গোপন ছিল যা...
শ্যামলী সেনগুপ্ত
' আসছি' বলে সেই যে গেল, আর ফেরেনি। বলার মধ্যে কোনও ভান ছিল না। ভণিতা বলেও মনে হয়নি চুয়ার। সে তো জানতোই না 'আসছি' বলে কেউ কেউ আর ফেরে না। ঠাম্মি বলতো, 'যাচ্ছি, গেলাম, চললাম-এসব বলতে নেই। যাওয়ার সময় আসি বা আসছি বলতে হয়।'
অনিকেতের ব্যবহারেও চলে যাওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায়নি। ছোটবেলা থেকেই একসঙ্গে বড়ো হয়েছে তারা। একই স্কুল। কলেজ অবশ্য আলাদা। একজন হিউম্যানিটিজ। অন্যজন ইঞ্জিনিয়ারিং। অনিকেতের মা, বাবা নেই। ওর দাদু চুয়ার বাবার দপ্তরী।
স্যারের কাছে সঁপে দিয়েছিল অনিকেতকে। শুধু স্যার কেন, অনিকেতকে পেয়ে সকলেই খুব খুশি হয়েছিল।
চুয়ার তো অনেক সময় মনে হতো, তার চেয়ে মা-বাবা অনিকেতকে বেশি ভালোবাসে। অনিকেতের সঙ্গে বাবার একটা মিষ্টি সম্পর্ক ছিল। ভরসা করতো বাবা ওকে। ভরসা কি চুয়াও করতো না! ওরা ভাইবোনের চেয়ে বন্ধু হয়ে উঠেছিল বেশি। সব কথা, সব গোপন কথা, এমনকি
শরীরের বদলের কথাও ওদের কথোপকথনের বিষয় ছিল। 'অ্যাই অনি, আমার বগলে চুল উঠছে দেখ, বাবাদাদুর মতো!' খুব বিস্ময়ে প্রায় ফিসফিস করে এক ছুটির দুপুরে আড্ডার মাঝে জানিয়েছিল চুয়া। 'আমি কি তবে ছেলে!' অনিকেত তার সাফসুতরো বগল দেখিয়ে বলেছিল, 'ভ্যাট।তবে কি আমি মেয়ে?' ছেলে মেয়ের ব্যাপারগুলো একটু একটু ধরা পড়ছিল আর সেসব ছিল ওদের হাসিঠাট্টার বিষয়। অনিকে তার তো ছেলে বলে আলাদা কিছু মনে হয়নি।দিব্যি অনির কোলে পা তুলে দিয়ে কামরাঙা মাখা খেতে খেতে অনির প্রেমিকা অস্মিতার গপ্প করতো তারা দুজনে।
সেদিন ভোর থেকেই বৃষ্টি। চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বৃষ্টি দেখছিল চুয়া। অনিকেত কিছু বলতে এসে থমকে গেল। ফিরে যাচ্ছিল। চুয়া টের পেল। অনি, অনি ডাকতে ডাকতে দোতলার ব্যালকোনি থেকে নীচে নামছিল চুয়া। অনি সেদিন অস্মিতার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করে ফিরে এসেছিল। চুয়ার স্টাডি রুমে বসে সে কথা বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠেছিল অনিকেত। সান্ত্বনা দিতে তার কাছে আসতেই অনি ছিটকে সরে গিয়েছিল। তারপর নিজের স্টাডি রুমে চলে গিয়েছিল। বাবার সঙ্গে সেই রাতে অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল অনিকেতের।
দু'দিন পরে খুব ক্যাজুয়ালি 'আসছি' বলে বেরোয় অনিকেত। চুয়াও বেরোচ্ছে।হাত নেড়েছিল শুধু।

No comments:
Post a Comment