Tuesday, March 3, 2026


 

খাঁচাবন্দি বসন্তের কিস্তি

 উৎস চক্রবর্তী

​সকাল থেকেই ল্যাপটপের নীল আলোয় বসন্তের বিজ্ঞাপনগুলো পপ-আপ হয়ে ভেসে উঠছে। ‘স্প্রিং সেল’, ‘নিউ কালেকশন’—বিশ্বায়নের এই যুগে ঋতু এখন ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে নেমে এসে কর্পোরেট মেইলের ইনবক্সে ভিড় জমায়। জানলার ওপাশে আকাশটা ধোঁয়াটে ধূসর। বহুতল আবাসনগুলোর ভিড়ে সূর্যোদয় দেখা এক বিলাসিতা, আর কোকিলের ডাক তো এখন কেবল কলটোন বা নোটিফিকেশন সাউন্ডে সীমাবদ্ধ।

​নীলিমা বারান্দায় রাখা আধমরা মানিপ্ল্যান্টটার গায়ে একটু জল ছিটিয়ে দিল। এই কংক্রিটের জঙ্গলে এটাই ওর একচিলতে অরণ্য। বাইরে রাস্তার মোড়ে ফ্লাইওভারের কাজ চলছে, যেখানে ধুলোর আস্তরণে ঢাকা পড়েছে রাস্তার ধারের শেষ পলাশ গাছটা। আধুনিক সমাজ-ব্যবস্থার যাতাকলে মানুষের আবেগগুলো এখন বড্ড হিসেবি। প্রেম মানে ডেটিং অ্যাপের সোয়াইপ, আর আড্ডা মানে হোয়াটসঅ্যাপের টেক্সট।

​হঠাৎ এক ঝলক তপ্ত হাওয়া নীলিমার অবিন্যস্ত চুলে বিলি কেটে গেল। সেই হাওয়ায় কোনো বুনো ঘ্রাণ নেই, আছে পোড়া মবিল আর এসির গরম নিঃশ্বাস। তবু কেন জানি মনটা হু হু করে উঠল। পদাতিক কবির সেই 'ফুল ফুটুক না ফুটুক'- এর উপলব্ধির মতো ওর মনে হলো, বসন্ত আসলে বাইরে নয়, থাকে মানুষের ভেতরে। ধুলোমাখা এই শহরে একমুঠো আকাশ দেখার নামই হয়তো এখনকার বসন্ত।

​অনলাইন অর্ডারের পার্সেলটা হাতে নিতে নিতে নীলিমা ভাবল, পৃথিবী হয়তো অনেক বদলে গেছে, কিন্তু ওই ছেঁড়া জামা পরা কিশোরটা যখন রাস্তার ধারের ডাস্টবিন থেকে একটা ঝরঝরে হলুদ ফুল কুড়িয়ে পরম যত্নে নিজের কানে গোঁজে, তখন বোঝা যায়—কংক্রিটের হাহাকার ছাপিয়ে বসন্ত আজও মানুষের জিজীবিষায় বেঁচে আছে।

No comments:

Post a Comment