ক্রমবিন্যাস
জনা বন্দ্যোপাধ্যায়
শাল, মহুয়ার জঙ্গল ঘেরা অযোধ্যা পাহাড়ের পথে চড়িদা গ্রাম। এখানকার একনিষ্ঠ মুখোশ শিল্পী সমীরণ মাহাতোর ছেলে সিধু ও মেয়ে তরলা বাবাকে ছৌ নাচের মুখোশ তৈরীর কাজে সাহায্য করে। সিধুর বয়স সতেরো ছাড়িয়েছে, তরলার পনেরো !
সমীরণ মাহাতোর স্ত্রী তুলসী কাকভোরে পুকুরে স্নান করতে যায়। পুকুর ধারে ছিপ হাতে বসে থাকেন পার্বতীচরণ। প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয়ের ভঙ্গিতে চলে দুজনের প্রেম। অকৃতদার পার্বতীচরণের এই গ্রামে একটি মুদির দোকান আছে। শিল্প বোঝেন না তিনি, ব্যবসা ভালো বোঝেন।
পৃথিবীর সুখ দু:খের আবর্তের মাঝে মহামারীর প্রকোপ ভয়াবহ দু:স্বপ্নের মতো মানুষের জীবনকে ঘিরে ধরে। সেবার শীতে কলকাতা থেকে শিল্পমেলা আয়োজক অনুপম তালুকদার এসে কিছু মুখোশের অর্ডার দিয়ে যান। কিন্তু করোনার প্রকোপে কিছু দিন পর অনুপম তালুকদার তাঁর অর্ডারগুলো ক্যানসেল করেন। সমীরণ নিরাশ হয়ে পড়েন।
একদিন হঠাৎ করেই করোনায় আক্রান্ত হন সমীরণ মাহাতো। পরীক্ষা করানোর পর দুদিনের জ্বরে মৃত্যু হয় তাঁর। তুলসী মানসিক ভাবে ভেঙে পড়ে। দিশাহারা, সাদা থান পরিহিতা তুলসীকে দেখে পার্বতীচরণ বলেন, " তুই আমার বাড়ি চল তুলসী। আমরা সংসার পাতবো।"
তুলসী শেষ পর্যন্ত রাজী হয় না, গ্রামের অবস্থাপন্ন ঘোষদের বাড়িতে কাজে ঢোকে।
বছর দুয়েক পর হঠাৎ সমীরণের চৌকির তলা থেকে একটা ঠিকানা লেখা কার্ড পেয়ে সিধু মাকে বলে, " এটা কলকাতায় অনুপম বাবুর ঠিকানা। ওখানে বাবার বানানো মুখোশগুলো নিয়ে যাব বিক্রির জন্য। এখন তো আর দেশে করোনা নেই। ওনারা না করতে পারবেন না।"
মহামারী দেশকে শ্মশান করেছে। তবু মানুষের মনে আশার আলো নেভেনি। তুলসী আর তরলা কিছু মুখোশ সহ সিধুর ব্যাগপত্তর গুছিয়ে দেয়। মা বোনকে বিদায় জানিয়ে আত্মবিশ্বাসী সিধু তার অদম্য ইচ্ছা পূরণের পথে পাড়ি দেয়। তুলসী "দুগ্গা দুগ্গা" বলে বার বার প্রণাম করে।

No comments:
Post a Comment