Thursday, July 2, 2026


 

অন্য ভালোবাসার শহরে

জয়িতা সরকার

শহরের সঙ্গে আত্মিক মেলবন্ধন ঘটায় কিছু মানুষ, যোগাযোগের নিবিড়তায় ভালোবাসা গাঢ় হয় নতুন শহরটির সঙ্গে। দু- চারটে এমন শহরের সঙ্গে গভীর চেনা-জানা হয়, কিছু মানুষ জীবনে জড়িয়ে থাকার সুবাদে। শুরুতে একটা তুল্যমূল্য মনোভাব নিয়ে পরিচয় ঘটে এক নতুন শহরের সঙ্গে। যার সূত্র জলপাইগুড়ি রাজবাড়ির সিংহদুয়ার। তখন আজকের মত এত চকচকে ছিল না গেটখানা।  তবুও জল শহরের রাজবাড়ি দেখার চাইতে গেটের প্রতি আর্কষণ ছিল বেশি, রাজার বাড়ি, বড় গেট এসব নিয়ে খানিকটা গর্বিত আমি। এরকম রাজকীয় শহরবাসীর অহংকার খানখান হল, যখন বুঝলাম আমার প্রিয় কিছু মানুষেরা আরও বড় রাজশহরের বাসিন্দা। উন্নতি উন্নয়নে দু'টি শহর সমগোত্রীয় হলেও শহরের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লাল বাড়ি আর বড় গেটটা যে ঐতিহ্যের সাক্ষী তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। মা- বাবার হাত ধরেই যাতায়াত শুরু হয় জলপাইগুড়ি থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরের রাজার শহর কোচবিহারে। তিস্তার স্রোত আছড়ে পড়ে তোর্সার তীরে। রাজ শহরের ইতিহাস সবার জানা, আমি হয়ত সেসব খুব সামান্যই জানি। তাই ইতিহাসের গল্প নয়, একটা অন্য শহরকে নিজের শহরের মত ভালোবেসে ফেলার কিসসা লিখি আজ।

কাল সকাল সকাল বাস ধরতে হবে, আগের দিন রাতে শেষ পর্বের প্রস্তুতি চলছে। ব্যাগ গুছিয়ে নেওয়া থেকে কেক বিস্কুট ব্যাগে ভরে তিন ঘন্টার জার্নির জন্য সে এক বিরাট প্রস্তুতি। আজ এসব জার্নি গুলো চোখের নিমিষে হয়ে যায়, ডে ট্রিপ নামকরণ হয়েছে, কিন্তু নব্বইয়ের দশকে এই তিনঘণ্টার পথ পাড়ি দেওয়া মানে রীতিমত প্রাক পরিকল্পনা। উত্তেজনায় সারারাত ঠিকমত ঘুম নেই আমাদের। সাড়ে পাঁচটা বাজতেই মায়ের ডাকাডাকি। কোথাও বের হওয়ার আগে স্নান করা ছিল বাধ্যতামূলক,কাল মাস নির্বিশেষে। তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে গলির মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের গলির ঠিক উল্টোদিকের গলিতে থাকা বাসটি ছিল আমাদের যাতায়াতের সেরা বাহন। দু-দিন আগেই বাবা গিয়ে জানিয়ে এসেছে আমরা ওমুক দিন সকালে যাব। বাবার পাড়ার বন্ধু পুতুল কাকু ছিল বাস মালিক, বাসের নাম সুদর্শন, রুট- জলপাইগুড়ি কোচবিহার। জন্মলগ্ন থেকেই জল শহরের পাশাপাশি এই কোচবিহারের সঙ্গে আমার সমান্তরাল যোগাযোগ, মায়ের কাকুর বাড়ি, মানে আমার মামাবাড়ি। একসময় তারা জল শহরের কাছের একটি গ্রামে থাকলেও,দাদু ব্যবসা সূত্রে কোচবিহারের বাসিন্দা হয়। মানি- মামারা সেখানেই, তাই আমাদের যাতায়াতও ছিল ঘন ঘন। গ্রীষ্মের ছুটি কিংবা পরীক্ষার পরের ছুটিতে কোচবিহার যাওয়ার একটা রেওয়াজ ছিল, কিংবা মানিদের জলপাইগুড়ি আসার একটা ধারা ছিল সেসময়।

সুদর্শন বাসে চেপে শহর ছাড়ছি, তিস্তা ব্রিজ দেখার প্রবল  উৎসাহ নিয়ে জানালা দিয়ে মুখ বের করে আছি, ব্রিজ পার হতেই ঘুমিয়ে পড়তাম প্রতিবার, ময়নাগুড়ি ধূপগুড়ি কখন পেরিয়ে যেত কোনদিন টের পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। তাই জলঢাকা নদী দেখেছি খানিকটা বড় হওয়ার পর। ফালাকাটা এলে পুরি ডাল আর মিষ্টির গন্ধ ঘুম ভাঙার অন্যতম অ্যালার্ম। মা ভাবত বাড়ির কেক বিস্কুট খাইয়ে এই যাত্রা পাড়ি দেবে, কিন্তু আমি আর বাবা ঠিক নেমে গিয়ে কিছু খেয়ে নেবই। তারপরও অনেকটা পথ। রাস্তার অবস্থা শোচনীয়, ছেলেবেলায় জলপাইগুড়ি কোচবিহারের রাস্তা ভালো ছিল এমনটা আমার মনে পড়ে না। ঝাঁকুনি খেতে খেতে পুন্ডিবাড়ি, মা তাক করে আছে, আর কিছুক্ষণ পরেই রামভোলা স্কুলের কাছে আমরা নেমে যাব। বাস স্ট্যান্ড অবধি যেতে হত না আমাদের। রামভোলা স্কুলের সামনে নেমে রিক্সা করে সোজা শিবযজ্ঞ রোড। দাদুর বাড়ির একটা পরিচিতি ছিল, ব্যবসায়িক পরিচিতি, ভাঙ্গাচোরা জিনিস কেনাবেচার ব্যবসা ছিল আমার আরেক দাদুর। যে কোন রিক্সাচালককে বললেই চোখ বন্ধ করে পৌঁছে দেবে বাড়ির গেটে। বাড়িতে ঢুকতেই একটা হইহই ব্যাপার, বাড়ির সদস্য সংখ্যা অনেক, তারপর আমরা, সঙ্গে ব্যবসার লোকেদের আনাগোনা, সবসময় সরগরম থাকত বাড়িটা, আমাদের নিরিবিলি বাড়ির বিপরীত ছবি ধরা পড়ত এই বাড়িতে। তখন বাড়িতে নাতনি বলতে শুধু আমি, তাই আদরের কোন ভাগীদার না থাকায় সবার আহ্লাদে আটখানা,  যা চাইছি তাই হাজির হচ্ছে সামনে।

প্রথম কবে কোচবিহার গিয়েছি তা আমার মনে নেই, না থাকারই কথা, তবে যে সময়ের কথা মনে পড়ে তখন বয়স ছ-সাত হবে। বিকেলে কোথায় কোথায় যাব তার তালিকা তৈরি করছে আমার দুই মানি। প্রথমেই মদনমোহন বাড়ি, সাগরদিঘি, রাজবাড়ি, কোচবিহার শহরের দর্শনীয় স্থান। সেসব দেখা শেষ হতেই আমার ঘুরুঘুরু মন বলছে, শুধু বাইরে থেকে রাজবাড়ি দেখে আমার মন ভরেনি, ভেতরে ঢুকতেই হবে। মানি বলল, ভেতরে তো ঢুকতে দেয় না, আমি নাছোড়বান্দা, সকালে আসব, কিন্তু তাতেও ভেতরে ঢোকার ছাড়পত্র মিলবে না বলে জানাল অভিজ্ঞ কোচবিহার বাসীরা। আমরাও জেদ সেরকম মা-কে ঠিক বুঝিয়ে খানিকটা কান্নাকাটি করে সকালবেলা রাজবাড়ির সামনে পৌঁছলাম। ঘটনাচক্রে সেদিন কোন বড়মাপের কেউ এসেছিলেন, তারা ভেতরে প্রবেশ করছে দেখেই দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সামনে আমার ছোট্ট কাচুমাচু মুখটা বেশ বেনিয়মের ছাড়পত্র হিসেবে কাজ করে গেল, ঢোকার অনুমতি পেলাম, কী কী দেখেছিলাম তা স্মৃতিতে নেই, তবে মানিরা এত বছরে যা দেখার সুযোগ পায়নি আমার দৌলতে সেটা দেখতে পেয়ে যার পর নাই আহ্লাদিত। বাড়ি ফিরে এসে গোটা পাড়ার লোককে সেই গল্প করেছিল আমার মেজ মানি। কোচবিহার মানে আজও মধ্য জীবনে দাঁড়িয়ে আমার কাছে আবদার আহ্লাদে মোড়া জীবনের গল্প। আমার মায়ের শৃঙ্খলায়নের ঠিক উল্টো ছিল কোচবিহারের মামাবাড়ি। দিদা বেশ ধীর গতিতে চলা একজন মানুষ, রান্না আর ঠাকুরঘর ছাড়া দিদার বিশেষ কিছু ভালো লাগত কী না কিংবা এখনও লাগে কিনা তা জানতে চাইনি কোনদিন। তবে রান্নায় এ যুগের যে কোন শেফকে পেছনে ফেলে দেওয়ার ক্ষমতা দিদার আছে। শুঁটকিমাছ প্রিয় আমার দুই বন্ধু শুধু গল্প শুনে কোচবিহার চলে গিয়েছিল দিদার হাতে রান্না খেতে। আমার মেজমানিও সেই গুণে সমৃদ্ধ। বড়মানি ছিল আমার দেখভালের দায়িত্বে। মা বাবাকে ছেড়ে দু-তিনবার বড়মানির সঙ্গে কোমর বেধে রাজার শহরে গিয়েছি।

একটা শহর জুড়ে ছেলেবেলার স্মৃতির ভিড়। বাস কোনদিক দিয়ে ঢুকল তা নিয়ে আমার প্রবল উৎসাহ ছিল, যদি নিউটাউন দিয়ে বাস ঢোকে তবে রাজার বাড়ির দর্শন শুরুতেই হয়ে যাবে। কিন্তু যদি খাগড়াবাড়ি দিয়ে ঢোকে তবে সে সুযোগ নেই। রাস্তার শোচনীয় অবস্থার কথা শুরুতেই বলেছি। রাস্তা নিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা আছে। সে কাহিনী শুরু হয় সুদর্শন বাস মিস করলে কিংবা অন্য কোন বাসে যেতে হলে। পারাপার নামে একটি বাস চলত, এর গতি বেশ দ্রুত ছিল, কালুসাহেব নামে দুটো বাস চলত, একটি কোচবিহার, একটি ফালাকাটা পর্যন্ত। একবার কোচবিহার যাওয়ার প্ল্যান হয় ভোরবেলা, তৈরি হতে হতে সব বাস ছেড়ে গিয়েছে, অগত্যা ফালাকাটা জলপাইগুড়ি রুটের কালুসাহেবে যেতে হল। ফালাকাটা পৌঁছে জানতে পারি রাস্তায় কিছু একটা হয়েছে বাস যাচ্ছে না। আমি আর বাবা ছোট গাড়িতে চেপে শিলতোর্ষার রাস্তা দিয়ে কোচবিহার পৌঁছই। বহু বছর পর রাস্তা যখন ভালো হল যাতায়াত তখন কমে এলো। কঠিন পথের যোগাযোগ মসৃণ ছিল অনেকটা, পথ মসৃণ হলে হয়ত পিছলে যেতে হয়।

এই শহরের সঙ্গে মায়ের নারীর টান, তাই কোচবিহারের গল্পে ইতি টানা খানিকটা দুষ্কর।কোচবিহার গেলে বাঁধাধরা নিয়ম ছিল একদিন টাকাগাছ যেতে হবে, মায়ের মামাবাড়ি।  ওই দাদুর বাড়ির পাশে সরু খাতে বয়ে চলা নদীর নাম নাকি মরাতোর্সা, নদীর বাঁধ পার হয়ে পৌঁছতাম সেখানে। রাতে থাকতে বললেই আমার সোজা উত্তর তোমরা গ্রামে থাকো, আমি এখানে থাকব না। সন্ধ্যেটা কোনরকমে কাটিয়ে পালাতে পারলে বাঁচি। অন্ধকার রাস্তাঘাট আমার একদম ভালো লাগত না। শিবযজ্ঞ রোডও যে খুব আলো ঝলমলে ছিল তা নয়, তবে টাকাগাছ থেকে ভালো। এই শহরে এসে দিঘির সঙ্গে পরিচয় হয় আমার, জল শহরে পুকুর বলাটাই প্রচলিত, কিন্তু এ শহরে সাগর দিঘি, রাজমাতা দিঘি আরও কত নাম ঠিক মনে পড়ছে না এখন। কোচবিহারে এসে যেমন পরিচয় হয় শিবযজ্ঞ রোডের মন্দিরটির সঙ্গে, ঠিক তেমনি জীবনের মধ্যাহ্নেও পরিচয় হল না রাসমেলার সঙ্গে। কোনদিন সেসময় যাওয়া হয়নি, একবার ভাঙা মেলা দেখার সুযোগ হয়েছিল এইটুকুই।

তবে কোচবিহার মানে বানেশ্বরের দই, সম্রাটের সিঙ্গারা, আর খেলা পাগল আমার মামা ল্যান্ডলাইন আসার পর কোচবিহারে লোডশেডিং হলে ফোন করে আপডেট নিত। কোচবিহার একসময় ছিল আমার দ্বিতীয় ভালোবাসার শহর। ডিবিসি রোড, কদমতলা যতটা চেনা বিশ্ব সিংহ রোড কিংবা নৃপেন্দ্র নারায়ণ রোডও আমার ততটা চেনা। পলিটেকনিক কলেজ থেকে রামভোলা স্কুলের রাস্তাটা আমার কাছে পান্ডাপাড়া কদমতলা মনে হত। সময়ের নিয়মে যাতায়াত কমেছে, দাদু নেই, মানি মামা ভাই বোন দিদা আছে, ফেসবুক ইনস্টা যুগে যোগাযোগ লাইক কমেন্টসে, বছরে বিশেষ দিনে মেজ মানির ফোন আসে নিয়ম করে, আমার থেকে সামান্য বড় হলেও মায়ের মত ভালো বলা যায় ওর জন্য। সময় পরিবর্তনের দৌরাত্ম্যে

যোগসূত্রগুলো আলগা হয় ক্রমশ,তবে এখনও বাড়ির কোন অনুষ্ঠান হলে আমরা সারারাত না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখি। স্মৃতির পাতায় জড়িয়ে থাকা রাজ শহরের অলিগলিতে ফেলে আসা অনেক গল্প, কয়েকটা শব্দে যার ইতি টানা অসম্ভব। তিস্তার হৃদয়ে তোর্সার বাতাস মিশে আছে আমার ছেলেবেলার রাজ শহরে দিন যাপনের উপাখ্যানে। 

No comments:

Post a Comment