ফেরা
মনোরঞ্জন ঘোষাল
অয়ন যখন বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়াল, তখন গোধূলির আলো ফিকে হয়ে আসছে। দশ বছর পর এই চেনা কড়াটা নাড়তে গিয়ে তার হাত সামান্য কেঁপে উঠল। বড় চাকরি, বিদেশের ব্যস্ততা আর নাগরিক কোলাহলে সে ভুলেই গিয়েছিল এই মাটির গন্ধমাখা গ্রামটার কথা।
দরজা খুললেন তার মা। সাদা চুলে একটু বেশি রূপালি আভা ধরেছে, চোখের কোণে বলিরেখাগুলো আরও গভীর। অয়নকে দেখেই মা থমকে দাঁড়ালেন। বিস্ময় কাটিয়ে ফিসফিস করে বললেন, "আসলি শেষমেশ?"
অয়ন ভেবেছিল মা হয়তো অভিমানে ফেটে পড়বেন, জানতে চাইবেন কেন সে এতগুলো বছর একটা ফোন পর্যন্ত ঠিকমতো করেনি। কিন্তু মা কেবল তার হাতটা ধরে টেনে ভেতরে নিয়ে গেলেন। দাওয়ায় বসিয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বললেন, "তোর প্রিয় নারকেল নাড়ু করে রেখেছি। আজ সকালেই মনে হচ্ছিল তুই আসবি।"
অয়ন অবাক হয়ে দেখল, ঘরের কোণে তার সেই ছোটবেলার ভাঙা সাইকেলটা আজও রাখা। পড়ার টেবিলের ধুলো ঝেড়ে মা সব বইগুলো গুছিয়ে রেখেছেন। যেন এই দশটা বছর সময় এখানে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল তার প্রতীক্ষায়।
রাতের নিস্তব্ধতায় অয়ন যখন পুরনো বিছানায় গা এলিয়ে দিল, তার মনে হলো—শহরের ওই কাঁচঘেরা অট্টালিকা তাকে অনেক কিছু দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু শান্তিটা এখানেই জমা ছিল। সাফল্যের ইঁদুর দৌড়ে সে আসলে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছিল। আজ মায়ের হাতের সামান্য ডাল-ভাতের স্বাদে সে খুঁজে পেল সেই হারানো অস্তিত্বকে।
বিদেশের ফ্লাইটের টিকিটটা মনে মনে বাতিল করে অয়ন জানলার বাইরে তাকাল। জোনাকি জ্বলছে। আজ অনেক বছর পর সে কোনো দুঃস্বপ্ন ছাড়া শান্তিতে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিল।

No comments:
Post a Comment