লাল মাটির কান্না
কাকলি ভদ্র
"লাল মাটিতে ধুলো ওড়ে,
মাদল বাজে সাঁঝে,
হামদের এই পুরুলিয়া গো
বুকের মাঝে বিঁঝে।"
পুরুলিয়া মানেই আকাশ-বাতাস জুড়ে এক অদ্ভুত অরণ্য-আদিমতা। পুরুলিয়া মানেই বসন্তে আগুন-রাঙা পলাশ আর বর্ষায় ধুয়ে যাওয়া লাল মাটির সোঁদা গন্ধ! এই রুক্ষ অথচ রূপবতী প্রকৃতির বুকে তিরতির করে বয়ে চলেছে এক অনন্য জীবনধারা... যা আদিবাসী জীবনের মেঠো সুর এবং ছৌ নাচের এক অনন্য মেলবন্ধন।
প্রকৃতির পরম স্নেহে লালিত এখানকার ভূমিপুত্র সাঁওতাল বা ‘হরকো’দের যাপনচিত্র। পাহাড়, অরণ্য আর নদীর নিবিড় বাঁধনে রচিত হয়েছে বেঁচে থাকার চিরন্তন ছন্দ। প্রকৃতির সাথে এই আত্মিক নিবিড়তারই এক অপরূপ প্রকাশ তাদের ‘ওড়াঃ’ অর্থাৎ মাটির ঘরগুলোর... দেওয়ালে দেওয়ালে নিখুঁত আলপনার কারুকাজ যা অনায়াসে হার মানায় যেকোনো শহুরে শিল্পকলাকে। অরণ্য-পাহাড়ের এই শাশ্বত মায়াই যেন পূর্ণতা পায় তাদের প্রাণের উৎসব করম আর সোহরাইয়ের আঙিনায়।ধামসা-মাদলের সেই আদিম যুগলবন্দি শান্ত বাতাস চিরে যখন ছন্দ তোলে, ঠিক তখনই পুরুলিয়ার ধুলোমাটি মেতে ওঠে এক আদিগন্ত উৎসবে। সাঁওতাল ছেলেরা পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, কোমরে হাত দিয়ে বীরদর্পে আসরে নেমে পড়ে। ঢোল আর মাদলের ছন্দে বাতাসে ভেসে আসে নাচের খাঁটি বোল...
"তা-ধিন-তা, তা-ধিন-তা!
ধিন-তাক-ধিন, ধিন-তাক-ধিন!!!"
ঢোল-ধাঁসার ধমক আর সানাইয়ের সুরে মেতে উঠেছেন শিল্পীরা। রঙিন মুখোশের আড়ালে যখন তাঁরা গোলাকার মঞ্চে ক্ষিপ্র গতিতে লাফিয়ে ওঠেন, তখন মনে হয় এক টুকরো মাঠাবুরু পাহাড় যেন চঞ্চল হয়ে উঠেছে। তাঁদের পায়ের জাদুকরী 'উলফা' আর শরীরের অবিশ্বাস্য ভাঁজে এক নিমেষেই জীবন্ত হয়ে ওঠে কোনও এক মহাকাব্যিক যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা অরণ্যের বন্য পশুর লড়াইয়ের দৃশ্য।
পুরুলিয়ার চড়িদা গ্রাম... যাকে আমরা সবাই 'মুখোশ গ্রাম' নামে চিনি। এখানকার শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় ছৌ নাচের সেই বিখ্যাত মুখোশগুলো। কিন্তু এই চোখধাঁধানো রূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্য বাস্তব... আদিবাসী শিল্পীদের চরম দারিদ্র্য ও দৈনন্দিন কঠিন লড়াই। অভাব যাঁদের নিত্যসঙ্গী, সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর আত্মসম্মানই তাঁদের বেঁচে থাকার এলকমাত্র জ্বালানি। এই লাল মাটি, এই মাদলের সুর আর এই ছৌ নাচ... সব মিলিয়ে এমন এক রূপকথা, যা এই মাটির সন্তানদের হাত ধরে আজও টিকে আছে সস্নেহে, সমর্যাদায় আর সগৌরবে।
৯ই আগস্ট... প্রতি বছর ক্যালেন্ডার মেপে ধুমধাম করে পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। জাতিসংঘ (UN) দ্বারা ১৯৯৪ সালে প্রথম এই দিনটি উদযাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ কোটি আদিবাসী মানুষের বাস। কিন্তু চরম বাস্তব হলো,তারা মোট বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি হলেও পৃথিবীর চরম দরিদ্র মানুষের প্রায় ১৫ শতাংশই এই আদিবাসী সমাজভুক্ত।
এই দিনটিতে প্রতি বছর ক্যালেন্ডার মেপে মহাসমরোহে পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস। শৌখিন আদিবাসী-প্রেম আর আলো-ঝলমলে প্রচারের হুজুগে জমজমাট উৎসবের মঞ্চ। কিন্তু উদযাপনের সেই ঝলমলে আলো নিভে গেলেই এই সুর বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় অধিকারহীনতার অন্ধকারে। সময় বদলায়, দুনিয়া বদলায়, কিন্তু বদলায় না জল, জঙ্গল আর জমিনের এই আদিম রক্ষকদের বঞ্চনা ও অবহেলার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও আত্মত্যাগকে একদিনের সস্তা উদযাপনে বন্দি না রেখে, বছরজুড়ে ওদের সাংবিধানিক অধিকার আর বেঁচে থাকার মর্যাদা সুনিশ্চিত করাটাই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার। কারণ, প্রকৃতির এই সন্তানদের সরল হাসিতেই লুকিয়ে আছে আমাদের প্রাণভোমরা... এই পৃথিবীর ভারসাম্য!

No comments:
Post a Comment