Tuesday, August 4, 2026


 

রাখী বন্ধন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ

চিত্রা পাল  

                              

রাখী বন্ধন বা রক্ষা বন্ধন আমাদের এক পবিত্র উত্‌সব,যেদিন ভাইবোনের সম্পর্কের বাত্‌সরিক উদ্‌যাপন করা হয়।এই পবিত্র দিনে বোনেরা ভাইদের কপালে চন্দন ফোঁটা দিয়ে হাতে রাখী বলে এক পবিত্র সুতো বেঁধে দেয়। ভাইদের দীর্ঘায়ু ও মঙ্গল কামনা করে। এর পরিবর্তে ভাইয়েরা বোনেদের সারা জীবন রক্ষা করার কথা বলে।নিজের ভাইবোন ছাড়াও অনাত্মীয় ছেলেকেও রাখী পরিয়ে ভাই বা দাদার  সম্পর্ক পাতানো যায়।মহাভারতেন কথিত আছে,সুদর্শন চক্রের যুদ্ধে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আঙুলে আঘাত লাগলে দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির একটি টুকরো ছিঁড়ে ক্ষতস্থানে বেঁধে দেন যাতে রক্ত না বেরোয়। তাঁর এই আচরণে মুগ্ধ হয়ে কৃষ্ণ তাঁকে সর্বদা রক্ষা করার কথা দেন।

সম্রাট আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণ করলে আলেকজান্ডারের স্ত্রী রোজানা রাজা পুরুকে একটি পবিত্র সুতো পাঠিয়ে তাঁকে অনুরোধ করেন আলেকজান্ডারের কোন ক্ষতি যেন না করেন।পুরু সেই রাখীকে সম্মান জানিয়েছিলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি নিজে সম্রাটকে কোন আঘাত করেননি।আবারএক জনপ্রিয় কাহিনী শুনি, চিতোরের রাণী কর্ণাবতী মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে একটি রাখী পাঠান,গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণ থেকে তাঁর রাজ্যকে রক্ষা করায় সাহায্য করতে।  হুমায়ুনের সেনা পাঠাতে দেরী হয়ে গিয়েছিলো। রাণী কর্ণাবতী সব পুরস্ত্রীদের নিয়ে জহর ব্রতে আত্মাহুতি দেন। তবে চিতোরে পৌঁছে হুমায়ুন বাহাদুর শাহকে উত্‌খাত করে কর্ণাবতীর ছেলে বিক্রমজীত্‌কে সিং হাসনে অভিষিক্ত করেন। 

রাখীবন্ধন  ভাই-বোনের  ভালোবাসার সম্পর্কের এই সামাজিক প্রথাকে কবিগুরু এক নতুন রূপ দেন অন্য আঙ্গিকে। ১৯০৫ সালের  ২০ জুলাই ভারতের তখনকার ভাইসরয় লর্ড কার্জন অভিভক্ত বাংলাকে ধর্মীয়  ভিত্তিতে দুই ভাগে ভাগ করার কথা ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য ছিলো হিন্দু মুসলিম দুই জনজাতিকে আলাদা করে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দুর্বল করা।দুভাগ কার্যকর করার দিন ঘোষণা করা হয়  ১৩১২ বঙ্গাব্দের ৩০ আশ্বিন,১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর। সেদিন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের আহবানে  এই রাখী বন্ধন উত্‌সব এক সার্বজনীন রূপ পায়। তিনি একে কেবল ভাই-বোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতি ধর্ম,বর্ণ নির্বিশেষে সমস্ত বাঙ্গালীর মিলনোত্‌সবে পরিণত করেন।  রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে সেদিন বাংলার মানুষ একে অপরের হাতে রাখী বেঁধে দিয়ে তাঁরা অঙ্গীকার করেন, পরস্পরের কাছে, একে অপরের জন্য।কোন সীমানা দিয়ে তাঁদের আলাদা করা যাবে না। ওই দিন সকালে সাধারণ মানুষ গঙ্গাস্নান সেরে ফিরছিলেন।তখন পথে যাকে পাওয়া গেছে তাকেই রাখী পরিয়ে দেওয়া হয়।কবি নিজে  চিত্‌পুরের এক মসজিদে  গিয়ে মুসলিম ধর্মগুরু ও মৌলবীদের হাতে রাখী বেঁধে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের অসাধারণ নজীর সৃষ্টি করেন। রবীন্দ্রনাথের এই অভিনব  শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সর্ব সাধারণের মনে এক তীব্র জাতীয়তাবোধের  উন্মেষ হয়। যার ফলে ১৯১১ সালে বৃটিশ প্রশাসন বঙ্গভঙ্গ  বাতিল করতে বাধ্য হয়। তাঁর শুরু করা এই রাখী বন্ধন উত্‌সব ছিল মানবতা, সম্প্রীতিএবং বাংলার অখন্ডতা রক্ষার এক ঐতিহাসিক  স্মারক। 

তিনি এই দিনটির উদ্দেশে সেই বিখ্যাত গান রচনা করেন বাং লার মাটি বাংলার জল, বাংলার বায়ু বাংলার ফল -/ পুণ্য হউক পূণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।

এছাড়াও তাঁর রচিতবিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান’, ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবেপ্রভৃতি গান সেদিন আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। 


এইভাবে সেসময় রাখীবন্ধন উত্‌সব যেভাবে আপামর জনসাধারণকে উদবুদ্ধ করেছিল, যার হোতা ছিলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা ইতিহাসে বিরল্ কেন  নেই বললেই চলে। তাঁর ভাবনাকে আমরা কতখানি আত্মস্থ করতে পেরেছি তা সময়ই বলে দেবে।

 

  



  



 

No comments:

Post a Comment