Thursday, July 2, 2026


 

তিস্তা- তোর্সায় একটা রাত

পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় 

সে বার তিস্তা তোর্ষা  তে নিমতিতা স্টেশন এ একদল ডাকাতের মুখে পড়েছিলাম। এখন  যেমন সন্ধ্যা আটটা সাড়ে আটটার মধ্যে নিমতিতা ষ্টেশন পার হয়ে  যায়, সে বার  জঙ্গীপুরের লাইনের কাজ চলাতে, রাত পৌনে তিনটায় দুম দাম শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

ট্রেনের বডির পাত খোলার শব্দে যাত্রীরা আতংকিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করল। কে বা কারা নাকি স্মাগলড গুডস ট্রেনের মধ্যে করে পাচার করছে। অন্য একদল ডাকাত সে খবর পেয়ে,  সেইসব জিনিস আআত্মসাৎ করতে চাইছে।                   

ছোট বেলায় গ্রামে  যে ডাকাতি হয়েছিল। তার সাথে এর কোন মিল নেই। গ্রামের সেই ডাকাতি তে গুলি চলেছিল, বোমা পড়েছিল, সুশীল ঘোষের দুই ছেলে জখম হয়েছিল। টাকা, সোনাদানা মিলে দু লাখ টাকা নিয়ে গিয়ে ছিল ডাকাত দল।সেই দলের এক ইনফরমার ধরা পড়লেও, ডাকাত বা ডাকাতির মাল, কিছুই পাওয়া  যায় নি। ইনফরমার কে সুবীর সাহার বোম্বাই আম গাছের ডালে, ওপরে পা, নিচে মাথা করে দড়ি দিয়ে বেঁধে, পা য়ে সুঁচ ফুটিয়ে ও কারো হদিস পাওয়া না গেলে, গাঙ্গুলি জেঠুর বকুনি তে পাড়ার দাদা রা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল। তা না হ'লে  যে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটত, তা বলাই বাহুল্য। 

আমার ছাত্রী র স্বামী, রেলের টিকিট পরীক্ষক ছিল। ছাত্রী এম,এ পড়ত। পরীক্ষার আগে আমার মত পাস কোর্সের গ্রাজুয়েট এর কাছে,ইংরেজি শব্দের মানে উদ্ধার করত। ছাত্রী টির স্বামী অলক, মারা গেল। কি একটা অ সুখ ছিল। 

জলপাইগুড়ি, শিয়ালদাতে কখনও তিস্তায়, কখনও উত্তর বংগ এক্সপ্রেস এ সে আমাকে মাংস ভাত খাওয়াত। ট্রেনের টিকিট পরীক্ষক আমার অনুজ প্রতিম ভাই, এটা দেখে অনেক সহযাত্রী ই ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ত।

আজকের  যাত্রা তে, টিকিট পরীক্ষক কে দেখে, বার বার অলকের কথা মনে এল। ভদ্রলোক কে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার সহকর্মী, টিকিট পরীক্ষক,  অলক কর্মকার কে চিনতেন? , 
বিলক্ষণ,  অলক আপনার কে হ'য়? 
আমার বিশেষ পরিচিত। 

তারপর নানা কথায় ডাকাতির প্রসঙ্গে এলাম। নিমততা স্টেশনের ডাকাতি র কথা বলতে, বললেন, এখন তারা আর ডাকাতি করে না। তাদের ছেলে-মেয়েরা এখন ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। ডাকাত রা এখন নেতা। আড়াই ভরির চেন, দুহাতে আটটা আংটি, স্করপিও গাড়ী,  সে দিন ই পাঞ্জাবি পরে ভাষন দিচ্ছিল। তিন ঘন্টায়, একটা ওয়াগন সাফ করে দিত। এখন আর ও সব কাজ করবে না।

টিকিট পরীক্ষক  যখন এ সব বলছিলেন তখন আমার বগির সহ যাত্রিরা,  মোবাইলে র, "তেরে বিনা জিন্দেগী সে কয়ি.....সিকোয়া নেহী" গান বন্ধ করে, ' ডাকাত -কাহিনী' হাঁ করে গিলছিল।

ফারাক্কা আসাতে উনি বললেন, চলুন চা খেয়ে আসি। সকালে বেড়গুম থেকে ভারতী বৌদির দেওয়া মাছ ভাত নষ্ট হয়ে   যাবে বলে নৈহাটিতেই সাবাড় করে দিয়েছি। পেট টা ভরা ভরা কিন্তু নিমতিতা থেকে জলপাইগুড়ি তে পুতুল কে  যখন জানালাম, রাতে আর খাব না। স্বভাব সিদ্ধ শাসনের সুরে বলল, " একদম উপোস করবে না, অবশ্যই মালদা থেকে খেয়ে নেবে।"

স্টেশনের স্টলে পৌছতেই দেখি চারটি প্লেটে ব্রেড-টোস্ট, ওমলেট, এক গ্লাস  গরম কফি। আপত্তি  জানানোর আগেই বললেন, " তাড়াতাড়ি খেয়ে নিন, আমি এখানেই নেমে  যাব। মালদা থেকে অন্য টিটি (সুভাষ বাবু) উঠবেন।  নিউ জলপাইগুড়ি তে উনি আপনাকে চা খাওয়ার ব্যাবস্থা করবেন। "

ট্রেনে ওঠার সময় দেখলাম, এক ভদ্রলোক, হাসি মুখে ষ্টল মালিক কে আমাদের বিলের বাবদ পাঁচ 'শ টাকা বাড়িয়ে দিলেন। নেতা গোছের এই ভদ্রলোক এর সোনার চেন,হাতের আংটি দেখে,  আমার কফি- ওমলেট গলায় ধাক্কা দিতে শুরু করল। তিস্তা - তোর্ষা তখন কোমর  দুলিয়ে চলতে শুরু  করেছে।

No comments:

Post a Comment