মুক্তি
উৎপলেন্দু পাল
তপনের আজকাল ঠিকঠাক ঘুম হয়না। ওর স্ত্রীর সেই ব্যামোটা বেশ বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এতদিন দরজায় ছিটকিনি দিতে দিতোনা, আজকাল দরজাই বন্ধ করতে দেয় না।
আসলে তপনের বাড়ির কোনও দরজায়ই ছিটকিনি কিংবা খিল নেই। বাড়ির মূল দরজা অর্থাত গেটে কখনোই তালা পড়েনা। তালা সংস্কৃতি ওর বাড়িতে নেই। এমনকি বাথরুমেও ছিটকিনি নেই।
বিয়ের আগে ধৃতি ছিল ওদের গ্রামের বাড়িতে। বাবার একমাত্র আহ্লাদি মেয়ে ধৃতিকে বিয়ে করার পর ধীরে ধীরে তপনের ঝামেলার শুরু। সে কিছুতেই ওই শহরের বাড়িতে থাকতে চায় না।
ধৃতিদের বাপের বাড়ির মাঝখানে বিরাট উঠোন। চারদিকে ঘর। পুবের ঘর, পশ্চিমের ঘর, উত্তরের ঘর, দক্ষিণের ঘর। তার পেছনে টিউবওয়েল, গোয়াল ঘর, আরেক দিকে রান্নাঘর। তার পেছনে গাছপালা, তারই এক কোণে পায়খানা। টিউবওয়েলের পাশে স্নান ঘর, প্রস্রাবখানা, মানে টিনের বেড়ার আড়াল।
ধৃতি ঠিক খাপ খাইয়ে উঠতে পারেনা শহরে। ওর দম বন্ধ হয়ে আসে। সবসময়ই সে মুক্ত বাতাস খোঁজে। ঘরের দরজা বন্ধ করেনা, তপন বন্ধ করলে ছিটকিনি দিতে দেয়না। জোর করে বন্ধ করতে চাইলে ও চিৎকার করে, শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়, গা ঘেমে যায়। এক দৌড়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তে চায়। তার মনে হতে থাকে যে সে দমবন্ধ হয়ে মরে যাবে।
তপন এখন সইয়ে নিয়েছে সব। সে নিরুপায়। ধৃতি ঘুমিয়ে পড়লে সে চুপিসারে গেট বন্ধ করে আসে আবার ও ওঠার আগেই গেট খুলে রাখে। এ নিয়ে কম ঝামেলা হয়নি। স্নানঘর, পায়খানারও দরজা আটকায়না ধৃতি। অনেকবার বিচ্ছিরি ঘটনাও ঘটে গেছে। বাচ্চারাও জেনে যায় মা বাথরুমে, সুতরাং ওদিকে যাওয়া মানা।
ব্যাঙ্কের সামনে বিরাট লাইন। আধার কার্ড সংশোধন চলছে। ছেলের আধার সংশোধন করাতে হবে।
ধৃতি লাইনে। মেয়েদের লাইনটা ছোট বলে ধৃতি দাঁড়িয়েছে। তপন ছেলেকে নিয়ে আশপাশে ঘোরাঘুরি করছে। বেলা দুটোর মধ্যে লাইনে না থাকলে সেদিন আর কাজ হবেনা।
ঠিক দুটোয় যারা লাইনে ছিল তাদের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে গেটকিপার সামনের শাটার বন্ধ করে দিল।
ধৃতি আচমকাই চিৎকার করে উঠলো," গেট খোলো, গেট খোলো "।
গেটকিপার খুললো না। সে বললো," গেট খোলা যাবে না। সময় শেষ"।
ধৃতি ছটফট করছে দেখে তপন গেটকিপারকে অনুরোধ করলো,"দাদা, একটু খুলে দিন। ওর একটু সমস্যা আছে। প্লিজ!"
গেটকিপার বিরক্ত হয়ে বললো," আপনারা কি বেরিয়ে যাবেন?"
"না"।
"তাহলে? ওভাবে আপনি চাইলেই খোলা যাবেনা। বেরিয়ে যেতে হলে পেছনের গেট দিয়ে বেরোন"।
"দাদা, প্লিজ!"
এদিকে ধৃতি শাটার তোলার চেষ্টা করছে আর চিৎকার করে যাচ্ছে," খোলা, খোলা, খোলো"।
ভেতরের সব লোকজন অবাক। স্টাফেরা কাজ ছেড়ে তটস্থ হয়ে উঠেছে। গার্ড এসে ধৃতিকে সরে যাবার অনুরোধ করছেন। ধৃতি ক্রমশ উত্তেজিত হয়ে বিকৃত আচরণ করছে। তপন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ধৃতিকে টেনে সরাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কের ভেতর এক অরাজক অবস্থা। ম্যানেজার তপনকে অনুরোধ করছেন ওনাকে পেছনের গেট দিয়ে বের করে নিয়ে যেতে। বাইরে লোকজনের ভিড়। তপন ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে। ছেলেটা ফুঁপিয়ে কাঁদছে, ওকেই বা সামলায় কে?
ধৃতির নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে, প্রশ্বাস আটকে যাচ্ছে, কে যেন তাকে সজোরে চেপে ধরেছে দু-হাতের আলিঙ্গনে বুকের সাথে পিষে দিচ্ছে। তার ঠোঁট, গলা, বুক, পেট, নিতম্ব পেঁচিয়ে অজগর গিলে খাচ্ছে তাকে। কে যেন ধর্ষকাম দানবীয় শক্তি প্রয়োগে তাকে ধর্ষণ করতে উদ্যত।
ধৃতি প্রলাপের মতো কিন্ত উচ্চৈস্বরে বলে যাচ্ছে," আমাকে ছেড়ে দাও, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।" তার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। সে চিৎকার করছে, "ছেড়ে দাও কাকু, দরজা খোলো। ছাড়ো আমাকে কাকু, আর চাপ দিয়োনা, আমার সব হাড় ভেঙে যাচ্ছে কাকু। আমাকে ছেড়ে দাও, ছেড়ে দা---ও।"
সবাই কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ধৃতি সর্বশক্তি প্রয়োগ করে বন্ধনমুক্ত হতে চাইছে। ঘামে ভিজে যাচ্ছে তার পোশাক। সে মরিয়া হয়ে উঠেছে নিজেকে ছাড়াতে।
"বাঁচাও, বাঁচা--ও, বাঁ-----চা--ও"। মুক্তির জন্য কি করুণ আর্তি!
জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল ধৃতি। তারপর সব শান্ত।

No comments:
Post a Comment