Thursday, July 2, 2026


 

 মুনা 

অনলাইন আষাঢ়  সংখ্যা ১৪৩৩


সম্পাদকের কথা 

সারা বিশ্ব আপাতত ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। কমবেশি সকলেই রাত জেগে খেলা দেখে দিনের বেলায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিচ্ছেন। এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলে বেশ কিছু ছোট দল সবাইকে আনন্দ দিচ্ছে অনবদ্য খেলা প্রদর্শন করে। তাদের খেলা দেখতে দেখতে ভারতবাসী হিসেবে নিরাশ তো হতেই হয়। এত বড় দেশ আমাদের, অথচ আমরা বিশ্বকাপ ফুটবলে অংশ নেওয়ার ধারেপশে নেই। ফুটবল উত্তেজনার মধ্যেই ভেনেজুয়েলার প্রবল ভূমিকম্প আমাদের বাকরুদ্ধ করেছে। প্রকৃতির এই তাণ্ডব সহ্য করার শক্তি মানুষের নেই। আমাদের দেশও প্রকৃতির রোষে। বর্ষাকাল এলেও, এখনও অবধি বৃষ্টির ঘাটতি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই রাজ্যের উত্তরে আবার প্রবল বৃষ্টিতে ধস দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে। সঙ্গে রাজনৈতিক নানা টানাপোড়েন ও বিগত সরকারের দেউলিয়াপনা দেখে আপামর রাজ্যবাসী হতভম্ব ও স্তম্ভিত। বিশ্বকাপ ফুটবল না থাকলে হয়ত এই সব নিয়ে চর্চা আরও বেশি হত। কিন্তু এই মুহূর্তে বাঙালি মেতে আছে মেসি, এমবাপে, হাল্যান্ড প্রমুখদের নিয়ে। 


    মুজনাই  

অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা ১৪৩৩

রেজিস্ট্রেশন নম্বর- S0008775 OF 2019-2020

হসপিটাল রোড 

কোচবিহার 

৭৩৬১০১

ইমেল- mujnaisahityopotrika@gmail.com 

 

 প্রচ্ছদ ছবি 

শৌভিক রায় 

সম্পাদক 

শৌভিক রায় 

প্রকাশক 

রীনা সাহা 

 


মুজনাই আষাঢ় বৈশাখ সংখ্যা ১৪৩৩


এই সংখ্যায় 

প্রবন্ধ 

কবিতা বণিক, অভিজিৎ সেন, বটু কৃষ্ণ হালদার


বর্ষা ভ্রমণ 

গৌতমেন্দু নন্দী, অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী


গল্প 

চিত্রা পাল, ঋতুপর্ণা ভট্টাচার্য, উৎপলেন্দু পাল, পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়, অমিতাভ চক্রবর্ত্তী,

শুভেন্দু নন্দী, তুহিন শুভ্র ভট্টাচার্য্য, তাপসী ঘোষ


কবিতা (প্রথম পর্যায়)

প্রাণেশ পাল,  তন্ময় কবিরাজ, দীপাঞ্জন দত্ত, বিকাশ   দাশ, মোঃ আব্দুল রহমান, 

প্রতিভা পাল, মগ্ননীল (দীপ মুখার্জী), আকাশলীনা ঢোল, সৌমিতা মিত্র


ভ্রমণ 

বেলা দে, রণিতা দত্ত, জয়িতা সরকার


কবিতা (দ্বিতীয় পর্যায়)

মাথুর দাস, লীনা রায়, রাজু রায়, প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী, রীনা মজুমদার, মজনু মিয়া, সুধীর দাস 


অনলাইন আষাঢ় সংখ্যা ১৪৩৩


 

রবীন্দ্র সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বাণী 

অভিজিৎ সেন 


জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে সংস্কার মুক্ত যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, অঢেল শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা,  উপনিষদের ভক্ত, দার্শনিক পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের  কর্ম প্রণালী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো অগ্রজদের প্রভাব, অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরী, প্রিয়নাথ সেন, সঙ্গীতজ্ঞ শ্রীকন্ঠ সিংহের মতো ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য  রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করেছিল  পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনী(জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলা)গ্রন্থে সে কথা স্বীকার করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে তাঁর বউ দিদি অর্থাৎ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিণী কাদম্বরী দেবী । লাজুক ও মুখচোরা স্বভাবের এই ছেলেটি সুশৃংঙ্খলিত ঠাকুর পরিবারের চতুঃসীমার মধ্যে সংযমী জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন, তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে অত্যন্ত সাধারণভাবে যা তাঁকে আত্ম সংযমের সু-অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বাধা ধরা শিক্ষা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বাড়িতেই বাংলা,সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষা চর্চা,বিজ্ঞানের চর্চা, সংগীত চর্চা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করছেন। বৈদিক সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্যের বিশেষ করে রোমান্টিক যুগের কবিদের কাব্য, সেক্সপিয়ারের নাটক শৈশবেই অধ্যায়ন করেন, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য বিশেষ করে অনুবাদ সাহিত্য, চন্ডীদাস বিদ্যাপতি প্রভৃতির বৈষ্ণব পদ, মঙ্গলকাব্য, বাউল গান এবং জয়দেবের গীতগোবিন্দ, সংস্কৃত কবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্য ও তাঁর অন্যান্য নাটক শৈশবে তাঁর মনের মাঝে যে সুর ধ্বনিত করতো, যে আনন্দ তিনি এসবের মধ্য থেকে পেয়েছেন তার মূল্য ছিল অসামান্য। ঠাকুর পরিবারে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো নাটক, বিভিন্ন ধরনের সংগীতের ও বাদ্যযন্ত্রের নিয়মিত আসর, ব্রাহ্মসঙ্গীতের উদাত্ত সুর, স্বদেশী চেতনা, স্বজাত্যবোধ,কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর গীতি কবিতার প্রভাব প্রভৃতি ছোট বড়ো নানা বিষয় রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য জীবনকে, কর্মজীবনকে সমৃদ্ধি দান করেছিল। অতি শৈশবে পিতার সঙ্গে হিমালয় দর্শন, পরবর্তীকালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিলেতে কিছুদিন বসবাস তাঁকে গভীরভাবেই প্রভাবিত করেছিল। তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে যে কটা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তিনি সবই আত্মস্থ করেছিলেন।সুমহান সভ্যতার দেশ ভারতবর্ষ ও তার সমন্বয়ী জীবন দর্শন রবীন্দ্রনাথকে গোড়া থেকেই প্রভাবিত করেছিল। 

প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যে ভরা ভারত সভ্যতার মূল শক্তি ও সৌন্দর্য যা তিনি অতি শৈশবেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। অহিংসা ও মানবতাই ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি যা তিনি তাঁর যাবতীয় রচনায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাবে, প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করে গেছেন। ধর্মান্ধতা, জাতিগত হিংসা, পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিশ্বমানবতার শত্রু। মানুষের ওপর তিনি বিশ্বাস রেখেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে। বিশ্বাস রেখেছেন সমস্ত বিদ্বেষরূপী অন্ধকার দূর হবে, মনুষ্যত্ব জয়ী হবে। আর এই মনুষ্যত্বের সোপান ধরেই মানুষই একদিন দেবতা হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে। 
        কেউ নয় ঘৃণ্য কেউ নয় নীচ
               অমৃতের সবাই সন্তান 
        কর্মে ধর্মে মানুষই পাবে 
              দেবতার শ্বাশত সম্মান।
                    
মহাকাব্য বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তিনি তাঁর সোনার ফসল ফলাতে পারেননি । বাংলা ভাষা এবং বাঙালির  সামগ্রিক সংস্কৃতিকে তাঁর শাশ্বত রচনার মধ্য দিয়ে সর্বকালের এবং সর্ব মনের উপযোগী করে যেভাবে উপস্থাপন করে গেছেন তার তুলনা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল। 
                           
এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ আজন্ম রোমান্টিক কবি।('আমারে বলে যে ওরা রোমান্টিক /সে কথা মানিয়া লই') তিনি রোমান্সের রাজহংস। বিশেষ করে কাব্য সাহিত্যে তাঁর জীবন দেবতা, সীমা অসীমের দ্বন্দ্ব 
মানবতার অবিনাশী সুখদুখাশ্রিত আনন্দবাদের বহিঃপ্রকাশ।মর্ত্যপ্রীতি,মানব জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসার গভীর গহন অনুভূতিকে অলৌকিক শব্দ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত ও সাবলীল ভাবে প্রকাশ করেছেন, সত্যিই অতুলনীয়। গ্ৰিক নাট্যকার সফোক্লিস,জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটে, ফরাসি সাহিত্যক ভিক্টর হিউম ও রোঁমা রঁলা, নাট্যকার শেক্সপিয়ার,সংস্কৃত নাট্যকার কালিদাসের সঙ্গে কিছুটা তুলনীয় ।তাঁর কাব্য দর্শন আমাদের জীবনে নিয়ে আসে অখন্ড প্রশান্তি। যেখানে নেই কোন কলুষতা। যেখানে নেই হিংসার বিষাক্ত ছোবল। শান্ত স্নিগ্ধ জোছনার মতো ছড়িয়ে থাকে মানবতারূপী আলোকবর্তিকা। তাইতো কবি পাশবিকতাকে, বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে, ধর্মীয় উগ্রতাকে প্রবল ভাবে কসাঘাত করেছে তাঁর সাহিত্যে। জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন মানুষের শুভ বুদ্ধিকে, বিবেককে। শেষ পর্যন্ত কবি মানুষের উপর বিশ্বাস রেখেছেন । 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের 'ভারততীর্থ' কবিতায় ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সর্বত্র মানবতাবাদের জয় ঘোষণা করেছেন। এখানে বলেছেন যুগে যুগে ভারতবর্ষে নানা জাতের মানুষ শাসন করেছে তাণ্ডব করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতেই ওরা মিশে গেছে। বহু জাতি এভাবেই যুগে যুগে এসেছে এবং ভারতের বৃহত্তর সমাজের অখন্ড একটি অংশ হয়ে থেকে গেছে। তাই কেউ কাউকে বিচ্ছিন্ন করে ভারত গড়ে উঠতে পারে না। সবাই সবার মধ্যে মিশে আছে "শক হূন দল পাঠান মোগল/এক দেহে হল লীন"। তাই প্রার্থনা করেছেন মানুষের বিবেকী চিত্তের কাছে--"হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে/জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে" । 'পরিশেষ' কাব্যের 'ধর্মমোহ' কবিতায় বলেন "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ যে জন মারে আর শুধু মরে'। হিংসা সাম্প্রদায়িকতা  জাতের অভিমান পৃথিবীর সভ্যতাকে মনুষ্যত্বকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় । নৈবেদ্য কাব্যের ৯২ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"শক্তিদম্ভ স্বার্থলোভো মারীর মতন/দেখিতে দেখিতে আজি ঘিরিছে ভুবন/দেশ হতে দেশান্তরে স্পর্শ বিষ তার/ শান্তিময় পল্লী যত করে ছারখার' । 

গীতাঞ্জলি কাব্যের ১০৮ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান"। মুসোলিনির ইথিওপিয়া আক্রমণের প্রতিবাদে লিখেছেন 'আফ্রিকা' এবং জাপানের দ্বারা চীন আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদে 'নবজাতক' কবিতা । কবি সাবধান করে দিয়েছেন মানবতার শত্রুদের ।'প্রান্তিক' কাব্যের ১৮ সংখ্যক কবিতায় "ডাক দিয়ে যাই/দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে" । 'নবজাতক' কাব্যের 'বুদ্ধভক্তি' কবিতায় তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেন,"হিংসার উষ্মায় দারুন অধীর/সিদ্ধির বর যায় করুণানিধির---/মুষ্টি উঁচায় তাই চলে/বুদ্ধরে নিতে নিজ দলে' এই যে কত বড় মানবের পরিহাস অহিংসার দেবতাকে হিংসায় উন্মত্ত মানুষ হিতাহিত জ্ঞান ভুলে নিতে চায় নিজেদের দলে । কবি বিশ্বাস করেন হিংসা সাম্প্রদায়িকতা একদিন হার মানবে। পথে নগরে সর্বত্র সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ কাজ করে যাবে সভ্যতার চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে"শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নাশেষ 'পরে/ওরা কাজ করে'। শেষ পর্যন্ত তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। 'শেষলেখা' কাব্যের ৬ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"ওই মহামানব আসে/দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/মর্ত্য ধূলির ঘাসে ঘাসে" । 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে বলেন,"কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব' । তিনি আজীবন তাঁর সাহিত্য সাধনায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন । তিনি জানেন তাঁর কবিতা পৃথিবীর সকল মানুষের দুঃখকে তুলে ধরতে পারেনি সকলের ব্যথাকে, কথাকে ব্যক্ত করতে পারেনি। 'রোমান্টিক' নামক কবিতায় বলেন,"আমারে বলে যে ওরা রোমান্টিক/সে কথা মানিয়া লই/রসদীর্ণ পথের পথিক' । কবি 'জন্মদিনে' কাব্যের 'ঐকতান' কবিতায় স্বীকার করেছেন,"বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি/দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী---/আমার কবিতা জানি আমি/গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী/--যে আছে মাটির কাছাকাছি/সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি' ।

               ধর্মান্ধতার ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে । প্রবন্ধগ্ৰন্থে যুক্তিগ্রাহ্য, তাত্ত্বিক ও সমাজ বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে হিন্দু- মুসলমানের মধ্যের দূরত্ব, ধর্মের নামে ভন্ডামি ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের যে বীভৎস্যরূপ তিনি দেখেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে তারই বিষাক্ত মূল উৎপাটন করেছেন অত্যন্ত সহানুভূতির ও বিবেচনার সঙ্গে । 'ভারতবর্ষ' প্রবন্ধে বলেন, "ঐক্য মূলক যে সভ্যতা মানবজাতির চরম সভ্যতা ভারতবর্ষ চিরদিন ধরিয়া বিচিত্র উপকরণে তাহার ভিত্তি নির্মাণ করিয়া আসিয়াছে। পর বলিয়া সে কাহাকেও দূর করে নাই---ভারত বর্ষ সমস্তই গ্রহণ করিয়াছে, সমস্তই স্বীকার করিয়াছে (ভারতবর্ষের ইতিহাস) ।'বিশ্বসাহিত্য' প্রবন্ধে বলেন,"আমাদের অন্তঃকরণে যত কিছু বৃত্তি আছে সে কেবল সকলের সঙ্গে যোগস্থাপনের জন্য । এই যোগের দ্বারাই আমরা সত্য হই, সত্যকে পাই। নহিলে আমি আছি বা কিছু আছে ইহার অর্থই থাকে না ।' 'সমাজ' প্রবন্ধে 'পূর্ব-পশ্চিম' অংশে বলেছেন,'যাহা সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যাহা সকলের চেয়ে পূর্ণ যাহা চরম সত্য তাহা সকলকে লইয়া।' 'ন্যাশনালিজম' প্রবন্ধে বলেন,'নেশন- তত্ত্বটি অতিমাত্রায় প্রকাণ্ড হইয়া ওঠে, তখন সে নিজের ভেতরের মানুষকে গ্রাস করিতে শুরু করে। মানুষের যেসব মহৎ গুণ-যেমন দয়া, পরোপকার, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা-সেগুলিকে এই যান্ত্রিক নেশন নিজের স্বার্থের যূপকাষ্ঠে বলি দেয় ।---ভারতের সাধনা কোনদিন নেশন গঠনের সাধনা ছিল না, ভারতের সাধনা ছিল সামাজিক সামঞ্জস্য  ও সমন্বয় সাধনের সাধনা' ।

              'মানুষের ধর্ম'ও 'ধর্মের অধিকার' প্রবন্ধে তিনি আচার সর্বস্ব ধর্ম মানুষের প্রকৃত ধর্ম নয় । বাহ্যিক আচার-আচরণ, পোশাক, তিলক বা টুপি মানুষকে বিভক্ত করে। অপরদিকে অন্তরের আধ্যাত্মিক সত্য মানুষে মানুষে মিলন ঘটায়। তিনি বিশ্বাস করেন ধর্মের কাজ মানুষকে যুক্ত করা, বিভক্ত করা নয়। যখন কোন ধর্ম অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে শেখায় তা প্রকৃত ধর্মই নয়-তা হল ধর্মের নামে মোহ ও অন্ধত্ব। ' ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে ।'
                       
বাংলা তথা ভারতবর্ষের সমাজ জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী সমস্যা হল হিন্দু-মুসলমান সমস্যা । কবি অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে এর কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টা করছেন । কী কী উপায়ে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন সম্ভব তার একটি দিক নির্দেশ করেছেন বিশেষ করে তাঁর  কালান্তর, হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিময় নামক প্রবন্ধে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন মুসলমান সমাজকে হিন্দু সমাজ দীর্ঘদিন নানা কারণে দূরে সরিয়ে রেখেছে ফলে দূরত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। তিনি মনে করেন পারস্পরিক চুক্তির দ্বারা বা রাজনৈতিক জোটের দ্বারা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন সম্ভব নয় বরং প্রকৃত মিলন হবে একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষা বিস্তারে, অর্থনৈতিক সমতায় এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের দ্বারা।
               
'হিন্দু-মুসলমান' প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে তিনি এও বলেছেন যতক্ষণ উভয় সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার থেকে নিজেদের মুক্ত না করেছেন ততক্ষণ উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকৃত মিলন সম্ভব না, প্রকৃত ভারতবর্ষের জন্মও সম্ভব না। 
                 
'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাকে ভারতের মূল শক্তি বলেছেন। নাগরিক চেতনায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থাকলেও, ভারতের গ্রামগুলিতে বছরের পর বছর ধরে উভয়ের সম্প্রদায় কিভাবে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে আসছে সে কথাই প্রাবন্ধিক বলেছেন। এটা ভারতবর্ষের 
মধ্যে অবস্থিত আর একটি ভারতবর্ষ ।

তিনি বাউল, সুফি ও লোকায়ত সাধকদের জীবন দর্শনের আলোকিত অধ্যায় সমূহকে তুলে ধরেছেন শহুরে শিক্ষিত সমাজের সামনে । দেখিয়েছেন লালন সাঁই বা গগন হরকরার মত বাউল সাধকদের গানে ও জীবনে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান ছিল না। তাঁদের গানে ঈশ্বর ও মানুষ অভিন্ন হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে, ধর্মীয় পার্থক্য থাকলেও তাদের দৃষ্টিতে কোন ভেদাভেদ ছিল না। এই সহজ সত্যটিকে অত্যন্ত সহজ ভাবে বাউল সাধকরা তাঁদের গানে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ কবিতায়,প্রবন্ধে,নাটকে, উপন্যাসে ,গল্পে,গানে,পত্রে, আচরণে যখনি প্রয়োজন হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলবার তখন তিনি মানবতাকেই সমর্থন করেছেন।
              
'ন্যাশনালিজম' প্রবন্ধে উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন নিজের দেশকে ভালোবাসার নামে অন্য দেশকে বা জাতিকে ঘৃণা করা এক ধরনের পৈশাচিকতা। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা বিশ্বমানবতাবাদের অন্য নাম । এই প্রবন্ধে তিনি যখন বলেন, 
'ধর্ম যখন নিজের সীমালঙ্ঘন করে পলিটিক্সের ক্ষেত্রে প্রবেশ করে তখন তার মত ভয়ানক জিনিস আর কিছু হতে পারে না। এ এক আবহমান চিরসত্য ।
                 
তিনি তাঁর প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে সমূলে ছুড়ে ফেলে মানুষকে মানবতাবোধের সর্বজনীন শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছে। উপন্যাসে অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্ব মানবতাবাদী মনোভাব পরিপক্ক ও শিল্প সম্মতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধ ধর্মের নামে উগ্রতা, রক্ষণশীলতা ও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দূরত্বের পরিসীমা বৃদ্ধি করে চলেছিল, তিনি তার উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র ও কাহিনির মধ্যদিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তত্ত্বকে দূরে রেখে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন কৃত্রিম ধর্মীয় পরিচয় আসল পরিচয় নয়, প্রকৃত পরিচয় মৈত্রীতে ও মানবতায়।'গোরা'(১৯১০) উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে বিশ্ব মানবতায় উত্তরণ । কেন্দ্রীয় চরিত্র 
গোরা প্রথম জীবনে ছিল কঠোর হিন্দুত্ববাদী। জাত পাত, আচার সর্বস্বতাকে শ্রেষ্ঠ মনে করতো, একেই ধর্ম বলে বিশ্বাস করত। কিন্তু যেদিন জানতে পারে সে জন্মসূত্রে ভারতীয় হিন্দু নয়, সিপাহী বিদ্রোহের সময় হারিয়ে যাওয়া আইরিশ দম্পতি সন্তান। তখন তার দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা গোঁড়ামির প্রাচীর মন থেকে ভেঙে পড়ে। সে মহিম ও আনন্দময়ীকে  অনায়াসে বলতে পারে,'আজ আমি এমন শুচি হয়েছি যে চন্ডালের ঘরে আমার পাত পাড়তে আর সংকোচ থাকবে না... আজ আমি ভারতবর্ষীয়, আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান কোন সমাজের কোন বিরোধ নেই। 'রবীন্দ্রনাথ  গোরা চরিত্রের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণ্ডির মধ্যে আটকে থেকে দেশকে বা মানুষকে  যথার্থভাবে ভালোবাসা যায় না, সেবা করা যায় না, উপকার করা যায় না।'ঘরে-বাইরে'(১৯১৬) উপন্যাসে ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার ও রাজনৈতিক মুনাফা লুটার কুৎসিত রূপটি উন্মোচিত হয়েছে। তাই সন্দীপ স্বদেশী আন্দোলনের নামে গরিব মুসলিম ও নিম্নবর্ণের মুসলমানদের লবণ, বিদেশি কাপড় বর্জন করতে বাধ্য করে,  দাঙ্গায় ঠেলে দেয় । অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী জমিদার নিখিলেশ মনে করে জোড়জুলুম করে প্রকৃত দেশপ্রেম জাগ্রত করা যায় না ।'চতুরঙ্গ'(১৯১৬) আচার সর্বস্ব ধর্মের অসারতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে 'জ্যাঠামশাই' অর্থাৎ জগমোহন চরিত্রটির আচরণের মধ্য দিয়ে। তিনি ঘোরতর নাস্তিক ও মানবতাবাদী তাই তিনি প্লেগ আক্রান্ত দরিদ্র মুসলিম ও নিম্ন বর্ণের মানুষদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন এবং তাদের সেবা করে মানবতাবাদের পরিচয় দিয়েছেন। 'যোগাযোগ'(১৯২৯) উপন্যাসে কুমুদিনী অত্যন্ত  ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম তাকে অহংকারী ও সংকীর্ণমনা
করে তুলতে পারিনি। তাঁর হৃদয়ের ঈশ্বর চেতনা জাত বা গণ্ডিতে আবদ্ধ নয় ।
                            
রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন ধর্ম যখন মানুষের চেতনার চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন সমাজকে সে ধ্বংস করে থাকে ‌। জাত পাতের বিচার এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। উদারতা,মানবতা ধর্মের মূল আধ্যাত্বিক শক্তি যা মানুষকে ভালবাসতে শেখাবে, সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বমানবতার বাণী ঘোষিত করবে।  দেবতার অবস্থান মন্দিরে নয় মানুষের মাঝে।  তাঁর 'ধূলিমন্দির' কবিতায় পুরোহিতদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ভজন পূজন সাধন আরাধনা/সমস্ত থাক পড়ে/রুদ্ধ দ্বারে দেবালয়ের কোণে/কেন আছিস ওরে।'মানুষের সেবায় আসল ধর্ম, প্রকৃত ঈশ্বরের সেবা করা। 'যত জীব তত শিব' স্বামী বিবেকানন্দের বলেছিলেন।'সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ তাহার উপরে নাই' কখনো চন্ডীদাস বলেছিলেন।'নর সে পরম দেব নর সে ঈশ্বর/নর বীনে ভেদ নাই/দেবতা কিন্নর'কখনো বলেছিলেন আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজী। 
                     
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকে ধর্মীয় গোঁড়ামি, আচার সর্বস্বতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। যেমন 'বিসর্জন'(১৮৯০) নাটকটি ধর্মীয় আচার ও জীব-বলির বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াই । নাটকে ত্রিপুরার রাজপুরোহিত রঘুপতি মনে করত রাজরক্ত ও পশুরক্ত ছাড়া  দেবী তুষ্ট হন না। তার এই অন্ধবিশ্বাস ও অহংকার তাকে হিংস্র করে তোলে, এমনকি রাজাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে পর্যন্ত লিপ্ত করে। বলির জন্য অনাথ বালিকা অর্পণার ছাগ শিশুটিকে কেড়ে নেয়। শেষে রঘুপতির শিষ্য জয়সিংহ উপলব্ধি করে ধর্ম বা দেবতা রক্তপাত চায়না ।

'অচলায়তন'(১৯১২) সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এই নাটকটি। 'অচলায়তন' হলো নিয়মের বা ছোঁয়াছুঁয়ির শেকলে বেঁধে থাকা এক বন্দী জীবন । নাটকে মুক্তির দূত হিসাবে আসেন দাদা ঠাকুর ও পঞ্চক চরিত্র দুটি। দাদাঠাকুর গোঁড়ামির 'অচলায়তন' প্রাচীর কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। যে ধর্ম মানুষকে অস্পৃশ্য বা শত্রুরূপে দূরে ঠেলে দেয় সে ধর্ম অসার বা মৃত। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার মধ্যেই জীবনে আসে মুক্তির বাতাস-- প্রকৃত ধর্ম সেই পরিবেশই তৈরি করে। 
         
 'মুক্তধারা'(১৯২২) নাটকে যুবরাজ অভিজিৎ শিব- তরাইয়ের সাধারণ মানুষের জলের সমস্যা দূর করতে গিয়ে বাঁধ ভেঙে দিয়েছেন। সেই বাঁধের জলের স্রোতে সে নিজেই ভেসে গেছে। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তার আত্মত্যাগ মানুষের কল্যাণ করেছে। অভিজিতের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্র ও ধর্মের নামে সাধারণের উপর অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ দেখিয়েছেন।
     
 'রক্তকরবী'(১৯২৬) নাটকে যক্ষপুরীর রাজা ও ধর্মীয় গুরু গোঁসাই উভয় মিলে জাত পাত ও নিয়মের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের শোষণ করে চলেছে। তারা একতাবদ্ধ হতে পারেনি অথবা তাদের একতাবদ্ধ হতে দেওয়া হয়নি । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নন্দিনীর সহজ ও অসাম্প্রদায়িক ভালোবাসায় এরা শোষণের জাল ছিঁড়ে ফেলেছে ঐক্যবদ্ধভাবে। এখানে শিল্প সভ্যতার নির্মমতার উপর কৃষি সভ্যতার জয় ঘোষিত হয়েছে প্রতীক-সংকেতের মধ্যদিয়ে।
           
'রথের রশি'(১৯৩২) নাটকে সমাজের লালিত পালিত  জাত পাত, অস্পৃশ্যতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার মূলে সরাসরি আঘাত করেছেন। ধর্মীয় শক্তির অধিকারী পুরোহিত, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অধিকারী ক্ষত্রিয় কূল বা রাজন্যবর্গ, টাকার অহংকারে মত্ত বণিক শ্রেণী যখন হঠাৎ থেমে যাওয়া রথ টানতে পারছিল না তখন ডাক করলো সমাজের অবহেলিত নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ শূদ্রদের। তারা এসে রথের রশি টানতেই রথ চলতে শুরু করে। এতদিন যাদের ছোঁয়া লাগলে জাত যেত, যাদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার ছিল না, বাধ্য হয়ে তাদেরকেই মহাকালের রশি টানার অধিকার দিতে হলো উচ্চবর্ণের । নাটকে 'কবি' চরিত্রটি জানতো মহাকাল আর জাত পাতের বৈষম্য সহ্য করবেন না। সে বলে,'যাদের এতদিন তোমরা নীচে ফেলে রেখেছিলে, আজ মহাকাল তাদেরই ওপরে টেনে তুলেছেন' । 'কবি' উচ্চবর্ণের মানুষদের মনের ভয় দূর করে বলেন এখন থেকে রথে চড়ে সবাই সমান ভাবে এগিয়ে যাব। ছোট বড় স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য ভেদ থাকবে না ।
                 
সমাজ জীবনে পরাধীন ভারতবর্ষে যখনই শাসকবর্গের দ্বারা অন্যায় হয়েছে রবীন্দ্রনাথ তাঁর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য তিনি মানুষের মাঝে মানবিক আবেদন রেখেছেন। রাখি বন্ধন উৎসব এর মধ্য দিয়ে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। ১৯১৯ সালে জালিওনাবাগের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে তিনি ইংরেজদের দেওয়া 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেছেন। অতি শৈশবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর 'হিন্দুমেলার উপহার' কবিতাটি জাতীয়তাবাদী ধারণার পরিচায়ক । 'দুরন্ত আশা' কবিতা অলস ভিরু দুর্বল মানসিকতার বাঙালিকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেছেন। 'হতভাগ্যের গান' কবিতায় সর্বহারা মানুষদের দুঃখ জয় করতে বলেছেন। 

'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বঙ্গমাতা' কবিতায় বলেছেন 'সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী/রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি" 'কাহিনী' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'দীনদান' কবিতায় বলেছেন, 'শূন্য নয় রাজদম্ভে পূর্ণ,সাধু কহে/আপনার স্থাপিয়াছ জগতের দেবতারই নহে' কবি প্রকৃত ঈশ্বর বলতে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছেন । মানুষের সেবা ঈশ্বরের সেবা।
                 
অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্বমানবতাবোধ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন,''ধর্মের নামে সংকীর্ণতা যেখানে মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়, সেখানে আমি ধর্মের কোন সার্থকতা দেখিনা'। আবার কখনো বলেন,"ভারতবর্ষের চিরদিনই একমাত্র চেষ্টা প্রভেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা ।" স্বামী বিবেকানন্দ বলেন,"আমরা শুধু অন্য ধর্মকে সহ্য করি না, সব ধর্মকেই সত্য বলে বিশ্বাস করি।" কাজী নজরুল বলেন" হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসা কোন জন?/ কান্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার" । মহাত্মা গান্ধী বলেছেন,"পৃথিবীর সব ধর্মই মূলত এক, কেবল তাদের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম গুলো ভিন্ন"। লালন সাঁই তাই তাঁর গানে বলেন "সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে"। ভারতের জাতীয় সংগীত "জন গন মন" রবীন্দ্রনাথের রচনা। আবার তেমনই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত"আমার সোনার বাংলা"সেই রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। গান দুটিতে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের চির-উজ্জ্বল প্রকাশ।


 

বিজ্ঞানীদের  বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়  ছদ্মবেশে বিপ্লবী ছিলেন
বটু কৃষ্ণ হালদার

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি রসায়নবিদ, বাংলা ও বাঙালির গর্ব আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে যারা বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে তুলতে শিখিয়েছেন, তাদের মধ্যে স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা। যে দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় সত্য কি তাহা জানে এবং বোঝে, কিন্তু জীবনে বরণ করিয়া লইতে প্রস্তুত নহে - মনের গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে যে সত্যের নিকট লজ্জায় মস্তক অবনত করিতেছে, অথচ বাহিরে জনসমাজে এবং সভার মাঝে তাহাকে স্বীকার করিবার সাহস নাই,সে জাতি কেমন করিয়া জগতের নিকট সগর্বে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে তাহা আমার বুদ্ধির অতীত।,বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।সবাই তাঁকে ফুলু বলে ডাকতেন।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, যিনি পি সি রায় নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, বিজ্ঞানশিক্ষক, দার্শনিক, কবি।যিনি  একদিকে বেঙ্গল  কেমিক্যাল এর প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যদিকে মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক।

২রা আগস্ট ১৮৬১ সনে, বাংলাদেশের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাডুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মা ভূবনমোহিনী দেবী এবং পিতার হরিশচন্দ্র রাযয়ের পুত্র। হরিশচন্দ্র রায় স্থানীয় জমিদার ছিলেন। বনেদি পরিবারের সন্তান প্রফুল্লচন্দ্র ছেলেবেলা থেকেই সব বিষয়ে অত্যন্ত তুখোড় এবং প্রত্যুৎপন্নমতি ছিলেন। পড়াশোনা শুরু হয় বাবার প্রতিষ্ঠিত এম ই স্কুলে। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু রক্ত আমাশায় রোগের কারণে তার পড়ালেখায় ব্যাপক বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে যান। গ্রামে থাকার এই সময়টা তার জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে সাহায্য করেছে। বাবার গ্রন্থাগারে প্রচুর বই পান তিনি এবং বইপাঠ তার জ্ঞানমানসের বিকাশসাধনে প্রভূত সহযোগিতা করে।

১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রফুল্লচন্দ্র কলকাতায় ফিরে  অ্যালবার্ট স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি  প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) ভর্তি হন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে কলেজ ফাইনাল তথা এফ এ পরীক্ষায় (ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসি) দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সী থেকে গিলক্রিস্ট বৃত্তি নিয়ে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বি এসসি পাশ করেন।

পরবর্তীকালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েই ডি এসসি ডিগ্রী লাভের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তাঁর সেই গবেষণার বিষয় ছিল কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ (Conjugated Sulphates of Copper Magnesium Group: A Study of Isomorphous Mixtures and Molecular Combination)। দুই বছরের কঠোর সাধনায় তিনি এই গবেষণা সমাপ্ত করেন এবং পিএইচ ডি ও ডি এসসি ডিগ্রী লাভ করেন। এমনকি তার এই গবেষণাপত্রটি শ্রেষ্ঠ মনোনীত হওয়ায় তাকে হোপ প্রাইজে ভূষিত করা হয়। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে (India Before and After the Sepoy Mutiny) এবং ভারতবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে ভারতবর্ষ এবং ইংল্যান্ডে সাড়া ফেলে দেন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রফুল্লচন্দ্র রায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সী কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় ২৪ বছর তিনি এই কলেজে অধ্যাপনা করেছিলেন। অধ্যাপনাকালে তার প্রিয় বিষয় রসায়ন নিয়ে তিনি নিত্য নতুন অনেক গবেষণাও চালিয়ে যান। তার উদ্যোগে তার নিজস্ব গবেষণাগার থেকেই বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে তা কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন এর নতুন নাম রাখা হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড।।

নিজের বাসভবনে দেশীয় ভেষজ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি তার গবেষণাকর্ম আরম্ভ করেন। তার এই গবেষণাস্থল থেকেই পরবর্তীকালে বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানার সৃষ্টি হয় যা ভারতবর্ষের শিলপায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তাই বলা যায় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পায়নে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট (HgNO2) আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। এটি তার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। তিনি তার সমগ্র জীবনে মোট ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন।সমবায়ের পুরোধা স্যার পিসি রায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ জন্মভূমিতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী পিসি রায় পিতার নামে আরকেবিকে হরিশ্চন্দ্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

বাগেরহাট জেলায় ১৯১৮ সালে তিনি পি.সি কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে বিশাল ভূমিকা রাখছে। শিক্ষকতার জন্য তিনি সাধারণ্যে ‘‘আচার্য’’ হিসেবে আখ্যায়িত। সি আই ই: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববাদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয়বারের মত তিনি ইংল্যান্ড যান এবং সেখান থেকেই সি আই ই লাভ করেন।সম্মানসূচক ডক্টরেট: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই ডিগ্রী দেয়। এছাড়া ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে মহীশুর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি ডক্টরেট পান।১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ব নাইট উপাধি লাভ করেন।l

পিসি রায় শুধু নিজে অসাম্প্রদায়িকই ছিলেন না বরং সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার মূলোৎপাটনের জন্যও চেষ্টা করেছেন সবসময়। পিতার মত তিনিও ছিলেন আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ দক্ষ। তাদের বাড়ির বিশাল লাইব্রেরিতে অনেক ইসলামী ও হিন্দু ধর্মীয় বই পুস্তক ছিল। তাদের বাড়িতে সার্বক্ষণিক একজন বৃদ্ধ মৌলভী সাহেব নিযুক্ত ছিলেন।

১৯১৫ সালে কুদরত-ই খুদা (একমাত্র মুসলিম ছাত্র) এমএসসি তে (রসায়ন) প্রথম শ্রেণি পাওয়ায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক তাকে অনুরোধ করেন প্রথম শ্রেণি না দেওয়ার জন্য। অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও পিসি রায় নিজের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কুদরত-এ-খুদাকে প্রথম বিভাগ দেন। সারা জীবনে অনেক প্রচ্ছেদ রচনা করেছেন অনেক বই লিখেছেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তাঁর লদ্ধে উল্লেখযোগ্য কতগুলি হলঃ ১। India Before and After the Sepoy Mutiny (সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে), ২। সরল প্রাণীবিজ্ঞান, বাঙ্গালী মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার, ৩। হিন্দু রসায়নী বিদ্যা এবং মোট ১৪৫টি গবেষণাপত্র।

ফুলুকে বলা হয় 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী'। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলত ফুলু নাকি বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে বিপ্লবী।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলোনের সময় বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার টাকা দিত।ফুলুর দেশপ্রেম এতই উগ্র ছিল,যে ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন,_স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি আধ-ডজন থাকতেন, এতদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত।' ১৯১৯ সালে ফুলুকে ব্রিটিশরা Companion of the Indian Empire(C.I.E.) উপাধি দিয়েছিলেন।সেই বছরই কলকাতার টাউন হলে রাওলাট বিলের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছিল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।তিনি বলেছিলেন,_দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।'

প্রেসিডেন্সি কলেজে ২৭ বছর পড়িয়েছেন তিনি। ক্লাসে ফুলু পড়াতো বাংলা ভাষায়।নীচের দিকেই ক্লাস নিতে ভালোবাসত ফুলু, সে বলত 'কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমত আকার দিতে পারে হাইস্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়।' সে সব সময় চাইত তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাপিয়ে যাক। তাই তিনি লিখেছিলেন,_ সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করিবে, কিন্ত পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া সুখী হইবে।' ফুলুর এক মুসলিম ছাত্র ছিলেন ডঃ কুদরত-ই খুদা। ১৯১৫ সালে কেমিস্ট্রিতে এম.এস.সি পরীক্ষায় কুদরত-ই খুদা প্রথম শ্রেণী পাওয়ায় কয়েকজন কট্টর হিন্দু শিক্ষক ফুলুকে অনুরোধ করেছিলেন কুদরত-ই খুদাকে প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য। কিন্ত ফুলু যে অসাম্প্রদায়িক পিতার ভাবাদর্শে দীক্ষিত। ফুলুর কাছে যে যোগ্য সে যোগ্যই। তাই ফুলু রাজি হয়নি।

ফুলুকে একবার বিশ্বকবি লিখেওছিলেন,_যেসব জন্ম-সাহিত্যিক গোলমালের মধ্যে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন।' আসলে বিশ্বকবি অনুভব করেছিলেন, বিলেতে পড়াশুনা করলেও এবং ইংরেজিতে চোস্ত হলেও বাংলা ভাষা ছিল ফুলুর প্রাণ এবং ফুলুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সাহিত্যি সুলভ আচরণ। ফুলুর ৭০ তম জন্মজয়ন্তীর দিনে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, আবেগমথিত কণ্ঠে বিশ্বকবি বলেছিলেন, 'আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি।' সেদিন রবীন্দ্রনাথ ফুলুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি তাম্রফলক, তাতে খোদাই করা ছিল কবির লেখা দুটি লাইন -'প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়,করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।'

ছোটবেলা থেকেই কলা খেতে ভালোবাসত ফুলু, সকালে টিফিন করত দুটো কলা দিয়ে। চাঁপাকলা ফুলুর খুব প্রিয় ছিল। সেই সময় এক পয়সায় দুটো চাঁপাকলা পাওয়া যেত। একদিন এক ছাত্র স্যারের জন্য তিন পয়সা দিয়ে দুটো কলা নিয়ে আসায় কি রাগ ফুলুর, ছাত্রকে বলেছিল, 'নবাবি করতে শিখেছ, আমায় পথে বসাবে?'

এর কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস নেতা ড . প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন ফুলুর কাছে,তাঁর তিনহাজার টাকা দরকার ছিল। তৎকালীন সময়ে এক পয়সায় দুটো কলা পাওয়া যেত, সে যুগে তিন হাজার টাকার মুল্য সহজেই অনুমান করা যায়। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনহাজার টাকার চেক লিখে দিয়েছিলেন।

'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' রাড়ুলীর ফুলুর নাম ডাক ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বাইরে ও। সাইমন কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজের কথা ও ফুলুর কথা লন্ডনে অনেক শুনেছিল। তারা কলকাতায় এসে বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল,আসল উদ্দেশ্য ছিল ফুলুকে দেখা। এক দুপুরে তারা ফুলুর ঘরে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিস্কারক স্যার পি,সি,রায় গামছা পরে চেয়ারে বসে আছেন। কারণ ফুলু তার ধুতি খানা কেচে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। ঘরের এক কোণে স্টোভ জ্বলছে, নিজের খাবার নিজেই রান্না করছিলেন। একটু লজ্জা না পেয়ে ফুলু নাকি সেই অবস্থাতেই সাইমন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।তিনি বুঝেছিলেন, ‘‘একটা সমগ্র জাতি শুধুমাত্র কেরানী বা মসীজীবী’’ হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখালেন তিনি। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কস। মূলধন বলতে ছিল, মাত্র আটশো টাকা আর পূর্ণ আত্মবিশ্বাস।

বাঙালি আধুনিক হয়েছে। নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে প্রধানত করে অন্য ভাষার দাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানী ফুলু বিদেশে পড়াশোনা করলেও নিজের ভাষা সংস্কৃতির কথা এতটুকু ভুলে যাননি। ইতিমধ্যেই বাঙালির অন্যতম প্রিয় জিনিস বাংলা ক্যালেন্ডার সাংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে।সেই ক্যালেন্ডার জুড়ে সারা বছরে বহু মনীষীদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস খোদাই করা থাকতো। সেসব আজ অতীত।আদর্শ বাঙালিরা বর্তমান সময়ে এমন মহান ব্যক্তির জন্ম,মৃত্যু দিবস পালন না করলেও মার্কস,লেলিন,চে গুয়েভারা দের মত বহু বিদেশীদের জন্ম মৃত্যু দিবস শ্রদ্ধার সঙ্গে এই বাংলায় পালন করেন।ভারতবর্ষের ইতিহাস জুড়ে বিদেশীদের কর্মকাণ্ড পড়ানো হয়। অথচ বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কথা প্রায় ভুলতে বসেছে আমাদের প্রজন্ম।আমাদের ক্ষমা করবেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তবে বর্তমান সময়ে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে।আমাদের দেশের ইতিহাসটা একটু পরিবর্তন করা দরকার। ইতিহাসের পাতা থেকে বিদেশীদের অব্যাহতি দিয়ে ফুলুদের মতো এমন মহান বাঙালি বিজ্ঞানীদের মহান কর্মকাণ্ডের কথা  বেশি করে তুলে ধরা উচিত।সেই কাজ যত দ্রুত সম্ভব হয় তার প্রচেষ্টা করা উচিত। নইলে আগামী প্রজন্ম প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কে চিনতে পারবে না।

ফাদার অব নাইট্রাইট খ্যাত বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার পি,সি, রায় ৭৫ বছর বয়সে পালিত অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও আট বছর বেঁচে ছিলেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের একটি ছোট কক্ষে, যেখানে ছিল একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাবার ছোট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। যেসব ছেলে তাঁর কাছে থাকত, তাদেরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মাত্র ৮৩ বছর বয়সে বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মনকে চিন্তার বিষয় করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। যাকে আমরা শুধু বিজ্ঞানী বলে ছেড়ে দিলাম। যিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম জনক হয়ে উঠতে পারতেন তাকে প্রায় ভুলিয়ে দিলাম।  যিনি অনলস পরিশ্রম করে থান ইঁটের মত দুখন্ডে চরক সুশ্রুত ভাস্করাচার্যের আধারে লিখলেন হিন্দু রসায়নের ইতিহাস তাকে শুধু বিজ্ঞানী বলে তার হিন্দু সাধক সত্ত্বাকে ভুলে গেলাম।  কারন তিনি গেরুয়া পরতেন না। ধর্মের নামে অন্ধ কুসংস্কারকে পাত্তা দিতেন না। সেগুলোর সমালোচনা করতেন।  তিনি তার বাঙালির মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার বইয়ে,লিখেছেন তাল ধুপ করে পড়ল না পরে ধুপ করলো এই নিয়েই বাংলার পন্ডিত রা ব্যস্ত। প্রদীপ ঠাকুরের সামনে ডানে ঘুরবে না বাঁয়ে ঘুরবে সেই নিয়ে কি তর্ক।  অনেকটা বিবেকানন্দের বানী । 

এখন ও আমরা সেই কুসংস্কারেই হাবুডুবু খাচ্ছি। সোমবারে লাউ আর মংগলবারে কুমড়ো কেন খেতে নেই তাই নিয়ে চর্চা চলছে। এখনও বাংলার একদল সাধু বাবাজী কাকে কালসর্প ধরেছে, কে মাঙ্গলিক, একাদশী তে বাইচান্স জল খেলে কোন নরকে যাবে, শনিবারে ঘরে শুকনো লংকা পোড়ার ধূমো দিলে কি হয়, ম্যানিবাগে গোলমরিচের গুড়োরাখলে কিভাবে টাকা আসে এ সব নিয়ে মেতে আছে।  

প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর বইয়ে লিখেছেন, "শাস্ত্রেই বলা আছে:_"কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্য বিনির্নয়/যুক্তিহীনে বিচারে তু ধর্ম হানি প্রজায়তে"।  শাস্ত্র অথবা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যতই বলুক ধর্মকে যুক্তি দিয়ে বিচার করে তবেই মানতে হবে, সেকালের মত আমাদের একালের বাবা রাও একই পথের পথিক।  যদি আমরা সত্যিই হিন্দু ধর্মের বিকাশ চায় তবে প্রফুল্লচন্দ্রে পথই আমাদের পথ। কোন অন্ধ কুসংস্কারযুক্ত বিশ্বাস বাবাজী গুরুজীর অন্ধ বিশ্বাস যুক্ত বচন আমাদের পথ নয়।  সমাজ ও রাষ্টের কল্যানের জন্য যদি আরো ১০০ জন্ম মোক্ষ না হয়, যদি আরো হাজার জন্ম নরকে যেতে হয় তো হবে। তাই বলে যুক্তি আর বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে দিনরাত গূহ্যটিপে মোক্ষের সন্ধান করতে পারবো না।"



 

বনসাই

কবিতা বণিক

বনসাই হল মানুষের এমন এক শিল্পকলা যা এক শিল্পী তাঁর বুদ্ধি, সাধনা, ধৈর্যের মাধ‍্যমে বিরাট প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরেন। মুগ্ধ হতে হয় এমন যত্নে লালিত শিল্পকলা দেখে। প্রকৃতির ক্ষুদ্র রূপ।

বনসাই একটি জাপানি শিল্পকলা। বন অর্থে অগভীর পাত্র, সাই অর্থ গাছ। খুব বড় গাছকে অগভীর পাত্রে বসিয়ে যত্ন করে বামন আকৃতি করে পুষ্ট করে তোলার নাম বনসাই। এই প্রক্রিয়ায় মহীরুহকেও ছোট্ট করে রাখা যায়। তার গুণমান বজায় রেখে। সব ধরনের পূর্ণাঙ্গ গাছকে বনসাই করা যায়। এর ফলও সাধারণ ফলের মতই হয়। কারণ জিনগত ভাবে এটি একটি সাধারণ গাছ। জাপানে এই শিল্পের উৎপত্তি হলেও সারা পৃথিবীতেই এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট ফ্ল‍্যাটেও বনসাই রাখা যেমন সম্ভব, তেমনি বনসাই এর বড়বড় পার্কও আছে। যেখানে মানুষ সৌন্দর্য উপভোগের সাথে সংরক্ষণ, শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বিনোদন এরও কেন্দ্র হয়ে ওঠে। বনসাই হাজার বছরও বাঁচে। বনসাই করা প‍্যানোরমা ছবিও পার্ক গুলোতে দেখতে পাওয়া যায়। প‍্যানোরমা ছবি যা হল একটা ট্রের মধ্যে প্রকৃতির চারিদিকের একটি পূর্ণাঙ্গ দৃশ‍্য তুলে ধরা। যেমন বনের আবহ তৈরি করতে একই প্রজাতির অনেক ছোট চারা নির্বাচন করা হয়। বিভিন্ন উচ্চতার ও বিভিন্ন ব‍্যাসের কান্ডের গাছ ব্যবহার করলে দৃশ‍্যটি জীবন্ত মনে হয়। চারাগুলোকে অসমান ভাবে আঁকাবাঁকা দূরত্বে বসানো হয়। মাঝে মাঝে ছোট গাছ, ঝোপঝাড় বা ফার্ন জাতীয় গাছ ব‍্যবহার করা হয়। শ‍্যওলা দিয়ে মাটিতে সবুজ আস্তরণ তুলে ধরা হয়। পাহাড়ি রূপ দিতে গাছের ফাঁকে ফাঁকে পাথর বসানো হয়।

 অস্ট্রেলিয়ার ক‍্যানবেরা ন‍্যাশনাল আরবোরেটাম। ২৫০ হেক্টর এলাকা জুড়ে ৪০,০০০ এর বেশি বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ এখানে রয়েছে। আমার দেখা ভারতবর্ষের ব‍্যাঙ্গালোরের লাল বাগেও বনসাই পার্ক আছে।



 বনসাই করার কিছু পদ্ধতি আছে। প্রথমত শক্ত কাণ্ড যুক্ত গাছ নির্বাচন করতে হবে। আমাদের দেশের বট, পাকুড়, কাঠ গোলাপ, ডালিম ইত্যাদি। গাছের বৃদ্ধি রোধ করতে অগভীর ও ছড়ানো টব কিংবা ট্রে নিতে হবে। জল নিষ্কাশনের জন‍্য অবশ্যই কয়েকটা ছিদ্র করতে হবে। যাতে জল সহজেই নিষ্কাশন হয়। বনসাই এর জন্য মাটি তৈরি করা হয় দোঁ-আঁশ মাটির সাথে কিছু বলি ও জৈব সার মিশিয়ে। নিচের ছিদ্র গুলোতে আ‍্যলুমিনিয়াম বা তামার তার পেঁচিয়ে গাছের বৃদ্ধি কমিয়ে রাখে। কিছুদিন বৃদ্ধির পর ডালপালায় ঐ রকম তার পেঁচিয়ে উপযুক্ত আকৃতি দিতে হয়। খেয়াল রাখতে হবে যেন গাছের গায়ে ক্ষত না হয়। ডালটি পছন্দ মতো আকার নিলে কয়েক মাস পর তারটি খুলে ফেলতে হয়। এবং অবাঞ্ছিত ডালপালা ছাঁটাই করতে হয়। বনসাই অতিরিক্ত রোদ বা জল কোনটাই সহ‍্য করতে পারে না। তবে আলো বাতাস পূর্ণ স্হানে রাখতে হবে। একবছর বাদে টবের মাটি পরিবর্তন জরুরি। বনসাই এর মূল, কাণ্ড মসৃণ ও দাগ মুক্ত হয়। গাছটি যেন তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ঠিকমতো বহন করতে পারে। বনসাই পরিচর্যার জন‍্য নির্ধারিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার প্রয়োজন। খাদ্য হিসেবে তরল সার, জৈব সার যেমন শুকনো গোবর, ভার্মিকম্পোষ্ট, হাড়ের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়।

ব‍্যাঙ্গালোরের লাল বাগে বনসাই পার্কে প্রচুর বনসাই এর সাথে কিছু প‍্যাগোডা, অদ্ভুত আকৃতির বেশ বড় পাথর, ছোট ছোট পশু-পাখির মডেল রেখে পার্কের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বিশেষ ধরনের বনসাই যেমন জুনিপার মাউন্টেন স্কেপ। অর্থাৎ ফরেষ্ট স্টাইল বনসাই একটি শৈলী যেখানে অগভীর পাত্রে একাধিক জুনিপার গাছ একসঙ্গে এমন ভাবে সাজানো হয় যাতে একটি প্রাকৃতিক পাহাড় বা বনভূমির দৃশ‍্য ফুটে ওঠে । এই শৈলীটির আকর্ষণীয় গঠন এবং নান্দনিক রূপের জন‍্য অত্যন্ত জনপ্রিয়। রকি মাউন্টেইনের রুক্ষ প্রাকৃতিক দৃশ্য বা পাহাড়ি পরিবেশে প্রাকৃতিক ভাবে বেড়ে ওঠা জুনিপার গাছের দৃশ‍্যকে বোঝায়। রকি মাউন্টেনের জুনিপার , উত্তর আমেরিকার একটি চির সবুজ উদ্ভিদ। যা চরম ঠান্ডা ও খরা সহ‍্য করতে পারে। রবার থর্ন বনসাই। জনপ্রিয় ইনডোর বনসাই। চকচকে পুরু পাতা ও সামান‍্য যত্নে টিকে থাকার ক্ষমতার কারণে এটি গৃহসজ্জার উপযোগী। টবে ছোট আকৃতি বজায় রাখার জন‍্য এর বৃদ্ধি এবং পাতার আকারকে ছোট রাখতে নিয়মিত ছেঁটে রাখতে হয় ৬/৭ টি কচিপাতা রেখে। পরোক্ষ আলোয় এ গাছ ভালো থাকে।

ফিকাস মাইক্রোকারপা হলো অত‍্যন্ত জনপ্রিয় সহজে রক্ষণাবেক্ষণ যোগ‍্য একটি ইনডোর বনসাই। এটি এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলের স্হানীয় গাছ। এই গাছের সুন্দর গড়ন ও মজবুত কাণ্ডের কারণে, বনসাই শিল্পে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। এই গাছের শিকড় ও কান্ড খুব তাড়াতাড়ি মোটা হয়। সে কারণেই বনসাই শিল্পে চাহিদা ও বেশি। পাতা গাঢ় সবুজ , চকচকে ডিম্বাকৃতি। ফলে খুব সুন্দর হয়। এটিকে চাইনিজ বেনিয়ান, মালয়েশিয়ান বেনিয়ান বা ইন্ডিয়ান লরেল ফিগ নামেও পরিচিত। মালয়ান বেনিয়ান নামেও পরিচিত। আসলে বট গাছেরই একটা প্রজাতি। প্রচুর বনসাই আছে ব‍্যাঙ্গালোরের লালবাগে। তারই কিছু ছবি দেওয়া হল।
  
বনসাই এর কথায় রবি ঠাকুর কে মনে পরে, জোনাকির সাথে চাঁদ, সূর্যের তুলনা চলেনা। কিন্তু আনন্দ! জোনাকির যে নিজের সাথে সবাই কে নিয়ে সে আনন্দ—
“ তুমি নও তো সূর্য, নও তো চন্দ্র, তাই বলে কি কম আনন্দ।
তুমি আপন জীবন পূর্ণ করে আপন আলো জ্বেলেছ।….
তুমি ছোট হয়ে নও গো ছোট, জগতে যেথায় যত আলো সবায় আপন করে ফেলেছ।।”


 

রাণীর কাছাকাছি
অর্পিতা মুখার্জী চক্রবর্তী

প্রতিবছর জুন মাসের এক টুকরো অবকাশের মরসুমে বাড়ির বাইরে থাকা ছেলেমেয়ে যখন ঘরে ফেরে, বাবা- মায়েদের কোথায় বেড়াতে নিয়ে যাবে তা নিয়ে ওদের উৎসাহ, উদ্দীপনা থাকে তুঙ্গে। আসবার আগে থেকেই নানান পরিকল্পনা চলে ফোনে, মেসেজে। তবে ঋতু যেহেতু বর্ষা, তাই শখ পূরণে বাদ সাধে অনেক কিছুই। তাই এবারের গন্তব্য একরকম স্থির হয়েও আবার জায়গা বদলাতে হলো শুধুমাত্র বর্ষার রমরমাকে মনে রেখে। সিকিমের কোনো এক অফবিট ডেস্টিনেশনকে আপাতত মুলতুবি রেখে সর্বসম্মতিক্রমে নেপালের কন্যম যাওয়ার কথা স্থির হলো। 




খুব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম আমরা শিলিগুড়ির পথ ধরে। কখনো হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি আবার কখনো রোদের আভাসকে সঙ্গে করে বাগডোগরা হয়ে আমাদের যাত্রা জারি রইলো। যাবার পথেই খানিক বিরতি নিয়ে প্রাতরাশ সেরে নিলাম। দেখা হলো মেচি নদীর সঙ্গে। এরপর চেকিং, পারমিট সবকিছুর আনুষ্ঠানিকতার শেষে নেপালের সীমান্ত ধরে গাড়ি এগিয়ে চলল কন্যমের পথে। 

হাতের এতটাই কাছে অথচ ভৌগলিক সীমারেখা অনুযায়ী অন্য একটি দেশে প্রবেশ করেছি ভাবতেই কেমন রোমাঞ্চ হচ্ছিল। ভারতের সীমারেখা পার করতেই পথের দুধারের দৃশ্যগুলো বদলে যাচ্ছিল খুব দ্রুত। বাড়িঘর গুলো কেমন আলাদা রকম দেখতে হয়ে যায় জায়গা ভেদে সর্বত্রই। এখানেও তার পার্থক্য ছিল না। দুপাশের বাড়িঘর, গাছগাছালি, বাজারহাট, দোকানপাট, স্থানীয় মানুষ সবকিছুকে প্রত্যক্ষ করতে করতে অনেকটা সমতল পথ এগিয়ে চলেছিল গন্তব্যের দিকে।

                                    দূরে গাছপালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া পাহাড় একসময় হাতের নাগালে চলে এলো। শুরু হলো পাকদন্ডী পথ। দুপাশের দৃশ্য এত চমৎকার যে ভাষা কম পড়ে প্রকাশের জন্য। প্রকৃতি নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে সবটুকু লাবণ্য জড়ো করে। পাহাড় ছুঁয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে পাশের মনোমুগ্ধকর শোভাকে মুঠোবন্দী করে। আবাসগৃহ গুলি তাদের রংবাহারি ফুলের বাগান গুলি নিয়ে যেন একেকটি সুন্দর স্বপ্ন। বেশিরভাগ বাড়ির সামনে দোকানঘর। গৃহপালিত পশু পাখিরা আনন্দে বিচরণ করছে বাড়ির গা ঘেঁষে। ঘোরানো পাহাড়ি পথ কোনো অস্বস্তি সৃষ্টি করে না শরীরে। ফুরফুরে মনের সঙ্গে সঙ্গে চনমনে সুস্থ শরীর নিয়েই অতিক্রম করা যায় অনায়াসেই এই সুন্দর গন্তব্যকে। একসময় ড্রাইভার দাদা দূরে অঙুলি নির্দেশ করে বললেন "ওই যে মেঘে ঢাকা জায়গাটা দেখছেন, এরপর আমাদের গাড়ি সেখান দিয়ে যাবে।"

সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। সামনে সবটাই ঘোলাটে। গাড়ির জানালার কাচ ঘেঁষে মেঘের সারি। সেগুলো ভেদ করে গাড়ি এগিয়ে চলেছে তার লক্ষ্যে। ওয়াইপার কাজ করে চলেছে নিজের মতো। আবার হঠাৎ মেঘ সরে গিয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে মনোরম এক দিন। আবার মেঘ এসে মস্করা করে একসঙ্গে মাথা ঢেকে নিচ্ছে গুটিসুটি পায়ে। এরপর খানিকক্ষণ চলল বৃষ্টির রিমঝিম বোল। পাহাড়ি পথে সেও এক অনন্য ভালোলাগা। 



হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের দোতলায় রেস্টুরেন্টে চলে এলাম সবাই দুপুরের খাবার সেরে নিতে। সেখানকার সাজানো গোছানো সুন্দর পরিবেশ মন কেড়ে নিল নিমেষেই। কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারলাম হোটেল ও সংলগ্ন রেস্টুরেন্টটির দায়িত্বে রয়েছে বেশ কয়েকজন তরুণী। তাদের অমায়িক মিষ্টি সৌজন্য, আন্তরিক আতিথেয়তা, সহবত, দায়িত্ববোধ, নিপুণ ভাবে খাবার পরিবেশন কোনোটাই ভুলবার নয়। একেকদিনের ব্যস্ত সময়সূচীর তালিকায় সকাল ছটা থেকে রাত নটা পর্যন্ত ডিউটি করেও তাদের মুখের হাসিটি কোন জাদুমন্ত্রে অম্লান থাকে, কন্যমের কন্যারাই জানে সেটা।
 
       আমরা নেপালী থালি নিয়েছিলাম দুপুরের পাতে। সঙ্গে যে যার মতো পছন্দের আমিষ ডিশ। লেবুর মিষ্টি গন্ধে মৈত মন মাতিয়ে দিয়েছিল পানীয়র বিভাগে। হালকা বৃষ্টিকে সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়েছিলাম আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে। নেপালের রাণীর মুখভার ছিল সেই বেলা। বিকেলের সঙ্গে অমিমাংসিত কোনো এক বিবাদের জেরে মেঘলা মুখে অভিমানে আবছায়া হয়ে ধরা দিয়েও দিল না সেদিন কন্যম। একটানা বৃষ্টির মধ্যেই ঢেউ খেলানো চা- বাগান আর পাইনবনকে কখনো হালকা দৃশ্যমান আবার কখনো পুরো অদৃশ্য করে রেখেছিল প্রকৃতি। বিকেলের একফালি আলো রাণীর মানভঞ্জনের ব্যর্থ চেষ্টা করে আবার মেঘের আড়ালে অদৃশ্য হয়েছিল। মুঠোফোন ও ক্যামেরা বন্দী করছিল সব মুহূর্তদেরই। 

ফিক্কাল বাজারে এসে এরপর গাড়ি থামল আমাদের। এই বাজারটি ইলাম শহরের একটি উল্লেখযোগ্য ও ব্যস্ততম বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানকার স্থানীয় চা বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। কাছেই নানান রঙের ঘোড়াদের একটি আখড়া। সহিসরা নানান কায়দায় সেগুলিকে চালিয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন অনবরত। অনেকেই সওয়ার হচ্ছেন তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে। রাজকীয় চালে ঘোড়াদের এগিয়ে চলার সে দৃশ্য অত্যন্ত মনোগ্রাহী। বিস্তৃত জায়গাটি মেঘলা বিকেলের আলো গায়ে মেখে মায়াবী পোশাকে গা ঢাকা দিয়েছে। সামান্য একটু দূরের দৃশ্য মুহূর্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে কোন জাদুকাঠির ছোঁয়ায়। আবার পরক্ষণেই মেঘ আংশিক কেটে গিয়ে কিছুটা দৃশ্যমান করছে তাকে। অতিরিক্ত ঠাণ্ডা না থাকলেও হালকা এক শৈত্যপ্রবাহ থাকায় সকলের গায়েই কম বেশি শীতের পোশাক। কুয়াশা পেরিয়ে এগিয়ে আসা গাড়ির হেডলাইট রহস্য সিরিজের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল নিঝুম সেই সন্ধেবেলা। 




অদ্ভুত এক নির্জনতা চারিদিকে। এত লোকের মাঝেও, এত পথচারী, স্থানীয় মানুষজন, টুরিস্ট সকলের মাঝেও কন্যম কেমন একান্তই নিজের মতো নিজের। নির্দিষ্ট এক ঘেরাটোপে বন্দী সে। সকলের মাঝে থেকেও নিজের আবর্তে নিজের মতো করে নিজের ধ্যানে মগ্ন। 

খুব সুন্দর একটি ক্যাফেতে গিয়ে কফি আর স্ন্যাক্স খেলাম আমরা সবাই মিলে। ফেরার পথে আবারও কিছু দৃশ্যের সঙ্গে নিজেদের মেলে ধরে ক্যামেরায় বন্দী করে রাখার পালা চলল কিছুক্ষণ। পথে লোকজন কমে আসছিল ক্রমশ। আমরাও হোটেল মুখী হলাম। হোটেলের মন ভালো করা আতিথেয়তায় রাতের খাবার পাটও খুব সুন্দর করে মিটল। সবাই সবার ঘরে গিয়ে গল্পগাছা ও শেষ রাতে মেসির দুর্দান্ত খেলা দেখে ঘুমোতে গেলাম সবাই যে যার মতো। 

ভোর পাঁচটা থেকে ঘর সংলগ্ন ব্যালকনিতে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম সূর্যোদয় দেখার আশায়। বৃষ্টি না থাকলেও আকাশের গায়ে আবারও গল্প লিখছিল একটি মেঘলা দিন। সামান্য দূরের সবকিছু ছিল পুরো ঝাপসা। মন এবার সত্যিকারের খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। কারণ মেয়ে বলেছিল আবহাওয়া সহায় থাকলে ওই ব্যালকনি থেকে সূর্যোদয় তো দেখা যাবেই সঙ্গে আলোর মুকুট মাথায় পাহাড়ের শোভা থেকে যাবে উপরি পাওনা হয়ে। এর কোনোটাই হবার নয় মনে হচ্ছিল সেই মেঘলা সকালের দিকে চেয়ে। কন্যমের কাছেই প্রার্থনা জারি ছিল তার নিজস্ব সুন্দর রূপটিকে দেখবার সামান্যতম সুযোগ করে দেওয়ার। 

ইতিমধ্যেই একটু একটু করে সাড়া জাগছিল সামনের পথে, উল্টোদিকের বাসগৃহ গুলিতে। তবুও আলোর দেখা মিলছিল না। অন্যমনস্ক হয়ে পড়তে পড়তে হঠাৎ দেখেছিলাম আকাশের গায়ে রাংতার মোড়ক যেন। গা চিরে বেরিয়ে আসছে আলোর দ্যুতি। একটু আগের ঝাপসা ঘরবাড়ি, গাছপালা, মানুষজন সব দারুণ উজ্জ্বল, প্রাণময় সেই আলোর ছটায়। দূরের পাহাড় এক লহমায় মেঘের চাদর ঝেড়ে ফেলে দিয়ে প্রথম আলোর বর্ণমালায় লিখছে বিজয়ের নাম। 




মন ভালো করা এই আলোর সকালের সদ্ব্যবহার করতে তড়িঘড়ি আমরা রওনা হয়েছিলাম ভিউ পয়েন্টের উদ্দেশ্যে। খামখেয়ালি রাণীর মনে কী আছে কে জানে! আবার কখন গোসাঘরে খিল দেবে সে! অনির্বচনীয় সৌন্দর্যের সাক্ষী করেছিল সে সকাল দিগন্ত বিস্তৃত গালিচার মতো উজ্জ্বল সবুজ চা বাগান আর পাইন বনের মনোরম আবেশে। ভিউ পয়েন্টের অতখানি সিঁড়ি ধরে উঠেও বেশ ফুরফুরে লাগছিল প্রকৃতির অমৃত ছোঁয়ায়। অনেকটা সময় সেখানে কাটিয়ে হোটেলে ফিরে স্নান, জলখাবার সেরে রিসেপশনে সেখানকার কর্মী মেয়ে গুলির সঙ্গে কিছুটা সময় একসাথে থেকে বেরিয়ে পড়লাম বুদ্ধ পার্কের উদ্দেশ্যে। 

যাওয়ার রাস্তাটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর। এখানে আসা ইস্তক কত যে রংবেরঙের ফুল দেখেছি ঠিক নেই। এই পথে বাড়িগুলি যেন আরও সুদৃশ্য আর তাদের ফুলের বাগান যেন আরও মনোরম। কখনো রোদ কখনো মেঘের স্তর পার করে একসময় নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছলাম আমরা। 

                    গাড়ি থেকে নামতেই একদিকে সবুজ গালিচার ওপর ছবির মতো পাইন বন দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ওপরে তাকাতেই ঝলমলে বুদ্ধ মূর্তি মন কেড়ে নিল সকলের। হাওয়ায় উড়ছিল সাদা বৌদ্ধ পতাকা গুলি শান্তির বাণী হয়ে। কাছেই সুদৃশ্য ঝকঝকে সবুজ ঘাসে চড়ে বেড়াচ্ছিল একটি ঘোড়া। সিঁড়ি বেয়ে ওঠা পথটি হাতছানি দিচ্ছিল কাছে যাবার জন্য। হঠাৎ দেখি কেউ কোত্থাও নেই। একটু আগের সে দেখা তবে কি চোখের ভ্রম! সাদা এক সিফন শাড়ির মতো মেঘ এসে ঢেকে দিয়েছে যাবতীয়। বেট ফেলে কেউ বলতেই পারে যেন, এখানে কিচ্ছু ছিল না তো! এতবড় পাইনবনকে চুরি করে, বুদ্ধ মূর্তিকে আড়াল করে মেঘ তখন কারসাজি করছে নিজের মতো করে। একটু পরেই আবার টুংটাং ঘন্টি গলায় ঘোড়া মাটি ফুঁড়ে জেগে উঠল। বেরিয়ে পড়ল পাইনবন মেঘের চোরা থলের ভেতর থেকে। মেঘস্নান সেরে মূর্ত তখন বুদ্ধমূর্তিও। চললাম সামনে থেকে সবকিছুকে দেখে শুনে মোবাইলের ক্যামেরা বন্দী করতে। 

                        অপরূপ সেই বুদ্ধমূর্তি মোহিত করে মনকে। সেদিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দেওয়া যায় অনেকটা সময়। মাঝখানে বিস্তৃত জায়গাটির একদিকে বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রার্থনার চক্রটি। আর একদিকে কিছু খাবারের দোকান, ছবি তোলার প্রেক্ষাপট,সুন্দর একটি ব্রিজ। ব্রিজ পেরোলে চা বাগান, পাইন বনের মেলবন্ধনে মনোমুগ্ধকর একটি জায়গা সিঁড়ির ধাপে ধাপে একরাশ সৌন্দর্য নিয়ে বসত করছে। ঘুরতে আসা মানুষজন সেই সময়টুকুকেই পুরোপুরি উপভোগ করে নিতে চাইছেন মনপ্রাণ ভরে। যে যার মতো ছবি তুলে ধরে রাখছেন সেই সুন্দর পরিবেশকে, নিজেকে, নিজের প্রিয় মানুষকে। ছোট্ট এক মিষ্টি ছেলে আর এক কথা বলা পাখির সঙ্গে দেখা হয়েছিল এই বুদ্ধ পার্কেই। 




নীচে নেমে দুপুরের খাওয়া সেরে রওনা হয়েছিলাম আবার পরবর্তী গন্তব্যে। 'কন্যম' কথাটি লেখা একটি ভিউ পয়েন্টে এসে স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম নয়নাভিরাম প্রকৃতির রূপলাবণ্যকে সামনে থেকে ছুঁয়ে। চা বাগান যে কত সুন্দর হতে পারে, সাজানো হতে পারে নিজের চোখে এখানে এসে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। পাইন গাছগুলো তালে তাল মিলিয়ে সৌন্দর্যের প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছে যেন। কন্যম নিজেও দিশেহারা কাকে সেরার শিরোপা দেবে। শুধু চেয়ে থাকা আর চেয়ে থাকা। আলোর আস্কারা সঙ্গে ছিল সেই মেঘ কেটে যাবার পর থেকেই। সেজন্যই আরও সুন্দর করে পাওয়া হলো সারাটি দিনের কন্যমকে। 
তবে রাণীর মেজাজ বোঝা ভার। আবার কখন খামখেয়ালি মেঘের ওড়নায় গা ঢাকা দিয়েছেন তিনি বুঝতেও পারিনি। তাই স্কাই ওয়াক আর হলো না নির্দিষ্ট জায়গাটিতে পৌঁছেও। বেলা পড়ে আসায় অধরা রয়ে গেল সুন্দর একটি লেকের সঙ্গে দেখা। পাহাড়ি চড়াই উৎরাই বেয়ে শ্রান্তও তখন সবাই। ঘরের পথে রওনা হলো গাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে চলল সবাই মিলে সুন্দর করে কাটানো বেশ কিছুটা সময়, সুন্দর কিছু অভিজ্ঞতা, প্রকৃতির থেকে পাওয়া অসামান্য কিছু উপলব্ধি আর সবচেয়ে বড় যা পেয়েছি তা হলো আশ্চর্য এক প্রশান্তি। 


খুব দ্রুত শেষ হয়ে যাওয়া ছোট্ট এই সফর জীবনের খুব দামি একটি কথা শিখিয়ে গেল। চোখের সামনে না থাকলেও, হঠাৎ মিলিয়ে গেলেও অস্তিত্বে ঠিকই রয়ে যায় যা একসময় ভীষণরকম দৃশ্যমান ছিল, কাছের ছিল। বন্ধ চোখের পাতা খুললে কোনো এক রূপকথার মতো হঠাৎ করে আবারও মূর্ত হতে পারে সে সবটুকু ভালোলাগা নিয়ে। সেই আলোর আশা নিয়েই তো পথচলা। পথ চাওয়া আবার কবে চোখ খুললেই স্বপ্ন সত্যি হবার মতো করে দূরে থাকা ছেলেমেয়েদের ঘরের দরজায় দেখতে পাব। কন্যমের সেই ঘোড়ার গলার ঘন্টির মতো টুংটাং খুশির জলতরঙ্গ তুলবে যারা আমাদের ছোট হয়ে আসতে থাকা নির্জন জীবনের বাঁকে বাঁকে।



বর্ষা মেঘে ভেসে ভেসে/ যাই ছুটে মেঘ-পাহাড় দেশে 

গৌতমেন্দু নন্দী


 "মেঘ পিয়নের ব্যাগের ভেতর 

        মন খারাপের দিস্তা 
        মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়
        ব্যাকুল হলে দিস্তা......."

    চারচাকা "আই-টেন" গাড়িটি খাপরাইল মোড় থেকে মিরিকের দিকের রাস্তায় চলতে চলতে শিমুল বাড়ি এসে মিরিকের রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে রোহিনী র দিকে বাঁক নিতেই দূর পাহাড়ের নিসর্গতায় মুগ্ধ হয়ে গুনগুন করে গেয়ে ফেললাম উপরোক্ত চারটি লাইন। এমন মেঘলা দিনে পাহাড়ি পথে কুয়াশাকে সঙ্গে নিয়ে চলতে চলতে আমাদের ডুয়ার্স বাসীদের এর থেকে প্রাসঙ্গিক কথা ও সুরে সমৃদ্ধ গান আর কী হতে পারে!  




       কয়েক বছর আগেও পাহাড়ের কোলে অযত্নে পড়ে থাকা ছোট্ট জনপদ রোহিনী হয়ে কার্শিয়াং , দার্জিলিং যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সেই জনপদ রোহিনী আজ  কার্শিয়াং-দার্জিলিং যাওয়ার সংক্ষিপ্ত ও আকর্ষণীয় পথের মাঝে এক জনপ্রিয় পাহাড়ি জনপদ।  বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন হোমস্টে, হোটেল ও রেস্তোরাঁ নিয়ে দিন দিন জমজমাট হয়ে ওঠা এই রোহিনী এখন কার্সিয়াং, দার্জিলিং পর্যটকদের কাছে রাত্রি যাপনেরও ঠিকানা হয়ে উঠছে। রোহিনী লেক এবং রোহিনী ঝোরা (ওয়াটার ফলস্) ইতিমধ্যেই বেশ পর্যটক প্রিয় হয়ে উঠেছে।  




       
বর্ষায় পূর্ণরূপে ও সশব্দ গর্জনে পাহাড়ের মাথা থেকে আছড়ে পড়ছে রোহিনীর এই জলপ্রপাত।  চড়াই পথের পাশে নজরকাড়া এই দৃশ্যকে পাশে রেখে পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পথ ধরে যখন কার্শিয়াং  ঢুকছি তখন বাঁদিকে পাহাড়ের কোলে শহরের নাগরিক চিত্র প্রায় পুরোটাই  ভাসমান মেঘের আড়ালে। কার্শিয়াং ঢুকতেই দৃশ্যমান সেই বহু দেখা উঁচু টাওয়ারটির প্রায় পুরোটাই ভাসমান মেঘের আগ্রাসনে।  শীর্ষ দেশের কিছুটা অংশের সাথে  মেঘের লুকোচুরি খেলা দেখতে দেখতেই কার্শিয়াং স্টেশনের কাছে চলে এলাম। স্টেশনের ব্যস্ততাকে  পাশে রেখে একটু এগিয়েই দার্জিলিংএর দিকের হিলকার্ট রোড ছেড়ে ডানদিকে পাহাড়ি চড়াইপথ ধরলাম। বৃষ্টি, যানজট আর সংকীর্ণ পথের  প্রতিকূলতাকে সঙ্গে নিয়েই আমার গাড়ির চালক  শান্ত স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে সাবধানে উঠতে লাগল ডাউহিল পাহাড়ের দিকে। শহর ছেড়ে নির্জনতার দিকেও  বাইক, স্কুটার আর চার চাকার তীব্র যানজটে ঝুঁকিপূর্ণ  যাত্রাপথ বিরক্তি উদ্রেক করে বৈকি! আর সময়ের সাথে সাথেই নগরায়নের কোপে উধাও দুই পাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য। কংক্রিটের জংগল এই  পথেও দেখতে পাব ভাবিনি। কার্সিয়াং থেকে প্রায়  দশ-বারো কিঃমিঃ এই খাড়া পথের অর্ধেকের বেশি  পথ অতিক্রম করার পর অবশেষে সেই কাঙ্খিত প্রকৃতির সন্ধান পেলাম। কংক্রিটের জংগল উধাও হয়ে দুই পাশে আবির্ভূত হতে লাগলো  ফার,পাইনের প্রত্যাশিত সবুজ প্রকৃতি! মাঝে মাঝে ঝুলন্ত মেঘের দল এসে কেড়ে নিচ্ছে সেই সবুজতা। তখন মনে হচ্ছে যেন এক মায়াবী সবুঝ-ধুসরের  জগতে প্রবেশ করছি। যত এগোচ্ছি ততই পাইন-ফার  আর দোদুল্যমান মেঘের খুনসুটি যেন বাড়তে লাগল  আর গ্রাস করতে লাগল এক সবুজ নৈঃশব্দ্য। ঝিরঝির বৃষ্টি, নির্জন-নিস্তব্ধতার মধ্যে চারপাশের পাইনের জংগল এক মায়াবী রহস্যময় হয়ে উঠল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম এইজন্যই কি ডাউহিল "হন্টেড প্লেস"?! এই গা ছমছমে ভৌতিক পরিবেশের জন্যই কি এই পাহাড়ি এলাকা নিয়ে এতো প্রচলিত গল্প! 




কার্শিয়াং থেকে প্রায় ২০০০ ফুট এই উচ্চতায়  একসময় নাকি স্থানীয় ভাষায় "ডাও" নামে কোন পাখির ডাকে জায়গাটি মুখরিত থাকত। সেই "ডাও"থেকেই নাকি এই জায়গার নাম "ডাওহিল" বা  "ডাউহিল"। মেঘ, বৃষ্টি, কুয়াশার এই রহস্যাবৃত পরিবেশের মধ্যেই দেখলাম এখানকার বিখ্যাত সরকারী স্কুল---ডাউহিল উচ্চবিদ্যালয়। শিল্প-স্থাপত্যে দৃষ্টিনন্দন এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে মেয়েদের জন্য। এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে প্রবেশের অনুমতি থাকলেও এর কাছেই ছেলেদের জন্য তৈরি  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান "ভিক্টোরিয়া বয়েজ হাইস্কুল"-এ বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। যার নেপথ্যে ও সেই  মনগড়া ভৌতিক গল্প। এই অপপ্রচার কারীদের রুখতেই নাকি এখন এই বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে  সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ।




       
রহস্যময় এই পাহাড়ি পরিবেশের আলোছায়া পথ ধরে টিকিট কেটে ঢুকে গেলাম পাইন জঙ্গলের আরণ্যক গভীরতায়। ঘন পাইনের অরণ্য পথ ধরে মাথার উপর ঝুলন্ত মেঘদের নিয়ে প্রায় পুরোটাই চড়াই পথে দুই কিলোমিটার অরণ্য পথে হেঁটে হেঁটে পৌঁছোলাম আরও গভীর নিবিড়তায় এক পার্কে। প্রায় জনশূন্য সেই উদ্যানেও দেখলাম "সেল্ফি জোন" নীল রংয়ের বড় বড় অক্ষর ব্লকে লেখা সেই চিরপরিচিত শব্দবন্ধ --" I LOVE  DOWHILL.."--আজকাল প্রায় সমস্ত পর্যটন স্থলেই কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী,---এই "ভালোবাসা"র চিহ্নটিকে খুঁজে পাওয়া যায়। গা ছমছমে আবহের মধ্যেও এই সেল্ফি জোন দেখে  কিছুটা " জনপদের  আলো " যেন খুঁজে পেলাম। 

       পাইন ফরেস্টের ঘন অরণ্যে  দিনের বেলাতেও কুয়াশাময় অকাল সান্ধ্য নির্জনতায় স্বাভাবিক ভাবেই অরণ্য পথ হয়ে যায় "ডেথ রোড" বা মৃত্যু উপত্যকা।খুব অনায়াসেই তৈরি হয়ে যায় গা ছমছমে "স্কন্ধ কাটা" ভূতের গল্প বা "রক্ত চোখ"এর ভীতি প্রদর্শন ! "ডাউহিল" বা "মর্গান হাউস" এর "টি আর পি" এতে বাড়ে বৈ কমে না।  পাইন,ফার, দেবদারু ঘেরা এক  অসাধারণ বিস্তীর্ণ পাহাড়ি সবুজ পরিসরের নির্জনতার বিজ্ঞাপন থেকে কেন এগিয়ে থাকবে ভয়,সংস্কার যুক্ত মিথ্যে ভৌতিক গল্পের কাল্পনিক "মিথ"?! সত্যিই ভাবতে হয়!




 ফেরার পথে এলাম বর্তমানে কার্শিয়াংএর  সবচেয়ে জনপ্রিয় ভিউ পয়েন্ট ---" হনুমান টপ"এ।
২০২১-এ এখানে নয়াবস্তি এলাকায় চা বাগানের মধ্যে হনুমান জয়ন্তী তে জি. টি. এ . দ্বারা নির্মিত হয় ৪০ ফুট উঁচু বিশাল হনুমানের মূর্তি। এই মূর্তি ঘিরেই এই উচ্চতায় এই ভিউ পয়েন্ট। এখান থেকে পুরো কার্শিয়াং এর "প্যানারোমিক ভিউ" অনবদ্য!  চারপাশে বিস্তীর্ণ চা বাগান যেন প্রাকৃতিক "গ্যালারি"। পেছনে প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা কার্শিয়াংএর  রংবেরং এর সারি সারি অসংখ্য ঘরবাড়ির অনবদ্য  ল্যান্ডস্কেপ। মাঝে মাঝে সেই ক্যানভাস ধুয়ে দিয়ে যাচ্ছে ভাসমান মেঘ। বাগানের বুক চিরে মসৃন পিচ রাস্তা যেন উপর থেকে নিচে এঁকে বেঁকে নেমে যাওয়া কোন বিশাল পাহাড়ি পাইথন। যার মাথার উপর দিয়ে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে উড়ে যাচ্ছে বর্ষা মেঘের দল। অসাধারণ এই প্রাকৃতিক কোলাজকে সঙ্গে নিয়ে  সেই পথ ধরেই নেমে এলাম কার্শিয়াং-এর সমতলে।  ততক্ষণে মেঘমুক্ত আকাশে বেলা শেষের আলোয়  আবার উদ্ভাসিত সেই চিরচেনা কার্শিয়াং নাগরিক চিত্রের ব্যাকড্রপ চিত্রাভাস।