Tuesday, August 4, 2026


 

মুনা 

অনলাইন শ্রাবণ  সংখ্যা ১৪৩৩


সম্পাদকের কথা 

ইংরেজি অগাস্ট মাস এলে এমন কোনও ভারতীয়কে পাওয়া যাবে না, যিনি একবারও স্বাধীনতার কথা ভাবেন না। আসলে মাসটা এরকমই। ভারতের স্বাধীনতা লাভের  দু`বছর আগে অবশ্য পৃথিবী দেখেছিল এক নির্লজ্জ্ব নরসংহার। এই মাসেই। যার কথা ভাবলে আজও লজ্জিত হই আমরা মানুষ হিসেবে। পৃথিবীর কলঙ্কময় সেই ইতিহাস মুছে ফেলার দায়িত্ব আমাদেরই। অথচ এই অগাস্ট মাসেই (অধিকাংশ বছরেই) আমরা রাখি বাঁধি হাতে। গাই ভালবাসার ও সৌহার্দ্যের জয়গান। অথচ সেই আমরাই আবার দূরে সরিয়ে রাখি আমাদের মধ্যে থাকা বহু মানুষকে। আজও আমাদের দেশে সেই মানুষেরা তাঁদের ন্যায্য অধিকারের জন্য লড়ে চলেছেন। কত কিছু থেকে বঞ্চিত তাঁরা আজও। তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট দিন ঘোষণা আর উদযাপনের মধ্যে আমাদের সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। তাঁদের জন্য সত্যিই কিছু করা দরকার। 

আপাতত দুটি বিষয় মুজনাইকে ব্যথিত করেছে। প্রতিবেশী অসম সহ উত্তর-পূর্ব ভারতে বিধ্বংসী বন্যায় যাঁরা সব হারিয়েছেন, তাঁদের কথা ভেবে মুজনাই অত্যন্ত মর্মাহত। মুজনাইয়ের সমবেদনা রইল তাঁদের জন্য। মুজনাই চেষ্টা করছে তার সীমিত সাধ্যের মধ্যে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে। দ্বিতীয় বিষয়টি শুধু ব্যথিত করেনি। বরং অনেক বেশি ক্রোধের সৃষ্টি করেছে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মরণীয় মানুষ আমাদের সকলের শ্রদ্ধার ও ভালবাসার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোসকে নিয়ে যে কু-কথন করে চলেছেন একদল ভুঁইফোড় মানুষ, তা আমাদের অধঃপতিত মানসিকতা ও সামগ্রিক অবক্ষয়ের ছবি। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে এই সমস্ত অসামাজিক মানুষগুলির বিরুদ্ধে শক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। সেটা না হলে আমাদের ক্রমশ বিশ্বাস কমবে। এত তাতে ক্ষতি হবে রাষ্ট্রেরই। 


অনলাইন শ্রাবণ সংখ্যা ১৪৩৩ 

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

 

 প্রচ্ছদ ছবি 

শ্রীমতী শমিতা রাহা, বেনারস  

সম্পাদক 

শৌভিক রায় 

প্রকাশক 

রীনা সাহা 

 


মুজনাই শ্রাবণ  সংখ্যা ১৪৩৩



  



 


পরিকল্পিত গনহত্যা ও আইনস্টাইনের একটি চিঠি                                                                        

মাল্যবান মিত্র

 

 

"ওরে হাল্লা রাজার সেনা , তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল !" এই বাক্যের  অনুধাবন ও আত্মীকরন একালের কিংবা অতীতের বেশিরভাগ শক্তিধর ক্ষমতাশালী মানুষেরাই করতে ব্যর্থ হয়েছেন নির্মম ভাবে। আর তাই এই পৃথিবীর বুকে ঘটে গিয়েছে দুটো বিশ্বযুদ্ধ , একদল ক্ষমতালোভী মানুষের মনোবাসনা চরিতার্থ করবার দাম দিতে হয়েছে পৃথিবীর অগণ্য মানুষকে এবং এই পরিকল্পিত  গণহত্যার ইতিহাস বেড়েই চলেছে।  

                                       

যতদিন পৃথিবীতে যুদ্ধ হবে, ততদিন একটি ঐতিহাসিক  চিঠির গুরুত্ব  বজায় থাকবে।  চিঠিটির প্রাপক আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট এবং প্রেরক হিসেবে সাক্ষর করেছিলেন আপেক্ষিকতাবাদ তত্বের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন।   যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে রুজভেল্ট  তাঁর যুদ্ধসচিব হেনরি  স্টিমসন  কে   উদ্দেশ্য করে বলতে হয়েছিল সেই অমোঘ উক্তি "পা ! দিস রিকোয়ার্স অ্যাকশন!"

                                     

মাত্র ষোলো বছর বয়েসে সামরিক আইনের জাঁতাকলে পরে বুদাপেস্ট টেকনিক্যাল একাডেমির ছাত্র লিও সিলার্ড  প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিকবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ; যুদ্ধের প্রতক্ষ্য রূপ ও সামরিক কর্তাদের অমানুষিক ব্যবহার সিলার্ডকে আজন্ম যুদ্ধ বিরোধী করে তুলেছিল।  প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি বুদাপেস্ট থেকে বার্লিনে চলে আসেন ও চার নোবেল প্রাইজ প্রাপক অধ্যাপক আইনস্টাইন , ফন লে , ম্যাক্স প্লাঙ্ক ও নেনর্স্ট এর প্রভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন  বিজ্ঞানসাধক হিসেবে।    হিটলার যখন জার্মানির ক্ষমতা দখল করে , সেসময় বিখ্যাত নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট লিও সিলার্ড , কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউটে অবৈতনিক লেকচারার হিসেবে অধ্যাপনা করতেন ।  ১৯৩০ -এর দশকে নাৎসি এবং ফ্যাসিবাদী দমন থেকে বাঁচতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে এসেছিলেন সিলার্ড ।

                                              

জার্মানিতে থাকার সুবাদে সিলার্ড বুঝতে পেরেছিলেন , হিটলারের ন্যাক্কারজনক “Rassenhygiene” বা  Racial Hygiene  ও ‘ Holocaust ’বা ইহুদি বিতারন এর মতো দমননীতির ফলস্বরূপ সেসময়ের  বহু বরেণ্য বিজ্ঞানসাধক জার্মানি থেকে চলে গেলেও বাধ্য হয়ে রয়ে  গেছেন হাইজেনবার্ক , অটো হ্যান , ফন লে , থেকে গেছেন  গণিত সাগর   ডেভিড হিলবার্ট এর মতো কিছু বিজ্ঞানী  যারা পরমাণু শক্তি কে কাজে লাগিয়ে সবার আগে তৈরী করে ফেলতে পারেন অত্যন্ত্য শক্তিশালী একটি অস্ত্র “Atom Bomb”। লিও সিলার্ড , এনরিকো ফার্মি   ইউজিন উইগনার   এডওয়ার্ড টেলর এবং  জর্জ গ্যামো এই সমস্ত সহ- বিজ্ঞানীদের   সাথে আলোচনা করে ঠিক করলেন পারমানবিক শক্তি ব্যবহার করে যে দানবিক অস্ত্র তৈরী করা সম্ভব সেটা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কে জানাবেন এবং এই মহাশক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করবেন। তাদের ধারণা হয়েছিল  জার্মান বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বোমা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম  তৈরি করে ফেললে ,  হিটলার এই অবিশ্বাস্য শক্তিশালী বোমা দখল করে  পৃথিবী দখল করতে উদ্যত হতে পারেন।   হিটলারের মতো একজন যুদ্ধলোলুপ মানুষের হাতে এই অস্ত্র পৌঁছলে পৃথিবীর অবস্থা কি হবে সেটা নিয়ে সিলার্ড সবচাইতে বেশি  চিন্তিত ছিলেন।  তিনি ইউজিন উইগনার কে সঙ্গে নিয়ে লং-আইল্যান্ডে আইনস্টাইনের নিভৃতবাসে পৌঁছলেন এবং নিজের শিক্ষক , ইউনিফাইডফিল্ড তত্ত্বে বিভোর আইনস্টাইনকে অবহিত করলেন তৎকালীন সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান আবিষ্কারের  অপব্যবহার করার সম্ভাবনা যা  পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম।  চিঠি লেখা হল, আইনস্টাইন প্রেরক হিসেবে সাক্ষর করলেন ঐতিহাসিক চিঠিটিতে।

                                                         

রুজভেল্টকে অবহিত করার জন্য লেখা হয়েছিল   “সাম্প্রতিক গবেষণায় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ইউরেনিয়াম পরমাণুতে চক্রাকার আবর্তন সৃষ্টি করা সম্ভব ; যা থেকে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিধর ও ধ্বংসাত্মক বোমা তৈরি করা যেতে পারে। জার্মানিও একই বিষয়ের উপর কাজ করছে”। বলা আবশ্যক, আইনস্টাইনের চিঠি রুজভেল্টের হাতে পৌঁছাবার ১৫ দিন আগেই জার্মানিতে “ইউরেনিয়াম প্রজেক্ট”-এর কাজ শুরু হয়েছিল। আইনস্টাইন চেকোস্লোভাকিয়া থেকে জার্মানির ইউরেনিয়াম সংগ্রহ সম্পর্কে সতর্কবাণী এবং কানাডা ও কঙ্গোর ইউরোনিয়াম খনি সম্পর্কে রুজভেল্টকে আলোকপাত করেছিলেন এই চিঠিতে। এই গুরুত্বপূর্ণ চিঠি যাতে বেহাত না হয়ে যায় আলেকজান্ডার শ্যাক্স এর হাতে পাঠানো  হল এই চিঠি । 

                                          

দীর্ঘ  আড়াই মাসের চেষ্টার পর ১১ ই  অক্টোবর ১৯৩৯ , ওয়াল স্ট্রিট এর অর্থনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাঙ্কলিন  রুজভেল্টের  দীর্ঘদিনের বন্ধু ,  আলেকজান্ডার শ্যাক্স,  আলবার্ট আইনস্টাইনের আগস্টে লেখা চিঠিটি  নিয়ে আলোচনা করার জন্য হোয়াইট হাউসে  রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার অনুমতি পেলেন। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের গূঢ়তত্ব সমন্বিত এই চিঠি প্রভাব ফেলতে পারেনি প্রেসিডেন্টের মননে, তিনি আইনস্টাইনের সম্মান রক্ষার্থে পুরো চিঠিটি শুনেছিলেন মাত্র, চিঠির বক্তব্যের সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে ধারণাই করতে পারেননি  তদানীন্তন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, শুধুমাত্র বিজ্ঞানের একটি নতুন আবিষ্কার-এর খবর হিসেবে গ্রাহ্য করেছিলেন,  আসলে বিখ্যাত লেখক নারায়ণ সান্যালের ভাষায় "বিজ্ঞান তখনো রাজনীতির নাগপাশে সম্পূর্ণ আবদ্ধ হয়নি"। পরের দিন শ্যাক্স আবার দেখা করেন প্রেসিডেন্টের সাথে এবং নেপলিয়ানের  আধুনিক অস্ত্রের ব্যাবহার ও প্রথম  বাস্প-চালিত জাহাজ ব্যাবহারের  ঘটনা মনে করান রুজভেল্টকে এবং মনে করান  এইসব পদক্ষেপ এর সুদূরপ্রসারি ফলাফল যা   পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে  বাধ্য করেছিলো ।       

                                                         

রুজভেল্ট  ১৯  অক্টোবর, ১৯৩৯ এ চিঠির উত্তরে  আইনস্টাইনকে লিখেছিলেন যে, তিনি ইউরেনিয়াম অধ্যয়নের জন্য  বেসামরিক এবং সামরিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি কমিটি তৈরী করছেন । চিঠিটির বক্তব্য অনুধাবন করে  রুজভেল্টে ১৯৩৯  সালের অক্টোবরে ইউরেনিয়াম গবেষণার অনুমোদন দেন,  এই বিশ্বাসের ভিত্তিতে যে,  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিটলারকে "অত্যন্ত শক্তিশালী পরমাণু বোমা"  একতরফা দখলে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারে না,  যা শেষ পর্যন্ত  প্রতিষ্ঠা করেছিল  "ম্যানহাটন প্রকল্পের" , যেখানে পৃথিবীর প্রথম দুটি পরমানু  বোমা  ‘লিটল বয়’ ও ‘ফ্যাট ম্যান’ তৈরি করা হয়েছিল। ম্যানহাটন প্রকল্পের  সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত করা হয় ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যান্ডার্ড এর পরিচালক জেনারেল লেসলি গ্রোভস্ এর হাতে,এবং বেসামরিক কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ করা  হয় আমেরিকান  পদার্থ বিজ্ঞানী ওপেনহেইমারকে। 

                                            

আজো পৃথিবীতে যুদ্ধ হচ্ছে পারমানবিক শক্তির ব্যাবহার , যোগান ও তাকে নিয়ে করা ব্যবসার রাজনৈতিক অঙ্কের যোগবিয়োগের ভিত্তিতে।  কি কারনে এই যুদ্ধ তা বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের কাছেই অজানা ;  তবু যুদ্ধের ফলভোগ করতে হচ্ছে তাঁদের বর্তমান প্রজন্মকে , হয়ত  ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দিতে হবে এর মাসুল! যেমন হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণুবোমা বিস্ফোরণের পর ৭০ বছর পার হয়ে গেছে তবু ইউরেনিয়াম বোমার তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব হিসেবে বিকলাঙ্গ শরীর - অপরিণত মস্তিস্ক নিয়ে  আজো জাপানে  জন্মাচ্ছে  বহু  শিশু। “ Budapest Memorendam On Security Assurance”   ও   “Treaty on the Non-Proliferation of Nuclear Weapons”  সই করা ইউক্রেন রাশিয়ার উপর আর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না , ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার দেয়া নিরাপত্তা আশ্বাস থেকে বেরিয়ে  NATO  (The North Atlantic Treaty Organization) এর হাত ধরতে চাইছে ইউক্রেন। আর বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহৎ পারমানবিক শক্তির যোগানদার রাশিয়ার অন্যতম  আপত্তি সেখানে। অন্যদিকে  দেশের সীমানা বাড়ানোর চেষ্টা থেকে নিজেদের নিঃস্পৃহ রাখার চুক্তি অমান্য করে ইউক্রেন এর  পার্শ্ববর্তী ছোট জনপদ দখলে উদ্যত হওয়াও এই নরমেধ যজ্ঞর আরেকটি প্রধান কারণ।    

                                                                   

প্রাত্যহিক সংবাদপত্রের পাতায় রোজ ছাপা হচ্ছে যুদ্ধের  ছবি যা সাধারণ জনমানসের  মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হানার পক্ষে যথেষ্ট।  , প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসংখ্য মানুষ ।  এই বিশ্ব অনেকগুলি যুদ্ধ দেখেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তৈরী "ম্যানহাটান প্রজেক্টের" ফসল শুধু আধুনিক যুদ্ধের  খোলনলচে বদলে দেয়নি, স্থায়ী বদল ঘটিয়েছিল যে কোনো দেশের নিরাপত্তা ভাবনা, রণনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র নীতি, সামাজিক,  রাজনৈতিক এবং  অর্থনৈতিক অবস্থানের। অতীতের মতো  বর্তমানেও বিজ্ঞান কে আশীর্বাদ হিসেবে ব্যাবহার না করে অভিশাপ রূপে ব্যাবহার করার চেষ্টা  দূরদর্শী বিজ্ঞানসাধক  লিও সিলার্ড-এর  সমস্ত  অশঙ্কাকে  সত্যি প্রমাণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আইনস্টাইনের সাক্ষর করা ঐতিহাসিক চিঠিটির সঠিক ও যথার্থ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের বেশিরভাগ ক্ষমতাশালী দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব  প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তবে আশা রাখি  আর কোনো  ‘লিটিল বয়’ বা ‘ফ্যাট ম্যান‘ আছ্ড়ে পড়বে না কিয়েভের কোনো গির্জায়, অতীতে বহু যুদ্ধ দেখা ক্রিমিয়ার প্রান্তরে কিংবা "কালো সমুদ্রের" তটভূমিতে, বরঞ্চ ক্রিমিয়ার পুনরায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠা মাটিতে নতুন করে আবার দেখা মিলবে অনেক  "লেডি উইথ দি ল্যাম্প" ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের।


 

নাগাসাকি দিবসঃ সভ্যতার বধ্যভূমি 

                            অভিজিৎ সেন 

এক একটি দিবস বহমান সময়ের ক্ষুদ্র একক। একটি  দিবসের বৃত্ত পূর্ণ হয়ে ওঠে অজস্র ঘটনার কোলাজে। চিত্রনাট্যর মতই জীবন-চিত্রও আবর্তিত হয়ে চলে। বিবেকবান, সমাজ সচেতন, মানবতাবাদী, সংহতিতে বিশ্বাসী মানুষেরা অন্ত্যত হিংসা, বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা ও পাশবিকতাকে দূরে রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চায় এবং অপরকে উৎসাহিত করে। তাই সভ্যতার ইতিহাস মানুষের কৃতির ইতিহাস। অতীতের ঘটনা আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করে। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে 
বর্তমান সময় পর্যন্ত ছোট বড় ঘটনার গাঁথামালা হলো ইতিকথা। ইতিহাসের বহু ঘটনায় আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে গেছে । পূর্বার্জিত জ্ঞান বা 'স্কিমা'কে মনে রেখে মানুষ সম পর্যায়ের কোন কাজ করার পূর্বে সাবধান হয়ে ওঠে । মানুষ সেই জ্ঞানকে অভিজ্ঞতা কে মনে রেখে ভুল-ঠিক,উচিত-অনুচিত,কর্তব্য-অকর্তব্য বিষয়টি স্থির করে। সমগ্ৰ বিশ্বে বিভিন্ন দিবস পালন করা হয় যা বিশ্ববাসীকে আয়নার সামনে দাঁড়করায়। যেন আমাদের প্রশ্ন করে আমরা মানবতা, দয়া, সহানুভূতি, সমানুভতি, প্রেম, সৌভ্রাতৃত্ব, মৈত্রী, স্বাধীনতা চাই না হিংসা, বিদ্বেষ, দাঙ্গা, যুদ্ধ, হত্যা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, শোষণ, বিকৃত মানসিকতা এবং অমানবিকতা চাই। যেখানে পারস্পরিক আলোচনা, শান্তি ও সহযোগিতা সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করবে এবং হিংসার আগুন সভ্যতাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে । যে প্রগতি সকলের জন্য নয় সেখানে সমৃদ্ধি আসে না। সমাজে মূল্যবোধ, মানবতা ও বিবেকের অবক্ষয় ঘটে। তাই "বিশেষ দিবস" পালন আমাদের সেকথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বারে বারে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি 'আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস', ৫ই জুন 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস', ৮ই মার্চ 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস', ২৪ শে অক্টোবর 'জাতিসংঘ দিবস'। তেমনই কিছু কলঙ্কিত দিবসও আছে। 

২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নির্দেশে ষাট লক্ষ ইহুদি নিহতের ঘটনায় পালিত হয় ২৭ শে জানুয়ারি 'আন্তর্জাতিক হোলোকাস্ট স্মরণ দিবস'। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় ও ৯ই আগস্ট নাগাসাকি শহরে আমেরিকা পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই ভয়াবহ দিনের স্মরণে পালিত হয় এই দুই তারিখে যথাক্রমে 'হিরোশিমা ও নাগাসাকি স্মরণ দিবস' । ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমায় এবং ১১টা ২ মিনিটে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তাই এই দিনে সময়ে সমগ্ৰ জাপানে সাইরেন বাজিয়ে সকলে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। Peace Memorial Park এ বিশ্বনেতাদের উপস্থিততে পারমাণবিক অস্ত্র চিরতরে নিষিদ্ধ করার এবং পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে "শান্তি ঘোষণা" পাঠ করা হয় প্রতিবছর। মৃত শিশুদের স্মরণে কাগজের সারস তৈরি করা হয়। রাতে নদীতে মোমবাতি জ্বালিয়ে কাগজের লন্ঠন ভাসানো হয় ।"শহরের মাঝখানে সূর্য নেমে এলো/বৈশাখের নয়, শ্রাবণের নয়/ এটি অদ্ভুত সূর্য রক্তাভ/ পঙ্গু করে দিয়ে গেল হাজার হাজার প্রাণ ।"
       আমেরিকা কেন জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ 
করেছিল, এর পেছনে কোন কোন সামরিক, রাজনৈতিক ও
কৌশল কাজ করেছে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। 
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে জার্মানি ও ইতালি ২য় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে । ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধের ভয়াবহ চিহ্ন ইউরোপ জুড়ে। কঙ্কালের মতো রূপ ধরেছে ইউরোপ। জাপান ঘোষণা করেছে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবে। তাদের 'কামিকাজি' আত্মঘাতী বিমানে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মিত্রপক্ষের (ইংল্যান্ড,ফ্রাস,আমেরিকা, রাশিয়া, চীন) সৈন্য ধ্বংস করে চলেছে।'Potsdam Declaration' এর মাধ্যমে  জাপানকে মিত্রপক্ষ নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে বলেছে । ইউরোপে যুদ্ধ শেষ। এশিয়ায় চলছে। আমেরিকার যুক্তি, যুদ্ধ থামাতে হলে জাপানের মূল ভূখণ্ডে সেনা নামাতে হবে তাতে মিত্রপক্ষের লক্ষ লক্ষ সেনার মৃত্যু হবে পাশাপাশি নিরপরাধ জাপানি নাগরিকও । তাই পারমাণবিক বোমা ফেলে ব্যাপক ক্ষতি সীমিত করে। তাদের আত্মপক্ষসমর্থনের যুক্তিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মানতে নারাজ। কারণ জাপানের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বোমা নিক্ষেপের প্রয়োজন ছিল না। এর পেছনে ছিল অন্য কিছু কারণ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মাঞ্চুরিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। জাপানের বুকে পারমাণবিক বোমা ফেলে আমেরিকা নিজেদের ক্ষমতা পৃথিবীকে দেখালো,যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বড় একটি অংশ দখল না করে নেয়। এছাড়া সোভিয়েত পূর্ণশক্তিতে যাতে এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত দেশের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হয় । সেই কারণেই কোটি কোটি ডলার খরচ করে " ম্যানহাটন প্রজেক্ট" পরিচালনা করে ইউরেনিয়াম ভিত্তিক 'লিটিল বয়' এবং প্লুটোনিয়াম ভিত্তিক 'ফ্যাট ম্যান' নামকরণ যুক্ত পারমাণবিক বোমা ফেলে মানব সভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত বিপজ্জনক, নৃশংস "পারমাণবিক যুগে"র সূচনা করে আমেরিকা। শোনাযায় ১৯৩৯ সালে জার্মানির এলবার্ড আইনস্টাইন ও হাঙ্গেরির পদার্থবিদ লিও জিলার্ড রুসভেল্টকে গোপনে চিঠি লিখে ন্যাসি জার্মানির গোপন বোমা তৈরির খবর জানায় এবং তাদের দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরিতে যুক্ত হতে বলেন । পদার্থ বিজ্ঞানী J.Robent Oppenheimer নেতৃত্বে 'Manhattan Project' পরিচালিত হয়, আমেরিকার নিউইয়র্ক এলাকায়। তাঁকে 'Father of the Atomic Bomb' বলা হয়। এই প্রজেক্টে খরচ হয় ২০০ কোটি ডলার । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী ছিল ইউনাইটেড কিংডম এবং কানাডা। যথাক্রমে বিজ্ঞানী ও কাঁচামাল দিয়ে সাহায্য করেছে। এক লক্ষ ত্রিরিশ হাজার কর্মী কাজ করে। ১৯৪৫ সালের ১৬ ই জুলাই নিউ মেক্সিকোর আলমাগোরডা মরুভূমিতে 'Trinity' কোড নামে সফলভাবে পরীক্ষা হয় ।পারমাণবিক বোমাটি যেন বলে--"Now I become Death,the destroyer of worlds" যদিও পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাত্মক রূপ দেখে পরবর্তী 
কালে আইনস্টাইন অত্যন্ত লজ্জিত, দুঃখবোধ করেছিলেন। 

                      ২০২৬ পর্যন্ত ১২১৮৭ টি পারমাণবিক বোমা পৃথিবীর কয়েকটি দেশে আছে । রাশিয়ার ৫৪৫৯ থেকে ৫৫৪০টি, আমেরিকায় ৫১১৭ থেকে ৫২৪৩টি,চীনে ৬০০ থেকে ৬২০টি,ফ্রান্সে ২৯০টি, ইংল্যান্ডে ২২৫টি,ভারতে ১৯০ টি, পাকিস্তানে ১৭০টি, ইসরাইলে ৯০টি এবং উত্তর-কোরিয়ায় ৫০টি । দেখা যাচ্ছে রাশিয়া ও আমেরিকা ৮৩ থেকে ৮৬ শতাংশ পরমাণু অস্ত্র বহন করে। বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ড ও তুরস্কে NATO চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা সেখানে তাদের সামরিক ঘাঁটিতে কিছু পারমাণবিক বোমা মজুত রেখেছে।১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ৩২ টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল North Atlantic Treaty Organization বা NATO । ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা একমাত্র দেশ নিজেদের পরমাণু অস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। ১৯৯১ সালের ২৬ শেষ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের বিপুল পারমাণবিক অস্ত্র চলে যায় রাশিয়ার হাতে । সোভিয়েত ভেঙে গেলে আমেরিকা ও রাশিয়ার 'ঠান্ডাযুদ্ধ'ও শেষ হয়। রাশিয়া সহ ১৫ টি দেশের জন্ম হয়(ইউক্রেন, জর্জিয়া,কাজাখস্তান,আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান,উজবেকিস্তান, বেলারুশ,লাটাভিয়া ইত্যাদি) এতে রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে অথচ হাজার হাজার পরমাণু বোমা পড়ে আছে তাদের ঘরে। ১৯৯৩ সালে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে কুড়ি বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এই চুক্তি চলে। দীর্ঘ কুড়ি বছরে রাশিয়া প্রায় কুড়ি হাজার পারমাণবিক বোমা চিরতরে নষ্ট করে। ৫০০ মেট্রিকটন উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করে এবং তার জ্বালানী আমেরিকাকে‌ দেয়।এর জন্য রাশিয়া ১২০০ কোটি ডলার বা ১২ বিলিয়ন লাভ হয়। ভেঙে পড়া অর্থনীতি সচল হতে সাহায্য করে। 'Megatons to Megawatts' রূপান্তরিত হয়ে আমেরিকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০% এখান থেকেই আসে কুড়ি বছরে।

                  অর্থাৎ পারমাণবিক বোমাকে ধ্বংস করে তাকে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা যায় । তবে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী । কারণ এর ভেতরের বিপদজনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়াম পিটিয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করা যায় না। Strategic Arms Reduction Treaty হয় ১৯৯১ সালের ৩১ শেষ জুলাই আমেরিকার সঙ্গে USSR এর মধ্যে,সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পাঁচ মাস পূর্বে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ এবং ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচেভর মধ্যে। ঠিক হয় ২৫ থেকে,৩০ শতাংশ অস্ত্র উভয়ে কমিয়ে ফেলবে । ২০০৯ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় । New star হলো start-1 চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১০ সালের ৮ই এপ্রিল চুক্তি করা হয়। New Start কার্যকর হয় ২০১১ থেকে। স্বাক্ষর করেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবমা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ । ২০২১‌ সালে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৬ এর ৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত । তবে ২০২২ সালের ২৪ শেষ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে 'বিশেষ সামরিক অভিযানে'ঘোষণা করেন ও পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করে দেন, বর্তমানেও চলছে। বিবাদ সৃষ্টি হয় ২০১৪ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনের 'ক্রিমিয়া দ্বীপ' দখল করার মধ্যদিয়ে। বর্তমানে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নানাভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার  প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতদিন একচেটিয়াভাবে এই অধিকার ভোগ করে এসেছে আমেরিকা। বর্তমানে রাশিয়ার পাশাপাশি চীন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্পর্ধা অর্থনৈতিক ভাবে,সামরিক ভাবে দেখাতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়া কোন প্রতিবন্দকতা তোয়াক্কা না করে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে চলেছে। বর্তমানে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করে নিয়েছে কী না পৃথিবীবাসীর কাছে প্রকাশ করে নি তবে তাদের কাছে ইউরেনিয়াম আছে এটা সত্য । ইরান ইসরাইলের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে নিজে সরাসরি এতদিন 
যুদ্ধ করে নি,'ছায়াযুদ্ধ' চালিয়ে গেছে হিজবুল্লাহ,হামাস,হুতির মতো আন্তর্জাতিক স্তরে নিষিদ্ধ সসস্ত্র সংগঠনগুলোকে অর্থ, অস্ত্র সাহায্য করে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হয়। তার পূর্বে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভালো ছিল। ক্ষমতা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হাতেই আসার পর ইরানের চোখে আমেরিকা 'গ্রেট শয়তান'এবং ইসরায়েল 'অবৈধ রাষ্ট্র' বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে ইরানের 'হরমুজ' প্রণালীতে  তৈলবাহী জাহাজ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চলাচলে ইরানের  প্রতিবন্ধকতার কারণে আমেরিকা ও ইসরাইল এবং ইরান যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গেছে। যার প্রভাব সমগ্ৰ বিশ্বের অর্থনীতিতে পড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শত্রুতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর স্থায়ী অশান্তি সৃষ্টি করে চলা পারস্পরিক সহযোগিতা বদলে দেশগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতা, চীনের তাইওয়ান দখলের পরিকল্পনা, উত্তর  আফ্রিকার দেশগুলোর অভাব, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর  বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অবস্থা সৃষ্টি করা,সবল দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্ৰাসনের সুকৌশলে দুর্বল দেশগুলির আভ্যন্তরের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ, ইসরাইলের অস্তিত্বের সংকট, আমেরিকার পরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উপর চীন, রাশিয়া ও ভারতের প্রভাব বিস্তারের প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্বে ছোট বড়ো অমঙ্গলকর অমানবিক ঘটনা পারমাণবিক যুদ্ধের দিকেই কী মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে না ?

        শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চাইলেই পরমাণু বোমাগুলোকে ধ্বংস করে মানব সভ্যতার উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে। পরমাণু অস্ত্র নষ্ট করার প্রথম ধাপ হলো-- বোমাটির মুখ (Warhead) থেকে মূল পরমাণু অংশটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলাদা করা হয়। রোবট ও বিশেষজ্ঞদের নিখুঁত সমন্বয়ে বোমার চারপাশের ইলেকট্রনিক্স তার,ফিউজ এবং সাধারণ বিস্ফোরকগুলি (conventional Explosives) একে একে খুলে ফেলা হয়। প্রথম ধাপকে বলা হয় Dismantling বা অস্ত্র খুলে আলাদা করা। আমেরিকার প্যান্টেক্স প্ল্যান্ট, রাশিয়ার মায়াকে প্ল্যান্ট ও ওজাক্স শহরে এই কাজটি হয়।
           
দ্বিতীয় ধাপে Core Extraction বা তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বের করে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বোমার বিপদজনক  অংশ কেন্দ্র বা Core যা মূলত প্লুটোনিয়াম--২৩৯(239pu) বা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU বা Highly Enriched  Uranium) দিয়ে তৈরি। বোমাটি খোলার পর পারমাণবিক  জ্বালানিটুকু বের করে সুরক্ষিত পাত্রে রাখা হয়। 

                  তৃতীয় ধাপে Downblending বা জ্বালানি ব্যবহারে অযোগ্য নিষ্কাশিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোন বোমা তৈরি করা না যায় তার জন্য রাসায়নিক ও পারমাণবিক রূপের পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। উচ্চ সমৃদ্ধ  "ইউরেনিয়াম" যা শূন্য শতাংশ খাঁটি থাকে তাকে নিম্নসমৃদ্ধ  ইউরেনিয়াম এর সঙ্গে মেশানোর ফলে এটা বোমা তৈরির উপযোগী থাকেনা। তখন এটাকে মানব কল্যাণে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু "প্লুটানিয়ামকে" ধ্বংস করা কঠিন। সাধারণত অন্য কোন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সাথে মিশিয়ে কাঁচ বা সিরামিকের ব্লকের ভেতর আটকে দেওয়া হয় বা Vitrification করা হয় । যাতে এর থেকে অন্য কোন অস্ত্র তৈরি না হয় ।

                  চতুর্থ পর্যায় হল Waste Storage বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ সংরক্ষণ--যে অংশগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে না সেগুলোকে মাটির গভীরে  ভূকম্পমুক্ত সুরক্ষিত পাথরের গুহায় বা Deep Geological  Repository যে শত বৎসর বা তার অধিক সময়ের জন্য 'সিল' করে রেখে দেওয়া হয়। যাতে এই তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি না করতে পারে ।

                  পারমাণবিক বোমার ক্ষতিকারক উপাদান গুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে মানবজীবনে মঙ্গলজনক কাজে ব্যবহার করা যায় যেসব ক্ষেত্রে---(১) পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনে (২) ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করতে, থাইরয়েড থেরাপিতে, শরীরের ভেতরে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, রক্ত সঞ্চালন, হৃদয় ও মস্তিষ্কের অবস্থা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার করা যায়। (৩) মহাকাশ অভিযান ও দূরবর্তী মিশনে রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেক্ট্রনি জেনারেটর এর সাহায্যে তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় । নাসার ভয়েজার, কিউরিওসিটি রোভার,  পারসিভারেন্স রোভার এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি, মঙ্গল অভিযানে ও গভীর মহাকাশে কাজ করা হয়েছে। (৪) উচ্চ ফলনশীল বীজ এর সাহায্যে উৎপাদন সম্ভব, জিনগত পরিবর্তন করে। খাদ্য সংরক্ষণ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বিমান, সেতু বা জলের নীচে বড় পাইপলাইনের ধাতব অংশে অদৃশ্য ফাটল আছে কিনা তা পরীক্ষা করা, ভূগর্ভস্থ জলের সনাক্তকরণ এর দ্বারা সম্ভব। 

                 তুলনামূলক গরিব দেশের পক্ষে বিলিয়ন ডলার খরচ করে ঐতিহ্যবাহী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে এর সমাধান হল Small Modular Reactors যার খরচ কম, নিরাপদ ও সহজ পরিবহনযোগ্য। Thermal energy কে ব্যবহার করে সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করা সম্ভব। আফ্রিকার শুষ্ক দেশে, মধ্যপ্রাচ্যের মরুদেশে করা হয়। উন্নত দেশগুলো নিজেদের খরচায় গরীব দেশে thermal plant তৈরি করে‌ তাদের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধা দিতে পারে।

                   তবে পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল । যেসব দেশে ঘন ঘন অভুত্থান হয়, গৃহযুদ্ধ চলছে, সন্ত্রাসবাদি গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি আছে যেমন ইয়েমেন, সাউথ সুদান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক প্রভৃতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি চলে এলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। গোটা বিশ্বে ভয়াবহ ধ্বংস নেমে আসবে। পারমাণবিক বোমা কোন সাধারণ বোমা নয়,এটা মহা বিনাশের অন্যতম হাতিয়ার, যা ইতিমধ্যেই মানুষ অর্জন করেছে। বিজ্ঞানের এই প্রযুক্তিকে অসৎ ভাবে ব্যবহার করলে তার পরিণতি হবে ভয়ানক। হিরোশিমা ও নাগাসাকি পৃথিবীর কাছে উদাহরণ হয়ে আছে। পৃথিবীতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য অর্থ ও মূল্যবান সময়কে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত, তবেই আমরা প্রকৃত সভ্য বলে বিবেচিত হবো। না হলে --
  "ধ্বংস দাঁড়িয়ে তোমার ঘরের দুয়ারে/অগণিত পরমাণু বোমা বুকে পৃথিবী চলেছে ঘুরে/নিশি স্বপ্নে আঁতকে ওঠে পৃথিবী রোজ/অগণিত হিরোশিমা অগণিত নাগাসাকি হতে পারে মুহূর্তে/ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানচিত্রে ! "


 

লাল মাটির কান্না

কাকলি ভদ্র

"লাল মাটিতে ধুলো ওড়ে,
মাদল বাজে সাঁঝে,
হামদের এই পুরুলিয়া গো
বুকের মাঝে বিঁঝে।"
পুরুলিয়া মানেই আকাশ-বাতাস জুড়ে এক অদ্ভুত অরণ্য-আদিমতা। পুরুলিয়া মানেই বসন্তে আগুন-রাঙা পলাশ আর বর্ষায় ধুয়ে যাওয়া লাল মাটির সোঁদা গন্ধ! এই রুক্ষ অথচ রূপবতী প্রকৃতির বুকে তিরতির করে বয়ে চলেছে এক অনন্য জীবনধারা... যা আদিবাসী জীবনের মেঠো সুর এবং ছৌ নাচের এক অনন্য মেলবন্ধন।
প্রকৃতির পরম স্নেহে লালিত এখানকার ভূমিপুত্র সাঁওতাল বা ‘হরকো’দের যাপনচিত্র। পাহাড়, অরণ্য আর নদীর নিবিড় বাঁধনে রচিত হয়েছে বেঁচে থাকার চিরন্তন ছন্দ। প্রকৃতির সাথে এই আত্মিক নিবিড়তারই এক অপরূপ প্রকাশ তাদের ‘ওড়াঃ’ অর্থাৎ মাটির ঘরগুলোর... দেওয়ালে দেওয়ালে নিখুঁত আলপনার কারুকাজ যা অনায়াসে হার মানায় যেকোনো শহুরে শিল্পকলাকে। অরণ্য-পাহাড়ের এই শাশ্বত মায়াই যেন পূর্ণতা পায় তাদের প্রাণের উৎসব করম আর সোহরাইয়ের আঙিনায়।ধামসা-মাদলের সেই আদিম যুগলবন্দি শান্ত বাতাস চিরে যখন ছন্দ তোলে, ঠিক তখনই পুরুলিয়ার ধুলোমাটি মেতে ওঠে এক আদিগন্ত উৎসবে। সাঁওতাল ছেলেরা পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, কোমরে হাত দিয়ে বীরদর্পে আসরে নেমে পড়ে। ঢোল আর মাদলের ছন্দে বাতাসে ভেসে আসে নাচের খাঁটি বোল...
"তা-ধিন-তা, তা-ধিন-তা!
ধিন-তাক-ধিন, ধিন-তাক-ধিন!!!"

ঢোল-ধাঁসার ধমক আর সানাইয়ের সুরে মেতে উঠেছেন শিল্পীরা। রঙিন মুখোশের আড়ালে যখন তাঁরা গোলাকার মঞ্চে ক্ষিপ্র গতিতে লাফিয়ে ওঠেন, তখন মনে হয় এক টুকরো মাঠাবুরু পাহাড় যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তাঁদের পায়ের জাদুকরী 'উলফা' আর শরীরের অবিশ্বাস্য ভাঁজে এক নিমেষেই জীবন্ত হয়ে ওঠে কোনও এক মহাকাব্যিক যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা অরণ্যের বন্য পশুর লড়াইয়ের দৃশ্য।
পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রাম... যাকে আমরা সবাই 'মুখোশ গ্রাম' নামে চিনি। এখানকার শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় ছৌ নাচের সেই বিখ্যাত মুখোশগুলো। কিন্তু এই চোখধাঁধানো রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য বাস্তব... আদিবাসী শিল্পীদের চরম দারিদ্র্য ও দৈনন্দিন কঠিন লড়াই। অভাব যাঁদের নিত্যসঙ্গী, সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর আত্মসম্মানই তাঁদের বেঁচে থাকার এলকমাত্র জ্বালানি। এই লাল মাটি, এই মাদলের সুর আর এই ছৌ নাচ... সব মিলিয়ে এমন এক রূপকথা, যা এই মাটির সন্তানদের হাত ধরে আজও টিকে আছে সস্নেহে, সমর্যাদায় আর সগৌরবে।

৯ই আগস্ট... প্রতি বছর ক্যালেন্ডার মেপে ধুমধাম করে পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ (UN) দ্বারা ১৯৯৪ সালে প্রথম এই দিনটি উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি আদিবাসী মানুষের বাস। কিন্তু চরম বাস্তব হলো,তারা মোট বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি হলেও পৃথিবীর চরম দরিদ্র মানুষের প্রায় ১৫ শতাংশই এই আদিবাসী সমাজভুক্ত। 
এই দিনটিতে প্রতি বছর ক্যালেন্ডার মেপে মহাসমরোহে পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। শৌখিন আদিবাসী-প্রেম আর আলো-ঝলমলে প্রচারের হুজুগে জমজমাট উৎসবের মঞ্চ। কিন্তু উদযাপনের সেই ঝলমলে আলো নিভে গেলেই এই সুর বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় অধিকারহীনতার অন্ধকারে। সময় বদলায়, দুনিয়া বদলায়, কিন্তু বদলায় না জল, জঙ্গল আর জমিনের এই আদিম রক্ষকদের বঞ্চনা ও অবহেলার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও আত্মত্যাগকে একদিনের সস্তা উদযাপনে বন্দি না রেখে, বছরজুড়ে ওদের সাংবিধানিক অধিকার আর বেঁচে থাকার মর্যাদা সুনিশ্চিত করাটাই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার। কারণ, প্রকৃতির এই সন্তানদের সরল হাসিতেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রাণভোমরা... এই পৃথিবীর ভারসাম্য!


 

একজন ভাষা সৈনিকের দুঃখ ও যন্ত্রণা

  কবিতা বণিক       

                                                                                                  

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৌন্দর্য ও সাহিত্যে লিখেছেন  “ভাষা যে ছবি আঁকে  সে ছবি যে যথাযথ ছবি বলিয়া  আমাদের কাছে আদর পায় তাহা নয়— ভাষা যেন তাহার মধ্যে একটা মানবরস মিশাইয়া দেয়, এজন্য সে ছবি আমাদের হৃদয়ের কাছে একটা  বিশেষ আত্মীয়তা লাভ করে। বিশ্বজগৎকে ভাষা দিয়া মানুষের ভিতর চোলাইয়া  লইলে সে আমাদের অত্যন্ত কাছে আসিয়া পড়ে।”


ভাষা সৈনিক বলার কারণ টোটো উপজাতির একটি ছেলে ধনীরাম , সে  কত কষ্ট, অপমান সহ‍্য করে বাংলা শিখে   বড় হয়ে  তার মাতৃভাষার  সম্মান  স্বরূপ টোটো  বর্ণমালা তৈরি করলেন , তার  সেই  শারীরিক ও মানসিক যুদ্ধের কথা  আলোচনা করার চেষ্টা করছি।  ১৯৬৪ সালে জন্ম ধনীরামের। ছোট বেলা থেকেই   তার দিদিমার কাছ থেকে শোনা  পূর্বপুরুষদের গল্প অর্থাৎ  কিভাবে তারা জল আর জঙ্গলকে সাথী করে  আনন্দে বসবাস করত।  সে নিজেও জঙ্গলের প্রচুর ফল, মূল, কন্দ,  নানান ছত্রাক, লতাপাতা  দিদিমার সাথে, বাবা, মায়ের সাথে গিয়ে নিয়ে আসত। মধু সংগ্রহ করত এই জঙ্গল থেকে।  সে জেনেছে দেখেছে  তারা খেলেও পশুপাখিদের  জঙ্গলে  খাবার  কখনও কম পরত না।  তারা প্রকৃতির সাথেই বাস করতে ভালোবাসে। জঙ্গলের ‘ চুরুসাই’  ‘ মুরুংসাই ‘ লতা  দিয়ে দিদিমা ওষুধ তৈরি করত।  দিদিমার কাছে সেংজা দেবতার কথা, তাঁর আশীর্বাদের অনেক গল্প শুনেছে।


দূরের ওই হিসপা  আর পদুয়া পাহাড়কে  ওরা দেবতা মানে।  এছাড়াও তার খুব ভালোলাগে অপূর্ব সুন্দর ডায়ামারার গুহা। আস্তে আস্তে  সে জঙ্গল  চোখের সামনে ছোট হয়ে যেতে থাকল।  এমনি মাতৃসমা জঙ্গল ও নদীর এখনকার অবস্হা দেখে ধনীরামের মনে বড় কষ্ট। গাছকাটা, আর পাহার কেটে নদীগর্ভ খুঁড়ে পাথর বিক্রির দুষ্কর্মটা যদি আটকানো যেত তাহলে ধ্বসের পর ধ্বসে এমন ক্ষত বিক্ষত হতে হতনা তার মাতৃভূমিকে।  ১৯৬৮ সালের কথা। বিট অফিসার ভগবান দাশের নেতৃত্বে  হাতি চড়ে এসে জাপেনরা ( বাঙালি, বিহারি, নেপালি যারা টোটোপাড়ারর বাইরের লোক ) টোটোদের জমির ফসল, ঘর সব পুড়িয়ে দেয়। টোটোপাড়ার মোড়লের কাছে  ওই জমির ওপর টোটোদের অধিকারের  প্রমাণ লেখা ছিল তাম্রপত্রে। কিন্তু আমাদের স্বাধীন সরকার বলল সেসব বৃটিশদের দেওয়া।  তাই সেই তাম্রপত্রের কোন মূল্য নেই এখন। বিট অফিসার সেই তাম্রপত্র তাদের ফিরিয়ে দিলেন না।  প্রমানপপত্র হারিয়ে খুব মুষড়ে পড়লেন সবাই।  ধনীরামের বাবা আমেপা টোটো বললেন “ ধানুয়া ! তোদের বড় হয়ে টোটোদের জমি জায়গা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে টোটোরা বাঁচবে কিকরে?” ধনীরামের বুকের  ভিতর কেমন যন্ত্রণায়  টনটন করে উঠল। বাবার অপমান বড্ড কষ্ট দিয়েছে তাকে।

 

ধনীরাম এখন স্কুলে যায়।  সরকারী  মাস্টারমশায় আসেন। টোটো ছেলেমেয়েদের অর্থহীন ধ্বনিতে মাস্টার মশায় বিরক্ত হন। টোটো ছেলমেয়েদের বর্ণমালা পরিচয় করানো , উচ্চারণ করানো খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। অবোধ্য ধ্বনির সাথে  হাত পা  নাড়িয়ে মাষ্টার যত  শেখাতে চান  ছেলেমেয়েরা  হেসে ফেললে   চলে বেতের শাসন।  এই ভাবেই বছর ঘোরে। ধনীরাম অবাক হয়  যে তারা তো মা-বাবা, ঠাকুরমা- ঠাকুরদার থেকে  শোনা কত গান গল্প সহজেই মনে রাখে, বলতেও পারে।  কিন্তু মাষ্টারমশাইএর পড়া, পদ্য মনে  থাকে না। ধনীরামের বেশি দুঃখ  হয় যখন পড়া বলতে না পারলে মাষ্টার মশাই মাথা দেখিয়ে ইঙ্গিত  করে  যে তোদের  মাথায় কিছু নেই।  একদিন পড়া না  পারার জন্য  মাষ্টারের কাছে মার খেয়েছে  ধনীরাম।  ছেলেরা হাসাহাসি করছে, বাড়ি ফিরে  মায়ের কাছে বলবে না ভেবেছিল কিন্তু মায়ের কাছে আসতেই অশ্রু নদী দুটোতে হড়পা বানের প্লাবন ডাকল। মা  দুহাতে জড়িয়ে স্নেহ ভরে  জিজ্ঞেস করেন “কি হয়েছে?“  ধনীরাম বলে “পড়া পারিনি। মাস্টার মেরেছে। বলেছে স্কুলে না গিয়ে জঙ্গলে যেতে। বন্ধুরা হেসেছে।”  মা তাঁর কাপড়ের খুঁট  দিয়ে দুঃখ মুছিয়ে বললেন “পদ্য মুখস্হ বলতে পারিসনি তো কি হয়েছে? তুই নিজে একদিন কত কবিতা তৈরি করবি।  লোকে তোর কবিতা শুনবে। তুই টোটো পাড়ার নাম উজ্জ্বল  করবি। সেংজা দেবতা তোর জন্ম দিয়েছে , টোটোদের দুঃখ কষ্ট দূর করার জন্য।  সমস্ত দুঃখ কষ্টের বোঝা  তোর্সায় ভাসিয়ে দিয়ে আসতে হবে তোকে। সেংজা তোর সব বোঝা হালকা করে দেবে।  তুই সেংজার বরপুত্র। তোকে ইস্কুলের পাশ দিতে হবে।  তবে না বাবুদের অপমানের জবাব দিতে পারবি।“  মায়ের এই স্নেহস্পর্শ , মায়ের আশা  ধনীরামের মনে তীব্র জেদের সৃষ্টি করে।  বাবার অপমান, নিজের লজ্জা অপমান  সব দূরে ঠেলে   প্রতিজ্ঞা  করে যতই দুর্বোধ্য হোক সে ভাষা , তাকে সব শিখে স্কুলে পাশ দিতেই হবে। 


ক্লাস টুতে পড়ার সময় ধনীরাম প্রথম বাবার অনুমতিতে দিদিমার সাথে  পায়ে হেঁটে ২৪ কিমি দূরে মাদারী হাট বাজারে যায়। সেখানে প্রথম ট্রেন গাড়ি দেখে।  তার কাছে মনে হয়  বিশাল এক ভোঁতা মুখো  লোহার সাপ  কিরকম বিভৎস গর্জন করতে করতে  তার বিষ নিশ্বাস  কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে  চলে যাচ্ছে। মাটিও থর থর করে কাঁপতে লাগল। তার দিদিমার হাতে বোনা একটা পোষাক আছে।  দিদিমা তাকে দেখিয়েছে। তখন টোটোদের ঘরে ঘরে  গাছ-গাছড়া থেকে সূতো তৈরি করে কাপড় বুনত। এখন আর তা মনে নেই। এই  পোষাকটা তার বাবা ঠাকুরদাও  পরেছে। এখনও ভালো আছে কাপড়টা। 


এই টোটোপাড়ার পঞ্চায়েত মুখিয়া  ধনীরামের বাবা আমেপা টোটো। তার স্ত্রী লক্ষিনী টোটো।  এরা অল্প বয়স থেকেই  বিনিময়ে বেচাকেনা করত। সে সময় টোটো পাড়ায় প্রচুর কমলালেবু ফলত।  তারা কুয়োপানির জঙ্গল পেরিয়ে দলসিং পাড়ায়  পিঠে ঝুড়ি বেঁধে নিয়ে যেত কমলালেবু। একবার গণ্ডারের দেখা পেয়েছিল।অর্থাৎ নানান বিপদ মাথায় নিয়ে তাদের যাতায়াত, বসবাস সবকিছু। তবু তারা খুব ভালো ছিল। কিন্তু   সেবার টোটো পাড়ার সব কমলালেবুর গাছ মারা গেল।  কারণ হিসেবে ওদের বক্তব্য রাভা জাতির মানুষদের অভিশাপে  সমস্ত  কমলালেবুর গাছ নষ্ট হয়েছিল। অথচ টোটোদের সাথে  মেচ, রাভাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। এরপর তারা বাঁশের চাষ শুরু করে। কারণ হিসেবে বলে টোটোদের পূর্বপুরুষরা নাকি  জংলি  বাঁশঝাড়ের নীচে বাস করত। বাঁশ এদের বন্ধু।  নানান ধরণের বাঁশ ছিল। তারা বাঁশের ঘর, সিঁড়ি, মশাল , জল খাওয়ার পাত্র,ইত্যাদি নানান কাজে ব্যবহার করত। এছাড়া আশেপাশের চা বাগান গুলিতে বাঁশের চাহিদা ছিল।  বাঁশের বিনিময়ে আদান প্রদান চলত।  ১৯৮০ র দশকে বাঁশের মড়কে বাঁশ চাষ শেষ হয়ে গেল।  এরপর শুরু হয় সুপারি চাষ ও সুপারি বিক্রি।


টোটোদের জমি নিয়ে ধনীরামের বাবা আমেপা টোটোর খুব চিন্তা।  মাঝে মাঝে মা- বাবার আলোচনা শোনে ধনীরাম। একদিন  পাহাড়ের ঢালে তাদের চাষের জমি থেকে মা-বাবার সাথে মকাই তুলতে  গিয়েছিল। সেদিন সুযোগ বুঝে মাকে জিজ্ঞেস করে “  তুই আর বাবা জমি নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন?”   মা বলেন “ বনদেবীর অফুরান দানে  টোটোজাতির জীবন  লালিত হত।   আমাদের টোটোদের অনেক জমি হারাতে হয়েছে। ধীরে ধীরে জমি- জঙ্গল  থেকে  আমাদের  বঞ্চিত করা হচ্ছে।  বাবার কাছে শুনিস। আমাদেরও কত ধানী জমি  ছিল। তোরসার কত মাছ আমরা পেতাম ।       


মিশনারিরা  হাসপাতাল আর স্কুল তৈরি করল। লুথারেন ওয়ার্ল্ড সার্ভিস বা এল, ডাবলিউ, এস  একটি সংস্হা আসাম বর্ডারে  “ রামপুর সিঙ্গিমারি হাইস্কুল “  উদ্বাস্তুদের  নিয়ে চালাতেন । এদিকে মণিপুরের কেবিন মিনিষ্টার ছিলেন বি,কে, রায় বর্মণ।  তিনি ধনীরামের বাবা আমেপা টোটোকে  বাংলা শেখাতেন। এই রকমই কোন সূত্র ধরে  শুনতে পায়  কোচবিহারের পঞ্চকন্যা নামে এক গঞ্জে মিশনারিদের দ্বারা চালিত স্কুলে  আদিবাসী জনজাতির ছেলেরা  ছাত্রাবাসে থেকে নিখরচায়  পড়াশোনা করতে পারে। ধনীরাম  সেখানে টোটোপাড়ার স্কুল থেকে চতুর্থ শ্রেনী পাশ করে এই মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন।  এই প্রথম ধনীরাম বাইরে বের হল। মাদারীহাটের চেয়ে দূরে কখনওই সে যায় নি।  এখন ধনীরাম মোটামুটি বাংলা ভাষা শিখে গেছে। বুঝতে পারে। তবে কোন সময় টোটো ভাষা বলে ফেললে  অনেকে “ জংলি ভাষা” বললে খুব মন খারাপ হয়ে যায়।  ধীরে ধীরে বাংলার সাথে সাদরি ও কামতাপুরি ভাষাও সে শিখে নিল বন্ধুদের থেকে। ধনীরাম কোচবিহার দেশের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে।  মিশনারি স্কুল  অষ্টম শ্রেণী পাশ করে  চলে আসে। ন্যাশনাল ওপেন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন 94-95 এ। রবীন্দ্র মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়  থেকে আবারও তিনি মাধ্যমিক পাশ করেন 2004. সালে। এস, এস , বি তে   চাকরী পেয়েছিলেন কিন্তু তার মা তাকে টোটোপাড়ার বাইরে যেতে দিতে চান না। তাই চাকরী করা হল না। পরবর্তীতে মহেশ্বর মূর্মূর সহযোগিতায় পুরমন্ত্রী দীনেশ ডাকুয়া  সোস্যাল ওয়ারকার হিসেবে  চাকরী দিলেন ধনীরামকে। 


এখন টোটোদের স্বাস্হ্যকেন্দ্র, পোষ্টঅফিস, ব্যাঙ্ক, লাইব্রেরি,  প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটা হাইস্কুল , রাস্তা, কালভার্ট ইত্যাদি হয়েছে। প্রথম মহিলা মাধ্যমিক  পাশ করেন সূচনা টোটো। তিনি  টোটো পাড়া আই, টি, ডি, পি  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান।  প্রথম মহিলা  রিতা টোটো গ্র্যাজুয়েট হন ২০১০ সালে।ধনীরামের ছোট ছেলে  ধনঞ্জয়  টোটো ২০১৬ সালে প্রথম মাষ্টার ডিগ্রী  করেন লাইব্রেরিয়ান সাইন্স  নিয়ে।  ধনীরামের দুঃখ  পাশ করেও ছেলেমেয়েরা কম্পিটেটিভ পরীক্ষায় বিজয়ী হতে পারে না। তিনি টোটোদের জন্য সরকারি চাকরির বিশেষ সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।  সরকারি বাবুদের চোখে  জঙ্গল , মায়ামমতা ভরা মায়ের কোল নয় , তারা জঙ্গলকে চেনে না বোঝে না। তাই তাদের কাছে জঙ্গল মানে ভয়, জন্তু জানোয়ারের ভয়, বিপদ , অনুন্নতি। এই ভুল ধারণার জন্যই তারা জঙ্গল কেটে কংক্রিটের ঘর,বাড়ি, রাস্তা, শহর বসায়। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলে। এর  ফলে নানান ধরনের নোংরামি হয়। একেই আজকাল “ উন্নয়ন” বলে। আজ জঙ্গল হারিয়ে, নদী, ঝর্ণা হারিয়ে টোটোদের  সব রকম অভাব যেন ঘিরে ধরেছে। 


 ধনীরাম দুঃখ করে, বাংলাদেশ থেকে আসা জাপেনরা রেললাইনের ধার ঘেঁসে কত নুতন নুতন ঘর তৈরি করে বসেছে।  তারা ইউনিয়ন করছে।  হাজার হাজার বছরের জঙ্গল ধ্বংস করে জমি কেড়ে নিতে তাদের বাধে না।  টোটোদের  কত জমি আইনি- বেআইনি পথে  চলে গেল  জাপেনদের কব্জায়। অস্ত্রশস্ত্র, হানাহানি, মারামারিকে  ওরা গণতন্ত্র বলে।  তিনজন বয়স্ক টোটো মিলে ঠিক করলেন  সরকারি আদব কায়দা মেনে  আলিপুরদুয়ারের আদালতে  কেস করা হবে।  উত্তরবঙ্গে মেচ জনজাতির একজন মাত্র পাশ করা উকিল  তপন বাবুকে বলা হল। তিনি লড়বেন টোটোদের হয়ে।  উকিল বাবু বললেন এসব জমি টোটোদের ধানী জমি ছিল। আদালত প্রমান চাইলেন। বৃটিশ সরকারের দেওয়া তাম্রপত্র স্বাধীন দেশের   বিট অফিসার গায়েব করে স্বাধীন দেশের নাগরিকত্বের গরিমা প্রকাশ করলেন।  এইবার জাপেনদের  লোকেরা তপনবাবুকে  প্রাণনাশের হুমকি দিলে ভীত তপন বাবু সরে গেলেন।  আইনের দেবীর তো চোখ বাঁধা!  টোটোদের আইনি লড়াই এখানেই শেষ হল। 


টোটোদের পরম্পরাগত গ্রাম পঞ্চায়েতের এখন আর কোন ক্ষমতা নেই। বর্গাদার জাপেন জাতিরা  সরকারি কলকব্জা খাটিয়ে টোটোদের জমি- জায়গা দখল করে বসেছে। সরকার আইন করে বন্দুকওয়ালা পাহারাদার বসিয়ে  একের পর এক জঙ্গলে  টোটোদের ঢোকা নিষেধ করে দিচ্ছে। ধনীরাম দৃঢ় ভাবে বলে এসব হতে দেওয়া চলবে না।  জমি আর জঙ্গলের উপর টোটোদের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে।  নাহলে আগামী প্রজন্মের জন্য তারা কেবল  দাসত্ববৃত্তিই রেখে যাবে।  নেতাদের তৈরি করা তালিকা ধরে  টোটোপাড়ায় সরকারি পঞ্চায়েতের গম ও আর্থিক সাহায্য আসে। সে তালিকায় ধনীরামের নাম নেই।  পরিবারে বাচ্চাদের অনাহার - অর্ধাহারের শুকনো মুখ গুলো দেখে সহ্য না করতে পেরে  হাজির হয় মাদারীর  পার্টি অফিসে।  সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকেও টিটকিরি শুনে  শূন্য হাতে ফিরে আসেন। আত্মগ্লানিতে মন  ভারাক্রান্ত হয়। কেনই বা সে গিয়েছিল। স্ত্রী চম্পাকলি তাকে সাহস যোগায়। ধনীরাম তার সহযোগী  কয়েকজনের সাথে বি ডি ও অফিসে দেখা করে বলেন যে তারা রিলিফের টাকা পায় নি। বি ডি ও জানালেন তিনি প্রতিকার করবেন। পরদিন দারোগা বাবু ধনীরামের সহযোগী , শনে   টোটোর বিরুদ্ধে( মিথ্যে) ষড়যন্ত্র করার  অভিযোগে গ্রেফতার করা হলে   টোটোপাড়ার মানুষরা  ছুটে এলে পুলিসবাহিনী তাদের লাঠি মেরে ভাগিয়ে দিল। শনেকে হাজতে দেওয়া হল। ধনীরাম  বুঝল এটাই তবে বি ডি ও সাহেবের প্রতিকার ।  অনেক চেষ্টা করেও কোথাও সুরাহা করতে না পেরে  শেষে  ধনীরামের পাঁচজন সহযোগী মিলে তাদের সুপারি আধাদামে বিক্রির চুক্তিপত্রে সই করে  মাদারীহাট থানা থেকে শনেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এল।  ধনীরামের মনে আগুন জ্বলে। প্রতিশোধ নয়, কিন্তু এই ভন্ডামির মুখোশ পরা অত্যাচার-অনাচারের মুখোশ টেনে খোলা প্রয়োজন। 

                    “ কেন রে তোর দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়? 

                                 জয় অজানার জয়।

                     এই দিকে তোর ভরসা যত , ওই দিকে তোর ভয়।

                                  জয় অজানার জয়।…”

                                                                                                                                          

               

 ধনীরাম স্কুল জীবন থেকেই  অনেক কবিতা লেখেন।   ধনীরামের  লেখা অনেক রম্য রচনা  ছাড়াও আছে “ টোটো জনজাতির কথা” , “ধানুয়া টোটোর কথা মালা “  তার স্ত্রীর মৃত্যুর পর লেখেন  “ প্রিয়তমার স্বপ্নভূমি”।  ২০২৫ শে  জ্যোতির্ময় রায়ের সম্পাদনায় তার আরও একটি বই  “ জিওলোজি পে ডিগ্রি অফ দ্যা টোটো কম্যুনিটি” প্রকাশিত হতে চলেছে।  যিনি বইটি  সম্পাদনা করেছেন  তিনি বীরপাড়া কলেজের বাংলা বিভাগের প্রফেসর।  ধনীরাম, টোটোদের বর্ণমালা  তৈরি করে “ পদ্মশ্রী” পেয়েছেন ২৮শে জানুয়ারি  ২০২৩। তাকে সাহায্য করেছেন  টবি এ্যান্ডারসন অস্ট্রেলিয়ান লিঙ্গুয়িষ্টিক। এছাড়াও লিজা ডেভিডসন ব্যাঞ্জনবর্ন, স্বরবর্ণ ,   ধ্বনি ইত্যাদিতে সাহায্য করেছেন। ক্যাথরিনাও বর্ণমালা তৈরিতে  সাহায্য করেছেন। কিন্তু ছবিগুলো ধনীরাম নিজেই এঁকেছেন। টোটো বর্ণমালা সম্পূর্ণ করতে ছয়মাস লেগেছিল। ২০১৮ সালে শেষ হয়।  ধনীরাম একটা অভিধানও সংকলন করেন।  আজ তার মা বাবার কথা খুব মনে পড়ে।  বাবা একদিন  সন্ধ্যেবেলায়  ধনীরামের মাথায় হাত বুলিয়ে  বলেছিলেন  “ তোকে নিয়ে আমার অনেক আশা রে ধানুয়া!  তোর দাদুও ছিল পঞ্চায়েত মুখিয়া। আর টোটোপাড়ার জঙ্গলে তার সাথে বাঘের লড়াই হয়েছিল। বাঘও তাকে হারাতে পারেনি। তোর দাদু গেন্দ্রা টোটো সেই লড়াইতে জিতেছিল।  সে গল্প আজও সবাই  করে।  তোকেও  টোটোজাতির নাম উজ্জ্বল করতে হবে।  তুই ভালো করে পড়াশোনা কর, এই লড়াইয়ে তোকে জিততে হবে“  ধনীরামের মনে হয় তার মা বাবা দিদিমা দাদু সবাই ওপর থেকে তাকে আশীর্বাদ দিচ্ছে।  কিন্তু গ্রামের মানুষরা তাকে বলে এসব করে কি হবে?  খাওয়া হবে না এই সব করে।  গ্রামের লোকেদের এইসব তাচ্ছিল্য মূলক নানান কথা তাকে খুব দুঃখ দেয়।  ছেলেমেয়েরা ভিনদেশে কাজ করতে যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষার উন্নতি হচ্ছে না। তাদের সমস্যা মেটানোর চিন্তায় জর্জরিত হলেও  মা, বাবা, দিদিমার আশীর্বাদ  আছে। সেই দায়িত্বই তার কাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। 

                   “যে ধ্রুবপদ দিয়েছ বাঁধি বিশ্বতানে

                    মিলাব তাই জীবন গানে।।

                    ……………………………….

                     বাজায় উষা নিশীথকুলে যে গীতভাষা

                     সে ধ্বনি নিয়ে জাগিবে মোর নবীন আশা।

                     ফুলের মতো সহজ সুরে প্রভাত মম উঠিবে পুরে,

                      সন্ধ্যা মম সে সুরে যেন মরিতে জানে।। “

                      

                 *এখন  ধনীরাম রাজ্যপাল  সি ভি আনন্দ বোস , কলকাতায় গভর্নরের কাছে কয়েকটি দাবি পেশ করেন।  ক্লাস 6 থেকে  ক্লাস 10 পর্যন্ত CBSC  বোর্ড এর স্কুল প্রয়োজন টোটোপাড়ায়।  ছেলেমেয়েরা বাংলা বিভাগে পড়ে নম্বর খুব কম পায়। কোন প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষায় তারা উত্তীর্ণ হতে পারছে না। বসারই সুযোগ পায় না। 

                 *  পি জি টি  বা  পোষ্ট গ্রাজুয়েট  ট্রেনিং সার্টিফিকেট ।

                  *  খেলাধূলার  উন্নয়ন।

                  *  উড়াল পুল( বালি , পাথর  প্রচুর আছে) 

                  *  বিধান সভায়, লোক সভায় আসনের প্রয়োজন। ( লোক সংখ্যা খুব কম বলে তাদের সমস্যা । কোনদিনই কেউ সামনে আনেননি। সমস্ত বর্ষাকাল জুড়ে মূল খন্ডের সাথে সম্পূর্ণ               যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে।  এছাড়া খাদ্য, স্বাস্হ্য, শিক্ষা, খেলাধূলা  ইত্যাদি বিষয় সামনে  আনতে পারবে।  টোটোপাড়ার ভৌগলিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে সামান্যতম অংশ দুঃখ কষ্টের পরিচয় দেওয়া যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের আলিপুর দুয়ার জেলার  ভুটান সীমান্তে দুর্গম একটা ছোট্ট জনপদ  টোটোপাড়া গ্রাম।  টোটো ভারতের  আদিম উপজাতির এক ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি ।  সারা পৃথিবীতে একমাত্র  এই অঞ্চলেই এদের বাসস্থান। ২০০০ একর পরিসীমার  মধ্যে ছয়টি  গ্রাম - পঞ্চায়েত গাঁও, মণ্ডল গাঁও,সুব্বা গাঁও, মিত্রঙ গাঁও, পূজা গাঁও এবং ধুমচি গাঁও   নিয়ে টোটোদের বাস  হলেও এদের মধ্যে কিছু  নেপালি, বিহারি, বাঙালি , মুসলিম আছে। 

মাদারীহাট থেকে ২৪ কিমি দূরে অবস্হিত টোটোপাড়া গ্রাম।  চারিদিকে পাহাড় ঘেরা  এই ছোট্ট গ্রামটা পাহাড়ের ঢালেই অবস্হিত। জলদা পাড়া অভয়ারণ্যের গা  ঘেসে  বইছে খরস্রোতা তোর্সা নদী। মাদারীহাট থেকে ২৪ কিমি রাস্তা পার হতে হয়  তিনটি নদী খাতের মধ্য দিয়ে। তিতি, বাংড়ি ও হাউড়ি।  এছাড়া অনেক ঝোরা , উপঝোরা  পার হয়ে  জামতলা বাজার, হান্টা পাড়া চা বাগান,  তারপর বাংড়ি নদী খাত পার হয়ে  তিতি নদীর পাশের জঙ্গল  পার হয়ে ( জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের  অংশ )  হল্লা পাড়া  আর বল্লাল গুঁড়ির রাস্তা ধরে  হাউরি নদীর বিস্তীর্ণ  পাথরের খাত পার হয়ে  টোটো পাড়া পৌঁছন যায়।

                

পাহাড় থেকে  এত পাথর নেমে আসে ,সে কারণে  শীতকালেও এই নদী খাত পার হতে হয় বড় বড় পাথরের ওপর দিয়ে। অল্প জলের মধ্য দিয়ে পার হতেও পায়ের  ওপর পাথর পড়তে পারে। টোটোরা  বন্যজন্তু বাঁদরেরা কিভাবে লাফিয়ে পার হয় তা দেখে শিখেছে এই খরস্রোতা নদী লাফিয়ে পার হওয়ার কৌশল।  একে বলে বাঁদর চাল।  বালি , আর জল যেখানে , সেখানে পা ফেলতে হয়  সাবধানে। কারণ পাথরের উপর পা পড়লে পাথরের বাড়ি খেতে হয়।   তাই দেখে দেখে লাফিয়ে   লাফিয়ে পার হতে হয়ে।  ঝোরার জল নেমে  যাওয়ার জন্য পাকা ড্রেন করা আছে। সেই জলের তীব্র গতিবেগের ভয়ংকরী শব্দ  মনে এক অজানা আতঙ্ক ছড়ায়। ঐ জল  গিয়ে মেশে তোর্সা  নদীতে।  টোটোপাড়ায় খুব বজ্রপাত হয়। ছোট ছেলেমেয়েরা নদীতে পাথর কুড়িয়ে স্তুপ করে, পাথর ভাঙে। নদীর ওপর দিয়ে গাড়ি যেতে গিয়ে ফেঁসে  গেলে এই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা  কোদাল, শাবল দিয়ে নুতন রাস্তা তৈরী করে দেয়।  আবার গাড়ি ঠেলেও দেয় সামান্য পয়সার বিনিময়ে।তবে পাড় ভাঙলে কোন উপায় থাকে না। ওরা ওই বালু পাথর তুলে দেয় ট্রাকে। ফলে নদীতে বড় বড় গর্ত হয়। তাই গাড়িতে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেতে খেতে যেতে হয়। এত অসংখ্য ঝোরার সৃষ্টিও হাউরি নদী থেকেই।   সারা বছরই যাতায়াতের কষ্ট কিন্তু মূল ভূখণ্ড থেকে  বর্ষায় একেবারেই বিচ্ছিন্ন থাকে  টোটো পাড়া।  


একমনে তোর একতারাতে  একটি যে তার সেইটি বাজা—

ফুলবনে তোর একটি কুসুম , তাই নিয়ে তোর ডালি সাজা।।”

………………………………………………………………………

লোকের কথা নিসনে কানে,  ফিরিস নে আর হাজার টানে,

যেন রে তোর হৃদয় জানে হৃদয়ে তোর আছেন রাজা—

একতারাতে একটি যে তার আপন-মনে সেইটি বাজা।।

 ধনীরাম  সবচেয়ে কষ্টকর কাজ করেছে। টোটো ভাষার লিপি আবিস্কার। করেছে।  এখন একে ধরে রাখার জন‍্য সকলের সহযোগিতা অবশ্যই চাই। 


 

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়!
অনিতা নাগ 

সে'সব যখন বোঝার বয়স হয় নি, তখন থেকেই  এই দিনটা বড় গর্বের, বড় আনন্দের,  আর মাথা উঁচু করে বাঁচার ছাড়পত্র। সে আমার দেশের স্বাধীন হবার দিন। ১৫ ই অগাস্ট। 

স্কুলে জুলাই মাস থেকেই পিটি স্যার আর দিদি খুব  সিরিয়াসলি ক্লাস করাতেন। শেষের দিকে অনেক একস্ট্রা ক্লাস হতো।  কতো রকমের ড্রিল। মার্চ ফার্ষ্ট। লেফ্ট, রাইট, লেফ্ট।  তালে তালে পা মিলিয়ে চলা। সামনে পতাকা হাতে বড় দিদিরা। সে’ এক অন্য আনন্দ।,  এক আলাদা অনুভব। একস্ট্রা ক্লাস মানেই ক্লাসের পড়া থেকে মুক্তি  আর সব ক্লাসের মেয়েদের সাথে, বড় দিদিদের সাথে একসাথে প্র্যাকটিস করা, হৈহৈ করা। সে' বড় আনন্দের দিন ছিলো। বাড়ীতে রঙীন কাগজ কেটে তিরঙ্গা বানানো, কাগজের শিকলি বানানো। মা আটা দিয়ে আঠা বানিয়ে দিতেন। সেই শিকলি আর পতাকা দিয়ে পাড়ায়, স্কুলে সাজানো হতো। পাড়াতে ইঁট দিয়ে পতাকা উত্তোলনের বেদী তৈরী হতো।  জিলিপি, লজেন্স, বিস্কুট। রেডিওতে দিল্লীতে পতাকা উত্তোলনের ধারাভাষ্য। সারাদিন এক উৎসবের আমেজ। হই হই, আনন্দ, খাওয়া-দাওয়া, চারদিকে মাইকে দেশাত্মবোধক গানের সুর। পড়ার ছুটি। খুব আনন্দে কাটতো ছোটবেলায় এই দিনটা। 

একটু বড় হয়ে অন্যরকম স্বাধীনতা।  এই দিনটি উদযাপনের সাথে  লুকিয়ে প্রেমিকের সাথে দেখা করা! সেই দিন ঘরে ফিরতে একটু দেরী হলেও ম্যানেজ করা যেতো অনায়াসে। স্বাধীনতা দিবসের এই উদযাপনের দিনেও মা একই নিয়মে উনুনের সামনে বসে রান্না করতেন। ছুটির দিন মানেই নিয়মের বাইরে আবদারের রান্না। মা'র সে'দিন স্নান খাওয়া সারতে অনেকটা দেরী হতো। সবাই যখন স্বাধীণতা দিবসের আনন্দ উদযাপনে মশগুল, তখন এক গৃহবধূ নীরবে তার কাজ করে যেতেন। শুধু তো আমার মা নয়। ভারতবর্ষের আগুন্তি গৃহবধূর একই গল্প। তাদের স্বাধীনতার কথা তো আমরা কখনো ভাবি নি।  আজও কি ভাবি!  আমাদের পরিবারে আমার মা সম্মানীয় ছিলেন। কিন্তু সংসারের স্বার্থেই বোধহয় তাদের একদিন  ছুটি দেওয়ার কথা, তাদের মতো করে আনন্দ করতে দেওয়ার কথা কখনো কারুর  মনে হয়নি। আমি তার নিজের মেয়ে, আমারও কখনো মনে হয়নি। মনে হয়েছে এটাই আমাদের প্রাপ্য, মা এভাবেই করবেন। 

আজ সমাজের ছবি গেছে বদলে। জীবনের  সুযোগ-সুবিধাও গেছে অনেক বেড়ে। এখন সোশ্যাল মিডিয়া, মুঠোফোন,আমাদের জীবনকে  অন্য এক সুরে বেধেছে। আজ ব্যক্তি- স্বাধীনতা যত বেড়েছে মানুষে মানুষে দূরত্ব ততটাই বেড়েছে। আজ স্বাধীনতা দিবসের উদযাপনে অনেকটাই যেনো দেখনদারি। কে কাকে কতটা বেশি পাল্লা দিতে পারলো সেই দৌড়।  সোশ্যাল মিডিয়ায় দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাচ এর  ভিডিও আর রিলস বানিয়ে নিজেকে অনেক বেশি দেশপ্রেমিক  প্রমাণ করার প্রতিযোগিতা চলে। থিমের যুগ। তিরঙ্গা থিমে সেজে উঠে সবকিছু। 

কিছুদিন আগে গিয়েছিলাম আলিপুর জেল মিউজিয়ামে। যে গল্প, যে কাহিনী ইতিহাসে পড়েছি, তার সামনে দাঁড়িয়ে দু’চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। মনে হয়েছিল এই পুণ্যভূমিতে না এলে বীর শহীদদের  বলিদান ইতিহাসের পাতাতেই থেকে যেতো। এমন করে  দেশের জন্য তাঁদের আত্মত্যাগের যন্ত্রণা, তাদের কষ্ট, অনুভব করতে পারতাম না। আঠারো বছরের ক্ষুদিরাম যখন হাসতে হাসতে  ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেছেন, চারপাশের কারাগার থেকে তখন বন্দে মাতরম, জয়হিন্দ ধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিলো আকাশ বাতাস। আলিপুর জেলের ইঁট পাথরের কোনে কোনে আজও সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়। 

আমাদের স্বাধীনতা বড্ড ভালোবাসার, বড্ড দামি। আর ক’দিন পরেই আমাদের আশিতম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন  করবো।  কতো আনন্দ, কতো অঙ্গীকার, কতো প্রতিশ্রুতি। একটা নির্ভেজাল ছুটির দিন দেশপ্রেমের সুরে গাঁথা। এত আনন্দের মাঝেও ভুলতে পারবো  আশি তম স্বাধীনতা অভয়াকে বিচার দিতে পারেনা,  বিচার পায় না আরো অনেকে!  বিচারের বাণী আজও নিভৃতে কেঁদে মরে। সরকার বদলায়। গল্পের কাঠামো বদলায়। সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখে। অপেক্ষায় থাকে কবে সত্যি হবে ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম। মাইকে গান ভেসে আসে পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পূণ্য হউক হে ভগবান। সুরে ছন্দে তালে প্রভাত ফেরি এগিয়ে চলে, 
চল্ চল্ চল্, 
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ দল
চল রে, চল রে চল’ লেফ্ট রাইট,  লেফ্ট…. 
 ক্রমশ পদধ্বনি মিলিয়ে যায়, সুরের রেশ ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। বুড়ো চোখ ঝাপসা হয়ে উঠে। প্রণতি রাখি আমার দেশমাতৃকার চরণে ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’।।


 

রাখী বন্ধন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ

চিত্রা পাল  

                              

রাখী বন্ধন বা রক্ষা বন্ধন আমাদের এক পবিত্র উত্‌সব,যেদিন ভাইবোনের সম্পর্কের বাত্‌সরিক উদ্‌যাপন করা হয়।এই পবিত্র দিনে বোনেরা ভাইদের কপালে চন্দন ফোঁটা দিয়ে হাতে রাখী বলে এক পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। ভাইদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে। এর পরিবর্তে ভাইয়েরা বোনেদের সারা জীবন রক্ষা করার কথা বলে।নিজের ভাইবোন ছাড়াও অনাত্মীয় ছেলেকেও রাখী পরিয়ে ভাই বা দাদার  সম্পর্ক পাতানো যায়।মহাভারতেন কথিত আছে,সুদর্শন চক্রের যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লাগলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির একটি টুকরো ছিঁড়ে ক্ষতস্থানে বেঁধে দেন যাতে রক্ত না বেরোয়। তাঁর এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে কৃষ্ণ তাঁকে সর্বদা রক্ষা করার কথা দেন।

সম্রাট আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের কোন ক্ষতি যেন না করেন।পুরু সেই রাখীকে সম্মান জানিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিজে সম্রাটকে কোন আঘাত করেননি।আবারএক জনপ্রিয় কাহিনী শুনি, চিতোরের রাণী কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে একটি রাখী পাঠান,গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণ থেকে তাঁর রাজ্যকে রক্ষা করায় সাহায্য করতে।  হুমায়ুনের সেনা পাঠাতে দেরী হয়ে গিয়েছিলো। রাণী কর্ণাবতী সব পুরস্ত্রীদের নিয়ে জহর ব্রতে আত্মাহুতি দেন। তবে চিতোরে পৌঁছে হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে উত্‌খাত করে কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রমজীত্‌কে সিং হাসনে অভিষিক্ত করেন। 

রাখীবন্ধন  ভাই-বোনের  ভালোবাসার সম্পর্কের এই সামাজিক প্রথাকে কবিগুরু এক নতুন রূপ দেন অন্য আঙ্গিকে। ১৯০৫ সালের  ২০ জুলাই ভারতের তখনকার ভাইসরয় লর্ড কার্জন অভিভক্ত বাংলাকে ধর্মীয়  ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করার কথা ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিলো হিন্দু মুসলিম দুই জনজাতিকে আলাদা করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।দুভাগ কার্যকর করার দিন ঘোষণা করা হয়  ১৩১২ বঙ্গাব্দের ৩০ আশ্বিন,১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর। সেদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আহবানে  এই রাখী বন্ধন উত্‌সব এক সার্বজনীন রূপ পায়। তিনি একে কেবল ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতি ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত বাঙ্গালীর মিলনোত্‌সবে পরিণত করেন।  রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সেদিন বাংলার মানুষ একে অপরের হাতে রাখী বেঁধে দিয়ে তাঁরা অঙ্গীকার করেন, পরস্পরের কাছে, একে অপরের জন্য।কোন সীমানা দিয়ে তাঁদের আলাদা করা যাবে না। ওই দিন সকালে সাধারণ মানুষ গঙ্গাস্নান সেরে ফিরছিলেন।তখন পথে যাকে পাওয়া গেছে তাকেই রাখী পরিয়ে দেওয়া হয়।কবি নিজে  চিত্‌পুরের এক মসজিদে  গিয়ে মুসলিম ধর্মগুরু ও মৌলবীদের হাতে রাখী বেঁধে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের অসাধারণ নজীর সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথের এই অভিনব  শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সর্ব সাধারণের মনে এক তীব্র জাতীয়তাবোধের  উন্মেষ হয়। যার ফলে ১৯১১ সালে বৃটিশ প্রশাসন বঙ্গভঙ্গ  বাতিল করতে বাধ্য হয়। তাঁর শুরু করা এই রাখী বন্ধন উত্‌সব ছিল মানবতা, সম্প্রীতিএবং বাংলার অখন্ডতা রক্ষার এক ঐতিহাসিক  স্মারক। 

তিনি এই দিনটির উদ্দেশে সেই বিখ্যাত গান রচনা করেন বাং লার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল -/ পুণ্য হউক পূণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।

এছাড়াও তাঁর রচিতবিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবেপ্রভৃতি গান সেদিন আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। 


এইভাবে সেসময় রাখীবন্ধন উত্‌সব যেভাবে আপামর জনসাধারণকে উদবুদ্ধ করেছিল, যার হোতা ছিলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ইতিহাসে বিরল্ কেন  নেই বললেই চলে। তাঁর ভাবনাকে আমরা কতখানি আত্মস্থ করতে পেরেছি তা সময়ই বলে দেবে।