আকাশের প্রতিফলন
অমিতাভ চক্রবর্ত্তী
শহরটি বাইরে থেকে স্বাভাবিক—বাস থামে, দোকান খোলে, বিকেলে চায়ের দোকানে ভিড় জমে। তবু বাতাসে এক ধরনের ক্লান্তি লেগে থাকে। প্রতিদিন একই কথার পুনরাবৃত্তি—সময়ের দোষ, দেশের দোষ, অন্যের দোষ। কথাগুলো বদলায় না, দিনগুলো বদলায় না।
শহরের মাঝখানে একটি পুরোনো পুকুর। কেউ বলে একসময় সেখানে শাপলা ফুটত। এখন পলিথিনের স্তর, পচা গন্ধ, নিস্তেজ জল।
এক বিকেলে অর্ণব দেখল—একজন বৃদ্ধ নীরবে জলে নেমে আবর্জনা তুলছেন। লোকজন দাঁড়িয়ে হাসল—
“এতে কী হবে?”
বৃদ্ধ কিছু বললেন না।
পরদিনও তিনি এলেন। তার পরদিনও।
কয়েক সপ্তাহ পরে পুকুরের এক কোণে আকাশের ফিকে নীল দেখা গেল।
এক রবিবার অর্ণব জলে নামল। কাদা পায়ে আটকে গেল, গন্ধে শ্বাস থমকে গেল। তবু সে একটি প্লাস্টিক তুলল, তারপর আরেকটি। বৃদ্ধ ধীরে বললেন,
“জল পরিষ্কার হলে মানুষ আকাশ দেখতে শেখে।”
ধীরে ধীরে কয়েকজন শিশু নেমে পড়ল। তারপর আরও মানুষ। দুর্গন্ধ কমল, জলে হালকা ঢেউ দেখা গেল। এক ভোরে একটি সাদা বক এসে দাঁড়াল পাড়ে।
মানুষ থেমে জলের দিকে তাকাতে শিখল।
একদিন বৃদ্ধ আর এলেন না। পুকুরপাড়ে একটি ভাঁজ করা কাগজ পড়ে ছিল—
“যেখানে মানুষ তুচ্ছতায় ডুবে থাকে, সেখানে জল পচে যায়। যেখানে মানুষ হাত ভেজায়, সেখানে আকাশ ফিরে আসে।”
বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে পুকুর ভরে উঠল। শিশুরা কাগজের নৌকা ভাসাল। অর্ণব জলে আকাশের প্রতিফলন দেখে বুঝল—পরিবর্তন আসলে জলের নয়, মানুষের চোখের।

No comments:
Post a Comment