একজন ভাষা সৈনিকের দুঃখ ও যন্ত্রণা
কবিতা বণিক
রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৌন্দর্য ও সাহিত্যে লিখেছেন “ভাষা যে ছবি আঁকে সে ছবি যে যথাযথ ছবি বলিয়া আমাদের কাছে আদর পায় তাহা নয়— ভাষা যেন তাহার মধ্যে একটা মানবরস মিশাইয়া দেয়, এজন্য সে ছবি আমাদের হৃদয়ের কাছে একটা বিশেষ আত্মীয়তা লাভ করে। বিশ্বজগৎকে ভাষা দিয়া মানুষের ভিতর চোলাইয়া লইলে সে আমাদের অত্যন্ত কাছে আসিয়া পড়ে।”
ভাষা সৈনিক বলার কারণ টোটো উপজাতির একটি ছেলে ধনীরাম , সে কত কষ্ট, অপমান সহ্য করে বাংলা শিখে বড় হয়ে তার মাতৃভাষার সম্মান স্বরূপ টোটো বর্ণমালা তৈরি করলেন , তার সেই শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধের কথা আলোচনা করার চেষ্টা করছি। ১৯৬৪ সালে জন্ম ধনীরামের। ছোট বেলা থেকেই তার দিদিমার কাছ থেকে শোনা পূর্বপুরুষদের গল্প অর্থাৎ কিভাবে তারা জল আর জঙ্গলকে সাথী করে আনন্দে বসবাস করত। সে নিজেও জঙ্গলের প্রচুর ফল, মূল, কন্দ, নানান ছত্রাক, লতাপাতা দিদিমার সাথে, বাবা, মায়ের সাথে গিয়ে নিয়ে আসত। মধু সংগ্রহ করত এই জঙ্গল থেকে। সে জেনেছে দেখেছে তারা খেলেও পশুপাখিদের জঙ্গলে খাবার কখনও কম পরত না। তারা প্রকৃতির সাথেই বাস করতে ভালোবাসে। জঙ্গলের ‘ চুরুসাই’ ‘ মুরুংসাই ‘ লতা দিয়ে দিদিমা ওষুধ তৈরি করত। দিদিমার কাছে সেংজা দেবতার কথা, তাঁর আশীর্বাদের অনেক গল্প শুনেছে।
দূরের ওই হিসপা আর পদুয়া পাহাড়কে ওরা দেবতা মানে। এছাড়াও তার খুব ভালোলাগে অপূর্ব সুন্দর ডায়ামারার গুহা। আস্তে আস্তে সে জঙ্গল চোখের সামনে ছোট হয়ে যেতে থাকল। এমনি মাতৃসমা জঙ্গল ও নদীর এখনকার অবস্হা দেখে ধনীরামের মনে বড় কষ্ট। গাছকাটা, আর পাহার কেটে নদীগর্ভ খুঁড়ে পাথর বিক্রির দুষ্কর্মটা যদি আটকানো যেত তাহলে ধ্বসের পর ধ্বসে এমন ক্ষত বিক্ষত হতে হতনা তার মাতৃভূমিকে। ১৯৬৮ সালের কথা। বিট অফিসার ভগবান দাশের নেতৃত্বে হাতি চড়ে এসে জাপেনরা ( বাঙালি, বিহারি, নেপালি যারা টোটোপাড়ারর বাইরের লোক ) টোটোদের জমির ফসল, ঘর সব পুড়িয়ে দেয়। টোটোপাড়ার মোড়লের কাছে ওই জমির ওপর টোটোদের অধিকারের প্রমাণ লেখা ছিল তাম্রপত্রে। কিন্তু আমাদের স্বাধীন সরকার বলল সেসব বৃটিশদের দেওয়া। তাই সেই তাম্রপত্রের কোন মূল্য নেই এখন। বিট অফিসার সেই তাম্রপত্র তাদের ফিরিয়ে দিলেন না। প্রমানপপত্র হারিয়ে খুব মুষড়ে পড়লেন সবাই। ধনীরামের বাবা আমেপা টোটো বললেন “ ধানুয়া ! তোদের বড় হয়ে টোটোদের জমি জায়গা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে টোটোরা বাঁচবে কিকরে?” ধনীরামের বুকের ভিতর কেমন যন্ত্রণায় টনটন করে উঠল। বাবার অপমান বড্ড কষ্ট দিয়েছে তাকে।
ধনীরাম এখন স্কুলে যায়। সরকারী মাস্টারমশায় আসেন। টোটো ছেলেমেয়েদের অর্থহীন ধ্বনিতে মাস্টার মশায় বিরক্ত হন। টোটো ছেলমেয়েদের বর্ণমালা পরিচয় করানো , উচ্চারণ করানো খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। অবোধ্য ধ্বনির সাথে হাত পা নাড়িয়ে মাষ্টার যত শেখাতে চান ছেলেমেয়েরা হেসে ফেললে চলে বেতের শাসন। এই ভাবেই বছর ঘোরে। ধনীরাম অবাক হয় যে তারা তো মা-বাবা, ঠাকুরমা- ঠাকুরদার থেকে শোনা কত গান গল্প সহজেই মনে রাখে, বলতেও পারে। কিন্তু মাষ্টারমশাইএর পড়া, পদ্য মনে থাকে না। ধনীরামের বেশি দুঃখ হয় যখন পড়া বলতে না পারলে মাষ্টার মশাই মাথা দেখিয়ে ইঙ্গিত করে যে তোদের মাথায় কিছু নেই। একদিন পড়া না পারার জন্য মাষ্টারের কাছে মার খেয়েছে ধনীরাম। ছেলেরা হাসাহাসি করছে, বাড়ি ফিরে মায়ের কাছে বলবে না ভেবেছিল কিন্তু মায়ের কাছে আসতেই অশ্রু নদী দুটোতে হড়পা বানের প্লাবন ডাকল। মা দুহাতে জড়িয়ে স্নেহ ভরে জিজ্ঞেস করেন “কি হয়েছে?“ ধনীরাম বলে “পড়া পারিনি। মাস্টার মেরেছে। বলেছে স্কুলে না গিয়ে জঙ্গলে যেতে। বন্ধুরা হেসেছে।” মা তাঁর কাপড়ের খুঁট দিয়ে দুঃখ মুছিয়ে বললেন “পদ্য মুখস্হ বলতে পারিসনি তো কি হয়েছে? তুই নিজে একদিন কত কবিতা তৈরি করবি। লোকে তোর কবিতা শুনবে। তুই টোটো পাড়ার নাম উজ্জ্বল করবি। সেংজা দেবতা তোর জন্ম দিয়েছে , টোটোদের দুঃখ কষ্ট দূর করার জন্য। সমস্ত দুঃখ কষ্টের বোঝা তোর্সায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে হবে তোকে। সেংজা তোর সব বোঝা হালকা করে দেবে। তুই সেংজার বরপুত্র। তোকে ইস্কুলের পাশ দিতে হবে। তবে না বাবুদের অপমানের জবাব দিতে পারবি।“ মায়ের এই স্নেহস্পর্শ , মায়ের আশা ধনীরামের মনে তীব্র জেদের সৃষ্টি করে। বাবার অপমান, নিজের লজ্জা অপমান সব দূরে ঠেলে প্রতিজ্ঞা করে যতই দুর্বোধ্য হোক সে ভাষা , তাকে সব শিখে স্কুলে পাশ দিতেই হবে।
ক্লাস টুতে পড়ার সময় ধনীরাম প্রথম বাবার অনুমতিতে দিদিমার সাথে পায়ে হেঁটে ২৪ কিমি দূরে মাদারী হাট বাজারে যায়। সেখানে প্রথম ট্রেন গাড়ি দেখে। তার কাছে মনে হয় বিশাল এক ভোঁতা মুখো লোহার সাপ কিরকম বিভৎস গর্জন করতে করতে তার বিষ নিশ্বাস কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে চলে যাচ্ছে। মাটিও থর থর করে কাঁপতে লাগল। তার দিদিমার হাতে বোনা একটা পোষাক আছে। দিদিমা তাকে দেখিয়েছে। তখন টোটোদের ঘরে ঘরে গাছ-গাছড়া থেকে সূতো তৈরি করে কাপড় বুনত। এখন আর তা মনে নেই। এই পোষাকটা তার বাবা ঠাকুরদাও পরেছে। এখনও ভালো আছে কাপড়টা।
এই টোটোপাড়ার পঞ্চায়েত মুখিয়া ধনীরামের বাবা আমেপা টোটো। তার স্ত্রী লক্ষিনী টোটো। এরা অল্প বয়স থেকেই বিনিময়ে বেচাকেনা করত। সে সময় টোটো পাড়ায় প্রচুর কমলালেবু ফলত। তারা কুয়োপানির জঙ্গল পেরিয়ে দলসিং পাড়ায় পিঠে ঝুড়ি বেঁধে নিয়ে যেত কমলালেবু। একবার গণ্ডারের দেখা পেয়েছিল।অর্থাৎ নানান বিপদ মাথায় নিয়ে তাদের যাতায়াত, বসবাস সবকিছু। তবু তারা খুব ভালো ছিল। কিন্তু সেবার টোটো পাড়ার সব কমলালেবুর গাছ মারা গেল। কারণ হিসেবে ওদের বক্তব্য রাভা জাতির মানুষদের অভিশাপে সমস্ত কমলালেবুর গাছ নষ্ট হয়েছিল। অথচ টোটোদের সাথে মেচ, রাভাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। এরপর তারা বাঁশের চাষ শুরু করে। কারণ হিসেবে বলে টোটোদের পূর্বপুরুষরা নাকি জংলি বাঁশঝাড়ের নীচে বাস করত। বাঁশ এদের বন্ধু। নানান ধরণের বাঁশ ছিল। তারা বাঁশের ঘর, সিঁড়ি, মশাল , জল খাওয়ার পাত্র,ইত্যাদি নানান কাজে ব্যবহার করত। এছাড়া আশেপাশের চা বাগান গুলিতে বাঁশের চাহিদা ছিল। বাঁশের বিনিময়ে আদান প্রদান চলত। ১৯৮০ র দশকে বাঁশের মড়কে বাঁশ চাষ শেষ হয়ে গেল। এরপর শুরু হয় সুপারি চাষ ও সুপারি বিক্রি।
টোটোদের জমি নিয়ে ধনীরামের বাবা আমেপা টোটোর খুব চিন্তা। মাঝে মাঝে মা- বাবার আলোচনা শোনে ধনীরাম। একদিন পাহাড়ের ঢালে তাদের চাষের জমি থেকে মা-বাবার সাথে মকাই তুলতে গিয়েছিল। সেদিন সুযোগ বুঝে মাকে জিজ্ঞেস করে “ তুই আর বাবা জমি নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন?” মা বলেন “ বনদেবীর অফুরান দানে টোটোজাতির জীবন লালিত হত। আমাদের টোটোদের অনেক জমি হারাতে হয়েছে। ধীরে ধীরে জমি- জঙ্গল থেকে আমাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাবার কাছে শুনিস। আমাদেরও কত ধানী জমি ছিল। তোরসার কত মাছ আমরা পেতাম ।
মিশনারিরা হাসপাতাল আর স্কুল তৈরি করল। লুথারেন ওয়ার্ল্ড সার্ভিস বা এল, ডাবলিউ, এস একটি সংস্হা আসাম বর্ডারে “ রামপুর সিঙ্গিমারি হাইস্কুল “ উদ্বাস্তুদের নিয়ে চালাতেন । এদিকে মণিপুরের কেবিন মিনিষ্টার ছিলেন বি,কে, রায় বর্মণ। তিনি ধনীরামের বাবা আমেপা টোটোকে বাংলা শেখাতেন। এই রকমই কোন সূত্র ধরে শুনতে পায় কোচবিহারের পঞ্চকন্যা নামে এক গঞ্জে মিশনারিদের দ্বারা চালিত স্কুলে আদিবাসী জনজাতির ছেলেরা ছাত্রাবাসে থেকে নিখরচায় পড়াশোনা করতে পারে। ধনীরাম সেখানে টোটোপাড়ার স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেনী পাশ করে এই মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। এই প্রথম ধনীরাম বাইরে বের হল। মাদারীহাটের চেয়ে দূরে কখনওই সে যায় নি। এখন ধনীরাম মোটামুটি বাংলা ভাষা শিখে গেছে। বুঝতে পারে। তবে কোন সময় টোটো ভাষা বলে ফেললে অনেকে “ জংলি ভাষা” বললে খুব মন খারাপ হয়ে যায়। ধীরে ধীরে বাংলার সাথে সাদরি ও কামতাপুরি ভাষাও সে শিখে নিল বন্ধুদের থেকে। ধনীরাম কোচবিহার দেশের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে। মিশনারি স্কুল অষ্টম শ্রেণী পাশ করে চলে আসে। ন্যাশনাল ওপেন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন 94-95 এ। রবীন্দ্র মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবারও তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন 2004. সালে। এস, এস , বি তে চাকরী পেয়েছিলেন কিন্তু তার মা তাকে টোটোপাড়ার বাইরে যেতে দিতে চান না। তাই চাকরী করা হল না। পরবর্তীতে মহেশ্বর মূর্মূর সহযোগিতায় পুরমন্ত্রী দীনেশ ডাকুয়া সোস্যাল ওয়ারকার হিসেবে চাকরী দিলেন ধনীরামকে।
এখন টোটোদের স্বাস্হ্যকেন্দ্র, পোষ্টঅফিস, ব্যাঙ্ক, লাইব্রেরি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটা হাইস্কুল , রাস্তা, কালভার্ট ইত্যাদি হয়েছে। প্রথম মহিলা মাধ্যমিক পাশ করেন সূচনা টোটো। তিনি টোটো পাড়া আই, টি, ডি, পি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান। প্রথম মহিলা রিতা টোটো গ্র্যাজুয়েট হন ২০১০ সালে।ধনীরামের ছোট ছেলে ধনঞ্জয় টোটো ২০১৬ সালে প্রথম মাষ্টার ডিগ্রী করেন লাইব্রেরিয়ান সাইন্স নিয়ে। ধনীরামের দুঃখ পাশ করেও ছেলেমেয়েরা কম্পিটেটিভ পরীক্ষায় বিজয়ী হতে পারে না। তিনি টোটোদের জন্য সরকারি চাকরির বিশেষ সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন। সরকারি বাবুদের চোখে জঙ্গল , মায়ামমতা ভরা মায়ের কোল নয় , তারা জঙ্গলকে চেনে না বোঝে না। তাই তাদের কাছে জঙ্গল মানে ভয়, জন্তু জানোয়ারের ভয়, বিপদ , অনুন্নতি। এই ভুল ধারণার জন্যই তারা জঙ্গল কেটে কংক্রিটের ঘর,বাড়ি, রাস্তা, শহর বসায়। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে। এর ফলে নানান ধরনের নোংরামি হয়। একেই আজকাল “ উন্নয়ন” বলে। আজ জঙ্গল হারিয়ে, নদী, ঝর্ণা হারিয়ে টোটোদের সব রকম অভাব যেন ঘিরে ধরেছে।
ধনীরাম দুঃখ করে, বাংলাদেশ থেকে আসা জাপেনরা রেললাইনের ধার ঘেঁসে কত নুতন নুতন ঘর তৈরি করে বসেছে। তারা ইউনিয়ন করছে। হাজার হাজার বছরের জঙ্গল ধ্বংস করে জমি কেড়ে নিতে তাদের বাধে না। টোটোদের কত জমি আইনি- বেআইনি পথে চলে গেল জাপেনদের কব্জায়। অস্ত্রশস্ত্র, হানাহানি, মারামারিকে ওরা গণতন্ত্র বলে। তিনজন বয়স্ক টোটো মিলে ঠিক করলেন সরকারি আদব কায়দা মেনে আলিপুরদুয়ারের আদালতে কেস করা হবে। উত্তরবঙ্গে মেচ জনজাতির একজন মাত্র পাশ করা উকিল তপন বাবুকে বলা হল। তিনি লড়বেন টোটোদের হয়ে। উকিল বাবু বললেন এসব জমি টোটোদের ধানী জমি ছিল। আদালত প্রমান চাইলেন। বৃটিশ সরকারের দেওয়া তাম্রপত্র স্বাধীন দেশের বিট অফিসার গায়েব করে স্বাধীন দেশের নাগরিকত্বের গরিমা প্রকাশ করলেন। এইবার জাপেনদের লোকেরা তপনবাবুকে প্রাণনাশের হুমকি দিলে ভীত তপন বাবু সরে গেলেন। আইনের দেবীর তো চোখ বাঁধা! টোটোদের আইনি লড়াই এখানেই শেষ হল।
টোটোদের পরম্পরাগত গ্রাম পঞ্চায়েতের এখন আর কোন ক্ষমতা নেই। বর্গাদার জাপেন জাতিরা সরকারি কলকব্জা খাটিয়ে টোটোদের জমি- জায়গা দখল করে বসেছে। সরকার আইন করে বন্দুকওয়ালা পাহারাদার বসিয়ে একের পর এক জঙ্গলে টোটোদের ঢোকা নিষেধ করে দিচ্ছে। ধনীরাম দৃঢ় ভাবে বলে এসব হতে দেওয়া চলবে না। জমি আর জঙ্গলের উপর টোটোদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। নাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য তারা কেবল দাসত্ববৃত্তিই রেখে যাবে। নেতাদের তৈরি করা তালিকা ধরে টোটোপাড়ায় সরকারি পঞ্চায়েতের গম ও আর্থিক সাহায্য আসে। সে তালিকায় ধনীরামের নাম নেই। পরিবারে বাচ্চাদের অনাহার - অর্ধাহারের শুকনো মুখ গুলো দেখে সহ্য না করতে পেরে হাজির হয় মাদারীর পার্টি অফিসে। সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও টিটকিরি শুনে শূন্য হাতে ফিরে আসেন। আত্মগ্লানিতে মন ভারাক্রান্ত হয়। কেনই বা সে গিয়েছিল। স্ত্রী চম্পাকলি তাকে সাহস যোগায়। ধনীরাম তার সহযোগী কয়েকজনের সাথে বি ডি ও অফিসে দেখা করে বলেন যে তারা রিলিফের টাকা পায় নি। বি ডি ও জানালেন তিনি প্রতিকার করবেন। পরদিন দারোগা বাবু ধনীরামের সহযোগী , শনে টোটোর বিরুদ্ধে( মিথ্যে) ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে গ্রেফতার করা হলে টোটোপাড়ার মানুষরা ছুটে এলে পুলিসবাহিনী তাদের লাঠি মেরে ভাগিয়ে দিল। শনেকে হাজতে দেওয়া হল। ধনীরাম বুঝল এটাই তবে বি ডি ও সাহেবের প্রতিকার । অনেক চেষ্টা করেও কোথাও সুরাহা করতে না পেরে শেষে ধনীরামের পাঁচজন সহযোগী মিলে তাদের সুপারি আধাদামে বিক্রির চুক্তিপত্রে সই করে মাদারীহাট থানা থেকে শনেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এল। ধনীরামের মনে আগুন জ্বলে। প্রতিশোধ নয়, কিন্তু এই ভন্ডামির মুখোশ পরা অত্যাচার-অনাচারের মুখোশ টেনে খোলা প্রয়োজন।
“ কেন রে তোর দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়?
জয় অজানার জয়।
এই দিকে তোর ভরসা যত , ওই দিকে তোর ভয়।
জয় অজানার জয়।…”
ধনীরাম স্কুল জীবন থেকেই অনেক কবিতা লেখেন। ধনীরামের লেখা অনেক রম্য রচনা ছাড়াও আছে “ টোটো জনজাতির কথা” , “ধানুয়া টোটোর কথা মালা “ তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর লেখেন “ প্রিয়তমার স্বপ্নভূমি”। ২০২৫ শে জ্যোতির্ময় রায়ের সম্পাদনায় তার আরও একটি বই “ জিওলোজি পে ডিগ্রি অফ দ্যা টোটো কম্যুনিটি” প্রকাশিত হতে চলেছে। যিনি বইটি সম্পাদনা করেছেন তিনি বীরপাড়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রফেসর। ধনীরাম, টোটোদের বর্ণমালা তৈরি করে “ পদ্মশ্রী” পেয়েছেন ২৮শে জানুয়ারি ২০২৩। তাকে সাহায্য করেছেন টবি এ্যান্ডারসন অস্ট্রেলিয়ান লিঙ্গুয়িষ্টিক। এছাড়াও লিজা ডেভিডসন ব্যাঞ্জনবর্ন, স্বরবর্ণ , ধ্বনি ইত্যাদিতে সাহায্য করেছেন। ক্যাথরিনাও বর্ণমালা তৈরিতে সাহায্য করেছেন। কিন্তু ছবিগুলো ধনীরাম নিজেই এঁকেছেন। টোটো বর্ণমালা সম্পূর্ণ করতে ছয়মাস লেগেছিল। ২০১৮ সালে শেষ হয়। ধনীরাম একটা অভিধানও সংকলন করেন। আজ তার মা বাবার কথা খুব মনে পড়ে। বাবা একদিন সন্ধ্যেবেলায় ধনীরামের মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন “ তোকে নিয়ে আমার অনেক আশা রে ধানুয়া! তোর দাদুও ছিল পঞ্চায়েত মুখিয়া। আর টোটোপাড়ার জঙ্গলে তার সাথে বাঘের লড়াই হয়েছিল। বাঘও তাকে হারাতে পারেনি। তোর দাদু গেন্দ্রা টোটো সেই লড়াইতে জিতেছিল। সে গল্প আজও সবাই করে। তোকেও টোটোজাতির নাম উজ্জ্বল করতে হবে। তুই ভালো করে পড়াশোনা কর, এই লড়াইয়ে তোকে জিততে হবে“ ধনীরামের মনে হয় তার মা বাবা দিদিমা দাদু সবাই ওপর থেকে তাকে আশীর্বাদ দিচ্ছে। কিন্তু গ্রামের মানুষরা তাকে বলে এসব করে কি হবে? খাওয়া হবে না এই সব করে। গ্রামের লোকেদের এইসব তাচ্ছিল্য মূলক নানান কথা তাকে খুব দুঃখ দেয়। ছেলেমেয়েরা ভিনদেশে কাজ করতে যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার উন্নতি হচ্ছে না। তাদের সমস্যা মেটানোর চিন্তায় জর্জরিত হলেও মা, বাবা, দিদিমার আশীর্বাদ আছে। সেই দায়িত্বই তার কাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।
“যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে
মিলাব তাই জীবন গানে।।
……………………………….
বাজায় উষা নিশীথকুলে যে গীতভাষা
সে ধ্বনি নিয়ে জাগিবে মোর নবীন আশা।
ফুলের মতো সহজ সুরে প্রভাত মম উঠিবে পুরে,
সন্ধ্যা মম সে সুরে যেন মরিতে জানে।। “
*এখন ধনীরাম রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস , কলকাতায় গভর্নরের কাছে কয়েকটি দাবি পেশ করেন। ক্লাস 6 থেকে ক্লাস 10 পর্যন্ত CBSC বোর্ড এর স্কুল প্রয়োজন টোটোপাড়ায়। ছেলেমেয়েরা বাংলা বিভাগে পড়ে নম্বর খুব কম পায়। কোন প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হতে পারছে না। বসারই সুযোগ পায় না।
* পি জি টি বা পোষ্ট গ্রাজুয়েট ট্রেনিং সার্টিফিকেট ।
* খেলাধূলার উন্নয়ন।
* উড়াল পুল( বালি , পাথর প্রচুর আছে)
* বিধান সভায়, লোক সভায় আসনের প্রয়োজন। ( লোক সংখ্যা খুব কম বলে তাদের সমস্যা । কোনদিনই কেউ সামনে আনেননি। সমস্ত বর্ষাকাল জুড়ে মূল খন্ডের সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। এছাড়া খাদ্য, স্বাস্হ্য, শিক্ষা, খেলাধূলা ইত্যাদি বিষয় সামনে আনতে পারবে। টোটোপাড়ার ভৌগলিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সামান্যতম অংশ দুঃখ কষ্টের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর দুয়ার জেলার ভুটান সীমান্তে দুর্গম একটা ছোট্ট জনপদ টোটোপাড়া গ্রাম। টোটো ভারতের আদিম উপজাতির এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি । সারা পৃথিবীতে একমাত্র এই অঞ্চলেই এদের বাসস্থান। ২০০০ একর পরিসীমার মধ্যে ছয়টি গ্রাম - পঞ্চায়েত গাঁও, মণ্ডল গাঁও,সুব্বা গাঁও, মিত্রঙ গাঁও, পূজা গাঁও এবং ধুমচি গাঁও নিয়ে টোটোদের বাস হলেও এদের মধ্যে কিছু নেপালি, বিহারি, বাঙালি , মুসলিম আছে।
মাদারীহাট থেকে ২৪ কিমি দূরে অবস্হিত টোটোপাড়া গ্রাম। চারিদিকে পাহাড় ঘেরা এই ছোট্ট গ্রামটা পাহাড়ের ঢালেই অবস্হিত। জলদা পাড়া অভয়ারণ্যের গা ঘেসে বইছে খরস্রোতা তোর্সা নদী। মাদারীহাট থেকে ২৪ কিমি রাস্তা পার হতে হয় তিনটি নদী খাতের মধ্য দিয়ে। তিতি, বাংড়ি ও হাউড়ি। এছাড়া অনেক ঝোরা , উপঝোরা পার হয়ে জামতলা বাজার, হান্টা পাড়া চা বাগান, তারপর বাংড়ি নদী খাত পার হয়ে তিতি নদীর পাশের জঙ্গল পার হয়ে ( জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের অংশ ) হল্লা পাড়া আর বল্লাল গুঁড়ির রাস্তা ধরে হাউরি নদীর বিস্তীর্ণ পাথরের খাত পার হয়ে টোটো পাড়া পৌঁছন যায়।
পাহাড় থেকে এত পাথর নেমে আসে ,সে কারণে শীতকালেও এই নদী খাত পার হতে হয় বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে। অল্প জলের মধ্য দিয়ে পার হতেও পায়ের ওপর পাথর পড়তে পারে। টোটোরা বন্যজন্তু বাঁদরেরা কিভাবে লাফিয়ে পার হয় তা দেখে শিখেছে এই খরস্রোতা নদী লাফিয়ে পার হওয়ার কৌশল। একে বলে বাঁদর চাল। বালি , আর জল যেখানে , সেখানে পা ফেলতে হয় সাবধানে। কারণ পাথরের উপর পা পড়লে পাথরের বাড়ি খেতে হয়। তাই দেখে দেখে লাফিয়ে লাফিয়ে পার হতে হয়ে। ঝোরার জল নেমে যাওয়ার জন্য পাকা ড্রেন করা আছে। সেই জলের তীব্র গতিবেগের ভয়ংকরী শব্দ মনে এক অজানা আতঙ্ক ছড়ায়। ঐ জল গিয়ে মেশে তোর্সা নদীতে। টোটোপাড়ায় খুব বজ্রপাত হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা নদীতে পাথর কুড়িয়ে স্তুপ করে, পাথর ভাঙে। নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি যেতে গিয়ে ফেঁসে গেলে এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোদাল, শাবল দিয়ে নুতন রাস্তা তৈরী করে দেয়। আবার গাড়ি ঠেলেও দেয় সামান্য পয়সার বিনিময়ে।তবে পাড় ভাঙলে কোন উপায় থাকে না। ওরা ওই বালু পাথর তুলে দেয় ট্রাকে। ফলে নদীতে বড় বড় গর্ত হয়। তাই গাড়িতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে যেতে হয়। এত অসংখ্য ঝোরার সৃষ্টিও হাউরি নদী থেকেই। সারা বছরই যাতায়াতের কষ্ট কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে বর্ষায় একেবারেই বিচ্ছিন্ন থাকে টোটো পাড়া।
একমনে তোর একতারাতে একটি যে তার সেইটি বাজা—
ফুলবনে তোর একটি কুসুম , তাই নিয়ে তোর ডালি সাজা।।”
………………………………………………………………………
লোকের কথা নিসনে কানে, ফিরিস নে আর হাজার টানে,
যেন রে তোর হৃদয় জানে হৃদয়ে তোর আছেন রাজা—
একতারাতে একটি যে তার আপন-মনে সেইটি বাজা।।
ধনীরাম সবচেয়ে কষ্টকর কাজ করেছে। টোটো ভাষার লিপি আবিস্কার। করেছে। এখন একে ধরে রাখার জন্য সকলের সহযোগিতা অবশ্যই চাই।