Friday, October 9, 2026


 

মুজনাই 

অনলাইন আশ্বিন  সংখ্যা ১৪৩৩


সম্পাদকের কথা 

অনেকদিন আগেই পুজোর বাজনা গেছে। আর পুজো মানেই দীর্ঘ উৎসবের মরশুম। আগে মহালয়ার দিন পুজো সংখ্যা প্রকাশ পেত। আজকাল এত আগে সেসব প্রকাশ হয় যে, পুজো এলে সেগুলি ফিরিওয়ালাকে বিক্রি করার কাগজের স্তুপে পড়ে থাকে। `মুজনাই`-এর অবশ্য সেই দুর্ভাগ্য নেই। কেননা `মুজনাই`-এর পুজোসংখ্যা অনলাইনে প্রকাশ পায়। পড়তে ইচ্ছে না হলে স্ক্রল করে চলে গেলেই হল। 

এই বছরের পুজো সংখ্যাতেও `মুজনাই`-এর ঐতিহ্য অনুসারে কোট-আনকোট রথী-মহারথীরা লেখেননি। কিন্তু যাঁরা লিখেছেন, তাঁরা সত্যিই লেখক বলে `মুজনাই` মনে করে। নামে নয়, `মুজনাই` বয়ে চলে সৃজনে। উৎসবের কথা মাথায় রেখেই `মুজনাই`-এর অনলাইন কার্তিক সংখ্যা প্রকাশিত হবে না। অনলাইন সংখ্যা আসবে অগ্রহায়ণ মাসে অর্থাৎ ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। 

উৎসবের এই দুরন্ত মুহূর্তে অন্য কথা বলে আর সময় নষ্ট না করাই ভাল। তবে `মুজনাই` সেদিনই আপ্লুত হবে, যেদিন উৎসবের আলো সত্যিই স্পর্শ করবে নিরন্ন প্রান্তিক জনতাকে। তার আগে `মুজনাই`-এর  প্রচেষ্টা চলবে। 


অনলাইন আশ্বিন সংখ্যা ১৪৩৩ 

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

 

 প্রচ্ছদ ছবি ও সম্পাদনা 

শৌভিক রায় 

প্রকাশক 

রীনা সাহা 

 মুজনাই ভাদ্র  সংখ্যা ১৪৩৩


এই সংখ্যায় আছেন যাঁরা 

অরুণ কুমার, সুমনা গুহনিয়োগী, লিপিকর, অভিজিৎ সেন,

তন্ময় ধর, মৌসুমী চৌধুরী,  অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য,

সুধাংশু চক্রবর্তী, শেখ আবির আল সাদ, দেবযানী চক্রবর্তী, চিত্রা পাল,

সুকল্যাণ দে, প্রদীপ মুকুটী, ভবরঞ্জন দাস, মনোমিতা চক্রবর্তী,

অনিন্দ্য পাল, মধুমিতা দে রায়, শুভেন্দু নন্দী,

অনিতা নাগ, মহঃ সা নো য়া র, বেলা দে, ফটিক চৌধুরী,

গৌতমেন্দু নন্দী, অপর্ণা সাহা, অজিত দেবনাথ, শিশির আজম,

উৎপলেন্দু পাল, অমিত আভা, মৃড়নাথ চক্রবর্তী, প্রাণেশ পাল,

 প্রতিভা পাল, বিকাশ দাশ,  কৌস্তুভ গুপ্ত,  তপন মাইতি,

 অনুপম বিশ্বাস, আকাশলীনা ঢোল, তিথি পাল সরকার, হৃদান সরকার,

সোমা দাশ, বি এম মিজানুর রহমান, কবিতা বণিক, সুশান্ত সেন, 

মি ষ্টু স র কা র, নবনীতা রক্ষিত, পৃথ্বীরাজ কামিলা


অনলাইন আশ্বিন সংখ্যা ১৪৩৩ 

       


 

প্রবন্ধ/ নিবন্ধ 


এক মুকুটহীন রাজকুমারের অজানা কথা

অরুণ কুমার 


বৈকুণ্ঠপুর রাজবংশের উত্তরাধিকার থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাহসী কর্মী—গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনকথা

ইতিহাস বড় নির্মম। তার নির্মমতা কখনও যুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে, কখনও রাজপ্রাসাদের অন্তরালে, আবার কখনও মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অলিগলিতে ধরা পড়ে। ইতিহাসের পাতায় রাজা, মহারাজা, মন্ত্রী কিংবা সেনানায়কদের নাম সহজেই জায়গা করে নেয়; কিন্তু তাঁদের উত্তরসূরি হয়েও যে মানুষটি নীরবে জীবনযুদ্ধ লড়ে যান, তাঁর কথা অনেক সময় থেকে যায় অন্ধকারে।

উত্তরবঙ্গের ইতিহাসে বৈকুণ্ঠপুর রাজ স্টেট এমনই এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। রায়কত বংশের দীর্ঘ ঐতিহ্য জলপাইগুড়ি ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও উন্নয়নের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রসন্ননগর থেকে জলপাইগুড়ির প্রসন্নদেব মহাবিদ্যালয়—বিভিন্ন স্থানে সেই ঐতিহ্যের ছাপ আজও দৃশ্যমান।
এই ঐতিহ্যের অন্যতম পরিচিত নাম রাজা প্রসন্নদেব রায়কত। তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের জনজীবনে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। কিন্তু তাঁর জীবনের সঙ্গে যুক্ত আরেকটি অধ্যায় অনেকটাই অনুলিখিত—তাঁর পুত্র গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনকাহিনি।
সামাজিক ও ঐতিহাসিক অর্থে তিনি যেন এক ‘মুকুটহীন রাজকুমার’—রাজপরিবারে জন্ম, কিন্তু রাজকীয় আরাম-আয়েশ নয়; উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নিরাপত্তার বদলে অনিশ্চয়তা, প্রাসাদের ছায়ার বদলে সংগ্রাম, আর শেষ পর্যন্ত দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নিজের শ্রম ও সাহস দিয়ে নিজস্ব পরিচয় নির্মাণ।

রাজপ্রাসাদ থেকে জীবনের কঠিন বাস্তবতায়

গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জন্ম ১৯৪৪ সালে দার্জিলিঙে। তাঁর মা ডিলা দেবী, যিনি ডাংকো দেবী নামেও পরিচিত ছিলেন, ছিলেন রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের অন্যতম সহধর্মিণী। গৌরীশঙ্করের সঙ্গে তাঁর দুই বোন—জ্যোৎস্না দেবী ও লীলা দেবী।

দার্জিলিংয়ের বাতাসিয়া অঞ্চলের কাছে প্রায় সাড়ে ২২ একর জমির উপর অবস্থিত ‘জলপাইগুড়ি হাউস’-এর পরিবেশেই তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে। বর্তমানে সেই সম্পত্তি সরকারি ব্যবস্থার অধীনে; কিন্তু একসময় সেটিই ছিল তাঁর শৈশবের পৃথিবী।

বাবা প্রসন্নদেব রায়কত জীবিত থাকাকালীন গৌরীশঙ্কর তাঁর স্নেহ পেয়েছেন। ছোটবেলার স্মৃতিতে বাবার সঙ্গে বাতাসিয়া, দার্জিলিংয়ের রেলস্টেশন, টয় ট্রেনের ধোঁয়া, দার্জিলিং ম্যাল, ঘোড়ায় চড়া—সবকিছু আজও যেন জীবন্ত।

একবার বাবা তাঁকে একটি দামি ‘Raleigh’ কোম্পানির চেইন-কভার লাগানো সাইকেল কিনে দিয়েছিলেন। সেই সাইকেল নিয়ে কিশোর গৌরীশঙ্কর দার্জিলিং থেকে সালুগাড়া, বৈকুণ্ঠপুরের জঙ্গল, বেলাকোবা ও রংধাবালি হয়ে জলপাইগুড়ির রাজবাড়িতে পৌঁছেছিলেন। রাজবাড়িতে সাইকেল নিয়ে তাঁর আগমন ছিল যেন এক রাজকুমারের নিজের রাজ্যে ফিরে আসা। অথচ সেই আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।

প্রাসাদের সম্পর্ক, উত্তরাধিকার এবং সম্পত্তিকে ঘিরে পারিবারিক টানাপোড়েন ক্রমশ তাঁর জীবনে ছায়া ফেলতে শুরু করে।


পিতার মৃত্যুর পর বদলে গেল সব

প্রসন্নদেব রায়কতের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। শরিকি মামলা-মোকদ্দমা ও পারিবারিক জটিলতার কারণে ডিলা দেবী ও তাঁর সন্তানদের জলপাইগুড়ি হাউস ছেড়ে চলে যেতে হয়।

একসময়ের রাজপরিবারের সন্তানদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয়, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজের সহযোগিতা এবং সীমিত সুযোগের মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয় গৌরীশঙ্করকে।

দার্জিলিংয়ের রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তাঁর জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। সেখানে তিনি স্নেহ, শৃঙ্খলা এবং মানসিক শক্তির পরিবেশ পান। পরে দার্জিলিং সরকারি স্কুলে পড়াশোনা করেন। কিন্তু নবম শ্রেণির পর আবার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।

এবার তাঁকে পড়াশোনার পরিচিত পথ ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে নামতে হয়।


এক অচেনা লাইনে দাঁড়িয়ে বদলে গেল জীবন

কলকাতায় এসে একদিন রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি দেখতে পেলেন একদল যুবক একটি নিয়োগের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কী হচ্ছে, কোথায় চাকরি—সেটা তাঁর কাছে স্পষ্ট ছিল না। কৌতূহল থেকেই তিনি লাইনে দাঁড়িয়ে পড়েন।

সেটিই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের অন্যতম বড় ‘টার্নিং পয়েন্ট’।

বলিষ্ঠ শরীর, খেলাধুলায় অভ্যস্ততা এবং শারীরিক সক্ষমতার কারণে নিয়োগকর্তাদের নজরে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় বিমানবাহিনীতে এয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।

জীবনের যে ছেলেটি রাজপরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে জন্মেছিল, সে এবার নিজের পরিচয় তৈরি করতে চলেছে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একজন কর্মী হিসেবে।

প্রশিক্ষণের জন্য তাঁকে যেতে হয় আম্বালা, পরে দেশের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে তাঁর কর্মজীবনের বিস্তার ঘটে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যোগ দিয়ে তিনি এমন এক সময়ে কর্মজীবন শুরু করেন, যখন দেশের সামনে একের পর এক যুদ্ধ ও নিরাপত্তা-সংকট এসে দাঁড়াচ্ছে।


যুদ্ধের সময় বিমানবাহিনীর নেপথ্য সৈনিক

১৯৬২ সালের চীন-ভারত সংঘাত, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ—এই উত্তাল সময়ের মধ্যেই গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের কর্মজীবন এগিয়ে চলে।

তিনি ছিলেন বিমানবাহিনীর গ্রাউন্ড স্টাফের সঙ্গে যুক্ত একজন দক্ষ কর্মী। বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত অস্ত্রব্যবস্থা, মিসাইল ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ, পরীক্ষা এবং প্রস্তুতির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

সামরিক জীবনের এই কাজ ছিল নিছক চাকরি নয়। যেকোনো সময় যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে; যেকোনো মুহূর্তে নির্দেশ আসতে পারে নতুন ঘাঁটিতে যাওয়ার। তাই প্রস্তুত থাকতে হতো শারীরিক ও মানসিক—দুইভাবেই।

রুশ প্রযুক্তির মিসাইল ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রযুক্তিগত কর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় করে অস্ত্রব্যবস্থাকে কার্যক্ষম অবস্থায় রাখার দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল।

১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধের সময় তাঁর দায়িত্বের মধ্যে তাজমহল অঞ্চলের আকাশ প্রতিরক্ষার সঙ্গেও যুক্ত থাকার স্মৃতি তিনি বয়ে বেড়িয়েছেন। আকাশপথে সম্ভাব্য শত্রু হামলার আশঙ্কায় রাডার ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হতো।

এ ছিল যুদ্ধের সেই অন্য মুখ—যেখানে সম্মুখসারিতে বন্দুক হাতে দাঁড়ানো সৈনিকের পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ নেপথ্যে থেকে যুদ্ধযন্ত্রকে সচল রাখেন।

গৌরীশঙ্কর তাঁদেরই একজন।


মিসাইলের পাশাপাশি বক্সিং রিং

তাঁর জীবনকে শুধু সামরিক দায়িত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল। বিমানবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর সেই আগ্রহ নতুন মাত্রা পায়।

বক্সিংয়ে তাঁর অসাধারণ সাফল্য তাঁকে বিমানবাহিনীর ক্রীড়া জগতে পরিচিত করে তোলে।

প্রশিক্ষক রঙ্গন দত্ত তাঁকে বক্সিংয়ের প্রতি আরও উৎসাহিত করেন। প্রতিদিন ভোরে উঠে কঠোর অনুশীলন, শারীরিক প্রস্তুতি এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে তিনি প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে থাকেন।

লাইট-মিডলওয়েট বিভাগে তাঁর সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত পূর্বাঞ্চলীয় বিমান কমান্ডের বক্সিং প্রতিযোগিতায় তাঁর ধারাবাহিক সাফল্যের কথা তিনি স্মরণ করেছেন। পরবর্তী সময়ে ইন্টার-কমান্ড পর্যায়েও নির্বাচিত হন।

একটি ম্যাচের স্মৃতিও তাঁর মনে গেঁথে আছে—সেমিফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বী জেমস বডলেরিকে নকআউট করে ফাইনালে ওঠা এবং সেখানে ল্যারি ফার্নান্ডেজকে পরাজিত করা।

তাঁর নিজের ভাষায়, প্রথম রাউন্ডে প্রচণ্ড চাপ সামলাতে হতো, কিন্তু দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাউন্ডে নকআউট করে জয় ছিনিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাই ছিল তাঁর বিশেষ শক্তি।

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে কিছু প্রতিযোগিতা বন্ধও হয়ে যায়। তবু বক্সিংয়ের সেই মেডেলগুলো আজও তাঁর সংগ্রহে—একটি সময়ের সাক্ষী হয়ে।


গান, গিটার ও এক বহুমুখী মানুষ

গৌরীশঙ্করের জীবনের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক তাঁর সংগীতপ্রেম।

বাংলা, হিন্দি, নেপালি ও ইংরেজি গান—চার ভাষাতেই তাঁর আগ্রহ ছিল। বিমানবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় গিটার বাজানোয় দক্ষতা অর্জন করেন। পরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁর গিটারের সুরে বাংলা, হিন্দি ও নেপালি গানের পরিবেশনা শোনা গেছে।

তাঁর প্রিয় গানের মধ্যে ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের বিখ্যাত গান—‘আপনা দিল তো আওয়ারা’। বাগানে ফুল-সবজির পরিচর্যা করতে করতে আজও কখনও কখনও তিনি আপনমনে গান গেয়ে ওঠেন।

সংগীতপ্রেমের উত্তরাধিকারও যেন বাবার কাছ থেকেই পাওয়া। প্রসন্নদেব রায়কত নিজেও গান-বাজনার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তাঁর ব্যবহৃত প্রায় একশো বছরের পুরনো জার্মান হারমোনিয়াম এবং বার্মা টিকের পালঙ্ক গৌরীশঙ্কর যত্ন করে রেখে দিয়েছেন বলে জানা যায়।

অর্থাৎ রাজবংশের স্মৃতি তাঁর কাছে শুধু জমিজমা বা প্রাসাদ নয়—কিছু বস্তু, কিছু সুর, কিছু স্মৃতি এবং কিছু সম্পর্কের মধ্যেও বেঁচে আছে।


রাজকুমারের আরেক পরিচয়—পর্যটনের সঙ্গী

১৯৭৫ সালে বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর গৌরীশঙ্কর ফিরে আসেন দার্জিলিংয়ে।
কিন্তু অবসর মানেই থেমে যাওয়া নয়।
জীবিকার নতুন পথ হিসেবে তিনি গাড়ি চালানোর কাজ শুরু করেন। রায়গড় থেকে একটি উইলিস জিপ নিয়ে দার্জিলিংয়ে আসেন। পরে সেই জিপ বিক্রি করে একটি পুরনো ল্যান্ড রোভার কেনেন। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ১৯৫৫ সালের মডেলের সেই ল্যান্ড রোভার তিনি মধ্যপ্রদেশের রায়গড় থেকে নিয়ে এসেছিলেন।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি রাস্তায় সেই গাড়ি নিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন অধ্যায়।
দেশি-বিদেশি পর্যটকদের নিয়ে তিনি দার্জিলিং, কালিম্পং, সান্দাকফু এবং পাহাড়ের নানা দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন। পাহাড়ের বিপজ্জনক রাস্তা, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা এবং দুর্গম পথ তাঁর কাছে নতুন কিছু ছিল না। সামরিক জীবনের অভিজ্ঞতা যেন এই নতুন পেশাতেও কাজে লাগত।

রাজেন্দ্র কুমারের অভিনীত ‘ঝুক গয়া আসমান’ সিনেমায় দেখা একটি জিপও তাঁর মনে গাড়ির প্রতি আগ্রহ তৈরি করেছিল বলে তিনি স্মরণ করেছেন।
পর্যটকদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কখনও গিটার, কখনও গান—এইভাবেই তাঁর জীবন আবার এক নতুন ছন্দ পায়।

প্রাসাদের উত্তরাধিকার নয়, জীবনের উত্তরাধিকার
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই।
তিনি রাজপরিবারে জন্মেছিলেন, কিন্তু রাজকীয় উত্তরাধিকার তাঁর জীবনকে নির্ধারণ করেনি। বরং তাঁর জীবনকে নির্মাণ করেছে সংগ্রাম, কর্মনিষ্ঠা, আত্মসম্মান এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ।
যে সম্পত্তি তাঁর শৈশবের আশ্রয় ছিল, তা একসময় তাঁর নাগালের বাইরে চলে যায়। পারিবারিক জটিলতা, মামলা-মোকদ্দমা, আর্থিক অনিশ্চয়তা—সবকিছু পেরিয়ে তিনি নিজের জীবিকা নিজেই তৈরি করেছেন।

আজ তাঁর নিজের পরিবার রয়েছে। দুই কন্যার বিয়ে হয়েছে; একজন শিক্ষিকা, অন্যজন নার্সিং পেশায় যুক্ত। পুত্রও বিবাহিত এবং বিদেশে কর্মরত। নাতি-নাতনিদের নিয়ে তাঁর জীবন এখন অনেক শান্ত।

অতীতের ক্ষত থাকলেও তিনি অভিযোগকে জীবনের কেন্দ্র করেননি।
বরং তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম—“আমার কিছু চাই না। ঈশ্বর আমায় সব দিয়েছেন।”
এই কথাটিই হয়তো তাঁর জীবনদর্শনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।


ইতিহাসের কাছে তাঁর দাবি কী?

গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবনের গল্পে রাজকীয়তার চেয়ে মানুষের গল্প বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একটি রাজবংশের সন্তান কীভাবে প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের জীবনকে নতুন করে গড়ে নিতে পারেন—এটি তার গল্প।
একজন কিশোর কীভাবে রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তা হারিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রয়ে বড় হয়, কীভাবে কৌতূহলবশত একটি চাকরির লাইনে দাঁড়িয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর সদস্য হয়ে ওঠে, কীভাবে যুদ্ধের উত্তাল সময়ে দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দায়িত্ব পালন করে, কীভাবে বক্সিং রিংয়ে বারবার জয়ী হয়, কীভাবে গান ও গিটারকে জীবনের আনন্দ করে তোলে এবং অবসরের পর পাহাড়ি পর্যটনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে—এই সমগ্র যাত্রা নিছক একজন মানুষের জীবনী নয়; এটি এক সময়ের সামাজিক ও সামরিক ইতিহাসেরও অংশ।
তাঁর কাছে রাজা প্রসন্নদেব রায়কতের স্মৃতি এখনও অমূল্য। তাঁর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ক্ষমতা ফিরে পাওয়া নয়; বরং বৈকুণ্ঠপুর রাজপরিবারের ইতিহাস, রাজা প্রসন্নদেবের কাজ এবং ঐতিহ্য যেন নতুন প্রজন্ম জানতে পারে।
সময়ের বিচারে এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।


মুকুটের চেয়ে বড় যে পরিচয় 

রাজপুত্রের পরিচয় জন্মসূত্রে আসে। কিন্তু মানুষের পরিচয় তৈরি হয় কর্মে। গৌরীশঙ্কর দেব রায়কত জন্মসূত্রে রাজপরিবারের সন্তান—এই পরিচয় তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় মাত্র। তাঁর প্রকৃত পরিচয় তৈরি হয়েছে জীবনের প্রতিটি কঠিন বাঁকে। রাজপ্রাসাদ তাঁকে স্থায়ী আশ্রয় দিতে পারেনি। উত্তরাধিকার তাঁকে নিরাপত্তা দেয়নি। পারিবারিক পরিস্থিতি তাঁকে অনেক কিছু থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সেই বঞ্চনাই হয়তো তাঁকে অন্য এক শক্তি দিয়েছে—নিজের পায়ে দাঁড়ানোর শক্তি।

বিমানবাহিনীর পোশাক, যুদ্ধকালীন দায়িত্ব, মিসাইল রক্ষণাবেক্ষণ, বক্সিংয়ের মেডেল, গিটারের সুর, পুরনো ল্যান্ড রোভার, পাহাড়ি রাস্তা আর অসংখ্য স্মৃতি—এসব মিলিয়েই তাঁর আসল মুকুট।
সেই মুকুট চোখে দেখা যায় না।
তাই তিনি মুকুটহীন রাজকুমার।
তবে ইতিহাসের বিচারে মুকুটের মূল্য যতই থাকুক, মানুষের কর্মের মূল্য তার চেয়ে কম নয়। বরং অনেক সময় মুকুট হারিয়ে যাওয়ার পরই মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়।গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবন সেই কথাই বলে।

বৈকুণ্ঠপুর রাজবংশের ইতিহাস হয়তো প্রাসাদ, সম্পত্তি, রাজনীতি ও ঐতিহ্যের নানা অধ্যায়ে লেখা থাকবে। কিন্তু সেই ইতিহাসের এক মানবিক অধ্যায় রয়ে যাবে এমন একজন মানুষের জীবনে, যিনি রাজপুত্র হয়েও রাজকীয় সুবিধার উপর নির্ভর করেননি; বরং দেশসেবার কঠিন পথে হেঁটে নিজের ভাগ্য নিজেই লিখেছেন।

আজ বয়সের ভারে অতীতের দিকে ফিরে তাকালে তাঁর চোখে হয়তো ভেসে ওঠে বাতাসিয়ার সেই বাড়ি, বাবার হাত ধরে টয় ট্রেন দেখতে যাওয়া, নতুন সাইকেলের আনন্দ, রামকৃষ্ণ মিশনের দিনগুলি, বিমানবাহিনীর ভোরবেলার অনুশীলন, বক্সিং রিংয়ের উত্তেজনা, যুদ্ধের সতর্কতা, গিটারের সুর, ল্যান্ড রোভারের পাহাড়ি পথ আর একসময়ের রাজপ্রাসাদ।

কিন্তু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটাই—
উত্তরাধিকার মানুষকে পরিচয় দিতে পারে, কিন্তু সংগ্রামই মানুষকে মর্যাদা দেয়।
ইতিহাস কখনও কখনও নির্মম হয়। কিন্তু ইতিহাসের কাজ শুধু বঞ্চনার হিসাব রাখা নয়; বিস্মৃত মানুষের কর্ম ও সাহসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা।
গৌরীশঙ্কর দেব রায়কতের জীবন তাই শুধু এক রাজপরিবারের হারিয়ে যাওয়া অধ্যায় নয়। এটি এক মানুষের আত্মনির্মাণের গল্প—এক মুকুটহীন রাজকুমারের অজানা, অথচ অসাধারণ জীবনকথা।


** তথ্য সংগ্রহ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
উমেশ শর্মা, লেখক ও গবেষক ,জলপাইগুড়ি
পৃথ্বীশ দেব , রায়কত পাড়া,জলপাইগুড়ি
গৌরী শংকর দেব রায়কত, শিলিগুড়ি
প্রদীপ গোলে, বাতাসিয়া, দার্জিলিং


 

মৃত্যুভাবনায়—রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ

সুমনা গুহনিয়োগী


"জন্ম-মৃত্যু দোঁহে মিলে জীবনের খেলা /যেমন চলার অঙ্গ পা-তোলা পা-ফেলা।।"-‐রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

সীমাহীন কালের মধ্যে চৈতন্যময় সংক্ষিপ্ত পর্যায়টির নাম জীবন, অথচ এই জীবনের নেপথ্যে রয়েছে মৃত্যুর অনিবার্যতা। তাই জন্মের সঙ্গে মৃত্যুকেও স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে হয়। পা তোলা এবং পা ফেলার মধ্যে যেমন চলার ছন্দ তৈরী হয় , জন্ম-মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তেমনি এই পৃথিবীর চলমানতা এবং নবীনতা রক্ষিত হয়।কিন্তু জীবন-মৃত্যুর এই অবিরাম লীলাকে প্রত্যক্ষ করার ক্ষেত্রে বাংলার দুই প্রতিভাধর কবি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কবি
জীবনানন্দ দাশের দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্য লক্ষ্যণীয়। এখন সে বিষয়ে কিছু আলোকপাত করার যৎসামান্য চেষ্টা করা হল -‐--
"কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়? জয় অজানার জয়!"
---জীবন-মৃত্যুর নিয়ত খেলাকে কবি রবীন্দ্রনাথ এভাবেই প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি মৃত্যুর কপালে জয়টীকা এঁকে জীবন-নদে সাঁতার কাটতে চান। তিনি মনে করতেন, আদি-অন্ত, সৃষ্টি-প্রলয়ের মত জন্ম-মৃত্যুর মধ্যেও রয়েছে এক অচ্ছেদ্য বন্ধন। মৃত্যুর সাথে তাঁর নিবিড় সখ্যতা গড়ে উঠেছিল-- "মরণরে তুঁহু মম শ্যাম সমান।" আবার 'শেষ সপ্তকে' উনচল্লিশ নম্বর কবিতায় তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় --
"মৃত্যু যে আমার অন্তরঙ্গ, /জড়িয়ে আছে আমার দেহের সকল তন্তু /তার ছন্দ আমার হৃদস্পন্দনে,/ আমার রক্তে তার আনন্দের প্রবাহ।"
মৃত্যু ছিল তাঁর হাতের ক্রীড়নক। মৃত্যুর কাছে তিনি নতিস্বীকার করেননি। তাঁর অঙ্গুলিহেলনেই যেন মৃত্যুর ওঠাবসা। তাঁর মনোভাব ব্যক্ত হয় এইরূপে --
"আমি মৃত্যু রাখাল /সৃষ্টিকে চরিয়ে চরিয়ে নিয়ে চলেছি /যুগ হতে যুগান্তরে /নব নব চারণক্ষেত্রে।"
সাধারণ মানুষ মৃত্যুশোকে অধীর হয়ে পড়েন। কিন্তু, তিনি তো সাধারণ নন। প্রিয়জনকে কেড়ে নিতে মৃত্যু বারবার এসেছে তাঁর শিয়রে। মৃত্যুর সেই প্রবল ঝটিকার দিনেও তিনি ছিলেন পর্বতের মত নিষ্কম্প, শোকে হননি মূহ্যমান। কারণ পন্ডিত বা আত্মজ্ঞ ব্যক্তি কারও জন্য শোক করেন না ---'নানুশোচন্তি পন্ডিতাঃ' (গীতা ২/১১)। অথচ ইন্দ্রিয়াসক্ত ভোগলিপ্সু মানুষের মনোজগতে সর্বদা মৃত্যুভয় বিরাজমান। তারা ভাবে কখন বা তাদের জীবনে নিভৃত পদসঞ্চারে ঘটবে মৃত্যুর প্রবেশ। কিন্তু সে ভয়ে কম্পিত হয়নি কবির হৃদয়। তিনি তো জিতেন্দ্রিয় পুরুষ। তাই তো অবলীলায় তিনি বলে ওঠেন--
"তাই এ ধরারে
জীবন-উৎসব শেষে দুই পায়ে ঠেলে 'মৃৎ-পাত্রের' মতো যাও ফেলে।" ----রসিক মানুষের কাছে 'প্রেম' ও 'মৃত্যু' একই মুদ্রার দুটো দিক। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন যথার্থ রসিক।তাই তাঁর চেতনায় 'প্রেম' ও 'মৃত্যু' 
   একাকার হয়ে গিয়েছে। তিনি স্বয়ং বলেছেন--
"প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস /তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ।"
বলতে দ্বিধা নেই, মৃত্যুকে এখানে অনেক লঘু করে দেখা হয়েছে।
কবি জানতেন, দেহ যখন কর্মফল ভোগের জন্য এই নশ্বর জগতে এসেছে, তখন তার বিনাশ হবেই। কেউ তাকে রোধ করতে পারবে না, কারণ "জাতস্য হি ধ্রুবো মৃত্যুঃ।"
"জন্মিলে মরিতে হবে/ অমর কে কোথা কবে/ চিরস্থির কবে নীর হায়রে জীবন নদে?" --মাইকেল মধুসূদনের এই ভাবনা কবিগুরুর মনোজগতেও ঠাঁই পেয়েছে। তাঁর কথায়---
"আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে /তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে।" কিন্তু আবার পরক্ষণেই তাঁর কণ্ঠে যখন শুনতে পাই--
"মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই,"-- তখন যেন আমরা পাঠকসমাজ কিছুটা বিভ্রান্ত হই। কিন্তু তা নয়, দুটো বক্তব্যকে আপাতবিরোধী মনে হলেও এর মধ্যে কোন বিরোধ নেই। আসলে কবির মতে, যশ বা কীর্তির মাধ্যমে মানুষ তার পাঞ্চভৌতিক দেহের বিনাশের পরেও সকলের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেয়।মহৎ কর্মের মধ্যেই তার বেঁচে থাকার সার্থকতা। শাস্ত্রেও বলা হয়েছে- "শরীরং ক্ষণবিধ্বংসী কল্পান্তস্থায়িনো গুণাঃ।"-- কবির অভিমত এই যে, মৃত্যু মানে মানুষের জীবনের চলার শেষ আর তার কীর্তির চলা শুরু।
  তিনি বলেছেন--
"আমিও রেখে যাব কয়েক মুষ্ঠি ধূলি, আমার সমস্ত সুখদুঃখের শেষ পরিণাম।"
ঔপনিষদিক ভাবনায় কবিমন ছিল আচ্ছন্ন। তাই তো, উপনিষদের মর্মবাণী তাঁর সাহিত্যসাধনায় বারে বারে বিচিত্রভাবে এসেছে। তিনি বলেন, মৃত্যুর পর আত্মা দেহ থেকে মুক্তি পেয়ে শূণ্য অসীম আকাশে বিলীন হয়। তিনি মৃত্যুকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন--
"সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর /আমার মাঝে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর।"
ঔপনিষদিক ভাবনা কবিকে মানবচেতনা থেকে দিব্য চেতনায়, কবিত্ব থেকে ঋষিত্বের মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছে। ঋষি কবি তাঁর 'নৈবেদ্য' কাব্যের একাংশে বলেছেন--
" শোন অমৃতের পুত্র যত দেবগণ দিব্যধামবাসী, আমি জেনেছি তাঁহাদের,/মহান্তপুরুষ যিনি আঁধারের পারে জ্যোতির্ময়/ তাহারে জেনে, তাহার পানে চাহি/ মৃত্যুরে লঙ্ঘিতে পার, অন্যপথ নাহি।"           

রবীন্দ্রোত্তর যুগের অলোকসামান্য প্রতিভাধর কবি জীবনানন্দের কবিতা বহুমুখী ভাবের ও চেতনার জগৎ। সেখানে,প্রকৃতিপ্রেম -ইতিহাস- মৃত্যুচেতনা পরস্পর সম্পৃক্ত। বলা হয়ে থাকে, "জীবনানন্দ দাশ সেই বিশাল প্রতিভা-- প্রকৃতি যাঁর প্রাণ, স্বদেশ যাঁর অস্তিত্ব, সমাজ যাঁর এষণা, প্রেম যাঁর সত্তা, ইতিহাস যাঁর অন্বিষ্ট, ঐতিহ্য যাঁর চিন্তা, মৃত্যু যাঁর মনন, সময় যাঁর প্রজ্ঞা আর অবচেতনা যাঁর অভিজ্ঞান।
রবীন্দ্রনাথের মত মৃত্যুভয়কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব ছিলনা জীবনানন্দের পক্ষে।
জীবনানন্দের কাব্যে মৃত্যু জীবনের দোসররূপে প্রতিভাত হয়নি। বিরহ বা বিচ্ছেদকে তিনি রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখেননি। তিনি জানেন, বিচ্ছেদ পূর্ণতা দেয় না, তাই তাঁর কাছে বিচ্ছেদের অর্থ অনন্ত শূণ্যতা। সাধারণ মানুষের মতো কবি জীবনানন্দ জানেন, মৃত্যু শারীরিক জীবনের ছেদরেখা, পরিচিত জগতের সমাপ্তি, অনুভূতিগুলির বিনাশ ছাড়া আর কিছু নয়-- "বাসাংসি জীর্ণানি যথা
বিহায় নবানি গৃহ্নাতি
নরোহপরাণি।।"
--জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নববস্ত্র পরিধানের গীতোক্ত ব্যাখ্যায় তাঁর মন সাড়া দেয়নি। তাই মৃত্যুকে সানন্দে বরণ করার কথা কখনোই তাঁর মনে জাগে না। বরং একধরণের বিষন্নতা জীবনধারণের পক্ষেও যেমন সত্য ছিল তাঁর কাছে, তেমনই জীবনত্যাগের ক্ষেত্রেও ছিল ততখানি সত্য।
জীবনানন্দ জানতেন, মৃত্যু অনিবার্য, মৃত্যু অমোঘ। 
 আজকের তারায় ভরা সুন্দর আকাশ অদূর ভবিষ্যতে মৃত্যুর হিমশীলতায় বিলীন হবে না একথা কেউ বলতে পারে না।
"যে ইঙ্গিতে নক্ষত্রও ঝরে, আকাশের নীলাভ নরম বুক ছেড়ে দিয়ে হিমের ভিতরে
ডুবে যায়.........."।
স্নেহময়ী সুধাময়ী বঙ্গজননীর একান্ত অনুরক্ত কবি জীবনানন্দ। শ্যামল সুন্দর বঙ্গভূমির সাথে কবির নাড়ীর যোগ অথচ কবি জানেন, প্রকৃতির নিয়মে একদিন মৃত্যু আসবেই। নিশ্চিহ্ন করে দেবে জীবনের অনুরাগরঞ্জিত কামনাগুলি। ছিঁড়ে ফেলবে জাগতিক মায়ার বন্ধন---
"তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার
সন্তান।
বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে।"
-- কারণ এই সত্য। আবার অন্যত্র তিনি বলেছেন--
"আমরা মৃত্যুর আগে কি বুঝিতে চাই আর?
জানিনা কি আহা,
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দেওয়ালের মতো
এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ।"
--মৃত্যু আগাম জানান নিয়ে আসে না। 
 কবি লিখেছেন, ---"কখন মরণ আসে কে বা জানে।"-- আকস্মিক ঝড় এসে যেমন পদ্মবনের সৌন্দর্য বিনষ্ট করে, তেমনই মৃত্যুও কখন আসবে তা অজ্ঞাত।---
"......... কালীদহে কখন যে ঝড়
কমলের নাল ভাঙে......।"
মৃত্যু শিকারী ইঁদুরের মত ওৎ পেতে থাকে তার অন্ধকার কক্ষে জীবনকে ভরে নেবে বলে ‐--"আমারে কুড়ায়ে নেবে মেঠো ইঁদুরের মত মরণের ঘরে।"
মৃত্যুভয় যেন কবিকে সর্বদা তাড়া করে বেড়াত।
কবি মনে করেন, জগতে শুধু চলিষ্ণু জীবনের জয়-জয়কার। মৃতেরা সব বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। '১৯৪৬-৪৭' এ তিনি লিখেছেন -‐-
"নীল হয়ে গেলে তারা তখন তো মৃত / মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না, কখনো।/
মৃতেরা কোথাও নেই, আছে"?
কিংবা 'অন্ধকার'-এ আমরা পাই 'ধানসিঁড়ি নদীর কিনারে আমি শুয়েছিলাম--
পউষের রাতে
কোনদিন জাগব না জেনে--
কোনদিন জাগব না আমি-- কোনদিন জাগব না আর।"---
মৃত্যুকে ঘিরে এক গভীর বিষন্নতাবোধ তাঁকে
সর্বদা কীটের মত দংশন করত। সেই বিষন্নতার সুর তাঁর মৃত্যু ভাবনাকে মেদুর করে তুলেছে। তিনি ভালোমত জানতেন, তিনি পৃথিবীতে না থাকলেও কোন কিছুই কিন্তু থেমে থাকবে না।
---"আমি চলে যাব বলে
চালতাফুল কি আর ভিজিবে না শিশিরের জলে
নরম গন্ধের ঢেউয়ে?
লক্ষ্মী প্যাঁচা গান গাবে নাকি তার লক্ষ্মীটির তরে?"
কবি এই ভেবে আশ্বস্ত ছিলেন যে, মহাকালের ভ্রুকুটিতে সবকিছু তছনছ হয়ে গেলেও সৌন্দর্য কিন্তু অটুট থাকবে। মানুষের মনোলোকেই সৌন্দর্যের চিরপ্রতিষ্ঠা। এই সৌন্দর্যের বিলয় নেই, ধ্বংস নেই--
"সময় মুছিয়া ফেলে সব এসে
সময়ের হাত
সৌন্দর্যকে করে না আঘাত।"
সারাজীবন কি যে কবির আকাঙ্খিত ছিল,
কী যে তিনি পাননি, তা নিজেও বোধহয় ভালো করে
বোঝেন নি। তাঁর নাবিক হৃদয়ে এক বন্দর থেকে আর এক বন্দরে শুধু ঘুরে মরেছে কোন্ দুর্লভ বস্তুর সন্ধানে কে জানে!-- "মৃত্যুরে ডেকেছি আমি প্রিয়ার অনেক নাম ধরে"। মৃত্যু বুঝি তাঁর বড়ই সাধনার ধন ছিল। ভাবুক কবি রোমান্টিক স্বপ্নকুহেলী রচনা করেছেন নিজ মৃত্যুকে ঘিরে। মৃত্যুর বিচ্ছেদ ভাবনা কবিকে বিষন্ন করলেও রূপসী বাংলার বুকে মৃত্যু তাঁকে অমৃতত্বের অধিকারী করবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। ---- "এ মাটির কোলে ছাড়া অন্যস্থানে নয়/ সেখানে মৃত্যুর আগে হয় না মরণ।" ---এখানেই তাঁর "মরণের ভালে জীবনের জয়টীকা"। "তবু যে মরি আমি এই মাঠঘাটের ভিতর,/ কৃষ্ণা যমুনার নয়-- যেন এই গাঙুড়ের ঢেউয়ের আঘ্রাণ/ লেগে থাকে চোখে মুখে --রূপসী বাংলা যেন / বুকের উপর জেগে থাকে।"
রূপসী বাংলার অণুতে পরমাণুতে মিশে থাকবে কবির অস্তিত্ব --এই ছিল কবির অন্তিম ইচ্ছা। রণক্লান্ত কবি জীবনানন্দ মৃত্যুর কাছে নতিস্বীকার করেছেন বলে ভুল বলা হবে।সেই মৃত্যুঞ্জয়ী পথিক "জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে"পরম বন্ধু বাংলা মায়ের সাথে মিলিত হয়ে লাভ করেছেন মৃত্যুঞ্জয়ী মহিমা।

উপরিউক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ দুজনের মৃত্যুভাবনার জগৎ ভিন্ন হলেও দুজনেই মৃত্যুর গহন অন্ধকারে ডুব দিয়ে যে মুক্তো তুলে এনেছেন, তাতে দুই কবিই পরেছেন মৃত্যুঞ্জয়ীর শিরোপা। পরিশেষে বলা যায় যে, গীতার মর্মবাণী যদি আমরা আত্মস্থ করতে পারি , তবেই পাব পূর্ণ আনন্দ। আমাদের বুঝতে হবে, মৃত্যুতে দেহের বিনাশ হয়, দেহীর তো বিনাশ হয় না। 
 আত্মা চিরন্তন। তাঁর জরা, ব্যাধি, মৃত্যু বলে কিছু নেই---
"অজো নিত্যঃ
শাশ্বতোহয়ং পুরাণো।
ন হন্যতে হন্যমানে
শরীরে।।” (গীতা ২/২০)


 

শিল্পরসিকের দায়িত্ব

লিপিকর  


কিছু মাস আগে লেখক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে - বর্ণাশ্রম সংক্রান্ত তাঁর ধারণা, অনুকূল ঠাকুরের প্রচারিত মতের প্রতি তাঁর দীর্ঘকালীন অনুরাগ, তাঁর কলম পেষার মূল পেশাগত আকর্ষণ হিসেবে অর্থাগম-সম্বন্ধিত-ভাবনা এবং পাঠকপ্রত্যাশা নিয়ে উদ্বিগ্ন না থাকা - এমন কয়েকটি বিষয়ে তাঁর বক্তব্য সমাজমাধ্যমে এক বহতা আলোচনার সূত্রপাত করেছে। অনেকেই ব্যক্তি শীর্ষেন্দু ও তাঁর বিশ্বাস সম্বন্ধে নিজনিজ হতাশা প্রকাশ করেছেন, বহু মানুষ তাঁর আগামী সৃজনগুলোর সঙ্গে তাঁর অতীতের সৃষ্টিগুলোকেও নস্যাৎ করে সেগুলো নিজেদের পাঠ্যতালিকা থেকে বের করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন, কিন্তু এরকম কোনও বক্তব্য বলতে গেলে আমার চোখে পড়েই নি, যেখানে লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের সঙ্গে কঠোরভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করেও তাঁর সৃষ্টিকে পৃথক প্রিজমে দেখার প্রচেষ্টা চালু রাখার কথা রয়েছে। এই লেখার ভাবনা সেই দায়িত্বশীল পাঠকের, তথা বৃহত্তর দৃষ্টিতে যে কোনো শিল্পরসিকের, সম্বন্ধে যারা কোনও সৃজনের শাঁসটুকু আস্বাদন করতে ইচ্ছুক, স্রষ্টার ব্যক্তিগত যাপন ও দর্শনকে যারা কোনও শিল্পীর মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি ধরে নেন না, বা সমাজমাধ্যমে সেই নিয়ে ক্ষোভান্বিত ১-২ লাইনে নিজেদের রাজনৈতিক সঠিকতার স্বাক্ষরটুকু রেখেই ক্ষান্ত হন না।

সমস্যা

সৃষ্টি ও স্রষ্টাকে একীভূত করে দেখার অভ্যেসটি শিল্পরসিকের পক্ষে একাধিক কারণে সমস্যাজনক।

প্রথমতঃ আমরা সচেতনভাবে এই নাকচ সংস্কৃতির বাইরে পদবিক্ষেপ না করলে আমাদের নিজেদের ভাঁড়ারটি অপূর্ণ থেকে যায়। রাজনৈতিক সঠিকতাকেই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে প্রয়োগ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে নাৎসি ভাবধারা সমর্থনের দায়ে তার প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে নোবেল পুরষ্কার জয়ী ন্যুট হামসুনের লেখা কালোত্তীর্ণ উপন্যাসগুলোকে বর্জন করতে হয়, একই কারণে ৩০-এর দশকে চলচ্চিত্র পরিচালিকা লেনি রিফেনস্টাহলের নির্মিত তথ্যচিত্রে অ্যাথলেটিক্স-এর গতিজাড্যকে সিনেমায় ধরার পদ্ধতিগত দক্ষতাকে উপেক্ষা করতে হয়, বা সাম্প্রতিককালে কবীর সুমনের ব্যক্তিগত যাপন বা বক্তব্য শুনলে হয়তো তাঁর ৯০-এর গান বা সেগুলোর লিরিক থেকে নিজেদের কান সরিয়ে নিতে হয়। এতে ক্ষতি সেই শিল্পীদের নয়, বা অন্যান্য শিল্পরসিকদেরও নয়, যারা ভালো শিল্পের, নির্মাণের নিরন্তর সন্ধানে থাকেন।

দ্বিতীয়তঃ আমরা আমাদের কাছে আসা তাথ্যের ভিত্তিতে শিল্পীর যে ব্যক্তি-অবয়বটি তৈরি করি, সেটা খন্ডিত তো বটেই, সময়বিশেষে আমাদের কাছে যে তথ্যগুলো কিছু নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেগুলো মিথ্যা হলে, সেই মূর্তিটি পুরোপুরি ভ্রান্তও হতে পারে। এর ফলে আমরা যাকে রাজার আসন দিলাম বা ব্যক্তিগত যাপন-সংক্রান্ত আক্রোশে যার সৃষ্টিকে অবজ্ঞা করলাম, তাঁর, প্রকৃত স্থান বা অবস্থান, সেটা নাও হতে পারে। এই ভুল মূল্যায়নের ক্ষতি রসিকের তো বটেই, তবে শিল্পী, বিশেষতঃ যদি তিনি তখনও জীবিত ও সৃজনশীল হন, তাহলে তাঁর কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। আমরা কী করে এত সহজে আজ ‘এক ডক্টর কী মওত’ বা ‘গণশত্রু’র অতিদ্রুত সার্বজনীন মূল্যায়নের ভুল হওয়ার ঝুকি সংক্রান্ত শিক্ষাটি ভুলে যাচ্ছি?

তৃতীয়তঃ পরিচয়-ভিত্তিক রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ করে, স্রষ্টাদের অধিকাংশ ‘প্রিভিলেজ’ তাঁরা সচেতনে চয়ন করেন না, পিতামাতা ও জন্মসূত্রে পান, এবং সেই প্রিভিলেজগুলোই তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি নিরূপিত, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট গতিপথে সংকীর্ণায়িত করে। একইভাবে, শিল্পীর ভাবনা বহুক্ষেত্রেই তাঁর সমকালের প্রচলিত সামাজিক ধ্যান ধারণার অনুগমন করে। এর ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, আমরা লেখিকা মহাশ্বেতা দেবীর সাহিত্যের বিষয়বস্তুর কথা এবিষয়ে স্মরণ করতে পারি, বা রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ ভাবনায় আধুনিক সাস্টেনেবিলিটি-র মূল অন্বেষণ করা যেতেই পারে, কিন্তু সেগুলো তাঁদের অসাধারণত্ব, প্রত্যেক শিল্পী-লেখকের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে প্রত্যাশা করার জিনিশ নয়। শিল্প যেহেতু প্রায় সবসময়েই পারিপার্শ্বিক-সচেতন, সমকালের দ্বারা প্রভাবিত, অবশ্যম্ভাবীভাবেই তাতে শিল্পীর ব্যক্তিগত বায়াস্টুকুর ছাপ থেকেই যায়। তারপরেও যদি কোনো শিল্প হৃদয়গ্রাহিতায়, মাধ্যমের নিজস্ব ব্যাকরণ-অনুসরণ ও ব্যাকরণ-অতিক্রমতায়, ভাবনার প্রকাশভঙ্গিমায় কালোত্তীর্ণ হয়েই ওঠে, তাহলে তার যে দিকগুলো সমালোচনাযোগ্য, চিন্তাধারার যে অংশটি অনাধুনিক, সেই খন্ডাংশটুকুর সম্বন্ধে বিরূপ বক্তব্য পেশ করেও শিল্প বা সাহিত্যটিকে সামগ্রিকভাবে উপভোগ করাটাই বাঞ্ছনীয় বলে মনে হয়।

সবশেষে, আমরা যদি শুধুমাত্র আমাদের পছন্দের মতাদর্শের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ শিল্পটুকুই বারংবার গলাধঃকরণ করতে থাকি, যদি আমরা আমাদের নিজস্ব খোপের বাইরে না বেরোই, ঘোষিতভাবে অন্য অক্ষের এবং বিরোধীপক্ষের সৃজনভাবনাকে গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকি, তাহলেও সাহিত্যপ্রেমী বা শিল্পরসিক হিসেবে আমাদের ভূমিকাটি নিঃসন্দেহেই সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। সাহিত্য ও শিল্পমাধ্যমের অন্যতম উপযোগিতা যে মতবিনিময়ের একটা দরজা খুলে দেওয়া, আদানপ্রদানের মাধ্যমে আমাদের সবারই মননকে ঋদ্ধ করা, ক্ষেত্রবিশেষে অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের যাপনে ও বিশ্বাসে সম্পূর্ণ আত্তীকরণ না করেও তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার যে শক্তিটাকে পাওয়া, যেটা বিশেষ করে বিভিন্ন পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির আন্দোলনে আবশ্যক, তার চর্চাটুকুকে বারবার রুদ্ধ করে দিয়ে আমরা নিজেদেরই চারিদিকে একটা গোড়ামির পাচিল তুলি, ফলে অনেকক্ষেত্রেই ঠিক জিনিসটি সম্বন্ধে ঠিক তথটি ঠিক সময়ে আমাদের গোচরে আসে না।ফলতঃ শিল্পের সামাজিক উত্তরণের ক্ষমতাটিকে আমরা দায়িত্ব নিয়ে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিই।

কিছু সাধারণ করণীয়

তাহলে একজন প্রকৃত শিল্পানুরাগীর কোন পথ অবলম্বর করা ভালো? এর স্থির, সর্বজনগ্রাহ্য উত্তর দেওয়া অসম্ভব, তবে কয়েকটা বিষয় সাধারণভাবে মনে রাখতে পারলে ভালো হয়।

(ক) সমাজমাধ্যম আমাদের মত সাধারণ শিল্পপিপাসুদের সঙ্গে জীবিত, সংযোগেপ্সু স্রষ্টাদের যোগাযোগ দারুণভাবে সহজ করে দিয়েছে। আর যেহেতু কোনোকিছু সুলভ হলেই তার অপব্যবহার হওয়া দস্তুর হয়ে পড়ে, তাই আমরাও অনেকসময়েই আচরণ ও কথোপকথনে ঢুকে পড়ি তাঁদের ব্যক্তিগত পরিসরে, এবং অবাঞ্ছিত সেই অনুপ্রবেশ যে শুধু  কিছু মানুষের প্রাত্যহিক শান্তি ও কাজকর্ম ব্যাহত করে (মনে পড়ছে, একটা সময়ে নবনীতা দেবসেন-এর মত আলাপী, সদা তারুণ্যস্পর্শ-উৎসাহী মানুষ-ও সমাজমাধ্যমের আলাপে এই ভালবাসার অত্যাচারের রাশ টানতে বাধ্য হয়েছিলেন) তাই নয়, কোনও কোনও ক্ষেত্রে স্রষ্টা ও শিল্পভোক্তা’র দীর্ঘমেয়াদি যে মতবিনিময়টি বাঞ্ছিত তাকেও ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে, খেজুরে অনর্থক কথার বন্যায়। স্রষ্টা-ভোক্তা সংযোগ যদি সমাজমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটে থাকে ও সেখানেই সীমিত থাকে, তাহলে আলাপের বিষয়বস্তু চয়নেও আমাদের একটা স্বনির্ধারিত সীমানা মান্য করে চলা উচিৎ। যদি প্রাথমিক আলাপ শিল্পীর একটি বা কয়েকটি নির্মাণ নিয়েই হয়ে থাকে, আলোচনাটিকে, অন্ততঃ রসপিপাসুর দিক থেকে, সেই বিষয়েই কেন্দ্রীভূত রাখাটা সময়ের অনর্থক অপচয়ের হাত থেকে উভয়কে রক্ষা করতে পারে।

(খ) উপভোগ করার জন্য শিল্পচয়নের (কোন গান শুনব, কার লেখা পড়ব, কোন অভিনেত্রী বা পরিচালকের উপস্থিতির জন্য একটা সিনেমা বা নাটক দেখব) প্রক্রিয়ায় শিল্পীদের আগের ভালোলাগা কাজগুলো নিশ্চয়ই স্মরণে রাখা উচিৎ, কিন্তু প্রতি নতুন শিল্পসৃষ্টি - একবার দেখতে / পড়তে / শুনতে শুরু করলে, বা তার মূল্যায়ণ করতে গিয়ে স্রষ্টার অতীতগৌরব থেকে দূরে সরে, নির্মোহভাবে শুধুমাত্র সাম্প্রতিক কাজটুকুর সম্বন্ধেই কোনটা কী কারণে পছন্দ আর কীইবা কেন ভালো লাগে নি ধারণা করার নৈর্ব্যক্তিকতাটুকু অর্জন করাটা - শিল্পরসিক হিসেবেই, সমালোচক হয়ে ওঠার যোগ্যতা অর্জনপ্রচেষ্টা বাদ দিলেও - আমাদের কর্তব্য। ভাবনার অনুশীলন ও প্রকাশভঙ্গিমার শীলন চর্চা একারণে খুব জরুরী। এটা না করতে পারলে কোথাও একটা আমরা শিল্পীদেরও প্রকৃত অনুপ্রেরণা দিতে দীর্ঘমেয়াদে অনুপযুক্ত হয়ে থাকব।

(গ) সমকালের সমাজমাধ্যমের এই ঘোরতর গম্যতায়, যেখানে খ্যাতিমান হলেই একজন মানুষ তাঁর সমস্ত ভাবনা ও বচন নিয়ে নিরাবরণ হয়ে পড়েন, আমরা প্রায়শঃই রসিক বা ভক্ত হিসেবে বড় নির্মম আচরণ করি। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ব্যক্তিগত জীবনের ওঠা-পড়ার সঙ্গে সাজুয্য রেখে একজন শিল্পীর মতবাদের বিবর্তন, বা ক্ষেত্রবিশেষে সম্পূর্ণ দিকপরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু আমরা যদি আমাদের নিজেদের মতবাদের সঙ্গে খাপে-খাপ কথা এককালে বলতেন বা ভাবতেন বলেই “প্রিয়কে দেবতা”য় উন্নীত করার প্রয়াসে বারংবার রত হই, তাহলে পরবর্তীকালে সেই ঐশ্বরিকীকরণের সিংহভাগ দায় সেই বাস্তববাদরহিত ভক্তকূলের ওপরেই বর্তায়, জীবন বা রাজনৈতিক দর্শন পাল্টানোর জন্যে তখন সেই মানুষটিকে গালাগালি দিয়ে নিজেদের শ্লাঘা বাড়ানো কোন সৃজনশীল বা গঠনমূলক প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে না।  ওপরে যে শিল্পী ও তাঁর প্রতিটি নতুন শিল্পকে পৃথক করে দেখার চর্চার কথা বলেছি, তার সচেতন প্রয়োগ এক্ষেত্রেও সদর্থক হবে।

(ঘ) এরই বিপ্রতীপে, ব্যক্তিগত চিন্তাধারা, আচরণ, এবং বিশেষতঃ রাজনৈতিক ভাবধারার প্রেক্ষিতে বিপরীত মেরুর মানুষ হলেই তাঁর সৃজনের সামগ্রিকতাকে নস্যাৎ করে দেওয়াটাও আমাদের সচেতন অভ্যাসে পরিহার করতে শেখা প্রয়োজন। বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের প্রত্যেকের নিজস্ব বিশ্বাস, ভাবনা, যাপিত দর্শণগুলোর পেছনে হয় সেই যৌক্তিক আত্মবিশ্বাস থাকা উচিৎ, যা বিরুদ্ধ বিবরণীর ঝড়েও আমাদের নিজের বিশ্বাসে নোঙর করে থাকতে দেবে, অথবা যে বিষয়গুলোতে আমদের জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা কম, সেগুলো সম্বন্ধে অন্যদের মত - তা সে যতই ভিন্ন হোক না কেন, অন্ততঃ মনোযোগ দিয়ে শুনব, পড়ব, দেখব, এবং মধ্যমেয়াদে সেই ভাবনাগুলোর মুকুরে নিজেকে ঋদ্ধ করব - এই মনোভাব নিয়ে চলা উচিৎ। শিল্পরস আস্বাদনের সময়ে ব্যক্তিগত বোধ নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার জন্যে ভিন্নভাবনাকে রুদ্ধ করে যাতে না ফেলি, সেটা কিন্তু আমাদের নিরন্তর খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সেই সচেতনতা ও বিবর্তনই রসিক-সমালোচক হিসেবে আমাদের প্রগতির মাইলফলক হয়ে উঠবে।

(ঙ) আর নিজেদের শিল্পরসিক বা উপভোক্তা হিসেবে আরো পরিণত, ধারালো করে তুলতে আরো একটা বিষয়ে আমাদের পরিশ্রম করতে হবে। প্রতিটি শিল্পমাধ্যম ও তাদের উপশাখাগুলোর, বিশেষ করে সারা বিশ্বে যেগুলো ধ্রুপদী আঙ্গিকের শিল্প বলে পরিগণিত হয়, সেগুলোর নির্দিষ্ট কিছু পরিভাষা আছে, অনেক প্রাথমিক সংজ্ঞা আছে, আমাদের ভালোলাগার মাধ্যমগুলোর ক্ষেত্রে অন্ততঃ নিজের গরজেই সেই পারিভাষিক অভিধানের সঙ্গে প্রারম্ভিক পরিচয়টুকু করে নেওয়া প্রয়োজন। কোন লেখা সম্বন্ধে যখনই একশব্দের ‘অপূর্ব বিশেষণটির মাত্রাছাড়া উপযোগ সমাজমাধ্যমে দেখতে পাই, আমার মনে হয়, কুম্ভীলকবৃত্তি অবলম্বন না করা সব লেখাই তো আক্ষরিকভাবে অ-পূর্ব, সেটা আলাদা করে উল্লেখ করে আমরা পাঠক হিসেবে কী মূল্য যোগ করছি?

এই বিষয় ও সীমারেখাগুলো খেয়াল রাখলেই শিল্পস্রষ্টা ও শিল্পরসিকের সম্পর্কের, পারস্পরিক মতবিনিময়ের, ও ব্যক্তিগত প্রত্যশানিয়ন্ত্রণের সবকটি আঙ্গিক যে সম্পূর্ণ সমস্যামুক্ত হয়ে যাবে, তা নয়, কিন্তু সামগ্রিকভাবে দু’পক্ষের অপরকে বোঝা ও শ্রদ্ধা করার ও অর্থপূর্ণ সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের পরিসরটুকু বাড়বে, সেই আশাটুকু এখনও করাই যেতে পারে। 


 

শরতের ক্যানভাস 

  অভিজিৎ সেন 

বঙ্গ প্রকৃতির ছয় ঋতু বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চের সুনিপুণ অভিনেতা। শরতের অভিনয় বাঙালির মনে-প্রাণে-চেতনায় দাগ কেটে চলেছে আবহমান কাল খন্ড ধরে। বর্ষা মুখর সান্ধ্য যাপনের অন্তিমে ধীর লয়ে নেমে আসে কাশ-স্নিগ্ধ-শুভ্রতায় ঢাকা মোলায়েম মখমলি দোলায় শরতের প্রকৃতি,আন্দোলিত হয় আনন্দে,কলরবে। খন্ড খন্ড মেঘপুঞ্জ অনাবিল গগন মণ্ডল জুড়ে উড়ে চলে যায় কোনো অজানায়, নিরুদ্দেশের কূলে---ঘন গভীর নীলাকাশ মায়াবী শামিয়ানা উড়িয়ে রেখেছে যেন আসন্ন শারদ মঞ্চের অভিনয়ের জন্যে। ভাদ্র ও আশ্বিন,বাংলা বর্ষপঞ্জির পঞ্চম ও ষষ্ঠ মাস, স্ব স্ব বেশ পরিধান করে নেমেছে বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে। প্রাচীন সংস্কৃত পঞ্জিকা ও পৌরাণিক সাহিত্যে ভাদ্র 'নভস্য' ও ভাদ্রের নক্ষত্র ভিত্তিক পৌরাণিক রুপ 'প্রৌষ্ঠপদ' নামে পরিচিত । বৈদিক সাহিত্যে আশ্বিনের সমার্থক শব্দ 'ইষ'। শরতের আগমনের প্রতীকী বার্তা আশ্বিন মাস। শ্রাবণের অঝোর ধারা শেষে বঙ্গ প্রকৃতির বুকে নেমে আসে গভীর প্রশান্তি। মেঘ ভেসে যায়। কাশফুলে ভরে ওঠে নদীকূল । উঠোনে ছড়িয়ে থাকে শিউলি ফুল। রাতে ধীর লয়ে বয়ে যায় হিমেল বাতাস। ভোরে সোনা ঝরা রোদ । দূর্বা ঘাসের মাথায় জমে থাকে জলবিন্দুর কণা, অগণিত হীরক কণার মতো! এই দুই মাস জুড়ে বাংলা প্রকৃতির বুকে যে রূপের রাশি সঞ্চিত হয়,প্রকৃতই,বঙ্গ প্রকৃতি হয়ে ওঠে 'রূপসী বাংলা'র মতন--কবি জীবনানন্দ দাশ বলে ওঠেন 'এখানে আকাশ নীল--নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল/ফুটে থাকে হিম শাদা-রং তার আশ্বিনের আলোর মতন' আমাদের মুখোমুখি বসিয়ে দেয় কাব্য পংক্তিগুলো শরতের এক মায়াবী শান্ত অনুভূতির আবহের কুসুম-কমল দোলায়।

                  শরতের অলৌকিক চিত্রপট সেজে ওঠে যেন দক্ষ কোন শিল্পীর তুলিতে, নতুন করে সেজে ওঠে বঙ্গ প্রকৃতি তার অলোকসামান্য কুশীলবদের নিয়ে । এরই মাঝে শোনা যায় বাংলার আগমনীর সুর। বেজে ওঠে দুর্গাপূজার সম্মোহনী ঢাকের শব্দ। ভোরের শিশির সিক্ত দূর্বা ঘাসের স্পন্দনে ভেসে আসে মায়ের চলার নুপুর নিক্কন। কোকনদের অপরূপ মায়ায় ভেসে ওঠে মায়ের মুখের প্রতিকৃতি। কাশফুলের দোলা,গভীর নীল দিগন্তের হাতছানি, টুকরো টুকরো মেঘেদের ভেসে যাওয়া,মেঘ-রোদের খেলা,সবুজের ঐক্যতান,দেশি ও পরিযায়ী পাখিদের বার্তা শরতের বিস্তীর্ণ ক্যানভাসে যে চিত্র অঙ্কন করে তা আবহমান বাঙালির জীবন শৈলির চিত্র,বঙ্গ ভূপ্রকৃতির অখন্ড চিত্র । শরতের প্রথম সৌন্দর্য দৃশ্যমান হয় অসীম অনন্ত পরিচ্ছন্ন নীল আকাশে। নীল আকাশ জুড়ে শুভ্র মেঘমালাপুঞ্জ ছোট ছোট পানসি নৌকা বা ডিঙ্গির মতোই যেন ভেসে বেড়ায়। 'পদ্মানদীর মাঝি'তে বর্ষার মৌসুমে যেমন ভেসে বেড়ায় মাঝিদের নৌকো। আলো জ্বেলে থাকা নৌকো গুলো দূর থেকে প্রদীপের মতো মনে হয়। তখন যে ইলিশ মাছ ধরার মরসুম মাঝিদের কালক্ষয় করে আলস্য যাপন চলে না ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তেমনি নরম তুলোর মতো সাদা সাদা মেঘের ভেলা নীল আকাশ জুড়ে চলেছে ভেসে। তাদের মাঝে কোন চঞ্চলতা নেই। আছে শান্ত ধীর লয়। আসন্ন শারদীয়া দুর্গোৎসবের আগমনের বার্তা দিয়ে চলেছে এই মেঘমালা। বঙ্গবাসী বঙ্গ প্রকৃতির রঙ্গমঞ্চে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত বিস্ময় বিহ্বল চোখে,আবেশের আবর্তে ঘুর্ণিত হতে হতে শরতের নাট্য দৃশ্য গুলিকে এগিয়ে যেতে দেখে। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যের মাঝে ভেসে যায়, অন্তলীন হয়ে যায়। প্রতিটি দৃশ্য এক একটি গভীর আবেগের আবর্তে মনকে ঘুরিয়ে চলে। মেঘ ও রোদের অমল খেলা দেখে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেন, 'আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরি খেলা রে ভাই আজ লুকোচুরি খেলা।/নীল আকাশে কে ভাসালো সাদা মেঘের ভেলারে ভাই--লুকোচুরি খেলা' অথবা 'আজি অমল আকাশে নির্মল বাতাসে' অথবা 'শেফালী বনের মনে কি গুঞ্জন উপজিল' । শিউলি ফুল, রৌদ্রছায়া আর নীলাকাশ বাঙালির আবেগের,আকাঙ্ক্ষার ও অপেক্ষার এক একটি প্রতীক হয়ে বঙ্গ রঙ্গমঞ্চে নিপুণ অভিনেতার মতোই নিজেদের উপস্থাপন করে চলে। বাঙালি আনন্দে,আবেগে শরতের অভিনেতার সঙ্গে সমপ্রাণতা অনুভব করে ভেসে যায় শুভ্র দলবদ্ধ মেঘ রূপ, বলাকার মতো। পথঘাট,নদী,পুকুর ধান ক্ষেত সর্বদাই মনোহরনকারী রূপ ধারণ করে। বঙ্গদেশের ভূলোক থেকে দ্যুলোক সর্বত্রই পরিলক্ষিত হয় বৈচিত্র্যের সমন্বয়ে অন্বিত একই দৃশ্য । সমগ্র বঙ্গ দৃশ্য যেন ধরা পড়ে একটি দৃশ্যের মাঝে। বরাভয় বিদ্যুতের প্রহার,ঘন কুটিল বর্ষার সর্বগ্রাশি রূপ,কর্দমাক্ত পথপ্রান্তর,নদীর দুকূল প্লাবিত বন্যার তান্ডব বঙ্গ প্রকৃতির বুকে তখন অদৃশ্য হয়ে যায়--প্রকৃতি তাদের কোথায় কোন গুহার গহ্বরে বন্দী করে রাখে কে জানে ? বঙ্গ প্রকৃতি জুড়ে এখন শুধু শান্ত কোমল মোলায়েম আলো-ছায়ার খেলা চলে । মাঠে মাঠে সবুজ ধানের প্রাণ- চঞ্চল ঢেউ বাতাসের ছোঁয়ায় তরঙ্গের মতো ভেঙে ভেঙে যায়। প্রকৃতি জুড়ে এখন কেবল সবুজের আমন্ত্রণ।খালে,বিলে,দিঘিতে ভরে থাকে পদ্ম ও শালুক। লাল ও সাদা রংয়ের পদ্ম। লাল,সাদা ও নীল শাপলার মেলা বসে। জলাশয়ের ধারে জলে ভেসে বেড়ায় কমলি লতা,তার মাথায় হালকা বেগুনি ও সাদা ফুল থাকে ফুটে।

                   ভোরের বাতাসে মিষ্টি সুবাসে ভরিয়ে রাখে শিউলি, ছাতিম ফুলের তীব্র ও গভীর ঘ্রাণ,সাদা টগর ও লাল জবার রঙের ছোঁয়া এবং কামিনী ও নাগেশ্বর এর সৌরভে শরতের বাগান হয়ে ওঠে সুরভিত। আর নদী কূলে, মাঠের প্রান্তরে ধবল কাশফুল শরতের রঙ্গমঞ্চে বঙ্গ প্রকৃতির বুকে নামিয়ে আনে সুরলোকের সৌন্দর্যকে। ভারতের কাশ্মীরকে ভূস্বর্গ বলা হয়--শরৎকালে বঙ্গ প্রকৃতিতে যেন সর্বত্র নেমে আসে এমনই স্বর্গীয় সৌন্দর্য তার সমস্ত মাধুর্য সমেত, যেদিকেই চোখ যায় না কেন !

             পিছিয়ে থাকে না দেশি ও বিদেশী পাখিদের দল। খালের শান্ত জলে,বিলের চড়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বক, মাছরাঙ্গা ছোঁ মেরে জল থেকে তুলে নেয় মাছ । দোয়েল, শালিকের কিচিরমিচির ডাকে গ্রামীণ পরিবেশকে করে তোলে প্রাণবন্ত। আমন ধানের ক্ষেতের ওপর দিয়ে উড়ে যায় দলবদ্ধ সবুজ টিয়া পরিচিত ডাক দিতে দিতে । সবুজে সবুজে মিলে মিশে হয়ে ওঠে একাকার । গাছের ডালে বসে সোনা ঝরা রোদে,ঘুঘু পাখি ক্লান্তিহীন ভাবে ডেকে যায়। আশ্বিনের শেষে অতিথি পাখির আগমন বার্তা আসে বঙ্গদেশে। হাওড়,
বাওড়,বিল ও সুন্দরবনের জলা ভাগে। সুদূর সাইবেরিয়া ও উত্তর ইউরেশিয়া থেকে আসে Northern Pintail 
ইউরেশিয়ান Wigeon ও Gadwali,Garganey নামে ছোট দ্রুতগামী হাঁস,Bar-headed Goose হিমালয় পর্বতমালার উপর দিয়ে সবচেয়ে উঁচুতে উড়ে আসা অন্যতম পরিচিত রাজহাঁস। শিকারি পাখি হিসেবে আসে উত্তর এশিয়া থেকে Spine,Ospreys এবং উজ্জ্বল নীল বুকের ছোট গায়ক পাখি বা নীলকন্ঠি (Bluethroat), কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চল থেকে আসে গাংচিল বা Gull--এরা হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পারি দিয়ে শরৎ ও শীতের শুরুতে বঙ্গ দেশে আসে জীবনধারণের জন্য। সাইবেরিয়া ও হিমালয়ের উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে যায়।। জলাশয় বরফে জমাট বাঁধে। সমস্ত প্রান্তর বরফে ঢেকে যায়। মাছ,জলজ উদ্ভিদ, পোকামাকড় এবং শস্যদানা সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই খাদ্যের তাগিদে শরতের বঙ্গদেশের অনুকূল আবহাওয়ায় ও মুক্ত জলাশয়ে অর্থাৎ নদ-নদী বাওর ও বিলে নিরাপদে এরা আশ্রয় নেয় বিশ্রাম নেয়,নতুন ছানাকে জন্ম দেয় ও তাদের বড় করে তোলে। এরপর পরিযায়ী পাখির দল ফিরে যায় নিজের দেশে বসন্তের আগমনে, তখন বরফ গলতে শুরু করে। যেমন বঙ্গবাসী মা দুর্গার জন্য অপেক্ষা করে সমস্ত বছর ধরে তিনি আসেন,আনন্দে ভাসিয়ে শেষে বেদনায় কাঁদিয়ে দশমীতে ফিরে যান কৈলাসে। বিদেশি পাখিরাও যেন অপেক্ষা করে এভাবে গোটা বছর ধরে বঙ্গ শরতের রঙ্গমঞ্চে, নিজেদের ভূমিকা পালনের জন্যে। এভাবেই শরতের রঙ্গমঞ্চ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের কুশীলবদের সম্মেলনে নানা রঙে,ঢঙে,বৈচিত্র্যে নব নব উপস্থাপনে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে নাট্যমঞ্চ।

                    সাদা সাদা কাশবনের ওপর দিয়ে সার বেঁধে উড়ে যায় সাদা বলাকার দল। অথবা মায়াবী হিমেল সন্ধ্যায় গোধূলির রাগে পশ্চিমের আকাশ শ্রান্তি মুছে তন্দ্রাচ্ছন্ন আবেশি আসর বসায়। পাখিরা ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসে নিজেদের নীড়ের উষ্ণ নিরাপত্তার বৃত্তে। শরৎকালে পক্ষীকূল বঙ্গদেশকে, তার অলোকসামান্য প্রকৃতিকে জীবন্ত ও বর্ণময় রূপ দান করে থাকে। বর্ষার মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষণের পর প্রশান্ত নীল আকাশ ও স্তব্ধ জলাভূমি দেশি-বিদেশি পাখিদের হরবোলার ঐক্যতানে প্রাণের স্পন্দনে জাগিয়ে তোলে সমগ্ৰ বঙ্গে শরতের অনাবিল প্রকৃতির দেহ অবয়বকে ।

                    বঙ্গের এই শরৎ কবি রবীন্দ্রনাথের কাছে শুধু
বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়,এর মাঝে ঘটে 'আত্মার জাগরণ'।
"শারদোৎসব" নাটকে তিনি শরতের নিষ্কলুষ প্রকৃতির মাঝে মুক্তির বার্তাকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। নাটকের ১ম দৃশ্যে বর্ষার অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘনঘটা কাটিয়ে শরতের আলোয়
শুভ্রতা ও মুক্তির আনন্দ উদযাপিত হতে দেখা যায়। এখানে রাজা,সন্ন্যাসী,বালক ও প্রজারা সামাজিক ভেদাভেদের কৃত্রিম প্রাচীর ভেদ করে একত্রিত হয়েছে শরতের
উদার, উন্মুক্ত প্রকৃতির বুকে। এই আনন্দের মাঝে সকলের মিলিত হতে কোন বাধা নেই। রাজা বিজয়াদিত্য, তাঁর রাজকীয় পোশাক ও অহংকার ত্যাগ করে সাধারণ বেশে
শরতের অমল পরিবেশে আনন্দের ভাগ নিতে বেরিয়ে পড়েছেন। সন্ন্যাসী,প্রকৃতির মাঝেই খোঁজেন "পরম সত্যকে" । বালক উপানন্দ,সে এখানে 'আনন্দের প্রতীক'--সে কঠোর পরিশ্রম করে ঋণশোধ করতে চায়--'কাজ' তার কাছে একটি উৎসব। আবার লক্ষেশ্বরের মতো অর্থলোভী চরিত্র কেবল সোনা কুঁড়াতে চায়,নিজেকে বঞ্চিত রাখে সকল আনন্দ থেকে। নাট্যকার বোঝাতে চেয়েছেন মানুষের ভেতরের সত্য ও আনন্দ প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্যের সাথেই এক সুরে বাঁধা। কবির কাছে শরৎ কেবল ঋতু পরিবর্তনের একটি কাল মাত্র নয়, বরং মানুষের মনের অন্ধকারকে দূর করে আলোর আবাহনের কাল। আত্মকেন্দ্রিকতা ও লোভের শৃংঙ্খল ভেঙে প্রকৃতি ও মানুষের মিলন মেলাই হলো শরৎকাল ।

                   পাশ্চাত্যের শরৎকাল ও বাংলার শরতের মধ্যে ভৌগোলিক পার্থক্য আছে। বাংলায় শরৎ নিয়ে আসে কাশফুল ও দেবী বন্দনার আনন্দ, ইউরোপে শরৎ হলো ফসল কাটার ঋতু। শীতের ঠিক আগের পাকা ফল ও সোনালী পাতার সময়কাল। জন কিটস "To Autumn" কবিতায় শরৎকালকে বিষাদ ঘন ঋতু হিসেবে না দেখে তাকে প্রাচুর্য ও পূর্ণতার কাল হিসেবে দেখেছেন। শরৎকে সূর্যের ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলেছেন 'Close bosom-friend of the maturing sun' দুই বন্ধু মিলে গাছে পাকা আপেল ও আঙ্গুরে ভরিয়ে তোলে। শরৎ তাঁর কাছে এক কৃষক বা শস্য সংগ্রাহক নারী। যে শস্য মর্দন স্থানে চুল এলিয়ে বসে আছে অথবা ক্লান্তি কাটাতে শস্যক্ষেত্রেই ঘুমিয়ে পড়েছে 'or on a half-reap'd furrow Sound asleep' । আবার তৃতীয় স্তবকে বলেছেন, বসন্তের সুন্দর গান থাকতে পারে,তবে শরতের সন্ধ্যার লালচে আকাশে ঝিঝিঁ পোকার ডাকে, নদীর তীরে উইলো গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট মশাদের দলের গুনগুনিয়ে কান্নার শব্দে, দূর পাহাড়ের ওপারে মেষ শাবকের ডাকে ও Swallow পাখির গানে শরতের নিজস্ব সুর ভেসে আসে। 'And gathering swallows twitter in the skies'। William Wordsworth তাঁর "The Solitary Reaper" কবিতায় শরতের ফসল কাটার পটভূমিতে পাহাড়ি বালিকার গান গাওয়ার দৃশ্য ফুটিয়ে তোলেন--' Reaping and singing by herself/ stop here, aur gentle pass!/....The music in my heart I bore/long after it was heard no more ' ।

                   আধুনিক মার্কিন সাহিত্যে রবার্ট ফ্রস্ট শরতের সোনালী পাতার সৌন্দর্য ও তার ক্ষণস্থায়িত্ব নিয়ে লিখেছেন 
তাঁর "Nothing gold can stay' কবিতায় কবি রূপকের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতাকে তুলে ধরেছেন। 'Nature's
frist green is gold/... But only so and hour/....So
dawn goes down to day/ Nothing gold can stay'. অথবা 'October' কবিতায় কবি অক্টোবরের এক নিস্তব্ধ শরৎ সকলকে ধীরে বয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। যাতে প্রকৃতির সৌন্দর্য ও পাকা ফলগুলো শীতের কনকনে ঠান্ডায় 
মুহূর্তেই নষ্ট না হয়ে যায় 'O hushed October morning mild/Thy leaves have ripened to the fall/Tomorrow's
wind,if it be wild /...Begin the hours of this day slow/...Release on leaf/...For the grapes sake.../
Whose leaves already are burned with frost /...
with the grapes still hanging on the twigs !'
                     
                বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের 
'পথের পাঁচালী' উপন্যাসে অপু ও দুর্গার কাশবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য,নীল আকাশ,মেঠো পথ,নদীর চরের কাশবন শরতের অপূর্ব চিত্রায়ন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় 
'পন্ডিত মশায়ে' দুর্গাপূজা ও আশ্বিন মাসের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে।'পল্লীসমাজে' পল্লী জীবনের আবহমান চিত্র অংকন করেছেন । উঠে এসেছে শরৎকালের মেঠো পথ, আমন ধানের ক্ষেত, শারদ উৎসবকে কেন্দ্র করে সামাজিক মেলামেশা ও সামাজিক টানাপোড়নের চিত্র ।
'শ্রীকান্তে'র প্রথম পর্বে আশ্বিনের স্বচ্ছ আকাশ ও দূর গাঁয়ের শারদীয় উৎসবের কথা আছে। 'দেবদাসে' চুনিলাল ও দেবদাসের শৈশব ও কৈশোরের চিত্র গ্রামীন প্রেক্ষাপটে শরতের শিশির ভেজা সকাল,কাশবন,শান্ত দীঘির জলের সৌন্দর্য পরোক্ষভাবে ফুটে উঠেছে।'অভাগীর স্বর্গে' শুরুতেই শরৎকালের নিখুঁত ও মর্মস্পর্শী বর্ণনা উঠে আসে। আশ্বিন মাসের রোদের সকাল, নীল আকাশ, নদী কুলের শরতের স্নিগ্ধ রূপের বর্ণনা আছে। শরৎচন্দ্র তাঁর গল্পে,উপন্যাসে সামাজিক মেলবন্ধনকে বাংলার গ্রামীণ উৎসব বিশেষত শারদ উৎসব বা দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে বারে বারে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। এভাবেই আলো বাতাসের উৎসব হয়ে ওঠে শরতের উৎসব। যার প্রকাশ কাশের বনে, শিউলি তলায় নদীর চরে এবং ধানের ক্ষেতে। শরৎকাল হলো মুক্তি ও দানের প্রতীক। বর্ষার ভারাক্রান্ত অবস্থার অবসান ঘটে, আকাশ হয়ে ওঠে অমল,নির্মল। মানুষের মনও স্বার্থ,লোভ ও কৃত্রিমাতার আবরণ ছড়িয়ে নির্মল হয়ে ওঠে। মন যেন গেয়ে ওঠে "তুমি নির্মল কর মঙ্গল করে মলিন মর্ম মুছায়ে"(রজনীকান্ত সেন) ।
                    
                  অসামান্য প্রতিভাধর নারী খনা শরৎকাল ও আবহাওয়া পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন 'ভাদ্রে আশ্বিনে হয় যে বৃষ্টি।/কহে খানা, তাতেই ধান্যের সৃষ্টি' বা 'ভাদ্রে নদী জল থৈ থৈ।/আশ্বিনে জল বই বই।।' বৈষ্ণব পদকার চন্ডীদাস ও বিদ্যাপতির পদে শরতের জোছনা ও রসের বর্ণনা আছে। সেখানে প্রকৃতি ও মানবমন একাকার হয়ে গেছে। যখন চন্ডীদাস বলেন 'শারদ চাঁদ পবন মন্দ।/বিপিনে ফুটিল মালতী গন্ধ ।।/কোকিলা কুহরে ময়ূর নাচে।/সুরত রঙ্গে কানু যে আছে।'শরতের স্নিগ্ধ চাঁদ আকাশে উঠেছে, মন্দ মধুর বাতাস বইছে, বনে মালতী ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে। এমন মনোরম পরিবেশেই কৃষ্ণ রাসলীলায় মত্ত। অথবা 'শারদ চন্দ জিনিয়া মুখমণ্ডল/হাসিতে বিজুরী হানে' অর্থাৎ শ্রীরাধার মুখমণ্ডল এতটাই জ্যোতির্ময় যে তা শরতের নির্মল চাঁদকেও জয় করে নেয়, আর তার হাসি যেন বিজলীর মতো চমকে ওঠে। 
                 বিদ্যাপতি যখন বলেন--'শারদ চান্দ কোটি ভানু জিনিয়া অঙ্গ রুপ।/অমিয় ছানিয়া কেবা গড়ল অপরূপ'
অর্থাৎ কোটি শরতের চাঁদ ও সূর্যের উজ্জ্বলতাকে জয় করে যেন কে এক শিল্পী অমৃত ছেঁকে এই অপরূপ রূপ গড়েছেন। 
                 ভারতচন্দ্র তাঁর 'অন্নদামঙ্গল' কাব্যে বলেছেন--
'আশ্বিন মাসেতে বন্দো দেবী ভাগবতী /শারদীয় পূজা করি পরম ভকতি ।' 
                    কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত বলেন ' গেল বরষা হইল 
প্রকাশ শরৎকাল/নির্মল হইল জল মেঘের জঞ্জাল' অথবা 
'ফুটিল কাশের ফুল নদীর তীরেতে/শিউলি ঝরিছে ফুটে 
ভোরের বেলাতে।' বাঙালির দুর্গাপূজার আনন্দ, উমার আগমন ও সামাজিক মিলনের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন 'আশ্বিন মাসেতে হয় দুর্গোৎসব রঙ্গে/কত সুখ কত রঙ্গ হয় নানা সঙ্গে।'
                 কবি বিহারীলাল চক্রবর্তী তাঁর 'সারদামঙ্গল'
কাব্যে বলেন 'শরতের শুভ্র মেঘ/সুনির্মল নিলাম্বরে/অমলের মত শোভা/প্রকাশিয়া চরাচরে।' 'সংগীত শতক'- এ বলেন 
'প্রভাতে শরতের আলো/শিশিরে ভিজিল পাতা/ফুটেছে 
শেফালিকা ফুল/আকুল ব্যাকুল লতা..'

                       শরৎকাল আবাহনের কাল। বাংলার পল্লী থেকে নগর সর্বত্র সাজো সাজো ভাব। এই ঋতু পরিবর্তনের 
চুম্বকীয় টানে মানুষের মনের কোণে জমে ওঠা বিষাদ ভেসে যায়, নতুন আশার আলো মনে সঞ্চারিত হয়। এই পরম মুহুর্তের জন্য বাঙালি সারা বছর ধরে অপেক্ষা করে। গ্রীষ্মের প্রবল দাবাদহ সহ্য করে,দুকূল প্লাবিত বর্ষার তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে আবারো বুকে আশা বাঁধা এসময়,শরতের আগমনের পথ চেয়ে। শরৎ এলে তার প্রথম সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে অসীম নীল আকাশ । বর্ষার ঘন কালো মেঘের পরিবর্তে স্থান নেয় পেঁজা তুলার মতো নরম মেঘপুঞ্জ,কোন অজানার উদ্দেশ্যে নিঃশব্দে করে বিচরণ। প্রকৃতি লাভ করে স্বর্গীয় শোভা। পথে,ঘাটে,মাঠে শুরু হয় রোদ ও ছায়ার খেলা। বাংলার মেঠো পথ,সবুজ ক্ষেত আর নদী-নালা এক অদ্ভুত গতিময়তা লাভ করে। ভাদ্রের মাঝামাঝি সূর্যের আলো প্রখর ও তীব্র হলেও বর্ষার স্যাঁতসেঁতে ভাবকে দূর করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে আনে কাঙ্ক্ষিত শুষ্কতা। আশ্বিন মাসে এই রোদ রূপ নেয় কাঁচা সোনার রঙে। শরতের সকালে শিশির ভেজা ঘাসের ডগায় আলোর বিচ্ছুরণ-- মানুষকে গৃহের বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে প্রকৃতির উন্মুক্ত সৌন্দর্যের প্রাঙ্গণে । দক্ষিণা বাতাসের দোলায় দুলতে থাকে জ্যোৎস্না ভেজা কাশবন প্রকাশ্য দিবালোকে। নদীর জলের কলকল শব্দ এবং কাশের মৃদু খসখস ধ্বনি মিলে তৈরি হয় অপূর্ব প্রাকৃতিক সুরমূর্ছনা যা মুহূর্তে পথচারীর ক্লান্তিকে দূর করে দেয়। ভোরের হিমেল বাতাস ও পথে ছড়িয়ে থাকা শিউলির গন্ধ আর অপরূপ দৃশ্য বাঙ্গালীর ভাবুক মনকে ভাসিয়ে রাখে শারদীয়া দুর্গাপূজার আনন্দ ঘন দিনের সুখ স্মৃতিতে, সে শুনতে পায় ঢাকের কাঠির শব্দ,কাঁসর ঘন্টার ধ্বনি, ধুনুচির সুবাসিত আবেশময় ধোঁয়া । দূরবাসী স্বজনেরা, প্রবাসীরা 
গৃহে ফেরার টান অনুভব করে। শারদীয় মিলনমেলায় ভরে ওঠে প্রতিটি বাঙালির গৃহকোণ। শরতের মনমুগ্ধকর দৃশ্য মানুষের মনের মধ্যে যে আনন্দের স্রোত বইয়ে দেয় তাকে প্রকাশ করতে হাতে রং তুলি নিয়ে নেমে পড়ে কতো না অনামি শিল্পীরা। নাইবা হলেন তাঁরা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, ভ্যান গগ, মাইকেল এঞ্জেলো, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেইজ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অথবা মকবুল ফিদা হোসেন। তবু তাদের অন্তর থেকে আঁকা চিত্রকর্মটি তাদের আনন্দের অভিব্যক্তি। তাই কচিকাঁচাদের অথবা অনামি শিল্পীর হাতে অঙ্কিত চিত্রের আনন্দের মূল্য কোন অর্থেই কম নয়। বঙ্গ ঋতুর শরৎকাল শিল্পীর তুলি ও‌ রঙ্গের কাল, এ যে কম বড় প্রাপ্তি নয় !

                মহালয়ার ভোরে আজো বাঙালি অপেক্ষা করে শ্রী বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠের চণ্ডীপাঠ। বাঙালির দুর্গোৎসবের নান্দী পাঠের মধ্য দিয়েই হয়। এরপর একে একে পঞ্চমী,ষষ্ঠী,সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী তিথির মঞ্চে আগমন দশমীতে ট্রাজেডির মধ্যে দিয়ে ঘটে নাটকের যবনিকা পাত । 'রামায়ণে' দেখা যায় পুরানের কালে রামচন্দ্রও সীতাকে উদ্ধার করতে শক্তিময়ী,মঙ্গলময়ী দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন অকালেতে, এই শারদ কালেই । শারদীয়া দুর্গোৎসব 'অকালবোধন' বলে তাই পরিচিত। ভাদ্রের সূচনায় প্রকৃতির ক্যানভাসে রূপের যে মেলা বসেছিল আশ্বিনের শেষে তা ধীরে ধীরে এক স্নিগ্ধ বিষাদের রূপ নেয় হেমন্তের আগমনে। শরৎকাল বাংলা ও বাঙালির মনে নাটকের মতই নানা দৃশ্যের অবতারণার মধ্য দিয়ে রেখে যায় অনাবিল শান্তির স্মৃতি। যে আত্মিক শুদ্ধি, শুভ্র প্রশান্তি দিয়ে যায় তা সারা বছর বাঙালির হৃদয়ে আলো হয়ে জ্বলজ্বল করে। অন্তর আমার তাই বলে ওঠে--

               বিস্তর জমে আছে ধুলো 
               সংকীর্ণের মলিনতা 
               শরতের শিশির ছোঁয়ায় 
               মুছে যাক্ সে আবিলতা ।
               শিউলি ছাতিম শাপলা শতদলে 
               ভেদাভেদহীন ঐক্যতান 
               শরৎ নাট্য মঞ্চ রাখে সাজিয়ে 
               প্রকৃতি মানুষে মিলে,গায় জয়গান ।


 

গল্প 


মৃত দেবদারুগাছ অথবা ঝরাপাতার কথোপকথন

তন্ময় ধর 

১।

ওরা প্রথম এই গাছের নিচে বসেছিল সাত বছর আগে, যখন গাছটা এত মরা ছিল না, আর তারা দুজনও এত ক্লান্ত ছিল না একে অপরের গলার স্বরে।
"তুমি বলেছিলে," মেয়েটি বলল, অনেক পরের একটা সন্ধ্যায়, "আমরা কখনো সাধারণ দম্পতি হব না। এখন দেখো, আমরা তো সাধারণ দম্পতিও হতে পারলাম না, শুধু ব্যর্থ প্রেমিক-প্রেমিকা হয়ে রয়ে গেলাম।"
"সাধারণ হওয়াটাই তো সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল," ছেলেটি বলল। "আমরা দুজনেই ভেবেছিলাম নিজেদের ব্যতিক্রম, তাই সাধারণ জিনিসগুলো— সময়মতো ফেরা, ছোট রাগ মিটিয়ে ফেলা, প্রশ্ন না করে বিশ্বাস করা— এগুলো শিখতেই ভুলে গেলাম।"
মালী তখন গাছের গায়ে লাল ক্রস আঁকছিল, দূরে দাঁড়িয়ে, তাদের কথা শুনতে পাচ্ছিল না, অথবা শুনেও শোনেনি বলে ভান করছিল।

২।
"তুমি কবে থেকে আমার মেসেজ চেক করা বন্ধ করেছ?" মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, প্রশ্নটা এমনভাবে করল যেন উত্তরটা তার আগে থেকেই জানা।
"যেদিন বুঝলাম," ছেলেটি বলল, "তোমার মেসেজে যা আছে, তার চেয়ে বেশি সত্যি তোমার নীরবতায়। ফোন তো শুধু শব্দ জমিয়ে রাখে। নীরবতা জমিয়ে রাখে অভিপ্রায়।"
"তাহলে তুমি কি বলছ, আমি তোমাকে ঠকিয়েছি?"
"না," ছেলেটি বলল, "আমি বলছি, আমরা দুজনেই একটা মিথ্যের ভেতর সুস্থির থাকার চেষ্টা করছিলাম, আর সেই মিথ্যেটা আমাদের নিজেদের তৈরি, কারো তৃতীয় মানুষের নয়। আমরা ঠকিনি একে অপরকে, আমরা শুধু থেমে গিয়েছিলাম বদলাতে বদলাতে একই দিকে।"
কাঠবিড়ালিরা ডাল থেকে ডালে লাফাচ্ছিল, তাদের ছোট্ট শরীরে কোনো দ্বিধা নেই, প্রতিটা লাফ একটা সিদ্ধান্ত, ফিরে আসার সম্ভাবনা ছাড়াই।

৩।
"মনে আছে," মেয়েটি বলল, "প্রথম বছর তুমি বলেছিলে আমার হাসিতে নাকি এমন কিছু আছে, যা তোমাকে ভয় পাইয়ে দেয়— কারণ তুমি জানতে না এত সুখ তোমার প্রাপ্য কিনা।"
"এখন আমি জানি," ছেলেটি বলল, "সুখ প্রাপ্য কিনা সেই প্রশ্নটাই ভুল ছিল। প্রশ্ন হওয়া উচিত ছিল, সুখটা আমরা রাখতে জানি কিনা। প্রাপ্তি সহজ, রক্ষণ কঠিন। আমরা দুজনেই প্রাপ্তিতে দক্ষ, রক্ষণে অপটু।"
"তুমি সবসময় এমন সুন্দর করে ব্যাখ্যা দাও," মেয়েটি বলল, গলায় এক অদ্ভুত তিক্ততা, "যেন ব্যাখ্যাটাই ভালোবাসার বিকল্প হতে পারে।"
"হতে পারে না," ছেলেটি স্বীকার করল, চুপ করে গেল কিছুক্ষণ, তারপর যোগ করল, "কিন্তু যখন ভালোবাসা আর থাকে না, তখন ব্যাখ্যাই একমাত্র জিনিস, যা মানুষকে সৌজন্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।"

৪।
মৃত পাতাদের একটা কথোপকথন ভেসে এল মাটির নিচ থেকে, যা দুজনেই শুনতে পেল, যদিও কেউ স্বীকার করল না যে শুনেছে।
"ওরা কি চলে যাচ্ছে?" একটা পাতা জিজ্ঞেস করল।
"সবাই চলে যায়," আরেকটা পাতা বলল। "আমরাও তো ঝরে গিয়েছিলাম একদিন, ডাল ছেড়ে। কেউ কি জিজ্ঞেস করেছিল আমাদের মতামত?"
"তবু আমরা মাটিতে মিশে গিয়ে গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখি," তৃতীয় পাতাটা বলল। "মানুষ কি সেভাবেও বাঁচায় একে অপরকে, বিচ্ছেদের পরও?"
কেউ উত্তর দিল না পাতাদের প্রশ্নের। কিন্তু মেয়েটির চোখে জল এল, প্রথমবার, আর সে চোখ মুছল না, যেন জল মোছাটাও একটা সিদ্ধান্ত, যা নেওয়ার ক্ষমতা তার আর নেই।

৫।
"তুমি কি অন্য কাউকে খুঁজছ?" ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ, প্রথমবার সরাসরি।
"খুঁজছি না," মেয়েটি বলল, "কিন্তু স্বীকার করছি, একা থাকার ভয়টা এখন আর তেমন ভয়ংকর লাগে না, যেমন লাগত তোমার সঙ্গে থাকার প্রথম বছরগুলোয়। তুমি কি জানো এটা কতটা নিষ্ঠুর সত্যি, যে একা থাকার কল্পনাটা এখন তোমার সঙ্গে থাকার কল্পনার চেয়ে বেশি শান্তি দেয়?"
"জানি," ছেলেটি বলল, গলা কাঁপল সামান্য, "কারণ আমারও একই কথা মনে হয়, প্রতি রাতে, যখন তুমি ঘুমিয়ে পড়ো আর আমি ছাদে গিয়ে দাঁড়াই। আমি ছাদে দাঁড়িয়ে ভাবি, যদি আজ রাতেই সব শেষ হয়ে যেত, তাহলে বাকি জীবনটা কি সহজ হত।"
"তাহলে আমরা কেন এখনও একসঙ্গে আছি?"
"অভ্যাসের জড়তা," ছেলেটি বলল, "আর একটা লজ্জা, যে সাত বছর একসঙ্গে থেকেও যদি বলি এটা ভুল ছিল, তাহলে সাতটা বছরও ভুল হয়ে যায়। কেউ নিজের অতীতকে এত সহজে ভুল বলতে পারে না।"

৬।
পাখিরা উড়ে গেল মাথার ওপর দিয়ে, তাদের ছায়া মাটিতে পড়ল, আর সেই ছায়ার ভেতর দুজনের ছায়া প্রথমবার আলাদা দেখাল, যদিও তারা পাশাপাশি বসে ছিল, কাঁধ প্রায় ছুঁয়ে।
"ছায়াও কি টের পায় বিচ্ছেদ?" মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, স্বগতোক্তির মতো।
"ছায়া শুধু আলোর অনুপস্থিতি," ছেলেটি বলল। "আমাদের মাঝেও এখন যা আছে, তা আলোর অনুপস্থিতি— একদা যা ছিল, তার ছায়া মাত্র, প্রকৃত অন্ধকার নয়, শুধু অন্ধকারের স্মারক।"
"তুমি কি আমাকে ঘৃণা করো?"
"না," ছেলেটি বলল, খুব দ্রুত, যেন প্রশ্নটা তাকে আঘাত করেছে অপ্রত্যাশিতভাবে। "ঘৃণা করলে অন্তত একটা অনুভূতি থাকত ধরার মতো। যা আমার আছে তা ঘৃণার চেয়েও শূন্য— একধরনের করুণা, নিজের জন্য, তোমার জন্য, আমাদের নষ্ট হয়ে যাওয়া সময়ের জন্য।"

৭।
গাছটা সেই রাতে পড়ে গেল, নিঃশব্দে, কেউ লক্ষ করল না ঠিক কখন। সকালে মালী এসে দেখল শুধু গুঁড়িটা, শিকড় উপড়ানো, মাটিতে পড়ে।
কিন্তু দুজন মানুষ তখন আর একসঙ্গে ছিল না সেখানে। মেয়েটি চলে গিয়েছিল আগের রাতেই, একটা ব্যাগ নিয়ে, যাতে ছিল শুধু দরকারি কাপড় আর একটা পুরনো ডায়েরি— যে ডায়েরিতে সাত বছরের প্রতিটা তারিখে একটা করে ছোট্ট টিক চিহ্ন, যার মানে শুধু সে-ই জানত।
ছেলেটি একা বসেছিল গুঁড়ির পাশে, ভোরবেলা, রজনের গন্ধ শুঁকছিল, যেন সেই গন্ধের ভেতর এখনও কিছু একটা খুঁজে পাওয়া যায়, যা কথায় বলা যায়নি।
"তুমি চলে গেলে," সে বলল বাতাসকে, কারণ বলার মতো আর কেউ ছিল না, "আর গাছটাও চলে গেল। দুটো বিচ্ছেদ একসঙ্গে ঘটল, অথচ আমার মনে হচ্ছে না এই দুটোর মধ্যে কোনো সমান ওজন আছে। গাছের জন্য শোক করা সহজ— ওর মৃত্যু দেখা যায়, ছোঁয়া যায়। কিন্তু তোমার চলে যাওয়াটা এমন এক শূন্যতা, যার কোনো গুঁড়ি পড়ে থাকে না মাটিতে, শুধু ঘরের প্রতিটা কোণে একটা অনুপস্থিতি জমে থাকে, যাকে আমি প্রতিদিন সকালে নতুন করে আবিষ্কার করব।"

৮।
মাস তিনেক পর মেয়েটি একবার ফিরে এসেছিল সেই জায়গায়, একা, দেখতে গাছটা কেমন আছে— অথচ গাছ তো ছিলই না, শুধু একটা খালি জায়গা, ঘাস গজিয়েছে অগোছালোভাবে।
"তুমি কি জানতে," সে বলল নিজেকে, কারণ শোনার মতো কেউ ছিল না, "গাছটা যেদিন পড়ে গেল, সেদিনই আমি ব্যাগ গুছিয়েছিলাম? আমি ভাবতাম এটা কাকতালীয়। এখন মনে হয়, হয়তো গাছটাও জানত, ওর সময় শেষ হয়ে গেছে ঠিক তখনই, যখন আমাদের সময়ও শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমি এটাও জানি, এই মিল খোঁজাটা আসলে নিজের কষ্টকে একটা গল্পের ভেতর গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা মাত্র, যাতে কষ্টটা একা, নিরর্থক না লাগে।"
খালি জায়গাটায় বাতাস বইল, আর সেই বাতাসে ভেসে এল পুরনো রজনের একটা ক্ষীণ, প্রায়-অস্তিত্বহীন গন্ধ, যা হয়তো ছিল না, হয়তো শুধু স্মৃতির কল্পনা— কিন্তু মেয়েটি সেই গন্ধ শুঁকে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ, যেন এটাই শেষ প্রমাণ, যে কিছু একটা সত্যিই ছিল একদিন, এই জায়গায়, দুজন মানুষের মধ্যে, একটা গাছের ছায়ায়।