পরিপূরক
শ্রাবণী সেনগুপ্ত
- কালু,বল পড়েছে ঝোপে, দৌড়ে যা....
কথাটা কানে যেতেই সেদিকে ছুটে যায় ছোটখাটো ছেলেটি। ঝোপঝাড়ের খোঁচায় হাত পা ছড়ে গেলেও খড়ি ওঠা চামড়া আমল দেয় না। বলটা হাতে পেয়ে তাতে বারকয়েক হাত বোলায় সে, ভাবে কবে যে এমন একটা আস্ত বলের মালিক হবে। হাঁক শোনা যায় - "এ্যাই ছোঁড়া,এতক্ষণ কি করছিস? শিগগির বলটা দে।"
বলটায় একটা চুমু খেয়ে দৌড়ে এসে দাদাদের বোলিংয়ের অনুকরণে একহাত ঘুরিয়ে বলটা তাদের দিকে ছুঁড়ে দেয় সে। ক্যাচ লুফতে না পারা পাড়ার দাদারা গালি দেয়। দাদাদের হারিয়ে দেবার আনন্দে ভাগ্যের হাতে মার খাওয়া কিশোর আড়াই পাক নেচে আবার বসে পড়ে যথাস্থানে।
শীতের দুপুরে মাঠের রোদে একটু যতটা সম্ভব গা সেঁকে নেয় কালু, সেই ওম্ ধরে রেখে কাটাতে হয় সারা রাত ঐ ইঁট বার করা স্যাঁতস্যাঁতে পোড়ো বাড়িতে। শীতের রাতে তো সম্বল বলতে শম্ভু মুদির দেওয়া ছালা, আর জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া একটা কম্বল। একসময় স্ট্রিট লাইট জ্বলে ওঠে, খেলা শেষ হয়, খেলুড়েরা সব যে যার বাড়িতে চলে যায়। এই সময়টা বড্ড মন কেমন করে তার, খুব মনে পড়ে আগের কথা। সর্বনাশী নদীটার পাড় না ভাঙলে বাপ মা সে আর তার ঠাগমা দিব্যি ছিল তাদের এক চিলতে মাটির ঘরে। রাগ হয় তার ওপর, যে সেই ঝড় জলের রাতের অন্ধকারে তাকে কোলে করে এক অচেনা নৌকাতে তুলে দিয়েছিল। তা না হলেতো সেও এতদিনে তার মা বাবা ঠাগমার সঙ্গে -
সেই নৌকা তাকে নামিয়ে দিল এই অচেনা গঞ্জে। বছর দুয়েক এখানেই কেটে গেল ফাই ফরমাশ খেটে।
সঙ্গী বলতে একটা নেড়ি। কালু আদর করে নেড়ির নামও রেখেছে নিজের নামে।
এইবারের শীতটা খুব বেশি পড়েছে।সেদিন রাতে খুব জ্বর এলো কালুর। নির্জলা,অনাহারে পড়ে রইল সে, কেউ খোঁজ করলোনা। দিন দুই পরে মাঝ দুপুরে খেলার সময় পাশের মাঠে আবার শোরগোল, "ঐ যাঃ, বলটা আবার ঝোপে পড়ল,কালু ,কালু কোথায় গেলি রে!" তাদের সম্মিলিত চিৎকারে পোড়ো বাড়িটা থেকে লাফাতে লাফাতে বেরিয়ে এলো চারপেয়ে কালু। এক দৌড়ে ঝোপে ঢুকে মুখে করে বল এনে দিল সে।

No comments:
Post a Comment