Thursday, July 2, 2026


 

বিজ্ঞানীদের  বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায়  ছদ্মবেশে বিপ্লবী ছিলেন
বটু কৃষ্ণ হালদার

উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি রসায়নবিদ, বাংলা ও বাঙালির গর্ব আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।বাঙালি বিজ্ঞানী হিসেবে যারা বিশ্বের দরবারে আমাদের মাথা উঁচু করে তুলতে শিখিয়েছেন, তাদের মধ্যে স্যার প্রফুল্ল চন্দ্র রায় অন্যতম। তিনি ছিলেন একাধারে একজন রসায়নবিদ, শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা। যে দেশের শিক্ষিত সম্প্রদায় সত্য কি তাহা জানে এবং বোঝে, কিন্তু জীবনে বরণ করিয়া লইতে প্রস্তুত নহে - মনের গোপনে, লোকচক্ষুর অন্তরালে যে সত্যের নিকট লজ্জায় মস্তক অবনত করিতেছে, অথচ বাহিরে জনসমাজে এবং সভার মাঝে তাহাকে স্বীকার করিবার সাহস নাই,সে জাতি কেমন করিয়া জগতের নিকট সগর্বে মাথা তুলিয়া দাঁড়াইবে তাহা আমার বুদ্ধির অতীত।,বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়।সবাই তাঁকে ফুলু বলে ডাকতেন।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, যিনি পি সি রায় নামেও পরিচিত, ছিলেন একজন প্রখ্যাত বাঙালি রসায়নবিদ, বিজ্ঞানশিক্ষক, দার্শনিক, কবি।যিনি  একদিকে বেঙ্গল  কেমিক্যাল এর প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যদিকে মার্কিউরাস নাইট্রাইট-এর আবিষ্কারক।

২রা আগস্ট ১৮৬১ সনে, বাংলাদেশের খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার রাডুলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মা ভূবনমোহিনী দেবী এবং পিতার হরিশচন্দ্র রাযয়ের পুত্র। হরিশচন্দ্র রায় স্থানীয় জমিদার ছিলেন। বনেদি পরিবারের সন্তান প্রফুল্লচন্দ্র ছেলেবেলা থেকেই সব বিষয়ে অত্যন্ত তুখোড় এবং প্রত্যুৎপন্নমতি ছিলেন। পড়াশোনা শুরু হয় বাবার প্রতিষ্ঠিত এম ই স্কুলে। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন, কিন্তু রক্ত আমাশায় রোগের কারণে তার পড়ালেখায় ব্যাপক বিঘ্নের সৃষ্টি হয়। বাধ্য হয়ে তিনি নিজ গ্রামে ফিরে যান। গ্রামে থাকার এই সময়টা তার জীবনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনে সাহায্য করেছে। বাবার গ্রন্থাগারে প্রচুর বই পান তিনি এবং বইপাঠ তার জ্ঞানমানসের বিকাশসাধনে প্রভূত সহযোগিতা করে।

১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে প্রফুল্লচন্দ্র কলকাতায় ফিরে  অ্যালবার্ট স্কুলে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি  প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন কলেজে (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) ভর্তি হন। ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে কলেজ ফাইনাল তথা এফ এ পরীক্ষায় (ইন্টারমিডিয়েট বা এইচএসসি) দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে তিনি প্রেসিডেন্সী কলেজে বি এ ক্লাসে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সী থেকে গিলক্রিস্ট বৃত্তি নিয়ে তিনি স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে যান। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বি এসসি পাশ করেন।

পরবর্তীকালে এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়েই ডি এসসি ডিগ্রী লাভের জন্য গবেষণা শুরু করেন। তাঁর সেই গবেষণার বিষয় ছিল কপার ম্যাগনেসিয়াম শ্রেণীর সম্মিলিত সংযুক্তি পর্যবেক্ষণ (Conjugated Sulphates of Copper Magnesium Group: A Study of Isomorphous Mixtures and Molecular Combination)। দুই বছরের কঠোর সাধনায় তিনি এই গবেষণা সমাপ্ত করেন এবং পিএইচ ডি ও ডি এসসি ডিগ্রী লাভ করেন। এমনকি তার এই গবেষণাপত্রটি শ্রেষ্ঠ মনোনীত হওয়ায় তাকে হোপ প্রাইজে ভূষিত করা হয়। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে (India Before and After the Sepoy Mutiny) এবং ভারতবিষয়ক বিভিন্ন নিবন্ধ লিখে ভারতবর্ষ এবং ইংল্যান্ডে সাড়া ফেলে দেন।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রফুল্লচন্দ্র রায় স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। দেশে ফিরে প্রেসিডেন্সী কলেজের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় ২৪ বছর তিনি এই কলেজে অধ্যাপনা করেছিলেন। অধ্যাপনাকালে তার প্রিয় বিষয় রসায়ন নিয়ে তিনি নিত্য নতুন অনেক গবেষণাও চালিয়ে যান। তার উদ্যোগে তার নিজস্ব গবেষণাগার থেকেই বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানা সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীকালে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে তা কলকাতার মানিকতলায় ৪৫ একর জমিতে স্থানান্তরিত করা হয়। তখন এর নতুন নাম রাখা হয় বেঙ্গল কেমিক্যাল এন্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস লিমিটেড।।

নিজের বাসভবনে দেশীয় ভেষজ নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি তার গবেষণাকর্ম আরম্ভ করেন। তার এই গবেষণাস্থল থেকেই পরবর্তীকালে বেঙ্গল কেমিক্যাল কারখানার সৃষ্টি হয় যা ভারতবর্ষের শিলপায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। তাই বলা যায় বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের শিল্পায়নে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারকিউরাস নাইট্রাইট (HgNO2) আবিষ্কার করেন যা বিশ্বব্যাপী আলোড়নের সৃষ্টি করে। এটি তার অন্যতম প্রধান আবিষ্কার। তিনি তার সমগ্র জীবনে মোট ১২টি যৌগিক লবণ এবং ৫টি থায়োএস্টার আবিষ্কার করেন।সমবায়ের পুরোধা স্যার পিসি রায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে নিজ জন্মভূমিতে একটি কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী পিসি রায় পিতার নামে আরকেবিকে হরিশ্চন্দ্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন।

বাগেরহাট জেলায় ১৯১৮ সালে তিনি পি.সি কলেজ নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তারে বিশাল ভূমিকা রাখছে। শিক্ষকতার জন্য তিনি সাধারণ্যে ‘‘আচার্য’’ হিসেবে আখ্যায়িত। সি আই ই: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববাদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে তৃতীয়বারের মত তিনি ইংল্যান্ড যান এবং সেখান থেকেই সি আই ই লাভ করেন।সম্মানসূচক ডক্টরেট: ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় তাকে এই ডিগ্রী দেয়। এছাড়া ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীকালে মহীশুর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তিনি ডক্টরেট পান।১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ব নাইট উপাধি লাভ করেন।l

পিসি রায় শুধু নিজে অসাম্প্রদায়িকই ছিলেন না বরং সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার মূলোৎপাটনের জন্যও চেষ্টা করেছেন সবসময়। পিতার মত তিনিও ছিলেন আরবী ও ফার্সী ভাষায় বিশেষ দক্ষ। তাদের বাড়ির বিশাল লাইব্রেরিতে অনেক ইসলামী ও হিন্দু ধর্মীয় বই পুস্তক ছিল। তাদের বাড়িতে সার্বক্ষণিক একজন বৃদ্ধ মৌলভী সাহেব নিযুক্ত ছিলেন।

১৯১৫ সালে কুদরত-ই খুদা (একমাত্র মুসলিম ছাত্র) এমএসসি তে (রসায়ন) প্রথম শ্রেণি পাওয়ায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক তাকে অনুরোধ করেন প্রথম শ্রেণি না দেওয়ার জন্য। অনেকের বিরোধিতা সত্ত্বেও পিসি রায় নিজের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কুদরত-এ-খুদাকে প্রথম বিভাগ দেন। সারা জীবনে অনেক প্রচ্ছেদ রচনা করেছেন অনেক বই লিখেছেন প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তাঁর লদ্ধে উল্লেখযোগ্য কতগুলি হলঃ ১। India Before and After the Sepoy Mutiny (সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে), ২। সরল প্রাণীবিজ্ঞান, বাঙ্গালী মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার, ৩। হিন্দু রসায়নী বিদ্যা এবং মোট ১৪৫টি গবেষণাপত্র।

ফুলুকে বলা হয় 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী'। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা বলত ফুলু নাকি বিজ্ঞানীর ছদ্মবেশে বিপ্লবী।বঙ্গভঙ্গ আন্দোলোনের সময় বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার টাকা দিত।ফুলুর দেশপ্রেম এতই উগ্র ছিল,যে ঢাকার একজন উচ্চপদস্থ অফিসার বলতে বাধ্য হয়েছিলেন,_স্যার পি.সি. রায়ের মতো লোক যদি আধ-ডজন থাকতেন, এতদিনে দেশ স্বাধীন হয়ে যেত।' ১৯১৯ সালে ফুলুকে ব্রিটিশরা Companion of the Indian Empire(C.I.E.) উপাধি দিয়েছিলেন।সেই বছরই কলকাতার টাউন হলে রাওলাট বিলের বিরোধিতায় গর্জে উঠেছিল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়।তিনি বলেছিলেন,_দেশের জন্য প্রয়োজন হলে বিজ্ঞানীকে টেস্ট টিউব ছেড়ে গবেষণাগারের বাইরে আসতে হবে। বিজ্ঞানের গবেষণা অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু স্বরাজের জন্য সংগ্রাম অপেক্ষা করতে পারে না।'

প্রেসিডেন্সি কলেজে ২৭ বছর পড়িয়েছেন তিনি। ক্লাসে ফুলু পড়াতো বাংলা ভাষায়।নীচের দিকেই ক্লাস নিতে ভালোবাসত ফুলু, সে বলত 'কুমোর যেমন কাদার ডেলাকে তার পচ্ছন্দমত আকার দিতে পারে হাইস্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়।' সে সব সময় চাইত তার ছাত্রছাত্রীরা তাকে ছাপিয়ে যাক। তাই তিনি লিখেছিলেন,_ সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করিবে, কিন্ত পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া সুখী হইবে।' ফুলুর এক মুসলিম ছাত্র ছিলেন ডঃ কুদরত-ই খুদা। ১৯১৫ সালে কেমিস্ট্রিতে এম.এস.সি পরীক্ষায় কুদরত-ই খুদা প্রথম শ্রেণী পাওয়ায় কয়েকজন কট্টর হিন্দু শিক্ষক ফুলুকে অনুরোধ করেছিলেন কুদরত-ই খুদাকে প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য। কিন্ত ফুলু যে অসাম্প্রদায়িক পিতার ভাবাদর্শে দীক্ষিত। ফুলুর কাছে যে যোগ্য সে যোগ্যই। তাই ফুলু রাজি হয়নি।

ফুলুকে একবার বিশ্বকবি লিখেওছিলেন,_যেসব জন্ম-সাহিত্যিক গোলমালের মধ্যে ল্যাবরেটরির মধ্যে ঢুকে পড়ে, জাত খুইয়ে বৈজ্ঞানিকের হাটে হারিয়ে গিয়েছেন তাদের ফের জাতে তুলব। আমার এক একবার সন্দেহ হয় আপনিও বা সেই দলের একজন হবেন।' আসলে বিশ্বকবি অনুভব করেছিলেন, বিলেতে পড়াশুনা করলেও এবং ইংরেজিতে চোস্ত হলেও বাংলা ভাষা ছিল ফুলুর প্রাণ এবং ফুলুর মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক সাহিত্যি সুলভ আচরণ। ফুলুর ৭০ তম জন্মজয়ন্তীর দিনে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন, আবেগমথিত কণ্ঠে বিশ্বকবি বলেছিলেন, 'আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি।' সেদিন রবীন্দ্রনাথ ফুলুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন একটি তাম্রফলক, তাতে খোদাই করা ছিল কবির লেখা দুটি লাইন -'প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয়,করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়।'

ছোটবেলা থেকেই কলা খেতে ভালোবাসত ফুলু, সকালে টিফিন করত দুটো কলা দিয়ে। চাঁপাকলা ফুলুর খুব প্রিয় ছিল। সেই সময় এক পয়সায় দুটো চাঁপাকলা পাওয়া যেত। একদিন এক ছাত্র স্যারের জন্য তিন পয়সা দিয়ে দুটো কলা নিয়ে আসায় কি রাগ ফুলুর, ছাত্রকে বলেছিল, 'নবাবি করতে শিখেছ, আমায় পথে বসাবে?'

এর কিছুক্ষণ পরেই কংগ্রেস নেতা ড . প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ এসেছিলেন ফুলুর কাছে,তাঁর তিনহাজার টাকা দরকার ছিল। তৎকালীন সময়ে এক পয়সায় দুটো কলা পাওয়া যেত, সে যুগে তিন হাজার টাকার মুল্য সহজেই অনুমান করা যায়। বিনা বাক্যব্যয়ে তিনহাজার টাকার চেক লিখে দিয়েছিলেন।

'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' রাড়ুলীর ফুলুর নাম ডাক ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের বাইরে ও। সাইমন কমিশনের সদস্যরা বিজ্ঞান কলেজের কথা ও ফুলুর কথা লন্ডনে অনেক শুনেছিল। তারা কলকাতায় এসে বিজ্ঞান কলেজ পরিদর্শনে এসেছিল,আসল উদ্দেশ্য ছিল ফুলুকে দেখা। এক দুপুরে তারা ফুলুর ঘরে এসে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। 'বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী' মারকিউরাস নাইট্রাইটের আবিস্কারক স্যার পি,সি,রায় গামছা পরে চেয়ারে বসে আছেন। কারণ ফুলু তার ধুতি খানা কেচে রোদে শুকাতে দিয়েছিল। ঘরের এক কোণে স্টোভ জ্বলছে, নিজের খাবার নিজেই রান্না করছিলেন। একটু লজ্জা না পেয়ে ফুলু নাকি সেই অবস্থাতেই সাইমন কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।তিনি বুঝেছিলেন, ‘‘একটা সমগ্র জাতি শুধুমাত্র কেরানী বা মসীজীবী’’ হয়ে টিকে থাকতে পারে না। বাঙালি জাতিকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখালেন তিনি। ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিকল ওয়ার্কস। মূলধন বলতে ছিল, মাত্র আটশো টাকা আর পূর্ণ আত্মবিশ্বাস।

বাঙালি আধুনিক হয়েছে। নিজের ভাষা সংস্কৃতিকে প্রধানত করে অন্য ভাষার দাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞানীর বিজ্ঞানী ফুলু বিদেশে পড়াশোনা করলেও নিজের ভাষা সংস্কৃতির কথা এতটুকু ভুলে যাননি। ইতিমধ্যেই বাঙালির অন্যতম প্রিয় জিনিস বাংলা ক্যালেন্ডার সাংস্কৃতি থেকে উধাও হয়ে গেছে।সেই ক্যালেন্ডার জুড়ে সারা বছরে বহু মনীষীদের জন্ম ও মৃত্যু দিবস খোদাই করা থাকতো। সেসব আজ অতীত।আদর্শ বাঙালিরা বর্তমান সময়ে এমন মহান ব্যক্তির জন্ম,মৃত্যু দিবস পালন না করলেও মার্কস,লেলিন,চে গুয়েভারা দের মত বহু বিদেশীদের জন্ম মৃত্যু দিবস শ্রদ্ধার সঙ্গে এই বাংলায় পালন করেন।ভারতবর্ষের ইতিহাস জুড়ে বিদেশীদের কর্মকাণ্ড পড়ানো হয়। অথচ বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কথা প্রায় ভুলতে বসেছে আমাদের প্রজন্ম।আমাদের ক্ষমা করবেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। তবে বর্তমান সময়ে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে।আমাদের দেশের ইতিহাসটা একটু পরিবর্তন করা দরকার। ইতিহাসের পাতা থেকে বিদেশীদের অব্যাহতি দিয়ে ফুলুদের মতো এমন মহান বাঙালি বিজ্ঞানীদের মহান কর্মকাণ্ডের কথা  বেশি করে তুলে ধরা উচিত।সেই কাজ যত দ্রুত সম্ভব হয় তার প্রচেষ্টা করা উচিত। নইলে আগামী প্রজন্ম প্রফুল্ল চন্দ্র রায় কে চিনতে পারবে না।

ফাদার অব নাইট্রাইট খ্যাত বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী স্যার পি,সি, রায় ৭৫ বছর বয়সে পালিত অধ্যাপক হিসেবে অবসর নেওয়ার পরও আট বছর বেঁচে ছিলেন। সেই সময়ও কেটেছে বিজ্ঞান কলেজের একটি ছোট কক্ষে, যেখানে ছিল একটি খাটিয়া, দুটি চেয়ার, খাবার ছোট একটি টেবিল, একটি পড়ার টেবিল ও একটি আলনা। যেসব ছেলে তাঁর কাছে থাকত, তাদেরই একজনের হাতে মাথা রেখে তিনি ১৯৪৪ সালের ১৬ জুন মাত্র ৮৩ বছর বয়সে বিশ্ব বরেণ্য বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মনকে চিন্তার বিষয় করে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। যাকে আমরা শুধু বিজ্ঞানী বলে ছেড়ে দিলাম। যিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম জনক হয়ে উঠতে পারতেন তাকে প্রায় ভুলিয়ে দিলাম।  যিনি অনলস পরিশ্রম করে থান ইঁটের মত দুখন্ডে চরক সুশ্রুত ভাস্করাচার্যের আধারে লিখলেন হিন্দু রসায়নের ইতিহাস তাকে শুধু বিজ্ঞানী বলে তার হিন্দু সাধক সত্ত্বাকে ভুলে গেলাম।  কারন তিনি গেরুয়া পরতেন না। ধর্মের নামে অন্ধ কুসংস্কারকে পাত্তা দিতেন না। সেগুলোর সমালোচনা করতেন।  তিনি তার বাঙালির মস্তিষ্ক ও তার অপব্যবহার বইয়ে,লিখেছেন তাল ধুপ করে পড়ল না পরে ধুপ করলো এই নিয়েই বাংলার পন্ডিত রা ব্যস্ত। প্রদীপ ঠাকুরের সামনে ডানে ঘুরবে না বাঁয়ে ঘুরবে সেই নিয়ে কি তর্ক।  অনেকটা বিবেকানন্দের বানী । 

এখন ও আমরা সেই কুসংস্কারেই হাবুডুবু খাচ্ছি। সোমবারে লাউ আর মংগলবারে কুমড়ো কেন খেতে নেই তাই নিয়ে চর্চা চলছে। এখনও বাংলার একদল সাধু বাবাজী কাকে কালসর্প ধরেছে, কে মাঙ্গলিক, একাদশী তে বাইচান্স জল খেলে কোন নরকে যাবে, শনিবারে ঘরে শুকনো লংকা পোড়ার ধূমো দিলে কি হয়, ম্যানিবাগে গোলমরিচের গুড়োরাখলে কিভাবে টাকা আসে এ সব নিয়ে মেতে আছে।  

প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর বইয়ে লিখেছেন, "শাস্ত্রেই বলা আছে:_"কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্তব্য বিনির্নয়/যুক্তিহীনে বিচারে তু ধর্ম হানি প্রজায়তে"।  শাস্ত্র অথবা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র যতই বলুক ধর্মকে যুক্তি দিয়ে বিচার করে তবেই মানতে হবে, সেকালের মত আমাদের একালের বাবা রাও একই পথের পথিক।  যদি আমরা সত্যিই হিন্দু ধর্মের বিকাশ চায় তবে প্রফুল্লচন্দ্রে পথই আমাদের পথ। কোন অন্ধ কুসংস্কারযুক্ত বিশ্বাস বাবাজী গুরুজীর অন্ধ বিশ্বাস যুক্ত বচন আমাদের পথ নয়।  সমাজ ও রাষ্টের কল্যানের জন্য যদি আরো ১০০ জন্ম মোক্ষ না হয়, যদি আরো হাজার জন্ম নরকে যেতে হয় তো হবে। তাই বলে যুক্তি আর বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে দিনরাত গূহ্যটিপে মোক্ষের সন্ধান করতে পারবো না।"


No comments:

Post a Comment