স্বাধীনতার স্বাদ
প্রদীপ মুখুটী
স্বাধীনতার স্বাদ আমরা তেমন করে কেউ হয়তো পাইনি। রক্তঝরা দিনগুলোর কথা ইতিহাসের পাতায় ছাপা—সে সব যেন রক্ত দিয়েই ছাপা বলে মনে হয়। এক-একজন মহান মানুষের বলিদান আজও মনে প্রশ্ন জাগিয়ে যায়।
মাটিতে ঝরা রক্তের রং ছিল লাল, আর সেই রক্তে ভেজা মাটির গন্ধও ছিল এক। তফাতটা পরে গড়ে উঠেছিল। কারণ? কারণটা আজ নাই-বা তুলে ধরলাম।
“ইংরেজ ভারত ছাড়ো”,
“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”—
এইসব পড়তে পড়তে সেই ছোট্ট মনটা একসময় বেশ স্বাধীনতা সংগ্রামী হতে চাইত। অবুঝ মনের কোনো এক কোণে প্রতিবাদের বারুদ নাড়া দিত। তাই এরকম বই পড়ার ইচ্ছের জোগান বাড়ির বড়দের কাছ থেকেই পেতাম।
ছোটবেলার গল্পের বই কিংবা ইতিহাসের পাতায় রঙিন হয়ে থাকত সেই স্বাধীনতার কথা। আর ইতিহাসের কথা বলতে গেলে স্কুলের কথা আসবেই।
মাস্টারমশাইরা বলতেন—
“ইতিহাস তো গল্প! এই গল্পটা মনে রাখতে পারিস না?”
সেই সময় মাস্টারমশাই যতই বলুন, ইতিহাস গল্প—মন সায় দিত না। মাথায় যে ছিল শুধু পড়া আর পড়া। সেই চাপই ছিল এক জুজু। আর সেই জুজুই ইতিহাসকে গল্প বলে মনে করতে দিত না।
সমাধান ছিল মুখস্থবিদ্যা। আর সেই বিদ্যাকেই মাথা পেতে নিলাম।
বেশ মনে আছে, স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় কাগজ-কলমের কাজ সেরে বাবা আমায় বললেন— “এবার মাস্টারমশাইকে প্রণাম করো।”
আমি প্রণাম সেরে উঠতেই বাবা বললেন—
“আপনার ছেলে ও ছাত্র। অন্যায় করলে বা পড়াশোনায় অবহেলা করলে বেত্রাঘাতে কার্পণ্য করবেন না।”
মাস্টারমশাই একটু হেসে বললেন—
“সে হবে, ক্ষণ।”
সেই ক্ষণেই স্কুলজীবনের সঙ্গে যুক্ত হলাম।
স্কুল ছিল শাসন ও অনুশাসনের এক মন্দির। শিক্ষার সঙ্গে এই দুটিকে নিয়েই চলতে হতো। অনুশাসন ছিল সময়ানুবর্তিতা আর শৃঙ্খলার দীর্ঘ পথ। আর শাসন? সে ছিল বেত্রাঘাত, ‘থ্রোয়িং দ্য ডাস্টার’—মানে, হুম, ডাস্টার ছোড়া—আর প্রতিদিন কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা।
এটাই ছিল প্রায় রোজকার নামতা।
সেই সময় পিটুনি খাওয়ার পর মনে বিদ্রোহ জাগলেও সাহসে ছিল বড় টান। শাসনটা ছিল বড়ই কঠিন। তাই শাসনের কাছে নতিস্বীকার করেই একের পর এক ক্লাস পার করতে হতো।
সঙ্গে ছিল খেলাধুলা। স্পোর্টসের পাশাপাশি ছিল ড্রিল, প্যারেড, ব্রতচারী—কিন্তু সেখানেও শাসন ও অনুশাসনের কোনো ছাড় ছিল না।
মন তার ডানা মেলে উড়তে চাইত। কিন্তু সেই ডানা মেলতে পারা ছিল বড় কঠিন। ইচ্ছেগুলো জন্ম নিয়েই যেন মৃত্যুবরণ করত। ডানার অব্যবহারে ছোট্ট মনের আকাশে দেখা স্বপ্নগুলো একসময় মনের বানে ভেসে যেত।
এই পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতা পাওয়ারও যেন কোনো উপায় ছিল না। জীবন-কাণ্ডারি বাবা-মা কিংবা পরিবারের কারও কাছে নিজের ইচ্ছের সমর্থন আদায় করতে গেলেই, আর এক দফা শাসনের দায়ভার নিতে হতো।
তাই মনের মধ্যে সবকিছু চেপে রেখে একের পর এক ক্লাস পার করে বড় হতে লাগলাম। ঘরে ও স্কুলে পড়াশোনার সম্মোহনে আবদ্ধ হয়ে পড়লাম।
সময়ের সঙ্গে যেমন বাড়ল বয়স, তেমনই বাড়ল ক্লাসের সংখ্যা। বেশ বড় হয়ে গিয়েছি তখন। বয়সের হিসেবেও যেন দুই অঙ্কে পৌঁছে গেছি—দশম শ্রেণিতে।
তখন ঘরে-বাইরে দুটোই একটু একটু করে আলাদা হতে লাগল। স্কুলে শাসনের ধরনটাও যেন একটু বদলে গেল। এখন আর শুধু বেত্রাঘাত বা কান ধরে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখার শাসন নয়—এখন ফল ভালো করতেই হবে। সবার নজর পড়ল সেদিকেই। ঘরেও ঠিক তেমনই।
সময়কে মূল্য দিতে শেখানো হচ্ছে। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা। আবার সেই সময়েই নিজের পছন্দের খাবারের আবদারও রাখতে শুরু করেছি। সঙ্গে বেশ গুরুত্বও পাওয়া যাচ্ছে। সেই উপভোগটা ভালোই উপলব্ধি করছিলাম।
শাসনের বাঁধন একটু হালকা হতেই বুঝতে পারলাম, আমার মনটাও বদলে গেছে। শিক্ষকদের শাসন আর অনুশাসন আমাদের স্বাধীনতার স্বাদটাই যেন বদলে দিয়েছিল।
বিদ্রোহ তার আসন বদলেছে—সেখানে জন্ম নিয়েছে শ্রদ্ধা।
যে মাস্টারমশাইরা একদিন শাসন করতেন, তাঁদের সেই শাসনের প্রতিই মনে মনে সম্মান জানাতে শুরু করলাম। রাস্তায় দেখা হলে প্রণাম করা, সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়া, মাস্টারমশাইয়ের কাছে কিছু জানতে চাওয়া, কোনো আবদার করা—ইচ্ছেগুলো যেন আবার নতুন করে ডানা মেলতে শুরু করল।
আর মাস্টারমশাইদের একটু কাছাকাছি পৌঁছাতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, তাঁদের লুকিয়ে থাকা আসল কষ্টটাও।
আমরা যে একদিন এই স্কুল পেরিয়ে চলে যাব—সেই কষ্ট তাঁরা যেন আমাদের চলে যাওয়ার অনেক আগেই নিজেদের মধ্যে বহন করতে শুরু করেছিলেন।
জীবনের এক অসাধারণ উপলব্ধি তখন অনুভব করলাম—
পরাধীনতার মাঝেও স্বাধীনতার কী অপূর্ব স্বাদ!
অনুভূতির স্পর্শে হৃদয়ের মধ্যে যে উপলব্ধির জন্ম হলো, তা আজও আমার সারাজীবনের পথপ্রদর্শক হয়ে আছে।
আজ শরীর আর মন—দুটোই বড় ভারী। বয়সের ভার এসে চেপে বসেছে মনের ওপর। আদর্শের সেই পথটাও যেন আর কোথাও খুঁজে পাই না। প্রজন্মের চলার পথে কেবলই হোঁচট খাই। মন আর সঙ্গ দিতে চায় না।
তবু চলতে হবে, মানতে হবে, করতে হবে।
পৃথিবীটা আজ অনেক বদলে গেছে। প্রযুক্তির আশীর্বাদে পৃথিবী আজ সবার হাতের মুঠোয়। শহর থেকে গ্রাম—সব বদলেছে। বদলেছে সহনশীলতা ও ধৈর্য। সবার কাছে আজ সময়টা হয়ে উঠেছে বড্ড ছোট।
সমাজের অনেক কিছু ভুলে, অনেক কিছু বাদ দিয়ে আমরা আজ নতুন রূপ নিয়েছি।
আজ আমরা তথাকথিত আধুনিক হয়েছি। কিন্তু আধুনিক মানে শৃঙ্খলা ভঙ্গ নয়। আধুনিক মানে রুচিকে নষ্ট করা নয়।
আধুনিকতা আগেও ছিল, আজও আছে—মাঝখানে বদলেছে শুধু রুচিবোধ।
আজ সরকারি স্কুলের তুলনায় বাণিজ্যিক স্কুল অনেক বেশি। ঝাঁ-চকচকে স্কুলগুলো সহজেই নজর কাড়ে। সরকারি স্কুলগুলো হয়তো সাদামাটা, কিন্তু শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই সেখানে আছে।
এই সরকারি স্কুলে পড়েই আমাদের দেশের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক ও স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গড়ে উঠেছিলেন। তাঁদের নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সারা পৃথিবীর কোণে কোণে।
পরাধীনতার ব্যথা মাথায় নিয়েও তাঁরা জয় করেছিলেন সারা পৃথিবী।
বাণিজ্যিক স্কুলগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য শিক্ষাব্যবস্থার অনেক কিছু বদলে দিয়েছে। সঙ্গে বদলে দিয়েছে অভিভাবকদের মানসিকতাও।
আজ স্কুলে শাসন ও অনুশাসনের অনেক কিছুই নেই। সকল ছাত্রছাত্রীকে স্বাধীন করে দেওয়া হয়েছে। আর তার ফলস্বরূপ ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের স্বাধীনতার মানসিক ধ্বজা উড়িয়ে চলেছে, আর পরাধীনতার শিকল পরানো হয়েছে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের মানসিকতায়।
আজ শিক্ষক-শিক্ষিকারা অসহায়।
শাসন বলতে এখন তাঁদের কাছে ধৈর্যের পরীক্ষা। শাসন করতে গেলে কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকেরা তেড়ে আসবেন। কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত দিতে হবে। এমনও হয়, অভিভাবকেরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে এফআইআর করেন।
একবার ভাবুন তাঁদের কথা।
তাই হয়তো তাঁরা মনে মনে বলেন—
“পরের ছেলে পরমানন্দ,
যতই যাক নিচে—হোক অভিভাবকদের আনন্দ।”
আজকের পরিবেশ শিক্ষক-শিক্ষিকাদের করেছে পরাধীন, আর ছাত্রসমাজকে করেছে স্বাধীন। আজ শিক্ষকরা তাঁদের অনেক অধিকার হারিয়েছেন। নামটা ঠিক আছে, কিন্তু বাকি সবকিছু বদলে গেছে। আজ শাসন নেই, অনুশাসন হারিয়ে গেছে। পড়ে আছে শুধু শিক্ষা নামের ধারাপাত।
সমাজজীবনের এই বদল দেখে মন বড় উদাস হয়ে পড়ে। কারও কাছে নিজের ভাবনাগুলো ভাগ করে নিতে পারি না—নিজের মানুষদের কাছেও নয়।
এমনকি সন্তানের কাছেও যদি এসব ভাবনা ভাগ করে নিই, তবে হয়তো আমাকেই গুণ, বিয়োগ আর ভাগ করে দেবে!
তবে কি আবার পরাধীন?
নাকি—
বিবেকের কাছে স্বাধীন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই হয়তো জীবন কেটে যাবে।
কারণ, স্বাধীনতা শুধু শৃঙ্খল ভাঙার নাম নয়। কখনও কখনও শাসনের মধ্যে থেকেও স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া যায়। আবার কখনও স্বাধীনতার নামের আড়ালেও মানুষ নিজের বিবেকের কাছে পরাধীন হয়ে থাকে।
তাই আজও মনে হয়
স্বাধীনতা আসলে কোথায়?
শাসনের বাইরে,
নাকি নিজের বিবেকের ভিতরে ।

No comments:
Post a Comment