Sunday, February 1, 2026


 

মুনা 

অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪৩২


সম্পাদকের কথা 

সামান্য বিরতি নিয়েছিল মুজনাই। নিতান্তই নিজস্ব প্রয়োজনে। অনেকেই জানতে চেয়েছেন, কবে থেকে আবার বইবে মুজনাই। আমরা কৃতজ্ঞ তাঁদের কাছে। আপনাদের এই শুভেচ্ছাই মুজনাইয়ের মূল শক্তি। বড় নামের পেছনে নয়, চোখ-ধাঁধানো অনুষ্ঠান নয়, কারোর সঙ্গে লেগে থাকা নয়। মুজনাই স্বতন্ত্র। নিজের মতো। তাই চলা শুরু আবার। বিরতির পর। আপনাদের সঙ্গে। আপনাদের নিয়ে।  


অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪৩২


রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

প্রকাশক- রীনা সাহা  

সম্পাদনা, প্রচ্ছদ ছবি, অলংকরণ ও বিন্যাস- শৌভিক রায় 


এই সংখ্যায়  মুক্ত গদ্যে - 

আরাত্রিকা বন্দ্যেোপাধ্যায়

এই সংখ্যায়  প্রবন্ধে/ নিবন্ধে - 

গৌতমেন্দু নন্দী, বটু কৃষ্ণ হালদার, মিত্রা রায় চৌধুরী

এই সংখ্যায়  রম্য গল্পে - 

প্রদীপ কুমার দে

এই সংখ্যায় গল্পে - 

চিত্রা পাল, লীনা রায়, অভিজিৎ সেন

এই সংখ্যায়  ভৌতিক গল্পে - 

শুভেন্দু নন্দী, মনোরঞ্জন ঘোষাল

এই সংখ্যায়  ভ্রমণ কাহিনীতে-

রণিতা দত্ত, অনিতা নাগ, বেলা দে

এই সংখ্যায়  কবিতায়- 

পরাগ মিত্র, অশোক কুমার ঠাকুর, রেবা সরকার, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়,

শিশির আজম, অর্পিতা রায় আসোয়ার, উৎপলেন্দু পাল, কেতকী বসু,

অমিত আভা, প্রতিভা পাল, নবনীতা (সরকার), প্রাণেশ পাল,

সম্রাট দাস, রাজু রায়, শংকর হালদার, আকাশলীনা ঢোল,

আসিফ আলতাফ, মহঃ সা নো য়া র, মন্দিরা ঘোষ, বিজয় বর্মন,

মাথুর দাস, মজনু মিয়া, মলয় চক্রবর্তী, মনোমিতা চক্রবর্তী,

চিরঞ্জিত মন্ডল, প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী, অঙ্কুর মহন্ত


অনলাইন মাঘ সংখ্যা ১৪৩২




 

মুক্তগদ্য 


বসন্তের শেষ প্রহর

আরাত্রিকা বন্দ্যেোপাধ্যায়
 
বসন্তের বিদায়বেলা সবসময়ই একটু বিষণ্ণ, অনেকটা প্রিয় বন্ধুর চলে যাওয়ার মতো। বসন্তের শেষ প্রহর মানেই এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। একদিকে ঝরা পাতার বিদায়-সংগীত, অন্যদিকে বৈশাখের রুদ্ররূপের পদধ্বনি। গাছের তলায় তখন শুকনো পাতার স্তূপ, আর বাতাসে ভেসে বেড়ায় এক দীর্ঘশ্বাস। সেই যে ফাল্গুনের শুরুতে পলাশ আর শিমুলের আগুন লেগেছিল, চৈত্র শেষের এই বেলায় তারা এখন মলিন, ধুলোমাখা রাস্তার এক কোণে পড়ে থাকা স্মৃতির মতো।

এই সময়ে দুপুরের রোদটা আর আগের মতো মায়াবী থাকে না, তাতে মিশে থাকে এক প্রখর তৃষ্ণা। জানলার পর্দা সরিয়ে তাকালে দেখা যায়, মাঠের ধারের শিরীষ গাছটা তার শেষ কটি পাতা ঝরিয়ে দিয়ে আগামীর প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। কোকিলের ডাকও যেন এই সময় একটু ক্লান্ত শোনায়—সেই আকুল করা কুহুতান এখন যেন বিদায়ের সুরে বাজছে। বসন্তের শেষ প্রহর আমাদের শেখায় যে, যা কিছু সুন্দর, তার শেষটুকুও মর্যাদার সাথে মেনে নিতে হয়।

বিকেলের আকাশটা এই সময় বড্ড ছটফটে হয়ে ওঠে। নীল আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা কমে গিয়ে সেখানে ধূলিধূসর একটা আস্তরণ জমা হয়। অথচ এই ধূসরতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে নতুন শুরুর ইঙ্গিত। বসন্ত চলে যায় তার সবটুকু রঙ আর সুগন্ধ উজাড় করে দিয়ে, রেখে যায় শুধু আগামীর কালবৈশাখীর জন্য এক উন্মুখ প্রতীক্ষা। দিনশেষে যখন গোধূলির আলো মিলিয়ে যায়, তখন মনের কোণে একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হয়—"আবার আসিব ফিরে।"


 

প্রবন্ধ/ নিবন্ধ 


কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা- কিছু কথা 

গৌতমেন্দু নন্দী


নির্দিষ্ট স্থানিক পরিসর থেকে ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্ব বলয় বৃত্তে কলকাতা বইমেলার অবস্থান বা ভূমিকা গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে ক্রম বর্ধমান না হ্রাস মান ?----এই নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে  তর্ক চলতেই পারে। কিন্তু এরসঙ্গে অবধারিতভাবে এসে যায় প্রকাশিত বইয়ের ভাষাগত দিক। 

 কলকাতার বৃহৎ পরিসরে অনুষ্ঠিত এই বইমেলায় প্রত্যেকবছর ফ্রান্স, লন্ডন, আর্জেন্টিনার মতো এক একটি "বিদেশ" বইমেলার  "থিম" হলেও সাধারণ  পাঠক বা বইমেলায় আগত বইপ্রেমীদের কাছে   সেই "বিদেশি প্যাভিলিয়ন" উল্লেখযোগ্যভাবে গুরুত্বহীন থেকে তা শুধুই কিছু আমন্ত্রিত অতিথি, তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ( ইদানিং চলচ্চিত্র বা সিরিয়ালের কিছু কলাকুশলী), এবং রাজনৈতিক  শাসকদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়। সর্বজনীন করার প্রচেষ্টা নেই বললেই চলে। "আন্তর্জাতিক" শব্দটির ব্যাপ্তি শুধুমাত্র শিরোনাম বা "পরিসর"-এর উপর নির্ভর করে না। বিদেশী প্রকাশনার প্রায়  ধারাবাহিক অনুপস্থিতি,  বাংলা বাদে অন্য কোন আন্তর্জাতিক ভাষা সমুহের প্রকাশিত গ্রন্থ বা তার  অনুবাদ ----না, কোথায় চোখে পড়ে?! 
      
তবুও এই বইমেলায় এতোদিন কিছুটা আন্তর্জাতিকতার ছোঁয়া দিয়ে আকর্ষণীয়ভাবেই উপস্থিত থাকত আমাদের পার্শ্ববর্তী, একই মাতৃভাষার দেশ" বাংলাদেশ"।  মৌলবাদ, ধর্মীয় ভাবাবেগ বা  ভারত বিদ্বেষী মনোভাবের কারণে কুটনৈতিক সম্পর্কের পারস্পরিক অধঃপতনে আজ সেই দেশও অনুপস্থিত!  
       
অনুবাদ সাহিত্যে বাংলা ভাষার দুর্দশা মুক্ত না ঘটলে এই "আন্তর্জাতিকতা" " সোনার পাথরের বাটি"রই নামান্তর হয়ে যায়। কলকাতা বইমেলার "হৃৎপিন্ড" লিট্ল ম্যাগ-এর স্টলেও অনুবাদ সাহিত্যের "হাহাকার" চোখে পড়ে। বারো-তেরো দিনের মেলায় প্রত্যেকদিন এই মহানগরীর কিছু আমন্ত্রিত অভিনেতা/অভিনেত্রী বা তথাকথিত সেলেবরা "বুদ্ধিজীবী" হয়ে বিশেষ  অনুষ্ঠানমঞ্চ আলোকিত করে আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে থাকেন।  উপেক্ষিত থেকে যান মহানগরের  বাইরে অনেক অনেক মেধাবী আলোচক বা সাহিত্য রসিকগণ। যে মেলা "রাজধানী" বা "মহানগর"-এর  ভৌগলিক সীমারেখা অতিক্রম করতে পারে না বা করতে চায়না, সেই মেলা কীভাবে বিশ্ববলয়ে প্রবেশ করবে? শুধুমাত্র বই এর টানেই কলকাতার বাইরের অগণিত সাহিত্য প্রেমী এখানে ভীড় করেন বলেই কি কলকাতা বইমেলা "আন্তর্জাতিক " তকমা পেয়ে যাবে? 
       
বৃহৎ পরিসরে সুসজ্জিত অসংখ্য স্টল, নামিদামি প্রকাশনার অজস্র ভালো ভালো বই , জেলা বইমেলা
থেকে অনেক অনেক এগিয়ে থাকলেও কলকাতা বইমেলা সত্যি কি আন্তর্জাতিকতার মানে পৌঁছতে পেরেছে? 


 

প্রজাতন্ত্র দিবস পালন হলেও বিপ্লবীরা যোগ্য সম্মান পায়নি আজও?
বটু কৃষ্ণ হালদার

জানুয়ারি মাস একদিকে ভারতবর্ষের কাছে অত্যন্ত গৌরবের কারণ এই মাসেই বাংলা মায়ের কোল উজ্জ্বল করে এসেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু।যাঁরা শুধুমাত্র ভারত বর্ষ নয় সমগ্র বিশ্বজুড়ে আলোচিত। আবার অন্যদিকে এই জানুয়ারি মাস অত্যন্ত বিষাদের কারণ এই মাসেই বহু বিপ্লবীদের ফাঁসি হয়েছিল।

স্বাধীনতা লাভের পর ভারতে পালিত হয়ে আসছে প্রজাতন্ত্র দিবস।কিন্তু এই দেশের জনগণ কে যাঁরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা প্রদান করে গেলেন তাঁরা কি যোগ্য সন্মান পেয়েছে?কারণ এই জানুয়ারি মাসেই বহু বিপ্লবীরা ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জায়গায় গেয়েছেন।অনেক বিপ্লবীদের নিষ্ঠুর ভাবেই হত্যা করা হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন মহান বিপ্লবী মাস্টার দা সূর্য সেন ও তারকেশ্ব র দত্ত। এদের কি মনে রেখেছি আমরা?

স্বাধীন,গণতান্ত্রিক,ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে ২৬ শে জানুয়ারী দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিবস হিসাবে পালন করা হয়।দেশের রাষ্ট্রবাদী জনগণ হিসেবে এই দিন টি প্রত্যেক ভারত বাসীর পালন করা উচিত।এই দিন পালনের জন্য বিশেষ ভাবে প্রস্তুতি নেন সেনা বাহিনীর জোওয়ানরা।প্রতিটি ভারতবাসীর জন্যই ২৬ জানুয়ারি দিনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।কুচকাওয়াজ, বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।ভারতকে ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে মুক্ত করা কোনও সহজ কাজ ছিল না। দেশের বীর সন্তান, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ, বলিদানের ফসল স্বাধীনতা। ২৬ জানুয়ারি  দিনটিকে প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালন করা হয়।এই দিন টি সম্পূর্ণ রূপে সংবিধান স্বীকৃত।

জেনে নেওয়া দরকার এই দিনটির গুরুত্ব কি?আমরা জানি ১৯৪৭ সালের আগে ভারত বর্ষ ছিল ব্রিটিশদের অধীনে।সমগ্র ভারত বাসী ছিল তাদের গোলাম। তবে এক্ষেত্রে শুধুমাত্র ব্রিটিশদের দোষ দিলে চলবে না। এক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, মুষ্টিমেয় কিছু ব্রিটিশরা ব্যবসা করতে এসে  কিভাবে সমগ্র ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছর রাজত্ব করে গেল? ভুলে গেলে চলবে না সেই সময় একশ্রেণীর জনগণ শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থে ব্রিটিশদের জামাই আদর করে ভারতবর্ষে শাসন ও শোষণ করতে সাহায্য করেছিল।অর্থ, সম্পদের সাথে সাথে রায় বাহাদুর খেতাব অর্জন করেছিল। তাঁরা চেয়েছিল ব্রিটিশরা রাজত্ব করুক, আমরা তো বেশ আছি পায়ের উপর পা তুলে।অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার মজাটাই  ছিল একেবারে ই অন্যরকম।সার্থকেন্দ্রিক কিছু মানুষের লোভ লালসা ভারতবর্ষের ভাগ্য লক্ষী অচিরেই অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল। আর দেশমাতার অপমান লাঞ্ছনা গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরেই অপর শ্রেণীর নিঃস্বার্থ সন্তানরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করার সংকল্প নিয়েছিল। স্বাধীনতা আনতে গিয়ে ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী,বাঘাযতীন,বিনয়,বাদল,দীনেশ,মাস্টারদা সূর্যসেনদের ফাঁসি কাঠে ঝুলতে হয়েছিল।কেউবা নির্দ্বিধায় ব্রিটিশদের হাতে নিজেদেরকে সমর্পণ করবে না বলে মুখে তুলে নিয়েছিলেন পটাশিয়াম সায়ানাইড।তরুণদের তাজা তাজা রক্তে দেশের মাটি লাল হয়ে উঠেছিল। জালিয়ান ওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এর মত অমানবিক,বর্বর হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ফাঁসির নির্ধারিত সময়ের আগেই ভগৎ সিংদের ফাঁসি কাঠে ঝোলানো হয়েছিল। চন্দ্রশেখর আজাদদের মত বিপ্লবীদের ধরতে ব্রিটিশদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল।তাদেরকে সন্ত্রাসবাদি উগ্রবাদী আখ্যা দেওয়া হয়েছিল।বহু বিপ্লবী দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছিলেন।আবার অনেকেই সুখ স্বাচ্ছন্দ ত্যাগ করে দেশ ছাড়া হয়েছিলেন। জেলে বন্দিদের প্রতি চলতো অকথ্য অত্যাচার।সবার ভাগ্যে গান্ধীজীর মত,জেলের মধ্যে দুটো কামরা বরাদ্দ থাকত না,দুধ,ফলমূল, ঘি দেওয়া হত না, বা জহরলাল নেহেরুর মত জেলে থেকে আগুনে ঝলসানো মাংস,বাটার রুটি  দেওয়া হত না।ফলের জুসও জুটত না। বহু বিপ্লবীদের দিয়ে খাটনির কাজ করানো হতো, আর খাবার দেওয়া হতো খুবই নিম্নমানের, কখনো বা জুটত বাসি খাবার।

সাঁওতাল, সিপাহী, নীল,কৃষক বিদ্রোহ গুলোকে প্রতিহত করতে অকাতরে লাঠিচার্জ করতেন এমনকি কখনো কখনো নির্দ্বিধায় গুলি চালিয়েছেন।তাতে বহু আন্দোলনকারী মারা গিয়েছেন,আহত হয়েছেন। শুধুমাত্র পুরুষরা নন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন নারীরা। বাংলার প্রথম রাজবন্দী ননীবালা দেবী,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাস,মাতঙ্গিনী হাজরারা অকথ্য অত্যাচার সহ্য করেছেন।কেউবা গুলি খেয়েছেন।তাই স্বাধীনতা কিন্তু অহিংসা, সততা কিংবা চরকা কেটে আসেনি।স্বাধীনতা হল বহু বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ এর ফলাফল।


স্বাধীনতা লাভের পর,ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ নাম হল সার্বভৌম সমাজতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র ভারত।ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস বা প্রজাতন্ত্র দিবস পালিত হয় ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ভারত শাসনের জন্য ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইনের পরিবর্তে ভারতীয় সংবিধান কার্যকরী হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে।এটি ভারতের একটি জাতীয় দিবস।১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় গণপরিষদ সংবিধান কার্যকরী হলে ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়।২৬ জানুয়ারি দিনটিকে মহাত্মা গান্ধী নাম দিয়েছিলেন, 'স্বতন্ত্রতা সংকল্প দিবস'। ১৯২৯ সালের বছর শেষে জহরলাল নেহেরুর নেতৃত্বে পূর্ণ স্বরাজ আনার শপথ নেওয়া হয়। এরপরেই ১৯৩০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিনটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল।পরে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করে ভারত এবং ওই দিনটি স্বাধীনতা দিবসের মর্যাদা পায়।স্বাধীনতা দিবসের প্রায় আড়াই বছর পর তৈরি হয়েছিল দেশের সংবিধান। ১৯৪৭ সালে ড. বি আর আম্বেডকরের নেতৃত্বে গঠিত হয় খসড়া কমিটি। ১৯৪৭ সালে ৪ নভেম্বর ড: বি আর আম্বেদকরের নেতৃত্বাধীন খসড়া কমিটি প্রথম ভারতীয় সংবিধানের খসড়া জমা দিয়েছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতীয় সংবিধান কার্যকর হয়। এই সূত্র ধরেই ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

দেশের এক শ্রেণীর নিঃস্বার্থ সন্তানরা নিজেদের জীবন দিয়ে ভারতবর্ষের ভাগ্যলিপি রচনা করেছিলেন।অথচ স্বাধীনতা লাভের পর বহু বিপ্লবীরা যথাযথ মর্যাদা পায় এই ভারতবর্ষে। বর্তমানে চোরেদের নাম ইতিহাসের পাতায় উঠলেও,বহু বিপ্লবীদের আত্মকাহিনী ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়নি।তৎকালীন কিছু রাজনৈতিক নেতাদের আঙ্গুলি হেলনে বহু বিপ্লবীদের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পরে দেশের সরকার বিপ্লবীদের খোঁজখবর নেননি,পায় নি,ন্যূনতম সরকারি ভাতা। কেউবা হাসপাতালে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন কেউবা ভিক্ষা করতে করতে অনেক অভিমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে। যে দেশে নেতাজিদের মতো মহান দেশপ্রেমিকরা স্বাধীনতা আনতে গিয়ে জীবনের অমূল্য সময় নষ্ট করেছেন,সেই দেশে বিপ্লবীদের মর্যাদা না দেওয়া হলেও বহিরাগত রোহিঙ্গা,সন্ত্রাসবাদিদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।রাজ্যের লাগাম উঠছে অযোগ্য নেতাদের হাতে।

যার কারণে ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে অন্য দেশের পতাকা লাগিয়ে ভারত মূর্দাবাদ স্লোগান দেয়।এর থেকে চরম লজ্জার বোধ হয় আর কিছুই নয়।যাঁরা স্বপ্ন দেখতেন:_ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা,অথচ মৃত্যুর পরে এই দেশের মাটিতে তাদের ঠাঁই হয়নি।ইতিহাসের পাতায় বহু বিপ্লবীদের বিজয় গাঁথা স্থান পায় নি,বিপ্লবীরা ভিক্ষা করেছেন সেই দেশে কোটি টাকা খরচ  করে প্রজাতন্ত্র দিবস পালন উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।

ইতিহাস হল মানব সভ্যতার কাছে জীবন্ত দলিল।প্রাচীন ইতিহাস বলছে ভারত বর্ষ ছিল প্রাচুর্য্য, ঐশ্বর্য,অর্থ, ধন সম্পদ খনিজ সম্পদ, কৃষিজ সম্প দে পরিপূর্ন এক উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় দেশ। এই দেশের ধন-সম্পদের লোভে একে একে বিভিন্ন বৈদেশিকশক্তির আগমন ঘটেছে।৭১২ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম বর্বর আরব দের আগমন ঘটেছিল। শুরু হয়েছিল লুটপাটের খেলা।সেই সংবাদ কানে কানে পৌঁছে যায় বহু দেশের লুটেরাদের  কানে। এরপর একে একে শক,হুন, পাঠান,মুঘল,তুর্কি,তুঘলঘ, খলজি সহ বিভিন্ন ডাকাত দল ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে লুটপাট করেছিল দেশের অর্থ সম্পদ। শুধু তাই নয় ফরাসির ডাচ বণিকদের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশে উপস্থিত হয় ইংরেজরা। ৭১২ খ্রিস্টাব্দে থেকে শুরু করে প্রায় ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এই ভারতবর্ষের অর্থ বিভিন্ন দেশে অর্থনৈতিক বুনিয়াদকে মজবুত করেছিল। ভারতবর্ষের জিনিস ধন সম্পদে ভারতীয়দের অধিকার ছিল সেই সম্পদ ব্রিটিশদের সন্তানদের মুখে সোনার চামচ তুলে দিলো। আর এই ভারতের সন্তানরা জন্মগ্রহণ করছে মাথায় ঋণের বোঝা নিয়ে। এর দায় কি শুধুমাত্র বৈদেশিক শক্তিদের? ভারতবর্ষে কি তৎকালীন সময়ে কোন শক্তিশালী বংশধর ছিল না তা আটকানোর জন্য? নিশ্চয়ই ছিল কিন্তু তারা পারেনি শুধুমাত্র ভারতীয়দের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। অথচ সমগ্র বিশ্বের ইতিহাসে একজন মানুষ কলঙ্কিত চরিত্র অপবাদ নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছে। তার নাম হলো মীরজাফর। অথচ এই ভারতবর্ষে হাজার হাজার মীরজাফর ছিল। ব্রিটিশের সময় বহু স্বার্থপর রাজনৈতিক চরিত্রের ব্যক্তিত্ব ছিলেন যারা শুধুমাত্র নিজেদের কথা এবং নিজেদের পরিবারের কথা ভাবতেন। তার কারণে ব্রিটিশদের জামাই আদর করে এই দেশে ধন সম্পদ লুটপাট করতে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছিলেন। তার বিনিময়ে সে সমস্ত রাজনৈতিক মির্জাফররা পেতেন অর্থ আর খেতাব। ভেবে দেখেছেন কেউ স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল দেশে ও বিশ্বাসঘাতক বনাম নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমীদের আত্ম বলিদান। তৎকালীন এক শ্রেণীর রাজনৈতিক মীরজাফরদের সহযোগিতা ও যোগ্য সঙ্গ না থাকলে কখনোই ব্রিটিশরা এ দেশে তাদের নোঙ্গর গা ড়তে পারতেন না। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করতে লক্ষ লক্ষ দেশপ্রেমিক মৃত্যু কে স্বেচ্ছায় আত্মবরণ করেছিল তার একমাত্র কারণ ছিল দেশের মানুষ যাতে স্বাধীন মুক্ত সূর্য দেখতে পায়। দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ যাতে উজ্জ্বল হয়। অথচ স্বাধীনতার পরে আমরা  দেশ সেবার নামে দেশীয় লুটেরাদের লুটপাটের খেলা চলছে স্বাধীনতার পরথেকে। সেই সঙ্গে দেখছি রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার।দেশীয় রাজনৈতিক নেতারা বংশ  পরাক্রমে যুগের পর যুগ দেশের জনসম্পদ দুই হাত দিয়ে লুটছে। জনগণের টাকায় দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করছে সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করছে আর ব্যাংকে বেড়ে চলেছে শূন্যের পর শূন্যের অংক। আর রাজনৈতিক ক্ষমতা অপব্যবহার করে দেশের আইন ব্যবস্থাকে পকেটে পড়ে সাহায্যে শেখের মত দাগি ক্রিমিনাল রা অপরাধ করেও বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।আর যারা ভোট দিয়ে ভাবেন এই বুঝি আমাদের ভাগ্যের আকাশে নতুন সূর্যের উদয় হবে তারা দেশের উন্নয়নের স্বার্থে হাড়হিম করা পরিশ্রম করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করেও কর পরিষেবা দিয়ে যান তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন আর দেশের ন্যূনতম সুযোগ সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হয়। রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য টাকা কোটি কোটি অপচয় করা হচ্ছে সেই সঙ্গে যথেচ্ছ সুযোগ সুবিধা ভোগ করেন।তাদের সন্তান পরিবারের লোকজনেরা মহাসম্ভব ভোগ করেন। রাজনৈতিক ক্ষমতার বলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অযোগ্য ব্যক্তিরা দখল করে নেয়। দেশের টাকায় চলছে মহাভুরিভোজ অথচ এই দেশ দিন দিন দারিদ্র্যের চরম সীমায় পৌঁছাচ্ছে। বেড়ে চলেছে শিশু নারীর শ্রমিকের সংখ্যা। লকডাউনের পর থেকে চরণে পৌঁছেছে কর্মহীনদের সংখ্যা।শিক্ষিত বেকার যুবকদের হাহাকার বেড়ে চলেছে। শিক্ষিত যুবকরা সঠিক কর্মের অভাবে মানসিক বিকার গ্রস্ত হয়ে পড়ছে।নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে।দুর্নীতির পথ বেছে নিচ্ছে হাতে তুলে নিচ্ছে বন্দুক,অস্ত্র,বোমা,গুলি। বেকারত্বের সুযোগ নিয়ে একশ্রীর রাজনৈতিক নেতারা তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে দুর্নীতির পথে। সস্তা তারে শিক্ষিত বেকারদের জীবন বিকিয়ে যাচ্ছে। আর যারা নিজেদের বিবেককে বিক্রি করতে চায় না তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে।রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে চলছে জমি দখলদারি,উচ্ছেদ। সিন্ডিকেট ব্যবসা রমরমে চলছে। সে সমস্ত দখলদারি জমিতে বড় বড় বিল্ডিং ফ্ল্যাট বানিয়ে ব্যবসা চলছে। আর তাতে বেড়েই চলেছে ফুটপাত বাসি, নিরন্ন,আশ্রয়হীন,বিবস্ত্র মানুষের সংখ্যা। দেশের উলঙ্গ শিশুরা কনকনে ঠান্ডায় মাঝ রাতে চন্দ্র অভিযান সাফল্যের আলোতে নিজেদের শরীর গরম করতে চায়। ঠিক যেন গোপাল ভাঁড়ের তালগাছে র উপরে ভাতের হাড়ি বেঁধে নিচে আগুন জ্বালিয়ে ভাত রান্না করার গল্পের মত করুন দৃশ্য ধরা পড়ে। তিলোত্তমা কলকাতার,শিয়ালদা হাওড়া সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় কনকনে ঠান্ডায় মাঝ রাতে গরম কাপড় জামা পরে হেঁটে পায়চারি করে দেখলেই দেশের চরম দুর্দশার মানচিত্রটা আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে যাবে।ফুটপাত,ঝুপড়ি,বস্তি এলাকাগুলোতে  লক্ষ লক্ষ  বয়স্ক বৃদ্ধ বাবা মায়েরা ছোট ছোট শিশুরা অভুক্ত  পেটে স্বাধীন খোলা আকাশের নিচে প্লাস্টিক গায়ে জড়িয়ে কীভাবে ঠান্ডায় কাঁপছে।কোটি কোটি টাকা অপচয় করে জি-টুয়েন্টি সম্মেলন,স্বাধীনতা, প্রজাতন্ত্র,দিবস পালনে মহা ভুরিভোজ হয় সেই দেশের অর্ধেকেরও বেশি জনগণ অনাহারে আধপেটা খেয়ে ওস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রাত কাটায়। অথচ এসব নিয়ে যাদের ভাবার কথা তারা নিশ্চিন্তে ঘুমায় মহা অট্টালিকার আড়ম্বরে। এদেশে ছোট ছোট শিশুদের ভবিষ্যৎ চুরির সঙ্গে সঙ্গে তাদের মুখের অন্ন ও চুরি যায় এর থেকে লজ্জার কিছু হতে পারে? দেশের নেতা-মন্ত্রীরা সমস্ত চিন্তা ছেড়ে এতটা উঁচুতে তাদের বিবেক বসবাস করে যে তাতে কর্মহীন শিক্ষিত,বেকার,অনাহারে আধপেটা  অপুষ্টিতে ভুগতে  থাকা বিকলাঙ্গ শিশুদের কান্না হাহাকার,চিৎকার, তাদের কানে পৌঁছায় না। আর এইসব দেখার জন্যই কি নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকা রা অকাতরে তাঁদের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে স্বাধীনতা লাভের জন্য? এদেশে ভোট আসে,কালের নিয়মে পালাবদলের খেলায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দেশের লাগাম হাতে নেয়।কোটি কোটি টাকা খরচ হয় রাজনৈতিক নির্বাচনে। তাতে একশ্রেণীর গুন্ডাবাজ খুনি দাগি আসামে অযোগ্য বর্বররা নেতা থেকে মন্ত্রী হয়। তাদের কোটি কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স হয়। কুঁড়েঘর অট্টালিকায় পরিণত হয়। আর জীবন বলিদান দিতে হয় সাধারণ নিরীহ জনগণকে। সেই সমস্ত অযোগ্য নেতা-মন্ত্রী রা সাধারণ জনগণের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে বলা ভালো তাদেরকে ঠকিয়ে নিজেদের সন্তানদের মুখে তুলে দেয় রাজভোগ,পোলাও,বিরিয়ানি দুধের গ্লাস। গুন্ডা মস্তান খুনি দাগে আসামিরা যখন নেতা মন্ত্রী হয়ে যায় তাদের সন্তানরা নামিদামি স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়।আর ভোট দাতাদের সন্তানরা নামমাত্র স্কুলেও পড়ার সুযোগ পায় না।

এক শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতা মন্ত্রীদের হায়নার থাবা থেকে বাঁচতে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে:_"হে ব্রিটিশ তোমরা ফিরে এসো/ পরাধীনতা আমার জন্মগত অধিকার/ এদেশের লাগাম আবার হাতে তুলে নাও"।


 

দেশনায়ক নেতাজী

মিত্রা রায় চৌধুরী


অনেকদিন বন্ধ থাকা জালনার কপাট গেল খুলে অন্ধকার ঘরে আলোর রশ্মি প্রবেশ করলো। বিচ্ছুরিত আলোর রেখা দেওয়ালে এঁকে দিল  স্বাধীনতার ছবি। আমরা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম।কে দেখালো আমাদের এই স্বপ্ন?

বিবেকানন্দর ভাবধারায় অনুপ্রাণিত এক ভারত সন্তান,তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু।  জানুয়ারি মাস পড়লেই আমাদের ভীষণভাবে মনে পড়ে যায় দুটো তারিখ ২৩ শে জানুয়ারি আর ২৬ শে জানুয়ারি। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতা ভগৎ সিং এর ভাষায় "বঙাল কি শের "এই দিনেই পৃথিবীতে পদার্পণ করেছিলেন।২৩শে জানুয়ারির ভোর মানে অনেক স্মৃতি আর এক অদ্ভুত অনুভূতি। ছোট থেকেই তিনি দেশাত্ম বোধে  উদ্বুদ্ধ ছিলেন। ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য নেতাজী প্রভূত চেষ্টা করেছিলেন। ভারতবাসীদের বলেছিলেন "তোমরা আমাকে রক্ত দাও আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।" তার ডাকে সাড়া দিয়ে অনেক যুবক এগিয়ে এসেছিল। সুভাষচন্দ্র বসু একজন ব্যতিক্রমী বহুমাত্রিক উদ্দীপক চরিত্র। শুধুমাত্র বিপ্লবী বললে তার সঠিক মূল্যায়ন হয় না। তিনি চিন্তাবিদ,দার্শনিক,সংগঠক। কূটনীতিক ও রাষ্ট্রভাবনার এক রূপকার। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তার ধারণা ছিল খুবই স্বচ্ছ। কোন রকম আপোষে তিনি রাজি ছিলেন না, তৎকালীন বহু বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের সাথে তার বিরোধ বাধে, তাই তিনি নিজের পথে আলাদা ভাবে একা অগ্রসর হন। নেতাজি উপলব্ধি করেছিলেন ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য সশস্ত্র বিপ্লব দরকার তার জন্য দরকার সংগঠিত প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনী। তাই সুভাষ কে বেছে নিতে হয়েছিল অজ্ঞাতবাসের অনিশ্চিত পথ।শক্তিশালী ব্রিটিশ দের বিরুদ্ধে লড়তে হলে দরকার প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সেনা বাহিনী। আর তার জন্য নিতে হবে বৈদেশিক সাহার্য্য। সেই উদেশ্য নিয়ে তিনি গোপনে ভারত ছেড়ে ছিলেন কারণ বিরুদ্ধ শক্তি তাকে বাঁধা দিয়েছিল।

জাপান ও জার্মানির সহায়তা তিনি চেয়েছিলেন। জাপানের  সহায়তায় তিনি গঠন করেন আজাদ হিন্দ ফৌজ। রাসবিহারী বসুকে সারথি করে সেই ফৌজ নিয়ে তিনি আধমরা ভারতীয় রাষ্ট্রকে আঘাতের পর আঘাতে জাগিয়ে তোলার সংকল্পে স্বদেশের দিকে ধেয়ে এসেছিলেন। কিন্তু পথে তাকে  তীব্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। নেতাজি ভারতবাসী কে স্বাধীনতা এনে দিতে পারেননি কিন্তু কোন পথে তাঁরা স্বাধীনতা পাবে সেই দিক নির্দেশ করে গেছিলেন। অকষ্মাৎ তিনি যদি হারিয়ে না যেতেন তবে হয়তো ইতিহাস অন্য কথা বলতো।আমরা শুনেছি তিনি এক বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। তার মৃত্যু আজও রহস্যাবৃত। তিনি যথার্থই দেশ নেতা ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে" দেশনায়ক" উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। 
                
বর্তমানে আমরা যতই আদর্শ হীনতা ও ব্যক্তি স্বার্থের পঙ্কিলতায় আবর্তিত হচ্ছে ততই নেতাজী আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন নেতাজি এক Tragic হিরো তিনি এক অনন্ত জিজ্ঞাসা। ২১ শতকে ২৩ শে জানুয়ারিতে পৌঁছে নেতাজি আমাদের হৃদয়ে ভীষণভাবে বর্তমান। আজ বাগদেবীর আরাধনার সাথে তার জন্মদিনও পালন করছি আমরা। দিনটি শুভ এই দিনে তাকে স্মরণ করে আমরা ধন্য।


 

রম্য গল্প 


বেঁচে গেছি
প্রদীপ কুমার দে


গরম খুন্তির বারি,পাছায় ফচাং করে বসিয়ে দিল আমার এককালের হৃদয় হরণকারিণী বর্তমানের রণচন্ডী স্ত্রী দুলালি। প্রচন্ড রেগে আমার দিকে ধাবিত হয়ে হাতের খুন্তি আমার পেছনে বসিয়ে দিতেই আমি কঁকিয়ে উঠলাম,
--  ওরে বাপরে! মরেই গেলুম যে রে ... 

লাল চোখে আমার চুলের মুঠো ধরে রামখিস্তি চালাল সে,
--  মেরে মেরে হাড্ডি চুন চুন করে দেবো ....

আমার দোষ এমন কিছুই নয়। পাশের বাড়ির উঠতি কিশোরীর সাথে আমি একটু হেসেখেলে কথা বলেছিলাম। আর একটু  ইচ্ছে হয়েছিল তাই তো...

--  কি করছিলে ওই বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে?

--  ছিঃ ছিঃ কি সব বলো? এই সূর্যালোক আর ওই মেয়েটার সাথে কি করব?

--  তোমাকে আমার বিশ্বাস নেই। তুমি মেয়ে পাইলেই হল। আচ্ছা কিছু যখন করোনি তখন ওর বাচ্চার বাপের নামটি বলে ফেলো দেখি?

--  দেখো কান্ড! তুমি আবার কিছু বলে দিও না যেন। ও তো রণাদার মেয়ে। ওই জানে ....

--  বুঝতে পারলাম। ওই যে সুনীর কথা বলছো, কিছুদিন আগে যে বিয়ের আগেই অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিল সেটি কে ছিল?

--  না না, ওটা কিন্তু আমার ছিল না। ওটা সেই সুজনদার ছিল।

--  তবে রে হারামী তুই সব জানিস? তোর ছিল না? তুই কি করে বুঝলি?

--  মাইরি বলছি। আমার নয়। সুনী জানে ওটা ওই সুজনেরই।

ব্যাস হয়ে গেল। সব টেনে বার করে নিল মুখ থেকে। তারপর শুরু হল বেদম মার। কেলিয়ে কেলিয়ে আমায় দফারফা এক করে ছেড়ে দিল। এক সপ্তাহ খাওয়া দাওয়াতেই টাইট দিয়ে দিয়েছিল।

বেঁচে গেলাম শুধু  সুনী আমাকে বাঁচিয়ে দিল তাই। সুনী একটু টাল ছিল। আমারও কাজ ছিল। একটু আধতু ফস্টিনস্টি করেওছিলাম। বাচ্চাটা কার কে জানে?
 
আমি বেঁচে গেছিলাম ওর দাদা ডাকে। আর ওটা ওই সুজনের বাচ্চা বলে স্বীকার করে নেওয়ায়। তবে পরে শুনেছি সুজনের বাড়িতে গিয়ে ওর বউকে আবার আমার বাচ্চা বলেই ওকেও এই একইভা‌বে বাঁচিয়েছিল।

যাকগে আমি বেঁচে গেছি এটাই বড় কথা।
-------------

স্ত্রী নয়তো একেবারে গরম ইস্ত্রি! এই ইস্ত্রিটাই যে আমার বুকের উপর চেপে রয়েছে কিন্তু কাউকে কিচ্ছুটি বলতে পারছিনা,  ভাবতে পারছেন বিবাহের ভবিষ্যৎ কি?

ওরে আমার স্ত্রী দুলালি, 
তুই আমারও জান নিলি ?
প্রাক বিবাহ বা প্রেম খুবই মোলায়েম, মন আর শরীর ছুঁকছুঁক করে। কখন কথা হবে কখন জাপটা   জাপটি হবে, একটু আনন্দ আর অনেকটাই খরচ। আরে তখন কি আর খরচের কথা প্রশয় পায় তখন শুধুই এক অজানা নারীর সুখে ভাসার চিন্তা।

এখন বুঝতে পারি ঈশ্বরের কি দান। নারীর সৃষ্টি পুরুষের মরণ। দগ্ধ হওয়া! নারীর হাতে দগ্ধে দগ্ধে মরা। আমি এখন সুযোগ খুঁজি। কি করে ওরে জব্দ করা যায়? কেবলই এই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায়।
চিন্তা করছি এইসব। এমন সময় স্ত্রী দৌড়ে এল, ভাল করে কথা বলল,
--  এই আজ আমায় একবার বাবার কাছে নিয়ে যাবে?

--  তোমার বাবাকে আমার পছন্দ হয় না। বাজে লোক ....

--  ধ্যামনা একটা। বদমাশ। মেরে তক্তা বানিয়ে দেব, যদি আর একবারও আমার বাপের নামে গালি দিবি। এবার শোন মিনসে, আমার বাবা নয় সবার বাবা তারকেশ্বর তারকভোলার কথা বলছি রে ...

ভয়ে সিঁটিয়ে গেলাম। মার খাওয়ার থেকে তারকেশ্বর নিয়ে যাওয়াই ভাল। 
--  ওহঃ তাই বলো, তা চলো,

বেরিয়ে পড়লাম। লোকাল ট্রেনে টিকিট কেটে চড়েই আমার বুদ্ধিমতী স্ত্রী নিজে বসেই ওর রুমাল দিয়ে আমার একটা সিট দখল করল আর আমাকে প্ল্যাটফর্ম থেকে ঝালমুড়ি কিনে আনার নির্দেশ জারি করল, আমি ঝামেলায় পড়লাম আবার ট্রেন থেকে নেমে দৌড়ে স্ত্রীর আদেশ মানতে গেলাম, আদরের দুলালি যে ঝালমুড়ি খেতে চেয়েছে।

ঝালমুড়ি কিনে ট্রেনে চড়ে দেখি ঝামেলা। আমার সিটে ফেলে রাখা রুমাল সরিয়ে এক পাক্কা লোক বসতে চাইছে আর আমার রাগী স্ত্রী তাকে ধমকাচ্ছে এই বলে যে এখানে একজন আছে। আমি উঠেই লোকটাকে ধমকে সরিয়ে দিলাম,
--  আমি রুমাল দিয়ে সিট রিজার্ভ করে রেখেছি যে ....

বলেই আমি ওনাকে অবজ্ঞা করে রুমাল তুলে সিটে বসে পড়লাম। কারোর কিছুই বলার নেই। লোকটি কারোর কোন সাপোর্ট পেল না।
আমার স্ত্রী একগাল হেসে আমাকে কনুইয়ের গোঁতা মেরে জানিয়ে দিল দেখেছো আমার বুদ্ধি?  তোমার ঘঠেতো আর বুদ্ধি নাই।

লোকটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে কটমট করে চেয়ে রইল। ভয় পেয়ে গেলাম।

আমি চোখ বুঁজে ঘুমানোর ভাণ করলাম। স্ত্রী সারারাস্তা ট্রেনে বসে মোবাইলে ভিডিও দেখল। তারকেশ্বর স্টেশন এসে গেল। স্ত্রী আমায় টান মেরে তুলল। আমি উঠেছি আর দুলালি উঠতে যাবে দাঁড়িয়ে থাকা সেই লোকটি ঠিক সেই মুহূর্তে অকস্মাৎ একটা রুমাল আমার স্ত্রীর গায়ে ফেলে দিল। ব্যাপারখানা কি হল?
স্টেশন এসে গেছে, আমি নামতে চাইলে ওই লোকটি  স্ত্রীকে আটকে দিল,
--  আমি রুমাল ফেলে আপনার স্ত্রীকে রিজার্ভ করে রেখেছি, ও এখন আমার।

প্রথমে রেগে গেলাম। প্রতিবাদে চেঁচামেচি করতে গিয়েও থেমে গেলাম।
আমি চমকে উঠলাম। এবার মিনিটে আমার বুদ্ধি কাজ করে গেল, যাক এবার উচিত ব্যবস্থা হয়েছে। একেবারে হাতেনাতে ফল।

ট্রেনের অন্য প্যাসেঞ্জাররা অবশ্যই সবাই ওই লোকটিকেই সাপোর্ট করে দিল।

লোকটি জানাল,
-- আপনি এখন আমার। আমার সাথেই যাবেন আমার স্ত্রী হয়েই .....

এতদিন পর দেখলাম স্ত্রীর অবস্থা সঙ্গীন। ভয়ে মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। আমি তো এরকমই কিছু একটা চাইছিলাম।  খুব ভাল হল। এনজয় করছি। কিন্তু পারলুম কই?
স্ত্রী আমাকে চেপে ধরে কাঁদো কাঁদো মুখে জানাল,
--  ওগো কিছু একটা করো, আমি ওর সাথে যাব না। 

লোকটি এবার হেসে ফেলল,
--  ভয় পেলেন? না ভয় নেই। মজা করলাম মাত্র।

বুঝলাম। আমার মতো আর কেউই এইরকম বোকা স্বামী হতে চাইবে না।


 

গল্প


তরাই ডরায় না

   চিত্রা পাল 


তরাই,ও তরাসি তরাই,তরী তরণী মায়ের ডাক শুনতে পাচ্ছে ও, তার সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের অষ্টোত্তর নামের মতো পরপর তার কত নাম। কিন্তু সাড়া দেবার অবস্থায় থাকলে তবে তো সাড়া দেবে। কোনো রকম করেই ওর গলার স্বর এখন একেবারে বেরোবে না। কি করে শব্দ বেরোবে!মায়ের ডাক শুনে ঘর থেকে বেরোতে গিয়েই না দেখতে পেলো দরজায় লম্বা শুঁড় দুটো। আর মুখটা ওর দিকেই ফেরানো। ওর মনে হলো যেন কটমট্‌ করে চেয়ে আছে ওর দিকে।ওরে বাবা, এখন সাড়া দেওয়া যায়? যদি সাড়া শব্দ শুনলেই ওর দিকে ধেয়ে আসে ,গা বেয়ে উঠে পড়ে তাহলে? তাহলে মনে হয় ও অজ্ঞান  হয়ে পড়ে যাবে। 

নাঃ, মেয়েটা আমাকে একেবারে পাগল করে দেবে। কি যে ভীতু হয়েছে,জন্তু জানোয়ারে ভয় খায়,সে তবু একটা কারণ থাকে,এ আরশোলা দেখে ক্যানো যে এতো ভয় পায়,কে জানে বাবা।এতো সব বকবক করতে করতে ভাই সোনাইকে কোলে নিয়ে যেই ওর মা ঘরে ঢুকলো,তরাই এর একছুট্টে মাকে জড়িয়ে ধরে তবে শান্তি। 

কোথায় দেখলি তেনাকে? মায়ের প্রশ্নের উত্তরের জন্যে এখন গলার স্বর বেরোয়, কথা ফোটে মেয়ের, ঐতো, দরজার ফাঁকে।  কই, কোথায়?আমি তো তাকে খুঁজেই পাই না,অথচ তোরই ঠিক চোখে পড়ে।তুই সব সময় খুঁজে খুঁজে বার করিস নাকি ওদের বলতো? বলেছি না,একগাছা ঝাঁটা দিয়ে পিটিয়ে একেবারে নিকেশ করে দিবি।‘বলতে বলতেই ওর মায়ের চোখে পড়লো,আর ঝাঁটার বাড়ি দিয়ে পিটিয়ে দিতেই শেষ। কিন্তু একবার ঘা খেতেই আরশোলা যেই ফরফর করে লাফিয়ে ওড়বার চেষ্টা করেছে,তরাই লাফিয়ে ঊঠেছে তড়াক্‌ করে,সেই ধাক্কায় ওর ভাই মাটিতে পড়ে মাথায় খেলো জোর ধাক্কা। কপাল এ জোর কালশিটে ছোপ। ওর ভাই এর একেবারে হেঁচকি তুলে কান্না। তরাই দৌড়ে  গিয়ে জল এনে ভাই এর মাথায় থাবড়ায়।তারপরে কান্না থামানোর জন্যে কত আদর করে খেলনা এনে দেয়। 

   তরাই এর মা রেগে গেলেও রাগ সামলিয়ে নিয়ে ওকে বোঝায়,তরাই তুই মিথ্যে এতো ভয়  পেলি।দেখলিতো এক বাড়িতেই সব শেষ। সেদিন তুই সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলিস, বেড়ালটা নাবছিলো,আচমকা ওকে দেখে তুই ভয় পেয়েছিলিস।তুই যদি সোজা ওপরে উঠে যেতিস কিছু হতো না, কিন্তু ভয় পেয়ে পিছু হটতে গিয়ে পড়ে যেতিস, আর হাড় গোড় সব ভাঙ্গতো যদি না মান্তুর মা তোকে  ধরে ফেলতো। দ্যাখ, ভয় পেয়ে ও  রকম করবি না। আরে ওরাও আমাদের দেখে ভয় পায়  তা জানিস?

আসলে তরাই যে অনেক ব্যাপারেই খুব সাহসী, সচেতন সেই ব্যাপারটা চাপা পড়ে যায় এই সব খুচরো  ঘটনার তলায়। এই তো সেদিন ওর ক্লাসের মধুঋতা খুব কাঁদছিলো টিফিনেরসময়ে। ও  একটা পেয়ারা এনেছিলো,টিফিনের সময়ে খাবে বলে, এখন দ্যাখে সেটা ওর ব্যাগে নেই। কে যেন কখন ওর ব্যাগ থেকে সেটা হাপিস করে দিয়েছে। তরাই ক্লাস ঘর থেকে বেরিয়ে লক্ষ্য করার চেষ্টা করে কেউ পেয়ারা খাচ্ছে কি না। দ্যাখে, দূরে পাচিঁলের ছায়ায় পল্টন আর রণি কি যেন করছে। দৌড়ে কাছে গিয়ে দ্যাখে,একটা চাকু দিয়ে পেয়ারা কাটার চেষ্টা করছে। খানিকটা কেটে যেই ছিঁড়ে নিতে গেছে,তরাই ও দের মাঝে পড়ে এক্কেবারে চিলের মত ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে দৌড়ে মধুঋতার হাতে দিয়ে বলে শীগগিরি খেয়ে ফ্যাল। মধুঋতা ভয়ে ভয়ে ওর দিকে তাকাতেই তরাই বলে,তুই ওদের ভয় পাচ্ছিস?দাঁড়ানা, আসুক একবার,আমি সোজা ওদের মিসের কাছে নিয়ে যাবো। তারপরে মিস ক্লাসে এলে তরাই সব বলে দিলে ওরা মিসের কাছে খুব বকা খেলো। 

  এবার বার্ষিক পরীক্ষার পরে তরাই ওর মা বাবার সঙ্গে চলেছে শান্তিনিকেতন বেড়াতে, সঙ্গে ওর ভাই ও আছে। তরাই এখন বিশ্বকবির কবিতা পড়েছে, গান শুনেছে ওনার ছবি দেখেছে। ওর একটা ধারণা তৈরি হয়েছে। তাই শান্তিনিকেতন যাবার ব্যাপারে ওর খুব উৎসাহ।     হঠাত্‌ ঠিক করা তো তাই শেষ মেষ কাঞ্চন কন্যাতেই বুকিং হল।  

ট্রেনটা খুব লেট্ করছে। তরাই এর আর অপেক্ষা করতে ভাল লাগছে না। প্ল্যাটফর্মেই এদিক ওদিক দোকানগুলো দেখছে। খেলনার দোকানে একটা খেলনা রিভলবার খুব পছন্দ হল ওর।খুব ইচ্ছে হল ওটা কেনার। বাবার কাছে বায়না করে জোর করে ওই রিভলবারটা কিনলো। ওটার মজা হচ্ছে রিল ক্যাপটা একবার পরিয়ে দিলে পর পর অনেকগুলো ফায়ার করা যায়। ওর মা ওর হাতে বন্দুক দেখে  বলে, তুই এটা কিনলি ক্যানো।তুই যা ভীতু ,ওতো পড়েই থাকবে।ও যে যাই বলুক তরাই এখন  ওটাকে  হাত ছাড়া করছে না। হাতেই রেখে দিয়েছে। 

  এখনও ট্রেন আসছে না। সবাই ছট ফট করছে, পায়চারি করছে। এমন সময়ে ঘোষনা শোনা গেল, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন এসে যাচ্ছে। দূরে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে। এখন এই গরমে এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস সবাইকে স্বস্তি এনে দিলো। এমন সময়ে ঘোষণা শোনা গেলো, ট্রেন এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ওভার ব্রীজ পেরিয়ে যেতে হবে ওই প্ল্যাটফর্মে। সবাই হুড়মুড় করে বাক্স প্যাঁট্রা নিয়ে ছুট লাগালো ওদিকে।এদিকে সেই মুহুর্তে শুরু হল কাল বৈশাখি ঝড়।ঠান্ডা হাওয়া সেই আগমন বার্তাই দিয়েছিলো ঠিকই, রাত বলে আকাশের অবস্থা বোঝা যায়নি। তুমুল ঝড় সঙ্গে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি। আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর এক কান্ড ঘটলো, হঠাত্‌ সব আলো নিভে গেলো। দক্ষ যজ্ঞ বা লংকা কান্ড বোধ হয় এভাবেই হয়েছিলো। যাত্রীদের হৈচৈ চিত্‌কারের ভেতরে সব ছাপিয়ে ভেসে এলো শিশু কন্ঠের গগন বিদারী চিত্‌কার।তার পরক্ষণেই  ধ্বনিত হলো দুম দুম বন্দুকের গুলির  শব্দ। শব্দ মাহাত্ম্যেই ভীড় হালকা।দেখা গেলো ওভারব্রীজের ওঠার সিঁড়িতে দুই শিশুকে জড়িয়ে ধরে তার মায়ের কান্না আর তাদের পাশে তরাই দাঁড়িয়ে তার বন্দুক হাতে। তরাই এর  বাবা উদ্ভ্রান্ত হয়ে  তরাইকে খুঁজছিলো। ওকে দেখতে পেয়েই সব শঙ্কা এক মুহুর্তে রাগে পরিণত হয়ে গেলো। ওর বাবা তার হাত ছেড়ে চলে আসার জন্যে তাকে চড় মারার জন্যে হাত তুলতেই কে যেন খপ করে তার হাত ধরে নামিয়ে দিয়ে  তরাইকে বুকেজড়িয়ে ধরে। সে আর কেউ নয় ওই  শিশুদুটির বাবা। বলে, আজ আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে আমার বাচ্ছাদুটোকে ফিরে পেয়েছি। ও যদি ও  সময়ে সাহস করে ফায়ার না করতো, ওরা আর একটু হলে মানুষের পায়ের চাপে থেঁতলে যেতো।  আপনার মেয়ের সাহসের জন্যে অনেক ধন্যবাদ।দাদা, আপনার মেয়ের মতো সন্তান যেন সবার ঘরে হয়। আজ  তরাই এর সাহসের প্রথম পুরষ্কার প্রাপ্তি ঘটলো ওর বাবার আনন্দাশ্রুতে।    


 

হারানো রোদ

লীনা রায়

পর পর তিনবার শাঁখ বাজলো পাশের বাড়িতে। মাধবী তখনও বিছানায়। লেপের বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু সন্ধ্যা দিতে হবে। তাই উঠতেই হলো। খাট থেকে নেমে মেঝেতে পা ছোঁয়াতেই কেঁপে উঠল মাধবী। মনে হলো বরফের চাঁই-এর ওপর পা রেখেছে। সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল বরফ ঠান্ডা। শুরু হল কাঁপুনি। কোন রকমে টেনে হিঁচড়ে কাঁপতে থাকা শরীরটাকে বিছানায় তোলে মাধবী। সন্ধ্যা দেওয়া হয় না। লেপের ভেতরেই হাত জোড় করে প্রণাম করে। ভগবানের কাছে অক্ষমতার জন্য মাফ চায়।

মাধবীর বয়স ষাট পেরিয়েছে। কিন্তু এত ঠান্ডা কোন শীতকালে পায়নি। আগে শীতের এত জামা কাপড়ও ছিল না। যদিও বয়স তখন বয়স কম। তাই হয়ত রক্তের জোর ছিল। ঠান্ডায় কোনদিন কাবু হয়নি মাধবী। উল্টে শীত তার বরাবর প্রিয়। কিন্তু এবার সব কিছু অন্যরকম। বড় অসহায় লাগছে।

দু'তলা বাড়ি। ওপর নিচ মিলিয়ে খান দশেক ঘর। বাড়ির সদস্য সংখ্যা পনের। শ্বশুর, শাশুড়ি ছাড়াও সাত অবিবাহিত ননদ, নিঃসন্তান খুড় শ্বশুর, শাশুড়ি। বাড়ির একমাত্র ছেলের বৌ মাধবী। কাজের লোক থাকলেও রান্না বান্না, ঘরদোর গুছোনো সব একা হাতে সামলেছে। একে একে তিন সন্তানের মা হয়েছে। দায়িত্ব বেড়েছে। একসময় শ্বশুর, শাশুড়ি চলে গেলেন। একে একে ননদদের বিয়ে হয়ে গেল। ছেলেরাও পড়াশুনো শেষ করে চাকরি করতে বাইরে গেল। বাড়িতে তখন মাধবী আর ওর কর্তা।

কর্তা অফিসে বেরিয়ে গেলে বাড়ি ঘর, বাগানের দেখভাল করে আর বাকি সময়টা টিভি দেখে দিব্যি কেটে যেত। সময় মতো ছেলেদের বিয়ে দিয়েছে। তারা সংসার, চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে সেভাবে আসতে পারে না। ফোনে কথা হয়। ছুটির দিনে ভিডিও কল। বেশ চলছিল। কিন্তু দু বছর আগে হঠাৎ করে ঘুমের মধ্যেই মানুষটা চলে যায়। আর এরপর থেকেই একটু একটু করে বদলে যেতে থাকে মাধবীর জীবন।

বাবার মৃত্যুর মাস তিনেক পর তিন ছেলে একসঙ্গে বাড়িতে আসে। এত বড় বাড়িতে মায়ের একা থাকা নিয়ে তারা তিন জনেই বেশ চিন্তিত। সেজন্য তারা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঠিক করেছে বাড়িটিকে বিক্রি করা হবে। তারপর বাড়ির পাশের ফাঁকা জায়গায় একটি দু' কামরার বাড়ি বানানো হবে। তিন ভাই সব ঠিক করেই এসেছিল- বাড়ির খদ্দের থেকে জমির দলিল অব্দি। মাধবী কিছু বলেনি। সই করে দিয়েছিল। তিন মাস লেগেছিল নতুন বাড়ি তৈরী হতে। আর তারপরেই পুরোনো বাড়ি ছেড়ে নতুন বাড়িতে উঠে আসে মাধবী।

অত বড় বাড়ি ছেড়ে এসে প্রথম প্রথম দম বন্ধ হয়ে আসতো। খোলা মেলা একটা পরিবেশ থেকে আচমকা দুটো ঘরে বন্দী জীবন। কষ্ট হত খুব। অভিমানে বুক টনটন করতো। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব সয়ে আসে।

দু' বছরে কত কিছু বদলে গেল। নতুন বাড়ি, নতুন জীবন। এতে অভ্যস্ত হতে না হতেই শুরু হলো তাদের বিক্রি হওয়া বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট তৈরির কাজ। বাড়ি ভাঙার শব্দে বুক ভেঙে যেত মাধবীর। দরজা, জানালা বন্ধ করে, টিভির আওয়াজ বাড়িয়েও কোন লাভ হত না। তার অমন সুন্দর বাড়ির জায়গায় এখন সাত তলা ফ্ল্যাট উঠছে।

এক পাশে সাত তলা ফ্ল্যাট, অন্য পাশে তিন তলা বাড়ি। মাঝে মাধবীর দু' কামরার বাড়ি। সারাদিন রোদের দেখা পাওয়া যায় না। শেষ বিকেলে সামনের বারান্দার কোন বরাবর এক চিলতে রোদ দয়া করে স্পর্শ করে যায়। হলদে রঙের মরা রোদ। সে রোদের রঙটুকুই সার। তাত নেই। মজা করে মাধবী ওর বাড়িটিকে বলে অসূর্যস্পর্শা। ভেজা ভেজা দেয়াল, বরফ ঠান্ডা মেঝে, ওম হারানো লেপ, তোষক নিয়ে মাধবীর নতুন সংসার।

সারাদিন বিছানায়। সন্ধ্যাটাও দিতে পারেনি। মনটা খচখচ করছে মাধবীর। এক কাপ গরম চা পেলে হয়ত শরীরটা একটু গরম হত। কান্না পায় মাধবীর। বাড়িটার কথা মনে পড়ে। চোখ বন্ধ করেও স্পষ্ট দেখতে পায় রোদে ভেসে যাওয়া সেই বাড়ির ছাদ, উঠোন। ঠিক সেই সময় বালিশের পাশে রাখা ফোনটা বেজে ওঠে। না দেখেও বুঝতে পারে তিন ছেলের কেউ একজন করেছে। লেপের বাইরে হাত বের করে ঠান্ডা ফোনটাকে ছুঁতে একটুও ইচ্ছে হলো না মাধবীর।


 

শিল্পী 

অভিজিৎ সেন


পৈত্রিক সম্পত্তির মধ্যে পেয়েছে এক বিঘা চাষযোগ্য জমি, মাথা গোঁজার মতো ছোট্ট দুটি ঘর, এক ফালি উঠোন এবং তার প্রিয় একতারা। কৃষি কাজে মন নেই জগাই বাউরির। জমি আধি দিয়ে দিয়েছে। আধিয়ার যতটুকু দেয় তাতেই সে সন্তুষ্ট। একা মানুষের চলে যায়। করনায় মা বাবা দুজনেই চিরকালের মতো বিদায় নিয়েছেন জীবন থেকে। জগাই নিজে গান লেখে, সুর দিয়ে একতারা বাজিয়ে মনের আনন্দে গেয়ে ওঠে। কী অসামান্য কন্ঠ তার,সকলের মন কেড়ে নেয় ! আত্মভোলা মানুষটি সারাদিন ঘুরে বেড়ায় নদীর ধারে, ধানক্ষেতে। প্রকৃতিকে সে যে কী ভালোবাসে সে নিজেও‌ জানে না ! তার গ্ৰামের মেঠো পথে কখনো কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, দেবদারু,নিম,আমলকি,কদম গাছের চাড়া এনে পুঁতে দেয়, শিশুর মতো যত্ন করে । এদিকে নিজের প্রতি থাকে সম্পূর্ণ উদাসীন। 'বিশ্ব পরিবেশ দিবসে'র দিন গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের নিয়ে বৃক্ষরোপণের আয়োজন করে । পরিবেশ বিষয়ক গান বেঁধে গ্ৰামের ক্ষুদেদের নিয়ে গোটা গ্ৰামে প্রভাতফেরী করে । তার সহজ সরল শিশুর মতো আচরণে শিশুরা যেমন তাকে ভালবাসে, প্রকৃতিও যেন ! গ্ৰামের ছোট ছোট ছেলে মেয়েগুলো তাদেরই একজন ভেবে নামধরে তাকে ডাকে,বলে,'জগাই চল্,খেলবি না,তুই শীতলা মন্দিরের ভেতরে চাঁপা গাছটি লাগিয়েছিলি। গাছটা বড়ো হয়েছ, কতো ফুল ফুটেছে । চল্ না আজ সেখানে যাই । ' জগাই ও সে কথা শুনে হাতে একতারা নিয়ে চললো সেখানে। রান্না করার কথা,ঘরের দরজায় তালা দেওয়ার কথা বেমালুম ভুলে গেলো । 
             
ছবির মতো সুন্দর, দর্শনীয় তাদের গ্রামটি। এই গ্রামের বুকচিরে মুজনাই নদী বয়ে চলেছে । এই নদী শুধু এ গ্ৰামের একটি নদী মাত্র নয়,নদীটি গ্ৰামের মা । নদীর বুকে আবর্জনা ভরে গেলে,গ্ৰামের সকলে মিলে পরিস্কার করে। নদীর তীরেই হয় শ্যামা পূজা । গানের আসর বসে,বৈঁচি প্রতিযোগিতা হয় । নদী তীরবর্তী জমিগুলি পলি পড়ে পড়ে হয়েছে উর্বরা । শরৎকালের শান্ত নদী, বর্ষায় ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। পাড় ভাঙ্গে। ঘর ভাঙ্গে। চাষের জমি নদীর বুকে মিশে যায়।এ নদীই গ্রামের মানুষদের মাছের যোগান দেয়, হয় জল সেচও । এখানকার মানুষের জীবন,জীবিকা ও সংস্কৃতি আবর্তিত হয়ে চলেছে বছরের পর বছর ধরে এভাবেই মুজনাই নদীকে কেন্দ্র করে । এই নদীর তীরেই জীবনের নানা পর্যায় পার করে অন্তিমে এই নদীর জলেই মিশে যায় মৃতদেহ ছাই আকারে । নদীর পাড়ের এই শ্মশান-কালীমায়ের পূজাটি হয় ঘটাকরে । মুজনাই নদী এ গ্রামের মা। মায়ের মতন স্নেহের ছায়ায় গ্রামটিকে আগলে রেখেছে। নদীপাড়ে ও গ্রামে আছে অজস্র সবুজ গাছপালা,লতা-গুল্ম । জগাই বাউরির বাড়ি মুজনাই নদীর তীরে এই গ্রামে। গ্রামের নাম চাঁপাডাঙ্গা । গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই কৃষক। খুব কম সংখ্যক মানুষই চাকুরীজীবী । নদীর এপার ওপারে দুটি গ্রাম। জগাই এর বাড়িটি নদীর তীর সংলগ্ন। নদীর জলের অজস্র তরঙ্গ ভঙ্গ সে প্রত্যক্ষ করে আর মাছরাঙ্গার মতো এক দৃষ্টিতে নদীর দিকে চেয়ে থাকে। আপন মনে হাসে। হাসতে হাসতে নিজের মধ্যে ডুবে যায়। ভেতরের ভাবনাগুলো কন্ঠ ঠেলে ঠোঁটের পাশে চলে এলে অপূর্ব মধুর গান বেরিয়ে আসে, মন হালকা হয়। প্রাণ খুলে সে গান ধরে। তার গান শুনে পথচারীরা মুহূর্তের জন্য হলেও দাঁড়িয়ে যায়, কেউ কেউ গুনগুন করে তার সঙ্গে গান করে। কী গভীর দরদ দিয়ে সে গানগুলো লিখে আবার দরদ ভরা কন্ঠে গানগুলো গায় ! মুঝনাই নদীর শীতল বাতাস, পাখিদের কলকাকলি এবং জগাই বাউরীর গান এই গ্রামের মানুষের কাছে সমার্থক বোধক । আবার কেজো লোকের কাছে সে একটা অকর্মণ, অপদার্থ। কেউ তাকে ডাকে 'পাগল 'বলে। কেউ বলে 'খ্যাপা'। যে যাই বলুক গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ তাকে ভালবাসে, স্নেহ করে তার শিশুসুলভ সারল্যের জন্য।


                    সূর্যোদয়ের আগেই সে উঠে পড়ে। তারপর একতারাটা সঙ্গে নিয়ে সবুজ মখমলে নরম শিশির ভেজা ঘাসের উপর দিয়ে আপন মনে হেঁটে চলে যায়। আঁধার কেটে ভোর হওয়ার অলৌকিক দৃশ্যের আবেশে কোথায় যেন হারিয়ে যায় ! কুসুমের মতো লাল সূর্যটা যখন ধীরে ধীরে পূবের আকাশে আলো ছাড়াতে থাকে, তখন তাঁর একতারাটা  বেজে ওঠে। ভোরের নির্মল আকাশে দূর মেঘের বুকে  এক ঝাঁক পাখি উড়ে গেলে তার একতারা বেজে ওঠে। উষা কালের সূর্যের আলো যখন মুজনাই নদীর প্রবাহে ঢেলে দেয় গলিত সোনা, নদীর বুকে ভেসে আসা শাপলা ফুল, সারারাত মাছ ধরে ক্লান্ত ডিঙ্গি-নৌকা এবং তন্দ্রাচ্ছন্ন মাঝি আর মুজনাই-এর স্বচ্ছ টলটলে জলপ্রবাহের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ-- তার মনে কথা ও সুরের সঞ্চার করে, তখন একতারা বেজে ওঠে। প্রাতঃভ্রমণ করে সে নদীর পাড়ের সেই চাঁপা গাছটির নীচে বসে । ডুবে যায় গানে। এই গাছ যেন তার দোসর। এখানে না এলে তার ভালো লাগেনা। গ্রামের সবাই জানে সে এখানেই বসে থাকতে ভালবাসে। কেউ তার খোঁজ নিলে সবাই জানে তাকে কোথায় পাওয়া যাবে। রান্না করতে তার কোন অসুবিধা হয় না। গ্রামের লোকেরা তাকে কষ্ট করে রান্না করতে বারণ করে। তারা বলে সে যেন যেকোন বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নেয়। এ গ্রামের সবাই তাকে নিজের ছেলের মতোই ভাবে। কেউ তাকে বিয়ে করে সংসারী হতে বললে,সে কোন উত্তর দেয়না । আপন মনে থাকে। গ্রামের সবাই বুঝে গেছে বিয়েতে তার মন নেই। প্রকৃতি ,নদী,গাছপালা,পাখি গ্রাম,গান এবং তার একতারার সঙ্গেই তার বিয়ে হয়ে গেছে। এগুলো নিয়ে সে শিশুর মতো খেলা করে। আত্মভোলা হলেও আত্মসম্মানটি তার প্রবল। সে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে চায় না। নিজের কাজ নিজেই করে। রান্নাটাও সে নিজেই করে। যদিও এক বেলাই রাঁধে। সেটাই রাতে গরম করে খেয়ে নেয়। আর যেদিন গ্রামে কোন বড় পূজো অনুষ্ঠান থাকে, বিয়ের অনুষ্ঠান অথবা গানের আসর,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সেখানে তার উপস্থিতি দেখার মতো। সে শুধু গান করেই চলে আসে না। সেই অনুষ্ঠানকে নিজের অনুষ্ঠান ভেবে যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে । আর সে যেখানে থাকে গ্রামের লোক জানে সে কাজটি কতোটা নিপুণভাব করে । তার নাম ডাক আশেপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে গেছে,সুকণ্ঠের জন্য । ভিন্ন গ্রামে অনুষ্ঠান করতে যায়। তারা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে যতটুক মূল্য দেয় তাতেই সে খুশি। তার এই স্বভাবের জন্য,সরলতার জন্য নির্লোভ-স্বভাবের জন্য তাকে ভিন্ন গ্রামের মানুষও ভালোবাসে ।
 
          নিত্যদিনের মতই প্রাতঃভ্রমণ করেই সে বাড়ির উঠোনে নদীর দিকে মুখ করে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর মনে মনে কিছু ভাবছে । ঠিক এই সময় তার বাবার খুব ভালো বন্ধু এ গ্রামের বাসিন্দা হরিহর বাউরি এসে তাকে ডাকছে, 'জগাই ও জাগাই অতো কি ভাবছিস ?'। আত্মমগ্ন জগাই হরিহর কাকুর ডাক প্রথমে শুনতেই পাইনি । এতটাই আত্মমগ্ন ছিল। আবার যখন হরিহর কাকু তার কাছে এসে জোরে জোরে ডাকলো তখন সে চমকে উঠলো এবং তাকিয়ে দেখে হরিহর কাকু । সে বলল, 'কাকু কখন এসেছো । আমি তোমার ডাক শুনতে পাইনি প্রথমে । কিছু মনে করোনা । একটা গান নিয়ে ভাবছিলাম'। হরিহর কাকু বললো,  'নারে না কিছু ভাবি নি আমি কি তোকে জানি না ? তোর জন্ম থেকে তোকে দেখছি। তুই হলি জাত শিল্পী । তুই ভাবের ঘোরে থাকবি না তো আমি থাকবো, আমি চাষ করি রস কষ বলে কিছু নেই আমার।  তুই যে কত সুন্দর সুন্দর গান বাঁধিস, গান করিস তাতেই আমার মনটা ভরে যায়। তোর বাবা মা নেই, তাই বলে কি তোকে দেখার লোক নেই? তোর ভালো-মন্দ আমার থেকে কে বেশি দেখবে? তোর বাবা আমার পরম বন্ধু ছিল। তোর বাবা-মা থাকতে এই বাড়িতে কত সময় কাটিয়েছি। তারাও আমাকে কত আদর যত্ন স্নেহ করতো। আজ তারা নেই আমি তো আছি। শোন তোর এভাবে জীবন কাটানো চলবে না। এবার তোকে সংসারী হতেই হবে। আমারও বয়স হচ্ছে আমার ছেলেমেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। তোরা তো প্রায় একই বয়সের । জানি তোর সংসারে মন নেই। জমির দায়িত্ব ভাগচাষীদের উপর ছেড়ে দিয়েছিস । এভাবে হাত পুড়িয়ে  কতদিন চলবে। আর শোন বয়স বাড়বে মনে রাখিস জীবনে একজন সাথীর দরকার। কে বলেছে বিয়ে করলে সংসারী হলে তোর গান তোর জীবন থেকে চলে যাবে ? আমি তোর জন্য এমনই একটি মেয়ের সন্ধান করেছি যে তোকে ভালো রাখবে। তোকে বুঝবে। তোর গান করাও পছন্দ করবে । আমি যা করছি তোর বাবা-মা থাকলে সেটাই করতো '। গ্রামের কাকিমা জেঠিমা এবং বন্ধুরা তাকে কতবার বিয়ের কথা বলেছে। সে কখনো রাজি হয়নি। সে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি। শুনে হেসে বেরিয়ে গেছে সেখান থেকে। কিন্তু হরিহর কাকুর বিষয়টা আলাদা। বাবার পরে তাকেই সে পিতৃস্থানীয় মনে করে। শ্রদ্ধা করে। তাঁর কথা অমান্য সে করার কথা মনেও ভাবে না। এবং নিজের অসুবিধার কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত কাকুর কথাতেই রাজি হয়ে গেলো।
 
          সে বিয়েতে রাজি হয়েছে এই কথা গ্রামে ছড়িয়ে পড়তেই গ্রামের লোকেদের আনন্দের সীমা নেই। গ্রামে যেন উৎসব লেগে গেলো। কিছু নিন্দুকেরা সবখানেই থাকে তারা আবার বলছে, হরিহর কাজটা ঠিক করলো না। জগাই 'ভবঘুরে' ছেলে । গান,নদী যার জীবন,প্রকৃতিতে পাখির মতন মুক্ত জীবন যাপন করতে যে পছন্দ করে সে আবার সংসারী হবে ? এ সংসার কদিন টেকে দেখো ! হরিহর কাকুর  অভিভাবকত্বে পাশের একটি গ্ৰামে বিয়ে ঠিক হলো। এটা কার্তিক মাস, বিয়ে আশ্বিন মাসে। কাকু তার সম্পর্কে সব কথাই বলেছে । গোপন করেনি । জগাই সেই গ্ৰামে বেশ কয়েক বার গানের অনুষ্ঠানে গান গেয়েছে । তার মধুর ব্যবহার তাদের মনকে ছুঁয়ে গেছে। আজ সে সেই গ্ৰামের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের বাঁধনে বাঁধতে চলেছে। ঐ গ্ৰামের মানুষেরা ভালো ভাবেই নিচ্ছে। আনন্দের কারণ একজন ভালো শিল্পীকে পাচ্ছে। মুজনাই তীরের এই মহেশডাঙ্গা গ্ৰামটির শিল্প-সাংস্কৃতি চর্চার খ্যাতি ছড়িয়ে আছে গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে।

        তিন বোন। মা ও বাবা । বাবা ধনেশ্বর বাউরী কৃষিজীবী। বিঘা দশেক জমি, একটি বড়ো পুকুর আছে। সারাবছর মাছ সেখান থেকে পেয়ে যায়। কিছু বিক্রি করে। জমির ফসলেই বছর চলে যায়। মুজনাই নদীর পলি সমৃদ্ধ মাটি প্রচুর পরিমাণে ফসলের যোগান দেয়। মুজনাই নদীকে ধনেশ্বর 'মা' বলেই ডাকে । জগাইকে তার শ্বশুর পণ হিসেবে এক লাখ টাকা এবং মূল্যবান সামগ্রী দিতে চেয়েছে । জগাই  পরিষ্কার বলেছে,'জগাই দরিদ্র্য তাই বলে সম্পর্কের মূল্য সে বৈষয়িক মূল্যের দাঁড়িপাল্লায় চড়াতে পারবেনা। মনের দাম অনেক বেশি আমার কাছে। আমি বাণিজ্য করতে আসিনি । মনের দাবি শুধুমাত্র মনের মানুষের কাছেই হতে পারে অন্য  কোথাও নয় । দেনা-পাওনার কথা এলে আমি বিয়েতে মত 
দিতে পারবো না। ' এরপর আর কোন কথা নেই। জগাই যে কতোটা ভালো মনের মানুষ এবং তার আত্মসম্মান কতোটা প্রবল বুঝতে তাদের অসুবিধা হলো না। যার সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার নাম তরী। তরী এর আগে জগাইকে গানের আসর দেখেছিল, তার গান শুনেছিল। জগায়ের গান তার ভালো লাগতো, আজ তার কথা,আত্মসম্মান বোধ দেখে তার প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো । এমন মানুষকে জীবনের সঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে কোনো দ্বিধা থাকলোনা তার । ওদের বিয়ে হয়ে গেলো। শুরু হলো জগাই আর তরীর সংসার জীবন। মুজনায়ের শান্ত প্রাণবন্ত উচ্ছল তরঙ্গের মতো আন্দোলিত হতে হতে ওদের জীবন বয়ে চললো । পূর্ণিমার রাতের স্নিগ্ধ মাদকতার আবেশে মিশে অনুরাগ,গানের সুরে- স্বরে মুজনাই তীরও উঠলো ময়ূর-ময়ূরীর মতো নেচে। বসন্ত ওদের জীবনে এখন বারোমাস । ফুল্লোরার বারোমাস্যা ছুঁতে পারেনা তাদের মধুর মুহূর্তগুলো। তরী,জগায়ের এতদিনের জীবন যাপনের কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসে রাশ টানলেও, শিল্পী রং স্বাধীনতায় নয়। বরং তাকে মুক্ত করে দিয়েছে সংসারের দায়িত্ব থেকে। তরী হাসিমুখে কাজ করে। জগাই এখন আরও বেশি করে গান বাঁধে,তরী অবসর‌ সময়ে গান শোনে, সঙ্গে সঙ্গে গুণগুণীয়‌ ওঠে । তরী উচ্চমাধ্যমিক পাশ। সংসারের হাল ধরবার জন্য গ্ৰামের অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীদের নিজের বাড়িতে টিউশন দিয়ে থাকে । সেলাই মেশিন আছে। মহিলাদের এবং বাচ্চাদের জামাকাপড় শেলাই করে। আর জমি থেকে যা ফসল উঠে আসে তাতে তাদের এখন ভালোই চলে যায়। জগাই,তরীর মধ্যে নিজের মাকে খুঁজে পেয়েছে।আবার বাবাকেও। জগাই উদাসীন,আত্মভোলা। তরীকে তার একতারা আর গানের মতই ভালোবাসে । ওর সব কথা শোনে। তরীও জগায়ের হৃদয়ের সকাল অলিগলির স্পন্দন বুঝতে পারে । ওরা দুজনে দুজনের ভালো মন্দ সব বোঝে । দুজন দুজনের চোখের ভাষা পড়তে পারে। একে অপরের জন্যেই যেন এরা মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ঠিকই বলেছিলেন--'খুঁজিয়া পাইলো যেন হাঁড়ির মতো সড়া' ।

                  জীবন গড়িয়ে গেলো । কেটে গেছে দুবছর। গ্ৰামের একমাত্র মেঠো পথটি পাকা হয়েছে। নদীর পাড় বরাবর এঁকে বেঁকে মিশে গেছে জাতীয় সরকের সঙ্গে । গ্ৰামের প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখন অষ্টম শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে। বাঁকুড়া ও বীরভূমের দুজন শিক্ষক এস.এস.সি পরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। দুজনেই কম বয়েসের । অবিবাহিত। জগাই এর কণ্ঠে বাউল গান শুনে দুই শিক্ষকই বিস্মিত। ওনারাও গ্ৰামেরই ছেলে। এ গ্ৰামেই ভাড়া থাকে । জগাই এর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। জগাই কে তাদের প্রকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যের কথা,মানুষের জীবন জীবিকার কথা,লাল মাটির কথা, বাউল সম্প্রদায়ের কথা, তাদের বিশেষ জীবনাচরণের কথা, জয়দেবের মেলার কথা, বাঁকুড়া, বীরভূমের প্রাচীন ইতিহাসের গল্প, লোকগাথার কথা বলে-- সে গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনে আর তার থেকে গানের প্রাণের রসদ সংগ্রহ করে। সে নতুন নতুন গান বাঁধে। তরীর প্রেম,বাউল দর্শনের গভীর উপলব্ধি তার গানকে আরও প্রাণবন্ত করে এবং যুক্ত করে সর্বজনীন মাত্রা।
 
              মুজনাই এর তরঙ্গে মিশে বয়ে চলেছে সময়। জগাই আর তরী আর একা নেই । ওদের যমজ সন্তান হয়েছে। একটি ছেলে অন্যটি মেয়ে। বিহান ও বেলা । আত্মভোলা জগাই আজকাল মুজনাই এর সেই বকুল গাছের নীচেই বেশিরভাগ সময় কাটায় । সুন্দর করে বাঁশের মাচা বানিয়ে তার উপরে বাঁশের ছাদ দিয়ে নিয়েছে। মুজনাই এর সবুজ ঘাসের মখমলি পাড়, জলের তরঙ্গ,দুই তীরের জনজীবন, নৌকা,মাঝি,আবাদি জমি, নানান শ্রেণীর বৃক্ষ, পাখির কলকাকলি, শ্মশানের নিস্তব্ধতায় এমনভাবে ডুবে থাকে বাড়ি ফেরার কথা বেমালুম ভুলে যায়। সে আজকাল কী এক গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে দূরে দূরে অনেক দূরে।
                     
প্রকৃতি অপূর্ব সৌন্দর্য্যের পশরা সাজিয়ে মুজনাই নদীর তীরে অবস্থিত গ্ৰামগুলোকে ভরিয়ে তুললেও
বর্ষাকালে কী ভয়াবহ রূপ ধারণ করে, গ্ৰামবাসীরা জানেন। এবার বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে অসহনীয় গরম আর কালবৈশাখীর রুদ্র নৃত্য জীবনকে তছনছ করে রেখেছে। গরমের পরিমাণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে । অনিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারী জীবন যাপন প্রকৃতির অভিশাপ হিসেবে নেমে আসছে মানুষের জীবনে । তার প্রভাব থেকে মুক্ত নয় কেউই। জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরম পার করে এলো আষাঢ় মাস। মাসের শুরু থেকেই প্রবল বৃষ্টিপাত হয়ে চলেছে। গ্রামের মাঠ পথ সবই জলে একাকার। ঘন কালো মেঘে সারাদিন আকাশ থাকছে ঢাকা। বাইরে বেরোনোর কোন উপায় নেই। বাড়ির মধ্যেই বন্দী হয়ে আছে সবাই। বৃষ্টির সাথে সাথে নেমে আসে বিকট আওয়াজের বজ্রপাত। এ ধরনের বজ্রপাত এর আগে মানুষ শোনেনি। পাহাড়ের জল এই মুজনাই নদীর প্রবাহ ধরে বয়ে যায়, জলের পরিমাণ ‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌যায় বেড়ে । গত তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি চলছে। নদীর জল বিপদসীমাকে ছুঁয়ে গেছে নদী বাঁধের একটি দুর্বল অংশ ভেঙে গেছে। সেই দুর্বল ফাটল দিয়েই জল ঢুকে গেছে গ্রামের ভেতর। এমন প্লাবন গ্রামের মানুষ আগে দেখেনি। সবাই বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে উঠে আসছে। বাড়িঘর, গৃহপালিত পশু বন্যার রুদ্র আঘাতে ভেসে চলে যাচ্ছে। মানুষ আশ্রয় নিয়েছি একটি নিকটবর্তী বিদ্যালয়। একদিকে বাস করতে হচ্ছে মানুষকে এবং গৃহপালিত পশুদের । জগাই এর গ্রামের সবাই সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। দুই শিশু সন্তানের প্রাণ বাঁচাতে তরী তাদের নিয়ে গ্রামের অন্যান্যদের সঙ্গে ছুটে চলেছে । এখানে পৌঁছে একটি নিরাপদ স্থানে কিছুক্ষণ স্থির হওয়ার পর, তার মনে পড়ল তার স্বামী জগাই আসেনি।

গ্রামের লোকেদের কাছে জানতে চাইলো জগাই কোথায় আছে ? তাকে কেউ দেখেছে কি না ? তারাও সে কথা বলতে পারল না। প্রাণ বাঁচানোই যেখানে বড় বিষয়, সেখানে কে কার খোঁজ রাখে ? যে যেমন পেরেছে পরিবার নিয়ে ছুটে এসেছে এখানে । জগাই যেহেতু বেশিরভাগ সময় বাইরেই থাকে ঘুরে বেড়ায় অথবা নদীর ধারে বকুল গাছটার নীচে বসে থাকে তাই তার কথা এমন তান্ডবের সময় কারোই মনে ছিল না। তরী এবার ব্যস্ত হয়ে উঠলো জবাইয়ের জন্য। শিশু দুটোকে রেখে সে আবার গ্রামের উদ্দেশ্যে যাওয়ার উদ্যোগ করলে গ্ৰামের বয়স্ক লোকেরা তাকে বাধা দিল। তাকে যেতে বারণ করলো। শেষে গ্রামের কয়েকটি যুবক ছেলে চলল জগাইকে খুঁজতে। তরীর মনের অবস্থা বুঝে গ্রামের মহিলারা তার বাচ্চা দুটোকে তাদের কাছে রেখে দিল এবং তরীকে স্বামীর খোঁজে যেতে দিল। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি ঝরে চলেছে।

ঘন কালো মেঘ আজ যেন রাক্ষুসে হা করে তাদের গোটা গ্রামকটিকে গিলে ফেলবে। পথ কোথায় ? চতুর্দিকে শুধু জল আর জল। এত জল তরী জীবনে প্রথম দেখছে। বন্যা হয়েছে এর‌ আগে কিন্তু এ যে মহাপ্লাবন। গ্রামের যুবক ছেলেদের দলটি একদিকে খোঁজার চেষ্টা করছে জগাই কে ‌। গ্রামের কাছাকাছি আসতেই তারা দেখতে পেলো বাঁধে যে ফাটলটি তৈরি হয়েছিল তা ভেঙে গেছে এবং গ্রামের একটি অংশ নদীর বুকে তলিয়ে গেছে । তারা গ্রামের ভেতরে প্রবেশ করতে পারল না, তরীও পারেনি ফিরে এসেছে নিরাপদ আশ্রয়ে। 

                 প্রবল উৎকণ্ঠ নিয়ে তরীর সময় কেটে চলেছে।  সেদিন সন্ধ্যার পর থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করল। ঘন্টাখানেকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। প্রায় অলৌকিকভাবে সে রাতে আর বৃষ্টি হলো না। নদীর জল কমতে শুরু করল। সকাল হতে না হতেই গ্রামের জল নেমে গেল। নদীর জল বিপদসীমা থেকে নীচে নেমে এসেছে । সুন্দর সাজানো গ্রামটি বিভৎস আকার ধারণ করেছে । এবার জগাইকে খুঁজতে তরী সম্ভাব্য সকল স্থানে প্রথম খুঁজে দেখে কিন্তু পায়না। নদীর গ্রাসে গ্রামের যে অংশটি অক্ষত থেকে যায় তার মধ্যে জগাই এর বাড়িটিও পড়ে । তরী বাড়ি ফিরে এলো। ঘরের অবস্থা শোচনীয় । বন্যার জলে সব জিনিস ওলট-পালট হয়ে গেছে। জগাই এর গানের খাতাটি  সম্পূর্ণ ভিজে গেছে এবং ঘরের এক কোণে পড়ে আছে। স্বামীর সব জিনিসের দিকে নজর যাচ্ছে এবং কান্নায় তার চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। ঠিক তখন তার নজর পড়লো ঘরে একতারাটা নেই । তরীর মনে পড়ল সেদিন যখন আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে, নদীর তীরে এক নৈসর্গিক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল, সেই দৃশ্য দেখে জগাই আনন্দে একতারাটি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার মা অর্থাৎ মূজনাই নদীর তীরে সেই বকুল গাছটির কাছে । তার মনে এই কালো মেঘ গভীর ভাবের জন্ম দিয়েছে। এবার তার একতারা উঠবে গেয়ে। তরী তাকে বারণ করল, বাইরে যেতে। অন্য সময় কখনোই সে তাকে বারণ করে না, আকাশের ঘন মেঘর ভয়ংকর রূপ তরীকে ভীত করে তুলছিল । যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। কিন্তু সে তরীকে বুঝিয়ে শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে পড়ে। এই তাদের শেষ দেখা । তরীর মনে সেখানেই বারে বারে টেনে চলেছে । সূর্য ডুববে ডুববে। তাই শেষ পর্যন্ত সে এবং গ্রামের দু একজন পরিচিত লোককে সঙ্গে নিয়ে ছুটে এল সেই বকুল গাছটির কাছে । প্রবল বন্যায় বকুল গাছের কাছে ফাটল দেখা দিয়েছিল। গাছটি মাটি সহ উপরে পড়ে আছে মুজনাই নদীর স্রোতের ধারায় । নদীর পাড় থেকে গাছটা যেখানে পড়ে আছে তার গভীরতা প্রায় তেরো-চোদ্দ ফুট হবে। এখানে যে বাঁশের মাচাটি ছিল সেটা জলে ভেসে চলে গেছে। আলো আঁধারের ফলে সবই অস্পষ্ট দেখাচ্ছে । তরী এবং বাকিরা জগাই জগাই বলে চিৎকার করছে কিন্তু কারো কোন সাড়া নেই। নদীর তীরে বিষন্ন হয়ে সবাই বসে আছে। মুজনাই প্রবল গতিতে বয়ে চলেছে। পাহাড় ধৌত গৈরিক জল, বড় বড় গাছ, মৃত পশু ভেসে চলেছে নদীর বুকে । কোথাও কোথাও দেখা যাচ্ছে বড় বড় পাক । সেই পাকে মৃত পশু গাছপালা তলিয়ে যাচ্ছে। ওরা বুঝলেও জগাই হয়তো নদীর জলেই তলিয়ে গেছে ।

         ওরা ফিরে আসার জন্য প্রস্তুত হলো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে । ঠিক এমন সময় ওই বকুল গাছের শেষ মাথায় যা নদীর সঙ্গে মিশে আছে একটি মানুষের হাত দেখা যাচ্ছে। আর সেই হাতে ধরা আছে একটি বাদ্যযন্ত্র। এটা প্রথমে তরীর নজরে পড়ে । সে চিৎকার করে ওঠে। জগাই জগাই বলে। জগাই তরীর ডাক শুনতে পায়। শরীরের শেষ শক্তি জড়ো করে একতারাটার তারে একটা টান দেয়, তার অস্তিত্বত্বের ইঙ্গিত দেয় । সবাই চিৎকার করে ওঠে, 'জগাই বেঁচে আছে জগাই বেঁচে আছে'। জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছে তার মা মুজনাই জগাইকে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার প্রিয় বকুল গাছটি জগাই কে বাঁচিয়ে রেখেছিল তার গ্রামের মানুষের ভালোবাসা। জাগায় কে বাঁচিয়ে রেখেছিল একতারার সুর, তরীর প্রেম । জগাই ফিরে এলো । জগায়ের একতারা আবার বেজে উঠলো, তার কন্ডোম উঠলো গেয়ে । মুজনাই নদী ও প্রকৃতি তার স্নেহের আঁচলে বেঁধে রেখেছিল তাকে । প্রকৃতি শাশ্বত শিল্পী তাই আরেক শিল্পীকে বাঁচিয়ে রাখলো শিল্পের খাতিরে।


 

ভৌতিক গল্প 


অলৌকিক 

শুভেন্দু নন্দী 


ক্লান্তিতে অবসন্ন দেহ ও মন। প্রচন্ড ক্ষুধায় কাতর ঐ পরিশ্রান্ত পথিক। সন্ধ্যা নেমেছে। চারিদিক ঘোর কালো ও ঘুপসী আঁধার। অমাবস্যার রাত। কে যেন এদিকেই আসছে ক্ষিপ্র গতিতে। চোখ দুটোও জ্বলছে অন্ধকারে।  যেন শিয়ালের ধূর্ত চোখ এদিক-ওদিক কিছু খুঁজছে। কিছুদূরে একটা জীর্ন,দীর্ন চালাঘর। ঘরের দেওয়াল মাটির। চারিদিক খোলা। ঐ আগন্তুক দাওয়ায় উঠে দরজায় মৃদু টোকা দিতে থাকে। প্রথমটা কোনও সাড়াশব্দ মেলেনা।
- কেউ কী আছেন? পথিক ক্ষীণ স্বরে বলতে থাকে।
কিন্ত কোনও উত্তর মেলেনা।
তারপর হঠাৎ ক্যাঁচ করে একটা আওয়াজ হোলো আর দরজাও খুলে গেলো।
- কে তুমি? একটা নারীকন্ঠের আওয়াজ। 
- এই ঘরে তুমি থাকো? একটু জল খাওয়াতে পারো?
' জল? ঐ যে পুকুর দেখছো- ওখানে যাও- এই নাও
ঘটি।
- ওতো কচুরপানায় ভর্তি-  এঁদো পুকুর!....
- দাঁড়াও । আমি আসছি -
পথিক দেখলো সামনে নারী মূর্তি, সারা দেহ সাদা
কাপড়ে ঢাকা।
-তুমি কে? অন্ধকারে তো মুখ দেখা যাচ্ছেনা। ঘরে প্রদীপ জ্বালাও নি কেন?
- তেল নেই। আমি... কিছুক্ষণ থেমে বললো- অমি রমলা।
- কি হোলো? চিনতে পারলেনা আমাকে? এসো, আমার সঙ্গে।  ঘটিটা আমায় দাও।জল পান করার
পরে পরেই হঠাৎ বাতাসের হাওয়ায় আবরন উন্মোচিত ও 
নারীর রক্তশূণ্য ফ্যাকাসে মুখ আর মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখে পথিকের মেরুদন্ড দিয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে নামলো। আতঙ্কে মুর্ছা গেলো। অনেকক্ষণ নীচে পড়ে থাকলো। জ্ঞান হতে দেখলো জনা দুই মানুষ তাকে ঘিরে রয়েছে।
- আমি কোথায় ? পথিক ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো।
ঐ দুজন সমস্বরে বলে উঠলো-" তুমি শ্মশানে পড়েছিলে। আমরা দেহ সৎকার করতে এসেছিলাম এই শ্মশানঘাটে - কিন্তু তুমি আসলে কি করে এখানে?
- আমি অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে একটা ভাঙ্গা চালাঘরের কাছে এসেছিলাম। ওখানে ' রমলা' বলে একজন স্ত্রীলোকের দেখা পেয়েছিলাম। ও আমাকে পুকুর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছিলো।
- পুকুর কোথায় ? ওটাতো একটা শীর্ণকায় নদী- শ্মশানঘাট! আরে! রমলাকে তো আমরাই দাহ করে ফিরছিলাম। আমরা এই দুজন ছাড়া সবাই চলে গ্যাছে। তোমাকে দেখেই তো দাঁড়িয়ে পড়লাম। তা, তুমি কী রমলাকে চিনতে? একজন প্রশ্ন করলো।
- বিলক্ষণ। কিন্তু তোমাদের কথামতো সে তো আর নেই! এ কি করে সম্ভব?  
কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো ঐ আগন্তুক, 
- তাকে তো আমি অন্ধকারে ভয়ংকর অবস্থায় দেখেছি। ভাবতেই পারছিনা
- তুমি কী তাকে আগে থাকতেই চিনতে? তার সাথে কিভাবে তোমার পরিচয় হয়েছিলো ? এই নাও, জল খাও"
জল পান করে পথিক বলতে শুরু করলো।
- সে এক বিরাট কাহিনী। বাবা-মায়ের একমাত্র কন্যা রমলা। ওই গ্রামেই আমি থাকতাম। ওর বাবা দূরারোগ্য ব্যধিতে মারা যান। ওঁর জীবদ্দশায় আমিই তাঁর দেখাশোনা করতাম। সংসারের কাজ সামলাতো মা আর মেয়ে। ফলে রমলার সাথে একটা ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওর বাবা ইতিমধ্যে মারা যান। একটা প্রাইভেট কোম্পানীতে ওর বাবা কাজ করতেন। বেশ কিছু টাকা কোম্পানী ওদের পরিবারকে সাহায্য করেছিলো, সবটাই আমার উদ্যোগে। যাই হোক, আজ রাজনগর স্টেশন থেকে ফিরতে দেরী হয়ে গেলো। ট্রেনে ট্রেনে ফেরি করি। ট্রেনেই কখন যে আমার পিকপকেট হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। একেবারে কপর্দকশূণ্য হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়। খিদের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠি। কোন্ এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমার বাড়ির কোনও ট্রেস পাচ্ছিলাম না। পাড়াগাঁ থেকে উঠে এসেছিলাম এই আধা-শহর রাজনগরে নতুন বাড়িতে । বাবার ব্যবসায়ে উন্নতির জন্যই তো এখানে আমাদের আগমন। যা বলছিলাম। অদ্ভূত ভাবে একটা চালাঘরের কাছে এসে পড়লাম। পিপাসা পেয়েছিলো প্রচন্ড।  তারপরেই তো সাদা কাপড় পরা একজনের সঙ্গে দেখা, তবে অবগুন্ঠনে ঢাকা। জল চাইতেই তার গলা শুনে ঠাহর হোলো সে একজন নারী। আমাকে চিনতে পেরে বলে উঠলো " আমি তোমার রমলা।" এটুকু ঠিকই ছিলো।  তার দেওয়া ঘটিটা তার কথামতন তাকে দিতেই হাওয়া়য় উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া তার শরীরের সাদা আবরন আর রক্তশূণ্য মাংসহীন কঙ্কাল শরীর দেখেই আমার জ্ঞান হারানো। 

বলে পথিক থামলো। একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো-
ওর বাবা মারা যাবার পর নিত্য আমার যাওয়া-আসা চলতে লাগলো। আর তার সাথে সাধ্যমত আর্থিক সাহায্য। কিন্তু ওর মা আমাদের এই সম্পর্ককে একদম মেনে নিতে পারেননি। তাই আমিও ও বাড়ি যাওয়া-আসা একসময় ছেড়েও দিলাম। কিন্তু রমলা আমাকে ভালোবাসতো।
- শোনো এবার আমরা তাহলে বাকিটুকু বলি  কেমন। গ্রামের একজন বয়স্ক লোকের সাথে ওর মা বিয়ে ঠিক করেছিলো। টাকা-পয়সাওয়ালা লোক। দেখতে কুৎসিত আর গায়ের রং কালো- সবটাই আমাদের শোনা কথা। এই নিয়ে মা-মেয়ের সাথে প্রচন্ড অশান্তি,ঝগড়াঝাঁটি। তখন মেয়ের বিষপানে আত্মহত্যা। 
- কখন ঘটেছিলো ব্যাপারটা?- আগন্তুকের প্রশ্ন। 
একজন বলে ওঠে, "এই তো আজ ভোরবেলা। আমরাই তো থানায় গিয়ে সব ফর্মালিটি সেরে তার দেহের দাহকার্য সম্পন্ন করে ফিরছি। "
- তা বাবা, তুমিই কী রামদয়াল শর্মা? তোমার নাম ঐ বাড়িতে অহরহ শোনা যেতো। তাই অনুমান করেই বলছি"
- আজ্ঞে হ্যাঁ। আমিই সেই হতভাগ্য রামদয়াল
-তাহলে তার অতৃপ্ত আত্মাই মরণের পরে তোমাকে ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ জল খাওয়াতে নিয়ে গেছিলো।পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়ির সন্ধান হয়তো আগেই পেয়েছিলো, একেবারে শ্মশানের নিকটে। হায়রে! কী মর্মান্তিক ঘটনা- একেবারে অলৌকিক।  এখন রাত দশটা। ঐ দোকানটায় বসে চা- বিস্কুট খাওয়া যাক। তারপর না হয় বাড়ি যাবে। সারাদিন তোমার তো খাওয়া হয়নি বাবা।"
- ঠিক আছে। এখানে সারা রাতই দোকান খোলা থাকে, তাই না?
- হ্যাঁ। টোটো রিক্সাও পাবে তুমি। তবে চার্জ একটু
বেশী। এই যা। এই নাও পঞ্চাশটা টাকা। আমি রমলার মামা।"
এর পরে রামদয়াল তাঁকে প্রণাম করলো। তারপর ধীর পায়ে অগ্রসর হোলো।