অশ্বমেধের ঘোড়া
রণিতা দত্ত
পোস্তকে রোজ নতুন নতুন গল্প শোনাতে হয়।
ওর মায়ের কড়া নির্দেশ বাচ্চার স্ক্রিনটাইম জিরো থাকবে । এই অনুশাসনে দাদু পরাগবাবুর ডিউটি হলো গল্পবলা। রামায়ণ মহাভারতের গল্প শুনে চার বছরের পোস্তর কত কি যে প্রশ্ন। সাধ্যমত উত্তর দেন পরাগবাবু।
হঠাৎ একদিন প্রশ্ন , " দাদু অশ্বমেধ যজ্ঞ কি?
বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করলেন পরাগবাবু।
"অশ্ব মানে হর্স -ঘোড়া।আগেকার দিনে স্ট্রং রাজারা একটা ঘোড়াকে ছেড়ে দিতেন। ঘোড়া ইচ্ছে মত ঘুরতো। ঘোড়া দূর দুরন্তের রাজ্যে রাজ্যে ঢুকে পড়তো । যে যে রাজ্য দিয়ে ঘোড়াটা যেত সেসব রাজ্য ওই বড় রাজাকে নিজেদের রাজা বলে মেনে নিত। ওই রাজার রাজ্যে যজ্ঞ চলত অনেক দিন ধরে। শেষে অনেক রাজ্যে
ঘুরে ঘোড়াটা নিজের রাজ্যে ফেরত আসতো। তখন বিরাট যজ্ঞ হতো। ঘোড়াকে তখন যজ্ঞে বলি দিত। সেই যজ্ঞের নাম অশ্বমেধ যজ্ঞ।"
"কোন দাদু কোন রাজা তো ওই ঘোড়াটাকে ধরে নিতে পারতো? "
" না দাদুভাই, কেউ সেই ঘোড়াকে ধরলেই স্ট্রং রাজার সাথে যুদ্ধ। ভয়ানক যুদ্ধ করে স্ট্রং রাজা ছোট রাজ্যকে শেষ করে দিত । "
" দাদু যুদ্ধে রাজ্যও শেষ হয়? কেমন করে দাদু?"
"হ্যাঁ ,মানুষ মরে, বাড়িঘর, রাস্তাঘাট গুড়িয়ে যায়। যুদ্ধ খাবাপ জিনিস দাদুভাই।"
পোস্ত একটু একটু করে বড় হচ্ছে। এখনো ওকে গল্প বলেন পরাগবাবু। গল্প ক্রমশ বদলে যায়।
যুদ্ধের গল্পে কৌতূহল। জিজ্ঞেসা ক্রমশ বাড়ে। পোস্ত বাবা- মাকে প্রশ্ন করে ঘাঁটায় না। তারা ক্যারিয়ার নিয়ে বেজায় ব্যস্ত । প্রশ্ন করার জন্য পরাগবাবুকে বেছে নিয়েছে তাই।
পরাগবাবু টিভিতে খবর শোনেন। খবর জুড়েই শুধু যুদ্ধ আর যুদ্ধ। হামলা, মিসাইল, ক্ষেপনাস্ত্র। পোস্ত অনুযোগের সুরে বললো ,"খবর না ছাই। তুমি তো শুধু টিভিতে যুদ্ধ দ্যাখো। যুদ্ধ খারাপ জিনিস। তবু দেখ।"
পরাগবাবু খানিকটা অসহায় ভাবে বলল, " কী করবো দাদুভাই, সারা পৃথিবী জুড়ে যে অনেক অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটছে। ছুটেই চলছে। যারা ঘোড়া আটকাচ্ছে তাদের ওপর মিসাইল চলাচ্ছে স্ট্রং স্ট্রং কিংয়েরা । অসহায় মানুষগুলো মরছে, পায়ের তলে পিষে যাওয়া পিঁপড়েদের মতো।
কিংরা মরেনা। আক্রান্ত দেশগুলোর রাজা মন্ত্রী সব মাটির নিচে বাঙ্কারে লুকিয়ে থাকে । আহত অভুক্ত, তৃষ্ণার্ত, আতঙ্কিত সাধারণ মানুষগুলো পালানোর পথ খুঁজে পায় না।"
" এখন কোথায় যুদ্ধ হচ্ছে দাদু?"
পরাগবাবু বলেন , " কঠিন সেই সব দেশের নাম। ইজরাইল, আমেরিকা, ইরান, প্যালেস্টাইন, ইউক্রেন.. কত দেশে আবার ঘরের মধ্যে ই যুদ্ধ ।"
পোস্ত কী বুঝলো, কে জানে। একটু ভেবে বলল, "যুদ্ধ লাগলে বাচ্চারা তখন কি করে দাদু? ওরাও কি যুদ্ধ করে?
পরাগবাবু বলেন "তোমাকে শুনিয়েছি সেই যুদ্ধের গল্প যখন গোটা পৃথিবীর প্রায় সব দেশ জুড়ে গিয়েছিলো। কি নাম যুদ্ধের মনে আছে তো ?"
"হ্যাঁ! ফার্স্ট এন্ড সেকেন্ড ওয়ার্ডওয়ার!"
"কাদের মধ্যে হয়েছিল বল দেখি?"
"সেন্ট্রাল এন্ড অ্যালায়েন পাওয়ার।"
"হ্যাঁ ঠিক বলেছো।শোন তাহলে তখন যুদ্ধ প্রায় থেমে গেছে। পশ্চিমের দেশ হার স্বীকার করে নিয়েছে। পূবের ছোট্ট দেশ জাপান। তখনও অ্যালায়েন পাওয়ারের সাথে পুরো দমে লড়ে যাচ্ছে। জাপানের সব বড় শহর গেছে গুড়িয়ে। হিরোসিমায় তখনও বোমার তান্ডব হয়নি। তবে সবাই আছে ভয়ে ভয়ে। হয়তো বোমারু আমেরিকান বিমান আসলো বলে । শহরে থমথমে ভাব। প্রাইমারী ইস্কুলে ভোরেই হাজিরা। এখন ওখানে পড়ালেখা হচ্ছে না। বড় ছাত্ররা গর্ত খুঁড়েছে বোমার আক্রমণ থেকে বাঁচতে। ছোটরা মাটি সরিয়ে দিচ্ছে ।"
উৎসুক চোখ পোস্তর।
"সেদিন ৬ই আগস্ট।রেইকোরা স্কুলে। খোঁড়া গর্ত থেকে মাটি সরাচ্ছে। হঠাৎ ৭টা বেজে ৯মিনিটে হিরোসিমার আকাশে দেখা গেল আমেরিকান যুদ্ধ বিমান। রেডিও দিল সতর্ক বার্তা । সাইরেন বেজলো। শহরবাসী প্রাণ নিয়ে যে যার মত ছুটলো। সেফ হাউজে আশ্রয় নিল। প্লেনটা দু তিন পাক খেল। ফিরে চলে গেল। আবার সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত।"
মৃদু হাসি পোস্তর মুখে।ও বোঝেনি এরপর গল্প কি বীভৎস হতে যাচ্ছে।
"ঠিক ৪৫ মিনিট কেটে গেছে, ৮:১০ মিনিট।
একসাথে তিনটে যুদ্ধ বিমানকে হিরোসিমার আকাশে দেখা গেল ।এবারে সাইরেন বাজেনি, রেডিও বার্তা দেয়নি।সবাই ভেবেছে হয়তো
পাক মেরে যাবে চলে।
"তারপর ? বোমা পড়লো দাদু ?" পোস্তর কৌতূহল তুঙ্গে।
"যে'সে বোমা নয়। প্লেনের 'বোম বে'তে ঘুমিয়ে ছিল ' লিটন বয়'। সাংঘাতিক এক পারমাণবিক বোমা। বিমান থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের পতন। সঙ্গে সঙ্গে প্রবল আলোর ঝলকানি। যেন শ'খানেক সূর্য। যারা অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল,সব্বার চোখের রেটিনা জ্বলে গেল। তারা আর কোনদিন কিছু দেখতে পেল না। রেইকো বুদ্ধি করে এক লাফে পাশের এক পুকুরে গিয়ে পড়লো। কঁচুরিপানার নিচে ডুবে থাকলো। দম বন্ধ করে। প্রচন্ড জোরে আওয়াজ হলো। অনেকের কানের পর্দা ফেটে গেল। সঙ্গে ঝনঝন ঝণাৎ শব্দ। কাঁচের দরজা জানলাগুলো চুরচুর করে ভাঙলো। রেইকো মুখ তুলে দেখে সবকিছু দাউদাউ করে জ্বলছে। বন্ধুরা দূরে দূরে ছিটকে পড়ে। ঝলসানো বন্ধুদের শরীর থেকে মাংসের টুকরো যেন খুলে লেজের মত ঝুলছে। কাঁদতে কাঁদতে বন্ধুদের নাম ধরে ডাকতে থাকলো। দেখে যাদের একটু প্রাণ অবশিষ্ট আছে তারা ঝলসে যাওয়া দেহ গলেপড়া মাংসের ডেলা নিয়ে অনেকে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে। রেইকোর ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। এমন সময় বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির দানাগুলো কালো, বড় বড়, চটচটে। জিভ বের করে কয়েকফোঁটা বৃষ্টির জল ঠোঁট দিয়ে চেটে নিল রেইকো। রেইকোর শুরু হলো মারাত্মক পেটব্যাথা। কালোবমি। সেভাবে ই পেটে হাত চিপে সে ছুটলো বাড়ির দিকে।"
"বৃষ্টির জলে এমন কি ছিল দাদু?"
"তেজস্ক্রিয় মৌল। সাংঘাতিক বিষ। ধীরে ধীরে পচিয়ে দেয় শরীর ।"
"কি হলো তারপর?"
"রেইকো দেখে চারিদিকে শুধু ঝলসে যাওয়া মৃত দেহের স্তুপ। বন্ধু শিয়াকুকে দেখলো রেইকো ।ইস্কুলবাড়ির এককোণে। ওর শরীরের ডানদিক গলে গলে পড়ছে। রেইকোর কাঁধে তুলে নিল শিয়াকুকে। এসে দেখে ওদের বাড়িঘরে কিছু অবশিষ্ট নেই। রেইকো দেখে মাকে। অবয়ব ঝলসে গেছে।মা হাতে কিছু ধরে টোলছে। যতটা সম্ভব মার কাছে গেল। দেখলো মায়ের হাতে ধরা মায়ের শরীরেরই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্লীহা পাকস্থলী।আরও কাছে যাবে এমন সময় রেইকোর মা ধপ করে পড়ে গেল। ছটফট করে থেমেও গেল। শিয়াকু বাড়ি গিয়ে বাপ্ মা বোন যে যেখানে ছিল ওদের কাউকে দেখলোনা। দেখলো ওদের একটা ছায়া রয়ে গেছে । কারো দেহ নেই । একদম সেন্টারে হিট এতো হয়েছিল যে ওরা বাষ্প হয়ে গেছে।"
"কত হিট দাদু?"
"৭০০০°ফারেহাইট। কল্পনা করতেও পারিনা।"
"তারপর রেইকোর কি হলো? বেঁচে গেল দাদু? আর শিয়াকু?
"সেদিন কয়েক লক্ষ লোক মরেছে জ্বলে পুড়ে। পারমাণবিক বোমায় যারা মরলো না, আপাতত বেঁচে গেল বলে নিজেদের ভাগ্যবান ভাবছিল , তারা হিবাকসু। "
"হিবাকসু? সে আবার কি?"
"পরে ভুগে ভুগে ,কষ্ট পেয়ে যারা বেঁচে ছিল তারাও মরলো। রেইকোও অনেক বছর ধরে কালো বমি করতে করতে মরলো। শিকাকুর পোড়া অংশে পচন লাগলো । যারা মরলো না, তারা বিকলাঙ্গ হয়ে বেঁচে থাকলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম।"
"আশি বছর পেরিয়েছে এখনো আছে হিবাকসু!"
"তিনদিন পর, ৯আগস্ট। আবার জাপানের এক দ্বীপ নাগাসাকিতে পড়লো পারমাণবিক বোমা। আবার মৃত্যু মিছিল। "
পোস্ত আর একটি কথাও বললনা। কৌতূহল দেখালো না। প্রশ্ন ও না। চুপচাপ চলে গেল নিজের ঘরে। বেরিয়ে এল। হাতে গ্লোব ।
"আচ্ছা দাদু আমাকে দেখাও কোথায় কোথায় আজও ছুটছে অশ্বমেধের ঘোড়া। আমি যাবো সেই ঘোড়াদের আটকাতে। আমাকে বলে দাও শুধু। দেখ আমি পারি কি না যুদ্ধ থামিয়ে দিতে।"
পরাগবাবু নাতির বিশ্বাসে আঘাত না করে ওকে বুকে জড়িয়ে নিলেন.....

No comments:
Post a Comment