।। পাঠ প্রতিক্রিয়া।।
অবগাহন: নন্দিতা পাল
প্রকাশক: ধানসিড়ি
মূল্য: ৫০০ টাকা
এই আলোচককে ব্যক্তিগত একটি চিঠিতে বরেণ্য সাহিত্যিক অমিয়ভূষণ মজুমদার একবার লিখেছিলেন, `প্রত্যেকটা মানুষ-জীবন একটা কাব্য। লিখে ফেলতে পারলেই তা সুন্দর।`
নন্দিতা পালের `অবগাহন` পড়তে পড়তে এই কথাগুলি বারবার মনে পড়ছিল। কোচবিহারের কন্যা নন্দিতা পাল অবশ্য দীর্ঘদীন থেকে জন্মভূমির বাইরে। তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থার উচ্চপদে কর্মরত এই লেখকের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার বিপুল। কর্মসূত্রে থেকেছেন দেশে-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায়। প্রত্যক্ষ করেছেন কীভাবে বদলে গেছে আজন্ম লালিত মূল্যবোধ। অতীতের সেই ঢিলেঢালা প্রথিবীতে ঘটে গিয়েছে তথ্য-প্রযুক্তির নিঃশব্দ বিপ্লব। জেট যুগ থেকে কবে যেন আমরা প্রবেশ করেছি এমন এক দুনিয়ায় পরিভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। বিপুল এক বাঁকবদল সর্বত্র। বাদ পড়েনি রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি। তিনশো ঊনষাট পাতার (উপন্যাস শুরু হয়েছে ১৩ নম্বর পাতা থেকে) বৃহদাকার উপন্যাসে সেই কথাই বলেছেন লেখক। উপন্যাসটি পড়তে পড়তে বারবার সমমনস্ক পাঠক কিছু জায়গায় নিজেকে দেখতে পারবেন, বুঝতে পারবেন বিরাট এক কালখণ্ডের গতি-প্রকৃতি এবং কখনও প্রত্যক্ষ করবেন তিনি নিজেও উপন্যাসের যেন চরিত্র হয়ে উঠেছেন।
নির্মোহভাবে কলকাতার যাদবপুরের এইট বি বাসস্ট্যান্ড থেকে তনুজার কথা বলেছেন লেখক। উপন্যাস যেদিন শুরু হচ্ছে, সেই দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৯২ সালের সেই ৫ ডিসেম্বরের পরের দিনই এই দেশে ঘটে গিয়েছিল এমন এক ঘটনা, যার অভিঘাত বোধহয় আজও সামলানো যায়নি। আক্ষরিক অর্থেই এক প্রবল ভাঙনের মধ্যে চলতে থাকা সময়ের হাত ধরে তনুজার এই এগিয়ে চলা কোথায় যেন এক দেশের মধ্যে থাকা দুই পথের ইঙ্গিতবাহী। হয়ত তনুজার ব্যক্তিগত জীবনেও। অবশ্য তার জীবনে `গড়া` ব্যাপারটি আগে হয়েছিল, ভাঙন এসেছে পড়ে। গল্প এরপর নিজের মতো এগিয়েছে কখনও ফ্ল্যাশব্যাকে তনুজার নিজের বাড়ির কথায়, কখনও আবার সময়ের হাতে হাত রেখে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের ধ্বংসের বিবরণে। উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র চপল তখন আমেরিকায়। সেদিন যে চপলের কথা ভেবে তনুজা আতঙ্কিত হয়েছিল, সেই চপল অবশ্য তার হাত ছেড়ে দিয়েছিল পরে। আর তনুজার সব কিছু জুড়ে জায়গা করে নিয়েছিল মেয়ে চৈতি। তার মধ্যে দিয়েই সব স্বপ্ন পূরণ করতে চেয়েছে তনুজা। নতুন করে ফিরে পেয়েছে বাঁচে থাকার ইচ্ছে।
উপন্যাসের স্বার্থেই এর বেশি বলা উচিত নয়। উপন্যাসের প্লট যথেষ্ট মজবুত সাজিয়েছেন নন্দিতা পাল। গল্প বলবার মুন্সিয়ানায় কখনও একঘেয়ে লাগেনি পড়তে। বরং প্রতিটি অধ্যায় শেষে সহজাতভাবেই পরের অধ্যায় পড়বার বাসনা জেগেছে। পাঠককে এই আটকে রাখা নিঃসন্দেহে লেখকের বড় কৃতিত্ব। উপন্যাসের প্রয়োজনে একের পর এক চরিত্র এসেছে। তনুজা, চপল ও চৈতি ছাড়াও অন্য কোনও চরিত্রকে অচেনা মনে হয়নি একবারের জন্যও। বরং বারবার মনে হয়েছে, এরা আমাদের অত্যন্ত পরিচিত। নিশ্চিন্ত বলতে পারি, বহু পাঠক নিজের বাপ-ঠাকুরদার ছায়া দেখতে পারবেন উদ্বাস্তু হয়ে এই দেশে আসা তনুজার বাবার মধ্যে। ডাক্তার হলেও প্রবীরদাকে অত্যন্ত পরিচিত মনে হয়েছে। দাগ কেটেছে অন্যায়নি চরিত্রগুলিও।
কলকাতা, বহরমপুর, মুম্বাই সহ ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা উপন্যাসে এলেও তাদের বর্ণনায় লেখকের সংযত বিবরণ অবশ্যই উপন্যাসের পক্ষে গিয়েছে। কথাটা বললাম একটাই কারণে। বেশ কিছু লেখককে দেখেছি যে, উপন্যাসে নানা জায়গার কথা বলতে গিয়ে তাঁরা এতটাই বিবরণধর্মী হয়ে ওঠেন যে, সেটি আর উপন্যাস থাকে না, ভ্রমণ গাইড হয়ে যায়। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় বলতে পারি, `অবগাহন`-এ পৃথিবীর বিখ্যাত বিভিন্ন জায়গা ঘুরেফিরে এলেও, লেখক যথেষ্ট পরিমিতি বোধ দেখিয়েছেন। প্রয়োজনের বেশি শব্দ ব্যবহার করেননি। সম্পর্কের টানাপোড়েন বা গভীরতা বোঝাতে গিয়েও অতিরিক্ত কিছু বলেননি। ফলে, অতিকথন দোষে দুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা মুক্ত হয়েছে তাঁর লেখা। অবশ্যই তার কৃতিত্ব লেখকের।
সেঁজুতি বন্দোপাধ্যায়ের সুন্দর প্রচ্ছদ গ্রন্থটির মান বৃদ্ধি করেছে। ধানসিড়ির মতো নামি প্রকাশনার মুদ্রণ, কাগজ, বাঁধাই ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন আসার কোনও ব্যাপার নেই। আসছেও না। হার্ড বাঁধাইয়ের বইটির বিক্রয়মূল্য সামান্য বেশি মনে হলেও, আজকের মূল্যবৃদ্ধির জমানায় ৫০০ টাকা এমন কিছু নয় বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।
কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণের অহোমরাজকে স্বর্গনারায়ণ চুখাম ফা-কে লেখা চিঠি আজও বাংলা গদ্যের প্রামাণ্য প্রথম নিদর্শন বলে করা হয়। পরবর্তী মহারাজা হরেন্দ্রনারায়ণ নিজে ভাল লিখতেন। মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণের লেখা Thirty-Seven Years of Big Game Shooting in Cooch Behar, The Duars, and Assam A Rough Diary পড়লে বোঝা যায়, গদ্যে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন তিনি। পিছিয়ে ছিলেন না রাজপরিবারের নারীরাও। মহারানি সুনীতি দেবীর আত্মজীবনী The Autobiograpy of an Indian Princess তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। জয়নাথ মুন্সীর 'রাজপোখ্যান', খান চৌধুরী আমানতউল্লা আহমেদ রচিত কোচবিহারের ইতিহাস ইত্যাদি এখানকার উর্বর সাহিত্য চর্চার কথাই বলে। পরবর্তীতে কোচবিহারের সাহিত্য জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন সুবোধ কুমার চক্রবর্তী, অমিয়ভূষণ মজুমদার,নীরজ বিশ্বাস, অরুণেশ ঘোষ, সুবোধ সেন, দেবজ্যোতি রায় প্রমুখের মতো গদ্যকাররা (প্রখ্যাত কবি রণজিৎ দেব, সমীর চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষ সিনহা, সুবীর সরকার প্রমুখদের এই তালিকায় রাখছি না তাঁরা কবি বলে)। বর্তমানে বাংলা সাহিত্য জগতে ছাপ রাখছেন তরুণ সোমজা দাস, অর্জুন বন্দোপাধ্যায়, দেবায়ন চৌধুরী প্রমুখরা। তাঁরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত পরিচিত নাম এবং কোচবিহারের গদ্য জগতকে অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছেন বা দিচ্ছেন।
নিঃসন্দেহে নন্দিতা পাল সেই তালিকায় এক উজ্জ্বল সংযোজন। তাঁর সৃষ্ট `অবগাহন`পাঠক হাতে তুলে নিক, এই কামনা রইল।
আলোচক: শৌভিক রায়

No comments:
Post a Comment