বৃক্ষপ্রাণা
মঞ্জুশ্রী ভাদুড়ী
ঘোষমাসিমা কতকাল যে বিছানায় কাটিয়েছিলেন সে হিসেব কষতে হলে খানিকক্ষণ বসে ভাবতে হবে। বহুকাল আগে থেকেই তিনি বালিকা স্বভাবের হয়ে গেছিলেন। সর্বদা ছোটদের মতো হাততালি দিয়ে হাসতেন আর আনন্দের সঙ্গে হরিনাম করতেন। সবকিছু ভুলে যেতেন। মঙ্কু ওঁর মেয়ে মিতার সঙ্গে চাকরি করে, একবার ওঁকে দেখতে গেছিল। মিতাকে দেখিয়ে বলল, মাসিমা, এ কে বলুন তো! তিনি ভালো করে দেখে হাসিমুখে বললেন, মুখটা তো চেনা চেনা লাগছে, কাছাকাছি থাকে বোধহয়! প্রায়ই আসে। কোঁকড়া কোঁকড়া কাঁচা-পাকা চুলের মাসিমা দেখতে ভারী মিষ্টি। সেসময় মিতার ছেলে ফাইভে পড়ে। তারপর ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে তার বিয়ে হল, তখনও মাসিমা বেঁচে, কিন্তু বিছানায়। মঙ্কু কখনও ওঁর কথা জানতে চেয়ে মিতার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকাত, তারপর আবার কথাটা গিলে নিত। কি জানি মাসিমা চলেই গেছেন কিনা, ওর তো সবই ভুল হয়ে যায়! তাহলে কেমন হবে না প্রশ্ন করাটা!
সেদিন মাসিমার মৃত্যুর খবর পেয়ে মঙ্কু বুঝতে পারল মাসিমা বেঁচেছিলেন, তবে সেই বাঁচা নামেই বেঁচে থাকা। সমস্ত কাজকর্ম মিটে যাবার পর মিতা স্কুলে এসে একটা অদ্ভুত গল্প বলেছিল। মাসিমার নিজের হাতে লাগানো একটি স্থলপদ্ম গাছের নিচে তাঁর মরদেহ রাখা হয়েছিল। সেই গাছ নাকি পেল্লায় বড় হয়ে উঠেছিল, ফুল পাড়া ছিল অসাধ্য। অসংখ্য ফুল হয়ে আপনিই শুকিয়ে ঝরে পড়ত। মাসিমার চলে যাবার পরের দিন ফুলভরা গাছের দিকে তাকিয়ে মিতার বৌদি বলল, ওঁরই হাতে তো বেড়ে উঠেছ, মাথা ঝুঁকিয়ে দুটো ফুল দাও না বাপু, তোমার ফুলে হাত ছোঁয়াবে এমন তো কারও সাধ্য নেই ! কি আশ্চর্য! সরসর করে হাওয়া বইল একটা, ওপর থেকে টুপ করে ঝরে পড়ল একটা ফুল। ভীষণ অবাক হয়ে গেল বৌদি। একে ওকে ডেকে ডেকে বলতে লাগল। এরপর রোজই ফুল-পাতা পড়তে লাগল ওই জায়গায়, আর গাছটিও ক্রমশ ন্যাড়া হতে লাগল। যেদিন মাসিমার শ্রাদ্ধকার্য হল, সেদিন গাছটি একেবারে রিক্ত ও শূন্য, তাঁর পুত্রের মুণ্ডিত মস্তকের মতই!
মিতার দাদা গাছটির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভগ্নস্বরে বললেন, আজ মা সত্যিই চলে গেল!

No comments:
Post a Comment