ইতিহাসে অ-মুদ্রিত অনির্বান বিপ্লবী নারী
শ্রাবনী সেনগুপ্ত
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুধুমাত্র পুরুষসমাজ কর্তৃক পরিচালিত হয়নি। নারীসমাজও আন্দোলন সগঠিত করতে সমান সাহস আত্মত্যাগ ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। কখনো পর্দার আড়ালে বা কখনো সামনের সারিতে পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের নির্ভিক সৈনিক রূপে সমাজের নানা বাধা উপেক্ষা করে তাঁরা সরাসরি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন , কারাবরণ করেছেন এমনকি কিছু ক্ষেত্রে জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের অবদান ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। এক্ষেত্রে এমন অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী মহিলা ছিলেন যাঁরা নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন। হয়তো বইয়ের পাতায় মাতঙ্গিনী , প্রীতিলতা , কল্পনা দত্ত , নলিনীবালা, বীণা দাস প্রমুখের মতো তাঁদের নাম উল্লিখিত হয়নি কিন্তু আজকে যে স্বাধীন ভারতের নাগরিকত্ব আমরা উপভোগ করছি, তার পিছনে সেই মহীয়সী যোদ্ধাদের অবদান অনস্বীকার্য। পরাধীন ভারতের অবিভক্ত বাংলার এমন অনেক অকুতোভয় সংগ্রামী ছিলেন, যাঁরা নিজেদের পাওয়া-না পাওয়ার সীমানা ছাড়িয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির আকাঙ্খায় নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।
আমি আজকে এমনই একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী নারীর কথা বলবো। তাঁর নাম শৈল সেন। তিনি আমার বড় পিসি। ১৯১৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং তিনি প্রয়াত হন ১৯৮৪ সালে। তাঁর পড়াশোনা ছিল ঢাকার ইডেন স্কুলে, কলেজে। সবচেয়ে বড় সন্তান হলেও আমার ঠাকুরদা কখনোই তাকে বাড়ির বাইরে থেকে নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নিরুৎসাহিত করেননি। ঢাকার ইডেন কলেজে পড়ার সময় তার সহপাঠী ছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী লাবণ্যপ্রভা দাস। সেই সময় থেকেই তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। যুগান্তরদল ও অনুশীলন সমিতির সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। মাস্টারদা সূর্যসেন তার অনুপ্রেরণা ছিলেন। আমাদের ঢাকার শান্তিনগরের বাড়িতে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত এনাদের পায়ের ধুলো পড়েছিল। বড় পিসি কারাবরণও করেছিলেন। তিনি মহিলা সশস্ত্র বিপ্লবী বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁর কাছ থেকে শুনেছিলাম শাড়ির গাছকোমর করে পরে কিভাবে রিভলবার চালাতে হয় সেই শিক্ষা তাঁরা পেয়েছিলেন। বিপ্লবী লীলারায়ের সাথে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন তারা। আমার ছোটবেলায় এনাদের বিভিন্ন বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের আলোচনা খুব হত বাড়িতে। বাড়িতে আসত জয়শ্রী পত্রিকা। নেতাজির মহিলা বাহিনীর সঙ্গেও কাজ করেছিলেন বড় পিসি। তিনি স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সোশ্যালিস্ট দলে যোগদান করেন সময় গুহের নেতৃত্বে এবং ১৯৫৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার তৎকালীন ভবানীপুর কেন্দ্রে কংগ্রেস সমর্থিত প্রার্থী সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের বিপরীতে সম্মিলিত বামপন্থীদের প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন । ছোটবেলায় বড় পিসির বাড়ি যখনই যেতাম তখনই দেখতাম বিভিন্ন অনামি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভিড় কেউ হয়তো চুপচাপ বসে থাকতেন, কেউ কখনো মুড়ি খেতেন আর বড় পিসির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হতো। বড়পিসি এবং তাঁর সংগ্রামী সাথীরা যখন কারাবরণ করেন সেই সময়ের কাহিনী আমরা শুনেছিলাম। শুনেছিলাম কিভাবে তাঁরা শায়ার দড়ি বেঁধে উঠে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন জেলের ছাদে। যাতে বাইরের খবর না আসতে পারে সেই জন্য বড় পিসিদের কাছে যে কাগজ পাঠানো হতো খবরের কাগজ সেই কাগজের বিশেষ বিশেষ অংশে কালী লেপে দেওয়া হতো। ওই সময় বড় পিসিদের যেই ছেলেটি চা দিতে আসতো সে সসপ্যানের সরু ফুটোর মধ্যে দিয়ে কাগজ ঢুকিয়ে নিয়ে আসতো যাতে কিছু বিশেষ কারাবন্দি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সঙ্গে পারস্পরিক যোগাযোগ রাখা যায় । যখন বড় পিসি তাঁর সদ্যতরুণী অবস্থায়, তখন স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব জওহরলাল নেহেরু গিয়েছিলেন ঢাকায়। উনি একটি স্টিক -লাঠি তুলে অভিবাদন করছিলেন সবাইকে। তাঁর গাড়ির পেছনে পেছনে ছুটে শৈল সেন সবার বারণ সত্ত্বেও গিয়ে, জও হরলাল নেহেরু কে বলেছিলেন যে আমাদের বঙ্গ -সংস্কৃতির প্রথানুযায়ী লাঠি তুলে অভিবাদন করতে হয় না, হাত জোড় করে অভিবাদন করতে হয়। আমি সেই কথা শুনে ভাবি যে কিভাবে তাঁরা এত মনের জোর পেতেন এবং অকুতোভয় হতেন যে ভুল বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন। পরবর্তীকালে স্বাধীন ভারতে দক্ষিণ কলকাতার রাসবিহারীর কাছে একটি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা হেড- মিস্ট্রেস হয়ে কাজে যোগদান করেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অনুশীলন সমিতির বিপ্লবীদের সঙ্গে সমন্বয় তৈরির একটি চেষ্টা হয়েছিল। সেই উদ্যোগের সঙ্গেও শৈল সেন যুক্ত হয়েছিলেন। বেহালা-বরিশা অঞ্চলের কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গেও এই বৃত্তে তাঁর যোগাযোগ ছিল , তাঁরা ছিলেন প্রয়াত শচীন সেন রায় , নৃপেন্দ্রনাথ গুহঠাকুরতা , মনা মুখার্জী প্রমুখ।
তিনি মহিলাদের জন্য বিভিন্ন স্বনির্ভর- প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বহু দুস্থ দরিদ্র মহিলাদের আমি ওনার বাড়িতে অনেক যাতায়াত করতে দেখেছি। তাঁর সমাজ-কল্যানমুলক কাজের সহায়তা পেতেন জয়শ্রীগোষ্ঠীর লীলা রায়, বাসনা গুহ, তেমনি কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেন, রেনু চক্রবর্তী, শিক্ষাবিদ উমা সেহানবীশ প্রমুখের কাছ থেকে। স্বাধীন ভারতে নারী কিভাবে স্বনির্ভর হবে , অর্ধেক আকাশ হয়ে কিভাবে পুরুষের পাশে থেকে দেশ ও সমাজ গড়ার কাজ করবে এই বিষয়ে সচেতন প্রয়াস তাঁদের ছিল। মুক্তি ও কর্মের যৌথ ধারণার প্রকাশ হিসেবে অসহায় ও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দেশের অগ্রগমন অব্যাহত রাখার প্রয়াসিক এই মহিয়সী নারীদের কথা ইতিহাস না জানালেও লোকশ্রুতির মতো সমাজে বহমান থাকবে , এই আশা রাখি। নাহলে সমাজের হিত -কল্প অসম্পূর্ণ থাকবে এবং সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
(ছবি- হৃষিকেশের চৌরাশি কুঠি বা বিটলস আশ্রমের দেওয়াল চিত্র/ শৌভিক রায়)

No comments:
Post a Comment