রবীন্দ্র সাহিত্যে অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার বাণী
অভিজিৎ সেন
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে সংস্কার মুক্ত যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, অঢেল শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ধারাবাহিক চর্চা, উপনিষদের ভক্ত, দার্শনিক পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কর্ম প্রণালী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো অগ্রজদের প্রভাব, অক্ষয় চন্দ্র চৌধুরী, প্রিয়নাথ সেন, সঙ্গীতজ্ঞ শ্রীকন্ঠ সিংহের মতো ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য রবীন্দ্রনাথের জীবন ও সাহিত্যকে কতটা প্রভাবিত করেছিল পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ তাঁর আত্মজীবনী(জীবনস্মৃতি, ছেলেবেলা)গ্রন্থে সে কথা স্বীকার করে গেছেন। রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে তাঁর বউ দিদি অর্থাৎ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহধর্মিণী কাদম্বরী দেবী । লাজুক ও মুখচোরা স্বভাবের এই ছেলেটি সুশৃংঙ্খলিত ঠাকুর পরিবারের চতুঃসীমার মধ্যে সংযমী জীবন যাপনের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছেন, তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়েছে অত্যন্ত সাধারণভাবে যা তাঁকে আত্ম সংযমের সু-অভ্যাস তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের বাধা ধরা শিক্ষা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। বাড়িতেই বাংলা,সংস্কৃত, ইংরেজি ভাষা চর্চা,বিজ্ঞানের চর্চা, সংগীত চর্চা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে করছেন। বৈদিক সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্যের বিশেষ করে রোমান্টিক যুগের কবিদের কাব্য, সেক্সপিয়ারের নাটক শৈশবেই অধ্যায়ন করেন, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য বিশেষ করে অনুবাদ সাহিত্য, চন্ডীদাস বিদ্যাপতি প্রভৃতির বৈষ্ণব পদ, মঙ্গলকাব্য, বাউল গান এবং জয়দেবের গীতগোবিন্দ, সংস্কৃত কবি কালিদাসের মেঘদূত কাব্য ও তাঁর অন্যান্য নাটক শৈশবে তাঁর মনের মাঝে যে সুর ধ্বনিত করতো, যে আনন্দ তিনি এসবের মধ্য থেকে পেয়েছেন তার মূল্য ছিল অসামান্য। ঠাকুর পরিবারে নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতো নাটক, বিভিন্ন ধরনের সংগীতের ও বাদ্যযন্ত্রের নিয়মিত আসর, ব্রাহ্মসঙ্গীতের উদাত্ত সুর, স্বদেশী চেতনা, স্বজাত্যবোধ,কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর গীতি কবিতার প্রভাব প্রভৃতি ছোট বড়ো নানা বিষয় রবীন্দ্রনাথের সমগ্র সাহিত্য জীবনকে, কর্মজীবনকে সমৃদ্ধি দান করেছিল। অতি শৈশবে পিতার সঙ্গে হিমালয় দর্শন, পরবর্তীকালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে বিলেতে কিছুদিন বসবাস তাঁকে গভীরভাবেই প্রভাবিত করেছিল। তৎকালীন বাংলা সাহিত্যে যে কটা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল তিনি সবই আত্মস্থ করেছিলেন।সুমহান সভ্যতার দেশ ভারতবর্ষ ও তার সমন্বয়ী জীবন দর্শন রবীন্দ্রনাথকে গোড়া থেকেই প্রভাবিত করেছিল।
প্রাকৃতিক ও সামাজিক বৈচিত্র্যে ভরা ভারত সভ্যতার মূল শক্তি ও সৌন্দর্য যা তিনি অতি শৈশবেই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিলেন। অহিংসা ও মানবতাই ভারতীয় সংস্কৃতির ভিত্তি যা তিনি তাঁর যাবতীয় রচনায় অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভাবে, প্রত্যয়ের সঙ্গে ঘোষণা করে গেছেন। ধর্মান্ধতা, জাতিগত হিংসা, পারস্পরিক সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বিশ্বমানবতার শত্রু। মানুষের ওপর তিনি বিশ্বাস রেখেছেন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে। বিশ্বাস রেখেছেন সমস্ত বিদ্বেষরূপী অন্ধকার দূর হবে, মনুষ্যত্ব জয়ী হবে। আর এই মনুষ্যত্বের সোপান ধরেই মানুষই একদিন দেবতা হয়ে উঠবে ভবিষ্যতে।
কেউ নয় ঘৃণ্য কেউ নয় নীচ
অমৃতের সবাই সন্তান
কর্মে ধর্মে মানুষই পাবে
দেবতার শ্বাশত সম্মান।
মহাকাব্য বাদ দিলে রবীন্দ্রনাথ বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা নেই যেখানে তিনি তাঁর সোনার ফসল ফলাতে পারেননি । বাংলা ভাষা এবং বাঙালির সামগ্রিক সংস্কৃতিকে তাঁর শাশ্বত রচনার মধ্য দিয়ে সর্বকালের এবং সর্ব মনের উপযোগী করে যেভাবে উপস্থাপন করে গেছেন তার তুলনা বিশ্ব সাহিত্যে বিরল।
এ কথা সত্য যে রবীন্দ্রনাথ আজন্ম রোমান্টিক কবি।('আমারে বলে যে ওরা রোমান্টিক /সে কথা মানিয়া লই') তিনি রোমান্সের রাজহংস। বিশেষ করে কাব্য সাহিত্যে তাঁর জীবন দেবতা, সীমা অসীমের দ্বন্দ্ব
মানবতার অবিনাশী সুখদুখাশ্রিত আনন্দবাদের বহিঃপ্রকাশ।মর্ত্যপ্রীতি,মানব জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসার গভীর গহন অনুভূতিকে অলৌকিক শব্দ সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত ও সাবলীল ভাবে প্রকাশ করেছেন, সত্যিই অতুলনীয়। গ্ৰিক নাট্যকার সফোক্লিস,জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটে, ফরাসি সাহিত্যক ভিক্টর হিউম ও রোঁমা রঁলা, নাট্যকার শেক্সপিয়ার,সংস্কৃত নাট্যকার কালিদাসের সঙ্গে কিছুটা তুলনীয় ।তাঁর কাব্য দর্শন আমাদের জীবনে নিয়ে আসে অখন্ড প্রশান্তি। যেখানে নেই কোন কলুষতা। যেখানে নেই হিংসার বিষাক্ত ছোবল। শান্ত স্নিগ্ধ জোছনার মতো ছড়িয়ে থাকে মানবতারূপী আলোকবর্তিকা। তাইতো কবি পাশবিকতাকে, বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে, ধর্মীয় উগ্রতাকে প্রবল ভাবে কসাঘাত করেছে তাঁর সাহিত্যে। জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন মানুষের শুভ বুদ্ধিকে, বিবেককে। শেষ পর্যন্ত কবি মানুষের উপর বিশ্বাস রেখেছেন । 'গীতাঞ্জলি' কাব্যের 'ভারততীর্থ' কবিতায় ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তিনি সর্বত্র মানবতাবাদের জয় ঘোষণা করেছেন। এখানে বলেছেন যুগে যুগে ভারতবর্ষে নানা জাতের মানুষ শাসন করেছে তাণ্ডব করেছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভারতেই ওরা মিশে গেছে। বহু জাতি এভাবেই যুগে যুগে এসেছে এবং ভারতের বৃহত্তর সমাজের অখন্ড একটি অংশ হয়ে থেকে গেছে। তাই কেউ কাউকে বিচ্ছিন্ন করে ভারত গড়ে উঠতে পারে না। সবাই সবার মধ্যে মিশে আছে "শক হূন দল পাঠান মোগল/এক দেহে হল লীন"। তাই প্রার্থনা করেছেন মানুষের বিবেকী চিত্তের কাছে--"হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে/জাগো রে ধীরে/এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে" । 'পরিশেষ' কাব্যের 'ধর্মমোহ' কবিতায় বলেন "ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ যে জন মারে আর শুধু মরে'। হিংসা সাম্প্রদায়িকতা জাতের অভিমান পৃথিবীর সভ্যতাকে মনুষ্যত্বকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় । নৈবেদ্য কাব্যের ৯২ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"শক্তিদম্ভ স্বার্থলোভো মারীর মতন/দেখিতে দেখিতে আজি ঘিরিছে ভুবন/দেশ হতে দেশান্তরে স্পর্শ বিষ তার/ শান্তিময় পল্লী যত করে ছারখার' ।
গীতাঞ্জলি কাব্যের ১০৮ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের করেছ অপমান/অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান"। মুসোলিনির ইথিওপিয়া আক্রমণের প্রতিবাদে লিখেছেন 'আফ্রিকা' এবং জাপানের দ্বারা চীন আক্রমণের তীব্র প্রতিবাদে 'নবজাতক' কবিতা । কবি সাবধান করে দিয়েছেন মানবতার শত্রুদের ।'প্রান্তিক' কাব্যের ১৮ সংখ্যক কবিতায় "ডাক দিয়ে যাই/দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে/প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে" । 'নবজাতক' কাব্যের 'বুদ্ধভক্তি' কবিতায় তীব্র ব্যঙ্গ করে বলেন,"হিংসার উষ্মায় দারুন অধীর/সিদ্ধির বর যায় করুণানিধির---/মুষ্টি উঁচায় তাই চলে/বুদ্ধরে নিতে নিজ দলে' এই যে কত বড় মানবের পরিহাস অহিংসার দেবতাকে হিংসায় উন্মত্ত মানুষ হিতাহিত জ্ঞান ভুলে নিতে চায় নিজেদের দলে । কবি বিশ্বাস করেন হিংসা সাম্প্রদায়িকতা একদিন হার মানবে। পথে নগরে সর্বত্র সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবী মানুষ কাজ করে যাবে সভ্যতার চাকাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে"শত শত সাম্রাজ্যের ভগ্নাশেষ 'পরে/ওরা কাজ করে'। শেষ পর্যন্ত তিনি মানুষের প্রতি বিশ্বাস রেখেছেন। 'শেষলেখা' কাব্যের ৬ সংখ্যক কবিতায় বলেন,"ওই মহামানব আসে/দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে/মর্ত্য ধূলির ঘাসে ঘাসে" । 'সভ্যতার সংকট' প্রবন্ধে বলেন,"কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব' । তিনি আজীবন তাঁর সাহিত্য সাধনায় অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন । তিনি জানেন তাঁর কবিতা পৃথিবীর সকল মানুষের দুঃখকে তুলে ধরতে পারেনি সকলের ব্যথাকে, কথাকে ব্যক্ত করতে পারেনি। 'রোমান্টিক' নামক কবিতায় বলেন,"আমারে বলে যে ওরা রোমান্টিক/সে কথা মানিয়া লই/রসদীর্ণ পথের পথিক' । কবি 'জন্মদিনে' কাব্যের 'ঐকতান' কবিতায় স্বীকার করেছেন,"বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি/দেশে দেশে কত না নগর রাজধানী---/আমার কবিতা জানি আমি/গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী/--যে আছে মাটির কাছাকাছি/সে কবির বাণী লাগি কান পেতে আছি' ।
ধর্মান্ধতার ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ধ্বনিত হয় তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে । প্রবন্ধগ্ৰন্থে যুক্তিগ্রাহ্য, তাত্ত্বিক ও সমাজ বিশ্লেষণাত্মক ভঙ্গিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তৎকালীন ভারতীয় সমাজে হিন্দু- মুসলমানের মধ্যের দূরত্ব, ধর্মের নামে ভন্ডামি ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের যে বীভৎস্যরূপ তিনি দেখেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে তারই বিষাক্ত মূল উৎপাটন করেছেন অত্যন্ত সহানুভূতির ও বিবেচনার সঙ্গে । 'ভারতবর্ষ' প্রবন্ধে বলেন, "ঐক্য মূলক যে সভ্যতা মানবজাতির চরম সভ্যতা ভারতবর্ষ চিরদিন ধরিয়া বিচিত্র উপকরণে তাহার ভিত্তি নির্মাণ করিয়া আসিয়াছে। পর বলিয়া সে কাহাকেও দূর করে নাই---ভারত বর্ষ সমস্তই গ্রহণ করিয়াছে, সমস্তই স্বীকার করিয়াছে (ভারতবর্ষের ইতিহাস) ।'বিশ্বসাহিত্য' প্রবন্ধে বলেন,"আমাদের অন্তঃকরণে যত কিছু বৃত্তি আছে সে কেবল সকলের সঙ্গে যোগস্থাপনের জন্য । এই যোগের দ্বারাই আমরা সত্য হই, সত্যকে পাই। নহিলে আমি আছি বা কিছু আছে ইহার অর্থই থাকে না ।' 'সমাজ' প্রবন্ধে 'পূর্ব-পশ্চিম' অংশে বলেছেন,'যাহা সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ যাহা সকলের চেয়ে পূর্ণ যাহা চরম সত্য তাহা সকলকে লইয়া।' 'ন্যাশনালিজম' প্রবন্ধে বলেন,'নেশন- তত্ত্বটি অতিমাত্রায় প্রকাণ্ড হইয়া ওঠে, তখন সে নিজের ভেতরের মানুষকে গ্রাস করিতে শুরু করে। মানুষের যেসব মহৎ গুণ-যেমন দয়া, পরোপকার, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতা-সেগুলিকে এই যান্ত্রিক নেশন নিজের স্বার্থের যূপকাষ্ঠে বলি দেয় ।---ভারতের সাধনা কোনদিন নেশন গঠনের সাধনা ছিল না, ভারতের সাধনা ছিল সামাজিক সামঞ্জস্য ও সমন্বয় সাধনের সাধনা' ।
'মানুষের ধর্ম'ও 'ধর্মের অধিকার' প্রবন্ধে তিনি আচার সর্বস্ব ধর্ম মানুষের প্রকৃত ধর্ম নয় । বাহ্যিক আচার-আচরণ, পোশাক, তিলক বা টুপি মানুষকে বিভক্ত করে। অপরদিকে অন্তরের আধ্যাত্মিক সত্য মানুষে মানুষে মিলন ঘটায়। তিনি বিশ্বাস করেন ধর্মের কাজ মানুষকে যুক্ত করা, বিভক্ত করা নয়। যখন কোন ধর্ম অন্য ধর্মকে ঘৃণা করতে শেখায় তা প্রকৃত ধর্মই নয়-তা হল ধর্মের নামে মোহ ও অন্ধত্ব। ' ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে/অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে ।'
বাংলা তথা ভারতবর্ষের সমাজ জীবনের সবচেয়ে স্থায়ী সমস্যা হল হিন্দু-মুসলমান সমস্যা । কবি অত্যন্ত স্পষ্ট ও নিরপেক্ষভাবে এর কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টা করছেন । কী কী উপায়ে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন সম্ভব তার একটি দিক নির্দেশ করেছেন বিশেষ করে তাঁর কালান্তর, হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিময় নামক প্রবন্ধে। তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন মুসলমান সমাজকে হিন্দু সমাজ দীর্ঘদিন নানা কারণে দূরে সরিয়ে রেখেছে ফলে দূরত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। তিনি মনে করেন পারস্পরিক চুক্তির দ্বারা বা রাজনৈতিক জোটের দ্বারা উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মিলন সম্ভব নয় বরং প্রকৃত মিলন হবে একমাত্র উপযুক্ত শিক্ষা বিস্তারে, অর্থনৈতিক সমতায় এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের দ্বারা।
'হিন্দু-মুসলমান' প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে তিনি এও বলেছেন যতক্ষণ উভয় সম্প্রদায় নিজেদের ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার থেকে নিজেদের মুক্ত না করেছেন ততক্ষণ উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রকৃত মিলন সম্ভব না, প্রকৃত ভারতবর্ষের জন্মও সম্ভব না।
'স্বদেশী সমাজ' প্রবন্ধে গ্রামীণ সমাজব্যবস্থাকে ভারতের মূল শক্তি বলেছেন। নাগরিক চেতনায় সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প থাকলেও, ভারতের গ্রামগুলিতে বছরের পর বছর ধরে উভয়ের সম্প্রদায় কিভাবে পাশাপাশি শান্তিতে বসবাস করে আসছে সে কথাই প্রাবন্ধিক বলেছেন। এটা ভারতবর্ষের
মধ্যে অবস্থিত আর একটি ভারতবর্ষ ।
তিনি বাউল, সুফি ও লোকায়ত সাধকদের জীবন দর্শনের আলোকিত অধ্যায় সমূহকে তুলে ধরেছেন শহুরে শিক্ষিত সমাজের সামনে । দেখিয়েছেন লালন সাঁই বা গগন হরকরার মত বাউল সাধকদের গানে ও জীবনে সাম্প্রদায়িকতার কোন স্থান ছিল না। তাঁদের গানে ঈশ্বর ও মানুষ অভিন্ন হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে, ধর্মীয় পার্থক্য থাকলেও তাদের দৃষ্টিতে কোন ভেদাভেদ ছিল না। এই সহজ সত্যটিকে অত্যন্ত সহজ ভাবে বাউল সাধকরা তাঁদের গানে তুলে ধরেছেন। রবীন্দ্রনাথ কবিতায়,প্রবন্ধে,নাটকে, উপন্যাসে ,গল্পে,গানে,পত্রে, আচরণে যখনি প্রয়োজন হয়েছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কথা বলবার তখন তিনি মানবতাকেই সমর্থন করেছেন।
'ন্যাশনালিজম' প্রবন্ধে উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি মনে করতেন নিজের দেশকে ভালোবাসার নামে অন্য দেশকে বা জাতিকে ঘৃণা করা এক ধরনের পৈশাচিকতা। তাঁর এই অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা বিশ্বমানবতাবাদের অন্য নাম । এই প্রবন্ধে তিনি যখন বলেন,
'ধর্ম যখন নিজের সীমালঙ্ঘন করে পলিটিক্সের ক্ষেত্রে প্রবেশ করে তখন তার মত ভয়ানক জিনিস আর কিছু হতে পারে না। এ এক আবহমান চিরসত্য ।
তিনি তাঁর প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে সমূলে ছুড়ে ফেলে মানুষকে মানবতাবোধের সর্বজনীন শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে চেয়েছে। উপন্যাসে অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্ব মানবতাবাদী মনোভাব পরিপক্ক ও শিল্প সম্মতভাবে প্রকাশ পেয়েছে। উনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের প্রথমার্ধ ধর্মের নামে উগ্রতা, রক্ষণশীলতা ও হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে দূরত্বের পরিসীমা বৃদ্ধি করে চলেছিল, তিনি তার উপন্যাসের বিভিন্ন চরিত্র ও কাহিনির মধ্যদিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তত্ত্বকে দূরে রেখে মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন কৃত্রিম ধর্মীয় পরিচয় আসল পরিচয় নয়, প্রকৃত পরিচয় মৈত্রীতে ও মানবতায়।'গোরা'(১৯১০) উগ্র জাতীয়তাবাদ থেকে বিশ্ব মানবতায় উত্তরণ । কেন্দ্রীয় চরিত্র
গোরা প্রথম জীবনে ছিল কঠোর হিন্দুত্ববাদী। জাত পাত, আচার সর্বস্বতাকে শ্রেষ্ঠ মনে করতো, একেই ধর্ম বলে বিশ্বাস করত। কিন্তু যেদিন জানতে পারে সে জন্মসূত্রে ভারতীয় হিন্দু নয়, সিপাহী বিদ্রোহের সময় হারিয়ে যাওয়া আইরিশ দম্পতি সন্তান। তখন তার দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা গোঁড়ামির প্রাচীর মন থেকে ভেঙে পড়ে। সে মহিম ও আনন্দময়ীকে অনায়াসে বলতে পারে,'আজ আমি এমন শুচি হয়েছি যে চন্ডালের ঘরে আমার পাত পাড়তে আর সংকোচ থাকবে না... আজ আমি ভারতবর্ষীয়, আমার মধ্যে হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান কোন সমাজের কোন বিরোধ নেই। 'রবীন্দ্রনাথ গোরা চরিত্রের মধ্য দিয়ে বুঝিয়েছেন কোন নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের গণ্ডির মধ্যে আটকে থেকে দেশকে বা মানুষকে যথার্থভাবে ভালোবাসা যায় না, সেবা করা যায় না, উপকার করা যায় না।'ঘরে-বাইরে'(১৯১৬) উপন্যাসে ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলার ও রাজনৈতিক মুনাফা লুটার কুৎসিত রূপটি উন্মোচিত হয়েছে। তাই সন্দীপ স্বদেশী আন্দোলনের নামে গরিব মুসলিম ও নিম্নবর্ণের মুসলমানদের লবণ, বিদেশি কাপড় বর্জন করতে বাধ্য করে, দাঙ্গায় ঠেলে দেয় । অসাম্প্রদায়িক ও উদারপন্থী জমিদার নিখিলেশ মনে করে জোড়জুলুম করে প্রকৃত দেশপ্রেম জাগ্রত করা যায় না ।'চতুরঙ্গ'(১৯১৬) আচার সর্বস্ব ধর্মের অসারতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছে 'জ্যাঠামশাই' অর্থাৎ জগমোহন চরিত্রটির আচরণের মধ্য দিয়ে। তিনি ঘোরতর নাস্তিক ও মানবতাবাদী তাই তিনি প্লেগ আক্রান্ত দরিদ্র মুসলিম ও নিম্ন বর্ণের মানুষদের নিজের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন এবং তাদের সেবা করে মানবতাবাদের পরিচয় দিয়েছেন। 'যোগাযোগ'(১৯২৯) উপন্যাসে কুমুদিনী অত্যন্ত ধার্মিক হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম তাকে অহংকারী ও সংকীর্ণমনা
করে তুলতে পারিনি। তাঁর হৃদয়ের ঈশ্বর চেতনা জাত বা গণ্ডিতে আবদ্ধ নয় ।
রবীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছেন ধর্ম যখন মানুষের চেতনার চেয়ে বড় হয়ে যায় তখন সমাজকে সে ধ্বংস করে থাকে । জাত পাতের বিচার এক প্রকার মানসিক ব্যাধি। উদারতা,মানবতা ধর্মের মূল আধ্যাত্বিক শক্তি যা মানুষকে ভালবাসতে শেখাবে, সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বমানবতার বাণী ঘোষিত করবে। দেবতার অবস্থান মন্দিরে নয় মানুষের মাঝে। তাঁর 'ধূলিমন্দির' কবিতায় পুরোহিতদের উদ্দেশ্য করে বলেন, 'ভজন পূজন সাধন আরাধনা/সমস্ত থাক পড়ে/রুদ্ধ দ্বারে দেবালয়ের কোণে/কেন আছিস ওরে।'মানুষের সেবায় আসল ধর্ম, প্রকৃত ঈশ্বরের সেবা করা। 'যত জীব তত শিব' স্বামী বিবেকানন্দের বলেছিলেন।'সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ তাহার উপরে নাই' কখনো চন্ডীদাস বলেছিলেন।'নর সে পরম দেব নর সে ঈশ্বর/নর বীনে ভেদ নাই/দেবতা কিন্নর'কখনো বলেছিলেন আরাকান রাজসভার কবি দৌলত কাজী।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকে ধর্মীয় গোঁড়ামি, আচার সর্বস্বতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। যেমন 'বিসর্জন'(১৮৯০) নাটকটি ধর্মীয় আচার ও জীব-বলির বিরুদ্ধে এক আপসহীন লড়াই । নাটকে ত্রিপুরার রাজপুরোহিত রঘুপতি মনে করত রাজরক্ত ও পশুরক্ত ছাড়া দেবী তুষ্ট হন না। তার এই অন্ধবিশ্বাস ও অহংকার তাকে হিংস্র করে তোলে, এমনকি রাজাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে পর্যন্ত লিপ্ত করে। বলির জন্য অনাথ বালিকা অর্পণার ছাগ শিশুটিকে কেড়ে নেয়। শেষে রঘুপতির শিষ্য জয়সিংহ উপলব্ধি করে ধর্ম বা দেবতা রক্তপাত চায়না ।
'অচলায়তন'(১৯১২) সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এই নাটকটি। 'অচলায়তন' হলো নিয়মের বা ছোঁয়াছুঁয়ির শেকলে বেঁধে থাকা এক বন্দী জীবন । নাটকে মুক্তির দূত হিসাবে আসেন দাদা ঠাকুর ও পঞ্চক চরিত্র দুটি। দাদাঠাকুর গোঁড়ামির 'অচলায়তন' প্রাচীর কে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। যে ধর্ম মানুষকে অস্পৃশ্য বা শত্রুরূপে দূরে ঠেলে দেয় সে ধর্ম অসার বা মৃত। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকার মধ্যেই জীবনে আসে মুক্তির বাতাস-- প্রকৃত ধর্ম সেই পরিবেশই তৈরি করে।
'মুক্তধারা'(১৯২২) নাটকে যুবরাজ অভিজিৎ শিব- তরাইয়ের সাধারণ মানুষের জলের সমস্যা দূর করতে গিয়ে বাঁধ ভেঙে দিয়েছেন। সেই বাঁধের জলের স্রোতে সে নিজেই ভেসে গেছে। নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। তার আত্মত্যাগ মানুষের কল্যাণ করেছে। অভিজিতের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্র ও ধর্মের নামে সাধারণের উপর অত্যাচারের তীব্র প্রতিবাদ দেখিয়েছেন।
'রক্তকরবী'(১৯২৬) নাটকে যক্ষপুরীর রাজা ও ধর্মীয় গুরু গোঁসাই উভয় মিলে জাত পাত ও নিয়মের ভয় দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিকদের শোষণ করে চলেছে। তারা একতাবদ্ধ হতে পারেনি অথবা তাদের একতাবদ্ধ হতে দেওয়া হয়নি । কিন্তু শেষ পর্যন্ত নন্দিনীর সহজ ও অসাম্প্রদায়িক ভালোবাসায় এরা শোষণের জাল ছিঁড়ে ফেলেছে ঐক্যবদ্ধভাবে। এখানে শিল্প সভ্যতার নির্মমতার উপর কৃষি সভ্যতার জয় ঘোষিত হয়েছে প্রতীক-সংকেতের মধ্যদিয়ে।
'রথের রশি'(১৯৩২) নাটকে সমাজের লালিত পালিত জাত পাত, অস্পৃশ্যতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার মূলে সরাসরি আঘাত করেছেন। ধর্মীয় শক্তির অধিকারী পুরোহিত, রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অধিকারী ক্ষত্রিয় কূল বা রাজন্যবর্গ, টাকার অহংকারে মত্ত বণিক শ্রেণী যখন হঠাৎ থেমে যাওয়া রথ টানতে পারছিল না তখন ডাক করলো সমাজের অবহেলিত নিম্নবর্গের মানুষদের অর্থাৎ শূদ্রদের। তারা এসে রথের রশি টানতেই রথ চলতে শুরু করে। এতদিন যাদের ছোঁয়া লাগলে জাত যেত, যাদের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার ছিল না, বাধ্য হয়ে তাদেরকেই মহাকালের রশি টানার অধিকার দিতে হলো উচ্চবর্ণের । নাটকে 'কবি' চরিত্রটি জানতো মহাকাল আর জাত পাতের বৈষম্য সহ্য করবেন না। সে বলে,'যাদের এতদিন তোমরা নীচে ফেলে রেখেছিলে, আজ মহাকাল তাদেরই ওপরে টেনে তুলেছেন' । 'কবি' উচ্চবর্ণের মানুষদের মনের ভয় দূর করে বলেন এখন থেকে রথে চড়ে সবাই সমান ভাবে এগিয়ে যাব। ছোট বড় স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য ভেদ থাকবে না ।
সমাজ জীবনে পরাধীন ভারতবর্ষে যখনই শাসকবর্গের দ্বারা অন্যায় হয়েছে রবীন্দ্রনাথ তাঁর তীব্র প্রতিবাদ করেছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে বঙ্গভঙ্গ রদ করার জন্য তিনি মানুষের মাঝে মানবিক আবেদন রেখেছেন। রাখি বন্ধন উৎসব এর মধ্য দিয়ে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন। ১৯১৯ সালে জালিওনাবাগের নৃশংস হত্যার প্রতিবাদে তিনি ইংরেজদের দেওয়া 'নাইট' উপাধি ত্যাগ করেছেন। অতি শৈশবে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাঁর 'হিন্দুমেলার উপহার' কবিতাটি জাতীয়তাবাদী ধারণার পরিচায়ক । 'দুরন্ত আশা' কবিতা অলস ভিরু দুর্বল মানসিকতার বাঙালিকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করেছেন। 'হতভাগ্যের গান' কবিতায় সর্বহারা মানুষদের দুঃখ জয় করতে বলেছেন।
'চৈতালি' কাব্যগ্রন্থের 'বঙ্গমাতা' কবিতায় বলেছেন 'সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী/রেখেছো বাঙালি করে মানুষ করনি" 'কাহিনী' কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত 'দীনদান' কবিতায় বলেছেন, 'শূন্য নয় রাজদম্ভে পূর্ণ,সাধু কহে/আপনার স্থাপিয়াছ জগতের দেবতারই নহে' কবি প্রকৃত ঈশ্বর বলতে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছেন । মানুষের সেবা ঈশ্বরের সেবা।
অসাম্প্রদায়িকতা ও বিশ্বমানবতাবোধ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন,''ধর্মের নামে সংকীর্ণতা যেখানে মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়, সেখানে আমি ধর্মের কোন সার্থকতা দেখিনা'। আবার কখনো বলেন,"ভারতবর্ষের চিরদিনই একমাত্র চেষ্টা প্রভেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা ।" স্বামী বিবেকানন্দ বলেন,"আমরা শুধু অন্য ধর্মকে সহ্য করি না, সব ধর্মকেই সত্য বলে বিশ্বাস করি।" কাজী নজরুল বলেন" হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসা কোন জন?/ কান্ডারী! বলো, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার" । মহাত্মা গান্ধী বলেছেন,"পৃথিবীর সব ধর্মই মূলত এক, কেবল তাদের বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম গুলো ভিন্ন"। লালন সাঁই তাই তাঁর গানে বলেন "সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন কয় জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে"। ভারতের জাতীয় সংগীত "জন গন মন" রবীন্দ্রনাথের রচনা। আবার তেমনই বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত"আমার সোনার বাংলা"সেই রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। গান দুটিতে অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের চির-উজ্জ্বল প্রকাশ।