Tuesday, June 2, 2026


 মুনা 

অনলাইন জ্যৈষ্ঠ  সংখ্যা ১৪৩৩


সম্পাদকের কথা 

নির্বাচন পরবর্তী বাংলায় সবার মনেই প্রত্যাশা। দীর্ঘদিনের জগদ্দল পাথরটিকে সরিয়ে যে ছোট্ট বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে, সে বিরাট মহীরুহে পরিণত হোক, আশা সেটাই। তবে আমরা তো ঘর পোড়া গরু, তাই সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। না, এখনও অবধি সেই অর্থে সেটি দেখা যায়নি, কিন্তু ভয় রয়েই যায়। বিশেষ করে, প্রান্তিক মানুষগুলি যদি রুজি-রুটি হারায় সেই বেদনা বুকে বাজে ভীষণভাবে। আশা রাখা যায়, সবার মন জয় করে উন্নয়নের পথে, প্রগতির পথে এগিয়ে যাবে আমাদের রাজ্য। কাজ পাবেন সর্বহারা মানুষ, সুখে থাকবেন বঙ্গভূমির মানুষ। 


মুজনাই  

অনলাইন জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা ১৪৩৩

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

 

 প্রচ্ছদ

বাবুল মল্লিক 


মুজনাই জ্যৈষ্ঠ বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩


এই সংখ্যায় 

প্রবন্ধ 

মাল‍্যবান মিত্র, গৌতমেন্দু নন্দী, অভিজিৎ সেন, বটু কৃষ্ণ হালদার, মিত্রা রায় চৌধুরী

গল্প 

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, পর্ণা চক্রবর্তী, দেবাশীষ বক্সী, চিত্রা পাল,শুভেন্দু নন্দী 

কবিতা/ ছড়া 

অণুশ্রী তরফদার, শিশির আজম, তন্ময় কবিরাজ, বিকাশ দাশ, মোহন,  

উৎপলেন্দু পাল, প্রাণেশ পাল, প্রতিভা পাল, অমিত আভা, রীনা মজুমদার, 

রাজু রায়, লীনা রায়, অশোক কুমার ঠাকুর, নূপুর রায়, রীতা মোদক

ভ্রমণ 

ইন্দ্রাণী বন্দ্যোপাধ্যায়, জয়িতা সরকার, কবিতা বণিক

মুক্তগদ্য 

অনিতা নাগ, অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী,  মিষ্টু সরকার

অণুগল্প 

তাপসী ঘোষ, রবীন বসু, তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য


মুজনাই জ্যৈষ্ঠ বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩





 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মডার্ন টাইমস এবং চ‍্যাপলিন 
মাল‍্যবান মিত্র


বিশ শতকের ত্রিশের দশক — বিশ্ব দেখলো অর্থনৈতিক মন্দা, বেকারত্ব, এবং দ্রুত শিল্পায়ন, আর এর সাথে সাথে মানুষের জীবনে এলো এক নতুন আতঙ্ক: যন্ত্রের দাসত্ব, সময় এগিয়ে চললো কালের নিয়মে এবং আজকের পৃথিবী হয়ে উঠলো বা উঠছে সেদিনের থেকেও আরো অন্যরকম হয়ে । কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , রোবট, অ্যালগরিদম—মানুষের কাজ, চিন্তা আর স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ও যাচ্ছে মেশিন এবং সেটা আর শুধু কাজ করছে না, এখন তা শিখছে, ভাবছে, তৈরি করছে স্মৃতির ডেটাবেস এবং অবলীলায় দ্রুততার সাথে মানুষের মতোই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

১৯৩০-এর দশক, শিল্পায়ন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে কারখানায় শ্রমিকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একরকমের কাজে জড়িয়ে পড়ছিলেন। সাথে প্রতিক্রিয়া হিসেবে মানুষ যেন হারাচ্ছিল নিজের অস্তিত্ব উৎপাদনের চাপে।সেই সময়ে একটা লোক একটি চলচ্চিত্র এ বললেন কিছু কথা - 

      “I wanted to say something about the tragedy of millions of men who are victims of progress.” অর্থাৎ, আধুনিকতার নামে যে সভ্যতা গড়ে উঠছে, তার ভেতরে মানুষ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে — সেটিই তাঁর মূল চিন্তা। উল্লেখ্য চলচ্চিত্রটি শুরু হয় এক বিশাল ঘড়ির দৃশ্য দিয়ে। এরপর দেখা যায়, কারখানার ভেতরে যন্ত্রের শব্দ, আর তার মধ্যে এক ছোট্ট মানুষ — “ট্রাম্প” — অবিরাম মেশিনের স্ক্রু ঘোরাচ্ছে।হঠাৎ যন্ত্র তাকে গিলে ফেললে, লিটিল ট্রাম্প মেশিনের চাকার মধ্যে হারিয়ে যায়। নিখুঁত অভিনয়, কৌতুক প্রমুখের উপস্থাপনে দর্শক হাসে, কিন্তু সেই হাসির গভীরে হয়তো থেকে যায় ভয় আর বেদনা। এই দৃশ্যটি যেন হয়ে ওঠে আধুনিকতার প্রতীক — যন্ত্রের গতি যত বাড়ে, মানুষ তত ক্ষুদ্র হয়ে যায়। ছায়াছবিটিতে এর পরবর্তীতে ট্রাম্প চাকরি হারিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, এক অনাথ মেয়ের সঙ্গে দেখা হয় তার, যে ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের মাঝেও বাঁচার চেষ্টা করছে। তাদের স্বপ্ন ছোট — একটু খাবার, একটা ঘর, আর একটু শান্তি। কিন্তু “modern times”-এর সমাজে এই ছোট স্বপ্নই অসম্ভব। এরপর নানান ঘটনা ঘটে এবং চলচ্চিত্রটির শেষ দৃশ্যে ট্রাম্প ঐ মেয়েটিকে বলে— “Buck up — never say die! We’ll get along!” এবং আশ্চর্য জনক ভাবে এই ছোট্ট সংলাপেই হয়তো লুকিয়ে ছিল সিনেমাটির দর্শন: জীবন যত কঠিনই হোক, হাসি আর আশা হারানো চলবে না। এই বিখ‍্যাত চলচ্চিত্রটির নাম ‘ মডার্ন টাইমস’ এবং লিটিল ট্রাম্পের চরিত্রের অভিনেতাটির নাম স‍্যার চার্লস স্পেনসর চ‍্যাপলিন।


চ্যাপলিন ইচ্ছাকৃতভাবে এই চলচ্চিত্রটি নির্বাক রাখেন, যখন গোটা বিশ্ব “সাউন্ড সিনেমা”-র মোহে বিভোর। তিনি বিশ্বাস করতেন-  “Words are cheap. The great power is in the gesture.” ১৮৮৯ সালের এক বসন্তের দিনে, লন্ডনের ওয়ালওর্থ অঞ্চলে জন্ম নেন ছোট্ট চার্লি। তাঁর পিতা চার্লস চ্যাপলিন সিনিয়র ছিলেন মদ্যপ, মা হান্না চ্যাপলিন ছিলেন মঞ্চশিল্পী — কিন্তু মানসিক রোগে আক্রান্ত। চ্যাপলিন কৈশোরে থিয়েটারে অভিনয় শুরু করেন। “Fred Karno’s Comedy Troupe”-এর সদস্য হিসেবে ১৯১৩ সালে তিনি আমেরিকায় আসেন। সেখানেই ১৯১৪ সালে Kid Auto Races at Venice ছবিতে প্রথম দেখা যায় তাঁর বিখ্যাত “ট্রাম্প” চরিত্রকে। এই চরিত্রই তাঁকে বিশ্বজুড়ে অমর করে তোলে। বাঁকা টুপি, ছোট গোঁফ, বড় জুতো, আর এক চিলতে মৃদু হাসি — এ যেন সমাজের সমস্ত নিপীড়িত মানুষের মুখ হয়ে ওঠেন। 

---

চ্যাপলিনের কমেডি কখনো নিছক বিনোদন নয়। তাঁর হাসির ভেতরেই ছিল সমাজ ও রাজনীতির গভীর ভাষ্য। তিনি ছিলেন এক নির্বাক বিপ্লবী, যিনি কথা না বলেও সত্য বলতেন। Modern Times-এ তিনি দেখালেন শিল্পায়নের নির্মমতা— যেখানে মানুষ যন্ত্রের চাকায় পিষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমরা হাসি, কিন্তু সেই হাসির ভেতরেও কাঁটা বিঁধে থাকে— প্রশ্ন জাগে, মানুষ কেন মেশিনে পরিণত হলো?

---

চ্যাপলিনের জনপ্রিয়তা যেমন ছিল বিশ্বজোড়া, তেমনি তাঁর স্পষ্টবাদিতা তাঁকে শত্রুও বানিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখন কমিউনিজমবিরোধী অভিযান শুরু হয়, তখন চ্যাপলিনকে অভিযুক্ত করা হয় “কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীল” হিসেবে। ১৯৫২ সালে তিনি সুইজারল্যান্ড সফরে গেলে, মার্কিন সরকার তাঁর ভিসা বাতিল করে দেয়। এরপর তিনি স্থায়ীভাবে সুইজারল্যান্ডে বসবাস শুরু করেন।
তবু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৭২ সালে হলিউড তাঁকে পুনরায় ডেকে নেয়। দেয় Honorary Academy Award “চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য।” পুরো হল দাঁড়িয়ে করতালিতে ভরে ওঠে, চোখে জল আসে সেই হাসির জাদুকরের।

---

চ্যাপলিন শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন শান্তভাবে, তাঁর স্ত্রী উনা ও’নীল এবং আট সন্তানকে নিয়ে সুইজারল্যান্ডে। ১৯৭৭ সালের বড়দিনে, তিনি পৃথিবী ছেড়ে চলে যান। কিন্তু চলে যাওয়ার পরও তিনি রয়েছেন আমাদের জীবনে —  প্রতিটি হাসির মাঝে, প্রতিটি মানবিকতায়। চ্যাপলিনের নিজের কথায়,  “Life is a tragedy when seen in close-up, but a comedy in long-shot.” এ যেন জীবনের দর্শন —যা শেখায়, দুঃখ ও হাসি একই মুদ্রার দুই পিঠ।

---

চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু সৃষ্টিকর্তা নয়, সময়েরও সাক্ষী। চার্লি চ্যাপলিন তাঁদেরই একজন।কমেডির আবরণে তিনি এমন সব সত্য উচ্চারণ করেছিলেন, যা সেই সময়েও অস্বস্তিকর ছিল, আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর হাত ধরে “হাসি” হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের ভাষা, এবং “কমেডি” রাজনীতির এক বিকল্প বোধ। আজকের পৃথিবী যখন রাজনৈতিক ভেদাভেদ, মিথ্যা প্রচার, ও ভয় দেখানোর রাজনীতিতে ভরা, তখন চ্যাপলিন যেন আবার ফিরে আসছেন—এক নীরব স্মরণিকা হিসেবে, যে হাসিও একধরনের বিপ্লব।

---

চ্যাপলিনের Modern Times (১৯৩৬) চলচ্চিত্রে এক শ্রমিক যন্ত্রের চাকার মধ্যে গিলে যায়। দৃশ্যটি যতই হাস্যকর হোক, এর মধ্যে আছে শিল্পায়িত সভ্যতার নিষ্ঠুর সমালোচনা। এই দৃশ্যের ভেতর দিয়েই চ্যাপলিন বলেছিলেন— “যন্ত্র মানুষের সেবক হতে পারে, শাসক নয়।” রাজনীতির ভাষায় এই বক্তব্যটি এক প্রকার মানবতাবাদী ম্যানিফেস্টো। চ্যাপলিনের রাজনীতি ছিল দলীয় নয়, নৈতিক রাজনীতি—যেখানে সমতা, সহানুভূতি ও স্বাধীনতাই মূল। তাঁর কমেডি কখনো “হাসির খেলা” নয়; বরং মানুষের কষ্টের ভিতর দিয়ে আশা খোঁজার এক দার্শনিক অনুসন্ধান।

---

১৯৪০ সালে যখন গোটা ইউরোপ নাৎসিবাদের ভয়াবহতায় কাঁপছে, তখন চ্যাপলিন বানালেন The Great Dictator। তাঁর হিটলার-সদৃশ চরিত্র “অ্যাডেনয়েড হিঙ্কেল” একদিকে হাস্যকর, অন্যদিকে ভীতিকর।চলচ্চিত্রের শেষে তিনি যে ভাষণ দেন, তা আজও ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী আহ্বানগুলোর একটি—
 “You are not machines. You are not cattle. You are men.”
এই বক্তব্যটি শুধু রাজনীতিবিদদের জন্য নয়, সভ্যতার জন্যও সতর্কবার্তা। চ্যাপলিন কমেডির ভেতর দিয়ে যে বার্তা দিয়েছেন তা স্পষ্ট— রাজনীতি যদি মানবিকতার বাইরে চলে যায়, তবে হাসিই হবে তার সর্বশেষ প্রতিষেধক।

---

চ্যাপলিন কখনো প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শে যুক্ত হননি। তবু তাঁর সৃষ্টিকর্ম তাঁকে রাজনৈতিক করে তুলেছিল। ম্যাকার্থি আমলে তাঁকে “কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীল” বলে অভিযুক্ত করা হয়; ১৯৫২ সালে তাঁকে আমেরিকা ছাড়তে হয়। তবে এই ঘটনার পর তিনি বলেন— “I am not a political man. I am an individual and a believer in liberty.” এটাই চ্যাপলিনের দর্শন: স্বাধীনতার রাজনীতি। যেখানে হাসি মানে মুক্তি, আর কমেডি মানে চিন্তার স্বাধীনতা।

---

সমসাময়িক পৃথিবীতে কমেডি এখন দ্বিমুখী অস্ত্র। একদিকে স্ট্যান্ড-আপ শিল্পীরা সমাজ ও শাসনের অন্যায়কে ব্যঙ্গ করেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র সেই হাসিকে ভয় পায়। বাংলাদেশ, ভারত বা আমেরিকা—সব দেশেই দেখা যায়, ব্যঙ্গচিত্র ও কৌতুক এখন একপ্রকার “রাজনৈতিক প্রতিরোধ”। কিন্তু চ্যাপলিনের যুগের তুলনায় আজ হাসির ভাষা অনেক তীক্ষ্ণ, কখনো ক্রুদ্ধ। যেখানে চ্যাপলিন মানুষের প্রতি মমতা রেখে ব্যঙ্গ করতেন, আজকের অনেক কমেডি বিদ্রূপে সীমাবদ্ধ—মানবিকতায় নয়, আক্রমণে ভরা। চ্যাপলিন আমাদের শিখিয়েছেন, “To truly laugh, you must be able to take your pain, and play with it.”
এই বাক্যটি শুধু শিল্পের নয়, রাজনীতিরও শিক্ষা। রাজনীতি যদি কষ্ট দেয়, তবে হাসি সেই কষ্টকে শিল্পে রূপান্তরিত করে। হাসি মানে ভুলে যাওয়া নয়, বরং প্রতিবাদের সাহস। তাঁর “লিটল ট্রাম্প” চরিত্রটি ছিল সেই সাধারণ মানুষের প্রতীক— যে রাষ্ট্রের চাকার নিচে পিষ্ট হয়েও নিজের মানবতা হারায় না। এই চরিত্রের মধ্যেই চ্যাপলিন এক নতুন রাজনৈতিক দর্শন দেন: দুর্বলরাই পৃথিবীকে বাঁচায়।

---

চ্যাপলিন ছিলেন গভীরভাবে মানবতাবাদী শিল্পী। তাঁর সিনেমায় সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলীয় প্রচার নেই, তবু প্রতিটি দৃশ্য রাজনৈতিক হয়ে ওঠে তার মানবিক প্রশ্নের কারণে। তিনি শ্রমিকের দুঃখ, বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অমানবিকতা তুলে ধরেছিলেন। এই কারণেই পরে তাঁকে “কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীল” বলা হয়। কিন্তু তিনি বলেছিলেন— “I am not a Communist. I am a humanist.” চ্যাপলিনের হাসি কখনো আক্রমণাত্মক নয়, বরং করুণ। তিনি মানুষকে কাঁদিয়ে নয়, হাসিয়ে ভাবতে শেখান। তাঁর হাসি যেন এক প্রার্থনা — যে প্রার্থনায় মানুষ আবার মানুষ হয়ে উঠবে। যন্ত্রযুগের ঠান্ডা ধাতুর ভেতর চ্যাপলিন দেখিয়েছেন উষ্ণতার সম্ভাবনা। তিনি প্রমাণ করেছেন, হাসিও হতে পারে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ রাজনীতি, সবচেয়ে মানবিক প্রতিবাদ।



---চ‍্যাপলিনের Modern Times তাই আজও সময়ের সীমানা ছাড়িয়ে প্রাসঙ্গিক। যন্ত্র বদলেছে, প্রযুক্তি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের একাকিত্ব ও অস্থিরতা আজ ও তেমনই। এবং আজ, যখন A.I আমাদের কাজকে ছুঁয়ে গেছে, যন্ত্র শুধু কাজই করে না, চিন্তাও করে, এবং মানুষকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে। চ্যাপলিন আমাদের মনে করান— মানুষের অনুভূতি মেশিন বুঝতে পারবে না। ভালোবাসা, হাসি, সহানুভূতি— এই অনুভূতি চিরন্তন। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের অন্তর, মন, আশা অক্ষুণ্ণ। ফ্যাক্টরির যন্ত্রের মতো, আজও A.I আমাদের জীবনের অংশ, কিন্তু মানুষের স্বপ্ন আর আশা চিরকাল বহমান।

---

চ্যাপলিন জানতেন— যখন মানুষ মেশিনের ছায়ায় ভয় পায়, হাসিই হয় অস্ত্র। ফ্যাক্টরির হাতে আটকে থাকা শ্রমিক, খাওয়ার সময় মেশিনের সঙ্গে কৌতুক, Barber-এর ছোট্ট প্রেম, ভুল বোঝাবুঝি—সবই হাস্যরসের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে বাঁচায়।

আজকের A.I যুগেও, হাসি ও ব্যঙ্গ আমাদের মানবিকতা রক্ষা করে। হাসি কেবল বিনোদন নয়, এটি এক শক্তিশালী প্রতিবাদ। সেই কারনেই  Modern Times–এর বার্তা আজও প্রাসঙ্গিক।মেশিন জীবনের অংশ, কিন্তু মানবিকতা চিরন্তন। মানুষ হাসতে পারলে, আশা রাখতে পারলে, ভালোবাসা রাখতে পারলে, প্রযুক্তি কখনো তাকে হারাতে পারবে না।

চ্যাপলিন বললেন— যন্ত্র যতই ক্ষমতাধর হোক, মানবতার অন্তর্দীপই চিরন্তন। মানবতা একাকী নয়—হাসি, প্রেম, সহানুভূতি সাথে থাকলেই মানুষ সর্বদা বেঁচে থাকে। 

যখন আমরা মোবাইল স্ক্রিনে বন্দি, যখন সময়ের পেছনে ছুটে ক্লান্ত, চ্যাপলিনের সেই ছোট মানুষটি যেন আজও মনে করিয়ে দেয় — “যতক্ষণ আমরা হাসতে পারি, ততক্ষণ আমরা মানুষ।”



তথ্যসূত্র 


১. Modern Times (1936), Directed by Charlie Chaplin, United Artists.

২. Chaplin, Charles. My Autobiography. Simon & Schuster, 1964.

৩. Robinson, David. Chaplin: His Life and Art. Penguin, 2001.

৪. “The Tramp and the Machine.” The Guardian, Film Essays, 2019.

৫. Official Chaplin Archives — charliechaplin.com.







উৎস থেকে ধারাবাহিক বিবর্তনে বাংলা সংগীত

গৌতমেন্দু নন্দী


সংগীতের ঝর্না ধারায় বাঙালির স্নাত হওয়ার ইতিহাসের ব্যাপ্তি প্রায় সীমাহীন। কীভাবে আমাদের জীবনযাপনে সুর এলো তারও এক সুদূর অতীত আছে। সেই অতীতের সন্ধান চলছে এবং চলবে।

বাংলা গান শিল্প-সংস্কৃতির পরিসরেই শুধু সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের জীবন-সংস্কৃতির চর্চারও ধারক ও বাহক। আমাদের চারপাশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য, ভৌগলিক বৈচিত্র্য এবং আমাদের যাপন বৈচিত্র্যও প্রভাবিত করেছে, বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে সংগীতের  কথা,ভাব এবং সুরকে বিভিন্ন ভাবে। প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান, ঋতু বৈচিত্র্য, পাখির কূজন আমাদের  চিন্তা চেতনার মনোভূমিকে নিরন্তর কর্ষিত করে করে  তৈরি করেছে এক সাংগীতিক উর্বর ক্ষেত্র। সেখানেই  জন্ম নিয়েছে কথা,সুর আর বোধ-ভাবনা। এইভাবেই বাংলার সংগীত জগৎ হয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। সুখ, দুঃখ, হর্ষ-বিষাদের মুহূর্তগুলোর অনুরণন বাংলার সংগীতে এনেছে গভীর দ্যোতনা, মূর্ছনা।এইভাবেই যেন বাংলা সাহিত্য ও সংগীত মিলে মিশে একাকার হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে এই সাহিত্য-সংগীত সংস্কৃতি। সেই ধারা আজকেও প্রবহমান। 

       এই ধারার প্রধান ধারক ও বাহক আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। যাঁর সংগীত অতীত থেকে বর্তমান  চির প্রাসঙ্গিক। কবিতায়,কাব্যে, প্রেমে, উৎসবে, উদযাপনে ,শোকে, আনন্দে,বিষাদে আমাদের অব্যক্ত অনুভূতি,বোধ, ভাবনা ---কথা ও সুর হয়ে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

শুধু ব্যক্তিগত যাপনচিত্রে নয়, আমাদের চারপাশের বিশাল প্রাকৃতিক পরিবেশের ঋতুগত আবহাওয়া  পরিবর্তনও "কথা" ও "সুর" হয়ে বিভিন্ন ঋতুতে  "ঋতুপর্যায়"এর গান হয়ে আজ আমাদের এক মহার্ঘ সম্পদ। বাংলা গানের এই অন্যতম সম্রাটই এই বিশ্বকে তাইতো বলেছেন "সুধাসাগর"। সত্যি তাই।

এই "সুধাসাগর"এ অবগাহন চিরকালীন। তবুও  "চূড়ান্ত" সুরটির সন্ধান যেন এখনও অধরা। ঠিক সেইজন্যই বোধহয় ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খানের মত একজন কিংবদন্তী ব্যক্তিত্ব উচ্চারণ করতে পারেন, " সারাটা জীবন সংগীত সাধনা করেও সরস্বতীর মন্দিরে ঢুকতে পারলাম না, মন্দিরের  চারপাশে শুধু ঘুরে বেড়ালাম..."
      
সাংগীতিক শিক্ষার কোন শেষ নেই। তবুও  আজ বলতেই হয় আমরা বাংলা গানের সেই অতীত  ঐতিহ্য কি ধরে রাখতে পারছি? সময়ের সাথে সাথে  পরিবর্তন স্বাভাবিক কিন্তু তা অবশ্যই হতে হবে ঐতিহ্য অনুসারী। উপযুক্ত শিক্ষার পাঠ নিয়ে সঠিক সাংগীতিক কাঠামো কে ঘিরে আবর্তিত হওয়া প্রয়োজন এই অনুশীলন। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল গীতির পর অতীতে "স্বর্ণযুগ"এর গান ছিল আমাদের  সম্পদ ও অহংকার। আশির দশকে যখন বাংলা গানের ঘোর দুর্দিন, যখন কথা,সুর ও গায়নে চলছে  এক ভাটা সেই সময় স্বর্ণযুগের বেশ কিছু জনপ্রিয়  গানকে আধুনিক যন্ত্রায়োজন ও প্রযুক্তিগত ডিজিটাল ব্যবহারের মাধ্যমে "রিমেক" এর রূপ দিয়ে  সেই গানগুলোকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করে তুললেন কিছু নতুন শিল্পী। এর প্রায় সমান্তরালে সময় ও সমাজের বিভিন্ন সমস্যার কথা সুরের মাধ্যমে গান হয়ে গেলদুই চারজন শিল্পীর কন্ঠে। যাঁদের মধ্যে অগ্রগন্য সুমন চট্টোপাধ্যায় বা কবীর সুমন।যিনি নিজের কথা,সুর আর নিজেরই যন্ত্রানুষঙ্গে "তোমাকে চাই..."এর মত কথা -সুরের সার্থক মেলবন্ধন এবং পুরুষোচিত দরাজ কন্ঠে বাজিমাত করলেন। সেই গান পেয়ে গেল "জীবনমুখী" তকমা। এইভাবেই যুবসমাজের ক্রাইসিসকে কথা ও সুরে বেঁধে রেওয়াজী কন্ঠ নিয়ে দাপটের সঙ্গে আবির্ভূত হলেন নচিকেতা চক্রবর্তী। যুবসমাজের কাছে জনপ্রিয় "নচিকেতা"হয়ে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশিষ্ট অভিনেতা অঞ্জন দত্তও এলেন "জীবনমুখী" সংগীত শিল্পী হয়ে। 

এরপর এর "বাংলা ব্যান্ড"। যেখানে প্রাধান্য পেতে লাগলো সম্মিলিত যন্ত্রানুষঙ্গ। একাধিক ব্যান্ডের গান জনপ্রিয় হলেও এইসময় থেকেই আবার অধঃপতন শুরু হলো বাংলা গানের। গান না শিখে, বেসুরো কন্ঠ নিয়ে এবং যন্ত্রের অযথা দাপাদাপিতে গান নয় মুখ্য হয়ে উঠল বিকৃত অঙ্গভঙ্গি। বর্তমানেও বাংলা সংগীত জগতে অসংখ্য বেসুরোদের দাপাদাপি। যারা রাজনৈতিক আনুগত্যে দিনের পর দিন মঞ্চ পেয়ে আসছেন। বিশেষকরে পূর্বতন শাসকদলের আমলে, অনুগ্রহের বাড়বাড়ন্তে যথার্থ যোগ্য শিল্পীদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের প্রাধান্য দেওয়া বাংলা গানের সর্বনাশের অন্যতম কারণ। সঠিক নির্বাচন কে গুরুত্ব না দিয়ে আনুগত্যের রমরমার প্রতিফলন এখনও মাঝে মাঝে দেখি দূরদর্শনের এক রাষ্ট্রীয় চ্যানেলে। কীভাবে এরা শিল্পীর মর্যাদা পান ভাবতে অবাক লাগে। ইদানিং এই বাংলা গানের আরও ক্ষতি করছে  "হ্যান্ডসেট" উৎসারিত "ট্র্যাক মিউজিক" সিস্টেম। বাড়িতে হারমোনিয়াম থাকলেও অনেকের বাড়িতে
সেই হারমোনিয়াম এখন ধুলোয় ঢাকা পড়েছে। সস্তায় জনপ্রিয়তা হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু  প্রকৃত,
 প্রশিক্ষিত শিল্পী হওয়া যায়না। 
   
একসময় দেখেছি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, পিন্টু ভট্টাচার্য থেকে শুরু করে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতী মুখোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্তদের হারমোনিয়াম নিয়ে বসে বসেই আসরের পর আসর মাতিয়ে রাখতে। আমাদের বাংলার সবচেয়ে সম্পদ সুরের রাগ- রাগিনী। যার উৎসও কিন্তু সেই প্রকৃতি। তাকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অথচ সংগীতের রাগ-রাগিনীকে আমরা অধিকাংশ বাঙালি অকারণ জটিলতার তকমা দিয়ে অজান্তেই উপেক্ষা করি।  আমাদের চারপাশের লোক সংগীত, বাউল গান সব কিন্তু এই রাগ রাগীনির প্রচ্ছন্ন মোড়কে প্রকৃতি থেকে উৎসারিত। তাকে উপেক্ষা করার সাধ্য কার?

ঠিক যেভাবে রবীন্দ্রনাথের গানেও আমরা খুঁজে পাই বিভিন্ন রাগ-এর মুর্ছনা। এই প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কথা মনে পড়ছে। গানটিতে রয়েছে  প্রকৃতির একটি ভয়াল রূপ। মল্লার জাতীয় সারং রাগাশ্রিত গানটি হল-----
       "গহন ঘন ছাইল গগন ঘনাইয়া 
        স্তিমিত দশ দিশি স্তম্ভিত কানন
         সব চরাচর আকুল
        কী হবে কে জানে......"
এমন অসংখ্য, অজস্র কত গান গ্রীষ্ম, বর্ষা,শরৎ বিভিন্ন ঋতুতে। সবই প্রকৃতি উৎসারিত।

 এর সঠিক অন্বেষণের জন্য, অনুধাবনের জন্য প্রয়োজন অনুশীলন ও চর্চা। যা আমাদের, বাঙালিদের চিরকালীন সম্পদ। তাকে অস্বীকার ক'রে প্রকৃত সংগীত শিল্পী হওয়া কখনো সম্ভব নয়। এই ধারা, ঐতিহ্য নিয়েই বাংলা গানের প্রবাহ  ঝর্নার মতোই চিরন্তন, চিরকালীন।


 

গণতন্ত্র 

অভিজিৎ সেন 


গ্রিক শব্দ "demos"(জনগণ ) "kratos"(শাসন) অর্থাৎ জনগণের শাসন হলো গণতন্ত্র । গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধুমাত্র  সংখ্যাগরিষ্ঠরা শাসন করেন তাই নয় এখানে সংখ্যালঘু ও বিরোধী মতাদর্শের মানুষের অধিকার সমানভাবে সুরক্ষিত থাকে। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন,'Democracy is a government of the people, by the people and for the people' ভীমরাও আম্বেদকর বলেছিলেন,'Democracy is not just a method of government, it is a form of social organisation' প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো গণতন্ত্রের বিরোধী ছিলেন। তাঁর মতে গণতন্ত্র হলো 'অজ্ঞদের শাসন' । তিনি তাঁর 'The Republic' গ্রন্থে গণতন্ত্রের বদলে একজন 'দার্শনিক রাজা'র শাসনকে উপযুক্ত মনে করেছেন । অ্যারিস্টোটলের মনে করতেন গণতন্ত্র হলো 'বিকৃত শাসন ব্যবস্থা' । তাঁর মতে গণতন্ত্র হলো বহুজনের বা দরিদ্রদের শাসন ব্যবস্থা যেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ দেখে । কিন্তু তিনি মধ্যবিত্তের শাসনকে সর্বোত্তম মনে করতেন । যা অনেকটা আধুনিক গণতন্ত্রের কাছাকাছি । 

               আধুনিক যুগে ইউরোপে বিভিন্ন দার্শনিক ও চিন্তাবিদেরা যেমন জন লক, জঁ জ্যাক রুশো, জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রের পক্ষে নিজেদের যুক্তিপূর্ণ মতামত দিয়েছেন। আধুনিক গণতন্ত্র ও উদারতাবাদের জনক হলেন জন লক । 'Two Treatises of Government'(১৬৮৯) জন লকের এই গ্রন্থটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি হিসাবে পরিচিত । এখানে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, স্বাধীনভাবে চলা, মত প্রকাশের অধিকার, নিজের শ্রম দ্বারা অর্জিত সম্পদ ভোগের অধিকারের কথা বলা আছে। বলা হয়েছে সরকার ঐশ্বরিক নিয়মে তৈরি হয় না মানুষ নিজের অধিকার গুলো রক্ষার জন্য পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে, সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে সরকার গঠন করেন । যদি সেই সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয় স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, জনগণ সেই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন সরকার গঠন করতে পারে । তিনি ধর্মীয় সহনশীলতার পক্ষে মত দেন। রাষ্ট্র ব্যক্তির উপর জোর করে ধর্মীয় বিশ্বাস চাপিয়ে দিতে পারেন না । জন লকের রাজনৈতিক চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন পরবর্তীকালে ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার ও রুশো । ১৭৭৬ সালে আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ও আমেরিকার সংবিধান লকের দর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে ।

        দার্শনিক ভলতেয়ার মনে করতেন আইনের চোখে সবাই সমান । তিনি বাক্ ও ধর্মীয় স্বাধীনতার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষপাতী না হলেও ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের মূল মন্ত্র Liberty, equality, fraternity-এর পেছনে তাঁর লেখনীর অবদান ছিল ।রুশো 'জনগণের সার্বভৌমত্ব' এবং 'সাধারন ইচ্ছা'র ধারণা দিয়েছেন । তাঁর মতে প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই সম্ভব জনগণ যখন সরাসরি আইন প্রণয়নে অংশ নেবে। তিনি প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিল গণতন্ত্রকে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার শ্রেষ্ঠ উপায় হিসেবে দেখেছেন । তিনি বলেন খেয়াল রাখতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন যাতে স্বৈরাচারে পরিণত না হয়। তিনি জোর দিয়েছেন সংখ্যালঘুর অধিকার রক্ষার উপর। তিনি শিক্ষিত নাগরিকদের ভোটাধিকারের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রচলিত বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে ধনীদের শাসন হিসেবে দেখা হয়। তাঁদের মতে প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই আসবে যখন সমাজে কোন শ্রেণিবিভাগ থাকবে না এবং অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ উল্লেখিত দার্শনিকগণ ব্যক্তি মানুষের মর্যাদা ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করাকেই গণতন্ত্রের প্রকৃত লক্ষ্য মনে করেছেন। 

          আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রকে কয়েকটি ধারায় পরিচালিত হতে দেখা যায় । (১) প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রে নাগরিকরা কোন মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নেয় । যেমন সুইজারল্যান্ডে যেকোনো জাতীয় বিষয়ে নাগরিকরা গণভোট বা রেফারেনডামের মাধ্যমে সরাসরি মতামত দেয় । একইভাবে কোন আইনের বিরুদ্ধেও তারা এভাবেই চ্যালেঞ্জ করে থাকে ।(২) সংসদীয় গণতন্ত্রে আইনসভা বা সংসদ সবচেয়ে প্রভাবশালী। প্রধানমন্ত্রী আইনসভার কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। এই ব্যবস্থা লক্ষণীয়  ব্রিটেনে, জার্মানিতে ও কানাডায়। সংসদীয় গণতন্ত্রের epicenter হল ব্রিটেন। ব্রিটেনে কয়েকশো বছরের বিবর্তন ও সংগ্রামের পথে এই ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল। ১২১৫ সালে রাজা জন ও বিদ্রোহী ব্যারনদের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'ম্যাগনা কার্টা'চুক্তির মধ্য দিয়ে । রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতা সীমিত হয়।
আইনের শাসন এবং জনগণের বিশেষত অভিজাতদের অধিকার স্বীকৃতি পায়। ১৬৮৮ সালে'গৌরবময় বিপ্লবে'র ফলে রাজা জেমস ক্ষমতারচ্যুত হন । রাজার দৈব ক্ষমতা বলে দেশ শাসন করতে পারবেন না। রাজার ক্ষমতা পার্লামেন্টের উপর নির্ভরশীল থাকবে।১৬৮৯ সালে পাশ হয় 'Bill of Rights' বলা হয় পার্লামেন্টের সম্মতি ছাড়া রাজা কোন নতুন কর আরোপ করতে পারবেন না । পার্লামেন্টের সদস্যরা বাক্ স্বাধীনতা ভোগ করবে, নির্বাচন হবে অবাধ ও নিয়মিত । ১৭২১ সালে স্যার রবার্ট ওয়ালপোল ব্রিটেনের কার্যকরী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়েই রাজার হাত থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতা ক্রমান্বয়ে ক্যাবিনেট ও পার্লামেন্টের হাতে আসতে শুরু করে । ব্রিটেনে ১৬৮৯ সালে সংসদীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হলেও সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। Representation of the people act অনুযায়ী ১৯১৮ সালে নির্দিষ্ট শর্তে নারীরা এবং ১৯২৮ সালে সকল প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক সমান ভোটাধিকার লাভ করে। Reform act অনুযায়ী ১৮৩২ সালে মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরুষদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। বৃটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থাটি বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তার করে পরবর্তীকালে। ভারত, বাংলাদেশ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি ৩০টির বেশি দেশ সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে বৃটেনের সংসদীয় কাঠামোকে অনুসরণ করে দেশ পরিচালনা করছে। (৩)রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান একজনই হন । ইনি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত। আইনসভা বা সংসদের কাছে তার কাজের জন্য সরাসরি দায়বদ্ধ থাকেন না। কারণ তিনি আইনসভার সদস্য নন। রাষ্ট্রপতি তার নিজের কাজের সহায়তার জন্য একটি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। আবার যেকোনো সময় তার পরিবর্তন করতে পারেন। এই ব্যবস্থা দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, ব্রাজিলে, দক্ষিণ কোরিয়ায়। (৪) সাংবিধানীক রাজতন্ত্রে রাজা বা রানী থাকলেও তার ক্ষমতা সংবিধান দ্বারা সীমাবদ্ধ। মূলত এটি এক ধরনের সংসদীয় গণতন্ত্র। যেমন জাপানে সম্রাট রাষ্ট্রের প্রতীক, প্রকৃত ক্ষমতা জনগণের হাতে নির্বাচিত সরকারের হাতে। তেমনই নেদারল্যান্ড ও নরওয়েতেও রাজতন্ত্র নামমাত্র, শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক। (৫) সেমি প্রেসিডেন্সিয়াল গণতন্ত্রে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের হাতেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ভাগ করা থাকে। ফ্রান্স এমনই একটি মিশ্র শাসনব্যবস্থার উদাহরণ। ফ্রান্সের বর্তমান শাসন ব্যবস্থা কে'fifth republic' বলা হয়। পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, জরুরী ক্ষমতা, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ রাষ্ট্রপতি করেন। দেশের আভ্যন্তরীণ নীতি, আইন প্রণয়ন, দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ, সংসদে সরকারের হয়ে জবাবদিহি, বিল পাস করানোর দায়িত্ব পালন করেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি বিরোধী দল হয় তখনো রাষ্ট্রপতিকে ওই বিরোধী দলের কোন ব্যক্তিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়। ১৮৫৮ সালের পূর্বে ফ্রান্সে এ ব্যবস্থা ছিল না। তখন ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হতো। তাই জেনারেল শার্ল দ্য গোল এই ব্যবস্থা চালু করেন।  ফলে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। ফ্রান্স ছাড়া রাশিয়া,  ইউক্রেন, শ্রীলংকা ও পর্তুগালে এই ব্যবস্থা আছে। এই মধ্যপন্থার জন্য এক দিকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার "স্থিতিশীলতা" এবং প্রধানমন্ত্রী দ্বারা শাসিত সংসদীয় ব্যবস্থার "জবাবদিহিতার"মেলবন্ধন ঘটে থাকে ।(৬) বর্তমান বিশ্বে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের ব্যবস্থা বেশিরভাগ দেশে প্রচলিত। জনগণ সরাসরি দেশ পরিচালনা করার জন্য ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন । প্রতিনিধিরা আইন প্রণয়ন করেন। আইন সংশোধন করেন। ভারতবর্ষ বিশ্বের বৃহত্তম প্রতিনিধি মূলক গণতন্ত্র। জনগণ দ্বারা সংসদ সদস্য এবং বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও একই পদ্ধতিতে গণতন্ত্র পরিচালিত হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পরোক্ষ বা প্রতিনিধি মূলক গণতন্ত্রে জনগণ কংগ্রেস সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন । 
        
প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে কতটা গণতান্ত্রিক উপাদান বিদ্যমান ছিল আলোচনা করা যায়। বৈদিক যুগে সভা ও সমিতি নামে দুটি পরিষদ রাজার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করত । সভা ছিল গণ্যমান্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের ছোট পরিষদ। যেখানে তারা বিচারকার্য ও পরামর্শদাতার ভূমিকা পালন করতেন। সমিতি ছিল জনগণের একটি বড় সমাবেশ। এখানে সম্পদ বন্টন, যুদ্ধের প্রস্তুতি, জনসাধারণের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। সমিতির সদস্যরা সরাসরি রাজাকে  নির্বাচন ও পদচ্যুত করার ক্ষমতা রাখতেন। রাজা দায়িত্ব গ্রহণের সময় শপথ নিতেন প্রজাদের রক্ষা করবেন, আইন ও ধর্ম মেনে চলবেনা। বেদে 'গণ' বা জনপদের উল্লেখ আছে। গনের প্রধান কে বলা হয় 'গণপতি' । গণ অর্থাৎ গোষ্ঠী যারা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন। পূর্ববর্তী বৈদিক যুগে নারীরা সভা ও সমিতিতে অংশগ্রহণ করতেন, নিজেদের বলিষ্ঠ মতামত রাখতেন। ঋগ্বেদ ১০.১৯১.৩ বলা আছে "সমানো ও মন্ত্রঃ সমিতিঃ সমানীঃ" । অথর্ববেদ ৮.১২.১ বলা আছে " সভা চ মা সমিতিশ্চাবতাম্ প্রজাপতেরদুহিতরৌ সংবিধানে " অর্থাৎ সভা ও সমিতি প্রজাপতি এই দুই কন্যা যেন ঐক্যমাদের ভিত্তিতে আমাকে সুরক্ষা প্রদান করেন ।

                       খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে ষোড়শ মহাজনপদে রাজতন্ত্রের পাশাপাশি প্রজাতান্ত্রিক জনপদের অস্তিত্ব ছিল। এগুলোকে "গণরাজ্য"বলা হতো। যেমন বৃজি, মল্ল, শাক্য,মোরীয় । এগুলোতে একক রাজবংশের শাসনের পরিবর্তে শাসনের মূল দায়িত্ব ন্যস্ত হতো একটি পরিষদের উপর। বৃজি বা লিচ্ছিবিদের কেন্দ্রীয় আইনসভা 'সাঁথাগারে' নাগরিক প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। কোন বিষয়ে মতবিরোধ হলে 'ভোট' বা 'ছন্দ' করা হতো। ভোট গণনার জন্য কাঠি বা 'শলাকা' ব্যবহার করা হতো। বিচার ব্যবস্থা স্বচ্ছ ছিল। বিচার বিভাগীয় কমিটি অর্থাৎ 'অষ্টকুলক'দোষী ব্যক্তিকে সাতটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে বিচার করতেন। যদি একটি স্তরেও নির্দোষ প্রমাণিত হতো তবে তাকে মুক্তি দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে গৌতম বুদ্ধ তাঁর বৌদ্ধ সংঘের নিয়মাবলী লিচ্ছিবিদের গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তির উপর গড়ে তুলেছিলেন। বুদ্ধদেব নিজে সাক্ষ্য বংশীয় প্রজাতান্ত্রিক পরিবেশে বড় হয়েছিলেন। তাঁর শিষ্যদের জন্য গড়ে তোলা সংঘে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ ছিল না । সভার কাজ শুরু করার জন্য নূন্যতম সদস্যের উপস্থিতি বা কোরামের প্রয়োজন হতো । একে বলা হত 'গণপূরক' । মতভেদ হলে ভোট হতো শলাকা ব্যবহার করে ।'মহাপরিনির্বাণসূত্ত' অনুযায়ী বুদ্ধদেব পরবর্তীকালে বৃজিদের যে সাতটি নিয়মের কথা বলেন তা গণতান্ত্রিক আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত---নিয়মিত জনসভা করা, একতাবদ্ধ হয়ে সভায় বসা ও কাজ করা, প্রচলিত আইনের শ্রদ্ধা এবং অপ্রয়োজনে কঠোর আইন না চাপানো, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা ও পরামর্শ গ্রহণ, নারী ও শিশুদের ওপর জোর জবরদস্তি না করা এবং তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ধর্মীয় স্থান ও ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা এবং জ্ঞানী ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের নিরাপত্তা প্রদান করা। বৌদ্ধ ধর্ম বর্ণপ্রথা বা বংশ মর্যাদার পরিবর্তে ব্যক্তির গুণ ও কর্মকে গুরুত্ব দিতেন। বৌদ্ধ নারী সন্ন্যাসিনীদের জন্য সংঘের ব্যবস্থা করেছিলেন। 

                  মধ্যযুগের ভারতে আজকের মতো রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ ছিল না ঠিকই তবে গণতান্ত্রিক উপাদানের উপস্থিতি ছিল বিশেষ করে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনে। প্রাচীন যুগে খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে হর্যঙ্ক বংশীয় বিম্বিসার ও অজাত শত্রুর রাজতন্ত্রের পাশাপাশি বৃজির মতন যেমন গণরাজ্য ছিল তেমনি বিম্বিসারের সময় গ্রামের প্রধান বা গ্রামভোজকরাই স্থানীয় সমস্যা নিয়ে রাজার সঙ্গে আলোচনা করতে পারতেন। নন্দ বংশের সময় মগধে মানুষের স্বাধীনতা ছিল না। মৌর্য যুগে বিশেষ করে অশোকের সময় বাক্ স্বাধীনতা, ধর্মীয় সহনশীলতা লক্ষণীয়। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা'য় পৌর প্রশাসনের ভূমিকার কথা বলা আছে। কুষাণ সম্রাট কনিষ্কের সময়ে ভারতে বহুমাত্রিক সংস্কৃতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতা অনেক বেশি বিকশিত হয়। গুপ্ত যুগে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ও নাগরিক স্বাধীনতা চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। গুপ্ত যুগে প্রাণদণ্ড বা কঠোর শারীরিক নির্যাতন ছিল না। প্রজাগণ রাজার অনুমতি ছাড়াই দেশের যে কোন জায়গায় যেতে পারতেন। হিউ ইন সাং এর বিবরণী থেকে জানা যায় হর্ষবর্ধনের আমলেও গুপ্ত যুগের স্বায়ত্তশাসন শাসন ব্যবস্থা অক্ষুন্ন ছিল । 

                  বাংলার স্বাধীন শাসক শশাঙ্কের (খ্রিস্টীয় ৫৯০-৬২৬) মৃত্যুর পর প্রায় একশত বছর বাংলায় কেন্দ্রীয় শাসন না থাকার ফলে চরম অরাজকতা সৃষ্টি হয়। সবল ব্যক্তিরা দুর্বলদের গ্রাস করতে থাকে ইতিহাস এই কাল খণ্ডকে "মাৎসান্যায়"বলে অভিহিত করেন। এই চরম অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে সেদিন বাংলার মানুষ যা করেছিলেন তা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য গণতান্ত্রিক ঘটনা। আনুমানিক ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সাধারণ জনগণ, সামন্ত শ্রেণি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সম্মিলিত ভাবে আলোচনা করে গোপাল নামক এক যোগ্য সামরিক নেতাকে বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন ।
তার প্রমাণ পাল তাম্রশাসন 'খালেমপুর তাম্রপট' । এখানে উল্লেখ আছে "মাৎস্যন্যায় অপোহিতুং প্রকৃতিভিরলক্ষ্ম্যাঃ করং গ্ৰাহিতঃ শ্রীগোপাল ইতি " অর্থাৎ মাৎস্যন্যায় অবসান করার জন্য প্রকৃতি বা জনগণ গোপালকে লক্ষীর হাত বা রাজত্ব গ্রহণ করিয়েছিলেন। সেন আমলে কৌলিন্য প্রথার ব্যাপক প্রভাবে সমাজে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হয়েছিল। 

                ভারতের মাটিতে বহু পূর্বেই গণতন্ত্রের বীজ বপন করা হয়েছিল । বহু বিবর্তনের পথ ধরে সেই গণতন্ত্র বর্তমানে মহীরুতে পরিণত হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব শতকের গণরাজ্য, বৌদ্ধ সংঘ, প্রাচীন ও মধ্যযুগে গ্রামীণ স্তরে রাজার বদলে গ্রাম সভার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, আধুনিক যুগে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকালে ভারতীয়দের অধিকার সচেতনতা, জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠার (১৮৮৫), মহাত্মা গান্ধীর ভারতব্যাপী গণ-আন্দোলন, মন্টেগু-চেমসফোর্ড সংস্কার (১৯১৯)--আইনসভায় আসার এবং ভোট দানের অধিকার, ভারত শাসন আইন (১৯৩৫) এই আইন দ্বারা প্রাদেশিক স্বায়ত্ত শাসন চালু হয় এবং ১৯৩৭ সালে নির্বাচনে ভারতীয়দের সরকার গঠনের অভিজ্ঞতা লাভ হয় । স্বাধীনতার পূর্বে 'গণপরিষদ' গঠন করে ভারতবাসীর জন্য সংবিধান তৈরীর কাজ শুরু হয়। এতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৩৮৯ জন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন। মহিলা সদস্য ছিলেন ১৫ জন। যেমন সরোজিনী নাইডু, রাজকুমারী অমৃত কাউর, দুর্গাবাঈ দেশমুখ প্রমুখ । ডঃ বি আর আম্বেদকর ছিলেন সংবিধান খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান। ২ বছর ১১ মাস ১৮ দিনের কঠোর পরিশ্রমের পর ১৯৪৯ সালের ২৬ শে নভেম্বর ভারতের সংবিধান গৃহীত হয় এবং ১৯৫০ সালে ২৬ শে জানুয়ারী তা কার্যকরের মধ্য দিয়ে ভারত একটি "সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র" হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে । সংবিধানে সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সমতা, দলিত ও শোষিতদের অধিকার, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী-পুরুষ সকলের সমান ভোটাধিকার প্রভৃতি বিষয় উল্লেখিত থাকে। যেখানে আমেরিকা বা বৃটেনের মতো দেশেও নারী, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের ভোটের অধিকার পেতে কয়েক দশক লড়তে হয়েছিল । ১৯৫১-৫২ সালে ভারতের প্রথম মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ড. সুকুমার সেনের নেতৃত্বে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, এভাবেই গণতন্ত্রের সকল পরীক্ষা হয় যা ভারতকে পৃথিবীর মধ্যে সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করে ।

                  মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রাচীন ও মধ্যযুগ মূলত রাজতন্ত্র বা সামন্ততন্ত্র বা জমিদার তন্ত্রের একচ্ছত্র অধিকার। আধুনিক যুগে গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র প্রাধান্য লাভ করে। গণতন্ত্রের হাত ধরেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদ, সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা প্রভৃতির চরম বিকাশ । রাজতন্ত্রে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতা রাজার হাতে থাকে, তিনি বংশানুক্রমিকভাবে ঐশ্বরিক শক্তির প্রতিনিধিত্বের দোহাই দিয়ে প্রজাদের উপর শাসন করতেন। প্রজাগণ এখানে রাজার অধীন। মধ্যযুগের সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় জমির মালিক হতেন রাজা-বা জমিদারবর্গ । কৃষকেরা মূলত ভূমিদাস । 

                                আধুনিক যুগে প্রজাতন্ত্রে বা গণতন্ত্রে সার্বভৌম ক্ষমতা জনগণের হাতে চলে আসে। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ দেশ শাসন করেন। জন প্রতিনিধিরা জনগণের মৌলিক অধিকারগুলো স্বাধীনতা,সম্পদের রক্ষা,জীবনের সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়কেই প্রাধান্য দেন । নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই সমান। গণতন্ত্রের হাত ধরেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের আগমন। গণতন্ত্রের বৃত্ত এখানেই সম্পূর্ণ হয়। 
              
ম্যাকিয়াভেলি 'The Prince' গ্রন্থে বলেছিলেন রাজাকে ছল,বল,কৌশল খাটিয়ে একনায়কতন্ত্র চালাতে হবে। মনে হতে পারে তিনি স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের সমর্থক। কিন্তু তিনি মনে প্রাণে প্রজাতন্ত্র ও সীমিত গণতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন। 'Discourses on Livy' গ্রন্থে প্রাচীন রোমান প্রজাতন্ত্রের প্রশংসা করে বলেছিলেন একজন রাজার চেয়ে সাধারণ জনগণ অনেক বেশি বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ । তিনি পূর্ণ গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন না "মিশ্র শাসন ব্যবস্থার"সমর্থক ছিলেন। তিনি মনে করতেন গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র হলো বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শাসন ব্যবস্থা তাকে টিকিয়ে রাখার জন্য নাগরিকদের সৎ, দেশপ্রেমিক ও আইন পরায়ন হতে হবে। দুর্নীতিগ্রস্ত সমাজে গণতন্ত্র টিকে থাকতে পারে না ।
                  
বিদেশি পর্যটক যারা ভারতবর্ষে এসেছিলেন তাঁদের বিবরণীতে তৎকালীন সময়ের শাসনব্যবস্থার বাস্তব চিত্রটি অনেকটাই ফুটে ওঠে। প্রায় প্রত্যেকেই স্বীকার করেছেন এদেশে কেন্দ্রীয় স্তরে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত থাকলেও গ্রামীণ স্তরে গণতান্ত্রিক পরিবেশ বর্তমান ছিল। মেগাস্থিনিসের 'ইন্ডিকা' তার সাক্ষ্য দেয়। আল বিরুনী একাদশ শতকে তাঁর ' কিতাব-উল-হিন্দ' গ্রন্থে জাতিভেদের কঠোর সমালোচনা করলেও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের কথা বলেন। ইবনে বতুতা চতুর্দশ শতকে ' কিতাবুর রেহলা' গ্রন্থে বলেন গ্রামে স্বায়ত্তশাসন বজায় ছিল। সাধারণ মানুষ সুলতানের দরবার এসে রাজ কর্চারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে পারতেন । সপ্তদশ শতকে ফ্রাঁসোয়া বার্নিয় তাঁর "travels in the Mughal Empire' গ্রন্থে বলেন মুঘল যুগের সাধারণ মানুষের অধিকার ছিল না । কিন্তু আধুনিক যুগে তার ধারণা আংশিক ভুল ছিল বলে প্রমাণিত হয়। কারণ ভারতে কৃষকদের বংশানুক্রমিক জমির অধিকার ছিল । ইতালীয় পর্যটক নিকোলাও মানুচ্চি মুঘল 'দরবার-ই- আম' এর বর্ণনায় বলেন সম্রাট স্বৈরাচারী হলেও গরিব প্রজারা দরবার এসে অন্যায়ের বিচার চাইতে পারতেন। ১৮৩০ সালে চার্লস মেটক্যাফ ভারতের গ্রামগুলো দেখে তিনি এগুলোকে "little republics" বলেন। তাঁর বৃত্তান্তে লেখেন, 
"ভারতে একের পর এক রাজবংশের পতন ঘটেছে, বিপ্লব হয়েছে, হিন্দু, পাঠান, মোগল, মারাঠা--সবাই একে একে শাসন করেছে কিন্তু ভারতের এই স্বায়ত্তশাসিত গ্রামগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে । প্রতিটি গ্রাম যেন নিজের মধ্যে এক একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ।"

                   ভারতীয় সংবিধানের তৃতীয় খন্ডে ১২ থেকে ৩৫ নং ধারায় মৌলিক অধিকার গুলি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। মৌলিক অধিকার খর্ব হলে ব্যক্তি ২২৬ নং ধারায় হাইকোর্টে ও ৩২ নং ধারায় সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে পারেন। ছয়টি মৌলিক অধিকার আছে। ১৪ থেকে ১৮ নং ধারা সাম্যের অধিকার, ১৯ থেকে ২২ নং ধারা স্বাধীনতার অধিকার, ২৩ ও২৪ নং ধারা শোষণের বিরুদ্ধে অধিকার, ২৫ থেকে ২৮ নং ধারা ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার, ২৯ ও ৩০ নং ধারা সংস্কৃতি ও শিক্ষার অধিকার, ৩২ নং ধারা সংবিধানের প্রতিবিধানের অধিকার । আম্বেদকর ৩২ নং ধারাকে"heart and soul of the constitution"বলেছিলেন। তবে মনে রাখতে হবে মৌলিক অধিকারগুলো অবাধ বা চরম নয়। দেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, জনশৃঙ্খলা এবং নৈতিকতা রক্ষা করার জন্য রাষ্ট্র এই অধিকার গুলোর উপর "যুক্তিযুক্ত নিষেধাজ্ঞা"জারি করতে পারেন । National emergency ঘোষিত হলে ২১ নং ধারা অর্থাৎ জীবনের অধিকার ছাড়া বাকি মৌলিক অধিকারগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করা যেতে পারে রাষ্ট্র । এখানেই গণতন্ত্রের নমনীয়তা,সৌন্দর্য এবং দীর্ঘস্থায়ীত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে। যা ছিল না রাজতন্ত্রে বা সাম্রাজ্যবাদে ।


 

শান্তিনিকেতনের নিয়ে গুরুদেব এবং মহাত্মা গান্ধীর দ্বন্দ্ব
বটু কৃষ্ণ হালদার

বৈশাখ মাসের সঙ্গে বাঙ্গালীদের নাড়ির সম্পর্ক যুগ যুগ ধরে। পয়লা বৈশাখ যেমন বাঙ্গালীদের কাছে এক অতি প্রিয় লোক উৎসব, তেমনি ২৫ বৈশাখ হলো বাঙালির কাছে অত্যন্ত আনন্দের।১২৬৮ সালের ২৫ শে বৈশাখ মঙ্গলবার কলকাতার জোড়াসাঁকোতে বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সারদা দেবীর কোল আলো করে জন্ম নিলেন রবি ঠাকুর। পিতার নাম দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ভোরের আকাশে পূব দিকে সূর্য যেমন ওঠে হেসে হেসে, ঠিক তেমনই আমাদের হৃদয়ের আকাশে ছেয়ে আছে তোমার স্মৃতি পট।।১৩১৭ সালের ৩১ শ্রাবণ "গীতাঞ্জলি" ছাপা হয়েছিল।এই গীতাঞ্জলি ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়ার পর বিশ্বের লেখক কবিদের মধ্যে সাহিত্যে নবজাগরণের সূচনা করেছিল। এই "গীতাঞ্জলি" এনে দিয়েছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সম্মান নোবেল পুরস্কার। সর্বপ্রথম এশিয়া মহাদেশের মধ্যে ভারতের গৌরব বাঙালি কবি রবি ঠাকুর। বিশ্বের দরবারে বাঙালি সত্তাকে তিনি প্রথম উন্মোচন করেছিলেন। সেই থেকে বাঙ্গালীদের আর ফিরে তাকাতে হয়নি। তবে সবথেকে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হলো ২০০৪ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি ঘটনাটা হল এদেশের সর্বশেষ্ঠ কলঙ্ক। তিনটি দেশের জাতীয় সংগীত যাঁর অবদান, নোবেল চুরি করে সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলে দেয়া সম্ভব নয়। কারণ তিনি আমাদের হৃদয়ের যুগে যুগে বিরাজমান। রাজনীতি প্রসঙ্গ বিশ্বকবির অবদান কম নয়। তিনি বরাবরই স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীদের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন লেখনীর মাধ্যমে।যেমন"আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলায় ফাঁসির হুকুম হইয়া গেলে বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত দুই হাতে লোহার বেরি বাজাইতে বাজাইতে রবীন্দ্রনাথের গান ধরেন। তিনি গেয়ে ওঠেন_"সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে/সার্থক জনম মাগো তোমায় ভালোবেসে"।একদিন ভূপেন্দ্র কুমার বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত কে জিজ্ঞাসা করেন_"আচ্ছা দিনেশ তুমি তো ভীষণ চঞ্চল ছেলে, তুমি কি পড়ার সময় শান্ত হয়ে যাও? বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত বলে কবিতা। ভূপেন্দ্র কুমার জিজ্ঞেস করেন কার কবিতা? বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত উত্তর দেন রবীন্দ্রনাথের।এসবের মধ্যে দিয়ে তিনি দেশপ্রেমের নমুনা দিয়ে গেছেন। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছিল প্রচন্ড আন্তরিকতা ও ভালোবাসা।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন জীবনশৈলী তে বিশ্বাসী অসীম সাহিত্যের দার্শনিক। সবচেয়ে বড় কথা তিনি ছিলেন জীবন রসের কবি। আসীম সসীমের মিলনকে কবি অনুভব করেছেন।প্রেম ভালোবাসার রূপে, রসে, গন্ধ, স্পর্শে, বিষাদে, সুখ দুঃখে পৃথিবীর তুচ্ছতম ধুলিকনা ও কবির কাছে পরম উপভোগ্য হয়েছে। সবই অভিষিক্ত হয়েছে সৌন্দর্যায়নের উৎসরসে। বিশ্বের অন্তর্নিহিত যার থেকে এই অনন্তময় পৃথিবীর সৃষ্টি, সেই অন্তর্নিহিত সৃষ্টির মূল সত্য কবির মধ্যে আধ্যাত্মিক চেতনার সাথে যুক্ত হয়েছিল। বিশ্বে কোনো কিছুর স্থির নেই। সমস্ত বিপুল পরিবর্তনময়। পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে অবিরাম। এই অনির্দিষ্ট ছুটে চলা, অনন্ত জীবন প্রবাহের এটাই বিশ্ব সৃষ্টির মূল তত্ত্ব। কবি মনে প্রাণে বিশ্বাস করতেন ও গভীর ভাবে অনুভব করেছিলেন।

১৯১৯ সালে বিশেষ করে জালীয়ানওয়ালাবাগে বর্বর হত্যাকান্ডের নায়ক জেনারেল ডায়ারের তীব্র নিন্দা করেন এবং সেই সঙ্গে ব্রিটিশ দের থেকে প্রাপ্ত নাইট উপাধি ত্যাগ করেন লর্ড চেমসফোর্ডকে তিনি বলেন যে, "আমার এই প্রতিবাদ, আমার আতঙ্কিত দেশ বাসির মৌন যন্ত্রণার অভিব্যক্তি"।এর থেকে বোঝা যায় তিনি কত না দেশ কে ভালোবাসতেন।তিনি শুধু কলম দিয়ে নয় মন প্রাণ দিয়ে দেশ কে সেবা করেছেন। তিনি  এক দিকে দেশ প্রেম  আর অন্য দিকে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে মোহিত করা দুটো কেই সমান তালে চালিয়ে নিয়ে গেছেন। সাহিত্য দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন সমগ্র বিশ্বে।তিনি বিশ্ব জোতিরময়ের অগ্নি বল য়। জীবন্ত প্রতিমূর্তি, যুগ যুগ ধরে জাজল্য মান।বিশ্ব কবি তাঁর অমূল্য সৃষ্টি গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থ লিখে পেয়েছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল ১৯১৩ সালে।বিদগ্ধ এশিয়ায় সর্ব প্রথম এই বিশ্ব সম্মানে ভূষিত হয়ে সমগ্র  বাঙালি জাতি তথা ভারতকে বিশ্বের দরবারে এক আলাদা স্বাক্ষর রেখে যান। ।তিনি সর্বদা সন্ত্রাস বাদের বিরোধিতা করে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কে সমর্থন করেন।১৮৯০ সালে প্রকাশিত "মানসী" কাব্যগ্রন্থ তে কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুররের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা ভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়।হিন্দু _জার্মান ষড়যন্ত্র মামলায় তথ্য প্রমাণ ও পরবর্তী কালের বিভিন্ন বিবরণ থেকে জানা যায় তিনি গদর ষড় যন্ত্রর কথা শুধু জানতেন না বরং এই ষড়যন্ত্র তৎকালীন জাপানি প্রধানমন্ত্রী তেরাউচি মাসাতাকি ও প্রাক্তন প্রিমিয়ার ওকুমা শিগেনোবুর এর সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। অন্যদিকে ১৯২৫ সালে একটি গ্রন্থে স্বদেশী আন্দোলনকে "চরকা" সংস্কৃতি বলে বিদ্রুপ করে রবি ঠাকুর এর কঠোর বিরোধিতা করেন।তিনি সাম্রাজ্যবাদ কে ঘৃণা করতেন।ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তার চোখে ছিল "আমাদের সামাজিক সমস্যা গুলির উপসর্গ"।এই কারণে বৈকল্পিক ব্যখ্যা হিসাবে তিনি বৃহত্তর জনসাধারণের স্বনির্ভরতা ও বৌদ্ধিক উন্নতির উপর গভীর ভাবে আলোক পাত করেন।তিনি অন্ধ বিপ্লব কে বিশ্বাস করতেন না।বাস্তব সম্মত উপযোগী মূলক শিক্ষার পন্থাটি কে গ্রহণ করার আহবান জানান।তাঁর এই ধরণের রাজনৈতিক মতবাদে অনেকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিলেন।১৯১৬ সালের শেষ দিকে সানফ্রান্সিসকোর একটি হোটেলে অবস্থান কালে একদল ভারতীয় চরম পন্থী রবি ঠাকুর কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন।ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন কে উজ্জীবিত করার জন্য লিখেছেন অগনিত গান ও কবিতা, নাটক ইত্যাদি. তাঁর কবিতা "চিত্ত যেথা ভয় শূন্য" ও গান " যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে" রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে টনিক হিসাবে কাজ করেছিল।একলা চলো রে গানটি বাপুজির খুব প্রিয় ছিল।গানটির আক্ষরিক অর্থের সঙ্গে মানব জীবনের অঙ্গlঙ্গি ভাবে জড়িত। সত্যই একা এই পৃথিবীতে আগমন ও একা একা ফিরে যাওয়া তবু ও এই বিশ্বের দরবারে আমার আমিত্ব সংজ্ঞায় ভাই ঝরায় ভাই য়ের রক্ত বা সন্তান ঝরায় পিতা মাতার রক্ত।মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে কবির ছিল অমল মধুর।দলিত সম্প্রদায় দের জন্যে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা কে কেন্দ্র করে মহাত্মা গাঁধী ও ড: বি. আর. আমবেদকরের মধ্যে যে বিরোধের সূত্র পাত হয় তার সমাধানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। গান্ধী তাঁর আমরণ অনশন প্রত্যাহার করে নেন ।স্বদেশ প্রেমে তিনি মোহিত ছিলেন কারণ দেশের উন্নতি কল্পনায় সর্বদাই উন্নত শীল চিন্তা করতেন। তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় আনতে চেয়েছিলেন আমূল পরিবর্তন। তিনি বুঝেছিলেন যে একমাত্র শিক্ষার আলোয় অন্ধ কুসংস্কারছন্ন ভারতের মুক্তির পথ লুকিয়ে আছে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যকে মিলিয়ে দিয়ে নতুন শিক্ষার অঙ্গন গড়ে তোলার চেষ্টা করেন।আধুনিক চিন্তা ধারায় সমাজকে সাজাতে চেয়েছিলেন. আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠবে আধুনিক ভারতের সমাজ ব্যবস্থা, এই রাস্তায় আসবে প্রকৃত বিপ্লব, পাল্টাবে বস্তা পচা ধ্যান ধারণা, আসবে উন্নতির জোয়ার তাই জ্ঞানের আলোয় সমাজকে আলোকিত না করলে থমকে যাবে উন্নত সমাজ ব্যবস্থা র ধারা।আর উন্নত সমাজ না গঠন হলেগড়ে উঠবে না উন্নত দেশ। উন্নত দেশগড়ার মানচিত্র থেকে যাবে খাঁচায় বন্ধী পাখির মত,শুধু ই ডানা ঝাপটাবে কিন্তু অসীম আনন্দের দিশা খুঁজে পাবে না।১৯১৭ সালের ১১ ই অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার সানটা বারবারা ভ্রমণের কালে এই চিন্তা ধারার ফলশ্রুতিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক নতুন ধরণের বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করেন।তাঁর হাতে গড়া  শান্তিনিকেতনের আশ্রম টিকে দেশ ও ভূগোল এর গণ্ডির বাইরে ভারত ও বিশ্বকে এক সূত্র ধারায় বিশ্ব পাঠ কেন্দ্র তে পরিনত করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।এক কথায় তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য কে এক ধারায় আনতে চেয়েছিলেন।অবশেষে ১৯১৮ সালের ২২শে অক্টোবর  বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিলান্যাস করেন।১৯২২ সালের ২২ শে ডিসেম্বর উদ্বোধন করেন বিশ্ব বিদ্যালয়েরর।তিনি নিজে কঠিন পরিশ্রম করে অর্থ জোগাড় করেছেন শুধু মাত্র দেশের মানুষ কে সু চিন্তায়, সু শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলবে বলে।তিনি পেয়েছিলেন বিশ্ব শ্রেষ্ঠ পুরস্কার নোবেল গীতাঞ্জলি কাব্য গ্রন্থের জন্য সেই পুরস্কার এর অর্থ মূল্য ও ব্যয় করেন বিশ্ব বিদ্যালয়ের জন্যে।১৯১৯ সাল থেকে ১৯২১  সাল পর্যন্ত একাধিক বার ইউরোপ ও আমেরিকায় গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যে অর্থ জোগাড় করতে।তিনি এক ধারে মহান ব্যক্তিত্ব অন্য দিকে সাহিত্যের দরবার।ভারতের সক্রিয় রাজনীতিতে তিনি নিজেকে যুক্ত না করলেও অনেক খানি ভূমিকা পালন করেছিলেন কারণ সমসাময়িক কিছু কিছু ঘটনা গুলি (বঙ্গ ভঙ্গ আন্দোলন, জালীয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ইত্যাদি)থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেনি বরং তিনি ছিলেন স্বদেশীকতার বরেন্য পুরুষ। ১৮৯৬সালে কলকাতায় যে কংগ্রেস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে " বন্দে _মাতরম" গানটি রবি ঠাকুর উদ্বোধন করেন।মহারাষ্ট্রের বাল গঙ্গাধর শিবাজি উৎসব পালন করেন তার অনুপ্রেরণায় তিনি লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা "শিবাজী উৎসব"।

কবিগুরুর স্বপ্নের শান্তিনিকেতন এবং বিশ্বভারতীর নানা বিভাগের পরিচালনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে কত সময়  আর্থিক কৃচ্ছতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে একথা আজ আর আমাদের নিকট কারো অজানা নয়।বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য কবিকে অনেক সময় দেশে বিদেশে ভাষণ দিতে হয়েছে মাঝে মাঝে তিনি শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকদের নিয়ে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় সংগীত নিত্য নাট্যাভিনয় জন্য ঘুরে বেড়াতেন। অর্থের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টা গান্ধীজীর মনে খুব কষ্ট দিত।রবীন্দ্রনাথ বৃদ্ধ বয়সে একবার অর্থ সংগ্রহের জন্য উত্তর ভারত অঞ্চলের সফরে বের হলেন এই সংবাদ গান্ধীজীর মনে ব্যথা দিলো। দিল্লিতে সদলবলে কবির সঙ্গে গান্ধীজীর সাক্ষাত হলে তিনি শান্তিনিকেতনে কবিকে ফেরত পাঠালেন।

গান্ধীজী গুজরাটের ওয়ার্ধা থেকে ১৩/১০/১৯৩৫ তারিখে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন_"একথা আমার নিকট ভাবনার অতীত বলে মনে হইতেছে যে আপনার এই বয়সে আপনাকে আবার ভিক্ষার উদ্দেশ্যে বাইর হইতে হইবে আপনার শান্তিনিকেতনের বাইরে পা বাড়ান ব্যতীত ই এই অর্থ কে আপনার নিকট পৌঁছে দিতে হইবে"। মহাত্মা গান্ধীর অনুরোধে ব্যবসায়ীরা রবীন্দ্রনাথের নিকট ৬০ হাজার টাকা পৌঁছে দিলেন। ওই অর্থে শান্তিনিকেতনের বহু ঋণ শোধ করা হয়। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গুরুদেব নিজের উত্তরোত্তর বার্দ্ধনমান বিশ্বভারতীর জন্য চিন্তা করতে শুরু করলেন। কারণ মৃত্যু চিরন্তন সত্য, তাকে উপেক্ষা করার মতো সাহস বিশ্বে কারো নেই। এই ভেবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করতে লাগলেন যে তার অবর্তমানে বিশ্বভারতীর ভবিষ্যৎ কী হবে। এই ভাবনা গুরুদেবের মনকে প্রবলভাবে ভারাক্রান্ত করে তুলতে লাগলো। তবে তিনি চিন্তা করেননি এমনটা নয়, ভেবেছিলেন মহাত্মা গান্ধীর কথা। মহাত্মা গান্ধীর নিকটের বিশ্বভারতী স্থায়িত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ গুরুদেবের চোখে গান্ধীজী যেমন ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কর্মক্ষমতাও অপরিসীম তেমনি বিশ্বভারতী আদর্শের প্রতি অতি নিয়ে আন্তরিকভাবে শ্রদ্ধাবান ছিলেন। মনে মনে এত শত ভাবার পর গান্ধীজীর অনুমতি না নিয়ে গুরুদেব  বিশ্বভারতীর একজন আজীবন ট্রাস্টি মনোনীত করেন গান্ধীজী কে। ট্রাস্টি মনোনয়নের পর পর কবি গান্ধীজী কে একটি চিঠি লিখেন_"(১০.০২.১৯৩৭) আমি আপনাকে আমাদের বিশ্বভারতীর একজন আজীবন ট্রাস্টি মনোনীত করার স্বাধীনতা গ্রহণ করেছি। আমার জীবনের এই ভাঙ্গা শেষ বয়সে জিনিসটা জানতে পারলাম যে যে প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অংশ এবং শ্রেষ্ঠ সামর্থ্য নিয়োজিত করিয়াছি সেই প্রতিষ্ঠান আপনাকে তার একজন অভিভাবকরূপ লাভ করিবে"। উদ্ভিদও উক্তিগুলোর মধ্য দিয়ে বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাত্মা গান্ধীকে কতটাইনা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতে।

তবে সমস্যার সূত্রপাত হলো এখান থেকে। গুরুদেব এভাবে গান্ধীজিকে বিশ্বভারতীর আজীবন ট্রাস্টি মনোনয়ন দেওয়ার উভয়ের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হয়েছিল।গান্ধীজী রবীন্দ্রনাথের এই চিঠির উত্তরে যে কথা লিখেছিলেন তার মধ্যে এমন ইঙ্গিত ছিল যে গান্ধীজিকে এই ট্রাস্টি মনোনয়নের ভিতরে প্রত্যক্ষ না হোক পরোক্ষে অর্থ সংগ্রহের যোগ আছে।মহাত্মা গান্ধীর একথা ঠিক অভিপ্রেত না থাকলেও গান্ধীজীর উত্তরের ভিতরে দিয়ে একথা কবিগুরু মনে মনে ক্ষুন্ন হয়েছিলেন। একটা সময় শান্তিনিকেতনের জন্য গুরুদেব সংগীত নৃত্য নাট্যাভিনয়ের দলবল নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন,তা দেখে গান্ধীজি একটি পথে কবি এই জাতি সম্পর্কে একটি "ইবমমরহম সরংরপড়হ" বলে অভিহিত করেছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর এমন ধারণা দেখে কবিগুরু মনে মনে প্রচন্ড ব্যথিত হয়েছিলেন।গুরুদেবের এইজাতীয় সফরের সাথে আর্থিক প্রয়োজন এর কোন সম্পর্ক ছিল না এ কথা যেমন সত্য নয়, তেমনি শান্তিনিকেতনের জন্য কেবল অর্থ ভিক্ষার অভিযান বলে অভিহিত করলে ও ঠিক হবে না। গুরুদেব নতুন নতুন সৃষ্টিতে বুঁদ হয়ে থাকতে ভালবাসতেন। সেই সৃষ্টির মধ্যে নিখুঁত সুরে নৃত্য অভিনয় রূপায়িত দেখতে দেখতে তিনি আনন্দ খুঁজে পেতেন। তাঁর কাছে অর্থের মূল্যের থেকে আনন্দের মূল্য কোন অংশে কম ছিলনা। যার ফলস্বরূপ বয়স কোনো বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি।বৃদ্ধ বয়সেও তাই দলবল নিয়ে দেশে-বিদেশে ঘুরতে তাঁর উৎসাহের খামতি ছিল না। এটাতে শুধুমাত্র গুরুদেবের ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, যে দৃশ্য দেখার জন্য বিশ্বের সুতা ও দর্শক দিনের-পর-দিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। আনন্দ পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মানুষের রুচি আচরণ জীবনের সাধারণ মূল্যবোধ উন্নত করে তোলাই গুরুদেবের মহৎ দায়িত্ব ছিল। এসবই ছিল গুরুদেবের দেশ ভক্তি র নমুনা।তিনি মনে করতেন এই সমস্ত অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে দেশবাসীর প্রতি তার মহৎ দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। তবে গান্ধীজীর সহজাত ধারণা ভিন্ন ছিল বলে তিনি হয়তো এই সমস্ত অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই মহাত্মা গান্ধীর ধারণা সম্বন্ধে গুরুদেব একটি চিঠি লেখেন (২৬/২/১৯৩৭)_"আমার দিক হতে অকপটে আপনাকে একটা কথা বলতে দিন।আমি যে কাজকে সানন্দে আমার নিজের বন্ধু বলে মনে করই সম্ভবত আপনার নিজের ধাত্রী সে ব্রতের মহিমা উপলব্ধি করতে আপনাকে বাধা দেয়। আমার এই যে ব্রত তাহা ভারতবর্ষের কেবলমাত্র কোন আর্থিক সমস্যা লইয়া ব্যস্ত নয়। ভারতবর্ষের কোন সাম্প্রদায়িক ধর্মমতের লইয়াও ব্যস্ত নয়। ইহা একটা ব্যাপক অর্থে মানব মনের সংস্কৃতিকেই ধারণ করে আছে।আমার মতে আমার একটি কবি সৃষ্টিকে আমি যখন বাহিরে পাঠাইয়া দিবার জন্য ভিতরে তাগিদ বোধ করি তখন আমি শুধু ভিক্ষা বা কোন উপকার আশা করি না।আমার এই কবি সৃষ্টিকে সাড়া দেওয়ার মতো যাদের মধ্যে একটি সংবেদনশীল হৃদয়ে আছে তাহাদের নিকট হইতে আমি আশা করি আমার সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রতি একটি সকৃতজ্ঞ শ্রদ্ধার্ঘ্য"।

এই সমস্ত অনুষ্ঠানে অসুস্থ শরীরেও গুরুদেব দেশ-বিদেশে কেন নিজে সশরীরে উপস্থিত থাকতেন তার কৈফিয়ৎ স্বরুপে মুক্ত চিঠিতে আরো লেখেন_"একটা কথা আমি স্বীকার করতেছি, আমি নিজে যে সকল শিল্পীদের শিক্ষা দিয়াছি সেই সকল শিল্পী যখন ছন্দ তালে সমন্বিত অঙ্গ সঞ্চালন এবং সুরময় কণ্ঠস্বরে আমার কোন সৌন্দর্যের স্বপ্নকে একটি নিখুঁত রূপ দান করিতে চাহে তখন তাদের পাশে সগর্বে বসে থাকা অপেক্ষা আর অন্য কোনো জিনিসই আমি বেশি ভালোবাসি না। আমি সগর্বে এই জন্য বসে থাকি যেন তাহাদিগকে বলিতে পারি চমৎকার হইয়াছে"।


 

কবিমন

  মিত্রা রায় চৌধুরী


কবির জন্ম মাসে রবির আলোয় কবির জয় গান গাই। অতি সাধারণ রবীন্দ্রপ্রেমী হয়ে রবীন্দ্রসাগরে ডুব দিতে চাই কিছু মুক্ত সংগ্রহকরবো বলে,যা নাড়াচাড়া করে বাকি জীবন আনন্দে কাটাতে পারব। এই অস্থির দোদুল্যমান সময়ে মানসিক শান্তির জন্য এই প্রচেষ্টা। যখন একান্তে বসে চিন্তার জগতে নিজেকে হারিয়ে ফেলি তখন একটা প্রশ্ন মন কে নাড়া দেয় কবি কি আধ্যাত্মিক গুরু। মানব মনের পট পরিবর্তনের তিনি হদিস পেতেন কি করে। সব বয়সের সব মানুষের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের  মনের খবর পেতেন কি করে?এ ও কি সম্ভব।সম্ভব বলেই তিনি রবি ঠাকুর। প্রেমের বিভিন্ন অভিব্যক্তিকে তিনি গানে, কবিতায় ব্যক্ত করেছেন। তার সৃষ্টিতে বিরহে আকুলতা যেমন আছে সেই আকুলতাকে সামাল দেবার পথ ও আছে। মানব জীবনে ঝড় ঝঞ্ঝার মুখোমুখি হতেই হবে। বিরহ, বিচ্ছেদ, মৃত্যু,বিষাদ কারণে-অকারণে দুঃখ ভোগ সবই সহ্য করতে হবে। কবি বলেছেন "আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহ দহন লাগে তবুও শান্তি তবুও আনন্দ তবুঅনন্ত জাগে" আমরা গীতায় পড়েছি কর্মে আমাদের অধিকার আছে কিন্তু কর্মফলে অধিকার নেই।গীতার বাণী কবিরও বাণী। সত্যকে সহজে মেনে নেওয়ার শিক্ষাও কবি আমাদের দিয়ে গেছেন, "সত্যেরে লহ সহজে "

                   
বুদ্ধদেব রামকৃষ্ণ যীশুখ্রীষ্ট সব মহাপুরুষদের বাণী এবং রবীন্দ্রনাথের অনেক কবিতাও গানের মর্মার্থ একই।মানবের চৈতন্য জাগ্রত করাই এদের প্রচেষ্টা। ব্রহ্মের উপর বিশ্বাস রেখে সত্যকে আশ্রয় করে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে বলেছেন কবি। নিজের মধ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্বের বিশ্বাস তাঁর আত্মবিশ্বাস, সহনশীলতা বৃদ্ধি করেছিল তাকে শৌর্য্য বীর্যে বলিয়ান করেছিল।সকলকে একলাই পথ চলতে হয় এবং হবে। তাই তিনি লিখেছেন "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে " ভয় হতে অভয় মাঝে আমাদের নতুন জন্ম নিতে হবে। অজানা ভয়ে আমরা  নিঃশঙ্ক পদক্ষেপ ফেলতে ভুলে গেছি।কবি আমাদের পথ দেখিয়ে বলেছেন "সদা থাকো আনন্দে সংসারে নির্ভয়ে, নির্মল প্রাণে, জাগো প্রাতে আনন্দে, করো কর্ম আনন্দে।" জীবনদেবতার নিকট থেকে দেহে বল ও প্রাণে শক্তি চেয়ে নিয়ে বলতে পেরেছেন "তোমার অসীমে প্রাণ মন ও লয়ে যত দূরে আমি ধাই কোথাও দুঃখ, কোথাও মৃত্যু কোথাও বিচ্ছেদ নাই...."
                     
কবি আমাদের সংসারে থেকে আনন্দ টুকু লুটে নেবার অনেক পথ দেখিয়েছেন তার নির্দেশিত পথকে বেছে নেইনা আমরা,নিজেদের জীবনে তাকে প্রয়োগও করি না। দুঃখ বিলাস আমাদের এক ধরনের বিলাসিতা। মনের দরজা খুলে দিতে হবে। নবজাগরণের জোয়ার আসুক দখিনা বাতাস প্রবেশ করুক সবার মনের খোলা দুয়ার দিয়ে। কবির ভাষায় বলি- 
 "ব্যর্থ প্রাণীর আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো একলা রাতের অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো।"
                               


 

জমিদারবাড়ির গোপন  কুঠরী 

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 


অবশেষে  আমরা  চার  বন্ধু  এসে  পৌছলাম নবগ্রাম জমিদারবাড়ির সিংহদুয়ারের সামনে। ট্রেন, বাস, ভ্যান রিক্সায় সারাটা দিন পার হয়ে গেল।  সন্ধ্যার  আগেই  আমরা পৌছে  গেলাম জমিদার  বাড়ির  পুরনো বৃদ্ধ  নায়েব   মশাই  ধরনীমোহন বাবুর অফিসে।  ধরনীমোহনবাবু  তাদের পুরনো গাইড, নিশিকান্ত কে আমাদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন পুরনো জমিদার বাড়ির তিনতলায়।

 বাপী,বাবুয়া,ক্ষীরোদ ছোটবেলা থেকে  একই স্কুলে   পড়তাম।  স্কুল   থেকে   ফেরবার  পথে আমরা  চারজনই   পড়তাম   ইংরেজি  মাস্টার মশাই   তারাপদ  ঘোষের  কাছে।  ইংরেজি ছাড়াও বাংলা সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতে ছিল তারাবাবুর অগাধ পান্ডিত্য।

মাথায় কাঁচা পাকা চুল,সারামুখে শ্বেতীর দাগ ছিল তারাবাবুর। পানের নেশা ছিল বলে তার ঠোঁট দুটো ছিল লাল। কথা বলার সময় জর্দার একটা  মিষ্টি  গন্ধ ঘরে  ছড়িয়ে পড়ত। পড়ানোর ফাঁকে  ফাঁকে  শোনাতেন  নানা  ধরনের  রহস্য রোমাঞ্চকর  কাহিনি।  তিনি   নিজেও  পড়তেন  নানারকম দেশী বিদেশি বই। 

 " তোরা  চলে  গেলে  পান  খাব, পান  খেয়ে পড়তে  বসব। "এই  ছিল  তাঁর   মুখের  কথা। রোজ তাঁর এই কথা   বারবার শুনতে শুনতে, আমরাও  তাঁকে  নকল করে  বলতাম,  " তুই   চলে  গেলেই  পান  খাব,  পান  খেয়ে পড়তে বসব।"

তিন তলার একটা অন্ধকার ঘরের মধ্যে নিয়ে আমাদের  নিয়ে  আসলেন   আমাদের  গাইড, নিশিকান্ত বাবু । গাইডের চোখ দুটো খুবই  চেনা কোনো  মানুষের মত লাগছিলো। কিন্তু কিছুতেই মনে আসছিল   না , যে  সে  ঠিক  কার    মতো দেখতে। আমরা চারজন একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করতে লাগলাম।  মানুষটা যে বেশ   রহস্যময়, এবিষয়ে কোন সন্দেহই রইল না।  আমরা  চারজন  তাকে  অনুসরণ করতে লাগলাম। সে আমাদের সব ঘর গুলো ঘুরিয়ে দেখাতে লাগলো।

হঠাৎই আমরা  লক্ষ করলাম নিশিকান্ত বাবু পান চিবোচ্ছেন।   অন্ধকারে  তার  চোখ  দুটো কেমন যেন  আলাদা  রকম  জ্বলজ্বল করছে। সব  ঘর গুলোই বেশ  পুরনো, এখানে  একমাত্র টুরিস্টরা এবং নানান  গবেষকরা এখানে ঘুরতে  আসেন, গবেষণার সুত্র সন্ধানে। সব ঘরেগুলোতেই  ঠিক  মিউজিয়ামের মতো  বহু   প্রাচীন   জিনিসপত্র  সাজানো। বাঘ, হরিণ, গন্ডারের মাথা সাজানো রয়েছে। আসবাবপত্রগুলোও একটু অন্য  একটু বিশেষ  ধরনের।  একটা ঘরের চার দেওয়ালে  পর পর চোদ্দ জন জমিদারের  (চোদ্দপুরুষের)  ছবি টাঙানো  রয়েছে । সব ঘরেই  চারিদিকে মাকড়সার জালের আঠা  আমাদের চোখে মুখে আটকে যাচ্ছে। ঘরময় একটা পুরনো ভ্যাপসা গন্ধ। কয়েকটা জোনাকি ইতস্তত ঘরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে। ছবি দেখে  বেশ  বোঝা গেল,   শেষ জমিদারই  ছিলেন সূবর্ণকান্তি মুখোপাধ্যায়। 

 নবগ্রাম জমিদার বাড়ির চুন সুরকি ওঠা বিশাল বাড়িটা নিয়ে কতই না  রহস্য, কত না কাহিনি।   এই জমিদার বাড়ির ঘিরে  নানা  রকম  কাহিনি, আজও  লোকমুখে শোনা যায়।   তারাবাবুর মুখে শোনা সেই সব রহস্যময় কাহিনির মুখোমুখি আমরা  আজ। তাই  রহস্য রোমাঞ্চের আর শেষ নেই। এর মাঝেই একটা হোতকা কালো বিড়াল আমাকে গুতো দিয়ে দৌড়ে চলে গেল। 

জমিদার বাড়িতে  সোনার চালের একটা বাক্স ছিল।  তার  মধ্যে সব  জমিদারদের নাম লেখা একটা সোনার পদ্মফুল ছিল।  হঠাৎই একদিন   সেই চালের বাক্স থেকে সোনার পদ্মটি উধাও হয়ে যায়।  এই ঘটনায় বহু মানুষকে চোর সন্দেহ করে হেনস্তা করা হয়। চুরি যাওয়া পদ্মফুল নিয়ে শুরু হয় নানারকম অশান্তি। 

 জমিদার সূবর্ণকান্তি  মুখোপাধ্যায় জমিদারির প্রায় সব ধন নিঃশেষ করে ফেলেছিলেন, সেই সোনার   পদ্মফুলের  চোরকে   খুঁজতে। অবশেষে অনেক    সিপাহি,   পেয়াদা, গোয়েন্দা লাগিয়ে   সেই সোনার  পদ্মফুলসহ  বাক্স উদ্ধার করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই কাজে তাঁর  ধনবল, লোকবল,  যৌবন সব শেষ হয়ে গিয়েছিল। 

তারাবাবুর  কথায়,  জেনেছিলাম  "ওই সেকেলে  মেজতরফের   দোতালায়  একটা  ঘরেই   ছিল গোপন  একটা   কুঠরী।  সেই কুঠরী  ঘর থেকে ধড়  এবং মুন্ডু আলাদা করে ফেলে দেওয়া হতো অপরাধীদের। খুব অহংকারী ছিলেন এই শেষ জমিদার।  তাঁর  পর   পরই  নাকি  জমিদারী প্রথার বিলুপ্তি  ঘটে। 

শোনা যায় দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জমিদার সূবর্ণকান্তি  ছিলেন অহংকারী ও দাম্ভিক প্রকৃতির মানুষ ।  এই জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে কোন প্রজা ছাতি মাথায় চলাচল করতে পারতেন  না। জমিদারীর খাজনা বাকী পড়লে কোন অন্যায় করলে,  লঘু পাপে গুরু দন্ড দেওয়া হত।  প্রজাদের কঠিন শাস্তি দেওয়া হতো।  তাই  জমিদারকে খুশি করবার জন্য সব  প্রজারা তাদের জমির ফলানো ফসল, শাক- সবজি,  পুকুরের মাছ, কচি পাঁঠা জমিদার মশাইয়ের  জন্য সদর সিংহদুয়ারের পাশে রেখে দিয়ে  যেত। 

তিনতলার একটা ঘরে অপরাধীদের বন্দী করে রাখা হত।  রাতেরবেলা  সবার অজান্তে, দু'জন   জল্লাদ  অপরাধীদের হত্যা করে, ফেলে দিত গোপন কুঠরীতে। সেই মৃতদেহ গিয়ে পড়তো সরাসরি যমুনা নদীর জলে। জোয়ার ভাটার টানে সেই সব মৃতদেহ চলে যেত বাংলাদেশের বিভিন্ন  নদীতে। 

সব  ঘরগুলো ঘুরে অবশেষে আমরা এলাম সেই অন্ধকার কালো কুঠুরিতে। সেখানে পা রাখতেই আমাদের এক অজানা আশংকায় রক্ত হীম হয়ে এল। দূরে কতগুলো শিয়ালের ডাক শোনা গেল। 

হঠাৎ  ভাঙা  জানালার  কপাট  দিয়ে  আবছা চাঁদের  আলোয়  আমরা  যা দেখলাম,  তাতে আমাদের   চারজনেরই  আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার জোগাড় হল।  আমরা লক্ষ্য করলাম, গাইডের মুখে শ্বেতীর দাগ এবং   পান খাওয়া লাল ঠোঁট।  ঠিক যেন আমাদের ইংরেজি মাষ্টার মশাই তারাবাবু বসানো । আমাদের সাথে কথা বলতে বলতে  ধীরে ধীরে অন্ধকার  নিকষকালো কুঠুরির সিঁড়ি ধরে নেমে গেলেন, এবং অদৃশ্য হয়ে গেলেন। মুহূর্তের মধ্যে আমরা  কুয়োর জলে একটা ভারী বস্তা পড়বার মতো  শব্দ শুনতে   পেলাম।  আমরা পাড়ি কি মরি  চারজন, জীবন মরণ পন করে দৌড়ে ঘোরানো  সিঁড়ি দিয়ে চলে এলাম জমিদার বাড়ির সিংহদুয়ারে। নায়েব মশাই এর অফিসে তখন তালা ঝুলছে। 

পরদিন সকালে আমরা চার বন্ধু মিলে চললাম গড় পাড়ায়,   ইংরেজি মাস্টার মশাই তারা বাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে।  সেখানে গিয়ে মাস্টারমশাই  এর  খোঁজ করতেই  পাশের বাড়ির এক মহিলা  নিচুস্বরে   বললেন,  " তারা মাস্টার কাল রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে মারা গেছেন।


 

আলোর বেণু

পর্ণা চক্রবর্তী 


গড়ের মাঠে একটা লোক বাঁশি বাজাচ্ছিল।  ছুটির দিনে  নরম রোদ মেখে  রঙিন ভীড় জমেছে। একটা সিড়িংগে পানা লোক  ছোটো একটা ছেলের হাত ধরে লোকটার সামনে এসে দাঁড়ালো, 

"বাঁশি আছে , ভালো  বাঁশি এই খোকার জন্য?"

লোকটা  বাজানো থামিয়ে' দুজনকে ভালো করে দেখল,   

"ভালো বাঁশি মানে ? বাঁশির আবার ভালোমন্দ কি ?  বাঁশির কোনো ভালো মন্দ হয় না। যে বাজায় তার   ভালো মন্দ  হয়।  সেই মতো তার বাজনা ভালো খারাপ হয় ।"

লোকটা  তাল কেটে যাওয়াতে গম্ভীর।

"আহা খুঁত বাঁশি হলে সুর উঠবে কি করে?"

লোকটা সিড়িংগেকে ভালো করে দেখল। বিকেলের সাথে সন্ধ্যার দেখা হচ্ছে তখন। সন্ধিক্ষণের মায়াবী আলোয়  লোকটার মুখটা বড্ড নিষ্পাপ লাগে।   বড়ো বড়ো   কটা  চোখে   ফিকে নীল আকাশের ছায়া।  

লোকটা   হাসল, বলল, " খুঁত  বাঁশিও  বাজে। বাজাতে জানতে হয়।  তারপর এক সময় সুরের মধ্যে ডুবে গেলে ওর খুঁত  কেটে যায়। সিরিংগে  হ্যাঁ করে রইল।  খোকাও হাঁ করে শুনল। "তাছাড়া আমি বাঁশি বেচি না, বাজাই। শুনবে ?" 

"আচ্ছা বেশ।"  

সবুজ ঘাসে পা ছড়িয়ে বসে লোকটা। আরো কতগুলো লোক জুটে গেল। লোকটা বাঁশিতে ফুঁ দিল। একটা সুর  ফোয়ারা মতো ওপরে উঠে ছোটো  ছোটো ফুলকির মতো ঝরে পড়ল চারপাশে ।তার সাথে কতগুলো ফুল পাতা ঝরে পড়ল। চারটে  কিশোরী একটু আগে  নিজেদের মধ্যে ফিসফিস গুজগুজ করছিল আর চাপা হাসছিল। একজন বলছিল ," চোখদুটো দেখেছিস, বুকের ভেতরটা কেমন  ধড়াস  ধড়াস করল।" আরেকজন  বলল ,"আহা কৃষ্ণঠাকুর ! তুই হলি রাধা।"  হাসিটা একটু জোরে বাজছিল। তারা এখন সব হাসি ফেলে নিস্পন্দ হয়ে বাঁশি শুনছে। দুটো পকেটমার  দূরে দাঁড়িয়ে  লোকটাকে মন দিয়ে মাপছিল।  একজন বলল, "কেমন থাকতে পারে বলতো? "

অন্যজন উদাস হয়েছিল, বলল," কি জানি। জেনেই বা কি হবে চল ভীড় বাস খুঁজি।"  আগেরজন বলল  "দাঁড়া না  একটু শুনি।" এমন  অনেক লোক নানা রকমের চিন্তা আর মন নিয়ে জড়ো হয়ে  বাঁশি শুনতে লাগল।

 

সন্ধ্যা আরো ঘন হলো।বাঁশি শুনতে শুনতে  লোকটার সামনে একজন  ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল তারপর আরেক জন,তারপর  আরো একজন। লোকগুলো কেউ কথা বলছিল না। দিনের আলো নিভে যাওয়ার  সঙ্গে ওদের সব কথাগুলোও যেন নিভে গেল।  একটা  লম্বা ,সৌখিন চেহারার লোক  ফোনে  কাকে  খুব  গালাগালি করছিল।   বাঁশির সুরটা  ওর মাথার ভেতর    আলতো  করে ঢুকে  রাগটাকে এক লহমায় শুষে নিল যেন, এমন মনে হলো ওই লম্বা রাগী লোকটার।

আকাশে তখন  একটা দুটো করে তারা ফুটতে লেগেছে। আবছা আলো মেখে অনেকগুলো লোক বসে রইল ঘাসের ওপর নিঃশব্দে। ওরা  প্রত্যেকে ওদের মনের ভেতরের  নানান চিন্তা , ভাবনা, দুঃখ ভয়গুলোকে হাতড়ে  দেখছিল সব  ঠিকঠাক আছে কিনা।  কিন্তু  কেউ কিচ্ছু খুঁজে পাচ্ছিল না । ভেতরটা  কেমন খালি খালি লাগছিল লোক গুলোর।  অসুবিধা হচ্ছিল, এতদিন ধরে  রাগ, বিদ্বেষ দুঃখ, ভয়গুলোর সাথে থাকতে থাকতে একটা অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। একটা আনন্দ  ওদের  বুকের ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছিল  কিন্তু সেটা এত নতুন যে ওরা  বুঝতে পারছিল না এমন হলে কতটা আনন্দ হয়।  লোকটা শান্ত হয়ে খানিক  বসে রইল তারপর ওর ঝোলায় বাঁশিটা পুরে একবার পিছনে ফিরে কাদেরকে ডাকল  আর  সোজা হাঁটা লাগালো রেড রোডের দিকে।একটা দমকা হাওয়া  কতগুলো  শুকনো পাতা নিয়ে পাক খেতে খেতে লোকটার পিছন পিছন ছুটল ।


একটু দূরে থেকে বসন্ত প্রথম থেকে  পুরো ঘটনাটা মন দিয়ে লক্ষ করছিল।লোকগুলো হতভম্ব ভাবটাও দেখল।  নিজেকেও দেখল বসন্ত। একটু আগে কয়েকটা লোভ ওকে খুব জ্বালাচ্ছিল। কিন্তু লোকটার বাঁশির সুর ওকে কেমন আচ্ছন্ন করে তোলার পর  বসন্ত লোভগুলোকে অনেক খুঁজল  তারপর দেখল সেগুলো নেতিয়ে পড়ে আছে মনের এক কোণে।  বসন্ত হেঁটে  ভিক্টোরিয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কতগুলো লোক সেখানে  বাঁশিওয়ালাকে নিয়ে আলোচনা করছিল।আধবুড়ো একটা লোক বলছিল, " লোকটাকে আজকাল  মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে। বেশি কথা বলেনা, খালি বাঁশি বাজায়। তবে ওর বাঁশি শুনলে কি  একটা হয়। সব কেমন বদলে যায়।"  বসন্ত  হাঁটতে হাঁটতে  জাদুঘরের দিকে গেল।  চারপাশটা ঘুরল কিন্তু লোকটাকে খুঁজে পেলনা। বসন্ত খুব অস্থির হয়ে উঠল। লোকটাকে ওর  খুঁজে পেতেই হবে, খুব দরকার । 


পরের সাতটা দিন বসন্ত গড়ের মাঠ আর তার চারপাশ চক্কর কাটল কিন্তু লোকটাকে দেখতেই পেল না। এদিকে বসন্তের শিরে সংক্রান্তি। ওর বন্ধু রাজার দূর সম্পর্কের  মামা পট  করে মরে গেল বিপুল সম্পত্তি রেখে।  সব কিছু রাজারই পাওয়ার কথা।  কিন্তু বুড়ো  উইল করে যায়নি । ব্যাংকে কোটি টাকা।  মরার খবর  কেউ জানে না। কে আর আছে যে জানবে।  বিদেশে ছিল বুড়ো। হঠাৎ করে মরে গেল ।তাই ওখানেই কোনো রকমে সৎকার করে রাজাকে খবর দিয়েছে বুড়োর চেনা এক জন। মন্দিরে পুজো দিয়ে কাজ সেরেছে রাজা। লোক জানার ভয়ে শ্রাদ্ধও করেনি।  বসন্ত সই নকল করতে ওস্তাদ। এ যাবৎ  লাখ পঞ্চাশ মতো টাকা তোলা হয়েছে। বসন্ত ভাগও পেয়েছে। কিন্তু এখনও আরো অনেক টাকা বাকি।   রাজা ছিনেজোঁকের মতো ওর পেছনে  লেগে আছে। কিন্তু বসন্তের লোভটা কেমন ফিকে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। লোকটাকে বসন্ত দরকার।   হয় বহুত ঘোড়েল  মাল,নিশ্চয় কিছু ধান্দা আছে।  না হলে কোনো তান্ত্রিক হবে। লোকটার সাথে কথা বলতেই হবে। বসন্ত ছটফট করতে থাকে ।


প্রায় দশদিন বাদ তেলেপুকুর বস্তির কাছে  এক ঝলক দেখতে পেল লোকটাকে বসন্ত। একটু আগে দুটো বিরোধী দলের মধ্যে  ভয়ঙ্কর  মারামারি হয়েছে,বেশ কিছু লোক আহত। লোকটা  একটু দূরে একটা  মন্দিরের চাতালে বসে খুব আস্তে বাঁশি বাজাচ্ছিল আর বেশ কিছু লোক জড়ো হয়ে শুনছিল। চারপাশটা এত শান্ত হয়েছিল যে বোঝাই যাচ্ছিল না একটু আগে অমন মারামারি হয়েছে। বিরোধী দল দুটোর নেতারা খুব নরম সুরে কথা বলছিল টিভিতে। দুটো দলই  নিজেদের দোষের কথা স্বীকার করল। চারপাশে হইচই পড়ে গেল। জনগণ বলতে লাগল ," এ নিশ্চয় কোনো নতুন নাটক ।দুটি দলের ভেতর নিশ্চয়  কোনো সমঝোতা হয়েছে।" 


 তারপর থেকে শহরের নানান জায়গায় লোকটাকে দেখা  যেতে লাগল।  ভোট  নিয়ে কোনো কলেজে দুই দলের  সংঘর্ষ হচ্ছে,  কোনো  কারণে  পুলিশের সাথে কোনো  প্রতিবাদী গোষ্ঠীর  খন্ড যুদ্ধ হচ্ছে, যেখানেই হিংসা  হচ্ছে, অন্যায় কিছু ঘটছে লোকটাকে ঠিক  দেখা যাবে। তবে সবাই দেখতে পায়না। যারা পায়না তারা বাঁশির আওয়াজ শুনতে পায়।  কাগজে  টিভিতে  লোকটাকে  নিয়ে  নানা  আলোচনা শুরু হলো।  পাড়ায় রকে, ঘরে ঘরে  সেই একই গল্প চলতে লাগল।


শহর আগের থেকে অনেক শান্ত।  মারামারি খুনোখুনি  কমছে । সব থেকে বড় কথা শহরটার রাগ কমছে , ঘৃণা কমছে, কমছে লোভ। বসন্ত পাগলের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছে লোকটাকে। আর বসন্তকে খুঁজছে রাজার দলবল। রাজার কথা না শুনলে হয়তো ওকে মেরেই দেবে ওরা। কিন্তু কিছুতেই মিলছে না লোকটা। যেদিন বসন্ত দক্ষিণে খোঁজে সেদিন খবর আসে  লোকটা পশ্চিমে ছিল। আবার উত্তরে লোকটাকে দেখা গেলে বসন্ত সেদিন  হয়তো  মধ্য কলকাতায় হন্যে হয়ে ঘুরছিল। লোকটা কখন কোথায় …কেউ জানে না।

বসন্ত পালিয়ে বেড়াচ্ছে।  কিছুদিন আগে রাজার লোক ওকে ধরেছিল।  বসন্ত খুব  চেয়েছিল লোকগুলো ওকে মারুক , তবে হয়তো লোকটা আসবে। কিন্তু ওরা মারল না  দুদিন সময়  দিয়ে শাসিয়ে গেছে। দুদিন পেরিয়ে গেছে, বসন্ত  ঠিক করল  শহর ছেড়ে পালাবে। সেইমতো খুব ভোরে উঠে বেরিয়ে পড়ল  ও বাড়ি থেকে।  মোড়ের মাথায় এসে থমকে দাঁড়ালো বসন্ত । রাস্তার ধারে  বন্ধ চায়ের  দোকানের সামনের  বেঞ্চে বসে আছে  সেই  লোকটা। কতগুলো কুকুরকে বিস্কুট  খাওয়াচ্ছে।

গত সপ্তাহে ,সরকারি কর্মচারীদের  মাইনে বাড়ানো, ডি এ বৃদ্ধি আর যোগ্য লোকজনদের চাকরির জন্য আন্দোলনকারীদের সাথে পুলিশের তুমুল মারামারি হয়েছে। পুলিশ নির্মম ভাবে  নিরস্ত্রদের ওপর লাঠি চালিয়েছে।  সেদিন লোকটাকে কেউ দেখতে পায় নি তবে এই প্রথম অনেকক্ষণ  ওর  বাঁশির আওয়াজ শোনা গেছে।  সরকারের পক্ষ থেকে   আন্দোলন কারীদের সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে। আর কিছু দোষী পুলিশ অফিসারদের সাসপেন্ড করা হয়েছে। কারণ ওরা নিজেরাই নাকি  নিজেদের দোষ স্বীকার করে নিয়েছে।  খবরটা শোনার পর থেকে বসন্ত আরো অস্থির হয়ে পড়েছিল । কারণ  এরপর বেশি দেরি  করলে  রাজার দলবল আর কথা বলার সময় দেবে না কখন যে নিঃশব্দে খুন করে দেবে বসন্তও টের পাবেনা।

 

 লোকটা বসন্তকে  ডাকল ,"এসো তোমার জন্য বসে আছি"

" কেন বলতো?"

"আমাকে খুঁজছিলে তো"

" তুমি কি করে জানলে আর আমি যে এখানে থাকি তাই বা কি করে জানলে?"

 লোকটা হাসল,  ওর হাসির ছোঁয়া লেগে  ভোরটা  ঝলমল করে  উঠল।  

 "আমার  সাথে এসো "

লোকটা  হাঁটতে লাগল  গঙ্গার ঘাট ধরে। শীতের ভোরে, নির্জন  রাস্তায়  বসন্ত  কেমন বোধশূন্য হয়ে লোকটার পেছন পেছন চলতে লাগল। কুয়াশায় লোকটার দীর্ঘদেহ  ক্রমশ আবছা হয়ে এলে বসন্ত আরো জোরে  হাঁটতে থাকল। হঠাৎ করে ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে  কতগুলো পায়ের আওয়াজ  জেগে উঠল। বসন্ত  পেছন ফিরে দেখেই ছুটতে  থাকল পাগলের মতো । চিৎকার করল " কোথায় গেলে  তুমি?  দেখতে পাচ্ছিনা যে, শুনছো?" ওর 

 মাথায় কে যেন জোর আঘাত করল।

 অর্ধচেতন  বসন্ত গভীর এক   ব্যথার মধ্যে ডুবে  যেতে যেতে  পুরো চেতনা হারিয়ে ফেলল ।

 

 আকাশে মেঘ জমেছে  । গঙ্গার  ধারে বসে আছে  বসন্ত। মাথাটা ভার।  কপালের কাছে জমে আছে রক্ত।লোকগুলো একটু আগে  শিশুর মতো কাঁদছিল। ওরা সব পাক্কা অপরাধী, ক্ষমা চেয়ে ফিরে গেছে। লোকটা গঙ্গার দিকে আনমনে তাকিয়ে ছিল ।  

বসন্ত বলল," তোমার জন্য  বেঁচে গেলাম।  না হলে….  ।" লোকটা একটু হাসল।

বলল ,"চলি।"  

"কোথায় যাবে ?  আর আসবে না?"

 "আমার কাজ আপাতত শেষ।  দরকার পড়লে আসতে হবে বৈকি।"   

উঠে দাঁড়ালো লোকটা  তারপর কাদেরকে হাত নেড়ে বলল," আমার পেছনে এসো।"

বসন্ত বলল," কেউ নেই তো ।কাদের কে ডাকছ ?" লোকটা বলল," ওই যে ওদেরকে। লোভ,ভয়, ঘৃণা,হিংসা।

তোমার ঐ কালো কালো ভয় আর  আধমরা লোভও আছে ওদের সাথে।"

"আসি এবার।"

বসন্তের  খুব একটা কষ্ট হলো ।

মরিয়া হয়ে বলে উঠল 

"তুমি কে বলত ? কেন এসেছ এখানে? কি কাজ তোমার?"

"তুমি কে বসন্ত? " 

লোকটা ওর  ঝকঝকে চোখদুটো  বসন্তের  চোখের ওপর রেখে দিল।

"তুমি কেন  এসেছ এই পৃথিবীতে , কি কাজ  তোমার , কখনো ভেবেছ?”

বসন্ত থতমত খেয়ে ভাবতে লাগল, এ আবার কি প্রশ্ন। কেন এসেছে সেসব ও কি করে জানবে ।

লোকটা বলল , “কি হলো? তুমি জানো কেন এসেছ?”

বসন্ত মাথা নাড়ল।

লোকটা বসন্তের সামনে দাঁড়িয়ে ওর ক্লান্ত হতাশ মুখটাকে নরম কোমল চোখে দেখল।

“যেদিন নিজেকে জানবে , কেন এসেছ, কি তোমার কাজ সব যখন বুঝতে পারবে সেদিন আমাকেও জানতে পারবে বসন্ত। "

 লোকটা ঝোলা থেকে বাঁশিটা বের করে বলল "এবার সত্যি আমাকে যেতে হবে, সময় কমে আসছে। " তারপর অদ্ভুত সুন্দর করে হাসল।

ওর হাসির থেকে  অজস্র রঙিন প্রজাপতির জন্ম হলো ,রামধনু ঝলসে উঠল । কত রকমারি রঙের সুর  ঝরে পড়তে লাগল  অজস্র ধারায়। বসন্ত নতজানু হয়ে বসে কাঁদতে  লাগল আকুল হয়ে।


আবার সেই আশ্চর্য্য বাঁশিটা বেজে উঠল । সমগ্র  চরাচর  ভেসে গেল সুরের বন্যায়। আচমকা  বাতাসে ঘূর্ণি উঠল , রাস্তার  সমস্ত আবর্জনা নিয়ে  সে ঘূর্ণি ছুটে  চলল বাঁশিওয়ালার  পেছনে। বসন্তের সামনের রাস্তাটা নরম মেঘলা রোদ মেখে আছে।  সেই রাস্তা ধরে আবছা হয়ে আসাএকটা চেহারার পেছনে ছুটতে ছুটতে  বসন্ত  বলে উঠল,

" কোথায় খুঁজব তোমাকে ?

 তুমি কোথায় থাকো ?"

 বাতাসে ভেসে  আসা ফিকে  বাঁশির সুর বলে উঠল " তোমার বুকের ভেতর।"