স্মার্টফোন
পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
ডাকবাক্সের তলায় এভাবে সুবলবাবুকে দেখব কখনো ভাবিনি। মাথায় উস্কোখুস্কো চুল, প্রায় পাগল পাগল অবস্থা। কিছু জিজ্ঞেস করলে কোনো কথার উত্তর দিচ্ছেন না। সুবলবাবু মানে সুবল বিশ্বাস, এই গ্রামের অলিখিত পোস্টমাস্টার।
গোবরডাঙার বাবুপাড়ায়, বনেদি সম্ভ্রান্ত মানুষের বাস। পৌরসভার এলাকাভুক্ত হলেও আধা গ্রাম, আধা শহর। সেখানে খেলার মাঠ, সিনেমা হল সুইমিং পুল যেমন আছে, তেমনই আছে শাক সবজির চাষ, আমবাগান, পুকুর সহ ধান,গম, সরষের ক্ষেত।
বাবুপাড়ার মোড়ের রঙ চটা বাড়িটা বাইরে থেকে দেখলে, নিতান্তই একটা পোড়োবাড়ি বলেই মনে হবে। অনেক আগে এই বাড়িটিই ছিল গ্রামের ডাকঘর। বাড়ির মালিক শম্ভু চ্যাটার্জি ছিলেন পোস্ট মাষ্টার। এখন সে বাড়িতে আর পোস্ট অফিস নেই, বেঁচে নেই পোস্টমাষ্টার চাটুজ্জ্যে মশাই। খুব রাগী এবং অহংকারী মানুষ ছিলেন এই চাটুজ্জ্যে মশাই। কাউকেই ঘুনাক্ষরে বিশ্বাস করতেন না। কারো কোন বিপদে আপদে তিনি এগিয়ে তো আসতেনই না। বরং কেন সে বিপদে পড়ল সেই কথা নিয়ে তুমুল কান্ড বাঁধিয়ে দিতেন। শোনা যায় একবার এক বালক তাঁর জামগাছে জাম পাড়তে উঠেছিল। সেটা চাটুজ্জ্যে মশাই এর চোখে পড়ায় বলেছিলেন, " তোমার ছেলে মরে মরুক, আমার জামের ডাল যেন না ভাঙে।"
সেসব দিন আজ অতীত, কিন্তু সেই লাল রঙের রঙচটা ডাকবাক্সটা আজও রয়ে গিয়েছে। আর
সুবলবাবুই এখন ডাকপিয়ন। তিনিই এখন পোস্টমাস্টারের কাজটাও চালিয়ে নেন। চিঠি পত্র, টাকা পয়সা জমা তোলার মতো অতি বিশ্বাসের কাজটা, সুবল বাবু খুব সুনিপুণ ভাবে করেন। সেই জন্য তার সুনামও আছে। কিন্তু কি এমন ঘটলো, যে সদাহাস্যজ্বল মানুষটি পাল্টে গেল নিমেষেই। একটা এঁদো পুকুরের পাড়ে ভর সন্ধ্যায় সেই ডাকবাক্সের নিচে টর্চ লাইট হাতে কি একটা খুঁজে চলেছেন।
চাটুজ্জ্যে মশাই এর পর তিনিই এখন সর্বের সর্বা। জগতে কাউকেই তিনি বিশ্বাস করতেন না। সবাই বলে, সুবলবাবু চাটুজ্জ্যে মশাই এর ওই একটা গুণ পেয়েছেন। পাড়ার যুবকরা তার অনুপস্থিতিতে তাঁকে সুবল অবিশ্বাস বলে ডাকত।
সেবার জামাই ষষ্ঠীতে সুবলবাবু শ্বশুরবাড়ি থেকে একটা স্মার্টফোন উপহার পেয়েছিলেন। সারা দিন খুট খুট করে সেই ফোনের সব টুকিটাকি আয়ত্ত করে ফেলেছিলেন। অফিসের সব কাজকর্ম, ব্যাক্তিগত সব কিছু মোবাইলে রেকর্ড করে রাখতেন। চিঠি দেওয়া, টাকা দেওয়া সব ছবি তুলে রাখতেন। তার মোবাইলে ছিল শত শত কল রেকর্ড, কখন কার সাথে কথা বলেছেন, সব।
"আমার কাছে সব রেকর্ড আছে " এই লাইনটা সারাদিন তিনি বলতেন। এই কথাটা শুনতে শুনতে সকলের কান খারাপ হয়ে গিয়েছিল। একটা খারাপ রেকর্ড প্লেয়ারের মত সেই কথা সারাক্ষণ বেজে চলত।
দূরে একজন মহিলা ঘোমটা মাথায় দাড়িয়ে সুবল বাবুকে একদৃষ্টে দেখে চলেছে। কাছে গিয়ে জানলাম, উনি সুবল বাবুর স্ত্রী।
"...সুবলদা'র কি হয়েছে, বৌদি ?" কি খুঁজছেন,জানতে চাইলাম।
..."আর বলবেন না, আপনার দাদার প্রিয় মোবাইলটা... "
..."মোবাইল ওখানে গেল কিভাবে? "
..."আসলে মোবাইলটা স্টোরেজ ফুল হয়ে, বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অনেক চেষ্টা করেও যখন মোবাইল অন করতে পারেন নি, তখন রাগ করে সেটা টান মেরে ফেলে দেয়, ওই ডাকবাক্সের নিচে। "

No comments:
Post a Comment