Tuesday, August 4, 2026


 

নাগাসাকি দিবসঃ সভ্যতার বধ্যভূমি 

                            অভিজিৎ সেন 

এক একটি দিবস বহমান সময়ের ক্ষুদ্র একক। একটি  দিবসের বৃত্ত পূর্ণ হয়ে ওঠে অজস্র ঘটনার কোলাজে। চিত্রনাট্যর মতই জীবন-চিত্রও আবর্তিত হয়ে চলে। বিবেকবান, সমাজ সচেতন, মানবতাবাদী, সংহতিতে বিশ্বাসী মানুষেরা অন্ত্যত হিংসা, বিদ্বেষ, সংকীর্ণতা ও পাশবিকতাকে দূরে রেখে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চায় এবং অপরকে উৎসাহিত করে। তাই সভ্যতার ইতিহাস মানুষের কৃতির ইতিহাস। অতীতের ঘটনা আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করে। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকে 
বর্তমান সময় পর্যন্ত ছোট বড় ঘটনার গাঁথামালা হলো ইতিকথা। ইতিহাসের বহু ঘটনায় আমাদের জীবনে চিরস্থায়ী চিহ্ন রেখে গেছে । পূর্বার্জিত জ্ঞান বা 'স্কিমা'কে মনে রেখে মানুষ সম পর্যায়ের কোন কাজ করার পূর্বে সাবধান হয়ে ওঠে । মানুষ সেই জ্ঞানকে অভিজ্ঞতা কে মনে রেখে ভুল-ঠিক,উচিত-অনুচিত,কর্তব্য-অকর্তব্য বিষয়টি স্থির করে। সমগ্ৰ বিশ্বে বিভিন্ন দিবস পালন করা হয় যা বিশ্ববাসীকে আয়নার সামনে দাঁড়করায়। যেন আমাদের প্রশ্ন করে আমরা মানবতা, দয়া, সহানুভূতি, সমানুভতি, প্রেম, সৌভ্রাতৃত্ব, মৈত্রী, স্বাধীনতা চাই না হিংসা, বিদ্বেষ, দাঙ্গা, যুদ্ধ, হত্যা, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, শোষণ, বিকৃত মানসিকতা এবং অমানবিকতা চাই। যেখানে পারস্পরিক আলোচনা, শান্তি ও সহযোগিতা সভ্যতাকে সমৃদ্ধ করবে এবং হিংসার আগুন সভ্যতাকে পুড়িয়ে ছাই করে দেবে । যে প্রগতি সকলের জন্য নয় সেখানে সমৃদ্ধি আসে না। সমাজে মূল্যবোধ, মানবতা ও বিবেকের অবক্ষয় ঘটে। তাই "বিশেষ দিবস" পালন আমাদের সেকথাই স্মরণ করিয়ে দেয় বারে বারে। ২১ শে ফেব্রুয়ারি 'আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস', ৫ই জুন 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস', ৮ই মার্চ 'আন্তর্জাতিক নারী দিবস', ২৪ শে অক্টোবর 'জাতিসংঘ দিবস'। তেমনই কিছু কলঙ্কিত দিবসও আছে। 

২য় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নির্দেশে ষাট লক্ষ ইহুদি নিহতের ঘটনায় পালিত হয় ২৭ শে জানুয়ারি 'আন্তর্জাতিক হোলোকাস্ট স্মরণ দিবস'। ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট জাপানের হিরোশিমায় ও ৯ই আগস্ট নাগাসাকি শহরে আমেরিকা পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। সেই ভয়াবহ দিনের স্মরণে পালিত হয় এই দুই তারিখে যথাক্রমে 'হিরোশিমা ও নাগাসাকি স্মরণ দিবস' । ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমায় এবং ১১টা ২ মিনিটে নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। তাই এই দিনে সময়ে সমগ্ৰ জাপানে সাইরেন বাজিয়ে সকলে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। Peace Memorial Park এ বিশ্বনেতাদের উপস্থিততে পারমাণবিক অস্ত্র চিরতরে নিষিদ্ধ করার এবং পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে "শান্তি ঘোষণা" পাঠ করা হয় প্রতিবছর। মৃত শিশুদের স্মরণে কাগজের সারস তৈরি করা হয়। রাতে নদীতে মোমবাতি জ্বালিয়ে কাগজের লন্ঠন ভাসানো হয় ।"শহরের মাঝখানে সূর্য নেমে এলো/বৈশাখের নয়, শ্রাবণের নয়/ এটি অদ্ভুত সূর্য রক্তাভ/ পঙ্গু করে দিয়ে গেল হাজার হাজার প্রাণ ।"
       আমেরিকা কেন জাপানে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ 
করেছিল, এর পেছনে কোন কোন সামরিক, রাজনৈতিক ও
কৌশল কাজ করেছে বিশ্লেষণ করা আবশ্যক। 
১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে জার্মানি ও ইতালি ২য় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে । ইউরোপে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। যুদ্ধের ভয়াবহ চিহ্ন ইউরোপ জুড়ে। কঙ্কালের মতো রূপ ধরেছে ইউরোপ। জাপান ঘোষণা করেছে শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করবে। তাদের 'কামিকাজি' আত্মঘাতী বিমানে অতর্কিতে হামলা চালিয়ে মিত্রপক্ষের (ইংল্যান্ড,ফ্রাস,আমেরিকা, রাশিয়া, চীন) সৈন্য ধ্বংস করে চলেছে।'Potsdam Declaration' এর মাধ্যমে  জাপানকে মিত্রপক্ষ নিঃশর্তে আত্মসমর্পণ করতে বলেছে । ইউরোপে যুদ্ধ শেষ। এশিয়ায় চলছে। আমেরিকার যুক্তি, যুদ্ধ থামাতে হলে জাপানের মূল ভূখণ্ডে সেনা নামাতে হবে তাতে মিত্রপক্ষের লক্ষ লক্ষ সেনার মৃত্যু হবে পাশাপাশি নিরপরাধ জাপানি নাগরিকও । তাই পারমাণবিক বোমা ফেলে ব্যাপক ক্ষতি সীমিত করে। তাদের আত্মপক্ষসমর্থনের যুক্তিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মানতে নারাজ। কারণ জাপানের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বোমা নিক্ষেপের প্রয়োজন ছিল না। এর পেছনে ছিল অন্য কিছু কারণ। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মাঞ্চুরিয়াসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। জাপানের বুকে পারমাণবিক বোমা ফেলে আমেরিকা নিজেদের ক্ষমতা পৃথিবীকে দেখালো,যাতে সোভিয়েত ইউনিয়ন জাপানের বড় একটি অংশ দখল না করে নেয়। এছাড়া সোভিয়েত পূর্ণশক্তিতে যাতে এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত দেশের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম না হয় । সেই কারণেই কোটি কোটি ডলার খরচ করে " ম্যানহাটন প্রজেক্ট" পরিচালনা করে ইউরেনিয়াম ভিত্তিক 'লিটিল বয়' এবং প্লুটোনিয়াম ভিত্তিক 'ফ্যাট ম্যান' নামকরণ যুক্ত পারমাণবিক বোমা ফেলে মানব সভ্যতার ইতিহাসে অত্যন্ত বিপজ্জনক, নৃশংস "পারমাণবিক যুগে"র সূচনা করে আমেরিকা। শোনাযায় ১৯৩৯ সালে জার্মানির এলবার্ড আইনস্টাইন ও হাঙ্গেরির পদার্থবিদ লিও জিলার্ড রুসভেল্টকে গোপনে চিঠি লিখে ন্যাসি জার্মানির গোপন বোমা তৈরির খবর জানায় এবং তাদের দ্রুত পারমাণবিক বোমা তৈরিতে যুক্ত হতে বলেন । পদার্থ বিজ্ঞানী J.Robent Oppenheimer নেতৃত্বে 'Manhattan Project' পরিচালিত হয়, আমেরিকার নিউইয়র্ক এলাকায়। তাঁকে 'Father of the Atomic Bomb' বলা হয়। এই প্রজেক্টে খরচ হয় ২০০ কোটি ডলার । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী ছিল ইউনাইটেড কিংডম এবং কানাডা। যথাক্রমে বিজ্ঞানী ও কাঁচামাল দিয়ে সাহায্য করেছে। এক লক্ষ ত্রিরিশ হাজার কর্মী কাজ করে। ১৯৪৫ সালের ১৬ ই জুলাই নিউ মেক্সিকোর আলমাগোরডা মরুভূমিতে 'Trinity' কোড নামে সফলভাবে পরীক্ষা হয় ।পারমাণবিক বোমাটি যেন বলে--"Now I become Death,the destroyer of worlds" যদিও পারমাণবিক বোমার ধ্বংসাত্মক রূপ দেখে পরবর্তী 
কালে আইনস্টাইন অত্যন্ত লজ্জিত, দুঃখবোধ করেছিলেন। 

                      ২০২৬ পর্যন্ত ১২১৮৭ টি পারমাণবিক বোমা পৃথিবীর কয়েকটি দেশে আছে । রাশিয়ার ৫৪৫৯ থেকে ৫৫৪০টি, আমেরিকায় ৫১১৭ থেকে ৫২৪৩টি,চীনে ৬০০ থেকে ৬২০টি,ফ্রান্সে ২৯০টি, ইংল্যান্ডে ২২৫টি,ভারতে ১৯০ টি, পাকিস্তানে ১৭০টি, ইসরাইলে ৯০টি এবং উত্তর-কোরিয়ায় ৫০টি । দেখা যাচ্ছে রাশিয়া ও আমেরিকা ৮৩ থেকে ৮৬ শতাংশ পরমাণু অস্ত্র বহন করে। বেলজিয়াম, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ড ও তুরস্কে NATO চুক্তি অনুযায়ী আমেরিকা সেখানে তাদের সামরিক ঘাঁটিতে কিছু পারমাণবিক বোমা মজুত রেখেছে।১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের ৩২ টি দেশ নিয়ে গঠিত হয়েছিল North Atlantic Treaty Organization বা NATO । ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ আফ্রিকা একমাত্র দেশ নিজেদের পরমাণু অস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করে। ১৯৯১ সালের ২৬ শেষ ডিসেম্বর সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তানের বিপুল পারমাণবিক অস্ত্র চলে যায় রাশিয়ার হাতে । সোভিয়েত ভেঙে গেলে আমেরিকা ও রাশিয়ার 'ঠান্ডাযুদ্ধ'ও শেষ হয়। রাশিয়া সহ ১৫ টি দেশের জন্ম হয়(ইউক্রেন, জর্জিয়া,কাজাখস্তান,আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান,উজবেকিস্তান, বেলারুশ,লাটাভিয়া ইত্যাদি) এতে রাশিয়ার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে অথচ হাজার হাজার পরমাণু বোমা পড়ে আছে তাদের ঘরে। ১৯৯৩ সালে আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে কুড়ি বছর মেয়াদী চুক্তি হয়। ১৯৯৩ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত এই চুক্তি চলে। দীর্ঘ কুড়ি বছরে রাশিয়া প্রায় কুড়ি হাজার পারমাণবিক বোমা চিরতরে নষ্ট করে। ৫০০ মেট্রিকটন উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি হিসেবে রূপান্তরিত করা হয়। চুক্তি অনুযায়ী পারমাণবিক বোমা ধ্বংস করে এবং তার জ্বালানী আমেরিকাকে‌ দেয়।এর জন্য রাশিয়া ১২০০ কোটি ডলার বা ১২ বিলিয়ন লাভ হয়। ভেঙে পড়া অর্থনীতি সচল হতে সাহায্য করে। 'Megatons to Megawatts' রূপান্তরিত হয়ে আমেরিকার মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ১০% এখান থেকেই আসে কুড়ি বছরে।

                  অর্থাৎ পারমাণবিক বোমাকে ধ্বংস করে তাকে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা যায় । তবে প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল, সংবেদনশীল এবং দীর্ঘমেয়াদী । কারণ এর ভেতরের বিপদজনক তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্লুটোনিয়াম ও ইউরেনিয়াম পিটিয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করা যায় না। Strategic Arms Reduction Treaty হয় ১৯৯১ সালের ৩১ শেষ জুলাই আমেরিকার সঙ্গে USSR এর মধ্যে,সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পাঁচ মাস পূর্বে। আমেরিকার রাষ্ট্রপতি জর্জ এইচ ডাব্লিউ বুশ এবং ইউনিয়নের রাষ্ট্রপতি মিখাইল গর্বাচেভর মধ্যে। ঠিক হয় ২৫ থেকে,৩০ শতাংশ অস্ত্র উভয়ে কমিয়ে ফেলবে । ২০০৯ সালে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় । New star হলো start-1 চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১০ সালের ৮ই এপ্রিল চুক্তি করা হয়। New Start কার্যকর হয় ২০১১ থেকে। স্বাক্ষর করেন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি বারাক ওবমা ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি দিমিত্রি মেদভেদেভ । ২০২১‌ সালে চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি করে ২০২৬ এর ৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত । তবে ২০২২ সালের ২৪ শেষ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে 'বিশেষ সামরিক অভিযানে'ঘোষণা করেন ও পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ শুরু করে দেন, বর্তমানেও চলছে। বিবাদ সৃষ্টি হয় ২০১৪ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনের 'ক্রিমিয়া দ্বীপ' দখল করার মধ্যদিয়ে। বর্তমানে বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নানাভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার  প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এতদিন একচেটিয়াভাবে এই অধিকার ভোগ করে এসেছে আমেরিকা। বর্তমানে রাশিয়ার পাশাপাশি চীন প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্পর্ধা অর্থনৈতিক ভাবে,সামরিক ভাবে দেখাতে শুরু করেছে। উত্তর কোরিয়া কোন প্রতিবন্দকতা তোয়াক্কা না করে পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা করে চলেছে। বর্তমানে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করে নিয়েছে কী না পৃথিবীবাসীর কাছে প্রকাশ করে নি তবে তাদের কাছে ইউরেনিয়াম আছে এটা সত্য । ইরান ইসরাইলের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করতে নিজে সরাসরি এতদিন 
যুদ্ধ করে নি,'ছায়াযুদ্ধ' চালিয়ে গেছে হিজবুল্লাহ,হামাস,হুতির মতো আন্তর্জাতিক স্তরে নিষিদ্ধ সসস্ত্র সংগঠনগুলোকে অর্থ, অস্ত্র সাহায্য করে। ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব হয়। তার পূর্বে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক ভালো ছিল। ক্ষমতা ইসলামী প্রজাতন্ত্রের হাতেই আসার পর ইরানের চোখে আমেরিকা 'গ্রেট শয়তান'এবং ইসরায়েল 'অবৈধ রাষ্ট্র' বলে বিবেচিত হয়। বর্তমানে ইরানের 'হরমুজ' প্রণালীতে  তৈলবাহী জাহাজ ও প্রাকৃতিক গ্যাসের চলাচলে ইরানের  প্রতিবন্ধকতার কারণে আমেরিকা ও ইসরাইল এবং ইরান যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে গেছে। যার প্রভাব সমগ্ৰ বিশ্বের অর্থনীতিতে পড়েছে। ভারত ও পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শত্রুতা, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর স্থায়ী অশান্তি সৃষ্টি করে চলা পারস্পরিক সহযোগিতা বদলে দেশগুলোর মধ্যে অসহিষ্ণুতা, চীনের তাইওয়ান দখলের পরিকল্পনা, উত্তর  আফ্রিকার দেশগুলোর অভাব, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিগুলোর  বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের অবস্থা সৃষ্টি করা,সবল দেশগুলোর সামরিক ও অর্থনৈতিক আগ্ৰাসনের সুকৌশলে দুর্বল দেশগুলির আভ্যন্তরের বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ, ইসরাইলের অস্তিত্বের সংকট, আমেরিকার পরে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উপর চীন, রাশিয়া ও ভারতের প্রভাব বিস্তারের প্রতিক্রিয়া এবং বিশ্বে ছোট বড়ো অমঙ্গলকর অমানবিক ঘটনা পারমাণবিক যুদ্ধের দিকেই কী মানুষ এগিয়ে যাচ্ছে না ?

        শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ চাইলেই পরমাণু বোমাগুলোকে ধ্বংস করে মানব সভ্যতার উন্নয়নে কাজে লাগতে পারে। পরমাণু অস্ত্র নষ্ট করার প্রথম ধাপ হলো-- বোমাটির মুখ (Warhead) থেকে মূল পরমাণু অংশটি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলাদা করা হয়। রোবট ও বিশেষজ্ঞদের নিখুঁত সমন্বয়ে বোমার চারপাশের ইলেকট্রনিক্স তার,ফিউজ এবং সাধারণ বিস্ফোরকগুলি (conventional Explosives) একে একে খুলে ফেলা হয়। প্রথম ধাপকে বলা হয় Dismantling বা অস্ত্র খুলে আলাদা করা। আমেরিকার প্যান্টেক্স প্ল্যান্ট, রাশিয়ার মায়াকে প্ল্যান্ট ও ওজাক্স শহরে এই কাজটি হয়।
           
দ্বিতীয় ধাপে Core Extraction বা তেজস্ক্রিয় জ্বালানি বের করে নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে বোমার বিপদজনক  অংশ কেন্দ্র বা Core যা মূলত প্লুটোনিয়াম--২৩৯(239pu) বা উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU বা Highly Enriched  Uranium) দিয়ে তৈরি। বোমাটি খোলার পর পারমাণবিক  জ্বালানিটুকু বের করে সুরক্ষিত পাত্রে রাখা হয়। 

                  তৃতীয় ধাপে Downblending বা জ্বালানি ব্যবহারে অযোগ্য নিষ্কাশিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ দিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোন বোমা তৈরি করা না যায় তার জন্য রাসায়নিক ও পারমাণবিক রূপের পরিবর্তন করে দেওয়া হয়। উচ্চ সমৃদ্ধ  "ইউরেনিয়াম" যা শূন্য শতাংশ খাঁটি থাকে তাকে নিম্নসমৃদ্ধ  ইউরেনিয়াম এর সঙ্গে মেশানোর ফলে এটা বোমা তৈরির উপযোগী থাকেনা। তখন এটাকে মানব কল্যাণে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ও অন্যান্য কাজে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু "প্লুটানিয়ামকে" ধ্বংস করা কঠিন। সাধারণত অন্য কোন তেজস্ক্রিয় উপাদানের সাথে মিশিয়ে কাঁচ বা সিরামিকের ব্লকের ভেতর আটকে দেওয়া হয় বা Vitrification করা হয় । যাতে এর থেকে অন্য কোন অস্ত্র তৈরি না হয় ।

                  চতুর্থ পর্যায় হল Waste Storage বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদ সংরক্ষণ--যে অংশগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হবে না সেগুলোকে মাটির গভীরে  ভূকম্পমুক্ত সুরক্ষিত পাথরের গুহায় বা Deep Geological  Repository যে শত বৎসর বা তার অধিক সময়ের জন্য 'সিল' করে রেখে দেওয়া হয়। যাতে এই তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশ ও মানুষের ক্ষতি না করতে পারে ।

                  পারমাণবিক বোমার ক্ষতিকারক উপাদান গুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে মানবজীবনে মঙ্গলজনক কাজে ব্যবহার করা যায় যেসব ক্ষেত্রে---(১) পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশ বান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনে (২) ক্যান্সারের কোষ ধ্বংস করতে, থাইরয়েড থেরাপিতে, শরীরের ভেতরে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ, রক্ত সঞ্চালন, হৃদয় ও মস্তিষ্কের অবস্থা নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যবহার করা যায়। (৩) মহাকাশ অভিযান ও দূরবর্তী মিশনে রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেক্ট্রনি জেনারেটর এর সাহায্যে তাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় । নাসার ভয়েজার, কিউরিওসিটি রোভার,  পারসিভারেন্স রোভার এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি, মঙ্গল অভিযানে ও গভীর মহাকাশে কাজ করা হয়েছে। (৪) উচ্চ ফলনশীল বীজ এর সাহায্যে উৎপাদন সম্ভব, জিনগত পরিবর্তন করে। খাদ্য সংরক্ষণ, পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। বিমান, সেতু বা জলের নীচে বড় পাইপলাইনের ধাতব অংশে অদৃশ্য ফাটল আছে কিনা তা পরীক্ষা করা, ভূগর্ভস্থ জলের সনাক্তকরণ এর দ্বারা সম্ভব। 

                 তুলনামূলক গরিব দেশের পক্ষে বিলিয়ন ডলার খরচ করে ঐতিহ্যবাহী পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরি করা সম্ভব নয়। তবে এর সমাধান হল Small Modular Reactors যার খরচ কম, নিরাপদ ও সহজ পরিবহনযোগ্য। Thermal energy কে ব্যবহার করে সমুদ্রের লবণাক্ত জলকে পানীয় জলে রূপান্তর করা সম্ভব। আফ্রিকার শুষ্ক দেশে, মধ্যপ্রাচ্যের মরুদেশে করা হয়। উন্নত দেশগুলো নিজেদের খরচায় গরীব দেশে thermal plant তৈরি করে‌ তাদের বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সুবিধা দিতে পারে।

                   তবে পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল । যেসব দেশে ঘন ঘন অভুত্থান হয়, গৃহযুদ্ধ চলছে, সন্ত্রাসবাদি গোষ্ঠীর সক্রিয় উপস্থিতি আছে যেমন ইয়েমেন, সাউথ সুদান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক প্রভৃতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হাতে পারমাণবিক জ্বালানি ও প্রযুক্তি চলে এলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। গোটা বিশ্বে ভয়াবহ ধ্বংস নেমে আসবে। পারমাণবিক বোমা কোন সাধারণ বোমা নয়,এটা মহা বিনাশের অন্যতম হাতিয়ার, যা ইতিমধ্যেই মানুষ অর্জন করেছে। বিজ্ঞানের এই প্রযুক্তিকে অসৎ ভাবে ব্যবহার করলে তার পরিণতি হবে ভয়ানক। হিরোশিমা ও নাগাসাকি পৃথিবীর কাছে উদাহরণ হয়ে আছে। পৃথিবীতে শান্তি, সমৃদ্ধি ও মানবতাকে টিকিয়ে রাখবার জন্য অর্থ ও মূল্যবান সময়কে মানব কল্যাণে ব্যবহার করা উচিত, তবেই আমরা প্রকৃত সভ্য বলে বিবেচিত হবো। না হলে --
  "ধ্বংস দাঁড়িয়ে তোমার ঘরের দুয়ারে/অগণিত পরমাণু বোমা বুকে পৃথিবী চলেছে ঘুরে/নিশি স্বপ্নে আঁতকে ওঠে পৃথিবী রোজ/অগণিত হিরোশিমা অগণিত নাগাসাকি হতে পারে মুহূর্তে/ভবিষ্যৎ পৃথিবীর মানচিত্রে ! "

No comments:

Post a Comment