।।পাঠ প্রতিক্রিয়া।।
দাও ফিরে: রাজর্ষি দত্ত
একলব্য প্রকাশন
২০২১ সালে প্রকাশিত রাজর্ষি দত্তের `দাও ফিরে` গ্রন্থটি ইতিমধ্যে `উপন্যাস` হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সম্প্রতি গ্রন্থটি পড়বার সুযোগ হল।
প্রথমেই বলে রাখি, রাজর্ষি দত্তের বাড়ি কোচবিহার জেলার প্রান্তিক শহর দিনহাটায়। যদিও পড়াশোনার সূত্রে বেশ কয়েকটি জায়গায় থেকেছেন তিনি। এই মুহূর্তে কর্মসূত্রে তিনি পশ্চিম ডুয়ার্সের অলিখিত রাজধানী মালবাজারের বাসিন্দা।
লেখকের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথাগুলি বললাম একটিই কারণে। আমি নিজে মনে করি, একজন লেখক (বিশেষ করে উপন্যাস লিখছেন যিনি) যত বেশি সংখ্যক মানুষ দেখবেন এবং নানাবিধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাবেন, তাঁর সৃষ্ট চরিত্ররা এবং উপন্যাসের প্লট তত বেশি মূর্ত হয়ে উঠবে। উত্তরের বিভিন্ন শহরে থাকবার ফলে লেখক রাজর্ষি দত্ত সেই সুযোগ পেয়েছেন। ফলে, `দাও ফিরে` উপন্যাসের প্লট ও চরিত্রগুলি উঠে এসেছে বাস্তবের মাটি থেকে। পাঠকের কাছে উপন্যাসের ঘটনাটি যেমন অজানা নয়, তেমনি চরিত্রগুলিও খুব চেনা।
উপন্যাসটিতে `উপক্রম` ও `উপসংহার` বাদেও দশটি পর্ব আছে এবং উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে একটি হাতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। তবে তা কিন্তু নিছক গল্পগাথা নয়। বরং গল্পের ছলে উত্তরের নানা সমস্যা, সাধারণ মানুষের উদাসীনতা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ইত্যাদিও কেন্দ্রীভূত হয়েছে। উত্তরের যে বিপুল অরণ্য সম্পদ আজ টালমাটাল অবস্থায়, সেই বিষয়ে যথেষ্ট ইঙ্গিত মেলে উপন্যাসে। বনচররা ভাল নেই, সে কথাও মনে করিয়ে দেন লেখক। গ্রন্থটিতে এমন কিছু তথ্য রয়েছে, যা থেকে স্পষ্ট লেখক যথেষ্ট পরিশ্রম করে উপন্যাস লিখবার কাজে এগিয়েছেন। তবে কিছু কিছু জায়গায় নীরস তথ্য উপন্যাসের গতিকে সামান্য হলেও রুদ্ধ করেছে। এই বিষয়ে লেখক আরও একটু সচেতন হলে পারতেন বলে মনে করি।
উপন্যাসটির সবচেয়ে বড় বিষয় হল, এটি সৃষ্টি হয়েছে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে। কোনও বিষয় বা ঘটনা আরোপিত বলে মনে হয়নি। যাঁরা উত্তরে থাকেন, তাঁদের পক্ষে বুঝতে অসুবিধে হয় না উপন্যাসের আখ্যান। যাঁরা উত্তর সম্পর্কে তেমন অবহিত নন, তাঁরাও যদি নিবিড় পাঠ করেন, তবে খুব সহজেই সেই আখ্যানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে উঠবেন বলে বিশ্বাস রাখি। যে জরুরি তথ্যটি উপন্যাসে রাজর্ষি বলেছেন, সেটি উল্লেখ করছি। ভারতে রেলের ১২ জোনের মধ্যে ট্রেন দুর্ঘটনায় হাতি মৃত্যুর ৩০ শতাংশ হয় আমাদের রাজ্যের এই উত্তর অংশে। অরণ্য নিধন করে উন্নয়ন এবং তৎসহ ক্রমাগত প্রাকৃতিক অবক্ষয় আজ আমাদের খাদের কিনারায় নিয়ে এসেছে। দিনের পর দিন বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংঘাত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্বিধাগ্রস্ত আমরা সকলেই। এই কথা ঠিক যে, উন্নয়ন হলে প্রকৃতির ওপর কিছুটা হলেও কোপ পড়ে। আবার প্রকৃতির অবক্ষয়ও মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। ঠিক সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে `দাও ফিরে` পাঠককে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক জগতে যেখানে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করছেন- এরপর....?
`একলব্য` প্রকাশনীর ঝকঝকে মুদ্রণ ও সুন্দর কাগজ গ্রন্থটির আকর্ষণ বৃদ্ধি করেছে। কৌস্তভ চক্রবর্তীর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ শোভা বৃদ্ধি করেছে পুস্তকের।
তরুণ লেখকের কাছে পাঠক হিসেবে প্রত্যাশা রইল আগামীতে আরও।
আলোচক: শৌভিক রায়

No comments:
Post a Comment