চোরাবালি
লীনারায়
ভোর পাঁচটা। খানিক আগেই বিছানা ছেড়েছে উজান। ফ্রেশ হয়ে এক কাপ চা নিয়ে ব্যালকনিতে আসে প্রতিদিনের মতো। রাতের অন্ধকার তখনও মুম্বাই শহরের গায়ে লেপ্টে আছে। আয়েশ করে চা শেষ করে। তারপরেও বসে থাকে। ধীরে ধীরে ঘুমন্ত শহরটাকে জেগে উঠতে দেখে।
প্রতিদিন চা শেষ হতে না হতে কাজ শুরু হয়ে যায়। একার সংসার। একা হাতে সব সামলে নটায় অফিসে বেরিয়ে যায়। আজ ওর তাড়া নেই। সকাল দশটায় হাসপাতালে যাবে। তারপর অফিসে। বাড়ি থেকে সাড়ে নটায় বের হয় উজান। ডক্টর পারিকরের হাসপাতাল পনের মিনিটের দূরত্বে। দশটায় ওর ডাক্তার দেখানোর সময়। বেশ কিছুদিন শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ডাক্তার দেখিয়েছে। কিছু টেস্ট করাতে হয়েছে। আজ সেই রিপোর্ট দেখানোর দিন।
হাতে একটু সময় নিয়ে বের হয় উজান। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করার সময় বৃষ্টি এলো। জানালার কাচে চোখ রেখে বসেছিল ও। বৃষ্টি দেখলেই যে কত কিছু মনে পড়ে। সেসব স্মৃতির কিছুটা শান্তি দেয়। আবার কিছুটা অশান্তিও। ভাবনায় ছেদ পড়ে। রিসেপ্শনিষ্ট ওর নাম ডাকছে।
চেম্বারে ঢুকেই ডক্টর পারিকরের টেবিলে রিপোর্ট রাখে উজান। ডাক্তারের মুখোমুখি চেয়ারে বসে। ঘরে পিন পতনের নীরবতা। এসির হালকা শব্দ, ঘড়ির টিক টিক আর রিপোর্টের পাতা উল্টানোর শব্দ সেটা ভাঙছে যদিও। উজানের অস্থির লাগছে। হাসপাতালে এসেই রিপোর্ট হাতে পেয়েছিল। খুলে দেখতে একটুও ইচ্ছে হয়নি তখন। কিছুই ভালো লাগছে না। মনটা কু গাইছে।
রিপোর্ট দেখা শেষ। ডক্টর পারিকর উজানের দিকে তাকান। একটু সময় নেন। উজানের হার্ট বিট প্রতি মুহূর্তে বেড়ে যাচ্ছে। নিজেকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে ওর।
ডক্টর পারিকর ছোট খাটো চেহারার মানুষ। গলার স্বর ভারি হলেও কথায় অদ্ভুত কোমলতা। একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলেন,
–মি. উজান, রিপোর্ট দেখলাম। একটু সমস্যা আছে। তবে চিন্তার কিছু নেই। সব রোগের চিকিৎসা আছে।
উজান কিছু বলে না। বলতে পারে না। ওর গলা শুকিয়ে কাঠ। জিভটাকে চেষ্টা করেও নড়াতে পারছে না। বুকের ঢিপ ঢিপ শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে। ডক্টর পারিকর আবার বলেন,
–আপনার টিউমারটা ম্যালিগন্যান্ট। তবে চিকিৎসা আছে। চিন্তা করবেন না।
এতক্ষন উজান মাথা নিচু করে বসেছিল। সকাল থেকে মনের ভেতরে যে উথালপাথাল চলছিল সেটা আপাতত শান্ত। ডক্টর পারিকরের দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে,
–আমার হাতে কতটা সময় আছে ডক্টর?
ডক্টর পারিকর উজানের কাছে আসে। পিঠে হাত রেখে বলে,
–সময় আছে। কিন্তু ট্রিটমেন্টটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শুরু করতে হবে। সম্ভব হলে কাল হাসপাতালে ভর্তি হয়ে যান।
–আমাকে সাতদিন সময় দিতে হবে। কিছু জরুরি কাজ আছে।
বৃষ্টিটা ধরেছে। উজান হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে অটো ধরে। ডক্টর পারিকর আশ্বাস দিলেও মন বলছে সময় খুব কম। অটোতে বসেই সাতদিনের কাজের প্ল্যান করে। ব্যাংকের কিছু কাজ আজই সেরে নেবে। এরপর কলকাতা যাবার এয়ার টিকিট করতে হবে। আর অফিসের কিছু কাজ সেরে ফেলতে হবে। সেটা আগামিকাল করবে। কিন্তু সবার আগে মন্দার ভাওকে ফোন করে আজ অফিসে আসতে পারবে না সেটা জানিয়ে দেয়।
মুম্বাইতে উজানের আপন বলতে একজন আছে– মন্দার ভাও। পনের বছর আগে সহায় সম্বলহীন অচেনা উজানকে আগু পিছু না ভেবে বুকে টেনে নিয়েছিল এই মানুষটা। একটু একটু করে কাজ শিখিয়েছে। বিশ্বাস করে নিজের ব্যবসা দেখাশুনোর দায়িত্ব ওকে দিয়েছে। আর সেজন্য আজ মুম্বাইতে একটা মাথা গোঁজার জায়গা হয়েছে। কিছু সঞ্চয়ও আছে।
উজান ঠিক করে ভাও-এর সঙ্গে দেখা করে সবটা জানাবে। সন্ধ্যায় মন্দার ভাও-এর অফিসে আসে উজান। ভাওকে রিপোর্টের কথা জানায়। সাতদিন পর হাসপাতালে ভর্তি হবে জানায়। আর এই সাতদিন ওর যা যা প্ল্যান সব কিছু খুলে বলে। ভাও কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকে। কোন কথা বলে না। তারপর ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে।
বুধবার সকাল নটায় কলকাতা যাবার ফ্লাইট। উজান সাতটায় এয়ারপোর্টে চলে এসেছে। সঙ্গে একটা ব্যাগ ছাড়া অন্য লাগেজ নেই। মুম্বাইতে এসেছিল এমনই একটা ব্যাগ নিয়ে। পনের বছর আগে গীতাঞ্জলি এক্সপ্রেসের জেনারেল কম্পার্টমেন্টে। প্রায় ছত্রিশ ঘন্টার জার্নি। আজ কলকাতায় ফিরছে ফ্লাইটে, বিজনেস ক্লাসে। তফাৎ শুধু এইটুকু।
কলকাতা এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করা মাত্র শরীরে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। বড় অভিমান নিয়ে শহর ছেড়েছিল উজান। মোবাইল ফোন অব্দি সঙ্গে নেয়নি সেদিন। আঠারো বছরের জীবনের সব কিছু মুছেই ট্রেনে চেপেছিল। আজ আবার সেই শহরে পা রেখে মন তো চঞ্চল হবেই।
উবারে করে রওনা হয় উজান। পনের বছরে কলকাতা আমূল বদলে গেছে। সব অচেনা। রাস্তার দুপাশে বড় বড় শপিং মল, হাইরাইজ বিল্ডিং। গুগল ম্যাপ দেখে পনের বছর আগের কলকাতাকে চিনতে চেষ্টা করছিল উজান।
আধ ঘন্টা পর বুড়ো বটগাছটাকে ডাইনে রেখে গাড়িটা বাঁক নিল। সেই পরিচিত রাস্তা! আর একটু পরেই ডান হাতে সেই মাঠ। উজান কেঁপে ওঠে। ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে। ওখানেই নেমে যায়।
মাঠের চারদিক এখন পাঁচিল ঘেরা। উজান দেয়ালে হাত রেখে মাঠের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে পড়ে এক দুপুরের কথা। মুষলধারায় বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে কয়েকজন ছেলের ফুটবল খেলা। আর সেই আনন্দের মুহূর্তে ছন্দপতন। বাবা এসে সবার সামনে মারতে মারতে উজানকে বাড়ি নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে খাবার বন্ধ করার নিদান দিয়ে বেরিয়ে যায়।
উজান ছেলেবেলা থেকে বাবার রাগ দেখে বড় হয়েছে। বাবার কথার বিরুদ্ধে বাড়ির কারো যাবার ক্ষমতা ছিল না। বাবার ইচ্ছেতেই উজানকে সায়েন্স নিয়ে পড়তে হয়েছে। একবছর ড্রপ দিয়ে মেডিক্যালের জন্য পড়াশুনো করতে হয়েছে। বাবার ইচ্ছেতেই উজান ওর প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করেছে। বাবার ইচ্ছের মান রাখতে গিয়ে নিজের ছোট ছোট ইচ্ছেকে মেরে ফেলেছে। কিন্তু বন্ধুদের সামনে অত বিচ্ছিরিভাবে মার খাবার পর উজান বাড়ি ছাড়ে। নিজের ইচ্ছেয়….প্রথমবার।
মাঠ পেরিয়ে কিছুটা গেলেই ওদের বাড়ি। বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়ায় উজান। চোখে জল আসে। এবার মায়ের সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।
গেট খুলে বাড়ির ভেতর পা রাখে। যে কারাগার থেকে একদিন পালিয়ে বেঁচেছিল, আজ সেখানেই ফিরে এসেছে। বন্দিদশারও যে চোরা টান থাকে। কখনো কখনো সেই টানকে প্রশ্রয় দিতেই হয়– শুধুমাত্র নিজের ইচ্ছেতে।

No comments:
Post a Comment