অভিশাপ
মৈত্রেয়ী নন্দী
"এর ফল তুক্যে ভুগ্যতে হবেক। মারাংবুরু কাউখ্যে ছাইড়ব্যেক লাই রে! কাউখ্যে না!” মাথা নেড়ে বিড়বিড় করে বকতে বকতে সিধো বুড়ার পাকানো কালো শরীরটা অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর সেঁধিয়ে যায়।
অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকি আমি।
শালগোড়াতে তেজস্ক্রিয় মৌলের খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। ফ্যাক্টরি বসানোর জন্য অনেকটা জমি চাই।
গাঁওবুড়া সিধো হাঁসদার সঙ্গে নরমে-গরমে অনেক আলোচনা করেও তাকে টলানো যায়নি। তার এক কথা, সাঁওতালরা আজন্মকাল এই জঙ্গলে মারাংবুরুর পূজা করে। ফ্যাক্টরি হলে মারাংবুরুর অভিশাপ লাগবে।
আদিবাসীদের অন্ধ বিশ্বাস! শেষপর্যন্ত জোর খাটাতেই হল। কোর্টের অর্ডার এনে পুলিশের সাহায্যে জঙ্গল কেটে জায়গাটা ঘিরে পাঁচিল তুলে দিলাম।
সিধো বুড়া সহ শ’খানেক সাঁওতাল নর নারী পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে সবটা দেখল।
ফেরার পথে আদিবাসী ড্রাইভার সেঙ্গেল বলল, “স্যার এই ক’টাদিন একটু সাবধানে থাকবেন।”
“কেন?”
"আমাদের বিশ্বাস এই পৃথিবীর প্রতিটা অনু পরমাণু জীবন্ত। গাছ, পাথর, জল, পাহাড়, মাটি সবার অনুভূতি আছে। প্রকৃতিই আমাদের বোঙ্গা।”
এসবের সাথে আমার সাবধানে থাকার কী সম্পর্ক? কথা বাড়ালাম না। গেস্ট হাউসে পৌঁছে গেছি ততক্ষণে।
রাত গভীর। বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছি। হঠাৎ মেঝে থেকে উঠে এল খসখস আওয়াজটা। কান পাতলাম। মেঝেতে টর্চের আলো ফেলেই এক লাফে উঠে বসলাম। ঘরের ভেতর এত সবুজ ঘাস, ছোট ছোট ঝোপ? পাগল হলাম নাকি? নাহ্, ঠিকই দেখছি! আতঙ্কে দম বন্ধ হয়ে আসছে! চোখের সামনে গাছগুলো লকলকিয়ে বড় হচ্ছে। অন্ধকারেই টের পেলাম ঘর ভরে যাচ্ছে। তিলধারণের জায়গা থাকছে না। জানালাগুলো সব বন্ধ। উঃ! একটু বাতাস! হিস্ হিস্ শব্দে শাখা-প্রশাখা বাড়িয়ে ওরা এগিয়ে আসছে। জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
দুদিন পর কলকাতার সব দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতার খবর, শালগোড়াতে মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারের রহস্যমৃত্যু। ময়না তদন্তে জানা গেছে কার্বন মনোক্সাইড পয়জনিং। কারণ জানা যায়নি। তদন্ত চলছে।

No comments:
Post a Comment