নেতাজির টানে স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন উত্তম কুমার
বটু কৃষ্ণ হালদার
নেতাজি হলেন এক মহামানব,কারো চোখে ভগবান,জাতীয়তা বাদী দেশ প্রেমিক হিসেবে নেতাজির প্রেমে পড়েনি এমন ভারত বাসী বোধহয় খুব কম।বিশেষ করে দেশের যুব সমাজ তো নয়।তিনি এমন ব্যাক্তিত্ব ছিলেন, যাঁকে হিটলার ও সমীহ করতেন এ তো কারো অজানা নয়।ঠিক তেমন তাঁর স্বদেশীকতা প্রেমে মত্ত হয়ে মহানায়ক উত্তম কুমার স্বদেশী কথার বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগদান করতে থাকেন।
বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম সফল ও জনপ্রিয় নায়কদের তালিকায় নিশ্চয়ই আসবে উত্তম কুমারের নাম।৭০_৮০ দশকেরই তিনি ছিলেন বাংলার অন্যতম রকস্টার।
চলচ্চিত্র জগতে বাঙালি’ এই কথাটি শুনলে সকলের মানসপটে সর্বপ্রথম যাঁর ছবি ভেসে ওঠে তা হল এক ঝাঁক কোকড়ানো চুল, ফর্সা, চ্যাপটা নাক,রাশভারী মুখ, চওড়া কপাল,মলিন হাসি।তিনি হলেন বাঙালির ম্যাটিনি আইডল।নিজের অভিনয় দক্ষতাকে বিশ্বমানের করে তুলেছিলেন। রোমান্টসিজমে মুগ্ধ করেছিলেন সমগ্র বিশ্ববাসীকে।আজ পর্যন্ত বাংলা ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রিতে তাঁর জায়গা নেওয়ার মতো দ্বিতীয় কাউকে খুঁজে পায়নি বঙ্গবাসী। তাইতো তাঁর স্থান আজও শূন্যে পড়ে। তাই আজও অনেকের মুখে বলতে শোনা যায়– বাংলা সিনেমায় নায়ক আগেও ছিলেন, এখনও আছেন। কিন্তু মহানায়ক একজনই।
শুধু কি তিনি অভিনেতা।কিন্তু এসবের ভিড়ে চাপা পড়ে যায় বাঙালির এই রোমান্টিক হিরোর জীবনের বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য। রক্তমাংসের অরুণ চট্টোপাধ্যায়ের সকল চরিত্র-বৈশিষ্ট্যের মতো এটিও যেনো চারিয়ে গেলো বাঙালির মহানায়ক উত্তম কুমারের অভিনয় সত্ত্বায়।তা হলো তাঁর— স্বদেশপ্রীতি।খুব ছোট থেকেই উত্তমকুমার থিয়েটার, নাটক ইত্যাদি করতেন। তখন থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে আত্মপরিচয় প্রকাশ করা। পাশাপাশি দেশাত্মবোধক গানও লিখতেন তিনি। গোপনে যোগযোগ রাখতেন বিপ্লবীদের সঙ্গে। দেশপ্রেমিক এই মানুষটি বিধায়ক ভট্টাচার্যের ‘তাইতো’ নাটকটির রিহার্সাল চলাকালীন লিখে ফেললেন দেশের জন্যে একের পর এক গান।
তিনি বিপ্লবীদের মত বন্দুক-পিস্তল দিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে লড়েননি, কিন্তু অভিনয় করতে করতে বারবার তাঁর মাথায় এসেছে একটাই প্রশ্ন – “দেশের জন্যে আমি কি করতে পারি?” এ দিকে তিনি পরিবারের বড় ছেলে।সংসারের ভার এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে। বাড়ির আর্থিক অবস্থাও ভালো নয়। বাধ্য হয়ে এক সময় পোর্ট ট্রাস্টের চাকরিও করতে শুরু করেন। কিন্তু দেশের জন্য কিছু করার মানসিকতায় কোনও দিন খামতি ছিল না।
মহাত্মা গান্ধী ভারতছাড়ো আন্দোলনের ডাক দিলেন।মেদিনীপুরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিলেন ৬৬ বছরের বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা।দেশের পরিস্থিতি উত্তাল। ভবানীপুরে বসে দেশের এই সমস্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির খোঁজখবর রাখছেন ১৬ বছরের এক কিশোর।নাম অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়। তখনও ‘উত্তমকুমার’ হননি। বন্ধুবান্ধব নিয়ে তিনি নিজের মতো করে ব্রিটিশ অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন আর দেশপ্রেমের বীজ রোপণ করছেন দেশবাসীর মধ্যে। তাই পরবর্তীতে উত্তমকুমার নিজের স্মৃতিচারণে বলেন—বন্ধুদের জুটিয়ে ভবানীপুরে প্রভাতফেরি করতেন তাঁরা মাঝেমধ্যেই। হাতে থাকত ত্রিবর্ণরঞ্জিত জাতীয় পতাকা। আর দেশাত্মবোধক গান লিখে সুর দিতেন উত্তম নিজেই। পথে-পথে ঘুরে সবাই মিলে গাইতেন সেই গান।
দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মদিনে কলকাতার রাস্তায় বেরিয়েছে প্রভাত ফেরি। নেতাজিকে নিয়ে না শোনা একটি গান গেয়ে এগিয়ে চলেছেন একদল যুবক। গানের কথাগুলি ছিল ঠিক এরকম —
“সুভাষেরই জন্মদিনে গাইব নতুন গান
সেই সুরেতে জাগবে মানুষ,জাগবে নতুন প্রাণ।”
প্রভাত ফেরির একেবারে সামনের সারিতে থাকা এক যুবক সুরেলা কণ্ঠে বাকিদের সঙ্গে গেয়ে এগিয়ে চলেছেন। তিনিই গানটি লিখেছিলেন এবং সুরও করেছিলেন। যুবকটির নাম অরুণ চট্টোপাধ্যায়। ভবানীপুর অঞ্চলে সকলেই তাঁকে চেনেন। পরবর্তীকালে গোটা যাঁকে দেশ চিনেছে উত্তম কুমার নামে।
এ থেকেই বোঝা যায়– অন্য পাঁচটা বাঙালির মতোই দেশপ্রেমিক মহানায়কেরও মনের মণিকোঠায় দেশনায়ক সুভাষচন্দ্র অনেকটা জায়গা জুড়ে বিরাজ করতেন । তাইতো তিনি নিজের স্মৃতিচারণে লিখেছিলেন, “আমাদের একমাত্র সহায় তখন নেতাজী। আমরা তখন নতুন আশার বাণীতে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি।
INA র বীর সৈন্যদের তখন বিচার চলছে দিল্লির লালকেল্লায়। নেতাজি বিমান দুর্ঘটনার নাটকীয়তায় হারিয়ে গিয়েছেন কিন্তু ততদিনে দেশবাসীর মনে তিনি জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছেন – দেশপ্রেমের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ।‘দিল্লি চলো, চলো দিল্লি’ মন্ত্রে জেগে উঠেছে দেশবাসী। দেশের সর্বত্র নেতাজির INA সৈন্যদের মুক্তির দাবিতে প্রতিবাদ মিছিল বের হয়েছে।দেশের এইরূপ পরিস্থিতিতে একদিন উত্তমকুমার সোজা চলে গেলেন অনুশীলন সমিতির সদস্য বিপ্লবী সতীশচন্দ্র বসুর কাছে। তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,দেশের এই পরিস্থিতিতে আমি আপনাদের জন্যে কি করতে পারি বলুন?
সতীশচন্দ্র উত্তমকে কিছু আর্থিক সাহায্য করতে বলেন কারণ মামলার খরচ চালানোর জন্য তখন অনেক অর্থের প্রয়োজন। সেই সময় উত্তমকুমারের উদ্যোগে লুনার ক্লাবের পক্ষ থেকে একটি চ্যারিটি শো আয়োজিত হয়। সেই শো তে মঞ্চস্থ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস। সেই শো-এর টিকিট বিক্রি করে ১৭০০ টাকা জোগাড় করেছিলেন উত্তম কুমার। ১৯৪৬ সালে দাঁড়িয়ে এই টাকার মূল্য নেহাৎই কম কিছু ছিল না।সেই টাকা সতীশ চন্দ্র বসুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
সবশেষে বলি, ১৯৭৭ সালে ‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের’ ‘পথের দাবী’ অবলম্বনে নির্মিত পিযুষ বসু পরিচালিত ‘সব্যসাচী’ সিনেমায় নিজের অভিনয় দক্ষতায় মানুষটি যেমন জয় করেছেন দেশবাসীর মনন, তেমনি নিজের সমগ্র জীবন দেশপ্রেমের বাতাবরণে ছেয়ে নির্মাণ করেছেন নিজ চরিত্রের সুদৃঢ় গড়ন।একদিকে তিনি মহা নায়ক অন্যদিকে হৃদয়ে বসিয়েছিলেন স্বদেশকে।তাঁর স্বদেশ নামক হৃদয়ে নিঃসন্দেহে ভগবানের আসন পেয়েছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু।

No comments:
Post a Comment