স্বপ্ন
লীনা চন্দ
আজকাল স্বপনের মা সন্ধ্যাবাতি দিয়েই আদা দিয়ে এক কাপ চা বানায়। তারপর তারিয়ে তারিয়ে চায়ে চুমুক দেয় আর সিরিয়াল দেখে। বছর খানেক হলো স্বপন পাকা দালান তুলেছে। দামি খাট, সোফা, টিভি সব কিনেছে। জানালা, দরজায় বাহারি পর্দা। রান্নাঘরটিকেও সারিয়েছে। গ্যাসের উনুন, বাসনপত্র সব কিনেছে।
স্বপন মাকে খাটে শোয়ায়। ও নিজে মেঝেতে ঘুমোয়। মা রাগ করলে বলে,
–সারা জীবন আমার জন্য করলে। ছেলেবেলায় বাবাকে হারিয়েছি সেটা বুঝতেই দাওনি। এবার তুমি পায়ের ওপর পা তুলে বসে আমাকে হুকুম করবে।
স্বপনের মা হাসে না। কিন্তু মনে মনে খুশি হয়। কপালে হাত ঠেকায়। মনে মনে ভগবানকে বলে,
– ঠাকুর, কারো নজর যেন না লাগে।
স্বপনের মা গ্যাসের উনুনে রান্না করে। ঘরদোর পরিষ্কার করে। স্নান সেরে পরিষ্কার শাড়ি পরে। আর সন্ধ্যাবেলায় সিরিয়াল দেখে। পাড়া পড়শী চোখ টাটায়। বলে,
–ছেলের বিয়ের পর দেখব কত বাবুগিরি থাকে।
অজানা আশঙ্কায় স্বপনের মায়ের বুক ঢিপ ঢিপ করে।
সেদিন আটটার সিরিয়াল সবে শেষ হয়েছে। ঠিক সেই সময় দরজায় বাইরে স্বপনের গলা।
-মা, তাড়াতাড়ি দরজা খোলো।
দরজা খুলে চমকে ওঠে স্বপনের মা। স্বপনের পাশে একটি মেয়ে। দুজনের গলায় ফুলের মালা।
–হেই স্বপন, তুই বিয়ে করেছিস?
তার গলার আওয়াজ নিজের কানেই আর্তনাদের মতো শোনায়। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নেয়। বলে,
–আগে বলবি তো বাবা। বরণডালা সাজিয়ে রাখতুম।
স্বপনের মা বৌমাকে হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসে। ওদের ঘরে বসিয়ে রান্নাঘরে আসে। দুধে চালে বসিয়ে দেয় পায়েস করবে বলে।
রাতে খাবার পর মাকে মাদুর নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে দেখে স্বপন বলে,
– কোথায় যাও?
– রান্নাঘরে।
– কেন?
– শোবো। তোরা দরজার খিল আটকে দে।
নতুন বৌ মায়ের হাত থেকে মাদুরটা কেড়ে নিয়ে বলে,
-এটা তোমার ঘর। তোমাকে কোত্থাও যেতে হবে না।
স্বপনের মায়ের বুক থেকে ভারি পাথরটা নিমেষে নেমে যায়।

No comments:
Post a Comment