পরিকল্পিত গনহত্যা ও আইনস্টাইনের একটি চিঠি
মাল্যবান মিত্র
"ওরে হাল্লা রাজার সেনা , তোরা যুদ্ধ করে করবি কি তা বল !" এই বাক্যের অনুধাবন ও আত্মীকরন একালের কিংবা অতীতের বেশিরভাগ শক্তিধর ক্ষমতাশালী মানুষেরাই করতে ব্যর্থ হয়েছেন নির্মম ভাবে। আর তাই এই পৃথিবীর বুকে ঘটে গিয়েছে দুটো বিশ্বযুদ্ধ , একদল ক্ষমতালোভী মানুষের মনোবাসনা চরিতার্থ করবার দাম দিতে হয়েছে পৃথিবীর অগণ্য মানুষকে এবং এই পরিকল্পিত গণহত্যার ইতিহাস বেড়েই চলেছে।
যতদিন পৃথিবীতে যুদ্ধ হবে, ততদিন একটি ঐতিহাসিক চিঠির গুরুত্ব বজায় থাকবে। চিঠিটির প্রাপক আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডেলানো রুজভেল্ট এবং প্রেরক হিসেবে সাক্ষর করেছিলেন আপেক্ষিকতাবাদ তত্বের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন। যার প্রেক্ষিতে পরবর্তীকালে রুজভেল্ট তাঁর যুদ্ধসচিব হেনরি স্টিমসন কে উদ্দেশ্য করে বলতে হয়েছিল সেই অমোঘ উক্তি "পা ! দিস রিকোয়ার্স অ্যাকশন!"
মাত্র ষোলো বছর বয়েসে সামরিক আইনের জাঁতাকলে পরে বুদাপেস্ট টেকনিক্যাল একাডেমির ছাত্র লিও সিলার্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সৈনিকবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন ; যুদ্ধের প্রতক্ষ্য রূপ ও সামরিক কর্তাদের অমানুষিক ব্যবহার সিলার্ডকে আজন্ম যুদ্ধ বিরোধী করে তুলেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে তিনি বুদাপেস্ট থেকে বার্লিনে চলে আসেন ও চার নোবেল প্রাইজ প্রাপক অধ্যাপক আইনস্টাইন , ফন লে , ম্যাক্স প্লাঙ্ক ও নেনর্স্ট এর প্রভাবে নিজেকে গড়ে তোলেন বিজ্ঞানসাধক হিসেবে। হিটলার যখন জার্মানির ক্ষমতা দখল করে , সেসময় বিখ্যাত নিউক্লিয়ার ফিজিসিস্ট লিও সিলার্ড , কাইজার উইলহেম ইনস্টিটিউটে অবৈতনিক লেকচারার হিসেবে অধ্যাপনা করতেন । ১৯৩০ -এর দশকে নাৎসি এবং ফ্যাসিবাদী দমন থেকে বাঁচতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে এসেছিলেন সিলার্ড ।
জার্মানিতে থাকার সুবাদে সিলার্ড বুঝতে পেরেছিলেন , হিটলারের ন্যাক্কারজনক “Rassenhygiene” বা Racial Hygiene ও ‘ Holocaust ’বা ইহুদি বিতারন এর মতো দমননীতির ফলস্বরূপ সেসময়ের বহু বরেণ্য বিজ্ঞানসাধক জার্মানি থেকে চলে গেলেও বাধ্য হয়ে রয়ে গেছেন হাইজেনবার্ক , অটো হ্যান , ফন লে , থেকে গেছেন গণিত সাগর ডেভিড হিলবার্ট এর মতো কিছু বিজ্ঞানী যারা পরমাণু শক্তি কে কাজে লাগিয়ে সবার আগে তৈরী করে ফেলতে পারেন অত্যন্ত্য শক্তিশালী একটি অস্ত্র “Atom Bomb”। লিও সিলার্ড , এনরিকো ফার্মি ইউজিন উইগনার এডওয়ার্ড টেলর এবং জর্জ গ্যামো এই সমস্ত সহ- বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা করে ঠিক করলেন পারমানবিক শক্তি ব্যবহার করে যে দানবিক অস্ত্র তৈরী করা সম্ভব সেটা আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কে জানাবেন এবং এই মহাশক্তির অপব্যবহার সম্পর্কে অবহিত করবেন। তাদের ধারণা হয়েছিল জার্মান বিজ্ঞানীরা পারমাণবিক বোমা পৃথিবীতে সর্বপ্রথম তৈরি করে ফেললে , হিটলার এই অবিশ্বাস্য শক্তিশালী বোমা দখল করে পৃথিবী দখল করতে উদ্যত হতে পারেন। হিটলারের মতো একজন যুদ্ধলোলুপ মানুষের হাতে এই অস্ত্র পৌঁছলে পৃথিবীর অবস্থা কি হবে সেটা নিয়ে সিলার্ড সবচাইতে বেশি চিন্তিত ছিলেন। তিনি ইউজিন উইগনার কে সঙ্গে নিয়ে লং-আইল্যান্ডে আইনস্টাইনের নিভৃতবাসে পৌঁছলেন এবং নিজের শিক্ষক , ইউনিফাইডফিল্ড তত্ত্বে বিভোর আইনস্টাইনকে অবহিত করলেন তৎকালীন সবচেয়ে বড় বিজ্ঞান আবিষ্কারের অপব্যবহার করার সম্ভাবনা যা পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে সক্ষম। চিঠি লেখা হল, আইনস্টাইন প্রেরক হিসেবে সাক্ষর করলেন ঐতিহাসিক চিঠিটিতে।
রু
দীর্ঘ আড়াই মাসের চেষ্টার পর ১১ ই অক্টোবর ১৯৩৯ , ওয়াল স্ট্রিট এর অর্থনীতিবিদ এবং রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্টের দীর্ঘদিনের বন্ধু , আলেকজান্ডার শ্যাক্স, আলবার্ট আইনস্টাইনের আগস্টে লেখা চিঠিটি নিয়ে আলোচনা করার জন্য হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপতির সাথে দেখা করার অনুমতি পেলেন। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানের গূঢ়তত্ব সমন্বিত এই চিঠি প্রভাব ফেলতে পারেনি প্রেসিডেন্টের মননে, তিনি আইনস্টাইনের সম্মান রক্ষার্থে পুরো চিঠিটি শুনেছিলেন মাত্র, চিঠির বক্তব্যের সুদূরপ্রসারী ফলাফল সম্পর্কে ধারণাই করতে পারেননি তদানীন্তন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট, শুধুমাত্র বিজ্ঞানের একটি নতুন আবিষ্কার-এর খবর হিসেবে গ্রাহ্য করেছিলেন, আসলে বিখ্যাত লেখক নারায়ণ সান্যালের ভাষায় "বিজ্ঞান তখনো রাজনীতির নাগপাশে সম্পূর্ণ আবদ্ধ হয়নি"। পরের দিন শ্যাক্স আবার দেখা করেন প্রেসিডেন্টের সাথে এবং নেপলিয়ানের আধুনিক অস্ত্রের ব্যাবহার ও প্রথম বাস্প-চালিত জাহাজ ব্যাবহারের ঘটনা মনে করান রুজভেল্টকে এবং মনে করান এইসব পদক্ষেপ এর সুদূরপ্রসারি ফলাফল যা পৃথিবীর ইতিহাস অন্যভাবে লিখতে বাধ্য করেছিলো ।
রু
আজো পৃথিবীতে যুদ্ধ হচ্ছে পারমানবিক শক্তির ব্যাবহার , যোগান ও তাকে নিয়ে করা ব্যবসার রাজনৈতিক অঙ্কের যোগবিয়োগের ভিত্তিতে। কি কারনে এই যুদ্ধ তা বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের কাছেই অজানা ; তবু যুদ্ধের ফলভোগ করতে হচ্ছে তাঁদের বর্তমান প্রজন্মকে , হয়ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দিতে হবে এর মাসুল! যেমন হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণুবোমা বিস্ফোরণের পর ৭০ বছর পার হয়ে গেছে তবু ইউরেনিয়াম বোমার তেজস্ক্রিয় রশ্মির প্রভাব হিসেবে বিকলাঙ্গ শরীর - অপরিণত মস্তিস্ক নিয়ে আজো জাপানে জন্মাচ্ছে বহু শিশু। “ Budapest Memorendam On Security Assurance” ও “Treaty on the Non-Proliferation of Nuclear Weapons” সই করা ইউক্রেন রাশিয়ার উপর আর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না , ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার দেয়া নিরাপত্তা আশ্বাস থেকে বেরিয়ে NATO (The North Atlantic Treaty Organization) এর হাত ধরতে চাইছে ইউক্রেন। আর বিশ্বের তৃতীয় সর্ববৃহৎ পারমানবিক শক্তির যোগানদার রাশিয়ার অন্যতম আপত্তি সেখানে। অন্যদিকে দেশের সীমানা বাড়ানোর চেষ্টা থেকে নিজেদের নিঃস্পৃহ রাখার চুক্তি অমান্য করে ইউক্রেন এর পার্শ্ববর্তী ছোট জনপদ দখলে উদ্যত হওয়াও এই নরমেধ যজ্ঞর আরেকটি প্রধান কারণ।
প্রাত্যহিক সংবাদপত্রের পাতায় রোজ ছাপা হচ্ছে যুদ্ধের ছবি যা সাধারণ জনমানসের মানসিক স্বাস্থ্যে আঘাত হানার পক্ষে যথেষ্ট। , প্রতিনিয়ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসংখ্য মানুষ । এই বিশ্ব অনেকগুলি যুদ্ধ দেখেছে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে তৈরী "ম্যানহাটান প্রজেক্টের" ফসল শুধু আধুনিক যুদ্ধের খোলনলচে বদলে দেয়নি, স্থায়ী বদল ঘটিয়েছিল যে কোনো দেশের নিরাপত্তা ভাবনা, রণনীতি থেকে শুরু করে পররাষ্ট্র নীতি, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থানের। অতীতের মতো বর্তমানেও বিজ্ঞান কে আশীর্বাদ হিসেবে ব্যাবহার না করে অভিশাপ রূপে ব্যাবহার করার চেষ্টা দূরদর্শী বিজ্ঞানসাধক লিও সিলার্ড-এর সমস্ত অশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আইনস্টাইনের সাক্ষর করা ঐতিহাসিক চিঠিটির সঠিক ও যথার্থ মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে বিশ্বের বেশিরভাগ ক্ষমতাশালী দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। তবে আশা রাখি আর কোনো ‘লিটিল বয়’ বা ‘ফ্যাট ম্যান‘ আছ্ড়ে পড়বে না কিয়েভের কোনো গির্জায়, অতীতে বহু যুদ্ধ দেখা ক্রিমিয়ার প্রান্তরে কিংবা "কালো সমুদ্রের" তটভূমিতে, বরঞ্চ ক্রিমিয়ার পুনরায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠা মাটিতে নতুন করে আবার দেখা মিলবে অনেক "লেডি উইথ দি ল্যাম্প" ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গেলের।

No comments:
Post a Comment