Tuesday, August 4, 2026


 

একটি দিনযাপন

অমলকৃষ্ণ রায়


বছরের ঐ একটা দিন। এদিনে কেন যে মনজুড়ে বিচিত্র কিছু অনুভূতি এসে ভিড় করে, কিছুতেই বুঝতে পারে না সুলোচনা। কখনও দুঃখের কিছু ভাবনা এসে মনটাকে ছেয়ে ফেলে, আবার কখনও বা একরাশ ভাল লাগা মনে দোলা দিয়ে যায়। অথচ কিসের এসব ভাল লাগা মন্দ লাগা, কেনইবা মনটাকে কখনও কালোমেঘের মতো ছেয়ে ফেলার পরক্ষণেই এক মেঘমুক্ত শরতের মিষ্টি রৌদ্রোজ্জ্বল অনুভূতি এসে সারা দেহের সুখের কেমিক্যালগুলোকে সতেজ এবং সক্রিয় করে তুলছে, ঠিক ঠাহর করতে পারে না সুলোচনা। অবশ্য মনেরই বা দোষ কী, সাদা কাগজের মতো কখনও অনুভূতি শূন্য হয়ে তো থাকে না, থাকতে পারে না। টারবাইনের চাকার মতোই বিশ্রামহীন ব্যস্তবতার কিছু না কিছু পল অনুপল নিয়ে ভাবনায় বুঁদ হয়ে থাকা। তা সেটা ভাল কিছু হোক কিংবা মন্দ। ভাবনার সময় মন কখনও ভালমন্দ বাছবিচার করে না। তাছাড়া সে তো আধ্যাত্মিক জগতের মানুষ না যে, সমাজ-সংসারের সবকিছুর উর্দ্ধে। ধ্যানে বসে ইহজগতের সব কিছুর থেকে অব্যহতি নেবে। মানুষের জীবনে সুখ আর দুঃখ ছাড়া আর কিছু আছে বলে সুলোচনা অন্তত বিশ্বাস করে না। কিছু ভাবনা মানুষকে সুখানুভূতি দেয়, আর কিছু ভাবনা মানুষকে কষ্ট দেয়। সুলোচনার মধ্যেও আর সব মানুষের মতোই সুখ এবং দুঃখের কেমিক্যালগুলো রয়েছে। এণ্ডোরফিন দেহপ্রকৃতির বেদনানাশক, ডোপামিন জীবনের ভালমন্দের মাঝে মনের প্রশান্তিকে ধরে রাখে। সেরোটোনিন মুড ব্যালেন্সিং করে মন ভাল রাখে। সর্বোপরি সে একটি সমাজ-সংসারের ঘেরাটোপে বাস করে বলে তার মধ্যে পরিবার এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মতো অক্সিটোসিন নামের কেমিক্যাল সক্রিয় রয়েছে। তা দিয়ে সে ভালবাসা-সহানুভূতি-সহমর্মিতা-বিশ্বাস-আত্মিক সম্পর্কের বাঁধনে নিজেকে বেঁধে রাখে। আর মেলাটোনিন নামের সুখের কেমিক্যাল তাকে রাতে একখানা গভীর নিদ্রায় ডুবে যেতে সাহায্য করে। এসব মিলে ধনের বিচারে না হোক, অন্তত মনের দিক থেকে সে এই সমাজ-সংসারের একজন সুখী মানুষ। একজন ফিজিয়োলোজির ছাত্রী হিসেবে সুলোচনা মানুষের সুখে থাকার আড়ালের বিজ্ঞান সম্পর্কে অবহিত। মনের সুখকে ধরে রাখার বিজ্ঞানটা জানে বলে তার মধ্যকার কর্টিসল নামের দুঃখের কেমিক্যালটিকে সহজে তার দেহপ্রকৃতির দখলদারি নিতে দেয় না। তাকে যথাসাধ্য দমিয়ে রাখে।

তবে প্রার্থীব জগতের মানুষদের সুখের একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারা একজন সাধ্বি পুরুষের মতো গভীর সাধনায় ডুবে গিয়ে ব্লিজ মলিকিউল বা আনন্দমাইড এবং স্পিরিট মলিকিউল ডিএমটি(ডাই মিথাইল টেট্রামাইন) নামের দেহের আরও দুটো বিরল নিউরো কেমিক্যালকে সক্রিয় করে তুলে প্রার্থীব জগতের বাইরের অপ্রাথীব পরম সুখের আস্বাদ নিতে পারে না। না পারার কারণ আর কিছু নয়, সুলোচনা একজন অতি সাধারণ সংসারী জীব হিসেবে একটা সুখ-দুঃখের অনুভূতিপ্রবণ জীবন কাটাচ্ছে। তাই আর পাঁচটা সংসারী মানুষের মতো শত চেষ্টা করলেও তার মনেও কখনও সুপ্ত দুঃখের ভাবনা জাগ্রত হয়ে তাকে কষ্ট দিয়ে যায়। আবার কখনও জীবনের ভাল কিছু ভাবনা সেসব মুছে দিয়ে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়। তবে প্রতি বছর ৯ অগাস্ট তার মনের সেই চিরাচরিত নিয়মের সুখ-দুঃখের বাইরেও একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

সুলোচনা একজন সাহিত্যিক। সাহিত্য লিখতে গিয়ে তাকে অনেকসময় বাস্তবতার সীমা ছাড়িয়ে কিছুটা হলেও কল্পনালোকে ডুবে যেতে হয়। বলতে দ্বিধা নেই, সে জগৎ থেকে চয়ন করা অনুভূতিগুলো তার সৃষ্টিকর্মকে এক অনন্য রূপ দান করে। যে কোনও শিল্প সৃষ্টিতে কল্পনার ভূমিকা অপরিসীম। কল্পনা সুলোচনাকে বর্তমান, অতীত এবং কখনও ভবিষ্যৎকে খুব কাছাকাছি থেকে উপলব্ধি করার শক্তি দান করে। এতটাই কাছাকাছি যে এই তিনের মধ্যকার পার্থক্য নিরূপণ করা তার পক্ষে মুশকিল হয়ে পড়ে। ৯ অগাস্টের দিনেও সেরকম কিছু ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ঘটনাগুলো মিলেমিশে তার মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে ফেলে। কেন ঐ বিশেষ দিনে তার এরকমটা মনে হয় সেটার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে একদিন সোস্যাস মিডিয়ার গুগোলের তথ্য ভাণ্ডারে ‘৯ অগাস্ট’ লিখে সার্চ বাটন টিপে দিলো। তাতে যা বেরিয়ে এল তা দেখে তার চক্ষু চরকগাছ। এই তারিখের ১৯৪৫ সালের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ‘ফ্যাটম্যান’ নামের একটি পারমানবিক বোমা জাপানের নাগাসাকি শহরে এক লহমায় ৭৪০০০ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, এই নিঃশংস ধ্বংসযজ্ঞের তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে আজও সে দেশে পঙ্গু সন্তান জন্ম নিচ্ছে। তার মানে আট দশক পরেও উত্তরসূরীদেরকে সেই যুদ্ধ ক্ষতের জ্বালাযন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ তো গেল ৯ অগাস্টের এক দিক, আশ্চর্যজনকভাবে সে ঘটনার ৪৯ বছর পর ১৯৯৪ সালের ৯ আগস্টে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করা শুরু হয়। তার মানে ৯ আগস্ট একদিকে যেমন প্রতি বছর বিশ্ববাসীকে মৃত্যুর এক ভয়াবহ স্মৃতিকে উসকে দেয়, অন্যদিকে আবার এ দিনটি জাতিসংঘ বিশ্বের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্ব স্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে। এ দিনটি যেমন আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্য, ভাষা, ইতিহাস, ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ, এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতার বার্তা বয়ে আনে, সেইসঙ্গে নিজেদের মধ্যে সম্পর্কের বাঁধনকে অটুট রাখার শপথ নেবার দিন। যেন ১৯৪৫এর ৯অগাস্টের বিশ্বামানবের যন্ত্রণার স্মৃতির উপরে প্রলেপ দিতেই সেই একই দিনকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। ধন্দে পড়ে গেল সুলোচনা, তার মনের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সূত্র কি তাহলে ঐ দুই ৯ অগাস্টের মাঝে নিবিষ্ট।

মানুষের জীবনেও তো অনেকসময় সেরকমটা ঘটে থাকে। মানুষ যখন তার জীবনের কোনও দুঃসহ স্মৃতিতে ডুবে গিয়ে কষ্ট পেতে থাকে, তখনই একটা আনন্দের খবর তার মন থেকে সব মুছে দিয়ে যায়। ইতিহাসেও তো সেরকম অনেক ঘটনা আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, ১৬৩০ সালের খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে মহারাষ্ট্রের শিবনেরি দুর্গে শিবভক্ত মাতা জিজাবাঈের কোল আলো করে শিবাজি পরিবারের এক খুশির জোয়ার বইয়ে এনেছিল। তার ঠিক এক বছর আগে মাতা জিজাবাঈয়ের পিতা লখুজী মাধব রাও, দুই ভাই এবং এক ভাইপোকে দৌলতাবাদের নিজামশাহ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় প্রকাশ্য দরবারে ডেকে এনে হত্যা করেন। নবজাতককে কোলে নিয়ে মাতা জিজাবাঈ নিঃসন্দেহে তার মনের সেই স্বজনহারানোর শোকার্ত অবস্থায় থেকে কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছিলেন। তবে সুলোচনার ক্ষেত্রে যা ঘটে সেটা হল প্রতি বছর ৯ আগস্ট এলে দুটি পৃথক বিষয় তার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এদিনের টিভির পর্দার আদিবাসীদিবসের অনুষ্ঠানের খবর তার মনে একইদিনের নাগাসাকি দিবস পালনের অনুষ্ঠানের বীভৎস ঐতিহাসিক ঘটনার ভয়াবহতার ঐতিহাসিক আলোচনাকে ছাপিয়ে প্রশান্তির প্রলেপ দিয়ে যায়। সারা বিশ্বজুড়ে সে অনুষ্ঠান যেন নতুন করে কোনও নাগাসাকি না ঘটবার শপথের এক নামান্তর।

পৃথিবীর যেমন বার্ষিক গতি রয়েছে, সুলোচনার স্মৃতিপটে ডুবে থাকা বিশেষ বিশেষ কিছু স্মৃতি এবং ভাবনাগুলোও অনেকটা বার্ষিক গতির নিয়মেই বছরে একবার করে অতীতের অন্ধকার থেকে ভেসে ওঠে। যদিও নাগাসাকি তার জীবনের অতীতের কোনও স্মৃতি নয়, কারণ স্মৃতি মানে তো মানুষ নিজের জীবনে অতীতে কোনও একটা সময়ে যা প্রত্যক্ষ করে মনে মনে ভীষণ কষ্ট কিংবা আনন্দ পেয়েছে, সেসব ভাল কিংবা খারাপ মুহূর্তগুলোকে জাবর কাটার মতো পুনরায় মনে করা। স্বভাবতই সুলোচনা নাগাসাকির পরমানু বিস্ফোরণের আমলের মানুষ নয় যে সে সময়ে জাপানে গিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের শত শত বছরের স্বপ্নের শহরের ধ্বংসাবশেষ, মৃত্যুমিছিল দেখেছে। মানুষের মৃত্যুযন্ত্রণার গোঙানি শুনেছে। বরং বলা যায় সেটা সে ইতিহাসের পাতা থেকে পড়ে উপলব্ধি করেছে। সেই নিঃশংসতার গল্প তাকে এতটাই কষ্ট দিয়েছে যে সে ঘটনাটা আত্মজন হারানোর মতো মনের গভীরে দাগ কেটেছে। সে দাগের দগদগে ঘায়ের যন্ত্রণা প্রতিবছর ৯ আগস্ট তাকে মনে করিয়ে দেয়। ইতিহাসের পাতার নাগাসাকি যেন পৃথিবীর বার্ষিক গতির মতোই মানসপটের গভীরে সুপ্ত অবস্থায় আবর্ত হতে হতে এই বিশেষদিনে আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠে। পাশাপাশি এদিনের টিভির পর্দায় দেখা দেশবিদেশের আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানগুলোর খবর তার সে কষ্টের অনুভূতিকে ছাপিয়ে মনের ভিতর এক সুখানুভূতির ঢেউ তোলে।

সেসব নিয়েই বছরের এই বিশেষ দিনটি বরাবরই একটু অন্যরকমভাবে কেটে যায়। কখনও বইয়ের তাকের কোণে পড়ে থাকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জাপান বিষয়ক ইতিহাস গ্রন্থটি তার নজর কাড়ে। আবার কখনও আদিবাসীদের জীবনযাত্রা নিয়ে লেখা কোনও বই। এসবেই বুঁদ হয়ে থাকে সুলোচনা।

No comments:

Post a Comment