নব দিগন্তের শুভ সূচনা
শুভেন্দু নন্দী
এ পৃথিবীতে তো কত কিছুই ঘটে যাচ্ছে। কালের নিয়মে একটা বছর আসে। আবার তার বিদায় লগ্ন হয় উপস্থিত। আবার নতুন বছরের আগমন, জানায় সবাই তাকে স্বাগতম। বছর ঘিরে অনেক প্রত্যাশা,সম্ভাবনার কথা ভাবতে ভাবতেই বছরের পর বছর কেটে যায়। একটা সংসার, একটা পরিবারের কথা চিন্তা করে অলোক এই মুহূর্তে।মধ্যবিত্ত পরিবার। তার একজন সদস্য স্বর্ণেন্দু। গান নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখে সে।
এ পাড়ায় মাঝে মাঝেই আসে অলোক চায়ের দোকানে। নয়নবাবু প্রোমোটারিং ব্যবসা করে বেশ ফুলে ফেঁপে উঠেছেন এ পাড়ায় নারায়ণগঞ্জে। সাবেকি আমলের একতলা বাড়ি আর নেই বললেই চলে। জনা তিনেক ছেলেকে কোচিং পড়ায় অলোক ফ্র্রিতে। আসে সপ্তাহে তিন দিন। আর চায়ের দোকানে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আড্ডা, গল্পগুজব। চারিদিকে তরতর করে উঠেছে বেশ কয়েকটা বহুতল ফ্ল্যাট। এতো পরিবর্তন?
-একী? স্বর্ণেন্দু তুই? আজ তো রবিবার। তোর ক্লাবে যাওয়ার দিন? অর্কেস্ট্রশনের ভালো করে তালিম নিচ্ছিস তো?
- হ্যাঁ। সব ধরনের ইনস্ট্রুমেন্ট প্রায় ওখানে আছে, অলোকদা। সত্যি, ছেলেগুলো বেশ ভালো। সবই তো তোমার দয়ায়। গান - কী ভাবে অঙ্গভঙ্গি করে এবং মাউথপিসে মুখ রেখে করতে হবে -সব ওরা আমাকে যত্ন করে শেখায়।
-বুঝলি, তোর গলায় সুর আছে, গান আছে। তাল, ছন্দ -সবই আছে। শুধু একটু রেওয়াজ করতে হবে নিয়মিত। ভালো কথা, চাকরির পরীক্ষা দেবার কথা ভাবছিস কী? অবশ্যই সুযোগ পেলে দিবি। তোকে পরীক্ষার নোটিফিকেশন করলেই জানিয়ে দেবো, কেমন। গাইড বুকও দেবার চেষ্টা করবো।
- কত আর করবে তুমি, দাদা?
আরে! গান আর চাকরির চেষ্টা দুটোই তোকে করতে হবে। তবে বুঝলি, একটা সিনেমা দেখেছিলাম তা বেশ কয়েক বছর আগে। একটা impressive dialogue ছিলো ওতে।
একজন ভিখারী আর একজন ভিখারীকে বলছিলো "আপনি গান জানেন? তাহলে কিন্তু
জর্জ ম্যাজিস্ট্রেট থেকেও বেশী উপার্জন করতে পারবেন।
- "ওগুলো সিনেমাতেই সম্ভব। বাস্তবে তার কোনও ভিত্তি নেই।" স্বর্ণেন্দু বলে উঠলো।
ভাবতে লাগলো সে দুবছরতো ইতিমধ্যেই উত্তীর্ণ হয়েছে। এ বছরও তো প্রায় শেষ হয়ে এলো। অলোকদার কথাটার মধ্যেও তো যুক্তি আছে। ইদানীং একটা ব্যাপারে সে খুবই চিন্তিত। ভাড়া বাড়িতে থাকে তারা। একতলা । ছাদে ফাটল। দেওয়াল জরাজীর্ন। পুরনো বাড়ি। মেরামত করার একেবারে ইচ্ছে নেই হয়তো বাড়িওয়ালার। ভাড়া খুবই কম। পাশেই থাকেন পরিবার নিয়ে। প্রোমোটারবাবু তাঁকে Influence করার চেষ্টা করছেন ঘন ঘন । বাড়িটাকে ভেঙ্গে চূড়ে renovation করে একটা নতুন বহুতল বিশিষ্ট ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি করার মতলব করছেন। যদি তাই হয়, তবে তারা তো সমুহ বিপদে পড়বে। .....
অলোকের সাথে স্বপ্নেন্দুর দেখা হওয়াটাও যেন একটা স্বপ্নের মত।
....... একটা একতলা বাড়ির কাছে গিয়ে অলোক থামলো। ঘরের ভেতর থেকে একটা গান ভেসে উঠলো। কে যেন গাইছে - বেশ খাসা গলা তো?
এইভাবেই তার ও তার পরিবারের পরিচয় ও পরে ঘনিষ্টতা। আর ক্লাবের সাথে যোগাযোগ করা আর সেখানেই তার তালিম নেওয়া। সবটুকুর দায়িত্ব অলোকের । ক্লাবের সাথে তার ভালোরকম পরিচয় ছিলো। কিছুটা monetary assistance -এ - পুরোটা bear করতো ও নিজে। বাবা সরকারী চাকুরে। তাই আর্থিক স্বচ্ছন্দ ছিলো তাদের পরিবারে।
ইতিমধ্যে পাড়ার একটা নামজাদা ক্লাবের রজত জয়ন্তী উৎসবে যাবার আমন্ত্রণ পেলো অলোক। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে এক বহিরাগত কন্ঠশিল্পীর দলবল নিয়ে আসার কথা ঐ অনুষ্ঠানে। ক্লাবের সম্পাদক তার বিশেষ বন্ধু। বিরাট একটা ড্রামাটিক হল সুন্দর করে সাজানো। সংস্কৃতি প্রিয় প্রচুর মানুষের ভীড় হলটিতে। বন্ধুর অনুরোধ রক্ষা করার জন্য হলঘরে যখন প্রবেশ করতে উদ্যত হোলো অলোক, তখন রাত্রি নটা বেজে গ্যাছে। প্রচন্ড চিৎকার,চেঁচামেচি চলছিলো তখন সমবেত দর্শকদের ক্লাব কর্তৃপক্ষের একটি ঘোষণায়। যা হোলো - একটা দুর্ঘর্টনায় কম-বেশী সকলেই আহত, তাই বহিরাগতদের সংগীতানুষ্ঠান বাধ্য হয়েই বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আর এর দুভার্গ্যজনক ঘটনার জন্য তারা খুবই দুঃখিত। ইত্যাদি ইত্যাদি। তখন অলোক মাউথপিসে ঘটনার জন্য আন্তরিক দুঃখপ্রকাশ করে সমবেত দর্শকদের কাছে একটা বিনীত প্রস্তাব রাখে যে, তাদের পাড়ায় একজন প্রতিভাসম্পন্ন কন্ঠশিল্পী আছেন, যাঁর গান তিনি নিজে শুনেছেন, তাঁকে একবার এই স্টেজে দয়া করে পারফর্ম করার সূযোগ দিন- আশা করি তিনি আপনাদের নিরাশ করবেননা। হলে কিছুক্ষণ গুঞ্জন শুরু হোলো। তারপর পরিবেশ ধীরে ধীরে শান্ত হোলো। স্বর্ণেন্দুর সাথে ইতিমধ্যেই যোগাযোগ করেছে অলোক। প্রথমটা ইতস্তঃত করলেও পরে সম্মতি জানিয়ে তার দল নিয়ে স্বর্ণেন্দু সোজাসুজি স্টেজে এসে পৌঁছেছিলো।
- এ কি করলি তুই? বন্ধুর আকুল প্রশ্ন, - আমিতো কিছুই বুঝতে পারছিনা রে"
- তুই শুধু দেখে যা" অলোক তাকে আশ্বস্ত করলো।
স্বর্ণেন্দুর বিভিন্ন ধরণের গানের পরিবেশনায় মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উত্তেজিত দর্শক " বাঃ , অসাধারণ"ইত্যাদিতে তাঁদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে মুহুর্মুহু করতালিতে তাকে অভিনন্দিত করলেন।
তারপর সংবাদপত্রে, প্রেস ফটোগ্রাফারের ভীড়ে, তার সাক্ষাৎকারে উচ্ছ্বসিত প্রসংশার ঢেউ বয়ে গেলো। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলো স্বর্ণেন্দু।
এরপর মাসাধিক কাল কেটে গেছে। অলোক চাকরী পাবার সুবাদে ভিন্ন রাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। এর মধ্যে এক লম্বা ছুটি নিয়ে ফিরেছে বাড়িতে। চাকরিটা পেয়েছে সময়মত। আর মাত্র একটি মাস বাকী বাবার অবসর গ্রহণের। বাধা মাইনের সরকারী চাকরী করেন তিনি। পুরণো বন্ধুদের সাথে গল্পগুজবের পরে স্বর্ণেন্দুদের বাড়ির উদ্দেশ্যে পা মেলালো। বাড়ির একেবারে কাছাকাছি আসতেই একজন তাকে প্রশ্ন করলেন" কাকে খুঁজছেন? স্বর্ণেন্দুকে?"
- ওতো এখন দু-হাত দিয়ে টাকা ইনকাম করে যাচ্ছ। যত্রতত্র গানের প্রোগ্রাম- শহরে,গ্রামে-গঞ্জে, বাইরে।আপনি ঠিক সময়ে এসেছেন। আর কয়েক ঘন্টা পরেই তো দলবল নিয়ে কলকাতায় যাবার প্রোগ্রাম আছে। ভীষণ ব্যস্ত এখন ও। আমাদের এই ফ্ল্যাটবাসী এই তো কিছু দিন আগে তাকে সম্বর্ধনা দিলো। আর খানিক পরে হাসতে হাসতে বলে উঠলো" আমিও তাতে সামিল হয়েছিলাম। ঐ যে দেখছেন নতুন তিনতলা ফ্ল্যাট !
চলে গিয়েছে ওখানে এই পুরণো ভাড়া বাড়ি ছেড়ে।" অলোকের হঠাৎ মনে পড়ে গেলো বেশ কিছুদিন আগেও ঐ বাড়িটা under construction দেখে ছিলো। প্রোমোটার নয়নবাবুর কাছ থেকেই
তাহলে .........? "অর্থকৌলিন্যের অহমিকায় এই পাড়ার সকল ফ্ল্যাটবাসী আমাদের অনুকম্পার চোখে দেখে। আমাদের আর্থিক দুরবস্থা,বাবার স্বল্প বেতন জরাজীর্ন, স্যাঁতস্যাঁতে ভাড়াবাড়িতে থাকা,দমবন্ধ করা ও অসহ্য পরিবেশ।
তাই একটু হীনমন্যতায় ভুগি। ওদের সাথে কথা বলতে, মিশতে সংকোচবোধ হয়" স্বর্ণেন্দু মাঝে মাঝেই অনুযোগ করতো আর দীর্ঘশ্বাস ফেলতো"
"আর আজ? ওঁরাই তাদের একান্তই আপন। সত্যিই বিচিত্র এই দুনিয়া" অলোক এই বিরাট পরিবর্তন আজ লক্ষ্য করে কথাগুলো মনে মনে অজান্তেই বলে ওঠে।
বাড়িতে প্রবেশ করে সবার সাথে দেখা করলো অলোক। স্বর্ণেন্দুর সাথে, ওর বাবা-মা, বোনের সাথে কিছুক্ষণ সুন্দর সময় কাটানোর পর ও ছোট বোনকে একটা গোয়েন্দা বই উপহার দিয়ে অতঃপর সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মন্থর গতিতে বাড়ির পানে চলতে লাগলো। ঐ নির্দ্ধারিত শিল্পীর অনুপস্থিতিতেই স্বর্ণেন্দুর ভাগ্যের চাকা ঘুরে গেছে। সিনেমার সেই বিখ্যাত ডায়ালোগ তাহোলে শেষে অদ্ভূতভাবে ফলে গ্যাছে। অথচ সবটাই ছিলো unpredictable. বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করলো অলোক আর ঈশ্বরকে মনে মনে ধন্যবাদ জানালো ।