহৎ চরিত্র বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন? কবি বলেন, ‘ I despise Ram and his rabble.’ সেটা বড় যশের কথা নহে - তাহা হইতে এই প্ৰমাণ হয় যে, তিনি মহাকাব্য রচনার যোগ্য কবি নহেন। মহত্ব দেখিয়া তাঁহার কল্পনা উত্তেজিত হয় না। নহিলে তিনি কোন প্রাণে রামকে স্ত্রীলোকের অপেক্ষা ভীরু ও লক্ষ্মণকে চোরের অপেক্ষা হীন করিতে পারিলেন। দেবতাদিগকে কাপুরুষের অধম ও রাক্ষসদিগকে দেবতা হইতে উচ্চ করিলাম!
এমনতর প্রকৃতিবহির্ভূত আচরণ অবলম্বন করিয়া কোন কাব্য কি অধিক দিন বাঁচিতে পারে? ধূমকেতু কি ধ্রুবজ্যোতি সূর্যের ন্যায় চিরদিন পৃথিবীতে কিরণ দান করিতে পারে? 
বাঙ্গালী হৃদয়ে রামায়ণ কথা বিশেষ সাড়া জাগাতে পারেনি, তার জন্য কবির দুঃখ :
“ বাঙ্গালাদেশের মাটিতে সেই রামায়ণ কথা হরগৌরী ও রাধাকৃষ্ণ কথার উপরে যে মাথা তুলিয়া উঠিতে পারে না , তাহা আমাদের দেশের দুর্ভাগ্য। রামকে যাহারা যুদ্ধক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্রে নরদেবতার আদর্শ বলিয়া গ্রহণ করিয়াছে, তাহাদের পৌরুষ, কর্তব্যনিষ্ঠা ও ধর্মপরতার আদর্শ আমাদের অপেক্ষা উচ্চতর।
“ রামায়ণে আদি কবি , গাহর্স্থ‍্য প্রধান হিন্দু সমাজের যত কিছু ধর্ম রামকে তাহারই অবতার করিয়া দেখাইয়াছিলেন। পুত্ররূপে , ভ্রাতৃরূপে, পতিরূপে ,বন্ধুরূপে , ধর্মের রক্ষাকর্তারূপে, অবশেষে প্রজারুপে বাল্মীকির রাম আপনার লোকপূজ্যতা সপ্ৰমাণ করিয়াছিলেন। তিনি যে রাবণকে মারিয়াছিলেন, সেও কেবল ধর্মপত্নীকে উদ্ধার করিবার জন্য। নিজের সমুদয় সহজ প্ৰবৃত্তিকে শাস্ত্রমতে কঠিন শাসন করিয়া সমাজরক্ষার আদর্শ দেখাইয়াছিলেন। আমাদের স্থিতিপ্রধান সভ্যতায় পদে পদে যে ত্যাগ ক্ষমা ও আত্মনিগ্রহের প্রয়োজন হয়, রামের চরিত্রে তাহাই ফুটিয়া উঠিয়া রামায়ণ হিন্দু সমাজের মহাকাব্য হইয়া উঠিয়াছে।
ভক্তবৎসল রাম, অধম পাপী সকলকেই উদ্ধার করেন। তিনি গুহকচণ্ডালকে মিত্র বলিয়া আলিঙ্গন করেন। বনের বানরদিগকে তিনি প্রেমের দ্বারা ধন্য করেন। ভক্ত হনুমানের জীবনকে ভক্তিতে আর্দ্র করিয়া তাহার জন্ম সার্থক করিয়াছেন। বিভীষণ তাঁহার পরম ভক্ত। রাবণও শত্রুভাবে তাহার কাছ হইতে বিনাশ পাইয়া উদ্ধার হইয়া গেল। এই রামায়ণে ভক্তিরই লীলা।
ভগবান যে শাস্ত্রজ্ঞানহীন অনাচারীরও বন্ধু, কাঠবিড়ালির অতি সামান্য সেবাও যে তাঁহার কাছে অগ্রাহ্য হয় না, পাপিষ্ঠ রাক্ষসকেও যে যথোচিত শাস্তিএ দ্বারা পরাভূত করিয়া উদ্ধার করেন, এই ভাবটিই প্রবল হইয়া ভারতবর্ষে রামায়ণ কথার ধারাকে গঙ্গার শাখার ন্যায় পথে পথে লইয়া গেছে।”
“ আমরা বিদেশি, আমরা নিশ্চয় বলিতে পারি না গ্রিস তাহার সমস্ত প্রকৃতিকে তাহার দুই কাব্য প্রকাশ করিতে পারিয়াছে কিনা, কিন্তু ইহা নিশ্চয় যে ভারতবর্ষ রামায়ণ মহাভারতে আপনাকে আর কিছুই বাকি রাখে নাই। পাশ্চাত্য পন্ডিত এবং সমালোচক কেউ কেউ এ কথাটি স্বীকার করেছেন। ”.........
“ রামায়ণ ...বৃহৎ বনস্পতির মতো দেশের ভূতলজঠর হইতে উদ্ভূত হইয়া সেই দেশকে আশ্রয় দান করিয়াছে ; তাকে সাধারণ কাব্য সমালোচনার আদর্শে বিচার করা অবিধেয় এবং অযৌক্তিক । এ মহাকাব্য স্বয়ং মহাকাল, যিনি সরল অনুষ্টুপ ছন্দে ভারতবর্ষের সহস্র বৎসরের হৃদপিন্ড স্পন্দিত করিয়া  আসিয়াছেন। ”  - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কাহিনী কাব্যগ্রন্থের ভাষা ও ছন্দের ৩১ নং কবিতাটিতে কবিগুরু কাব্যছন্দে ফুটিয়ে তুলেছিলেন বাল্মিকী রামায়ণ রচনার ঘটনা।শ্রী রামচন্দ্রকে নিয়ে লিখেছিলেন-
“ ভগবন ত্রিভুবন, তোমাদের প্রত্যক্ষ বিরাজে
কহ মোরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।
কহ মোরে বীর্য কার ক্ষমার করে না অতিক্রম
কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্মের নিয়ম
ধরেছে সুন্দর কান্তি মানিক্যের অঙ্গদের মতো,
মহৈশ্বর্যে আছে নম্র, মহাদৈন্যে কে হয়নি নত,
সম্পদকে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,
কে পেয়েছে সবচেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,
কে লয়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম
সবিনয়ে সগৌরবে ধরাধামে দুঃখ মহত্তম,
কহ মোরে সর্বদর্শী হে দেবর্ষি তাঁর পূণ্য নাম
নারদ কহিলা ধীরে,অযোধ্যার রঘুপতি রাম!”