দোতারা
স্বপন সিংহ
সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর রমাকান্তর মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় দোতারার সুরে। প্রতিরাতেই সেই একই শব্দ। ওঝা–গুণিনেও কাজ হয়নি।
বিষয়টি ক্রমে ভয় আর অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একদিন গভীর রাতে একমাত্র পুত্র সুরজিতের শোবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে রমাকান্ত স্পষ্ট শুনতে পান—দোতারার সুর আসছে ছেলের ঘর থেকেই। ঘরে ঢুকে দেখেন, লেপের নীচে শুয়ে তন্দ্রাঘোরে ডুবে থাকা ছেলে ভাটিয়ালি আর ভাওয়াইয়ার সুরের মূর্ছনায় বিভোর হয়ে দোতারা বাজাচ্ছে।
ঘুম ভাঙিয়ে ছেলেকে প্রচণ্ড মারধর আর ধমক দেওয়া হলো।
শুরু হলো দুই বিপরীত মানসিকতার মানুষের লড়াই।
সময় গড়াল।
আজ রমাকান্ত শয্যাশায়ী। অসহ্য রোগযন্ত্রণায় তাঁর চোখে আর ঘুম নেই। সেই বিভেদও আর নেই। প্রতিরাতে ছেলেকে সামনে বসিয়ে অনুনয়ের সুরে বলেন—
“আমার চোখ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত দোতারা বাজিয়ে যাবে।”
এক রাতে ছেলের দোতারায় ভেসে ওঠে সুরেলা ভাওয়াইয়া গানের সুর—“ ও মোর চাঁদ ওরে ও মোর সোনা, ও মোক ছাড়িয়া না যান…”
দোতারার সুর শুনতে শুনতেই রমাকান্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
বাবার মৃত্যুর পর থেকে প্রতি রাতে বাবার সমাধির সামনে বসে সুরজিত দোতারায় গান গায়।
আজ সুরজিত সুরকে জয় করেছে। নাম ছড়িয়েছে চারদিকে । দোতারার মাধুরীতে মোহিত মানুষ এখনও রাতের শেষে তার কন্ঠের অপেক্ষায় থাকে ।

No comments:
Post a Comment